#কাজলরেখা
#পর্ব:৪৩ (প্রথমাংশ)
#তানজিনা ইসলাম
একটা রাজকীয় বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে আকিব শিকদারের গাড়ি। মূল ফটক বন্ধ। আকিব শিকদার গাড়ি থামিয়ে রেখেছেন, এখনো হর্ণ দেননি। হর্ণ দিলে ফটক খুলবে, এটা ওনার জানা কথা। ওনি দ্বন্দ্বে পরেছেন, যাবেন না-কি না! পুরো রাস্তা এসব ভাবতে ভাবতে এসেছেন। ঠিক এজায়গায় উনি রাত্রি শিকদারকে নামিয়ে দিতেন। ওনি বাড়ির ভেতর চলে যেতেন। আকিব শিকদার দেনামোনা করতেন ফটক পেরিয়ে ঢুকবেন না-কি না।ওনাকে মোবারক হোসেন কখনো ডাকেননি। আজও সে দ্বন্দ্ব পরলেন তিনি। আত্মসম্মান বাঁধা দিচ্ছে যেতে, আবার রাত্রি শিকদারের কথা ভেবে এখান থেকে ফিরেও যেতে পারছেন না।
চাদনী অবাক হয়ে দেখছে বাড়িটা। এ জায়গাটায় ছোটবেলায় অনেকবার এসেছে ও। স্হানীয়রা এ বাড়িকে রাজবাড়ী নামে চেনে। এখানের পাশেই ঘোরার একটা সুন্দর জায়গা আছে। চাদনী বাড়ি টু স্কুল করতে করতে ছুটির দিনে ওর বাবার সাথে এখানেই আসতো। চাদনী কখনো এ বাড়িতে ঢোকেনি, তবে বাইরে থেকে দেখতো।এখানকার বাসিন্দারা প্রায়শই বিদেশ চলে যায়। ওঁদের আতরের বড় ব্যবসা আছে এবরোডে। রাজনীতি করে। তাই বেশিরভাগ সময় বাড়িটা খালি থাকে। এসব তথ্য দিয়েছিলো ওঁকে, ওর বাবা। ঘুরতে এসে চাদনী প্রশ্ন করলে এসব কথায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শোনাতো আকিব শিকদার।অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটাই আকিব শিকদার বললো না ওঁকে। এটা ওর নানুরবাড়ি। এখানে ওর কিছু আপনজন আছে।
আসলেই আপনজন? সে আপনজনরা তো এতোবছরে একবারও মনে করলো না ওঁদের। এজন্যই বোধহয় আকিব শিকদার অভিমান করে কথাটা বলেনি কোনোদিন ওঁকে।
আকিব শিকদার হর্ণ দিলেন।হর্ণের শব্দ পেয়ে দারোয়ান গেইট খুলে দিলো। আকিব শিকদার গাড়ি চালিয়ে গেইট পেরিয়ে ঢুকলেন।দারোয়ান দৌড়ে এলো জানালার কাছে।
নম্র স্বরে বললো
-"স্যার, পার্কিং লট এদিকে।"
দারোয়ান হাত বাড়িয়ে দেখিয়ে দিলো। আকিব শিকদার গাড়ি পার্ক করে, চাঁদনী কে নিয়ে এলেন।
চাদনী পুলকিত হলো। ইশ! কি সুন্দর সবাকিছু। কতোবড় বাগান!ইয়ার্ডের একপাশে হলুদ, লাল আর সাদা রঙের গোলাপের চারা। চাদনীর একটা ছিড়ে নিতে মন চায়লো। কিন্তু সম্মানের দিকে তাকিয়ে আর নিলো না। কেও দেখে ফেললে পাছে ওঁকে ছোঁচা বলে! রাজকীয়তার ছোঁয়া সব জায়গায়। চাদনী ফিসফিস করে বললো
-"তোমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন তো খুব ধনী বাবা!"
-"তোর বাপও কম ধনী না।"
-"ওয়াও। ইয়ে এটিটিউড হি তো মে দেখনা চা রাহিতি।"
আকিব শিকদার চোখ বুঁজে হাসলেন। চাদনী ওনার বাহু জড়িয়ে ধরলো। আকিব শিকদারের সাথে পা মিলিয়ে হাঁটতে থাকলো।
সদরদরজার সামনে এসে দাঁড়ালো দু'জনে। চাদনীর বুক ধুকপুক করছে। কারা কারা থাকতে পারে ভেতরে? নানুভাই, খালামনি আর কে? মামা? মামাতো ভাই,বোন?
ওর ভাবনার মাঝেই আকিব শিকদার বেল চাপলেন। তক্ষুনি দরজা খট করে খুলে গেলো। যেন কেও উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিলো ওঁদের আসার।দরজার পাশে বসে ছিলো, ওরা আসলেই দরজা খুলে দেবে।
দরজা খুলেই রাত বেরিয়ে এলো, মিষ্টি হেঁসে দেখলো ওঁদের।
চাদনী আকাশ থেকে পরলো যেন।ভুল দেখছে মনে করে, চোখ কচলে আবার তাকালো। নাহ, ভুল দেখছে না। চিমটি কাটার পরও ভুল দেখার কথা না। রাত হাসিমুখে তাকালো, আকিব শিকদারের দিকে।সেও হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে।
রাত খরখরে গলায় বললো
-"ভালো আছেন আঙ্কেল?"
