#আমি_তরুলতা (৫৩)
#সোফিয়া_সাফা
নীলাভের মুখ থেকে অস্ফুটস্বরে বেরিয়ে আসে,
“আহ,”
তরু স্তব্ধ হয়ে যায়, হাতে থাকা আরেকটা গ্লাস অন্যদিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে একছুটে নীলাভের দিকে এগিয়ে যায়, হাত দিয়ে রক্ত থামানোর চেষ্টা করে বলে,
“আ…ম স্যরি, বলেছিলাম না চলে যেতে এখান থেকে?”
আশেপাশে তাকিয়ে বলে, “এই কে কোথায় আছিস? ডক্টর নিয়ে আয়,”
নীলাভ তরুর পাগলামি দেখে ডুকরে কেঁদে ওঠে তরুকে জড়িয়ে ধরলো, “আমি ঠিক আছি, কিচ্ছু হয়নি। কুল ডাউন,”
হঠাৎ করেই তরুর মাথা ঘুরতে শুরু করে, তরু এক ধাক্কায় নীলাভকে সরিয়ে দিয়ে দুহাতে নিজের মাথা চেপে ধরল। শ্বাস প্রশ্বাস ভারী হয়ে নাক দিয়েও র'ক্ত বেরিয়ে এলো, নীলাভ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তরু মাথা ঘুরে পড়ে যায়। নীলাভ দৌড়ে তরুর কাছে গেলো, বাকি সবাই ও এলো, বিভান তরুর কাছে যেতে নিলে আভিক আটকিয়ে বলে,
“তুই আর লিজা মিলে ওদের সবাইকে বাংকারে নিয়ে আটকে রাখ, আমি কাপড় চেঞ্জ করে তরুর সাথে যাচ্ছি।”
,
তরুকে হসপিটালে আনা হয়েছে ডাক্তার চেক-আপ করে বলল,
“ওনার মাথায় এক্স-রে করে দেখা গেছে, ওনার মাথায় একটা টিউমার আছে।”
ডাক্তারের কথাটা শোনামাত্র নীলাভ বড়সড় একটা শক খেলো,
“কি বলছেন আপনি ডক্টর? এর আগে আমি তো ওকে ডাক্তার দেখিয়েছিলাম তারা তো এই ব্যাপারে কিছুই বলেনি।”
আভিক সামনে এসে বলল, “ডাক্তার এতোদিন সেটাই বলেছে যেটা তরু বলতে বাধ্য করেছে।”
নীলাভ দুপা পিছিয়ে গেলো, “ক…কি বললেন? আমার তরু কেনো সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছিলো?”
নীলাভকে পাশ কাটিয়ে আভিক ডাক্তারের সামনে এসে দাড়ালো,
“তরু সুস্থ হয়ে যাবে তো ডক্টর?”
“এখনই কিছু বলা যাচ্ছেনা, ওনার মাথায় যতদ্রুত সম্ভব অস্ত্রোপচার করতে হবে।”
তাজিম এগিয়ে এসে বলল, “এর আগে লন্ডনে থাকতে তরুকে আমি ডক্টরের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম, সেও বলেছিলো ওর সার্জারী করতে হবে। কিন্তু তরু রাজী হয়নি,”
জারা কান্না করছে তার সাথে সাফোয়ানও কাদছেন, নাহিদ জিদানকে কোলে নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তার ভেতরে অতিমাত্রায় অপরাধবোধ কাজ করছে,
নীলাভ হঠাৎ প্রশ্ন ছুড়লো,
“তরু কেনো সার্জারী করতে চায়নি?”
তাজিম কাদতে লাগলো, “কারণ ডাক্তার বলেছিলো এই সার্জারী করলে তরুর স্মৃতি নষ্ট হয়ে যেতে পারে, তরু সবকিছু ভুলে যাবে।”
কথাটা শুনে নীলাভ থমকে গেলো, তরুর বলা একটা কথা তার কানে বাজছে,
***আমি তোমাকে কক্ষনো ভুলে যাইনি লাভ, অপশন থাকা সত্ত্বেও আমি তোমাকে কক্ষনো ভুলে যাওয়ার চেষ্টাটুকু করিনি। কিন্তু তুমিই আমাকে ভুলতে না পেরে কষ্ট পেয়েছো, এটা আমার দোষ নয় নীলাভ। এটা তোমার কর্মের ফল যে তুমি আমাকে ভুলতে চেয়েও ভুলতে পারোনি। তুমি আমাকে ভুলে গিয়ে ভালো থাকতে চেয়েছো কিন্তু আমি অভাগী তোমাকে একমূহুর্তের জন্য ভুলে যেতে চাইনি, কারণ তোমাকে ভুলে যেতে চাওয়া মানে নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যাওয়া। তোমাকে ভুলে যাওয়া মানে নিজেকে ভুলে যাওয়া। তোমাকে ভুলে যাওয়া মানে…..
