#আমি_তরুলতা (২৮)
#সোফিয়া_সাফা
{Truth or Dare Special}
“আচ্ছা ভাইয়া বলো তাহলে ভাবিকে বিয়ে করার আগে তুমি কয়টা রিলেশন করেছিলে?”
প্রশ্নটা শুনে নিকি ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়। রোজি তো সন্দিহান চোখে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
“সত্যি করে বলবে কিন্তু ভাইয়া।”
নিকি নির্দ্বিধায় বলে, “২ টা করেছিলাম,”
কথাটা শুনে রোজি একটু রেগে যায়। নিকি রোজির দিকে তাকিয়ে বলে।
“রিলেশনে গিয়েছিলাম, তবে ভালো তো আমি নিজের বউকেই প্রথম বেসেছি। আর ওই আমার প্রথম আর শেষ ভালোবাসা।”
রোজি হাল্কা হাসলো। অবশ্য নিকি তাকে এই ব্যাপারে আগেই বলেছিলো, সবাই এবার জায়গা অদলবদল করে বসলো এরপর আসলো জুনায়েদ এর পালা, প্রশ্ন করবে মাহদী। জুনায়েদ তো ভীষণ নার্ভাস ফিল করছে। তার এই বন্ধু আজকে নির্ঘাত তাকে কেস খাইয়ে ছাড়বে। মাহদী হাসি মুখে বলে।
“কিরে জুনায়েদ কি নিবি?”
“ট্রুথ নিলে তুই আমাকে কেস খাইয়ে দিবি আমি জানি। তাই ডেয়ারই নিলাম।”
মাহদী শয়তানি হাসি দিয়ে বললো।
“তোর ডেয়ার হচ্ছে, তুই মনে মনে যেই মেয়েকে ভালোবাসিস তাকে এক্ষুণি প্রোপজ কর।”
কথাটা শুনে জুনায়েদ ভূত দেখার মতো ভয় পেলো। কাদোকাদো স্বরে বললো।
“ডেয়ার নিয়েও শান্তি পেলাম না। প্লিজ দোস্ত ডেয়ার পাল্টে দে।”
“নো পাল্টা পাল্টি, যা বলেছি কর নয়তো লবণ খা।”
“এখানে বসে প্রপোজ করলে নীলাভ আর ওর ভাই আমাকে লাত্থি মে*রে বের করে দেবে।”
কথাটা শুনে নাহিদ, নীলাভ, নিকি আর জিসান চার জনই জুনায়েদের দিকে তাকায়।
নীলাভ গম্ভীর গলায় বলে, “কি বলতে চাইছিস সরাসরি বল।”
“দেখলি বলার আগেই হুমকি দিচ্ছে। আমি ডেয়ার পারলাম না স্যরি লবণই খেয়ে নেবো।”
বলেই জুনায়েদ ১ চামচ লবণ খেয়ে নিলো। জিনিয়া তো তার অবস্থা দেখে ঠোঁট চেপে হাসছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে জারা আবারও বোতল ঘোরালো এবার বোতলের মুখ গিয়ে পড়লো মাহদীর দিকে আর প্রশ্ন করবে জিনিয়া।
জিনিয়া খুশিতে বলে উঠলো, “আজকে আমার গুড লাক ২য় বারের মতো চান্স পেলাম।”
জিনিয়া প্রশ্ন করবে দেখে মাহদী কয়েকটা শুকনো ঢোক গিললো। বেচারা একজনকে ফাসাতে গিয়ে এবার নিজেই ফেসে গেলো।
“তো বলেন ভাইয়া ট্রুথ অর ডেয়ার?”
“আমি বরং আগেই লবণ খেয়ে নিচ্ছি।”
বলেই মাহদী সাথে সাথেই এক চামচ লবণ খেয়ে নিলো যা দেখে সবাই হতভম্ব হয়ে গেলো। নীলাভ তো সন্দিহান চোখে মাহদী আর জুনায়েদের দিকে তাকালো তারপর ওদের দুজনের উদ্দেশ্যে বললো।
“খেলা টা শেষ হলে তোরা দুই বাদড় আমার সাথে দেখা করবি বুঝলি।”
জুনায়েদ আর মাহদী মুখটাকে হাল্কা হাসি হাসি করার চেষ্টা করে মাথা নাড়ালো। আবার বোতল ঘোরানো হলো। এবার বোতলের মুখ গিয়ে পড়লো জিসান এর দিকে আর প্রশ্ন করবে রোজি।
“উফস আমার গুড লাক। ভাবি আমাকে প্রশ্ন করবে,”
রোজি হাল্কা হাসলো তারপর বললো।
“কি নেবে ভাই? ট্রুথ অর ডেয়ার?”
