#কাজলরেখা
#পর্ব:৫১(প্রথমাংশ)
#তানজিনা ইসলাম
রাত বুকের সাথে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। উদাস লাগছে ওঁকে। এতোক্ষণ সব গেস্টই একে একে শুভকামনা দিতে এসেছিলো ওঁকে। রাতের কথা বলতেও ইচ্ছে করছিলো না। তবুও ভদ্রতার খাতিরে কথা বলেছে। ও সাদিক এহসানের পাশে দাড়াচ্ছেও না। কথা বলবে তো দূর। কয়েকজন গেস্ট এসে বাবা-ছেলের সাথে একসাথে ছবি তুলতে চায়লো। রাত দাঁড়ালো না ওনার পাশে। ওনি আশেপাশে আসলেই ওর মুখ কালো হয়ে যায়। ব্যাপারটা অনেকে নোটিশ করেছে। ফিসফিস করে আলোচনা করেছে। ফ্যামিলি ফটো তোলার জন্য রেহান অনেকবার রাত কে ডাক তে এসেছে। বাহু ধরে টেনেছে অনেকবার। রাত যায়নি। ও নিজেকে এ ফ্যামিলির কেও মনে করে না। যে পরিবারের মাথা সাদিক এহসান সে পরিবার রাতের না। রাতের পরিবার, ও চট্টগ্রামে ফেলে এসেছে।
চাদনী ওর বন্ধুদের সাথে থাকলেও আঁধার ওর বন্ধুদের সাথে দাঁড়ালো না। ও দূরত্ব মেইনটেইন করলো সবার থেকে। সাথে ওর ঈগল দৃষ্টি তো আছেই রাতের সাথে সবসময়।শাবিহা দৌড়ে এলো আঁধার কে ডাকতে। ওরা বন্ধুরা গ্রুপ ছবি তুলছে। অথচ গ্রুপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মেম্বার আঁধার নেই।আঁধার একপলক ওর দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ স্বরে বললো
-"তোরা তোল। আমার ইচ্ছে করছে না।"
-"সবাই ডাকছে। আয় না।"
-"ভালো লাগছে না। যা তো এখান থেকে।"
শাবিহা বিমর্ষ স্বরে বললো
-"একটা ইন্সিডেন্ট ঘটে গেছে। রিক কে মেরেছিসও তুই। তোর পক্ষ নিয়ে আমি ওঁকে কথাও শুনিয়েছি। আচ্ছা, তোর মন খারাপ তো! আমি ওর পক্ষ থেকে সরি বলছি তোকে। চল, প্লিজ। এখন এতোটা দূরত্ব বেড়ে গেছে যে কোনো অনুষ্ঠান ছাড়া আমাদের দেখাও হয় না। আয়, কয়েকটা ছবি তোল আমার সাথে। তোর বউ রাগ করবে?"
-"চাদনীকে রাগতে দেখেছিস কোনোদিন? ও রাগে না, কষ্ট পায়।"
-"সরি বলেছি না!"
-"তুই কেন বলছিস?"
-"আমার পার্টিতে এসে এমন হলো তাই। রিক কে আমি অনেক ঝেড়েছি। ও কোনো বাজে ইনটেনশনে চাদনীকে জড়িয়ে ধরতে যায়নি। তুই তো জানিস ও কেমন!"
আঁধার ক্ষোভ নিয়ে বললো
-"জানার দরকার নেই তো। ও চাদনীকে কী বলেছে, শুনিসনি তুই। আমার রাগ কমেনি এখনো। ওর থোবড়ার নকশা না পাল্টানো পর্যন্ত আমার শান্তি নেই। এমন বন্ধু বানাস কেন?"
শাবিহা অস্হির দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে। ওর হাত ধরে টানতে চায়লো। আবার চাদনীর দিকে তাকিয়ে থেমে গেলো। চোখ বন্ধ করে নিজেকে শান্ত করে বললো
-"তুই যাবি না তাহলে? ছবি তুলবি না?"
-"নাহ।"
-"আমার এতো সুন্দর দিনটা তুই নষ্ট করে দিবি আঁধার?"
-"আমি নষ্ট করছি? আমি? জাস্ট ছবি না তোলায় তোর সুন্দর দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে?"
-"হ্যাঁ। আমি অনেক প্ল্যান করেছিলাম, তোদের সাথে অনেক ছবি তুলবো। অনেক সুন্দর একটা সময় কাটাবো। কতোটা এক্সাইটেড ছিলাম আমি! তুই আসলে বন্ধুত্ব আর স্বামীর জায়গাটা আলাদাভাবে রাখতেই পারিস না। গুলিয়ে ফেলিস। সবকিছুর জন্য আলাদা আলাদা সময় রাখতে হয় আধার। তুই বাড়িতে চাদনীর হাসবেন্ড, এখানে আমাদের বন্ধু। তুই স্বামীর দায়িত্ব পালন করছিস, কিন্তু বন্ধুত্ব রাখছিস না!"
আঁধার কিছু বললো না। ও অন্যদিকে তাকালো। শাবিহা আবার বললো
-"যাবি?"
আঁধার তাকালো চাদনীর দিকে। ও ওর বন্ধুদের সাথে কথা বলছে মন খুলে।বাকি কোনোদিকে খেয়াল নেই ওর। বন্ধুদের পেলে ও স্বর্গ সুখ পায়। চোখেমুখে খুশিরা উপচে পরে। শাবিহা উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো ওর দিকে। আধারের শাবিহার জন্য খারাপ লাগলো। মেয়েটাতো কিছু করেনি৷ অন্যজনের জন্য ওর খুশি কেন নষ্ট হবে!