নীলাভ দুহাতে নিজের কানদুটো চেপে ধরলো। কিছু মূহুর্ত শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে চিৎকার করে উঠলো,
“আমি তরুর কাছে যাবো। কোথায় আমার তরু? কোথায়? আমাকে নিয়ে যাও কেউ।”
নীলাভ প্রলাপ করতে করতে কেবিনের বাইরে বেরিয়ে যেতে নিলে নাজমুল গিয়ে তাকে আটকায়,
“শান্ত হ নীলাভ। এখন এমন করার সময় নয়। মাথা ঠান্ডা রাখ।”
নীলাভ সেখানেই হাটু মুড়ে বসে পড়লো। তার ভীষণ লজ্জা লাগছে। সে জানেনা কেনো কিন্তু তরুর নাম ধরে ডাকতেও ভীষণ লজ্জা লাগছে। তার মুখে তরুর নামটা শুনতে এতোটা খারাপ কেনো লাগছে? এর আগেও কি এরকমটাই শোনাতো?
“হ্যাঁ সবসময়ই এরকমটাই শোনাতো কিন্তু আমি আজ উপলব্ধি করতে পারলাম যে তরুর নাম ধরে ডাকার যোগ্যতাটুকুও আমার নেই।”
ভাবতে ভাবতেই নীলাভ নিজের বুকের ভেতর প্রবল চাপ অনুভব করলো। সে একহাত দিয়ে বুকের বা দিকটা চেপে ধরে নির্জীব পদার্থের ন্যায় বসে রইলো।
সাফোয়ান কান্নাজরিত কন্ঠে বললেন, “ডক্টর, আমার মেয়ে কি আমাদেরকে ভুলে যাবে?”
“মেমোরি লস হওয়ার চান্সেস আছে, তবে শীঘ্রই অপারেশন করা না হলে ওনার ব্রেন থেকে ব্লিডিং হতে শুরু করবে। যার ফলে ওনার মৃ'ত্যু নিশ্চিত,”
নীলাভ তড়িৎ গতিতে উঠে দাড়ালো বুকটা শক্ত করে চেপে ধরেই বলল, “আপনি তাড়াতাড়ি ওর সার্জারীর ব্যবস্থা করুন ডক্টর। যেকোনো উপায়ে ওকে বাচান,”
এরই মাঝে রাফিজ চৌধুরী সেখানে উপস্থিত হলেন,
“আমার মেয়ে কোথায়? আমার ত্রানা কোথায়?”
