#আমি_তরুলতা (৫৫)
#সোফিয়া_সাফা
তরু ভ্রু কুচকে বলল, “কি গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর করছো তোমরা?”
এনি বলল,
“কিচ্ছু না কুইন,”
তরু অবাক হয়ে শুধায়,
“কুইন বলে কাকে ডাকছো?”
“আপনাকে ছাড়া আর কাকে ডাকব?”
তরু বেশ বিরক্ত হল, এমনিতেই বাচ্চাদের কান্নার শব্দে তার মাথা ছিড়ে যাচ্ছে তারউপর তার নামের প্রকারভেদ শুনতে শুনতে তার অর্ধেক মেমোরি এমনিতেই ফুল হয়ে যাবে, বাকি সব কথা কোথায় সেভ করবে? তরুর ইচ্ছা তো করছে নীলাভের রুমে গিয়ে বসে থাকতে কিন্তু, বাচ্চাদের জন্য সে অদ্ভুত কিছু একটা অনুভব করছে। যার জন্য সরেও যেতে পারছেনা, তরু থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করেই বসে,
“আ…তোমরা কি করছো হ্যাঁ? বাচ্চাদুটোকে সামলাতে পারছোনা। তোমাদেরকে কিসের জন্য রেখেছে?”
তরু নিজের কথায় নিজেই অবাক হল, সে এতোটাও জোরে বলতে চায়নি। এনিমিনি তরুর চিল্লানিতে ভয় পেয়ে গেল,
“স্যরি কুইন, কিন্তু আমরা কি করবো বলুন, ওদেরকে যেই খাবার গুলো খাওয়ানো হয় সেগুলো ওদেরকে স্যুট করেনা। ওদের পেটে ভীষণ ব্যাথা হয়, সেই জন্যই ওরা এভাবে কান্না করে।”
মিনির কথাশুনে তরু শান্তচোখে একবার নীড় আর নৌশির দিকে তাকাল। অজান্তেই তার ওদের জন্য খারাপ লাগছে, তরু বুঝতে পারলো সে যেই অনুভূতি টাকে বিরক্ত বলে মনে করতো সেই অনুভূতিটা আসলে ওদের জন্য মায়া ছিল। যেটা সে প্রথমে বুঝতে পারেনি। তার ভাবনার মাঝেই এনি মিনিকে বলল,
“আমি আর পারছিনা, স্যারকে কল করে আসতে বলি?”
“স্যার তো মনে হয় ব্যস্ত আছে, আমি সাবিনা আন্টিকে ডেকে আনি?”
মিনি গিয়ে সাবিনাকে ডেকে আনল। জারাও তার সাথে এল,
“এখন তো তরু আছে, তোমরা কেনো ওদেরকে বাইরের খাবার খাওয়াতে গেলে?”
কথাটা শুনে সবাই একসাথে তরুর দিকে তাকায়, তরু বেশ ইতস্তত বোধ করল। সাবিনা জারাকে চোখ দিয়ে ইশারা করলে জারা তরুর কাছে গিয়ে বসে,
“আপু সত্যি করে বলোনা, তোমার ওদের জন্য খারাপ লাগছেনা?”
তরু অসহায় চোখে জারার দিকে তাকায়,
“আপু আমি তোমার পরিস্থিতি বুঝতে পারছি। কিন্তু তুমিও একটু বোঝার চেষ্টা করো, ওদের তোমাকে প্রয়োজন।”
“আমাকে কি করতে বলছো? সরাসরি বলো প্লিজ।”
জারা তরুর কানে কানে কিছু বলল, তরু একটা ঢোক গিলে না সূচক মাথা নাড়াল।
“প্লিজ আপু, না কোরোনা। শুধু শুধু বাচ্চাদুটোকে এর মাঝে কষ্ট দিওনা।”
“এটা করলে ওদের কষ্ট কমে যাবে? ওরা আর কান্নাকাটি করবেনা?”
