#আমি_তরুলতা (২৫)
#সোফিয়া_সাফা
{তরুলতা নীলাভের শুভ পরিণয়}
সকাল ৮ টা।
নীলাভ নিজের রুমে ঘুমাচ্ছে, দেরি করে ঘুমানোয় সে এখনও গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। অসুস্থতার জন্য সে ছুটি নিয়েছে একেবারে স্যাটার ডে থেকেই কাজে যাবে। এদিকে তরু সবেমাত্র ফ্রেশ হয়ে বের হয়েছে। সে রেডি হয়ে নিচ্ছে অফিসে যাওয়ার জন্য। গতকাল অফিসে গিয়েছিলো কিন্তু সেখানে বেশি কাজ ছিলোনা যার জন্য সে নিজের কাজে বেরিয়ে গিয়েছিলো। আজও অফিসে যাবে তারপর সেখান থেকে তার ড্যাডের সাথে দেখা করতে যাবে। গতকাল বিকেলে তার ড্যাড সাভারে এসেছে তার সাথে দেখা করতে। তরু রেডি হচ্ছিলো তখনই সাবিনা তার রুমে আসে। সাবিনাকে আসতে দেখে তরু একটু অবাক হলো,
“আরে আন্টি আপনি? এখন আপনার শরীর কেমন আছে?”
“ভালো, ত্রানা তোমার সাথে আমার কিছু কথা ছিল।”
“হ্যাঁ আন্টি বলুন না,”
সাবিনা বেডের উপর বসলো, সেখানেই বানীকে বসিয়ে রেখেছিলো তরু। সাবিনা বানীর দিকে একবার তাকালেন তারপর তরুর দিকে তাকিয়ে বললেন।
“ত্রানা আজকে তোমার বাবার সাথে তোমার আংকেল নীলাভ আর তোমার বিয়ের ব্যাপারে কথা বলবে। তুমি কি কিছু বলতে চাও? দেখো তুমি যা ইচ্ছা বলতে পারো। আমি তোমাকে জোর করবোনা।”
তরু সাবিনার পাশে এসে বসলো,
“আন্টি একটা সত্যি কথা বলছি আমি নীলাভ স্যারকে পছন্দ করি। জানিনা কেনো তাকে আমার ভালো লাগে। আর এই প্রথম আমার সাথে এমন টা হয়েছে। তার উপর আপনাদের ফ্যামিলি আমার ভালো লেগেছে, জারাও আছে এখানে। আর আপনাকে দেখলেই কেনো যেন মায়ের কথা মনে পরে। এই প্রথম আমি একটা পরিবার পেয়েছি। সবকিছু মিলিয়ে আমি নীলাভ স্যারকে বিয়ে করতে রাজি আছি কিন্তু আমি চাইনা আপনারা তাকে জোর করুন। সে যাকে চাইবে তার সাথেই তার বিয়ে হোক।”
সাবিনা তরুর কথায় খুশি হলেন। তরুর মাথায় হাত রেখে বললেন,
“দেখো মা নীলাভ আমার ছেলে, বাচ্চারা না বুঝে শুনে অনেক সময় অনেক আবদার করে বসে যেটা তাদের জন্য পরবর্তীতে ভালো হয়না। কিন্তু মা বাবার উচিৎ তাদের সন্তানদের ভালো হবে এমন কিছু করা। আমি জানি নীলাভ তোমাকে বিয়ে করলেই সুখী হবে। তাই ওর বিয়ে আমি তোমার সাথেই দেবো।”
“কিন্তু স্যার হয়তো এটা চায়না। সে গত রাতেও আমাকে এগুলো নিয়ে কথা শুনিয়েছে, অনেক কথা বলেছে। আন্টি আমি সত্যিই চাইনা আমাকে নিয়ে আপনাদের মাঝে ঝামেলা হোক। তেমন হলে আমি অন্য কোথাও গিয়ে থাকবো।”
সাবিনা ভ্রু কুচকে বললেন,
“নীলাভ কি বলেছে তোমাকে?”
“বাদ দিন আন্টি। আমি চাইনা এসব নিয়ে আবারও আপনাদের মাঝে ঝগড়া হোক।”
“আহ বলোনা কি বলেছে।”
তরু মাথা নিচু করে বললো,
“বলেছে আমাকে খারাপ বানানোর জন্য সে আপনার কাছে এমন কিছু বলবে যা আমি করিই নি। যেন আপনি আমাকে আর দেখতে না পারেন।”
সাবিনা স্তব্ধ হয়ে গেলেন, তার ছেলে এমন কিছু বলতে পারে এটা ছিলো তার কল্পনাতীত।
“তুমি এই নিয়ে ভেবোনা, তুমি কি অফিসে যাচ্ছো?”
“হ্যাঁ আন্টি,”
“আচ্ছা বিকালের দিকে চলে এসো আজকেই তোমাদের এনগেজমেন্ট হবে।”
তরু মনে মনে অনেক খুশি হলো। কিন্তু মুখে বলল,
“স্যার তো আমাকে দেখতেই পারেন না। সে কি রাজি হবেন?”
“ওসব নিয়ে ভেবোনা৷ আমি সব ম্যানেজ করে নেবো। আর তোমার বাবা কি আসতে পারবেন? নাকি তোমার আংকেল যাবেন?”