-"চল।"
আঁধারের মুখ থেকে শব্দ টা শুনতে না শুনতেই শাবিহা উৎফুল্ল হাসলো।
পুরো পার্টি জুড়ে প্রতি জায়গায় জায়গায় ক্যামেরামেন, প্রেস। পক্ষের লোক, বিপক্ষদলের লোক। সাদিক এহসান প্রেস ব্রিফিং করছেন। ওনি খুব করে চাচ্ছেন রাত একবার ওনার পাশে গিয়ে দাঁড়াক। একবার ওনাকে সাহারা দিক। বাবারা সন্তানদের মাথার৷ উপর বটগাছ হয়ে থাকে। যখন সে সন্তান বড় হয়, যোগ্য হয় বাপদের বয়স বেড়ে যায় তখন সে সন্তানরা হয় বাপের লাঠি। সাদিক এহসান কখনো রাতের মাথার উপরের বটগাছ হতে পারেননি।
কবিতা এহসান আর সাদিক এহসান মাঝখানে দাঁড়িয়েছেন। কে কাটা হবে, রাতের জেতার খুশিতে। ওঁদের দু'জনের পাশে শাবিহা রেহান। রাত ভীড় থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকলো। খুব অপ্রয়োজনীয় একটা মানুষ মনে হলো ওর নিজেকে। খুব আলগা লাগলো এ পার্টিতে। এতো এতো মানুষের ভীড়েও ওর খুব একা মনে হলো নিজেকে। সবাই আছে, তবুও কেও নেই। রাত একা, ওর নিজের মানুষ নেই। সব জায়গায় মিশে যাওয়া মানেই কি সেখানে এক্সিস্ট করা? নাহ। ও মিশতে পারে না মানুষের সাথে। ও এখানে এক্সিস্টও করে না।
রেহান শাবিহা পরপর অনেকবার ডাকতে গেলো ওঁকে। রাত শান্ত কন্ঠে বললো, তোরা যা, আমি যাবো না। সবকিছুতে রাতকে জোরাজোরি করা ওঁরা, আজ আর ওঁকে জোর করতে পারেনি। রাত কখনো ওঁদের মায়ের পাশে দাঁড়াবে না।
ওঁদের মায়ের ছায়াও রাতের জন্য বিষ।
সবাই হৈ-হুল্লোড় করে কেক কাটছে। অথচ যার জন্য এ কেক কাটা, যাকে ঘিরে এতো আয়োজন, সমাদর সে দূরে দাঁড়িয়ে রইলো। রেহান ওর বন্ধুদের কেক না খাইয়ে, কেক হাতে নিয়ে এগিয়ে গেলো রাতের কাছে। রাত কেক খেলো, রেহানকে খাওয়ালো। আর মুচকি হেঁসে জড়িয়ে ধরলো ওঁকে। ওর বিহেভিয়ার রেহানের কাছে ফুল চেঞ্জড হয়ে যায়।
রাতের খুব চোখে বিঁধলো ব্যাপার গুলো। আরেকজনের সুখের সংসার শেষ করে দিয়ে মানুষ কতো সুন্দর হাসতে পারে৷ নিজেদের ভালো লাগা সেলিব্রেট করতে পারে।
রাতকে নিয়ে অনেকেই কানাঘুষা করলো। বাপের সাথে ছেলের ঝামেলা নিয়ে অনেকে জমজমাট আড্ডায় বসলো। চাদনীর খুব খারাপ লাগলো। ও পাল্টা প্রশ্ন করতে পারলো না রেহানকে। রেহান রাতের সৎ ভাই,এটা বুঝতেও বেশি বেগ পেতে হলো না ওঁকে। ওর স্বল্পপরিচিত খালামনি, যে কাওকে চিনতে পারছে না। অথচ তার প্রাক্তন স্বামী এখানে অন্য নারী নিয়ে পার্টি সেলিব্রেট। একটা মানুষকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড় খাঁড় করে দিয়ে, ওরা এখানে উৎসবে মেতেছে। চাদনীর একবার বিষয়গুলো জানতে ইচ্ছে করলো খুব। কিন্তু ওর ইচ্ছে হলো না, রেহান থেকে গিয়ে প্রশ্নগুলো করার। রাতের কাছ থেকে জানতে পারলে ভালো হতো। সে বয়সে বড়। সবকিছুর উত্তর তার কাছেই আছে। রেহান কে বলা হয়নি, রাতের সাথে ওর হুট করে, আত্মীয়তা হয়ে গেছে।নিজের খালামনি না হোক, নিজের খালাতো ভাইও না হোক। তবুও আত্মীয়তা হয়েছে। চাদনী মানতে পারে না ও শিকদার বাড়ির মেয়ে না। কিন্তু রাত তো ওর সাথে কথাই বলবে না। ওই গোমড়ামুখো তো নরমাল কথারই উত্তর দেয় না। অ্যারোগেন্ট একটা!
রেহান ওর বন্ধুদের কেক খাওয়াতে এলো। চাদনী ফট করে বললো
-" রেহান, তোর ভাই খুব লাকি রে,যে তোর মতো একটা ভাই পেয়েছে। তুই নিজের মা-বাবার আগে ভাইয়ের কাছে ছুটে গেলি।"
রেহান স্বাভাবিক গলায় বললো,
-"উহু! লাকি আমি। আমার আবরার ভাইয়ের মতো একটা বড় ভাই আছে।"
-"খুব ভালোবাসিস তাকে তাই না?
-"হয়তো, শাবিহা আপুর চেয়েও বেশি। জানিস, এটা শুনলেই শাবিহা আপু রেগে যায়। অথচ শাবিহা আপুও আমার চেয়ে বেশি তাকে ভালোবাসে। আব্বু, যার কথা শুধু আমাদের বাড়ির সবাই না, এলাকার লোকে পর্যন্ত শোনে, তার কথা শোনে না আপু।কিন্তু আবরার ভাইয়া একবার বললেই রাজি। একবার শাসন করলেই না টা হ্যাঁ হয়ে যাবে।"
-"কিউট তো ব্যাপারটা! তোদের নিজের ভাই না, তবুও তোরা কতো ভালোবাসিস তাকে!"
