ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমি তরুলতা

৪২তম পর্ব

লেখক: সোফিয়া সাফা

#আমি_তরুলতা (৪২)

#সোফিয়া_সাফা

রাত ১১ টা তরু আর নীলাভ গাড়ি দিয়ে অনেক জায়গায় ঘুরে বেরিয়েছে।

“এবার বাড়ি চলো।”

নীলাভ তরুর কথামতো বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। বাড়িতে ঢোকা মাত্রই নীলাভ অবাক হলো। পুরো বাড়ি অন্ধকার, তরু গিয়ে সুইচ অন করতেই নীলাভের উপর গোলাপের পাপড়ির বর্ষণ হলো, নীলাভ থমকে গেলো। আশেপাশে থাকা সবাই একসাথে বলে উঠলো,

'Happy birthday to you, Happy birthday to you. Happy birthday... Happy birthday... Happy to you'

নীলাভ বেকুব বনে গেলো, “হোয়াট? কার জন্মদিন আজকে?”

নাহিদ বলল, “কার আবার তোর, ভুলে গেলি?”

নীলাভের মনে পড়লো যে আজকে তার জন্মদিন, কাজের প্রেশারে সে ভুলেই গিয়েছিলো। নীলাভ সবার দিকে তাকিয়ে তারপর তরুর দিকে তাকালো।

“তুই এসব করেছিস তাইনা?”

“হুম।”

“আরে এখন কি আমার জন্মদিন পালন করার বয়স আছে?”

তরু বুকে হাত বেধে বলল, “জন্মদিন পালন করার বয়স আমৃত্যু থাকে, শুধু জন্মদিন মনে রাখার একজন মানুষ প্রয়োজন।”

তরু ইশারা করতেই দুজন ছেলে গিয়ে নীলাভের জন্য কেক নিয়ে আসে। ঠিক ১২ টা বাজার পর নীলাভ সব ক্যান্ডেল নেভালো।

“এবার উইশ করো।”

নীলাভ একটা উইশ করলো তারপর কেক কাটলো। নীলাভ সর্বপ্রথম তার বাবা-মাকে কেক খাওয়ালো তারপর তরুকে খাওয়াতে গেলে তরু আগে নীলাভকে খাইয়ে দিলো, তারপর নিজে খেলো। সবার খাওয়া দাওয়া শেষ হলে তাজিম এগিয়ে এসে নীলাভকে গিফট দিলো, তারপর বাকি সবাই ও দিলো।

নীলাভ বলল, “এসবের কি প্রয়োজন ছিলো? আমি কোনো বাচ্চা নাকি এবার তো ৩০ বছরও হয়ে গেলো।”

তাজিম বলল, “জন্মদিনের নিমন্ত্রনে এসেছি আর বার্থডে বয়কে গিফট দেবোনা তাকি হয়?”

নীলাভ হাসলো। সবার শেষে তরু নীলাভের হাতে একটা গিফট তুলে দিলো।

“তুইও?”

“অবশ্যই, আমার হাজব্যান্ডকে আমি গিফট দেবোনা? ওয়েট আরও একটা গিফট আছে।”

বলেই তরু ড্রইংরুমে গিয়ে সেখান থেকে একটা ফুলের তোরা তুলে নিলো তারপর সেটা নিয়ে গিয়ে নীলাভের দিকে এগিয়ে দিলো। নীলাভ তো ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে চমকে গেলো। কারণ সেগুলো তার পছন্দের ডেইজি ফুল, তাও আবার বিভিন্ন রঙের। ফুলগুলোর দিকে তাকাতেই তার কিছু একটা মনে পড়লো কিন্তু সে সবার সামনে কিছুই বললোনা। হাত বাড়িয়ে ফুলগুলো নিলো।

“থ্যাঙ্কিউ।”

তরু কিছু না বলে তাজিমের কাছে চলে গেলো। তরু যেতেই নাহিদ এগিয়ে এসে বলল, “তুই মনে হয় আমাদের গিফটের চাইতে ফ্লাওয়ার গিফট টা পেয়ে বেশিই খুশি হয়েছিস তাইনা?”