“আমি অনেক সত্যবাদী তাই ট্রুথই নিলাম।”
রোজি কিছু একটা ভেবে বললো।
“তুমি যাকে ভালোবাসো তার নাম কি?”
জিসান চমকে তাকালো, সবাই খালি ভালোবাসা নিয়েই পরল কেনো আজকে? তবে জিসান চালাক আছে সে এক গাল হেসে বলে উঠলো।
“আমার মা, আমি তাকে অনেক ভালোবাসি তার নাম হচ্ছে রেবেকা।”
সবাই চমকে তাকালো।
রোজি বলল, “না না ভাই এটা চিটিং করেছো তুমি।”
“এটাকে চিটিং করা না এটাকে চালাকি করা বলে, বুঝলে ভাবি। তুমি তো আমাকে specific ভাবে বলোনি যে আমার প্রেমিকার নামই বলতে হবে। ভালো তো আমি আমার মাকেও বাসি তাইনা?”
সবাই হেসে উঠলো, জিসান চালাক আছে মাহদী আর জুনায়েদ আফসোস করতে লাগলো। তারাও যদি একটু চালাকি করতো তাহলে আর লবণ খাওয়া লাগতো না।
আবারও বোতল ঘোরানো হলো এবার বোতলের মুখ গিয়ে থামলো নীলাভের দিকে আর প্রশ্ন করবে তরু।
“ট্রুথ অর ডেয়ার?”
নীলাভ ঘাবড়ে গেলো এই মেয়েকে যেটাই বলবে সেটাতেই তার রিস্ক আছে। তরুর মুখে রহস্যময় হাসি। ডেয়ার বলা যাবেনা তাহলে এই মেয়ে তাকে দিয়ে ভয়ানক কিছু করাতে পারে। নীলাভ একটু ভেবে বললো।
“ট্রুথ।”
তরু স্বাভাবিক ভাবেই জিজ্ঞেস করলো।
“আপনি সবচাইতে বেশি কাকে ঘৃনা করেন?”
নীলাভ সহ সবাই অবাক হয়ে তরুর দিকে তাকায়। সবাই যেখানে ভালোবাসার নাম জানতে চায়, ত্রানা সেখানে নীলাভ কাকে বেশি ঘৃণা করে সেটা জানতে চাইছে? নীলাভ একবার তরুর দিকে তাকালো। তরু তার দিকে তাকিয়ে লিপস বাইট করলো। নীলাভ চোখ সরিয়ে নিলো। তরু জানে অন্য কিছু জানতে চাইলে নীলাভ কিছুতেই বলবেনা। লবণ খেতে হলে লবণ খেয়ে নেবে তাছাড়া তরু নীলাভের মুখ থেকে নিজের নাম শুনতে চাইছিলো আর সেই জন্যই সে এই প্রশ্ন টা করেছে কিন্তু নীলাভ তাকে চমকে দিয়ে বললো।
“নিজেকে,”
সবাই নীলাভের উত্তর শুনে অবাক হলো। তরু শক্ত গলায় বলে উঠলো।
“মিথ্যা বলছেন আপনি।”
“এতবড় সত্যি কখনো বলিনি।”
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে জারা আবারও বোতল ঘোরালো। তরুর এবার আর খেলায় মন ছিলোনা।
“তার মানে নীলাভ সব সময় মিথ্যা কথা বলে গেছে? ও তরুকে সবচাইতে বেশি ঘৃনা করেনা? নীলাভ অনেক বড় একটা সত্যি লুকিয়ে রেখেছে। কি সেটা? কি সেই সত্যি, নীলাভ কেনো নিজেকে সবচাইতে বেশি ঘৃনা করে? আমাকে জানতেই হবে।”
এবার বোতল ঘুরতেই বোতলের মুখ গিয়ে থামলো তরুর দিকে আর প্রশ্ন করবে নীলাভ। তরু এবার একটু নড়েচড়ে বসলো। সে কিছুতেই ট্রুথ নেবেনা। নীলাভ ঠাট্টার স্বরে বলে উঠলো,
“তো মিসেস ত্রানা জাহির খান ট্রুথ অর ডেয়ার?”