-"আবরার ভাইয়ার ভালোবাসার সামনে কিছুই না। সে তার ভালোবাসার মানুষদের জীবন দিয়ে ভালোবাসে। তার ভালোবাসার মানুষ খুব অল্প। এ অল্প মানুষ গুলোকে ঘিরেই তার দুনিয়া। যার জন্য সে জীবন দিতে পারে আবার নিতেও পারে। আবরার ভাইয়া যাকে ভালোবাসবে, সে এ দুনিয়ায় সবচেয়ে লাকি পারসন হবে।"
চাদনী কথা বলছিলো। ও জানতেই পারলো না দূর থেকে একটা মানুষ খুব আফসোস নিয়ে দেখছে ওঁকে। চাদনী আসার পর থেকে রাত অনেকবার দেখেছিলো ওঁকে। মেয়েটা কে আজ এতো সুন্দর লাগছে। চোখ ধাঁধানো সুন্দরী বলে যাকে। কে বলে যারা ফর্সা তারা সুন্দর! তারা কখনো চাদনীকে দেখেইনি। তাদের একবার অন্তত চাদনীকে দেখে নিজেদের ধারণা পাল্টানো উচিত। কিন্তু আঁধারের বউ জানার পর রাত ভুল ক্রমেও একবার তাকায়নি চাদনীর দিকে। এখনো যে ও চাদনীর দিকে তাকালো এমন না। ওর দৃষ্টি পরেছিলো চাদনীর নুপুরের দিকে। রূপালি নুপুর পার্টির আলোকসজ্জায় চকচক করছে। রাতের চোখে পরছে খুব।পায়ের দিকে তাকাতে তাকাতে কখন যে ও মুখের দিকে তাকিয়ে ফেললো ও টেরই পেলো। ও আজকে আবার চোখে মোটা করে আইলাইনার দিয়েছে। রাত আইলাইনার আর কাজলের পার্থক্য বোঝে না। দু'টোই তো কালো। কোন টা কী? ও শুধু চেয়ে থাকলো চাদনীর কাজল কালো চোখের দিকে।রাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো
-" আমার দুঃখ অনেক শ্যামাঙ্গিনী। এ দুঃখ বড়ই নগন্য আমার জন্য। তবুও হতাশ লাগছে। এতটা হতাশা আমার হওয়ার কথা ছিলো না।"
চাদনী একটু নির্জনে বসতে গেলো, কর্ণার সাইডে। সবাই হৈ-হুল্লোড় করে ছবি তুলছে। ও পোজ দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে গেছে। চাদনী আশেপাশে তাকিয়ে আঁধার কে খুঁজলো। আঁধার নেই। ওর বন্ধুরাও নেই। সবাই হয়তো ছাঁদের দিকে গেছে। চাদনী ঠোঁট উল্টালো। আঁধার ওঁকে চোখের আড়াল হতে মানা করেছে। এখন তো নিজেই আড়াল হয়ে গেছে।
চাদনী চেয়ারে বসে চঞ্চল দৃষ্টিতে তাকালো আশেফাশে।তখনই রিক এসে বসলো ওর পাশের চেয়ারে। চাদনী চমকে উঠে দাড়ালো। রিক নরম স্বরে তড়িঘড়ি করে বললো
-"বসুন, বসুন। উঠছেন কেন?"
চাদনী বসলো না। ও সে জায়গা থেকে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। রিক থামিয়ে বললো
-"আপু, আমাকে আঁধার পাঠিয়েছে আপনাকে ডাকতে। থামুন একটু।"
আঁধারের নাম শুনে চাদনী তাকালো ওর দিকে। রিক অপরাধবোধে জর্জরিত হয়ে বললো
-"আই এম এক্সট্রিমলি সরি সিস। আঁধার তখন ওভাবে রুড হওয়য়, আমি রিয়্যাক্ট করে ফেলেছি আপনার সাথে। বাট আমার তেমন ইনটেনশন ছিলো না।আমি আঁধারের খুব ক্লোজ ফ্রেন্ড। আমি মন থেকে সরি বলছি আপনাকে। বড় ভাই হিসেবে মাফ করেদিন।"
চাদনী ভ্রু কুঁচকে তাকালো। ওর একটুও মন চায়লো না ছেলেটার সাথে কথা বলতে। তবুও আঁধারের বন্ধু তাই, ভদ্রতার খাতিরে বললো
-"ইট’স ওঁকে।"
-"আপনি কিছু মনে করেননি তো?"
-"করেছি। বাট সেসব তো আপনাকে বলতে পারছি না। "
রিক জোরপূর্বক হাসলো।
-"আঁধার ডাকলো আপনাকে।"
-"কোথায়?"