সাফোয়ান গিয়ে রাফিজকে সবকিছু জানালেন,
“আপনারা যতদ্রুত সম্ভব অপারেশন করুন আমার ত্রানাকে বাচান, ও ছাড়া আমার আর কেউ নেই।”
রাফিজও কান্না করছেন, আভিক একভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তরু বারবার বলেছিলো কখনোই যেন এই সার্জারী করা না হয়। কিন্তু সে তরুর কথা রাখতে পারলোনা,
“আমাকে ক্ষমা করে দিস তরু, আমি তোর কথা রাখতে পারলাম না।”
১৫ দিন পর,
নৌশি আর নীড় কাদছে, এনিমিনি তাদের কোলে নিয়ে ঘোরাঘুরি করছে। নীলাভ চুপচাপ খাটের কোনে বসে আছে, ১৫ দিন ধরে বলতে গেলে নীলাভ কারো সাথেই কথা বলেনি, একদম চুপচাপ থেকেছে। সেদিন তরুর সার্জারী সাকসেসফুল হয়েছিলো, কিন্তু ১৫ দিন যাবত তরু কোমায় আছে। ডাক্তারও বলতে পারছেনা কবে নাগাত তরুর জ্ঞান ফিরবে। এনি নৌশিকে কোলে নিয়ে নীলাভের সামনে এসে দাঁড়ায়,
“স্যার নৌশিকে একটু কোলে নিন না, মেয়েটা সকাল থেকেই কেদে যাচ্ছে।”
নীলাভ একটা শ্বাস ফেলে নৌশিকে কোলে নিলো, কিন্তু তার কান্না থামলোনা। সাবিনা ওদের কান্না শুনে ছুটে এলেন, নীড়কে কোলে নিয়ে কান্নাজরিত কন্ঠে বললেন,
“আমাদের কর্মের ফল ওদেরকে ভোগ করতে হচ্ছে, আমরা তরু মায়ের সাথে যেই অন্যায় করেছি। সেই শাস্তি তুমি ওদেরকে দিওনা আল্লাহ, ওরা অবুঝ শিশু, ওদের মাকে ওদের কাছে ফিরিয়ে দেও।”
নীলাভ প্রাণহীন কন্ঠে বলতে লাগলো, “কতো অদ্ভুত তাইনা মা? একটা সময় যার মৃ*ত্যু কামনা করতে, আজকে তার ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছো। একটা সময় যাকে সবচেয়ে বেশি অপ্রয়োজনীয় মনে করতে আজকে তার প্রয়োজন টাই সময় আমাদেরকে হারে হারে বুঝিয়ে দিচ্ছে, মা একবার ভেবে দেখোনা তরু ছাড়া আমি, নীড় আর নৌশি কতোটা অসহায়। তরু বারবার বলতো নীড় আর নৌশি তাকে ছাড়া অনেক অসহায় হয়ে যাবে। আমিই মানতে চাইতাম না, জেদ ধরে বলতাম দরকার হলে একশো জন রেখে নেবো তবুও ওদেরকে কষ্ট পেতে দেবোনা। মা তরু হয়তো আগে থেকেই জানতো যে এরকম একটা দিন আসবে সেইজন্যই ও বারবার আমাকে সতর্ক করতো। বারবার বলেছিলো চোখের দেখাও ভুল হতে পারে, একবার আমাকে এও বলেছিলো আমার জেদই নাকি আমাকে মায়া, আবেগ আর ভালোবাসার থেকে এতোটাই দূরে নিয়ে যাবে যে আমি সবকিছু হারিয়ে ফেলবো, ফিরে আসার পথটাও খুঁজে পাবোনা। আমাকে বারবার বিশ্বাস করার গুরুত্বটা বোঝাতে চাইতো। আমি সেসব বুঝেও বুঝতাম না, জানোতো তরু চায়নি নীড় আর নৌশিকে এর মাঝে কষ্ট দিতে সেই জন্য, শুধুমাত্র সেই জন্যই বারবার এবো*রশন করে ফেলতে চাইতো। জানো মা আমি একবার রাগের বশে বলেই ফেলেছিলাম যে তোর মতো মা থাকার চেয়ে না থাকাই অনেক ভালো হবে, উল্টো তুই থাকলেই ওদের জীবনে ঝামেলা হবে। তরু সেদিন হয়তো মনেমনে ভীষণ হেসেছিলো। এতো ভালো একটা জোক্স বলেছিলাম যে।”
নীলাভের চোখ বেয়ে অঝর ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়লো৷ নীলাভ আটকানোর চেষ্টা টুকুও করলোনা,
“ও সত্যিই বলেছে মা, আমি ওকে ডিজার্ব করিনা, ওর ভালোবাসার যোগ্য আমি নই, আমি চাই ও আমাকে ভুলে যাক। কিন্তু নীড় আর নৌশিকে মনে রাখুক,”