-"তুমি?"
-"হু, আপনার সাথে না আমার, আলাপ-আলোচনা বাকি থেকে গিয়েছিলো।"
-"আবরার, তুমি এখানে..
-"ওয়াও আপনি আমার নামও মনে রেখে দিয়েছেন।কিউট তো! ভেতরে আসুন।সব পরিচিতি কী বাইরে দাঁড়িয়ে হবে!"
চাদনী আকিব শিকদারের বাহু ছেড়ে দিলো। আকিব শিকদার ভেতরে প্রবেশ করে বললো
-"গাড়িতে নাস্তা ছিলো।সেগুলো আনার জন্য কাওকে লাগতো।"
-"আপনি বসুন। ওরা নিয়ে আসবে।"
আকিব শিকদার হ্যান্ডশেকের উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে দিলেন। রাত ওনার হাত ধরে হ্যান্ডশেক করলো,পরপর জড়িয়ে ধরলো ওনাকে। চাদনী হা করে দেখলো দু'জনকে। রাতের ব্যবহারে দফায় দফায় অবাক হচ্ছে ও। এই নাক উচা ছেলেটা এতো ভালো বিহেভ করছে কী করে! ও কে হয় এ বাড়ির?
রাত একবারও তাকালো না চাদনীর দিকে। অদেখা করলো ওঁকে। মোবারক হোসেন এ পর্যায়ে ড্রইংরুমে এলেন। আকিব শিকদার ওনাকে দেখে কী বলবেন বুঝতে পারলেন না। চাদনী সালাম দিলো ওনাকে। আকিব শিকদার সালাম নিয়ে হেঁসে বললেন
-"কেমন আছো তোমরা?"
চাদনী আকিব শিকদারের দিকে তাকালো। উনিও চাদনীর দিকে তাকালেন। দু'জনের মুখ চাওয়াচাওয়ি দেখলো রাত। আকিব শিকদার আর মোবারক হোসেন দু'জনেই একে অপরের সাথে কথা বলতে সংকোচ বোধ করলেন।
রাত পরিস্থিতি ঠিক করতে বললো
-"আপনারা দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসুন না। আমরা বসে কথা বলি।"
আকিব শিকদার কথা না বাড়িয়ে সোফায় গিয়ে বসলেন। চাদনী গেলো ওনার পিছু পিছু। আকিব শিকদার রাতের উদ্দেশ্যে বললেন
-"তুমি এ বাড়ির কে হও আবরার?"
-"রাত্রি শিকদার আমার খালামনি হন। আপনিই বলুন আমি কে হই?"
আকিব শিকদার অবাক স্বরে বললেন
-"তুমি রোদেলা আপুর ছেলে?"
-"জ্বি।"
-"এজন্যই আমার তোমাকে চেনা চেনা লাগছিলো।"
-"কীরকম? আমি আমার আম্মুর মতো দেখতে?"
-"নিরানব্বই পার্সেন্ট।"
রাত হাসলো। পরক্ষণেই মোবারক হোসেনের দিকে তাকিয়ে কনুই দিয়ে গুঁতো দিলো, আকিব শিকদারের সাথে কথা বলার জন্য। উনি করুণ দৃষ্টিতে তাকালেন। কী কথা বলবেন উনি? যখন বলার দরকার ছিলো তখনই কিছু বলেননি।
-"রোদেলা আপু কেমন আছেন?"
-"আলহামদুলিল্লাহ।"
-"তুমি এখানে বেড়াতে এসেছো?"
-"আমি তো ছোটবেলা থেকে এখানেই থাকি।"
আকিব শিকদার কপালে ভাজ ফেলে তাকালেন। ক্ষীণ স্বরে বললেন
-"আমি শুনেছিলাম রোদেলা আপুর শ্বশুরবাড়ি ঢাকায়?"
-"আম্মুর ডিভোর্স হয়ে গেছে।"
রাত বিষাদ হাসলো। চাদনীর মনে হলো, জাগতিক সকল দুঃখ-বিষাদ রাতের হাসিতে প্রকাশ পেলো। দ্রুত একহাতে আকিব শিকদারের হাত চেপে ধরলো চাদনী। ফিসফিসিয়ে বললো
-"এজন্যই তোমাকে মানুষের পার্সোনাল লাইফ নিয়ে প্রশ্ন করতে মানা করি। সবার জীবন সুখের হবে এমন কোনো কথা নেউ।"
-"আমিতো শুধু...