-"ওরা সবাই ছবি তুলতে গেছে। আপনাকেও ডাকছে। আধারই ডাকতে আসছিলো, আমি ভাবলাম আমি ডাকি। ডাকাও হবে, ক্ষমাও চাওয়া হবে। এজন্য আমব এলাম।"
-"ওহ।"
-"আসুন আমার সাথে।"
-"রেহান কে বলে আসি? ওকে না বলে, ও কোথাও যেতে মানা করেছে আমাকে।"
-"আঁধারই তো ডাকলো। পরে এসে জানাবেন।এখন চলুন। অনেক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে ওরা।"
চাদনী উঠে দাড়ালো। পা বাড়ালো ছেলেটার সাথে। মেয়েটা জানতেও পারলো না ও কতো বড় ভুল করতে যাচ্ছে। যে একটু আগেই তাকে এতো কথা বললো, যে ওর কারণে সকলের সামনে মার খেলো সে রাগ, ক্রোধের বশবর্তী হয়ে তার বেঁচে থাকার কারণটুকুই শেষ করে দিতে পারে।
চাদনী রিকের পিছু পিছু গেলো। বাগান সাইডে সরু একটা গলি। সেদিকটায় গেস্ট নেই বললেই চলে। এটাকে ছোটখাটো বাগানবাড়ি বলা যায়। চাদনীর সন্দেহ জাগলো না। এটা ছবি তোলার জন্য বেস্ট একটা জায়গা।
-"ওরা কোথায়?"
চাদনীর প্রশ্নে রিক বললো
-"সামনে।"
আচমকা রিক থেমে গেলো।চাদনীও থেমে গেলো তার সাথে। প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো
-"এখানে?"
-"হুম।"
-"কোথায় সবাই?"
-"সবাই নেই তো তিন'জন আছে। তুমি সহ চারজন।"
রিক চাদনীর দিকে ফিরে কুটিল হাসলো।রিকের কন্ঠস্বরের আকস্মিক পরিবর্তন স্পষ্ট বুঝতে পারলো চাদনী। হুট করেই ভয়েরা ঘিরে ধরলো ওঁকে। আপনি থেকে তুমিতে নেমেছে রিক। চাদনী পিছু ফিরে দেখলো, যে ফটক দিয়ে ওরা এসেছিলো, সে মূল ফটক বন্ধ। এটা কখন বন্ধ হলো? চাদনী তো একবারো ফটক বন্ধ হওয়ার আওয়াজ পায়নি। কারো পাযের শব্দও শোনেনি। চাদনীে সকল সাহস কর্পূরের মতো উড়ে গেলো। মুহুর্তেই খুব ভীত হয়ে পরলো ও।কন্ঠ যথেষ্ট শক্ত রাখার চেষ্টা করে বুঝলো ওর গলা দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছে না। কোনোমতে কাপা গলায় বললো
-"ভাইয়া। ওরা কোথায়?"
-"নেই। কেউ নেই এখানে। শুধু আমি, তুমি আর দু'জন। আসো তোমাকে ওঁদের সাথে পরিচয় করাই।"
রিক, চাদনীর হাতের কব্জি শক্ত করে ধরলো। শক্ত হাতের বাঁধনে ব্যাথায় ব্যাথাতুর শব্দ করলো চাদনী। রিক হাত ধরে টানলো ওঁকে। চাদনীর কোটর অশ্রুতে পূর্ণ হলো নিমিষেই। ও শুধু ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখলো, রিক ওঁকে কোথাও টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। চাদনী পায়ে শক্তি পায়। রোধ হয়ে যাওয়া কন্ঠে চেচায় সাহায্যের জন্য। রিক ওর চিৎকার শুনে অট্টহাসে। শ্লেষাত্মক কন্ঠে বলে
-"পুরো ঘরটায় সাউন্ড প্রুফ। তোমার চিৎকার বাইরে যাবে না।"
রাগে-দুঃখে-অসহায়ত্বে কান্না করে দিলো চাদনী। সর্বশক্তি দিয়ে ছাড়াতে চায়লো রিকের হাত। আঁধার ভাই কোথায়? কোথায় সে? সে জানে না চাদনী বিপদে পরেছে! ওঁকে কেন বাঁচাতে আসছে না। ইশ! চাদনী এতোটা বোকামো কি করে, করে ফেললো। আঁধার এমনি এমনি ওঁকে বোকা মেয়ে বলে না।
#চলবে#কাজলরেখা
#পর্ব:৫১(দ্বিতীয়াংশ)
#তানজিনা ইসলাম
-"রেহান, চাঁদনী কই?"
রেহান নিজেও চাদনীকে খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে যাচ্ছিলো। পইপই করে বলেছিলো ও মেয়েটাকে ওঁকে না জানিয়ে কোথাও যাতে না যায়। পার্টিতে হাজার রকমের, হাজার মেন্টালিটির মানুষ এসেছে। চাদনী এমনিতেই ভিতু, একটা হাত ধরা ছাড়া একা চলতে পারে না। এখন কোথায় গায়েব হয়ে গেছে এ মেয়েটা। আঁধারের প্রশ্নে রেহান তাকালো ওর দিকে। মুখ কালো করে বললো
-"তোমার সাথেই না দেখা করতে গেলো, ভাই!"
আঁধার কপালে ভাজ ফেলে বললো
-"কই না তো। আমার সাথে তো দেখা করতে আসেনি। আর ও আমাকে পাবে কই? আমি তো ছাঁদে ছিলাম। আমি তো ভাবলাম তোমার সাথে আছে।"
-"আমি যে খবর পেলাম তোমার সাথে দেখা করতে গেছে।"
-"কোত্থেকে খবর পেয়েছো?"