সাবিনা নিজেও কাদছেন, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জারাও কাদছে, চোখের পলকেই হাসিখুশি একটা সংসার তছনছ হয়ে গেলো, এইসব কিছুর জন্য অবশ্য এই বাড়ির সদস্য গুলোই দায়ী। নৌশি কাদতে কাদতে ঘুমিয়ে গেছে, নীলাভ নৌশিকে শুইয়ে দিয়ে নীড়কে কোলে নিলো, ছেলেটা তার মতোই কাদুনে হয়েছে। একবার কান্না শুরু করলে শক্তি শেষ না হওয়া পর্যন্ত কান্না থামায় না,
এনি—“আর্টিফিশিয়াল মিল্ক গুলো ওদের স্যুট করেনা, আমি বুঝতেই পারছিনা ওদেরকে কি খাওয়াবো।”
নীলাভ এনির কথা শুনেও শুনলোনা, “আমার ছেলেমেয়ে বলে ওদের কষ্ট পেতেই হবে, আমার ভুলের শাস্তি ওদেরকে পেতেই হবে, এটা ওদের ভাগ্য।”
নীলাভ কিছু একটা ভেবে নীড়কে কোলে নিয়েই হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। ১৫ মিনিটের মাথায় সে হসপিটালে এসে পৌছালো। নীড়ের কান্না থামেনি এখনো, নীলাভ ধীরপায়ে তরুর সামনে এসে বসলো। তরু ঘুমন্ত পরীর মতো নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে, মুখে অক্সিজেন মাক্স লাগানো হাতের আঙ্গুলে পালস রেট চেক করার যন্ত্র লাগানো। নীলাভ নীড়কে তরুর পাশে শুইয়ে দিলো, প্রতিদিনই সে নীড়কে নিয়ে এখানে আসে। নৌশি কান্না করতে করতে অভিমান নিয়ে ঘুমিয়ে গেলেও নীড় কান্না থামায় না যার জন্য তাকে এখানে নিয়ে আসতেই হয়। ছেলেটা বড্ড মা ভক্ত, মায়ের ঘ্রাণ পেলে তবেই সে শান্ত হয়। নীড় কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘুমিয়ে যায়, তরুকে দেখেই নীলাভের বুকের ভেতর তীব্র যন্ত্রণা হতে থাকে, কতো মিষ্টি নিষ্পাপ একটা মেয়েকে তাদের জন্য কতো যন্ত্রণাই না ভোগ করতে হয়েছে ভাবতেই শরীর শিউরে ওঠে তার।
“প্রাণপাখি, ক্ষমা করবি না আমাকে, এতো অভিমানী কবে থেকে হলি? আমি পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি তরু। প্লিজ এই অপরাধবোধ এই ন'রক থেকে আমাকে মুক্তি দে, তুই বলেছিলি না যে যখনই নীড় নৌশির তোকে প্রয়োজন হবে তখনই তুই আসবি ওদের কাছে। ওদেরকে নিয়ে যাবি নিজের সাথে, তাহলে এখন কেনো আসছিস না? প্লিজ আয়, যেখানেই যাসনা কেনো ওদেরকে নিজের সাথে নিয়ে যা, আমিও তোর সাথেই যাবো কিন্তু। তুই না নিতে চাইলেও জোর করে যাবো। তুই যেখানে যেতে চাইবি আমি যেতে দেবো আটকাবো না তোকে, শুধু আমাকে নিজের সাথে নিয়ে যাবি বল, আমি তোকে ছাড়া থাকতে পারবোনা তরু। শুধু আমার জেদটাই কেনো দেখলি? আমার ভালোবাসাটা কেনো অনুভব করলিনা? আমি যেকোনো কিছুর বিনিময়ে তোর সাথে থাকতে চেয়েছিলাম, আমি শুধু ভয় পেতাম যে বাকিরা তোকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নেবে, সেইজন্যই বারবার ক্ষমা চাইতে বলতাম। নিজেকে ঘৃনা করা থেকে মুক্ত করেছিস তুই, কিন্তু সেই সাথে আমার বেচে থাকার কারণটুকুও যে নিয়ে গেলি। নিজেকে ঘৃনা করে যাও বেচে ছিলাম কিন্তু এই অপরাধবোধ নিয়ে বাচতে পারছিনা রে তরু,”
নীলাভ উঠে দাড়ালো ঘুমন্ত নীড়কে কোলে নিয়ে চলে যেতে নেবে তার আগে ঘুরে এসে অভিমানী কন্ঠে বলল,
“তোর অপেক্ষায় আছি, ভুল যেহেতু আমার ছিলো শাস্তিটা শুধুমাত্র আমার প্রাপ্য। তুই ফিরে আয়, নীড় আর নৌশিকে নিয়ে যা। আমি তোর পিছু নিবোনা, আমি আর বাচার চেষ্টাই করবোনা তখন। এখন তো শুধু নীড় আর নৌশির জন্য বেচে আছি। আমি তোকে অনেক মিস করছি তরু, তুই জানতি তাইনা যে আমি তোকে এতোটাই মিস করবো?”