-"তুমি আর কোনো প্রশ্ন করবে না।"
রাত চোখমুখ কুচকে দেখলো চাদনীর ফিসফিসানি। আকিব শিকদার বললেন
-"সরি আবরার, ফর ইউর লস্ট।"
-"ইট’স নট মাই লস্ট। মানুষের জীবনে উত্থান-পতন আসে। আম্মু কষ্ট পেয়েছে।কিন্তু আমার মনে হয় ওটা আমার জীবনের প্রাপ্তি ছিলো।"
আকিব শিকদার কী বলবেন ভেবে পেলেন না। সার্ভেন্টরা কিচেন থেকে ট্রে করে নাশতা নিয়ে আসলো। মুহুর্তেই কাচের গোল টেবিলের কোণা কোণা ভর্তি হয়ে গেলো কাঁচের প্লেটে। রাত বললো
-"আঙ্কেল নাস্তা নিন।"
চাদনীকে রাত নাস্তা নিতে বললো না। ভেতরে ভেতরে সুক্ষ্ম অপমানবোধ হলো ওর।রাত আজও চাদনী কে চিনতে পারলো না। চাদনী বুঝে নিলো এ ছেলের স্মৃতিশক্তি খুব কম। এমন একটা মানুষের জনতার নেতা হওয়া একেবারেই উচিত না। এমন ভুলোমনা নেতা, ওঁদের একটুও দরকার নেই।
-"আপনি নিচ্ছেন না কেন? আপনাকে আলাদাভাবে বলতে হবে?"
চাদনী নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে তাকালো রাতের দিকে। আকিব শিকদার বললেন
-"ও এতো হেলদি ফুড খায় না!"
-"কী খায় সে?"
-"জাঙ্কফুড আর কোনোমতে একচামচ ভাত। এভাবেই বেঁচে আছে।"
চাদনী ফিসফিস করে বললো
-"ওনাকে এসব বলছো কেন তুমি?"
-"আরে আমি তো..
-"তোমার সাথে আর কথা নাই আমার।"
রাত ছোটোছোট চোখ করে তাকালো চাদনীর দিকে। এই মেয়ে এতো ফিসফিস করে কেন? ফিসফিসানি পিচ্চি একটা!
আকিব শিকদার ওর দিকে তাকিয়ে বললেন
-"তুমি আমাদেরকে ডেকে পাঠিয়েছো তাই না আবারার?"
-"শুধু আমি না তো। নানুভাইও আপনাদের সাথে দেখা করতে চেয়েছেন।"
-"তোমার নানুভাইয়ের তো এতোবছরেও দেখা করার প্রয়োজন পরলো না। হঠাৎ এখন কেন?"
মোবারক হোসেন লজ্জায় পরলেন। রাত বললো
-"আসলে, আপনার সাথে ওইদিন পরিচিত হওয়ার পর। আমার খালি মনে হচ্ছিলো, আপনাকে আমি চিনি। কোথাও না কোথাও আপনার কথা আমি শুনেছি। আপনাকে সরাসরি না দেখলেও রাত্রি খালামনি খুব বলতো আপনার কথা।"
-"রোদেলা আপু কোথায়?"
-"আমি ডেকে নিয়ে আসছি।"
রাত ডাকতে গেলো। কিন্তু কিছু সময় পর একা ফিরে এসে বললো
-"আম্মু ঘুমাচ্ছে। একটু পরই উঠে যাবে। কাঁচা ঘুম ভেঙে গেলে, মাথা ব্যাথা করে।"
-"কোনো সমস্যা নেই।"
-"আমরা লাঞ্চ টা করে ফেলি ততক্ষণে! আম্মুও উঠে যাবে।"
সবাই টেবিলে গিয়ে বসলো লাঞ্চের উদ্দেশ্যে। চাদনীর বিরক্ত লাগছে। কি বোরিং একটা টাইম যাচ্ছে! কত কি ভেবে এসেছিলো ও। ওর অনেক কাজিন থাকবে, সবার সাথে পরিচিত হবে। কত কি যে করবে। সেখানে এই গোমড়ামুখোটাই ওর কাজিন হতে পেলো। নাহ! আঁধার ভাই ঠিকই বলেছিলো।ও ব্যাতিত চাদনীর আর কাজিন নাই। এ ছেলে কাজিন হওয়ার যোগ্য না।কাজিনরা আর যায় হোক, এতো বোরিং হয় না। ভেবেই চাদনী মুখ বাকালো।
লাঞ্চে চাদনী তেমন কিছুই খেলো না। শুধু এক চামচ ভাত আর একটা লেগ রোস্ট। এই নিয়েও খাবার টেবিলে রাত ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বাঁশ মেরেছে ওঁকে। মেয়েরা না-কি স্টাইলের জন্য ভাতই খেতে পারে না।ওঁদের লিপস্টিক লেপ্টে যাবে সেজন্য। কত্তোবড় অন্ধ হলে এ কথা বলে। রাত কোথায় দেখেছে ওঁকে লিপস্টিক দিতে! ছি,ছি! এ কেমন নেতা পেতে চলেছে ওরা ভবিষ্যতে। নেতা এমন অন্ধ, ভুলোমনা হলে কী করে হয়।
চাদনী সবার আগে ভাত খেয়ে উঠলো। উঠে হাত ধুতে গেলো বেসিনে। হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধুতে ধুতে ও কিছুক্ষণ বিরবির করে গালি দিলো রাতকে। হঠাৎই ওর চোখ পরলো, আটপৌড়ে শাড়ি পরা একজন সুন্দরী নারী, পর্দার পেছনে লুকিয়ে লুকিয়ে ওঁকে দেখছে। ও তাকাতেই সে ভেতরে চলে গেলো। রাত এলো তখন হাত ধুতে। চাদনী তখন ভেতরে উঁকি মারছে।
-"কী হয়েছে? এভরিথিং ইজ ওঁকে, পিচ্চি?