রেহান চিন্তায় পরলো। কোত্থেকে খবর পেয়েছে ওর মনে নেই। কেক খাওয়া, ছবি তোলার ব্যস্ত সময়ে একটা উড়ো খবর এসেছিলো চাদনী আঁধার ভাইয়ের সাথে দেখা করতে গেছে। রেহান তখন অতোটা পাত্তা দেয়নি।রেহান ভেবেছিলো চাদনী আঁধারের সাথে আছে, আঁধার ভেবেছিলো চাদনী ওর বন্ধুদের সাথে আছে। আল্টিমেটলি চাদনী কোথাও নেই। রেহানের বুকে টান পরলো। আধার
রেহানকে বলেছিলো, চাদনীকে দেখে রাখতে। একটু আগে চাদনী ওর বন্ধুদের সাথেই ছিলো।হুট করেই কোথায় গায়েব হয়ে গেলো। ওর উপেক্ষার জন্যই হলো এটা। বিগত দশমিনিটে রেহান ওঁদের পুরো বাড়ি চসে ফেলেছে। ওর বন্ধুরাও লন, পার্টির এরিয়া, গার্ডেন সব জায়গায় তন্যতন্য করে খুঁজেছে চাদনীকে। পায়নি। শেষে সুক্ষ আশা ছিলো চাদনী হয়তো আঁধারের সাথে ছাদে আছে। ছাদেই যাচ্ছিলো ও। আঁধার নিজেই নেমে এসে জিজ্ঞেস করলো ওর থেকে চাদনীর কথা।
,
কক্ষের দরজা খুলতেই চাদনী দেখলো দু'জন পুরুষ দাঁড়িয়ে। চাদনী এদের চেনে না, কিন্তু পার্টিতে রিকের সাথেই দেখেছিলো। ও ঝাপ্সা চোখে যতটুকু ঠাওর করতে পারলো, ওরা দু'জনের মুখেই খুব পৈশাচিক হাসি লেপ্টে ছিলো। দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো ওরা মদ্যপ প্রায়ই। চাদনীর শরীর ক আতঙ্কে কাপছিলো।চাদনী দুর্বল!শারীরিক ভাবে, মানসিকভাবে কোনোদিক দিয়েই ও স্ট্রং না। তারউপর মাঝে মাঝে এতো বোকামি করে।রিকের দু'জন সহযোগী।
ওরা কাছে আসতেই চাদনীর শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো। ভয়ে, আতঙ্কে শরীর টলছিলো তো বহু আগে থেকেই। ও হাত ছাড়াতে চায়লো। রিকের পুরুষালি হাতে সাথে পারলো না। এতো শক্ত করে ধরেছে যে, মনে হচ্ছে কব্জি থেকে খুলে যাবে হাত। ওরা দু'জন দু'দিক থেকে চাদনীর হাত চেপে ধরলো বেডের সাথে।এতোটা শক্ত করে ধরলো যে, চাদনীর মনে হলো ওর চিকন চিকন হাড় গুলো ভেঙে যাবে, এক্ষুণি আত্মা বেরিয়ে যাবে। বেশ তাই হোক। ও এ কলঙ্কিত মুখ তো আঁধার কে দেখাতে পারবে না। না,ও এ কলঙ্ক বয়ে বেরাতে পারবে। এ সমাজ ওঁকে কথার বানে মারার আগে, এরাই না-হয় মেরে ফেলুক। আঁধার কোথায়? কোথায় সে? সে খুঁজছে না চাদনীকে? মানা করেছিলো না চোখের আড়াল হতে। হলো তো চাদনী। এখন সে আসছে না কেন, ওঁকে খুঁজতে খুঁজতে।
নিজের সহল অসহায়ত্ব নিয়ে কাদলো চাদনী। ভয়ে বুক কাঁপছে ওর।মস্তিষ্কের প্রতিটি শিরা দপদপিয়ে জানান দিচ্ছে খুব শীঘ্রই ওর চরিত্রে কালি ছোঁড়া হবে।সেই সাথে কল্পনায় আসছে, গ্রামের মানুষগুলোর ওঁর চরিত্রে কাঁদা ছোড়ার দৃশ্য।চেয়েও মনের মধ্যে সাহস সঞ্চার করে রাখতে পারছে না চাদনী।মেয়েদের সবচেয়ে দামী জিনিস তাদের ইজ্জত-সম্মান। সেটাই যখন আহূতি হয় তখন বেঁচে থাকার আর কোনো কারণ থাকে না।
ওর কান্না দেখে পৈশাচিক আনন্দ পেলো রিক। গায়ে থেকে সাদা রঙের সিল্কের ওড়না ছিনিয়ে নিলো একপ্রকার। চাদনীর হাত দু'টো খাটের পাটাতনের সাথে শক্ত করে বেধে অট্টহাসলো।
পরক্ষণেই গম্ভীর হয়ে সুধালো
-"ডোন্ট ক্রাই। আমার কথা শুনলেই তেমন একটা ক্ষতি হবে না তোমার। আমরা একটা ডিসকাশনে আসতে পারি।
-"আঁধার ভাই ছাড়বে না আপনাদের। আমাকে এখানে এনে ঠিক করলেন না আপনারা। এর মাশুল আপনাদের দিতেই হবে। আমার ক্ষতি করে আপনারা পার পাবেন না।"
চাদনীর কণ্ঠ ভেজা।অসম্ভব ভয়ে আর ক্রোধে মেশানো। ছেলেগুলো কোনো উত্তর দিল না। চাদনী হাত পা ছোটাতে চায়লো। হাত ওড়নার বাঁধনে বাধা। পা দু'টো ছেলে দু'টো ধরে রেখেছে।চাদনী সাবধান বাণী দিলো ওঁদের। আঁধার শেষ করে ফেলবে ওদেরকে। ছাই বানিয়ে দেবে। এতো বড় ভুল ওরা যাতে না করে। ওঁকে মেরে ওরা নিজেরা বাঁচবে না। চাদনী নিজে শেষ হলে, আধার ওদেরও নিঃশেষ করে দেবে।
কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করার পর চাদনী ক্লান্ত হয়ে মাথা নামিয়ে নিল। চাদনীর অবস্থা দেখে গা কাঁপিয়ে হাঁসলো ওরা।সেই বিকট শব্দ গুমোট পরিবেশ আরো ভুতুড়ে করে তুললো।ভেজা হতভম্ব হয়ে তাকালো চাদনী।এভাবে উন্মাদের মতো হাসার কারণ ঠিক ঠাওর করতে পারলো না।
-"ডিসকাশন টা শোনো।" রিকের কন্ঠ বাতাসের সাথে ভেসে এলো। চাদনী ভেজা চোখে তাকালো।
-"আঁধার কে ছেড়ে দাও। ও শাবিহার।তোমার না। উড়ে এসে জুড়ে বসেছো কেন তুমি, হ্যাঁ? এতোটুকুনি একটা মেয়ে, আমার বন্ধুর সংসার কেঁড়ে নিয়েছো। অন্যের সংসার করছো। অন্যের ভালোবাসার মানুষকে কেঁড়ে নিয়েছো। তারপরও এতো বড় বড় কথা কি করে বলো?"