জারা উপর নিচ মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। তরু একটা দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা ঝাকিয়ে রাজি হয়ে গেল, ফলস্বরূপ জারা সহ বাকি সবাই খুশি হল।
সন্ধ্যাবেলা, নীলাভ বাড়িতে ফিরে বেশ অবাক হল। প্রতিদিন এইসময় বাড়িতে আসলেই নীড় আর নৌশির কান্না শুনতে পাওয়া যায়। তাহলে আজকে চারদিকে এতো নীরবতা কেনো? নীলাভ নিজের রুমে প্রবেশ করতেই দেখল, তরু বাচ্চাদের দোলনার সামনে বসে বসে ব্যাতিক্রম কিছু অংঙ্গভঙ্গি করছে। যা দেখে বাচ্চারা তাকিয়ে আছে, এরকম দৃশ্য দেখার জন্য নীলাভ মোটেও প্রস্তুত ছিলনা। নীলাভ অনেকক্ষণ সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইল, হঠাৎ তরু দরজার দিকে তাকাতেই নীলাভকে দেখতে পেয়ে সাথে সাথেই তরুর হাসি থেমে গেল। নীলাভকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে তরু সোজা হয়ে খাটের উপর বসল,
“আ,,,আপনি এসে গেছেন?”
তরুর কথায় নীলাভের ধ্যান ভাঙ্গল, সে রুমে ঢুকে আলমারি থেকে কাপড় বের করতে করতে বলল,
“হুম এসে গেছি,”
তরু আর কি বলবে ভেবে পেলনা। ২০ মিনিট পর নীলাভ শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে এসে দেখল তরু আবারও বাচ্চাদের সাথে দুষ্টুমি করছে, নীলাভ অবাক চোখে তরুর দিকে তাকিয়ে রইল। তরুর ভিন্ন ভিন্ন রূপ সে দেখেছে কিন্তু এই রূপটা সবচাইতে আলাদা আর অন্যরকম। নীলাভ হঠাৎ করেই তরুর সামনে গিয়ে বসল, আচমকা নীলাভকে দেখে তরু চমকে উঠল। কয়েক সেকেন্ড পর তরু উঠে চলেই আসতে নেবে তার আগেই নীলাভ তরুর হাত ধরে ফেলে। তরু নীলাভের দিকে তাকিয়ে চোখ খিচে বন্ধ করে নেয়, নীলাভ তরুর এরকম করার কারণ টা খুজে পেলোনা।
“অই, এরকম করছিস কেনো? আমাকে কি ভূতের মতো দেখাচ্ছে নাকি?”
“আপনি কাপড় পড়েন নি কেনো? আপনার লজ্জা শরম নেই?”
নীলাভ তরুর কথায় থতমত খেয়ে গেল, এই মেয়ে বলেকি?
“চোখ খুলে দেখ কাপড় পড়েছি তো।”
তরু পিটপিট করে চোখ খুলে আবারও খিচে বন্ধ করে নিল,
“শার্ট পড়েন নি কেনো?”
নীলাভ হাসবে নাকি কাদবে বুঝতে পারছেনা, এটাই কি সেই তরু যে মুখের উপর সব কথা বলে ফেলতো। নীলাভকে শার্টলেস দেখলে নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে থাকতো। যার মাঝে লজ্জা শরমের বালাই ছিলোনা। অন্তত তার সামনে তরু কখনোই লজ্জা পেতোনা। নীলাভ উঠে গিয়ে একটা শার্ট পড়ে এলো,
“এবার চোখ খোল, এমন ভাব করছিস যেন এর আগে কখনো আমাকে শার্টলেস দেখিসনি।”
তরু চোখ মেলে পুনরায় স্বাভাবিক হয়ে বসল,
“সত্যিই দেখেছিলাম?”
নীলাভ ভ্রু কুচকে তরুর দিকে তাকালো,
“তোর সন্দেহ হচ্ছে?”