নীলাভ হাল্কা হাসলো, “মন কিছু না ভাইয়া। আসলে জানোই তো এই ফুলগুলো আমার ফেবারিট।”

“ফুলগুলো ফেবারিট, আর যে ফুলগুলো দিলো সে?”

নাহিদের দিকে তাকাতেই নীলাভের হাসি থেমে গেলো নাহিদ অদ্ভুত ভাবে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। তরু ড্রইংরুমে বসে তাজিমের সাথে কথা বলছে। নীলাভ একবার সেইদিকে তাকালো। নাহিদ গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো,

“নীলাভ আমি তোকে সতর্ক করছি। তরুর প্রতি দূর্বল হয়ে পড়িস না। ভুলে যাসনা তরু আমাদের বোনের খু'নি। তুই ওকে মা'রতে না পারলে আমিই তোর হয়ে কাজটা করে দেবো। তবুও শাস্তি দিয়েই ছাড়বো। আর আমি আশা রাখবো তুই অন্তত আমার কাজে বাধা হয়ে আসবিনা।”

নাহিদের কথাগুলো শুনে নীলাভ স্তব্ধ হয়ে গেলো। সে অসহায় চোখে নাহিদের দিকে তাকায়, “মনে রাখিস তুই যদি কোনোভাবে তরুকে বাচানোর চেষ্টা করিস তাহলে তোকে আমার সাথে মোকাবিলা করতে হবে।”

কথাটা বলেই নাহিদ চলে গেলো। নীলাভের দম আটকে আসছে, এমনিতে সে নিজের সাথে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত এরপর যদি নাহিদের সাথেও লড়তে হয়…

তরুর সিড়ি বেয়ে চলাফেরা করতে কষ্ট হয় যার জন্য নীলাভ আর তরু ১ মাস ধরে নিচের গেস্টরুমেই থাকছে। জারা, তাজিম আর মাইশাকে উপরের তলায় তাদের পাশের রুমে থাকতে বললো। তারপর নিজের রুমে চলে গেলো।

এখন রাত ১ টা,

নীলাভ ফ্রেশ হয়ে এসে খাটের উপর বসলো। তরু শুয়ে শুয়ে ফোন চাপছে। নীলাভ তরুর সামনে বসলো তারপর টেবিলের উপরে রাখা ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে তরুর উদ্দেশ্যে বললো, “তুই-ই গত ৬ বছর যাবত আমার জন্মদিনে আমার ঠিকানায় ডেইজি ফুল পাঠাতি?”

নীলাভের কথা শুনে তরু ফোন টা সাইডে রেখে নীলাভের দিকে তাকালো।

“হুম, আমিই পাঠাতাম।”

“তরুহ প্লিজ আমার জন্য পাগলামি করা বন্ধ কর। আমাকে এতো ভালোবাসতে হবেনা।”

“সম্ভব নয়।”

নীলাভ ভ্রু কুচকে তরুর দিকে তাকালো। তরু উঠে বসে বললো।

“গিফট গুলো খুলে দেখবেনা?”

নীলাভ একটা শ্বাস ফেলে গিফট গুলো নিয়ে এসে বসলো। প্রথমে নাহিদের দেওয়া গিফট টা খুললো যেখানে ব্র্যান্ডের ঘড়ি ছিলো।

“বাহ বেশ ভালো গিফট দিয়েছে তোমাকে।”

নীলাভ মুচকি হেসে তাজিমের দেওয়া গিফট বক্সটা খুললো। যেখানে একটা পারফিউম ছিলো। নীলাভ সেটা দেখে অবাক হলো। এটা যেই সেই পারফিউম নয়। একদম লিমিটেড এডিশনের পারফিউম যেটা নীলাভ সবসময় ইউজ করে। নীলাভ সন্দিহান চোখে তরুর দিকে তাকায়।

“তুই ওনাকে এটার ব্যাপারে বলেছিস?”