-"আমি কিচ্ছু কাড়িনি। কারো কোনো জিনিস নিই নি আমি। আমি নিজ থেকে আসিওনি। আমাকে আনা হয়েছে। যদি আঁধার ভাই শাবিহা আপুকে এতোই ভালোবাসতো তাহলে আমাকে কেন বিয়ে করলো?" চাদনী সাহস সঞ্চার করে বললো। ওর স্বর মৃদু। চেঁচাতে চেঁচাতে গলা বসে গেছে। মনে হচ্ছে, গলা ফেটে রক্ত বেরোবে। তবুও কী কারো কানেই ওর চেঁচানোর শব্দ পৌঁছাচ্ছে না!
-"আঁধার কে ছাড়বা? হ্যাঁ না-কি না?"
-"আমি কে হই তাকে ছাড়ার? আমার জীবনের সব সিদ্ধান্ত সে নেয়। সে না চায়লে, আমি তাকে ছাড়তে পারবো না।"
-"তাহলে এমন কিছু করি, যাতে সে নিজেই তোমাকে ছেড়ে দেয়। তোমার নিজের কষ্ট করে ওঁকে ছাড়তে না হয়, কী বলো?"
কথার মর্মার্থ বুঝতে পেরে ঘৃণায় মুখ ঘোরালো চাদনী।অট্ট হাসলো রিক।ঠোঁট গোল করে, তাচ্ছিল্য করে বললো
-"ছুরত না থাকলেও, জিদ কিন্তু ষোলো আনা।আমাদের রাতটা খারাপ যাবে না কী বলো!
রিক ঝুঁকলো ওর কাছে।চাদনীর চিবুক ধরলো আলতো করে।শিষ বাজিয়ে বললো
-"বি প্রিপেয়ার্ড বেবি! তোমার রাতটা আজ খুব সুন্দর কাটবে। চিন্তা করো না, তোমার আঁধার বেপ্পি তোমার অবস্থা দেখে, এমনিতেই তোমাকে ছেড়ে দেবে। তোমার চেয়ে বেশি আমরা তাকে চিনি। নিজে বারো হ্যান্ডেড হলেও, তার ইনটেক জিনিসপত্র লাগে। চু চু চু!"
রিক ঠোঁট গোল করে আফসোস করলো।
চাদনীর চোখ বেয়ে টুপ করে অশ্রু গড়ালো।ঠোঁট কাঁপছে ওর।কান্না আটকানোর বৃথা চেষ্টা করছে। ও কোনো মতে ঠোঁট নাড়িয়ে বললো
-"মেরে ফেলেন এর চেয়ে।আমি মরে গেলেই শাবিহা আপু আঁধার ভাইকে পেয়ে যাবে।"
-"নাহ, রিক দু'পাশে মাথা নাড়লো। খুব শান্ত কন্ঠে বললো
-"মৃত্যু খুব সহজ শাস্তি হবে তোমার জন্য। আমার বন্ধু একটা বছর কষ্ট পেয়েছে। সে কষ্টের মাশুল তুলবো না। সে একবছর কষ্ট পেলে, তোমাকে এক শতাব্দী কষ্ট পেতে, তবেই না প্রতিশোধ পূর্ণ হবে। তোমার জামাইয়ের প্রতিশোধ যে তোমার থেকে তুলতে হবে।
,
চাদনীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, এ খবরটা রাতের কানে এলো তখন যখন কথাটা সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পরলো। একটা মেয়ে রাত বিরেতে একটা জাঁকজমকপূর্ণ পার্টি থেকে উধাও হয়ে গেলো। এটা আসলে বিশ্বাস করার মতো কোনো ঘটনা না। পুরো এরিয়া জুড়ে সিসিটিভি ফুটেজ। কার এতো সাহস হলো যে এতো গিজগিজ করা মানুষের মধ্যে থেকে একটা মানুষকে নিয়ে যাবে।
রাতের বুক ধ্বক করে উঠলো। এই জায়গাটা ভালো না। এখানে অভিশাপ আছে। ওর পুরো ছোটবেলা শেষ করে দিয়েছে। ওর মায়ের সংসার ভেঙে দিয়েছে। ওঁকে সারাজীবনের জন্য একা করে দিয়েছে। ইশ! মেয়েটাকে ও অনেক্ষণ ধরে খুঁজ ছিলো। অনেক খুজেও যখন চোখে পরলো না তখন ভেবে নিয়েছিলো হয়তো তার স্বামীর সাথে আছে। অন্যের বউকে এতো উদগ্রীব হয়ে খোঁজা ঠিক না। শ্যামাঙ্গিনী, ও ঠিক আছে তো!