তরু স্বাভাবিক স্বরেই বললো,
“ডেয়ার,”
নীলাভ হাল্কা হাসলো সে জানতো যে ত্রানা কিছুতেই ট্রুথ নেবেনা। নীলাভ একটু ভেবে বলে উঠলো।
“আপনি যাকে সবচাইতে বেশি ভালোবাসেন তাকে I hate you বলুন।”
তরু ভাবতেও পারেনি নীলাভ এমন কিছু বলবে।
সে কথা না বাড়িয়ে এক চামচ লবণ মুখে ঢুকিয়ে নিলো। আর নীলাভের দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে রইলো, এভাবে সবার সামনে এসব বলাতে সে ভীষণ বিরক্ত হয়েছে।
নীলাভের কথা শুনে বাকি সবাই গোলগোল চোখে চেয়ে আছে। নীলাভ কতো স্বাভাবিক ভাবে তরু যাকে ভালোবাসে তাকে hate you বলতে বলছে। আর তরুও কোনো কিছু না বলেই লবণ খেয়ে নিলো। বিষয় টা কারোরই হজম হচ্ছেনা।
জারা জিজ্ঞেস করল, “আপু তুমি কাউকে ভালোবাসো?”
“আমি এই ব্যাপারে এখন কথা বলতে চাইছিনা জারা।”
জারা চুপ করে রইলো, সে তো জানে তরু কাউকেই ভালোবাসেনা। তাহলে হয়তো নীলাভ না জেনেই তরুকে এই ডেয়ার টা দিয়েছে। বা হয়তো সে জানতে চেয়েছে যে তরু নীলাভকে ভালোবাসে কিনা। আর তরু হয়তো সবার সামনে বলতে চাইছিলো না যে সে নীলাভ কে ভালোবাসেনা সেই জন্যই লবণ খেয়ে নিয়েছে। জারার খারাপ লাগলো তরুর জন্য।
নীলাভ কেনো তাকে এমন কিছু বলতে বললো? বাকি সবাই ও ব্যাপার টা স্বাভাবিক ভাবেই নিলো। তরু আর নীলাভের এরেঞ্জ ম্যারেজ হয়েছে। সেই ক্ষেত্রে তরু নীলাভকে ভালোনা বাসাটাও অস্বাভাবিক কিছুই নয়। আর ভালোবাসলেও হয়তো hate you বলতে চাইছেনা সেই জন্যই লবণ খেয়ে নিয়েছে। মোটকথা উপস্থিত সবাই যে যার মতো ভেবে নিলো। সবাই পুনরায় জায়গা অদলবদল করে নিলো।
আবারও বোতল ঘোরানো হলো এবারও বোতলের মুখ পড়লো নীলাভের দিকে আর প্রশ্ন করবে জারা। নীলাভ এবার প্রচন্ড বিরক্ত হলো।
“আবারও আমিই কেনো?”
নাহিদ বলল, “কিছুই করার নেই তোকে খেলতেই হবে।”
জারা বলল, “ভাইয়া ট্রুথ অর ডেয়ার?”
নীলাভ বিরক্তির স্বরে বলে, “ডেয়ার।”
জারা হাল্কা হাসলো, “ভাইয়া আপনার ডেয়ার হলো আপনি লবণ না খেয়ে আপুকে I Love you বলুন।”
জারার কথাটা শুনে সবাই হেসে উঠলো। নাহিদ জারাকে নিয়ে গর্ববোধ করছে। জারা সহজ সরল হলেও বেশ বুদ্ধিমতী।
“এটা কোনো কথা লবণ খেতে পারবোনা কেনো?”
“এটাই তো আপনার ডেয়ার ভাইয়া।”
সবাই জারাকেই সাপোর্ট করতে লাগলো। উপায়ন্তর না পেয়ে নীলাভ তরুর দিকে তাকালো। তরু তার দিকেই তাকিয়ে আছে। নীলাভ একপলক তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলো তারপর এক নিঃশ্বাসে বলে উঠলো।
“I Love U.”
নীলাভের মুখ থেকে ভালোবাসি শুনে তরুর হার্টবিট বেড়ে গেলো সে বলে উঠলো, “আরেক বার বলবেন?”