“ড্যাড তো সাভারেই আছে। গতকাল বিকালেই এসেছে। ঝামেলার জন্য তার কথা বলে উঠতে পারিনি। আর নাতো তার সাথে দেখা করতে পেরেছি।”
সাবিনা খুশি হলেন।
“আচ্ছা তোমার বাবার নম্বর টা দিয়ে যাও—তোমার আংকেল কল করে দেখা করতে বলবেন।”
তরু নম্বর টা দিয়ে নাস্তা করে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলো। অবশ্য সে গতকালই তার ড্যাড রাফিজ চৌধুরীকে সাভারে আসতে বলেছিলেন। মেয়ের কথা ফেলতে পারেননি রাফিজ। তাইতো গতকাল বিকেলেই সে সাভারে এসেছেন। তরু তো এখন অফিস থেকে সেখানেই যাবে বলে ঠিক করেছিলো।
এদিকে নাজমুল আর নাহিদ সকাল ১১ টার দিকেই বাড়িতে ফিরে আসে। নীলাভ মাকে দেখতে তার রুমে যাবে ভাবছে কিন্তু সাহস পাচ্ছেনা। সকালে ব্রেকফাস্ট করার সময় সাবিনা ছিলেন না। জারা-ই তাকে ব্রেকফাস্ট দিয়েছিলো। নীলাভ সাহস জোগাড় করে সাবিনার রুমে আসলো।
“মা আসবো?”
সাবিনা দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলেন নীলাভ দাঁড়িয়ে আছে, সে গম্ভীর স্বরে বললেন,
“এসো।”
নীলাভ এসে তার মায়ের সামনে বসলো।
“মা তোমার সাথে কিছু কথা ছিলো। প্রথমত আমি স্যরি গতকালকের আচরণের জন্য। আমার তোমার সাথে ওভাবে কথা বলা উচিৎ হয়নি। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দেও।”
সাবিনা নিজের কাপড় গুছিয়ে আলমারিতে রাখছিলেন। কাপড় ভাজ করতে করতেই বললেন,
“আমি তোমাকে একটা শর্তেই মাফ করবো আর সেটা হলো ত্রানাকে বিয়ে করলে।”
নীলাভ আশাহত হলো। তার মা এই ব্যাপারে এবার একটু বেশিই জেদ করছে বলে মনে হচ্ছে।
“মা তুমি ওনাকে কতদিন ধরে চেনো? তুমি ওনার ব্যাপারে কতটুকুই বা জানো? উনি যেমন ভাব ধরে থাকেন উনি কিন্তু মোটেও তেমন নয়।”
“ও কেমন সেটা আমাকে বোঝাতে এসোনা। আর রইলো চেনার কথা। ও তো আর আমার নিজের মেয়ে নয় তাই ওকে না চেনাটাই স্বাভাবিক নয়কি?”
নীলাভ বুঝলো তার মা এখনো রেগেই আছে। তাই সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে যেতে নিলো তখনই সাবিনা পেছন থেকে বলে উঠলেন,
“ওকে না চিনতেই পারি, কিন্তু নিজের ছেলেকে আমি ভালো করে চিনি। শোনো আজকে বিকালে তোমার আর ত্রানার এনগেজমেন্ট হবে তৈরি থেকো।”
নীলাভ ঘুরে এসে বললো,
“মা তুমি আমায় চিনলে আমার কথাটা অবশ্যই বোঝার চেষ্টা করতে। প্লিজ আমার কথাটা বোঝার চেষ্টা করো। ওনাকে আমার পছন্দ নয়। আমি দেখতে পারিনা ওনাকে।”
সাবিনা উঠে এসে নীলাভের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন,
“দেখা দেখির ব্যাপার টা বিয়ের পরে হওয়াই ভালো। নাহিদও কিন্তু জারাকে দেখতে পারতোনা। কিন্তু এখন নিজের চোখেই দেখো নাহিদ জারা বলতে অজ্ঞান। ওকে ছাড়া কিছুই বোঝেনা। তোমার ক্ষেত্রেও তেমনটাই হবে। আর অপছন্দ হওয়ার মতো ত্রানার মাঝে কিছুই নেই। ও তোমার জন্য পার্ফেক্ট ম্যাচ.”
নীলাভ কিছু বলতে নিলে সাবিনা বলে ওঠেন,
“আমার কথার অবাধ্য হয়ে দেখো আজকে। তুমি সারাজীবনের মতো আমাকে হারিয়ে ফেলবে। তারপর তখন তোমার যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে।”
সাবিনার কথা শুনে নীলাভের পায়ের নিচের মাটি সরে গেলো যেনো। সে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। মূহুর্তেই চোখ দুটো ভীষণ রকমের লাল হয়ে গেছে। সাবিনা দেখেও যেনো দেখলেন না। সে আজকে বাধ্য হয়েছে নীলাভকে এসব কথা বলতে।
“ছেলেমেয়ে অবাধ্য হয়ে গেলে সেই বাবা মায়ের বে'চে না থাকাই উত্তম। আমার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আমাকে বাধ্য কোরোনা তেমন কিছু করতে।”
নীলাভের দম আটকে গেলো যেনো। গলা দিয়ে কথাও বের হচ্ছেনা। সাবিনা তাকে এসব কথা বলবেন সে ভাবতেও পারেনি। সাবিনা তো তার পুরো কথাটাই শুনলোনা। নীলাভ বহু কষ্টে বলে উঠলো,
“মা আগে আমার কথাটা অন্তত শোনো প্লিজ?”