“হ্যাঁ বলেছি। কারণ অন্য কোনো পারফিউম দিলে তুমি ইউজ করতেনা। আর ভাইয়াও গিফট দেবেই দেবে। তো আমি কি করতাম?”

নীলাভ একটা শ্বাস ছেড়ে তরুর দেওয়া গিফট টা হাতে নিলো। তরু একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। নীলাভ গিফট বক্সটা খুলে দেখলো, সেটা একটা রিং। নীলাভ কিছুক্ষণ সেটার দিকেই তাকিয়ে রইলো, তার হাতে একটা আংটি ছিলো যেটা কিছুদিন আগেই হারিয়ে গেছে। মূলত আংটিটা তার ফেবারিট আংটি ছিলো। যেটা অনেক আগে থেকেই সেটা ব্যবহার করতো।

“এই রিংটা সামলে রেখো। আগের টার মতো হারিয়ে ফেলোনা।”

তরুর কথা শুনে নীলাভ তরুর দিকে তাকায়। তরু কথা ঘুরিয়ে বলে।

“আমি চাই এটা তুমি সবসময় নিজের কাছে রাখো।”

“তোর মনে হয় যে তোর দেওয়া কোনো জিনিস আমি রাখবো?”

তরু হাল্কা হাসলো তারপর নীলাভের দিকে ঝুকে গিয়ে তার ঠোঁটে আঙ্গুল বুলিয়ে বলল,

“বাচ্চাদুটোকে রাখতে পারলে এই রিংটা কেনো রাখতে পারবেনা?”

নীলাভ তরুর হাত সরিয়ে দিয়ে বলল, “ওরা আমার বাচ্চা।”

“আর আমিও তো তোমার ওয়াইফ।”

নীলাভ কথা বাড়ালো না তরুর সাথে কথায় সে পেরে উঠবেনা।

“দেখি হাতটা দেও।”

নীলাভ বিনাবাক্যে তরুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো। তরুও তার হাতে আংটিটা পড়িয়ে দিলো।

“হয়েছে? এবার খুশি?”

“হু, শোনো। এই কয়েকটা দিন আমাকে খুশি রাখবা তাহলে খরগোশের বাচ্চা দুটোও খুশি থাকবে বুঝলে?”

“হ্যাঁ তাতো অবশ্যই।”

তরু সবকিছু সরিয়ে রেখে নীলাভের কোলে গিয়ে বসলো তারপর নীলাভের হাতদুটো নিজের উচু পেটের উপর রাখলো। নীলাভ কিছু একটা অনুভব করে আনমনেই হেসে উঠলো।

“ওরা কি খুশিতে লাফাচ্ছে নাকি?”

“নাহ ওদের অনেক ক্ষুধা লেগেছে তাই লাফাচ্ছে।”

নীলাভ ভ্রু কুচকে তরুর দিকে তাকালো।

“তোর ক্ষুধা লেগেছে?”

তরু মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললো।

“আগে বলিসনি কেনো?”

“বার্থডে বয়কে জ্বালাতন করতে হয়না সেই জন্যই বলিনি।”

তরুর কথা শুনে নীলাভ হাসতে লাগলো। সে শুনেছে প্রেগন্যান্ট অবস্থায় মাঝেমধ্যেই মেয়েদের মুড সুইং হয়। এটা তরুর ক্ষেত্রে একটু বেশিই প্রভাব ফেলছে। তরুর প্রতিসেকেন্ডে মুড চেইঞ্জ হয়ে যায়। অবশ্য তরুর ক্ষেত্রে এরকম হওয়াটাও অস্বাভাবিক কিছুই নয়। যেখানে তরু নিজেই অস্বাভাবিক সেখানে তার বিহেভিয়ার কিভাবে স্বাভাবিক হবে?