তরু উপর নিচ মাথা নাড়ালো, নীলাভ ড্রেসিং টেবিলের সামিনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলল,
“বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে দেখ, ওরাই হচ্ছে প্রমাণ।”
তরু সত্যি সত্যিই বাচ্চাদের দিকে তাকালো, প্রথমে সেতো নীলাভের কথার মানেই বুঝতে পারেনি। কিন্তু যখন বুঝতে পারলো তখন তরুর গালদুটো গরম হয়ে গেল। তরু ফট করে দাঁড়িয়ে চেচিয়ে উঠল,
“ছিহ কি নির্লজ্জ আপনি,”
নীলাভ ঘুরে এসে তরুর সামনে দাড়ালো, তরু এদিক সেদিক তাকিয়ে চলে যেতেই নেবে কিন্তু নীলাভ তরুর বাহু ধরে আটকায়,
“আমি নির্লজ্জ, লাইক সিরিয়াসলি? তুই আমাকে নির্লজ্জ বলছিস? তুই যদি সত্যিই নির্লজ্জ কাউকে দেখতেই চাস তাহলে আয়নার সামনে গিয়ে দাড়া।”
“আমি মোটেই নির্লজ্জ নই,”
“বাচ্চাদের দিকে তাকালেই বুঝবি তুই কতোটা নির্লজ্জ।”
তরু নীলাভের কথায় অবাক হল, ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করল,
“কি বলতে চাইছেন আপনি? বাচ্চারা কি আমার নির্লজ্জের ফল?”
“হুম সেটাই বলতে চাইছি।”
তরু শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে নীলাভকে ধাক্কা দিল যার ফলস্বরূপ নীলাভ দুপা পিছিয়ে গেল।
“আপনি একটা abnormal person. আমি সিওর আপনি আমাকে জোর করে তুলে এনে বিয়ে করেছেন, নইলে আমি আপনার মতো কাউকে কখনোই বিয়ে করতাম না।”
“তাই তাহলে বাচ্চারা কোথা থেকে এলো?”
“কে বলতে পারে, আপনি হয়তো জোর করেছেন আমার সাথে। আপনার বিহেভিয়ার দেখেই আমি বুঝে গেছি, আপনি সবসময় আমার উপর জোরাজুরি করেছেন, আমার উপর টর্চার করেছেন। আর সেসব কিছুর প্রেশারেই আমি সবকিছু ভুলে গেছি,”
নীলাভ হাসতে লাগলো, তরুর কথা শুনে তার প্রচন্ড হাসি পাচ্ছে, নীলাভকে এভাবে হাসতে দেখে তরুর ভীষণ রাগ উঠছে,
“আজব, আপনি হাসছেন কেনো? শুধু কয়েকটা দিন অপেক্ষা করুন, আমার সবকিছু মনে পড়লেই আপনাকে আমি দেখে নেবো।”
নীলাভ তরুর কোমড় চেপে ধরে তরুকে নিজের কাছে টেনে এনে বলল,
“সবকিছু মনে পড়তে হবেনা, তুই চাইলে এখনই আমাকে যতবার খুশি দেখে নিতে পারিস। বল কিভাবে কিভাবে দেখতে চাস আমাকে?”
নীলাভের কথাগুলো শুনে তরুর ইচ্ছা করছে মাটির নিচে ঢুকে যেতে। লোকটা এতো অসভ্য কেনো সেটাই বুঝতে পারছেনা, এর সাথে সে কিভাবে সংসার করেছিলো? তরু চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তার গালদুটো ইতোমধ্যেই লাল হয়ে গেছে৷ তাকে লজ্জা পেতে দেখে নীলাভের আরও বেশি হাসি পাচ্ছে,
“তোকে অনেক কিউট লাগছে, এভাবে ব্লাশ করতে থাকলে কিন্তু আমি যখন তখন তোকে খেয়ে ফেলতে পারি। আগেই সতর্ক করে দিলাম। পরে কিন্তু আমার বিরুদ্ধে কেস করেও কোনো লাভ হবেনা। কারণ লাইসেন্স আ…
নীলাভের পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই তরু নীলাভের মুখ চেপে ধরল,
“আপনি দয়া করে চুপ করুন, অসভ্য বাজে লোক একটা।”
নীলাভ একহাতে তরুর হাতটা সরিয়ে সেখানে কিস করল, তরু নিজের শরীরে অদ্ভুত এক কম্পন অনুভব করল। তরু নিজের চোখজোড়া বন্ধ করে নিল। নীলাভ তরুর হাত ছেড়ে দিয়ে ঘাড়ে হাত রাখলো, তরুকে নিজের অনেকটা কাছে এনে তার ঠোঁটে কিস করতে যাবে তার আগেই দরজায় টোকা পড়লো, তরু নিজের হুশ ফিরে পেলো। দ্রুতপায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। নীলাভ তো প্রচন্ড বিরক্ত হয়েছে,
“শিট, আর আসার সময় পেলোনা। আর ২টো মিনিট পরে এলে কি হতো?”