“আমি তোমার কোনো কথা শুনতে ইচ্ছুক নই। তুমি এখন যেতে পারো। আমার যা বলার ছিলো আমি বলে দিয়েছি। বাকিটা তোমার ইচ্ছা।”
নীলাভ ২ কদম পিছিয়ে গিয়ে মায়ের উদ্দেশ্যে বললো।
“আজ তুমি জিতে গেলে মা। আমি হেরে গেলাম তোমার জেদের কাছে। তবে আমাকে হেরে যেতে দেখে তুমি খুশি হতে পারবে তো?”
“বিষয় টা মোটেও হার জিতের নয়। একদিন না একদিন তুমি আজকের দিনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।”
“তাই যেনো হয় মা। কিন্তু তোমার আজকের সিদ্ধান্তের জন্য ভবিষ্যতে যেনো তোমাকেই আবার আফসোস করতে না হয়।”
বলেই নীলাভ চলে গেলো। সাবিনা কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলেন। তখনই নাজমুল সাহেব এসে তার কাধে হাত রেখে বললেন,
“ছেলের কথায় মন ভারী কোরোনা সাবিনা। দেখবে যা হবে ভালোর জন্যই হবে।”
সাবিনা একটা শ্বাস ছেড়ে বললেন,
“তুমি মিস্টার চৌধুরীর সাথে কথা বলেছো?”
“হ্যাঁ আমি আর নাহিদ বাড়িতে আসার আগে তার সাথে রেস্টুরেন্টে দেখা করেছি আর আজকের এনগেজমেন্ট এর কথাও পাকা করেছি।”
সাবিনা খানিকক্ষন ভেবে বললেন।
“না। তুমি বরং একেবারে কাজি সাহেবকেই আসতে বলো।”
নাজমুল অবাক হয়ে বললেন,
“আজকেই কেনো? আজকে তো শুধু এনগেজমেন্ট হবে তাইনা?”
“আমি কোনো রিস্ক নিতে চাইনা নীলাভকে বহু কষ্টে রাজি করিয়েছি। ওর মত যখন তখন পরিবর্তন হতে পারে। ভুলে যেওনা ও সি আইডি অফিসার। আমাদের থেকে অনেক গুন বেশি বুদ্ধি নিয়ে ঘোরে। তুমি আর নাহিদ আত্মীয় স্বজন যারা যারা আছে সবাইকে ইনভাইট করে ফেলো। এক্ষুনি রওনা দিলে সবাই রাতের আগেই আসতে পারবে। আজকে রাতেই নীলাভ আর ত্রানার বিয়ে হবে।”
নাজমুল মাথা নাড়ালেন। তার খুব একটা চিন্তা হলোনা কারণ মিস্টার চৌধুরী খুব মিশুক, সে বলেছে ত্রানা যেহেতু রাজি হয়েছে, সে আর এখানে আপত্তি করবেন না। সেই হিসাবে আজকেই বিয়ে হলে মিস্টার চৌধুরী দ্বিমত করবেননা নিশ্চয়ই? তবুও নাজমুল সাহেব রাফিজ চৌধুরীকেই আগে কল করে জানালেন। সে সম্মতি দিলে নাজমুল সাহেব নাহিদকে নিয়ে বাকি সব আত্মীয় স্বজনদের ইনভাইট করতে শুরু করে দেয়। এদিকে সাবিনাও জারাকে নিয়ে কেনাকাটার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়।
দুপুর ২ টার দিকেই নীলাভ আর নাহিদের কাজিনেরা সবাই চলে এলো। নীলাভের বিয়ের খবর শুনে সবাই তাড়াহুড়ো করেই এসে পড়েছে। সেই সাথে কাছের আত্মীয়রাও আসতে শুরু করে দিয়েছে। ডেকোরেটরের লোকেরাও এসে বাড়িঘর সাজাতে শুরু করে দিলো। নাজমুল জারার বাবা মিস্টার সাফোয়ান এহসানকেও সপরিবারে আমন্ত্রণ জানালেন। সাফোয়ান অবশ্য এই ব্যাপারে জানে। তাজিম তাকে বলেছিলো। তাই সে আসা নিয়ে দোনোমোনো করছিলেন কিন্তু নাজমুলের জোরাজুরিতে সে আসবে বলে দিয়েছে।
এদিকে নাজমুল সাহেব যখন রাফিজ চৌধুরীকে কল করেছিলেন তরু তখন তার সামনেই ছিলো। তরু এই ব্যাপারে জানাতে পেরে একটু স্বস্তি বোধ করলো। অবশেষে তার আর নীলাভের বিয়েটা হচ্ছে। অবশ্য বিয়েটা একেবারে না হওয়া পর্যন্ত সে পুরোপুরি শান্তি পাচ্ছেনা।
বিকাল চার টা,
“সুইটি তোমার এখন যাওয়া উচিৎ।”
“হ্যাঁ ড্যাড, এক্ষুনি চলে যাবো। তুমি সবাইকে নিয়ে তাড়াতাড়িই চলে এসো কেমন?”