,
চোখের কোণা বেয়ে নোনাজল গড়াচ্ছিলো চাদনীর। হাত পা অসাড় হয়ে আসছে।মনের যন্ত্রণার সাথে শরীরের যন্ত্রণা কাহিল করে দিচ্ছে ওঁকে। তিনটা জানোয়ার চেপে ধরেছে ওঁকে। প্রস্তুতি নিচ্ছে ওঁকে ভেঙে দেওয়ার জন্য। এক্ষুণি শেষ করে দেবে ওঁকে। ও মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত তবে কলঙ্কের জন্য না। চাদনী মনে মনে দোয়া পরছে। কিছু একটা হোক। আঁধার আসুক। বাঁচাক ওকে। কেও তো আসুক। ওর বাবার মুখটা খুব মনে পরছে ওর। চট্টগ্রাম থেকে আমার সময় একবার মানুষটার সাথে ভালো করে কথা পর্যন্ত বলেনি ও। চাদনী তো একবার শেষ সুযোগও পাবে না তার সাথে কথা বলার জন্য। ও নিজের কলঙ্কিত মুখ না আঁধার কে দেখাতে পারবে, না ওর বাবাকে। হঠাৎই বাইরে কিছু গন্ডগোলের শব্দ আসলো এই ধারে! চাদনী মাথা তুলে তাকানোর শক্তি পেলো না। ও ভয়ে জ্ঞান হারালো।নিজের শেষ হওয়ার দৃশ্য ওর নিজের দেখার শক্তি নেই। বাইরে থেকে চিৎকার-চেচামেচির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। দপদপিয়ে দৌড়ানোর শব্দও ঠাওর করা যাচ্ছে। বুটের শব্দ এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। রিক আর ওর সহযোগিরা তাকালো। ঢোক গিলে, একে অপরকে দেখলো। এখনো তো কিছু করতেই পারলো না ওরা, তার আগেই ধরা পরে যাবে!
আচমকাই কাঠের দরজাটা ধুম করে ভেঙে গেলো।হকচকিয়ে সামনে চাইলো ওরা। প্রথমেই রাতের চিন্তিত, রাগান্বিত মুখ দৃশ্যমান হলো।পরপর আঁধার, শাবিহা দৌড়ে এলো। আঁধার থেমে গেলো দরজায়। পা চালিয়ে ভেতরে আসতে পারলো না। পেছনে প্রেসের লোকজন, কয়েকজন জার্নালিস্ট। তাঁদের হাতে ডিজিটাল ক্যামেরা। সাথে পার্টির অনেকজন এসেছে।
রিক দ্রুত পায়ের নামলো বিছানা ছেড়ে। আঁধারের দিকে আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। পরক্ষণে ইনোসেন্ট মুখ করে আঁধারকে বুঝ দিতে চায়লো,
-"ভাই, ও ডেকেছিলো আমাদের।"
আধার একপলক রিকের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি ফেরালো, চাদনীর দিকে। ওর পা দু'টো ছেড়ে দিয়েছে ছেলে দু'টো। কিন্তু ওর নাজুক অবস্থা। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পরে আছে মুখের উপর। গায়ের কাপড় ঠিকঠাক নেই। গাউনের অনেক জায়গায় টানাহেঁচড়ার ফলে ছিড়ে গেছে। শরীরের অনেক জায়গা আঁচড় খামছির দাগ। শ্বাসের গতি ধীর। বহু কষ্টে শ্বাস ফেলছে, বুকের উপরের চামড়ার ওঠা নামা দেখেই বোঝা যায় তা। মেয়েটার চোখ দুটো বন্ধ। কিন্তু জ্ঞান হারায়নি পুরোপুরি। আঁধার ঢোক গিললো, ও কিছুক্ষণ নড়তে পারলো না। ওর অবশ মনে হলো নিজেকে।
ওঁকে সরিয়ে দিয়ে রাত ভেতরে প্রবেশ করলো। চাদনীর দিকে বেশিক্ষণ তাকালো না। চোখ ফিরিয়ে নিজের গায়ের কোর্টটা দিয়ে ঢেকে দিলো চাদনীকে। গলার স্বর উঁচিয়ে বললো
-"সুহাশ, সবাইকে নিয়ে যাও এখান থেকে। এখানকার কোনো ভিডিও বা ছবি যাতে কারো ক্যামেরায় না থাকে।"
সুহাশ আর দলের কয়েকজন সে ব্যাপারটা সামাল দিলো। শাবিহা ভয়ে মুখে হাত চাপলো। রিক এসব করবে, কখনো ওর ভাবনাতেও আসেনি। ওর মনে হয়েছিলো রিক চাদনীকে ভয় দেখাবে। আঁধারের জীবন থেকে চলে যেতে বলবে। বা গুম করে দেবে। সেটাই করতো। দরকার হলে মেরে ফেলতো। এখন যে ধরাটা খেলো। এর ব্লেইম তো শাবিহার উপরও আসবে।
ও আঁধারের হাত ধরতে গেলো। তার আগেই আঁধার তেড়েফুঁড়ে গেলো রিকের কাছে। কলার ধরে মুখ বরাবর সর্বশক্তি দিয়ে ঘুষি বসালো। এতোটাই জোরে মারলো যে এক ঘুষিতেই নাক দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো ওর। রিক উল্টে পরতে পরতে সামলালো।। নাকে হাত চেপে বেজে বেজে বললো
-"শাবিহা থেকে জিজ্ঞেস কর, মেয়েটা ডেকেছে আমাদের। নয়তো আমাদের লেভেল এতো নিচুও না।"
আঁধারের কানে একটা শব্দও প্রবেশ করলো না। ওর রাগে হাত পা কাঁপছে। ও আরেকটা ঘুষি বসালো রিকের মুখ বরাবর। এবারে রিক নিজের তাল রাখতে পারলো না, পরে গেলো মেঝেতে। আঁধার ওর গায়ের উপর চড়ে বসলো।