নীলাভ তরুর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বললো,
“নো।”
তরু নিজের বুকের ডানপাশে হাত রাখলো। সে নিজের হার্টবিট নিজেই যেনো শুনতে পাচ্ছে।
এভাবেই খেলা শেষ হতে হতে রাত ১ টা বেজে যায়।
নাহিদ বলল, “এবার আমাদের ঘুমাতে যাওয়া উচিৎ।”
জুনায়েদ বলল, “হ্যাঁ কিন্তু আমাদের আজকের ব্রাইট কাপল নীলাভ আর নতুন ভাবির গানের মধ্যে দিয়েই আজকের আয়োজন শেষ হবে।”
মাহদী বলল, “নীলাভ তো বেশ ভালো গান করে। কিন্তু নতুন ভাবি গান জানে?”
নাহিদ বলল, “জানলেও গাইতে হবে আর না জানলেও গাইতে হবে। কি বলো সবাই?”
সবাই হ্যাঁ হ্যাঁ বলে সায় দিলো।
নীলাভ মুখ বাকিয়ে বলল, “আমি গান টান গাইতে পারবোনা গাইস। আমাকে এবার অন্তত ছাড়ো।”
জুনায়েদ বলল, “আজকের দিনটাই তো। না করিস না। প্লিজ।”
সবাই জোরাজুরি করতে লাগলো। নীলাভ না না করলেও তরু গান গাইতে শুরু করলো।
“একদিকে পৃথিবী, একদিকে তুমি যদি থাকো
আমি তোমারই বুকে রবো, আর কোনো খানে যাবো নাকো।
যেখানে তুমি রবে, সেখানে আমি হবো ছায়া,
আমারই জীবন তুমি, করিনা প্রানের কোনো মায়া।
আমি মরণও মেনে নেবো, প্রেমেরই বাজি যদি রাখো।
একদিকে পৃথিবী, একদিকে তুমি যদি থাকো
আমি তোমারই বুকে রবো, আর কোনো খানে যাবো নাকো।”
সবাই হাততালি দিয়ে উঠলো।
জারা বলল, “আপু তুমি এতো ভালো গান করো। আমাদের কখনো বলোনি তো।”
জুনায়েদ বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ ভাবি তো অসাধারণ গান করে। একদম প্রফেশনাল সিংগারের মতো।”
মাহদী নীলাভের উদ্দেশ্যে বলল, “একটা গান গা না।”
নীলাভ একবার সবার দিকে তাকালো তারপর গান গাইতে শুরু করলো।
“তুমি সেই রোদের মতো, আমি তোমায় মাখছি গো
তুমি সেই মেঘের মতো, বৃষ্টির আশায় থাকছি গো
ভাবি যেতে যেতে থেমে, সেই দেখা শেষ দেখা না হোক
তোমার আমার প্রেমে, আমি কি একাই স্মৃতির বাহক?
তুমি সব ভালো আমার, তুমি সব আলো আমার
অন্ধকার তো না। তবে কি বৃথা যাবে প্রেম প্রার্থনা?
ইশ্বর কি তোমার আমার মিলন লিখতে পারতোনা?
তোমার সেই সবুজ পাহাড় একটু কি রঙ হারাচ্ছে তার?
মন খারাপের বিলাপ শোনো। গাছ ফুল পাখি লতাপাতার,
এই ধূসর প্রখর জমিনে, আমি পথ হারা তোমার বিনে
শুনতে কি পাও না আর্তনাদ?
ইশ্বর কি তোমার আমার মিলন লিখতে পারতোনা?”
নীলাভের গান শুনে সব আত্মীয়রা এক জায়গায় জড়ো হলো। নীলাভের মা এসে নীলাভের দিকে তাকিয়ে নির্বিকার ভংগিতে দাঁড়িয়ে রইলেন। নীলাভ আর কোনোদিকে না তাকিয়ে নিজের রুমে চলে গেলো। তরু তো নীলাভের গান শুনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
জিসান বলল, “ভাইয়া এমন একটা গান কেনো গাইলো?”
লিলি বলে, “ভাইয়ার গানটা শুনে আমার কান্না পাচ্ছে।”
নয়না বলল, “ভাইয়ার মনটা হয়তো খারাপ।”
জিনিয়া প্রশ্ন ছুড়লো, “কেনো? ভাইয়ার মন খারাপ হবে কেনো?”