“হ্যাঁ অবশ্যই আমি লেইট করবোনা।”
তরু রাফিজ চৌধুরীর বাড়ি থেকে বের হয়েই তাজিমকে কল করলো,
“ভাইয়া ভুলে যেওনা আবার, তোমার একমাত্র বোনের বিয়ে কিন্তু।”
তাজিম হাসলো,
“হ্যাঁ আমার একমাত্র পাগলী বোনটার বিয়ে আজকে আমি অবশ্যই আসবো। চিন্তা করিস না।”
তরু তার বাকি বন্ধুদের কল দিয়েও আসতে বলে দিলো। তারপর নীলাভদের বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লো। নীলাভ সাবিনার রুম থেকে বের হওয়ার পর থেকেই নিজের রুমে দরজা আটকে বসে আছে। তার কাজিনরা অনেক বার ডাকাডাকি করলেও সে বের হয়নি। বাইরের সাউন্ড বক্সের আওয়াজে তার ভীষণ বিরক্ত লাগছে। সে বুঝতে পারছে আজকে বিরাট বড় কিছু একটা হতে চলেছে। কিন্তু সে কিই বা করবে? সে যে কোনো কিছুর বিনিময়েই নিজের মাকে হারাতে পারবেনা। এই মূহুর্তে তার মাথাতেও কোনো কিছুই আসছেনা।
বিকাল সাড়ে চার টা নাগাদ সাবিনা আর জারা শপিং করে ফিরে এলো। জারা তো কিছুই বুঝতে পারছেনা যে হচ্ছেটা কি? তরু তো বললো সে লাভ ম্যারেজই করবে তাহলে সাবিনা কেনো বলছেন যে তরু এই বিয়েতে রাজি?
“মা আপনি ভাইয়া আর আপুকে এই ব্যাপারে ভালোভাবে জিজ্ঞাস করেছেন তো?”
জারার কথায় সাবিনা বিরক্ত হলেন। মেয়েটা এই নিয়ে ১০ বারেরও বেশি একই প্রশ্ন করে যাচ্ছে।
“হ্যাঁ আমি ভালোভাবে জেনে বুঝেই সব করছি। তুমি প্লিজ এসব কথা রেখে আমার সাথে মিলে কাজে মনোযোগ দেও। সময় নেই বেশি।”
বিকাল ৫ টা,
তরু খান ম্যানসনে প্রবেশ করেই দেখলো বাড়ি ভর্তি মানুষ জন। এতো মানুষ জন দেখে সে একটু নার্ভাস ফিল করলো। সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে নেবে তখনই নীলাভের কাজিন বোনগুলো তরুকে এসে ঘিরে ফেললো। তাদের মধ্যে একজন জারার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ভাবি এই মেয়েটাই কি আমাদের হবু ছোটো ভাবি?”
জারা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলতেই ওরা ৫ জন তরুকে একপ্রকার টেনে নিয়ে গিয়ে ড্রইংরুমে বসালো। সেখানে আরো কয়েকজন মধ্যবয়সী মহিলা বসে ছিলেন। সম্পর্কে তারা নীলাভের ফুপু, মামি আর কাকি হয়। চারপাশে এতো মানুষ দেখে তরুর মাথা ঘুরছে। সবাই অদ্ভুত দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে এনায়া, সম্পর্কে সে নীলাভের বড় কাকী হন। সে বলে উঠলেন,
“মেয়েটা দেখতে শুনতে ভালোই। আয়ুর থেকেও ভালো।”
তরু একবার তার দিকে তাকিয়ে পরখ করে নিলো। তরু অবশ্য নীলাভের কাকিকে চেনে। এনায়ার কথার পিঠে নীলাভের বড় মামী রুবি বললেন,
“দেখতে শুনতে ভালো হলেই হবে নাকি? সাবিনা আপা তো ছোটো পোশাক পড়া মেয়েদের পছন্দ করেননা। আয়ুকেও এই নিয়ে অনেক বোঝাতেন। তাহলে সে আবার একে পছন্দ করলো কিভাবে?”
তার কথার পিঠে নীলাভের ফুপাতো বোন জিনিয়া বলে উঠলো,
“মামি এটাকে ছোটো পোশাক বলেনা এটাকে শার্ট প্যান্ট বলে। দেখোতো শরীরের কোনো অংশ বের হয়ে আছে নাকি? নেইতো তাইনা, যেই পোশাকে শরীর বের হয়ে থাকে সেই পোশাক কে ছোটো পোশাক বলে।”
রুবি পান চিবোতে চিবোতে বলতে লাগলেন,
“হয়েছে হয়েছে আমাকে আর এই বয়সে পোশাক চেনাতে হবেনা।”
তাদের কথা বাদ দিয়ে কাজিনরা সবাই প্ল্যান করতে শুরু করলো। সময় না থাকায় গায়ে হলুদ সহ বাকি সব অনুষ্ঠান আজকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সেসব অবশ্য কালকে হবে। আজকে শুধু বিয়েটা হবে। তবে সেসবের পাশাপাশি কালকে বিরাট বড় করে বৌভাতের আয়োজন করা হবে। তাদের সব প্ল্যান কালকের জন্য।
তাদের সবার পরিচয় জানা যাক। জিনিয়া আর জিসান দুজন ভাইবোন। নয়না হচ্ছে নীলাভের বড় কাকার মেয়ে তার একটা বড় ভাই আছে যার নাম নিকি, নিকি একবছর আগেই বিয়ে করেছে, তার বউয়ের নাম রোজি। আর বাকি দুজন হচ্ছে নীলাভের মামাতো বোন। যাদের নাম হচ্ছে লিলি আর লরা। তাদের ভাই নেই। নীলাভের বাবারা ৩ ভাই এক বোন, ছোটো কাকার ১ ছেলে আর ১ মেয়ে তারা দুজনই ছোটো, স্কুলে পড়ে। তাদের কথার মাঝেই দরজা দিয়ে ২ জন যুবক প্রবেশ করে। জারা workers দের রান্নার কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছিলো। যুবক দুজনকে দেখে সে হাসিমুখে সেদিকে এগিয়ে যায়।
“আরে মাহদী আর জুনায়েদ ভাই আপনারা এসেছেন?”