গলার উপর হাটু দিয়ে পাড়া দিয়ে, চোখের পাপড়ি টেনে ছিড়ে ফেললো। রাত টেনে আনলো ওঁকে। আঁধার আবারো তেড়েফুঁড়ে যেতে চায়লো ওর কাছে। কাপছিলো ও। মুখ দিয়ে একটা রাগান্বিত শব্দ পর্যন্ত বের করতে পারছিলো না।
রাত ওর শার্ট আকড়ে ধরে গম্ভীর স্বরে বললো
-"ওঁকে মারার চেয়েও এখন বেশি জরুরি চাদনীকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া।"
আঁধার থামলো ঠিকই, কিন্তু ছেড়ে দিলো না রিককে। রাতের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে, সর্বশক্তি দিয়ে লাথি বসালো রিকের শরীরে। রিক চেঁচিয়ে উঠলো।
চাদনী ভয়ে জ্ঞান হারিয়েছে। তেমন ক্ষতি হয়নি ওর। শুধু টানা হেচড়ায় শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছিড়ে গেছে। অনেক জায়গা নখের দাগ বসে, রক্ত গড়িয়ে পরছে সেখান থেকে। আঁধারের চোখে খুব বিধলো ব্যাপারগুলো। ওর ইচ্ছা করলো রিকের শরীর থেকে চামড়া টেনে টেনে খুলতে। মেয়েটার উপর কারো ছায়াও সহ্য হয় না ওর।সেখানে রিক ছুঁয়েছে ওকে, আঁচড়ের দাগ বসিয়েছে। রাতের কোর্টটা দিয়ে চাদনীকে পেঁচিয়ে নিজের কাছে আনলো আঁধার। গালে হাত দিয়ে, ভাঙা গলায় ডাকলো
-"চাঁদ। এই, চোখ খোল।এসে গেছি আমি। এতো বোকা কেনো রে তুই? একটু বুদ্ধি খাটালে কি হয়! আমার আসতে আরেকটু দেরি হলে কি অঘটন হতো বলতো!"
চাদনী উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। আঁধার
চাদনীকে পাঁজা কোলে তুললো। হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলো কক্ষ ছেড়ে। শাবিহা দেয়ালের সাথে শিটিয়ে ছিলো। আঁধারের ওই দৃষ্টিতেই খুন হয়ে যাচ্ছিলো বারবার৷ আঁধার ওর ঘৃণার মানুষগুলো ছাড়া কখনো কারো দিকে ওভাবে তাকায় না। রাত খুব শান্ত দৃষ্টিতে দেখলো শাবিহাকে। শাবিহা তুতলে বললো
-"ভাইয়া,,
রাত খুব স্বাভাবিক কন্ঠে বললো
-"সবাইকে নিয়ে বাইরে যাহ।"
ওর এ স্বাভাবিক কন্ঠই অস্বাভাবিক। ঝড়ের পূর্বাভাস৷ শাবিহা ক্ষতিটা কার করলো, চাদনীর, না ওর নিজের? এখন ও এতোদিকে সামাল দেবে কি করে!
রিক মেঝেতে পরে কোকাচ্ছে। আঁধার ওর দুচোখের পাপড়ি টেনে টেনে ছিঁড়েছে। ওর অন্ড*কোষ বরাবর ব্যুট জুতো দিয়ে সজোরে লাথি বসিয়েছে। ও উঠে দাঁড়াতে পারছে না।
রাত আগুন দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে। এমন ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলো ও খুব ছোটোবেলায়। ওর নিজের মায়ের সাথে এমন একটা ঘৃণ্য ঘটনা ঘটেছিলো। রাত সে ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলো, আজ এ ঘটনারও হলো। সে দিন পুরো রাত কেঁদে ছিলো রাত।ওর মায়ের সুন্দর, ইনোসেন্ট মুখটা বারবার চোখের সামনে ভাসছিলো! ওর মায়ের ক্ষত, কষ্ট সেসব নিয়ে দুঃখ তো ছিলোই তার চেয়েও বড় দুঃখ ছিলো ওর বাবার প্রতি ওর মায়ের ভক্তি,ভালোবাসা সব। যা ভেতরে ভেতরে শেষ করে দিচ্ছিলো রাতকে।কেন তার মা এমন একটা মানুষকে ভালোবাসতে গেলো, যার তার সম্মান নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যাথা ছিলো না!
ওর বাবা সময়ের পরিক্রমায় অতো কাছের মানুষটাকেও ভুলে গিয়েছিলাে।এমনই হয়! আমরা ভুলে যাই!স্মৃতির উপর ধুলাবালি জমে যায়।দু'দিন আফসোস করি হয়তো, তারপর আবার নিজেদের নিত্য জীবনে ফিরে যায়।তবে যার হারায়! সেই জানে প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণা!সেই মনে রাখে, প্রতিনিয়ত কষ্টে তড়পায়! রাত তড়পে গেলো। বিশটা বছর ও কষ্টে, যন্ত্রণায় তড়পালো। ওর বাবার কিচ্ছু হলো না। সে আরেকজন নারীকে নিয়ে ঠিকই সুখের সংসার সাজালো। চাদনীর সাথে কেন এমন একটা ঘটনা ঘটে গেলো আজ! কেন এমন হলো? শিট! শিট! এটা হওয়া উচিত হয়নি। চাদনী ট্রমাটাইজ হয়ে গেলো। এখন ও তড়পাবে। রাতের মতো। আঁধার ওঁকে বুঝবে তো না! না, ওর বাবার মতো ভুল বুঝবে? বিশবছর আগে ও ওর বাবাকে ছেড়ে দিলেও, এ বারে ও আঁধার কে ছাড়বে না। আঁধার কে চাদনীর সিচুয়েশন বুঝতেই হবে। ও চাদনীকে ছাড়তে পারবে না। কক্ষণো না।
#চলবে