নীলাভ আবারও তরুর পাশে বসলো, তার কান্না থামছেই না,
“আমি তোকে বিশ্বাস করিনি বলে অনেক কষ্ট পেয়েছিস তুই, কিন্তু আমার কাছে বিশ্বাস টা নিতান্তই তুচ্ছ ছিলো, আমি শুধু তোকে যেকোনো উপায়ে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছি। শক্ত করে ধরে রাখতে চেয়েছি, আমার অনুভূতি টা বিশ্বাসের অনেক উপরে ছিলো তরু, তুই একশোটা খু'ন করলেও আমি তোকে আজীবন ভালোবাসবো। আমি সেটা জানতাম আর সেটা জেনেই কখনো সত্যিটা খুঁজে বের করতেই যাইনি। আমার কাছে তুই কেমন সেটা ম্যাটার করেনা তরু, শুধুমাত্র আমার পাশে তোর থাকাটাই ম্যাটার করে। আমি কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যা সেটা না জেনেও তোকে অসম্ভব ভালোবাসতাম তরু। তুই সেটা জানতিনা বল?
নীলাভ একটা শ্বাস টেনে আবারও বলতে লাগলো,
“তোর অভিমানের পালা শেষ হলে ফিরে আসবি তো আমার কাছে? আমি অপেক্ষায় আছি তোর,”
নীলাভ নীরবে চোখের জল ফেলছে, তখনই তরু মৃদুস্বরে ডেকে ওঠে,
“নী…লা…ভ”
নীলাভ তড়িৎ গতিতে তরুর দিকে তাকায়, তরুর জ্ঞান ফিরেছে। নীলাভ দ্রুত তরুর দিকে এগিয়ে যায়, নীড়কে এক হাতে কোলে নিয়ে অন্য হাতটা তরুর মাথায় রাখে,
“প্রাণপাখি, তুই ঠিক আছিস?”
নীলাভ দ্রুত উল্টো দিকে ঘুরে ডাক্তারকে গিয়ে ডেকে আনলো। তরুর জ্ঞান ফেরার খবর পেয়ে বাকিরাও ছুটে এলো,
ডাক্তার তরুর চেক-আপ করে দেখলেন তরু একদম সুস্থ আছে, সে তরুর অক্সিজেন মাক্স খুলে দেয়,
“সি ইজ টোটালি ফাইন নাও। আপনারা কথা বলুন যেকোনো প্রয়োজনে আমাকে ডাক দিবেন।”
ডাক্তার চলে গেলো, জারা তরুর পাশে বসে তরুকে উঠে বসতে হেল্প করলো।
“আপু তুমি ঠিক আছো?”
তর একহাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে জারার দিকে তাকিয়ে আশেপাশে থাকা প্রত্যেকের দিকে তাকালো।
“আ…মি ক…কোথায় আছি?”
সাবিনা গিয়ে বসলেন তরুর পাশে, “মা তুমি হসপিটালে আছো,”
“হসপিটালে ক…কেনো?”
নাহিদের একটু সন্দেহ হলো এবার, সে তরুর উদ্দেশ্যে বলল,
“তরু তুমি আশেপাশে তাকিয়ে দেখোতো সবাইকে চিনতে পারছো তো?”
নাহিদের কথায় নীলাভ সিরিয়াস চোখে তরুর দিকে তাকালো, অজান্তেই ভীষণ ভয় পাচ্ছে সে। তরু সময় নিয়ে সবাইকে পর্যবেক্ষণ করলো সবশেষে নীলাভের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটস্বরে বলে ওঠে,
“আ…আপনাকে আমি কোথায় যেন দেখেছিলাম।”
তরু দুহাতে নিজের মাথা চেপে ধরলো, “আহ, মনে করতে পারছিনা কেন?”
তরুর রিয়েকশন দেখে সবাই বুঝতে পারলো যে তরু সবকিছুই ভুলে গেছে। নীলাভ তো এটা বুঝতে পেরে সেখানেই হাটু মুড়ে বসে পড়লো, তরু ভ্রু কুচকে সেদিকে তাকালো,
“ওনার কি হয়েছে?”