মাহদী হাসিমুখে বললো,
“ইয়েস ভাবি, আমাদের বেস্টফ্রেন্ড নীলের বিয়ে আর আমরা আসবোনা তা কি হয়?”
জুনায়েদ হাপ ছেড়ে বললো,
“উফ বাড়িঘর সাজানো দেখে নিশ্চিন্ত হলাম। আমি তো প্রথমে ভেবেছিলাম নাহিদ ভাই প্রাংক করছে। তার উপর নীলকে কখন থেকে কল করছি ওতো রিসিভ ই করছেনা।”
মাহদী বলল,
“চল গিয়ে দেখি মশাই কি করছে যে কলটাও রিসিভ করার সময় পাচ্ছেনা।”
জারা নিচু স্বরে বলে,
“ভাইয়া সকাল থেকে রুমে দরজা আটকে বসে আছে। দুপুরে খেতেও বের হয়নি।”
জুনায়েদ ভ্রু কুচকে তাকালো।
“মানেহ? ওকে কি তোমরা জোর করে বিয়ে দিচ্ছো নাকি? এরকম টাতো মেয়েরা করে ও আবার কবে থেকে এরকম আচরণ করতে শুরু করলো?”
মাহদী বলল,
“আমি তো আরও ভাবছিলাম না জানিয়ে বিয়ে করছে বলে কল রিসিভ করছেনা।”
তাদের কথার মাঝে নাহিদ এসে বলে,
“কিরে তোরা এসে গেছিস, আয় তোদের সাথে আমার কিছু কথা আছে।”
নাহিদ মাহদী আর জুনায়েদকে অন্য দিকে নিয়ে গিয়ে পুরো ব্যাপার টা ক্লিয়ার করে বললো৷ তারপর বললো নীলাভের কাছে গিয়ে ওকে বোঝাতে আর ওর সাথে সাথে থাকতে। মাহদী আর জুনায়েদকে দেখে নীলাভের ফুপাতো ভাই জিসান আর চাচাতো ভাই নিকি এগিয়ে এলো। নাহিদ ওদের দেখে বললো,
“তোরা চারজন নীলাভের কাছে যা। তারপর ওকে বুঝিয়ে শুনিয়ে রেডি কর। ২ জন ওর সাথেই থাকিস আর ২ জন আমার সাথে এসে একটু অন্য কাজগুলোতে সাহায্য করবি কেমন?”
নাহিদের কথায় সম্মতি জানিয়ে ওরা চার জন নীলাভের রুমের দিকে চলে যায়। এদিকে এতো লোকের মাঝে বসে থাকতে থাকতে তরুর অবস্থা বেহাল। এখন সন্ধ্যা ৭ টা বাজে। বিয়ের ডেকোরেশন কমপ্লিট হয়ে গেছে। বাগানের পুরো অংশটাই ডেকোরেট করা হয়েছে চারদিকে আলোয় আলোয় আলোকিত। এরই মাঝে তাজিমসহ সাফোয়ান আর জহুরাও এসে উপস্থিত হয়েছেন। সাফোয়ান অবশ্য জহুরাকে ভালোভাবে বুঝিয়ে শুনিয়েই এখানে এনেছেন।
জহুরাকে দেখে জারা তার কাছে আসতেই জহুরা চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন,
“এতকিছু হয়ে গেলো তুই আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করলিনা মুখপুরি। বারবার বলে দিয়েছিলাম এই মেয়ে এই বাড়িতে আসা মাত্রই আমাকে জানাবি। শুনলিনা কথা হুহ এখন বুঝবিনা। কিন্তু ভবিষ্যতে ঠিকই বুঝবি কতবড় বোকামি করেছিস আমাকে না জানিয়ে।”
জারা জহুরার কথা এড়িয়ে গেল। সে কেনো জানাতো? জহুরা যে তার বোনকে দেখতে পারেনা সে কি জানেনা? জহুরা জানলে কি তার বোনকে তার সাথে থাকতে দিতো? কখনোই দিতোনা।
ত্রানাকে সবার মাঝে বসে থাকতে সাবিনা ডাক দিলেন।
“কিরে তোরা এখনো ওকে এখানে আটকে রেখেছিস? মেক- আপ আর্টিস্ট এলো বলে। জারা ও জারা,,,
সাবিনার ডাকে জারা তার কাছে ছুটে গেলো।
“তোমার আর কোনো কাজ নেই মা। কাজ করার জন্য যথেষ্ট লোক আছে। তুমি শুধু ত্রানার সাথে থাকো।”
“আচ্ছা মা।”
সাবিনা বাকি সবার উদ্দেশ্যে বললেন,
“মেয়েরা সবাই গিয়ে রেডি হয়ে নেও। অল্রেডি ৭ টা বেজে গেছে। তোমাদের তো রেডি হতে ঢের সময় লাগবে।”