চাদনী তর্জনী দিয়ে দেখিয়ে বললো
-"ওখানে? ওখানে খুব সুন্দর একটা মানুষ ছিলো।"
-"কে?"
-"আমি কী করে জানবো, আপনার বাড়িতে কে আছে! আর আমি পিচ্চি না।"
নাক মুখ কুঁচকে বললো চাদনী। রোদেলা এহসান আবার এসে, ওঁকে দেখে চলে গেলো। চাদনী তড়িঘড়ি করে বললো
-"ওইতো। চলে গেলো আবার।"
-"ওহহো, শি ইজ মাই এংরি বার্ড।"
-"কে? আপনার বোন?" অন্যমনস্ক হয়ে বললো চাদনী।
-"আমার আম্মু।"
চাদনী বড় বড় চোখ করে তাকালো। বললো
-"সত্যিই? এতো সুন্দরী। বয়স বোঝায় যায় না।আমি তো মনে করেছি আমার চেয়ে একটু বড় হবে, অথচ আপনার আম্মু।
কত্তো কিউট, মাশাআল্লাহ!
-"থ্যাঙ্কিউ।"
-"আপনি আপনার আম্মুর মতো হয়েছেন তাই না?"
-"যেমন?"
-"কিছু নাহ।"
-"আমি আমার আম্মুর সৌন্দর্যের ছিটাফোঁটাও পাইনি।"
-"তেমন না, সৌন্দর্যের পুরোটা পাননি। ছিটাফোঁটা পেয়েছেন।"
রাত হেঁসে দিলো। টেবিল থেকে টিস্যু নিয়ে এগিয়ে দিলো চাদনীর দিকে। চাদনী হাত মুছতে মুছতে বললো
-"থ্যাঙ্কিউ।"
রাত বাঁকা চোখে তাকিয়ে বললো
-"তোমার নাম যেন কী, শ্যামাঙ্গিনী?"
-"আপনার স্মৃতিশক্তি কী কম ভাইয়া? না মানে, একটা সিম্পল নাম মনে রাখতে পারেন না। জনগণের সেবা করবেন কী করে? কার কী অভিযোগ সেটাই তো ভুলে যাবেন।"
-"তোমার নাম মনে রাখা কী, জনগণের সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ? না, তুমি কোনো সেলিব্রিটি?"
চাদনী মুখ ফেরালো। কথা বললো না আর। রাত মনে মনে হাসলো।কিন্তু উপরিউপর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না।
#চলবে#কাজলরেখা
#পর্ব:৪৩(দ্বিতীয়াংশ)
#তানজিনা ইসলাম
রাত আর আকিব শিকদার কথা বলছে।ওরা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছে।কথায় কথায় আকিব শিকদার জানতে পেরেছেন রাত রাজনীতি করে। এবারে ইলেকশন এমপি পদপ্রার্থী তে সে দাঁড়িয়েছে। আকিব শিকদার ওঁকে অনেক শুভকামনা জানিয়েছেন। আবার নিজের ব্যাপারেও অনেক কিছু জানিয়েছেন। নিজের বলতে ওনার শুধু চাদনীই আছে।আল্টিমেটলি তিনি, চাদনীর কথায় বলেছেন। এই যেমন চাদনী অনেক ভালো স্টুডেন্ট। ও ফিজিক্সে হায়েস্ট পেয়েছে। ওনার মেয়ে অনেক ভালো গান করতে পারে।কিন্তু চাদনীর বিয়ের ব্যাপারটা জানানো হলো না। উনি ভুলে যান, চাদনী বিবাহিত। আঁধারকে ওনি নিজের ছেলের মতোই দেখে। আবার দু'জন থাকেও একই বাড়িতে। আগের মতো ঝগড়া, চুলোচুলি করে। স্বামী-স্ত্রীর কোনো লক্ষন নেই ওঁদের মধ্যে। আঁধারের হাতের চাপড় খেয়ে চাদনী অভিযোগ জানাতে আসে ওনাকে। এসবে ওনি বেমালুম ভুলে যান চাদনী বিবাহিত।
চাদনী গালে হাত ঠেকিয়ে দু'জনের কথা শুনছে। ক্ষণকাল পরপর হামি তুলছে৷ মোবারক হোসেনও বসে আছে ওঁদের সাথে। অথচ সে আর চাদনী চুপ। কিন্তু রাত আর আকিব শিকদার দুনিয়ার সব কথা বলে ফেলছেন।
আকিব শিকদার আবারো রোদেলা এহসান কে দেখতে চায়লেন। রাত উঠে গেলো ওনাকে ডাকতে। একটু পর ওনাকে সাথে করে নিয়ে ফিরলো। চাদনী সোজা হয়ে বসলো। ওনিই একটু আগে ওঁকে দেখে পালিয়েছিলো।
রাত নরম কন্ঠে বললো
-"মাম দেখো, রাত্রি খালামনির হাসবেন্ড এসেছে।"
রোদেলা এহসান অবুঝ দৃষ্টিতে তাকালেন। অর্থাৎ তিনি চিনতে পারলেন না। রাত্রির কথা কোনোমতে মনে করতে পারলেও, যাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে তাদের চিনতে পারছে না। রাত ওনাকে সোফায় বসালেন। আকিব শিকদার ডাকলেন
-"আপু..