নীলাভ মনে মনে কথা গুলো বলে দরজার দিকে তাকালো, জারা এসেছে, তরু পেছনে ফিরে একবার নীলাভের দিকে তাকালো, নীলাভ তো অসহায় চোখে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। নীলাভের চাহনি দেখে তরু অতিমাত্রায় লজ্জা পেলো, যার ফলে সে জারাকে পাশ কাটিয়ে নিচে চলে গেল। জারা তো অবাক চোখে তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো,
“আপু চলে গেল কেনো? আমিতো তাকে একটা খুশির খবর দিতে এসেছিলাম। সে তো আমার কথা না শুনেই চলে গেল, আজিব।”
“আমি তোমার উপর রাগ করেছি ভাবী,”
নীলাভের কথা শুনে জারা অবাক চোখে নীলাভের দিকে তাকায়, সে বুঝতে পারলোনা যে সে রাগ করার মতো কি এমন করেছে?
“কেনো ভাইয়া? আমি কি কিছু ভুল করে ফেলেছি?”
“কিছুনা ভাবি অনেক কিছু, তুমি অনেক বড় ভুল করে ফেলেছো। কিন্তু আমি তোমাকে বলতে পারবোনা,”
“কেনো ভাইয়া, বলুন না আমি কি করে ফেলেছি?”
“বললে আর কি হবে?”
“আমি ভুল সংশোধন করার চেষ্টা করবো।”
নীলাভ অসহায় চোখে জারার দিকে তাকায়, তার চাহনি দেখে জারার কান্না পাচ্ছে। সে কি সত্যিই বিরাট বড় কোনো ভুল করে ফেলেছে? নীলাভ একটু ভেবে বলল,
“আমি তরুর সাথে অনেক ইম্পর্ট্যান্ট একটা বিষয় নিয়ে প্রাক্টিক্যালি ডিসকাস করছিলাম তুমি ঠিক প্রাইম সময়টাতে এসে দরজায় নক করে দিলে।”
জারা কাদোকাদো মুখ করে বলল,
“আ'ম স্যরি ভাইয়া, আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি, বিষয়টা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিলো তাইনা?”
“হুম ভাবি, অনেক বেশিই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।”
“আমি এক্ষুনি গিয়ে আপুকে পাঠিয়ে দিচ্ছি ভাইয়া,”
কথাটা বলেই নীলাভকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে জারা নিচে চলে গেল।
“হাহ ওকে পাঠালেই কি আর না পাঠালেই কি, ও কি আর আমার কাছে আসবে? ধুর ভাল্লাগেনা,”
নীলাভ বাচ্চাদের কাছে গিয়ে বসল, সে দেখলো বাচ্চারা খেলতে খেলতে ঘুমিয়ে গেছে।
“বাহঃ আজকে এতো ভদ্র হলে কিভাবে হুম? বাবা শাসন করতে পারিনা বলেই কি আমাকে এতো জালাও? আর মা একদিন শাসন করতেই ভদ্র ছেলেমেয়ে হয়ে গেলে তাইনা? টু মাচ আনফেয়ার, ভারী অন্যায় করলে আমার সাথে। তোমাদের মায়ের কাছ থেকে শাসন করা শিখতে হবে দেখছি।”
তরু চুপচাপ ড্রইংরুমে বসে আছে তার সামনে সাবিনা আর হানা বসে বসে গল্প করছে, সাবিনা নাতি-নাতনীদের জন্য শীতকালীন কিছু সোয়েটার বুনে রাখছেন, যেগুলো সে সামনের শীতে ওদেরকে পড়াবে। অবশ্য এগুলো সে শখ করেই বানাচ্ছে, জারা তরুর পাশে এসে বসল।
“স্যরি আপু আমি বুঝতে পারিনি যে তোমরা এতোটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলে তাহলে আমি তোমাদেরকে কখনোই বিরক্ত করতাম না।”
জারার কথা শুনে তরু কাশতে লাগলো,
“একি আপু কি হল?”