সাবিনার কথা মতো সবাই যার যার জন্য বরাদ্দকৃত রুমে চলে গেলো রেডি হতে। জারা তরুকে নিয়ে তরুর রুমে চলে এলো। এতোক্ষণে তরু একটু নিশ্বাস নিতে পারছে। ওখানে বসে বসে মহিলাদের আজেবাজে কথা শুনতে শুনতে তার কান খারাপ হয়ে গেছে। অবশ্য সাবিনার সামনে কেউ কিছু বলতে পারেনি। সবাই আড়ালে বলেছে। বেশিরভাগ কথাই হয়েছে জারাকে আর তার ফ্যামিলিকে নিয়েই। সে কিছু বলতে চেয়েও বলেনি। আজ সে কোনো প্রকার ঝামেলা করতে চায়না। শুধু বিয়েটা হয়ে নিক, সবার কথাগুলো সে নোট করে রেখেছে।
নীলাভ গম্ভীর মুখে বসে আছে। মাহদী আর জিসান সেই কখন থেকে বোঝাচ্ছে। কিন্তু কোনো কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারছেনা। জুনায়েদ আর নিকি নাহিদের সাথে মিলে অন্যান্য কাজ করতে ব্যস্ত। বাইরের মেহমানরা সবাই ডেকোরেশন করা জায়গাতেই এসে বসবেন। সেই জন্যই এখানের সবকিছু রেডি করতে সাহায্য করছে তারা। দশ টা নাগাদ তাদের প্রোগ্রাম শুরু হবে।
মেক-আপ আর্টিস্ট মিলে তরুকে সাজাচ্ছে। জারাও রেডি হচ্ছে। এই প্রথম তরু এতো বেশি সাজগোছ করছে। সাজাতে সাজাতে মেক-আপ আর্টিস্ট এর একজন বলে,
“তুমি এমনিতেই সুন্দর তাই বেশি কষ্ট করতে হবেনা।”
তরু কিছুই বললোনা শুধু হাতে থাকা বানীকে আরেকটু জড়িয়ে নিলো। সাজানো শেষ হলে তরুকে একটা ভারী মেরুন রঙের লেহেঙ্গা পড়ানো হলো। সেই সাথে গোল্ডের আর স্টোনের জুয়েলারি পড়ানো হলো। এই জুয়েলারি গুলো সাবিনা অনেক আগেই নীলাভের বউয়ের জন্য বানিয়ে রেখেছিলেন। সবশেষে তরুর মাথায় ইয়াবড় একটা ঘোমটা পড়ানো হলো। তরুকে এই সাজে একদম রাজরানীর মতো লাগছে। জারা তো তরুকে দেখে অজ্ঞান হয়ে যাবার উপক্রম,
“আপু তোমাকে এতো সুন্দর লাগছে যে আমি বোন হয়েও চোখ সরাতে পারছিনা। নীলাভ ভাইয়ের কি হবে সেটাই ভাবছি।”
তরু হাল্কা হাসার চেষ্টা করলো। আজকে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দরতম দিন। সে তার ভালোবাসাকে নিজের করে পেতে চলেছে। তরু জারার দিকে তাকিয়ে দেখলো জারা খয়েরী রঙের ভারী স্টোনের একটি শাড়ি আর সাথে ম্যাচিং জুয়েলারি পড়েছে। দেখতে অনেক বেশি কিউট লাগছে।
“তোকেও আজকে অনেক বেশি সুন্দর লাগছে।”
জারা কিছু একটা ভেবে বললো,
“আপু তুমি বিয়েতে রাজি আছোতো? নাকি আবার আমার কথা ভেবে রাজি হয়েছো?”
“না আমি রাজি আছি।”
“কিন্তু তুমিতো লাভ ম্যারেজ করতে চেয়েছিলে।”
“হুম লাভকেই তো বিয়ে করছি।”
জারা কথাটা বুঝে উঠতে পারলোনা,
“মানে?”
“মানে আমি এখন ম্যারেজ লাভ করতে চাইছি।”
“সেটার আবার কি মানে?”
“মানে বিয়ের আগে প্রেম না করে বিয়ের পরে প্রেম করবো।”
জারা খুশি হয়ে তরুকে জড়িয়ে ধরলো। তরু একটু অস্বস্তি বোধ করলো। এমনি এই পোশাকে তার ভীষণ uncomfortable লাগছে। লেহেঙ্গা টা ভীষণ ভারী নিশ্বাস নিতেও যেনো কষ্ট হচ্ছে। তার উপর ভারী ভারী গহনা গুলো তো আছেই। তখনই রুমে আভিক আর লিজা প্রবেশ করে। সাবিনা জারাকে ডাক দেয়ায় জারা তার কাছে চলে যায়।
তাদেরকে দেখে তরু বিভানের কথা জিজ্ঞেস করে। লিজা তরুর সামনে বসে বলে,
“যেই একটা ঝামেলা ওর গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছিস। ওর তো নিশ্বাস নেয়াও দায় হয়ে গেছে।”
“কি হয়েছে?”