কিছুক্ষণ পর নীলাভ কিচেনে গিয়ে তরুর জন্য সেমাই রান্না করতে লাগলো। মূলত সে সেমাই আর নুডলস ছাড়া তেমন কিছুই রান্না করতে পারেনা। তরু কিচেনে নীলাভের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। তরু রান্না করতে চাইলেও নীলাভ তরুকে রান্না করতে দেয়নি।

“তুই রুমে গিয়ে বোস আমি রান্না করে আনছি।”

তরু গাল ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।

“আমি রান্না করে খেতে পারতাম।”

“তুই যে রাধুনি সেটা আমি জানি। তবে আমি চাইনা তুই এই অবস্থায় রান্না ঘরে আসিস। তাই আমি যা বানাতে পারি তাই খেতে হবে।”

তরু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। জহুরা পানি নিতে নিচে এসে দেখে নীলাভ রান্না করছে আর তরু দাঁড়িয়ে আছে। সে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে বলেন,

“কি রান্না করছো বাবা?”

নীলাভ জহুরাকে দেখে বিরক্ত হলো। সে জানে ছোটো বেলা থেকেই তরুকে জহুরা দেখতে পারেনা। তবুও ভদ্রতার খাতিরে বলল,

“ক্ষুধা লেগেছে তাই সেমাই রান্না করছি।”

জহুরা তরুর দিকে তাকিয়ে দেখে তরু বানিকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

“এতো বড় হয়েছে এখনো পুতুল নিয়ে খেলছেন মহারানী।”

জহুরা কথাটা তরুকে শুনিয়ে বলতে চাইলেও নীলাভ থাকাতে বলতে পারলেননা। সে জানে তরুকে কিছু বললে নীলাভ তাকে ধুয়ে দেবে। জহুরা নীলাভের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন,

“আহারে তুমি কষ্ট করে রান্না করছো কেনো বাবা? সারাদিন অফিসে খাটাখাটুনি করে এসে রান্না করে খেতে হচ্ছে? তরুকে বললেই তো পারতে, ও রান্না করে দিতো।”

“আপনি তো জানেনই ওর শরীর ভালো নেই, তাই আমিই করছি। আপনি প্লিজ নিজের কাজ করুন।”

জহুরা খানিকটা অপমানবোধ করলো। তবে নীলাভের ব্যবহার যে এমন সে সেটা আগে থেকেই জানেন। তরু আর নীলাভের বিহেভিয়ারে মিল আছে, যদিও তরু এখন আর রুড বিহেভ করেনা কেমন যেনো স্ট্যাচু হয়ে থাকে সবসময়। যেমনটা এখনো স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তরু এই বাড়িতে শুধু জারা আর নীলাভের সাথেই কথা বলে। বলে রাখা ভালো বাকিরাও কেউ আগ বাড়িয়ে তরুর সাথে কথা বলেনা।

জহুরা আর কথা না বাড়িয়ে জগে পানি ভরে নিজের রুমে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর নীলাভের রান্না শেষ হলে সে তরুকে খেতে দিলো। তরু খাচ্ছে তো খাচ্ছেই।

“কেমন হয়েছে?”

“একদম পার্ফেক্ট, কি বলো তো তোমার হাতের রান্না খাওয়ার সৌভাগ্য আমার এই এক জীবনে হবে বলে ভাবিই নি কখনো।”

“সত্যিই ভালো হয়েছে?”

“হুম বেস্ট হয়েছে।”

বলতে বলতেই তরু নীলাভকে কিছুটা খাইয়ে দিলো। নীলাভ খেয়ে বুঝতে পারলো চিনি কিছুটা কম হয়েছে তবে বাকি সবকিছু ঠিক আছে।

“মিষ্টি কম হয়েছে।”

তরু কিছুই বললোনা। খাওয়া দাওয়া শেষে তরু আর নীলাভ রুমে চলে এলো।

এখন রাত ২ টা, নীলাভ বা তরু কেউই ঘুমায়নি।

“কালকে ডাক্তারের কাছে যাবো।”

“গত মাসেই তো গেলাম।”

“হুম, তবে কালকে আবারও যাবো।”

তরু কিছু একটা ভাবলো। তারপর আনমনেই প্রশ্ন ছুড়লো,

“তুমি ছেলে চাও? নাকি মেয়ে চাও?”