নয়না বলল, “খারাপ হবেনা? ভাইয়া তখন ভাবিকে বলেছিলো সে যাকে ভালোবাসে তাকে hate you বলতে কিন্তু ভাবি কি করলো এটা? সে তো ভাইয়াকে বলে দিতে পারতো তাইনা?”
জারা তরুর পক্ষ নিয়ে বলল, “আপু মিথ্যা বলবে কেনো? আপু তো কাউকেই ভালোবাসে না। আর hate you শুনে কি ভাইয়ার মন ভালো হয়ে যেতো?”
লরা বলল, “ভাবি তুমি বুঝতে পারছোনা, নতুন ভাবি ভাইয়াকে ভালোবাসে নাকি সেটা পরীক্ষা করার জন্যই ভাইয়া ওইরকম একটা ডেয়ার দিয়েছিলো।”
কেউ আর কিছু বলতে যাবে তার আগেই সাবিনা সবার উদ্দেশ্যে বললেন,
“সবাই ঘুমাতে যাও অল্রেডি ১ টা বেজে গেছে। আর ত্রানা তুমি একটু আমার রুমে এসো তো।”
সবাই যার যার রুমে চলে গেলো। তরুও সাবিনাের রুমে গেলো। গিয়ে দেখলো নাজমুল ঘুমিয়ে আছেন আর সাবিনা বসে আছে তরু চেয়ার টেনে সাবিনাের সামনেই বসলো।
“আন্টি কিছু বলবেন।”
সাবিনা তরুর মাথায় হাত রেখে বললেন,
“মা বলতে বলেছিলাম তো, ভুলে গেলে?”
“ওহ হ্যাঁ স্যরি মা।”
“এইতো এভাবেই বলবে কেমন?”
তরু মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললো।
“ত্রানা জানোতো, আমার ছেলেটা একটু না অনেক বেশিই চাপা স্বভাবের। নিজের মনের কথা সে কাউকে বলা তো দূর চাল চলনেও বুঝতে দিতে চায় না। ও কাউকে বলতেই পারেনা যে ও কি চায়। কেমন অনুভব করে, আমি জানি তোমার ওকে বুঝতে সময় লাগবে। কিন্তু প্লিজ তুমি ওকে সেই সময়টুকু দিও। ওকে কখনো ভুল বুঝোনা। আর আমি যে তোমাকে এগুলো বলেছি তুমি কাউকে বলোনা এমনকি নীলাভকে ও না। কেমন?”
তরু মন দিয়ে সব কথা শুনলো আর মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললো।
“আচ্ছা এখন গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।”
তরু উঠে নীলাভের রুমে চলে এলো, এসে দেখলো নীলাভ রুমে নেই হয়তো ওয়াশরুমে আছে। তরু সাবিনার বলা কথাগুলো শুনে বুঝতে পেরেছে যে সাবিনা নীলাভ সম্পর্কে এমন কিছু জানেন। যা সেও জানেনা। কিন্তু তার যে করেই হোক সেটা জানতেই হবে। মেহমানরা আরও ৩-৪ দিন থাকবে শুধুমাত্র ততদিন তরু নীলাভের রুমে থাকার অনুমতি পেয়েছে, কারণ মেহমান চলে গেলে নীলাভ কখনোই তরুর সাথে এক রুমে থাকতে রাজি হবেনা। এখন তো শুধু লোক দেখানোর জন্য তাকে সহ্য করছে। নীলাভ ওয়াশরুম থেকে বের হতেই তরু ওয়াশরুমে ঢোকে আর পরণের শাড়ি চেইঞ্জ করে টপস আর প্লাজো পড়ে নেয়।
তরু বের হয়ে দেখে নীলাভ শুয়ে পরেছে।
“শুনছেন? ঘুমিয়ে গেছেন?”
নীলাভ চোখ মেলে তরুর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়।
“আপনার সাথে আমার কিছু কথা ছিলো।”
নীলাভ উঠে বসে। তরু তার সামনে বসে বলে।
“আপনি নিজেকে ঘৃনা করেন কেনো?”
“ট্রুথ ডেয়ার গেম শেষ হয়ে গেছে। তাই এখন আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই। ঘুমাতে দিন,”
“আচ্ছা সে নাহয় বাদ দিলাম, কিন্তু আপনি সবার সামনে আমাকে ওটা বললেন কেনো?”
“কোনটা?”