রোদেলা এহসান চোখ ঘুরিয়ে চাদনীর দিকে তাকালেন। চঞ্চল চোখে দেখলেন ওঁকে। পরক্ষণে অবুঝ চোখে তাকালো রাতের দিকে। রাত মলিন হেঁসে বললো
-"আম্মু এখন কাওকেই চিনতে পারে না।"
-"কেন?"
-"সে গল্প না-হয় অন্য একদিনের জন্য তোলা রইলো।"
-"তাই বলে আমাদের সাথে একটু কথাও বলবে না?"
-"চিনতে পারছে না এজন্য। আম্মু তুমি একটু কথা বলো।"
রোদেলা এহসান কিছুই বললেন না। রাতের হাত ধরে রাখলেন। ওনার অপরিচিত মানুষ দেখলে ভয় লাগে। ওনি শুধু রাত, মোবারক হোসেন, আর বাড়ির সার্ভেন্টদের দেখেই অভ্যস্ত। অন্য মানুষদের সামনে প্যানিক হয়ে পরেন।
রাত চাচ্ছে ওনি যাতে একটু হলেও কথা বলেন। পুরোসো স্মৃতি গুলো একটু হলেও মনে পরে ওনার। না, বাপের বাড়ির কারো সাথে ও ওর মায়ের দেখা করাতে পারবে না। ওর বাপই তো শত্রুপক্ষের মেইন লিড। অন্তত, এ মানুষগুলোকে দেখে হলেও একটু স্বাভাবিক আচরণ করুক। ছোটবেলা থেকে ওনার এই অস্বাভাবিক আচরণ দেখতে দেখতে রাত পাথর হয়ে গেছে।
রাত মুরুব্বির মতো করে বললো
-"রোদেলা এহসান, কথা বলো তুমি ওঁদের সাথে।"
-"আমি কেন ওঁদের সাথে কথা বলবো? আমি ওঁদের চিনতে পারছি না। ওরা কারা?"
রাত আহত দৃষ্টিতে তাকালো। আকিব শিকদার ভ্রু কুঁচকে বললেন
-"রোদেলা এহসান?"
রাত তাকালো ওনার দিকে। ডিভোর্সের পরও ওর মায়ের এ পদবী কেন, আকিব শিকদার সেটা বোঝাতে চায়ছে। রাত বললো
-"এটা আমার পদবী! এহসান বাড়ির সাথে আম্মুর ডিভোর্স হয়েছে, আমার না। আমি চেয়েছি আমার আর আম্মুর পদবী এক থাকুক।"
চাদনী গালে হাত দিয়ে তাকিয়ে থাকলো রোদেলা এহসানের দিকে। কোনদিক দিয়ে ওনাকে রাতের মা লাগে চাদনীর বুঝে আসে না। কি বাচ্চা বাচ্চা একটা মুখ! অনুভূতিহীন দৃষ্টি! আচরণও বাচ্চাদের মতো।
চাদনী অন্যমনস্ক হয়ে হাত উচিয়ে ঘড়িতে সময় দেখে নিলো। ঘড়ির কাটায় পাঁচ টা বেজে ত্রিশ মিনিট। এক্ষুনি মাগরিবের আজান দিবে হয়তো। ও গল্প না করলে আকিব শিকদার আর রাতের গল্প মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো। গল্পের তালে কখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে কেও টেরই পায়নি। বুক ধ্বক করে উঠলো ওর। বাড়ি যেতে যেতে সন্ধ্যার পর হয়ে যাবে। একদিন এ ভুল করেছিলো ও।তারপর, সেদিন আঁধার ওর কি হাশর করেছিলো, ও কী করে ভুলে যাবো! আজও যদি এমন কিছু করে, চাদনী মরে যাবে। সত্যিই ও আর কোনো সুযোগ দেবে না আঁধার কে।
পরক্ষণে, আকিব শিকদারের দিকে তাকাতেই সস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো। আজ তো ওর বাবা আছে ওর সাথে। ও কেন এতো ভয় পাচ্ছে? আজ কেন পানিশমেন্টের ভয় পাচ্ছে ও? হুহ, ও কাওকে ভয় পায় না।
তবুও আকিব শিকদারকে ফিসফিস করে বললো
-"বাবা সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। কখন যাবে? সেই কোন দুপুরে এসেছি। আমাদের যাওয়া উচিত।"
আকিব শিকদার সম্মতি দিলেন। রাতের দিকে তাকিয়ে বললেন
-"তাহলে, আজ আমরা উঠি।অনেক্ষণ থাকলাম।"
-"একি! সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, চা টা অন্তত খেয়ে যান।"