আভিক বলল,
“কি হয়েছে বলছিস? কি হয়নি বল। অই মোমোর খপ্পরে পড়ে ওর জীবন ত্যানাত্যানা।”
“ও আসেনি?”
“এসেছে কিন্তু মোমো ওকে বগলদাবা করে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”
তরু কিছুই বললোনা। লিজা তরুকে দেখে বললো,
“তোকে তো পুরোই ডল লাগছে ইয়ার। তোর লাভ আজকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকবে দেখিস।”
“হ্যাঁ তোকে দেখে মনেই হচ্ছেনা যে তুই একজন গ্যাংস্টার। একদম innocent একটা রাজরানীর মতো লাগছে।”
তরু বাকা হাসলো।
“আমাকে দেখা হয়ে গেলে এবার একটু গিয়ে নীলাভকে দেখে আয় তো।”
“আচ্ছা যাচ্ছি”
আভিক চলে যেতেই তাজিম মাইশাকে নিয়ে তরুর রুমে আসে। তরুকে দেখিয়ে বলে
“মাইশা বউ দেখবেনা? এই দেখো, আমার বোনের হবু জা।”
তাজিমের পরিচয় করানো দেখে তরু আড়চোখে তাকালো। তবে বুঝতে পারলো যে মাইশাকে এখন তার আসল পরিচয় জানানো ঠিক হবেনা সেই জন্যই তাজিম এমনটা করেছে।
তরু একটু ভাব নিয়েই বলে।
“আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না ভাই। কে আপনি?”
তরুর কথা শুনে তাজিম অবাক চোখে তাকিয়ে চাপা স্বরে বলল,,
“মজা করছিস আমার সাথে?”
তাজিম আরোও কিছু বলতে যাবে তার আগেই মাইশার চাহনি দেখে সে কথা ঘুরিয়ে নেয়।
“ওহ না মানে তুমি আমাকে চিনতে পারছোনা? আমি হচ্ছি জারার ভাই। জারা তো তোমার বন্ধুও হয়। ওইযে লন্ডনের কথা মনে নেই। সেখানেই তো জারার সাথে তোমার বন্ধুত্ব হয়েছিলো। জারা লন্ডনে আমার সাথেই দেখা করতে গিয়েছিলো বুঝলে।”
তরু বাকা হেসে বললো,
“ওহ হ্যাঁ মনে পড়েছে, জারা আপনার কথা বলেছিলো আমাকে, কিন্তু আমাদের কখনো দেখা হয়নি। আ,,, উনি কে? আমাদের ভাবি?”
তাজিম হাসিমুখে বলল,
“হয়নি তবে শীঘ্রই হবে। তোমার বিয়ে মিটে গেলেই বিয়ে করবো ভাবছি।”
লিজা বসে বসে ওদের কান্ডকারখানা দেখে মুখ চেপে হাসছে তখনই সেখানে জারা আসে। মাইশাকে দেখে সে অনেক খুশি হয়ে যায়।
“এই নে তোর হবু ভাবির সাথে পরিচিত হ।”
“আরে ভাবি তুমি এসেছো আমি সত্যিই অনেক খুশি হয়েছি। আজকে আমার জন্য সবচেয়ে খুশির দিন।”
“তোমার মতো কিউট ননদের দেখা পেয়ে আমিও অনেক happy হয়েছি।”
বলেই মাইশা জারাকে জড়িয়ে ধরলো। তরু আড়চোখে একবার তাকিয়ে থেকে চোখ সরিয়ে নিলো।
এদিকে নীলাভ চুপচাপ বসে আছে। বিয়ের কথা শুনে সে স্তব্ধ হয়ে গেছে। কি করবে বুঝতে পারছেনা। সবাই এতোক্ষণ যাবত জোরাজুরি করে এবার ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। এদিকে ১০ টা বাজতেও বেশি সময় বাকি নেই। মাহদী গিয়ে নাহিদকে এই ব্যাপারে জানালে নাহিদ নীলাভের রুমে এসে সবার উদ্দেশ্যে বলে,
“তোমরা গিয়ে তৈরি হয়ে নেও। আমি নীলাভকে রেডি করে নিয়ে আসছি।”
সবাই চলে যেতেই নাহিদ দরজা আটকে দিয়ে বলে,
“তুই কি বিয়েটা করবিনা?”