“আমার ভালোবাসার মানুষকে hate you বলতে? আপনি কি জানতে চাইছেন যে আমি কাকে ভালোবাসি?”
“No, I'm not interested.”
তরু মুখ বাকিয়ে বললো।
“সেটাই তো, আমি তো জানিই যে আপনি আমার ব্যাপারে জানতে আগ্রহী নন। কিন্তু সবাই তো উল্টো পাল্টা কতো কিছুই না ভেবে নিলো।”
“কে কি ভেবেছে?”
“আপনি নাকি আমাকে পরীক্ষা করার জন্য ওই ডেয়ার টা দিয়েছিলেন যে আমি আপনাকে ভালোবাসি কিনা।”
নীলাভ কিছুই বললোনা,
“আপনি তো সেই ব্যাপারে জানতে আগ্রহী নন। তাহলে এমন ডেয়ার দিলেনই বা কেনো?”
“আমি এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নই।”
“আপনি তো আমাকে I love you বলেই দিয়েছেন, তাহলে কি ধরেই নেবো যে আপনি চ্যালেঞ্জে হেরে গেছেন?”
“একবার love you শুনেই যদি মনে হয় জিতে গেছেন, তাহলে চলে যান আমার জীবন থেকে। যাকে ভালবাসেন তাকে গিয়ে বিরক্ত করুন। আর শুনুন এরকম love you আমি আয়ুকে রোজ কমপক্ষে ১০ বার বলতাম।”
কথাটা শুনে তরুর চেহারার রঙ পাল্টে যেতে লাগলো। শুধুমাত্র নীলাভ বলে সবকিছুতেই পার পেয়ে যায়।
“ঘুম আসছে ঘুমাবো। যান এখন,”
নীলাভ শুয়ে পড়লো, তরুও আর কিছু না বলে লাইট অফ করে সোফায় শুয়ে রইলো। তবে ৩০ মিনিট যেতেই সে গতকালকের মতো স্প্রে টা নিয়ে গিয়ে নীলাভের মুখে স্প্রে করে দিলো। তারপর নীলাভকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লো।
“তোমার বুকে মাথা রাখলেই আমি শান্তি পাই, আমার naturally ঘুম আসে। আমার অভ্যাসে পরিনত হচ্ছো তুমি। তবে তোমার এতো কাছে এসেও কেনো তোমাকে বুঝতে পারছিনা আমি? কেনো? তুমি এতো জটিল কিভাবে হয়ে গেলে লাভ? আমি তোমাকে কেনো পড়তে পারছিনা। কেনো এভাবে নিজেকে শক্ত খোলসের মধ্যে আটকে রেখেছো? আমি জানি তুমি নিজে থেকে এর উত্তর দেবেনা। আমার প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর আমাকেই খুঁজে বের করতে হবে।”
কেটে যায় ৫ দিন, এরই মাঝে সব আত্মীয় স্বজনরা যার যার বাড়িতে চলে গেছে। আজকে মাহদী আর জুনায়েদ ও চট্টগ্রামে তাদের বাড়িতে ফিরে যাবে। চাকরি সূত্রে তারা দুজন পরিবারসহ সেখানেই থাকে। নীলাভ আর তারা এক ভার্সিটিতেই পড়াশোনা করেছে। সেখান থেকেই তাদের বন্ধুত্ব হয়েছিলো। নীলাভ এই কয়েকদিনে জানতে পেরেছে যে জুনায়েদ তার ফুপাতো বোন জিনিয়াকে ভালোবাসে আর মাহদী তার চাচাতো বোন নয়নাকে ভালোবাসে। সে অবশ্য এই ব্যাপারে জানার পর কিছুই বলেনি। তার বন্ধু দুটো বেশ ভালো। সেই হিসাবে ওদের বিয়ে হলে ওর বোনেরা ভালোই থাকবে। তবে নীলাভ বলে দিয়েছে যে তাদের বিষয় টা তাদেরই দেখতে হবে।
এই বিষয়ে সে কোনো সাহায্য করবেনা। তারা যদি জিনিয়া আর নয়নার অভিভাবকদের রাজি করাতে পারে তাহলে তার কোনো আপত্তি নেই। নীলাভ মাহদী আর জুনায়েদকে বাসস্ট্যান্ড অবধি ছেড়ে দিতে তাদের সাথেই যায়।