-"নাহ। আর সম্ভব না, এমন খাওয়া খাইয়েছো, স্টিল আমি উঠতে পারছি না। শরীর ভারী হয়ে হয়ে গেছে। চা রাখার আর জায়গা নেই।"
দু'জন একসাথে হেঁসে দিলো।
আকিব শিকদার আর চাদনী যখন বাড়ি থেকে বেরোলেন তখন পূর্ণ চাঁদ উঠে গেছে আকাশে। নিকষ কালো রঙে ছেয়ে গেছে আকাশ।জোৎস্না গলিয়ে পরছে, ইয়ার্ডে, লনে। সে আলো পা মাড়িয়ে দু'জন হাঁটতে থাকে। রাত আর মোবারক হোসেন পিছু পিছু এলেন ওঁদের বিদায় জানাতে। চাঁদের আকারে বোঝা যায়, আজ পূর্ণিমা। রাতের পূর্ণিমা পছন্দ না। ওর চাঁদকেই পছন্দ না টোটালি। সূর্য থেকে আলো ধার করে ওই বস্তু রাতের মহত্ত্ব কমিয়ে দেয়। ব্যাপারটা বড্ড বিরক্তিকর! কিন্তু আজ বিরক্ত লাগলো না কেন যেন! ওর আজ অকারণে খুশি লাগছে। এ খুশির কোনো কারণ নেই। শুধু মনে হচ্ছে হৃদয়ের সব বিষন্নতা কেটে গেছে।
আকিব শিকদার রাত থেকে বিদায় নিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। রাত আবারও ওনাকে আসতে বললো। সাথে জানালো ও খুব একা। এভাবে একজন গল্পের পার্টনার মাঝে মাঝে ওর সাথে গল্প করতে আসলে ভালো লাগবে। আকিব শিকদার ঠিকানা দিয়ে বললেন, ওনি তো একবার এসেই গেছেন। এবার রাতের পালা, ওনাকেও মেহমানদারীর সুযোগ দেওয়া হোক। রাত ঘাড় বাঁকিয়ে সম্মতি জানালো। চাদনী বিদায় না নিয়েই চলে যাচ্ছিলো,রাত পিছু ডেকে বললো
-"পিচ্চি কাজিন!"
চাদনী পিছু ফিরে তাকালো।
-"আবার এসো।"
-"আমি তো কোনো সেলিব্রেটি নই, এসে কী করবো? আপনি সেলিব্রেটি মানুষ, আপনার বাড়িতে একজন সাধারণ মানুষের আসা মানায়।"
রাত হাসলো।
-"আহা! রাগছো কেন? এটাতো তোমার নানুবাড়ি। দেখো, আমরা কাজিন হয়ে গেছি। কাজিন হিসেবে তো রসিকতা করাই যায়।"
-"আপনার সাথে আমার রসিকতা করার সম্পর্ক না।"
-"কাজিনদের সাথে রসিকতার সম্পর্কই হয়!"
-"আপনি কাজিন হিসেবে বড্ড বেমানান। কাজিনরা এতো গম্ভীর, গোমড়ামুখো আর বোরিং হয় না। বাড়িতেও আমার একজন কাজিন আছে। সে তো এমন না।"
রাত কোমল স্বরে বললো
-"সে আর আমি এক না তাই। আমার জীবনে হাসার কোনো কারণ নেই।"
রাত তাকালো চাদনীর দিকে। ওর গায়ে আজও একটা সাদা পাঞ্জাবি। চোখের মণি দু'টো কেমন যেন! ভয়ঙ্কর লাগে চাদনীর! সাথে রহস্যময়ও। এটা নিয়েই তো ওর কিউরিওসিটির শেষ নেই। জোৎস্নার আলো চোখের মণিতে চিকচিক করছে। হঠাৎ চাদনী বললো
-"কৃষ্ণগহ্বরে তো আলো প্রতিফলিত হয় না!"
-"কেন হয় না?"
-"আপনি জানেন না?"
-"না তো। আমি তো সাইন্সের স্টুডেন্ট না। ফিজিক্স নিয়ে ধারণা নাই।তুমিই বলো! তুমি ফিজিক্সে হায়েস্ট মার্ক পেয়েছো।"
-"কৃষ্ণগহ্বরের ঘনত্ব অসীম। সে অসীমতায় সবকিছু বিলিন হয়ে যায়। আপনার চোখে জোৎস্নার আলো চিকচিক করছে কী করে?"
-"কারণ আমার ক্ষেত্রে তা অসীম না, পুরোটাই শূণ্য!"
চাদনী গাড়িতে উঠে বসলো।মুহুর্তেই আকিব শিকদারের গাড়ি গেইট পেরিয়ে চলে গেলো। রাত দাঁড়িয়ে থাকলো গেইটের কাছে, একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলো চলতি গাড়ির পানে। হঠাৎই মাথা নুইয়ে, আচমকা হাসলো। গুণগুণ করে গাইলো
ঝড়ের বেশে, এলো কে সে??
কাজল সে চোখ দুটি
দিলো কঠিন কথার...
বিষণ্ণতার ছুটি!!