নাহিদ গিয়ে নীলাভের কোল থেকে নীড়কে কোলে নিলো, নাজমুল তরুর মাথায় হাত রেখে বললেন,
“মা আমাদেরকে চিনতে না-ই পারো কিন্তু নিজেকে তো মনে আছে তাইনা?”
তরু অবাক চোখে নাজমুলের দিকে তাকায়, “আমি… আমার কথা বলছেন?”
তরু পুনরায় মাথা চেপে ধরলো, কিন্তু তার কিছুই মনে পড়ছেনা। তরু এবার বেশ হতাশ হয়ে পড়লো,
“আ…আমার কিছু মনে পড়ছেনা কেনো? আমি কে? আ…আমি কোথা থেকে এসেছি?”
তরু এবার জারার হাত চেপে ধরলো, “আপনি জানেন আমি কে? বলুন না আমি কে?”
জারা অসহায় চোখে তরুর দিকে তাকায়, তরু তাকে আপনি করে বলছে মানে জারাকেও চিনতে পারছেনা। হাহ যেখানে তরু নিজেকেই চিনতে পারছেনা সেখানে জারাকে মনে না রাখাটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু এই স্বাভাবিক বিষয়টা নীলাভ কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা, নীলাভ উঠে এসে তরুর হাত ধরে তাকে দাড় করালো, মুখটা দু'হাতের আঁজলায় নিয়ে আদুরে কন্ঠে বলল,
“তুই আমাকে চিনতে পারছিস না? কিন্তু তরু তুই তো আমার নাম ধরেই ডেকেছিলি,”
তরু ২ পা পিছিয়ে গেল, “আপনি এরকম করছেন কেনো? আমি সত্যি বলছি আমি কাউকেই চিনতে পারছিনা।”
নাহিদ এগিয়ে এসে বলল, “কিছুক্ষণ পর তাজিম ভাই আর বাবাও এসে পড়বেন, দেখি ওনাদেরকে চেনে কিনা।”
“হাহ যেখানে আপু নীলাভ ভাইয়াকেই চিনতে পারছেনা, নিজেকেই চিনতে পারছেনা, সেখানে আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি আপু কাউকেই চিনতে পারবেনা।”
হলোও তাই তরু তাজিম, সাফোয়ান এহসান সহ রাফিজ চৌধুরী কাউকেই চিনতে পারলোনা। নীলাভ তো স্তব্ধ হয়ে বসে আছে, এসব কিছু আর মেনে নিতেই পারছেনা। তরু ঘাবড়ে গিয়ে বেডের উপর জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। নীলাভ অসহায় চোখে তাজিমের দিকে তাকালো,
“ভাইয়া আপনি বলেছিলেন আপনার কাছে কোনো সুপার পাওয়ার থাকলে আপনি তরুর মস্তিষ্ক থেকে আমাকে মুছে ফেলতেন, আপনি কি সত্যিই কোনো সুপার পাওয়ার ব্যাবহার করেছেন? ভাইয়া যদি করেই থাকেন তাহলে আমি অনুরোধ করছি আমাকে মনে করতে হবেনা শুধু নীড় আর নৌশির কথাটা ওকে মনে করিয়ে দিন। ছেলেমেয়ে দুটো ওকে ছাড়া সারভাইভ করতে পারবেনা।”
তাজিম অবাক চোখে নীলাভের দিকে তাকায়, নীলাভ কাদছে, তাজিম হয়তো তিক্ত কিছু বলতে চেয়েছিলো তবে সেটা ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,
“ধৈর্য্য ধরো নীলাভ, আমরা আস্তে আস্তে তরুকে সব কিছু মনে করানোর চেষ্টা করি, দেখবে একদিন না একদিন ওর সবকিছুই মনে পড়ে যাবে।”
রাফিজ চৌধুরী—“ত্রানা কি আমাকে কোনোদিনও চিনতে পারবেনা?”