এদিকে তরু নীলাভের রুমের সব জিনিসপত্র চেক করছে। আজকের পর থেকে তাকে আগের রুমে গিয়ে থাকতে হবে। এতোদিন নীলাভের জন্য সে কিছুই চেক করতে পারেনি তবে আজকেই তার মোক্ষম সুযোগ। তরু পুরো রুম চেক করলো সেই সাথে নীলাভের রুমের সাথে থাকা স্টাডি রুমেও চেক করতে গেলো কিন্তু কোথাও কিছুই পেলোনা।
অবশ্য নীলাভের রুমের সাথে আরও একটা রুম আছে যেটা সবসময়ই লক করা থাকে, তরু এই বাড়িতে আসার পর থেকে অনেকবার রুমটার দিকে তাকিয়েছে কিন্তু কখনো খোলা দেখেনি। তরু কিছুই খুঁজে না পেয়ে আলমারিতে হাত দিলো একটা ড্রয়ার খুলতেই সে অনেক গুলো টাকার বান্ডেল দেখতে পেলো। সে একটা শ্বাস ফেলে অপর ড্রয়ারটা খুলতে গেলো কিন্তু সেই ড্রয়ার টা লক করা।
“এটা কেমন কথা? টাকা যেই ড্রয়ারে আছে সেই ড্রয়ার টা লক করা নেই কিন্তু অন্য ড্রয়ার টা লক করা কেনো?”
তরু কিছু একটা ভাবলো,
“নিশ্চয়ই এই ড্রয়ার টার ভেতরেই কিছু না কিছু আছে। তবে এটা খুলবো কিভাবে?”
তরু চাবি খুজতে লাগলো। কিন্তু এভাবে কি কিছু পাওয়া যায়? যায়না। তরু কি করবে বুঝতে পারছেনা। তরুর মনে পড়লো যে সে নীলাভের হাতে একটা চাবির গোছা দেখেছিলো।
“ওটা কি ও সবসময় নিজের সাথে সাথেই রাখে নাকি?”
তরু একটা শ্বাস ফেলে অন্যদিকে তাকাতেই দেখলো নীলাভ যাওয়ার সময় আগের পড়া পোশাক চেইঞ্জ করে গিয়েছিলো। তরুর ভালো লাগছিলো না, ইদানীং নীলাভকে ছাড়া সে এক মূহুর্তও থাকতে পারছেনা। নীলাভ বাইরে গিয়েছে ১ ঘন্টাও হয়নি। এরই মাঝে সে তাকে মিস করছে।
“কি যে করেছো আমাকে। কিছুই বুঝিনা, কেনো তোমার জন্য পাগল পাগল লাগে নিজেকে?”
নীলাভ আর তরু বিয়ে উপলক্ষে ১৫ দিনের ছুটি পেয়েছে। সেই হিসাবে তারা এতোদিন বেশির ভাগ সময় টাই একসাথে থেকেছে। তরু অনেক কিছু করে নীলাভের attention পেতে চেয়েছে। কিন্তু কেনো জানিনা কিছুতেই কিছু হচ্ছেনা। নীলাভ তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছেনা। তরু বেশি কিছু না ভেবেই নীলাভের খুলে রেখে যাওয়া শার্ট টা জড়িয়ে ধরলো। তখনই সে শার্টের পকেটে কিছু একটার শব্দ শুনতে পেলো। তরু সেটা বের করে দেখলো এটাই সেই চাবির গোছা। যেটা সে একবার নীলাভের হাতে দেখেছিলো। তরু সময় নষ্ট না করে চাবিটা দিয়ে প্রথমে লক করে রাখা ড্রয়ার টা খুললো।
খুলে দেখলো সেখানে অনেক কাগজ পত্র। তরু সেসব সরিয়ে দেখতে পেলো তার আগের ফোনটা আর সে নীলাভকে যেই রুমাল টা দিয়ে ছিলো সেটাও এখানে রাখা। তরু একটা ঢোক গিলে নিজের ফোনটা অন করতেই নীলাভের ছবিটা ভেসে ওঠে।
“এটাই তো সেই ফোন, ধ্যাৎ আমি নীলাভ বলতে একটু বেশিই অজ্ঞান। কিন্তু ও এটা এভাবে ড্রয়ারে লক করে রেখে দিয়েছে কেনো? আর আমার রুমাল টাই বা এখানে কি করছে?”
চলবে,