নীলাভ তরুর কথা শুনে চমকে তাকালো।

“এই প্রশ্নের মানে কি? এমন বোকা বোকা প্রশ্ন করছিস কেনো?”

“আহ, বলোনা।”

নীলাভ কিছু না বলে নিজে উঠে বসলো তারপর তরুকেও উঠিয়ে বসালো।

“শোন তরু ছেলে বা মেয়ে ফ্যাক্ট নয়। আমি শুধু চাই আমাদের বেবিস সুস্থ ভাবে জন্ম নিক। সামনের কয়েকদিন আমি অফিসের কাজে অনেক ব্যস্ত থাকবো তখন যাওয়ার সময় পাবোনা। এখন তোর ৮ মাসের কাছাকাছি চলছে, তাই এখন একবার ডাক্তার দেখিয়ে আসা উচিৎ।”

“তুমি ওদেরকে অনেক ভালোবাসো তাইনা?”

নীলাভ একটা শ্বাস ছেড়ে বলল, “ঘুমিয়ে পড়, অনেক রাত হয়ে গেছে।”

নীলাভ শুয়ে পড়লো তরুও নীলাভের হাতের উপর মাথা রেখে শুয়ে পড়লো।

“আচ্ছা ওরা কষ্ট পেলে তুমিও অনেক বেশিই কষ্ট পাবে তাইনা?”

নীলাভ তরুর কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছেনা। তবে তরুর কথার ধরনে বুঝতে পারলো তরু অনেক সিরিয়াস।

“কে ওদেরকে কষ্ট দেবে?”

তরু চুপচাপ শুয়ে রইলো। তারপর কিছু সময় পর হঠাৎ করেই বলে উঠলো।

“বাচ্চারা অনেক বেশিই অসহায় হয়। তাদেরকে যে কেউ যেমন খুশি তেমন ভাবেই কষ্ট দিতে পারে।”

নীলাভ হয়তো তরুর কথার মানে বুঝতে পারলো, সে তরুর মুখ উঁচু করে চোখে চোখ রেখে বলল,

“বাচ্চাদেরকে বাবা- মায়ের জন্য কষ্ট পেতে হয়। তুই কষ্ট পেয়েছিলি তোর মা ছিলোনা বলে। তোর বাবা ২য় বিয়ে করে সেই কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু আমার বাচ্চাদের সাথে তেমন কিছুই হতে দেবোনা।”

“ওদের কোনো মা থাকবেনা। ওদেরকেও কষ্ট পেতেই হবে।”

“সেটা তোর ব্যার্থতা।”

“সেইজন্যই ওদেরকে কষ্ট পেতে হবে।”

“ওদের জন্য দরকার হলে ১০০ জন সার্ভেন্ট রেখে দেবো, আর আমি তো আছিই। মায়ের অভাব পূরণ না হলেও ওদের কোনো কষ্ট হবেনা। কেউ ওদেরকে কষ্ট দিতে পারবেনা। যাদের বাবা- মা না থাকে তারাই অসহায় হয়। দেখনা চ্যাম্প ও তো বাচ্চা, ও কি অসহায়? ও অনেক স্ট্রং, কারণ ওর বাবা- মা আছে, ফ্যামিলি আছে।”

কথাটা শুনে তরু হাল্কা হাসলো, “তাহলে ঠিক আছে। ওদের আমাকে প্রয়োজন হবেনা।”

নীলাভ গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো, “তুই চাস যে ওদের যেন তোকে প্রয়োজন না হয়?”

“হুম। প্লিজ তুমি গ্যারান্টি দেও যে ওদের আমাকে কখনো প্রয়োজন হবেনা। আর তুমি যদি গ্যারান্টি না দিতে পারো তাহলে…..

নীলাভ চমকে তাকালো, “তাহলে?”