মোবারক হোসেন সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকালেন ওর দিকে। নাতির মতিগতি ওনার একটুও ঠিক লাগছে না। রাত একপলক ওনার দিকে তাকিয়ে শিষ বাজাতে বাজাতে চলে গেলো।
,
আঁধারের পুরো দিনটা এতো বিশ্রী কাটলো যে বলার বাইরে।
দুপুরের খাবারের পর ও সোফায় বসে চেয়ে থাকলো সদরদরজার দিকে। দুপুরের খাবার পরপরই চাদনীর চলে আসার কথা। এলো না। আঁধার যতবার ঘড়িতে সময় দেখলো ততবার হতাশ হলো। আশ্চর্য! মানুষ বেড়াতে যায় কেন? ভাত খাওয়ার জন্য। ওটা খেয়ে চলে আসলেই তো হয়। এতো দেরি করার মানে কী? সময় কাটছিলো না বলে, সার্ভেন্ট কে চা বানিয়ে দিতে বললো। হয়তো চায়ের কাপ শূন্য হতে হতে চাদনী চলে আসবে। এলো না। আঁধার আরেককাপ চা চেয়ে নিলো। চুমুক দিয়ে দিয়ে কাউন্টডাউন শুরু করলো। হ্যাঁ, এবার বোধহয় চাদনী আসবে। এ আশা ধরে চা খেতে খেতে কয়কাপ চা যে আঁধার শেষ করলো, ও নিজেও গুণতে পারলো না।
ওর পেটে নির্ঘাত চায়ের পুকুর হয়ে গেছে। ও খুব আজব আজব কল্পনা করেছে পুরোদিন।চাদনীর মামাবাড়িতে, ওর কোনো মামাতো ভাই বা খালাতো ভাই থাকবে সেখানে। এতো পিচ্চি একটা কাজিনকে দেখে তার সাথে আলাপ জমাতে আসবে। সে কাজিন খুব সুন্দর হবে। চাদনী হয়তো প্রথম দেখায় অভিভূত হবে। সেও নিজ তাগিদে যাবে পরিচয় হবে। চাদনী আরো চুল খুলে, চোখে কাজল দিয়েছে। ওর সে কাজিন প্রশংসা করে বলবে, ইশ! কাজলচোখে তো খুব সুন্দর লাগে।চাদনী লজ্জা পাবে, লজ্জায় ওর গালদুটো লাল হয়ে যাবে। আঁধার চাদনীর লজ্জারাঙা মুখ কল্পণা করার চেষ্টা করলো। আরেকটা ছেলের কথায় লজ্জা পাচ্ছে, এটা কল্পণায় আসতেই চাদনীর হাসি খুব বিশ্রী লাগলো আঁধারের কাছে।
তারপর ওদের মধ্যে কথা হবে। আলাপচারিতা হবে। তারপর, তারপর কী হবে? আঁধার আর ভাবতে পারলো না। ডানেবায়ে মাথা নেড়ে ঝেড়ে ফেললো সব চিন্তা। ওর পেটের মধ্যে গুড়গুড় শব্দ হচ্ছে। চা দিয়ে গলা ভেজাচ্ছে বারংবার তারপরও গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। মনটা কূ ডাকছে ভীষণ করে। এতো চিন্তা কেন করছে ও?চাদনী তো একলা যায়নি, আকিব শিকদার আছে ওর সাথে। তবুও আকিব শিকদার তো মেয়েকে কিছুই বলে না। চাদনী কলিজা কেটে দিতে বললে, সত্যিই কেটে খাইয়ে দিবে। ও যদি বলে বাবা আমি সে বা তাদের সাথে গল্প করি।তবুও সে কিছুই বলবে না। কিন্তু কপাল তো পুড়বে আঁধারের।
আঁধার আর বসে থাকতে পারলো না। এতোক্ষণ শুধু পেট গুড়গুড় করছিলো। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বুকের ধুকপুকানিও বেড়েছে। দুই শব্দই আঁধারের কানে এসে বাজছে। বিশ্রী ঠেকছে। আঁধারের ভালো লাগছে না। একটুও শান্তি লাগছে না কোথাও। চাদনী এলেই ওর কান মলে দেবে। কোনো কিছু জিজ্ঞেস করা ব্যাতিত, একটা শব্দ বলা ব্যাতিত। শুধু গেছে এজন্য। ওর উচিত না আঁধারকে ছেড়ে কোথাও যাওয়া, ইভেন ওর নানুবাড়িতে পর্যন্ত না।
বিকেল হতেই আঁধারের পেটের গুড়গুড় শব্দ আরো বেড়ে গেলো।ওরা এখনো আসছে না! কেন আসছে না ওরা? এবার অন্তত ওঁদের ফিরে আসা উচিত। আঁধার কী করবে খুঁজে পেলো না। মোবাইল দেখতে ইচ্ছে করছে না, বাইরেও যেতে বিরক্ত লাগছে। শুধু ভাবছে চাদনী কখন আসবে। আসলেই ওর সব চুল কেটে দেবে ও। শয়তান মেয়ে একটা!