নীলাভ নিশ্চুপ,
“কি হল বল। না করলে বলে দে, তোর ভয় নেই আমি মাকে বোঝাবো। সে তোর ওপর কোনো রকম জোর জবরদস্তি করবেনা।”
নীলাভ তবুও চুপ করেই রইলো। নাহিদ এবার বিরক্ত হয়ে বললো।
“আচ্ছা আমি বরং বাইরে গিয়ে সবাইকে বলে দিচ্ছি যে তুই বিয়েটা করবিনা।”
নাহিদ বেরিয়ে যেতে নেবে তার আগেই নীলাভ তার হাত ধরে তাকে আটকায়।
“বিয়েটা আমি করবো। আর প্রমাণও করে দেবো যে নীলাভ জাহির খান স্বার্থপর নয়।”
নাহিদ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর নীলাভকে রেডি হতে সাহায্য করলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই নীলাভ রেডি হয়ে নিলো। তার পরনে গোল্ডেন কালারের শেরওয়ানি, হাতে ব্যান্ডের ঘড়ি, কপাল পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা সিল্কি চুলগুলো জেল দিয়ে সেট করা। পায়ে ব্যান্ডের কেস। এই সাজে তাকে আরও বেশি সুদর্শন লাগছে। নীলাভকে দেখে মাহদী ঠাট্টা করেই বললো,
“তোকে আজকে অনেক হ্যানসাম লাগছে। সবসময় তো বউকে দেখে বর অজ্ঞান হয়। আজকে মনেহয় বউ বরকে দেখে অজ্ঞান হয়ে যাবে। দেখিস ভাই, বউকে আবার অজ্ঞান—টজ্ঞান করে দিসনা যেন।”
নীলাভ কিছুই বললোনা তাকে রেডি হয়ে বসে থাকতে দেখে আভিক তরুকে গিয়ে খবর টা জানালো।
,
,
,
স্টেজের মাঝ বরাবর কাচা ফুলের পর্দা দিয়ে বর্ডার দেওয়া হয়েছে। একপাশের সোফায় নীলাভ বসে আছে। আর অন্যপাশের সোফায় তরু বসে আছে। এভাবেই সামনাসামনি বসানো হয়েছে। তরুর পাশে জারা বসে আছে তাছাড়া লিজাসহ নীলাভের মেয়ে কাজিনরাও আছে। নীলাভের পাশে তার বন্ধুরা আর ছেলে কাজিনরা আছে। নাহিদ আর নাজমুল সাহেব অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত। স্টেজের সামনে চেয়ার রাখা হয়েছে সেখানেই বাকিরা বসে আছে। সাফোয়ান এহসান দূর থেকেই তরুকে দেখছে, কাছে যায়নি কারণ কাছে গেলেও তো তরু তার সাথে কথা বলবেনা। রাফিজ চৌধুরী একদম সামনের চেয়ারে বসে আছেন। সাফোয়ান এহসান তার ব্যাপারে জানেন। সেদিন সে না থাকলে হয়তো তার মেয়েকে তারা জীবিত পেতেন না।
নীলাভ গম্ভীর মুখে বসে আছে। তরু লম্বা ঘোমটার আড়াল থেকে তাকে দেখার চেষ্টা করছে কিন্তু ফুলের পর্দা টার জন্য দেখতে পাচ্ছেনা। কিছুক্ষণের মধ্যেই কাজি সাহেব তরুর সামনে গিয়ে বসলেন, তরুকে কবুল বলতে বলা হলো। তরু একটা বড় শ্বাস টেনে বললো,
“কবুল,
কবুল,
কবুল।”
কাজি সাহেব এবার নীলাভের সামনে গিয়ে বসলেন। নীলাভকে কবুল বলতে বলা হলো। নীলাভ একবার নিজের বাবা মায়ের দিকে তাকায়, যারা সামনের সারির চেয়ারে বসে আছেন। তারপর একনাগাড়ে বলে ওঠে,
“ক,,বুল,
কবুল,
কবুল।”
এরপর নীলাভকে রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করতে বলা হয়। নীলাভ কাগজটার দিকে একবার তাকিয়ে সাইন করে দেয়। তারপর তরুও রেজিট্রি পেপারে সাইন করে দিলো। ব্যাস এভাবেই তরুলতা আর নীলাভের বিয়েটা সম্পন্ন হলো। স্টেজের বাইরে থাকা সবাই একসাথে—
'আলহামদুলিল্লাহ' বলে উঠলো। কিছুক্ষণ পর নীলাভকে বলা হলো কাচা ফুলের পর্দা সরিয়ে তরুর ঘোমটা তুলে তার চেহারা দেখতে। এতোগুলো লোকের সামনে নীলাভ না করতে পারলোনা। সে উঠে দাড়িয়ে সামনে এগিয়ে গেলো, পর্দাটা সরিয়ে তরুর ঘোমটা টা তুলে ফেললো। সাথে সাথেই তরু আর নীলাভের চোখজোড়া মিলিত হলো। নীলাভ তড়িৎ গতিতে চোখ সরিয়ে নিলেও তরু তাকিয়েই রইলো।
জুনায়েদসহ বাকি কাজিনরা জোর করতে লাগলো,
“অই তুই এতো আনরোমান্টিক কেনো? ভাবির কপালে কিস কর একটা।”
“মাথা খারাপ নাকি?”
মাহদী ফিসফিসিয়ে বলল,
“দেখ সবাই তাকিয়ে আছে। এখন না করলে সবাই বিষয় টা নেগিটিভলি নেবে। বাইরের অনেকেই আছে এখানে। কর প্লিজ,”
একপ্রকার বাধ্য হয়েই নীলাভ তরুর কপালে নিজের ঠোঁট ছোয়ালো। তরু তো একদম স্ট্যাচু হয়ে রইলো। এরকম টা হবে সে ভাবেনি। নীলাভ কিস করলো তাও আবার তাকে? তরুর পেটের ভেতর যেনো হাজারো প্রজাপতি উড়াউড়ি করতে লাগলো, সেই সাথে তার দৃষ্টি শক্তিও ক্ষীণ হয়ে আসতে শুরু করলো মাথাটাও চক্কর দিয়ে উঠলো। সে নির্ঘাত আজ বেহুশ হয়ে যাবে। আর হলোও তাই তরু আচমকাই নেতিয়ে পড়লো পাশে থাকা জারার কোলের উপর।