“তাহলে আমি ওদেরকে নিজের সাথে নিয়ে যাবো।”

তরুর কথা শুনে নীলাভ বিরাট বড় শক খেলো।

“কোথায় নিয়ে যাবি ওদেরকে?”

“যেখানে আমি যাবো।”

নীলাভ তরুর কথা কিছুতেই মানতে পারছেনা।

“তুই তো ওদেরকে সহ্যই করতে পারিস না। তাহলে কেনো নিয়ে যাওয়ার কথা বলছিস?”

তরু শোয়া থেকে উঠে বসলো, “সহ্য করতে না পারলেই সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়না এটা তুমিই আমাকে শিখিয়েছো। আমি তেমন নই যে দায়িত্ব অবহেলা করবো। জন্ম যখন দেবো তখন ওদের উপর আমারও দায়িত্ব আছে। ওরা ফেলনা নয়, তুমি ওদেরকে বেস্টটা দিতে না পারলে ওদেরকে আমি বেস্টটা দেবো। আর তুমি ভালো করেই জানো তরু যা বলে তাই করে। তাই ওদেরকে সবসময় বেস্টটা দিও। ওরা যেনো কোনোদিনও আমার প্রয়োজন বোধ না করে।”

কথাটা শুনে নীলাভের গলা শুকিয়ে আসছে সে কোনো ভাবেই তরু আর বাচ্চাদেরকে একসাথে হারিয়ে সারভাইভ করতে পারবেনা। নীলাভ ও উঠে বসে নিজেকে সামলে নিম্নস্বরে বলল, “তোকে তো আমিই মে'রে ফেলবো। তুই ওদেরকে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবিনা।”

তরু হাসতে লাগলো। যেই হাসি অনেক বেশিই ভয়ানক ছিলো। তরুর সেই হাসির শব্দ নীলাভের হার্টবিট ক্রমশই লাগামহীন করে দিচ্ছে। “প্লিজ চুপ কর। এভাবে হাসবিনা কখনো।”

তরু থামলোনা হাসির মাঝেই বলল, “এরকম জোক্স শুনেও হাসবোনা বলছো? তুমি এখনো বলছো যে তুমি আমাকে মে'রে ফেলবে?”

“দেখ তরু আমার কথা থেকে আমি সরে যাইনি এখনো।”

তরু আরও বেশি হাসতে লাগলো, “প্লিজ আর জোক্স বলোনা আমি আর হাসতে পারছিনা।”

নীলাভ আর কিছু বললোনা শুধু তরুর দিকে স্থীর চাহনি নিক্ষেপ করলো।

সকাল ১০ টার দিকে নীলাভ তরুকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে এলো। ডাক্তার তরুর আল্ট্রাসাউন্ডসহ আরও কয়েকটি টেস্ট করলো। তরু সব সময়ের মতোই নিশ্চুপ ডাক্তার লুসি এবার আর তরুর ব্যাবহারে অবাক হলেননা। সে বুঝতে পেরেছে তরুর বিহেভিয়ারই এরকম।

নীলাভ বরাবরের মতোই আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“বাচ্চারা কেমন আছে?”

“বাচ্চারা তো ভালোই আছে তবে মিসেস খান বেশি একটা ভালো নেই। তার নরমাল ডেলিভারি হওয়ার চান্স একদমই নেই বললেই চলে সিজারই করতে হবে।”

লুসির কথায় নীলাভ অনেক ঘাবড়ে গেলো, এমনি সে এই ব্যাপার টা নিয়ে টেনশনে আছে তার উপর এরকম কথা শুনে তার ভয়টা আরও বেড়ে গেলো। তরুর মধ্যে খুব একটা ভাবান্তর দেখা গেলোনা। নীলাভও আর কিছুই বলতে পারলোনা। ডাক্তার লুসি ফের বললেন,

“যাই হোক বাচ্চাদুটো অনেক একটিভ,”