সাফোয়ান—“অবশ্যই চিনতে পারবে ভাই। আপনি ভেঙ্গে পড়বেন না প্লিজ।”
নাজমুল—“ওকে আমাদের পরিচয় দেওয়া উচিৎ, জারা তুমি এক এক করে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেও।”
জারা পুনরায় তরুর পাশে গিয়ে বসলো, তরু সবাইকে চমকে দিয়ে বেডের শেষ প্রান্তে গিয়ে গুটিসুটি মেরে বসলো। তরুর পরনে প্যাশেন্টের কাপড়, মাথায় ব্যান্ডেজ করা, জারা একটু আহত হলেও তরুর উদ্দেশ্যে বলল,
“আপু তোমার নাম হচ্ছে তরুলতা এহসান, সবাই তোমাকে তরু বলেই ডাকে।”
জারার কথা শুনে তরু একটু আগ্রহ দেখালো,
“আমার নাম তরুলতা এহসান? সবাই তরু বলে ডাকে?”
“হ্যাঁ সবাই ডাকে শুধু ওই আংকেল টা বাদে,”
জারা রাফিজ চৌধুরীকে দেখিয়ে দিলো,
“ওনার নাম রাফিজ চৌধুরী, উনি তোমাকে ত্রানা বলে ডাকেন।”
“কেনো?”
জারা কিছু বলতে চাইলে রাফিজ চৌধুরী বাধা দিয়ে বললেন,
“আমি তোমার কিছুই হইনা ত্রানা, তবে শুধু এইটুকু জেনে রাখো, আগে তুমি আমাকে ড্যাড বলে ডাকতে আর আমি তোমাকে ত্রানা বলে ডাকতাম।”
তরু মুখটাকে ছোটো বাচ্চাদের মতো করে ফেললো। তারপর ঘাড়টাকে হাল্কা কাত করে পুনরায় হাটুতে মুখ গুজলো, জারা এবার এক এক করে প্রত্যেকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। এবার নীলাভের পালা, নীলাভ তো কেদেই যাচ্ছে। তরু তাকে ভুলে গেছে এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা,
“উনি হলেন তোমার হাজব্যান্ড যাকে তুমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতে, উনার নাম হলো নীলাভ জাহির খান। উনি সি আইডি ডিপার্টমেন্টের এএসপি পদে আছেন।”
নামটা শোনামাত্রই তরু জারার ইশারাকৃত দিকে তাকালো,
“নী…লাভ? উনি নীলাভ?”
তরু পুনরায় নিজের মাথা চেপে ধরলো, আবছা আবছা কিছু মনে পড়ছে, সে শুনতে পাচ্ছে সে কাউকে ডাকছে
“লা…ভ।”
“লাভ নয় নীলাভ,”
“আমি তোমাকে লাভ বলেই ডাকিনা?”
তরু নিজের মাথা ছেড়ে দিলো। দ্রুত নীলাভের দিকে এগিয়ে গেলো,
“আপনার নাম নীলাভ?”
নীলাভ অবাক চোখে তরুর দিকে তাকালো, কান্না থামিয়ে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললো, তরু নীলাভের চেহারায় হাত বুলাতে লাগলো, তরুর চোখজোড়া পানিতে চিকচিক করছে। তরুর রিয়েকশন দেখে নীলাভ সহ বাকি সবাই অবাক হলো,
“তুই আমাকে চিনতে পেরেছিস তরু?”
তরু কিছুই বললোনা একদৃষ্টিতে নীলাভের দিকে তাকিয়ে রইলো, আর এভাবে তাকিয়ে থাকা অবস্থাতেই তরু সেন্সলেস হয়ে নীলাভের গায়েই ঢলে পড়লো,
“তরুহ, কি হয়েছে?”
নীলাভ তরুকে কোলে করে বেডে শুইয়ে দিলো, ডক্টর এসে সবকিছু শুনে বললেন,
“আপনাদের কথা শুনে বুঝতে পারলাম যে উনি সবকিছু ভুলে গেলেও রিকোভারি করার চান্সেস আছে। তবে আপনারা ওনাকে প্রেশার দিয়ে কিছু মনে করাতে যাবেন না।”
নীড়ের ঘুম ভেঙ্গে গেছে, ছেলেটা পুনরায় কান্না শুরু করেছে। নীলাভ নীড়কে কোলে নিয়ে ডাক্তারের উদ্দেশ্যে বলল,
“ওকে আমরা বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবো?”
“হ্যাঁ নিয়ে যান, ফ্যামিলির সাথে থাকলে উনার সবকিছু মনে করতে সুবিধা হবে।”
চলবে,
শব্দসংখ্যা- ২৫০০+