“তুমি কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কথা বলছো বোন?”
“একটু আগে আমি যখন তোমাদের দরজায় নক করলাম তখন তুমি আর ভাইয়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করছিলে না? আচ্ছা আপু তুমি কি আমার উপর রাগ করেই চলে এলে?”
তরুর ভীষণ কান্না পাচ্ছে, লোকটা কি জারাকে সব বলে দিয়েছে? ইশ কি লেভেলের বজ্জাত লোকটা, জারাকে ওগুলো কিভাবে বললো একটুও লজ্জা করলনা?
“আপু তুমি যাওনা,”
“ক,,,কোথায় যাবো বোন?”
“কোথায় আবার ভাইয়ার কাছে যাবে, ভাইয়া তোমাদেরকে প্রাইম সময়ে বিরক্ত করার জন্য আমার উপর রাগ করেছে।”
তরু চোখ বড়বড় করে জারার দিকে তাকালো,
“আপু তুমি যাওনা, জানোতো ভাইয়া অনেক মন খারাপ করেছে। তোমরা গিয়ে আবার সেখান থেকেই টপিক টা শুরু করতে পারো। আমি আর বিরক্ত করবোনা প্রমিজ।”
তরু এবার লজ্জায় কেদেই ফেললো, জারা তো তরুকে কাদতে দেখে ঘাবড়ে গেল।
“আপু তুমি কাদছো কেনো? প্লিজ তুমি কেদোনা। আমার সত্যিই ভুল হয়েছে, তুমি আমাকে বকা দেও তবুও কেদোনা প্লিজ।”
তরু আর না পেরে হনহন করে উপরে চলে গেল। সাবিনা আর হানা যদিও জারা আর তরুর মাঝেকার কথা শুনতে পায়নি তবুও তরুর রিয়েকশন দেখে তারাও ভীষণ অবাক হয়েছে।
“একি তরু কাদছে কেনো? তুমি তো খুশির খবর দিতে গেলে, কি এমন করলে যে মেয়েটা কান্না করে দিল?”
“মা আমি তো খুশির খবরটা বলতেই পারিনি,”
“সেকি কেনো?”
জারা ভাবলো সে সাবিনাকে এই ব্যাপারে বললে সাবিনাও তার উপর রাগ করতে পারে যার জন্য সে বলল,
“বাদ দিন মা, এখন সব ঠিক হয়ে যাবে। আর খুশির খবরটা আমি আপুকে পরে জানিয়ে দেবো।”
তরু গটগট পায়ে এসে ঠাস করে রুমের দরজা লক করতেই নীলাভ দরজার দিকে তাকালো, নীলাভ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তরু এসে শার্টের কলার ধরে তাকে টেনে তুললো। নীলাভ তো তরুর চেহারা দেখেই ঘাবড়ে গেছে, তরু কাদছে? কেনো কাদছে? তাহলে কি তরুর সবকিছু মনে পড়ে গেছে? নীলাভ প্রচন্ড ঘাবড়ে গেল, সেই সাথে তরুকে হারিয়ে ফেলার ভয় তাকে জেঁকে ধরল।
“প্রাণপাখি কাদছিস কেনো?”
“শয়তান লোক একটা, আপনি কিভাবে পারলেন আপুকে ওগুলো বলে দিতে? লজ্জা করলনা আপনার?”
তরুর কথা শুনে নীলাভ স্বস্তির শ্বাস ফেলে মনে মনে আওড়াল,
“যাক তরুর কিছুই মনে পড়েনি তাহলে।”
“কি হল? বলছেন না কেনো?”
নীলাভ হাল্কা হেসে তরুর চোখদুটো মুছে দিল,
“এতে কান্না করার কি আছে? আমার প্রাণপাখিটা স্মৃতি হারিয়ে অন্যরকম এক চরিত্র হয়ে গেছে দেখছি। আগে তো বেশ স্ট্রং ছিলো। কখনোই কাদতোনা।”
“হাহ আপনি আসল কথা থেকে সরে যাচ্ছেন কিন্তু, আপনি জানেন আমি কতোটা লজ্জা পেয়েছি বোনের সামনে।”
“আমি আবার কি বলেছি? আমি তো শুধু বললাম যে আমরা গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় নিয়ে প্রাক্টিক্যালি আলোচনা করছিলাম ও একদম প্রাইম টাইমে এসে,,,,
নীলাভ কথাটা শেষ করার আগেই তরু নীলাভের বুকে কিল ঘুষি মারতে লাগলো,
“বজ্জাত লোক একটা।”
নীলাভ তো বেশ এনজয় করছে, তরুকে এভাবে লজ্জা দিতে তার ভালো লাগছে।
“আরও কি কি বলেছি শুনবিনা?”
“নাহ শুনবোনা,”
নীলাভ তরুকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই নীড় কেদে ওঠে, নীলাভ এগিয়ে যেতে নেয় কিন্তু তার আগে তরুই দৌড়ে গিয়ে নীড়কে কোলে তুলে নেয়, ব্যাস নীড়ের কান্নাও থেমে যায়। নীলাভ অবাক হয়ে তাদের দিকে এগিয়ে গেল,
“ব্যাপার কি বলতো? নীড় এরকম গুড বয় হয়ে গেল কিভাবে?”
তরু একটা হাসি দিয়ে বলল,
“ম্যাজিক,”
“ম্যাজিক? কি ম্যাজিক শুনি?”
“আপনার শুনতে হবেনা, এটা আমাদের পার্সোনাল ম্যাটার।”
“বলনা, আমিও ম্যাজিক টা শিখবো।”
“আপনার দ্বারা হবেনা।”
নীলাভ বিছানার উপর বসতেই তরু তার সামনে গিয়ে দাড়ালো,
“আপনি বাইরে যান,”
“কেনো? বাইরে যাবো কি করতে?”
“নীড়ের ক্ষুধা লেগেছে,”
“কিন্তু খাবার তো টেবিলের উপরেই রাখা থাকে বাইরে থেকে কি আনবো?”
তরু এবার প্রচন্ড বিরক্ত হল,
“আপনি একটা গর্দভ,”
“হু ভালো হয়েছে যা,”
“আপনি যান।”
“দেখ তরু আমি অনেক টায়ার্ড, বিরক্ত করিসনা।”
“ভালো, নীড় একটু পর চিল্লিয়ে উঠলে তখন আপনার আর বিরক্ত লাগবেনা তখন বেশ ভালোই এনার্জি পাবেন ওকে নিয়ে নাচার জন্য।”
তরু বলতে না বলতেই নীড় কেদে ওঠে আর ওর কান্নার শব্দে নৌশিও কেদে ওঠে,
“নিন হলো, যান এবার ওদের নিয়ে নাচুন।”
নীলাভ তরুর দিকে বিরক্তিকর চাহনি নিক্ষেপ করল,
“এনি আর মিনিকে ডাক দে,”
“ওদেরকে প্রয়োজন নেই আপনি বাইরে যান।”
নীলাভ সন্দিহান চোখে তরুর দিকে তাকালো,
“তুই কি করতে চাইছিস বলতো?”
তরু এবার ভীষণ লজ্জা পেলো,
“আপনি যাবেন নাকি আমি চিল্লিয়ে সবাইকে একত্রিত করবো?”
নীলাভ না পেরে রুমের বাইরে এসে দাড়ালো, সাথে সাথেই তরু দরজা লক করে দিল। নীলাভ একটা শ্বাস ফেলে ড্রইংরুমে গিয়ে বসল।
“নীলাভ, জারাকে নিয়ে কালকে অইবাড়িতে যাবো ভাবছি। তরুকেও সাথে নিয়ে যাবো?”
নাহিদের কথা শুনে নীলাভ ভ্রু কুচকে তাকাল,
“কেনো?”
“কেনো আবার তুই জানিস না?”
নীলাভ না বোধক মাথা নাড়ল,
“তাজিম ভাই বাবা হতে চলেছে সেই জন্যই জারা যেতে চাইছে।”
“ওহ, তরুর তো কিছুই মনে নেই। ও গিয়ে কি করবে?”
“কে বলতে পারে, ওখানে গিয়ে তরুর কিছু মনে পড়লেও পড়তে পারে।”
“না, তরু যাবেনা।”
নাহিদ হয়তো নীলাভের পরিস্থিতি বুঝতে পারল,
“দেখ নীলাভ তুই যতই চেষ্টা করিসনা কেনো, তরুর কিন্তু একদিন না একদিন সব মনে পড়বেই।”
“দরকার নেই, তরু নীড় আর নৌশিকেও মেনে নিয়েছে আর কিছু মনে করতে হবেনা।”
সাবিনা বলল, “নীলাভ ও তোকেও চিনতে পারছেনা, তুই এসব এতো স্বাভাবিক ভাবে কিভাবে নিচ্ছিস?”
“ও আস্তে আস্তে আমাকে নতুন করে চিনে নেবে। আমি কোনোভাবেই ওকে হারাতে চাইনা।”
কেউ আর কথা বাড়ালোনা। কিছুক্ষণ পর নীলাভ রুমে গিয়ে দেখলো নীড় আর নৌশি ঘুমোচ্ছে, তরু ইশারায় নীলাভকে চুপ থাকতে বলল, নীলাভ হাল্কা হেসে তরুর পাশে গিয়ে বসল,
“বাহঃ ভালোই তো ওদের সামলাতে পারছিস।”
“হুম, আমি তো প্রথমে ওদের ভীষণ পাজী বলে মনে করতাম কিন্তু এখন তো ওরা জিদানের মতোই কিউট আর ভদ্র হয়ে গেছে।”
“মা ছাড়া বেড়ে ওঠা সত্যিই অনেক চ্যালেঞ্জিং, মা না থাকলে সব বাচ্চারাই পাজী হয়ে যায়। এখন তুই ওদের মা আছিস সেই জন্যই ওরাও ভদ্র হয়ে গেছে,”
“যাক আমি তাহলে বেশ প্রয়োজনীয় তাইনা? কি বলেন?”
“হুম অনেক বেশিই প্রয়োজনীয়, একদম অক্সিজেনের মতো।”
“ধূর বেশিই বলে ফেললেন, ততটাও নই।”
“তার চেয়েও বেশি,”
তরু নীলাভের কথা শুনে তার দিকে তাকাতেই থমকে গেলো, নীলাভ অদ্ভুত দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে, তরু ইতস্তত বোধ করে উঠে চলে যেতে নেবে তার আগেই নীলাভ তরুর হাত ধরে ফেলে,
“তরু আমাকে একবার জড়িয়ে ধরবি?”
নীলাভের সহজ সরল আবদার শুনে তরু চমকে তাকাল, নীলাভ এমন ভাবে বলছে যেন এটা কোনো ব্যাপারই নয়। কিন্তু তরুর যেখানে তাকে মনেই নেই সেখানে সে কিভাবে তাকে এতো সহজে জড়িয়ে ধরতে পারে? তরু নিজের হাত ছাড়াতে চাইলে নীলাভ আরও শক্ত করে তরুর হাত ধরে,
“প্লিজ তরু একবার,”
নীলাভ নিজেই তরুকে সামনে এনে জড়িয়ে ধরল, তরু দাঁড়িয়ে আছে আর নীলাভ বিছানায় বসে আছে। সেভাবেই নীলাভ তরুকে জড়িয়ে ধরেছে, নীলাভ হঠাৎই গাইতে লাগল…
“বলো আমায় কখনো ছেড়ে যাবে না,
এই হাত দুটি আলাদা করে দেবে না,
না না আমি কোনো কিছু চাই না,
তুমি হলে আমার আর কিছু লাগে না,
আমি তোমায় ছাড়া আর কিছু বুঝিনা,
আমি তোমায় ছাড়া ভাবতে পারিনা,
আমি তোমায় ছাড়া আর কিছু বুঝিনা,
আমি তোমায় ছাড়া থাকতে পারিনা,
একটু কাছে পাবার আশায়
ধরি কত শত বাহানা..
দিন কি রাত আমার তুমি ছাড়া
এক মুহূর্ত কাটে না..,,
কোনো কিছুই একা আর ভালোলাগে না
মনে মনে তুমি আর কেউ থাকে না,
আমি তোমায় ছাড়া আর কিছু বুঝিনা,
আমি তোমায় ছাড়া ভাবতে পারিনা,
আমি তোমায় ছাড়া আর কিছু বুঝিনা
আমি তোমায় ছাড়া থাকতে পারিনা...
মন যে কেমন সারাটিক্ষন
ভাবে তোমায় আনমনে..
পাবে জীবন যতোটা সময়
আগলে রবো যতনে..,,
না না আমি কোনো কিছু চাই না,
তুমি হলে আমার আর কিছু লাগে না,
আমি তোমায় ছাড়া আর কিছু বুঝিনা,
আমি তোমায় ছাড়া ভাবতে পারিনা,
আমি তোমায় ছাড়া আর কিছু বুঝিনা,
আমি তোমায় ছাড়া থাকতে পারিনা,
নীলাভ কান্না করছে, নীলাভের এই হঠাৎ কান্না করার কারণগুলো তরু বুঝতেই পারেনা। কি সুন্দর গান গাইলো, শেষে এভাবে কান্না করার কি আছে? তরু নীলাভকে ছেড়ে তার মুখোমুখি বসল, নীলাভ দ্রুতহাতে নিজের চোখদুটো মুছে ফেলল, তরু বলল,
“আমি সবকিছু ভুলে গেছি বলে আপনি কান্না করছেন?”
নীলাভ কিছুই বললোনা,
“আপনি এভাবে কান্না করবেন না প্লিজ, আমি সবকিছু মনে করার চেষ্টা করছি তো, দেখুন না নীড় আর নৌশিকেও মেনে নিয়েছি। আমি একদিন অবশ্যই সবকিছুই মনে করতে পারবো, একটু সময় দিন প্লিজ।”
নীলাভ শান্তকন্ঠে বলল,
“কিছুই মনে করতে হবেনা তুই শুধু আমার সাথে থাক। আর কিছুই চাইনা,”
তরুর কপালে ভাজ পড়ল,
“আপনি চান না আমার সবকিছু মনে পড়ুক?”
“নাহ, আমি তোকে বারবার হারাতে পারবোনা।”
“এই আপনি সত্যিই আমাকে জোর করে বিয়ে করেন নি তো?”
“নোহ, তুই সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছাতেই আমাকে বিয়ে করেছিস।”
“তাহলে আপনি চান না কেনো যে আমার সবকিছু মনে পড়ুক?”
“এতোকিছু ভাবতে হবেনা শুধু নীড় আর নৌশির কথা ভাব, কিভাবে নিজে ভালো থাকবি সেসব ভাব।”
“আপনার কথাও ভাববোনা?”
“আমার কথা তো একদমই ভাববিনা, দরকার নেই ভাবার, শুধু আমার সাথে থেকে যা।”
তরু অজান্তেই নীলাভের মাথার এলোমেলো চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে ঠিক করতে লাগল, নীলাভ ফট করেই তরুর হাত ধরে ফেলে,
“এরকম করবিনা কখনো, আমার ভয় করে।”
তরু ভ্রু কুচকে তাকায়,
“এখানে ভয় পাওয়ার কি আছে?”
নীলাভ কিছুই বললোনা, সে তরুকে কিভাবে বলবে যে তরু এরকম টা আগে করতো। এখন তো সে সবকিছু ভুলে গেছে তারপরও এরকম কেনো করবে? এরকম করলে নীলাভের ভয় হয়, তার মনে হয় এই বুঝি তরুর সব মনে পড়ে গেল।
“আপনি আমাকে খুব ভালোবাসেন তাইনা?”
“তোর মনে হয় আমি তোকে ভালোবাসি?”
“হুম অবশ্যই, কেনো বাসেন না?”
“জানিনা।”
“এটা কেমন কথা? আপনি নিজেই জানেন না যে ভালোবাসেন কিনা?”
নীলাভ মনে মনে বলল,
“আমি কিভাবে বলবো ভালোবাসি? তোর ভালোবাসার কাছে এসব যে খুবই নগন্য। আমার নিজের ভালোবাসার কথা বলতেও লজ্জা করে।”
তরু শ্বাস ফেলে বলল,
“যাক বাদ দিন খেতে চলুন।”
চলবে,
শব্দসংখ্যা- ২৮৫০+