আঁধার কিছু করার না পেয়ে অর্পিতার স্বামীর সাথে দেখা করতে গেলো। জানিয়ে এলো অর্পিতা গতকাল ওর রুমে এসে ওঁকে এসব বলেছে। ওর হাত ধরেছে। সব বিষয় একটু মশলাপাতি মাখিয়ে বলে এলো। ও আবার কুট কাঁচালিদে খুব এক্সপার্ট। পাশের বাড়ির আন্টিকেও হার মানিয়ে দেবে। অর্পিতা যা করেছে যা করেনি, তার তিনগুন বানিয়ে বানিয়ে বলে এলো।
এসময়টা ও বাইরে না গেলে চাদনীকে বিরক্ত করে কাটায়। চাদনী অতিষ্ঠ হয়ে বেলকনিতে গিয়ে বসে, লুকিয়ে লুকিয়ে ছাঁদে চলে যায়। আঁধার ঠিকই খুঁজে নিয়ে, অতিষ্ঠ করে ফেলে ওকে। আজ চাদনী নেই, এদের নাটক দেখতে দেখতে কাটিয়ে দেওয়া যাবে।
আধার এসে চিন্তিত মনে নিজের কক্ষের বিছানায় বসলো। কখন আসবে চাদনী? কখন? আর তো ভালো লাগছে না।
নিচ থেকে অর্পিতার চিল্লাপাল্লার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। এবার ভালো লাগছে। কানের শান্তি। ওর জামাই ধরে ওর গলাটা টিপে দিলেই হয়। আরো শান্তি। শুধু শান্তি আর শান্তি। নিচে চেঁচামেচির আওয়াজ বাড়ছে। অর্পিতার সাথে সাথে, জবা বেগম আর রাফিয়া বেগমের আওয়াজ ভেসে আসছে। নাহ, এইসব সিন মিস করা যাবে না। চাদনীটা থাকলে খুব ভালো হতো। ওর সাথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নাটক দেখতে ভালো লাগতো। এখন তো ও নেই একায় দেখতে হবে, কী আর করার। আঁধার পপকর্ণের একটা প্যাকেট নিয়ে নিলো। সকালে চাদনী এনেছিলো খাওয়ার জন্য। খায়নি, মেয়েটা খেতেও ভুলে যায়। দোতলায় রেলিঙ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে, পপকর্ণ খেতে খেতে ও পুলকিত নয়নে,সবার ঝগড়া দেখলো। আজকে এ ঝগড়ার মীমাংসা হবে না। এ ব্যাপারটা কাল পর্যন্ত গড়াবে। মেঝোমা হয়তো বাড়ি আলাদা করে দিতে বলতে পারেন। বলুক গে, ওর কী? ও চাদনীকে নিয়ে ঢাকায় কেটে পরতে পারলেই বাঁচে। অন্যদের টা দেখার ওর দরকার নেই। চাদনী একা যেতে না চায়লে, আকিব শিকদার ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিয়ে যাবে। তারপর ওর মা'কে। ওর বাবা এখানে থাকুক নিজের আদরের মেঝো ভাই কে নিয়ে।
ঝগড়া দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে আঁধার নিজের কক্ষে গেলো। চাদনীর জন্য অপেক্ষা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে গেলো টেরও পেলো না।
আকিব শিকদার আর চাদনী বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা পার হয়ে গেলো। বাড়ির পরিস্থিতি তখন থমথমে। অর্পিতা কান্না করছে। জবা বেগম চেঁচামেচি করছে। বর্ষা বেগম সারাজীবনই নীরব ভূমিকা পালন করেন বাড়িতে। চাদনী ওনার থেকে শুনতে পেলো, আঁধার কী কী ঘটিয়েছে। এ ঘটনা এতো তাড়াতাড়ি ডিসমিস হবে না, ঘটনা অনেক দূর পর্যন্ত গড়াবে।
চাদনী দ্রুত গেলো আঁধারের সাথে দেখা করতে। ওঁকে একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার জানাতে হবে। আচ্ছা, নেতা সাহেব ওর কাজিন শুনলে আঁধার ভাই কেমন রিয়াকশন দিবে। চাদনীর খুব দেখতে মন চায়লো। আঁধার পরে পরে ঘুমাচ্ছে। চাদনী দ্রুত ডাকতে গেলো। কিন্তু ডাকলো না।আঁধার শ্বাস ফেলে ঘুমোচ্ছে। ও ঘুমালে বাচ্চাদের মতো লাগে। বেবি ফেসটা দেখলে যে কারোরই মায়া লাগবে। চাদনীর মায়া লাগে কি-না ও বোঝে না। আজ সকালেও চাদনী ওর ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে। এখনও এমন করা উচিত হবে না। আঁধার গায়ে কোনো ব্ল্যাঙ্কেট বা শীতের পোষাক দেয়নি। ওদিকে খোলা জানালা দিয়ে হুড়মুড়িয়ে শীত ঢুকছে। শীতকাটা দিয়েছে ওর গায়ে। পরেছে আবার একটা হাফহাতা টিশার্ট আর হাঁটু সমান প্যান্ট। এতো বড় একটা ছেলে এমন হাফপ্যান্ট পরে কেন চাদনীর বুঝে আসে না। চাদনী ব্ল্যাঙ্কেট নিয়ে ওর গায়ে দিলো। আজ ও আরেকটা ব্যাপার খেয়াল করলো।আঁধারের হাঁটু থেকে পা পর্যন্ত, ওর ফেইসের চেয়ে বেশি ফরসা। অথচ আঁধার মুখের জন্য ময়েশ্চারাইজার আর সিরাম মাখতে মাখতে শেষ হয়ে যায়। চাদনীর হিংসে হলো!আঁধারের গায়ের রং ওর ড্রিম। ওঁকে একটু সিরাম ভাগ দিলেও পারে। ওরও তো সুন্দর হতে ইচ্ছে করে। সে দেবে কেন? হিংসুটে একটা। চাদনী অপেক্ষা করলো আঁধারের ঘুম ভাঙার জন্য।
#চলবে