নীলাভ স্বাভাবিক ভাবেই খুশি হয়েছে কিন্তু তরুর জন্য তার অনেক বেশিই চিন্তা হচ্ছে। সে জানেনা কেনো এরকম টা হচ্ছে। সে তরুকে নিয়ে ভাবতে না চাইলেও তার মনে অটোমেটিক তরুর জন্য কনসার্ন সৃষ্টি হয়ে যায়। তরুর চেহারায় বরাবরের মতোই ব্ল্যাংক রিয়েকশন। ডক্টর লুসি তরুর ডেলিভারির সম্ভাব্য ডেট বললেন তারপর নীলাভ তরুকে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। মাঝপথে তরু হঠাৎ বলে ওঠে,

“তুমি আমাকে নিয়ে চিন্তা করছো কেনো?”

নীলাভ কথা না ঘুরিয়ে বলল, “আমি চাইনা বাচ্চাদের জন্ম দিতে গিয়ে তোর কিছু হয়ে যাক।”

তরু ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলল, “এখন আর এতো ভাবাভাবি করে কি হবে? আগে ভাবা উচিৎ ছিলো।”

নীলাভ তরুর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়।

তরু আবারও বলে ওঠে, “আগে যদি ভাবতে তাহলে এবো*রশন করে নিতে দিতে।”

তরুর এই কথাটা শুনে নীলাভ হাসবে না কাদবে বুঝতে পারছেনা।

“সাইকো একটা। এসব যদি তোর আর আমার মা- বাবা ভাবতো তাহলে আমাদের কোনো অস্তিত্বও থাকতোনা।”

তরু কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল, “হুম অন্তত আমার জন্মদাত্রীর ভাবা উচিৎ ছিলো। সে আমাকে জন্ম দিতে গিয়েই মারা গিয়েছিলো। সে নাকি মারা যাওয়ার আগে বারবার আমাকে বাচাতে বলেছিলো। কতোটা বোকা ছিলো ভাবা যায়?”

“মায়েরা বোকাই হয়। কিন্তু তুই তো চালাক। তুই নিশ্চয়ই নিজেকে বাচাতে বলবি?”

তরু নিশ্চুপ হয়ে গেলো কিছুক্ষণ পর বলে উঠলো,

“নাহ, আমার বাচা না বাচা সমান। তোমরা বরং বাচ্চাদেরই বাচাতে বলিও। আমাকে তো তোমরা মে'রেই ফেলতে চাও। সেই যাত্রায় ম*রে গেলে খারাপ হবেনা বলো? তোমাকে আর কষ্ট করে আমাকে মা'রতে হবেনা। কিভাবে আমাকে মা'রবে সেটা নিয়েও আর ভাবতে হবেনা।”

কথাটা শুনে নীলাভের চোখদুটো লাল হয়ে এলো। তার মনে হচ্ছে কেউ তার হৃদপিন্ডে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। তরু নীলাভের দিকে না তাকিয়েই কথাগুলো বলেছে, সে যখন নীলাভের দিকে তাকালো সে নিজেই থমকে গেলো। নীলাভ কাদছে,

“ত…তুমি কাদছো কেনো?”

নীলাভ আচমকাই গাড়ি ব্রেক করে একহাতে তরুর গালজোড়া চেপে ধরলো। তরু নীলাভের লাল চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হচ্ছে। নীলাভ রীতিমতো কাপছে। সে চিৎকার করে বলে উঠলো,

“তোর কি মনে হয়, তুই এতো সহজে ম'রে যেতে পারবি? তোকে বেচে থাকতে হবে, আমার হাতে ম'রার জন্য বেচে থাকতে হবে। আমার বুকে আগুন জ্বালিয়ে তুই খুব শান্তি পাস তাইনা? শুনে রাখ তুই যদি কোনোভাবে আমাকে না জানিয়ে দ্বিতীয়বার ম'রে যাওয়ার দুঃসাহস করিস তাহলে তোকে হাশরের ময়দানে জবাব দিতে হবে। আমার বুকে আগুন জ্বালানোর জন্য আমাকে এভাবে পোড়ানোর জন্য।”

চলবে,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন