ফন্ট সাইজ:
থিম:
কাজলরেখা (১ম খন্ড)

৫৭তম পর্ব

লেখক: তানজিনা ইসলাম স্রোতস্বিনী

#কাজলরেখা

#পর্ব:৫৭(প্রথমাংশ)

#তানজিনা ইসলাম

আজ ফার্স্ট ইয়ারের শেষ ক্লাস। দেখতে দেখতে একটা বছর চোখের পলকে চলে গেলো।চাঁদনী অনেকদিন কলেজে আসেনি। লম্বা একটা গ্যাপ পরে গেছে ওর৷ তবে বাড়িতে বসে, ফাইনালের জন্য ভালোই প্রিপারেশন নিয়েছে ও। তটিনী ওঁকে পড়াশোনার পাশাপাশি সব রকমের হেল্প করেছে। নিজের বড় বোনের মতো। চাঁদনীর আজও কলেজে আসার কথা ছিলো না। ভেবেছিলো, একেবারে এক্সাম দিতে আসবে। গ্যাপ পরার কারণে প্রিন্সিপালকে অ্যাপ্লিকেশন তো দিতেই হবে। আর একদিন এসে কী করবে ও! এমনিতেও আঁধার কলেজে এসে সব সামলে নেয়। ওঁকে এসব নিয়ে ভাবতে হয় না। কিন্তু হাসনার কল পেয়ে চলে এসেছে ও। ফার্স্ট শেষ ক্লাস। সেকেন্ড ইয়ারে উঠলে, ক্লাস চেঞ্জ হয়ে যাবে। ওঁদের এতো এতো স্মৃতি। শেষদিন এসে সেলিব্রেট না করলে, কেমন করে হয়। চাঁদনী চলে এসেছে কল পেয়েই। এই তো সেদিন মনে হয়, চাঁদনী ওঁদের সাথে পরিচিত হয়েছিলো। একটা বছর কাটিয়েও ফেললো। এই চারজনই আছে ওর। বাকিদের সাথে ভদ্রতার খাতিরেও কখনো কথা হতো না ওর। যেহেতু এটা শেষ ক্লাস, বেশিরভাগ স্টুডেন্টই উপস্থিত হয়েছে। ক্লাসের সব বেঞ্চ ভর্তি স্টুডেন্ট, গিজগিজ করছে। সচারাচর এতো এটেন্ডেন্স দেখা যায় না। রেহান চাঁদনীর সাথে তেমন একটা কথা বলছে না। কেমন যেনো এড়িয়ে চলছে ওঁকে। চাঁদনী মন খারাপ করে অনেকবার জিজ্ঞেসও করতে চেয়েছিলো, ছেলেটা এমন কেনো করছে ওর সাথে! অথচ ওদের বন্ধুমহলের সবচেয়ে উৎফুল্ল ছেলেটা রেহান। চাঁদনীর সাথে কথা বলতে দৌড়ে দৌড়ে আসে। চাঁদনী আসলে, যেমন ভাবছিলো ব্যাপারটা তেমন না। রেহানের লজ্জা লাগছিলো, ওর সাথে কথা বলতে। চাঁদনী জানেনা, কিন্তু রেহান তো জানে শাবিহা কি করেছে! প্রমাণ নেই, কিন্তু ওই যে কাজটা করেছে সেটা রেহান জানে। যার বড় বোনের জন্য চাঁদনী এতোবড় একটা ক্ষতির হাত থেকে বেঁচেছে, তার সাথে কী করে কথা বলবে চাঁদনী! স্বাভাবিক ব্যবহারটা কেনো যেন ভেতর থেকে আসছে না।

চাঁদনী অন্যমনস্ক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো, শহিদ মিনারের সামনে। ওঁদের ছুটি হয়ে গেছে একটু আগেই৷ রেহান আর সিয়াম ওঁদের রেখে চলে গেছে। বৃষ্টি আর হাসনা ক্লাসে গেছে, কোনো একটা কাজে। চাঁদনী যায় নি। ওর আর সিড়ি বইতে ইচ্ছা করছে না। আজকের দিনটায় অনেক দৌড়াদৌড়ি হয়ে গেছে। শক্তি নেই আর।

-"হেই।" চমকে তাকালো চাঁদনী। তটিনী এসেছে। হাসছে ওর দিকে তাকিয়ে। তটিনী কে দেখেই ঠোঁটের হাসি বিস্তৃত হলো ওর। উৎফুল্ল হয়ে ডাকলো

-"আপু। তুমি এখানে?"

-"তোমার সাথে দেখা করতে এসেছি। তোমার তো আজকে শেষ ক্লাস।"

-"হ্যাঁ।"

-"দেখো, শাবিহাও এসেছে দেখা করতে তোমার সাথে।"

শাবিহা পিছু পিছু হেঁটে এলো। চাঁদনীর ঠোঁটের হাসি মিইয়ে গেলো। শাবিহাকে ওর ভয় লাগে। কেমন যেনো মেয়েটা! ওর মনে হয়, চুপচাপ মানুষরা নিজেদের মধ্যে অনেককিছু লুকিয়ে রাখে। শাবিহা হেঁসে বললো

-"অবাক হলে, মনে হচ্ছে।কেমন আছো? তোমাকে সেদিন দেখতে যেতে পারিনি। আজ দেখতে এসেছি।"

-"ভালো আপু।" নরম স্বরে উত্তর করলো চাঁদনী।

-"একটু অবাক হয়েছি। আপনি রেহানকে নিতে এসেছেন? ও তো সিয়ামের সাথে চলে গেছে।"

-"নাহ। রেহানকে নিতে আসিনি। আমার কাজ তোমার সাথে। ওর সাথে কিছু নাই।কিছু টিপস নিবো তোমার থেকে, তারপর চলে যাবো।"

চাঁদনী কপালে ভাজ ফেললো।বললো

-"কীসের টিপস!"

-"আগে বলো, এতোটা শুকিয়ে গেছো কেনো? আঁধার যত্ন নেয় না?"

চাঁদনী অবাক হলো ভীষণ। শাবিহার থেকে এ প্রশ্নটা আশা করেনি ও। ও কয়েকদিন ধরে অনেক কম খাচ্ছে। এমনিতেও কম খায়। কিন্তু পরীক্ষার চিন্তায় খাওয়াদাওয়া, ঘুম, বিশ্রাম এসব ঠিকঠাক হচ্ছিলো না। আঁধার বাচ্চার মতো যত্ন নেয় ওর। ও বলতে গেলাে সেটা। আবার কথা ঘুরিয়ে বললো

-"এক্সামের জন্য একটু চিন্তা হচ্ছে। আর রুটিন দেওয়ার পর থেকে খাওয়া, ঘুম ঠিকমতো হচ্ছে না। এজন্য হয়তো।"

-"আরো কতো কিছুর চিন্তা করতে হয় তোমাকে। কীভাবে একটা মানুষের খুব প্রিয় মানুষকে কেড়ে নিবা। স্মুথলি ভিক্টিম কার্ড প্লে করবা। নিজেকে সতীসাবিত্রী প্রমাণ করার জন্যও তো অনেক কসরত হয়। কী করে করো বলোতো। টিপস দাও না।"

শাবিহার পাংশুটে মুখ। কিন্তু গলার স্বর একদম স্বাভাবিক। চাঁদনী হতভম্ব হয়ে চায়লো। তটিনীও অবাক হলো ওর মুখ থেকে এসব কথা শুনে। শাবিহা তো বলেছিলো, ওর চাঁদনী কে দেখতে ইচ্ছে করছে। মেয়েটা কেমন আছে, ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করবে সরাসরি। এসব কী বলছে ও?

তটিনী শাবিহার হাত ধরে বললো

-"কী বলছিস! পাগল হলি?"

চাঁদনী অস্থির স্বরে বললো

-"বুঝিনি।"

-"বুঝোনা? না, নাটক মারাও, কোনটা? তোমাদের মতো মেয়েগুলারে ভালোই চেনা আছে আমার। ছেলেদের কীভাবে ফাঁদে ফেলে, নিজের পক্ষের করতে হয়, সেসব ভালোই জানো। এই বয়স থেকেই এসব! আরেকটু বড় হলে কী করবা?"

-"কী বলছেন, জানেন আপনি?"

চাঁদনীর গলার স্বর উচ্চ হলো। শাবিহা চোখ পাকিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে বললো

-"জানি আমি। ভালো করেই জানি। তোর মতো মেয়েরা যে কতো বড় বেহায়া, নির্লজ্জ হয়- সেটা ভালো করেই জানা আছে আমার। আরেকজনের ভালোবাসার মানুষকে কেঁড়ে নিয়ে তোরা কী পাস! আবার ভিক্টিম কার্ডও প্লে করিস।"

শাবিহা তুই তোকারি শুরু করলো৷ চাঁদনী স্তব্ধ হয়ে দেখলো শাবিহার ব্যবহার। ও এই শাবিহাকে চিনতে পারলো না। সবসময় নরম, গম্ভীর স্বরে কথা বলা মেয়েটা আর এ মেয়েটার মাঝে বিস্তর ফারাক আছে। শাবিহা চেঁচিয়ে বললো

-"আঁধার কে কেড়ে নিয়েছিস তুই আমার থেকে৷ আমার ভালোবাসাকে আলাদা করে দিয়েছিস আমার থেকে। এতো কিছু হয়ে যাওয়ার পরও, ওর এতো অপমানের পরও তুই ওঁকে ছাড়লি না। এখানেই বোঝা যায় তুই কতো বড় বেহায়া! তোর কোনো আত্মসম্মান নাই। মেয়ে জাতির কলঙ্ক তুই।"

আত্মসম্মান নিয়ে কথা বলায় চাঁদনীর গায়ে লাগলো খুব। রেগে বললো

-"মুখ সামলে কথা বলেন আপু। আমি কী করেছি? আমি কাওকে কাড়িনি। সে আপনাকে এতো ভালোবাসলে, আমি কে হই আপনাদের মাঝে আসার!"

-"তুই অনেক ছল ছাতুরি জানিস বুঝেছিস। আমি দেখি নাই, প্রথম থেকে আঁধার কতোটা বিরক্ত ছিলো তোকে নিয়ে! না পারতে থাকছে ও তোর সাথে। এতোকিছু হওয়ার পরও তুই ওর জীবন ছেড়ে গেলি না। ও কখনোই তোকে ভালোবাসে নাই।"

-"ও তাই? সে কাকে ভালোবাসছে? আপনাকে? তাহলে সে, আপনাকে রেখে গ্রামে চলে গেলো কেনো? কেনো আপনার কথা একবারও ভাবলো না? এতো ভালোবাসে আপনাকে, এতো ভালোবাসা অথচ ঠিকই আরেকজনকে বিয়ে করতে চলে গেলো। এমন ভালোবাসার জন্য লড়তে আসছেন আপনি আমার সাথে!কথা শোনাচ্ছেন! ভুল করছেন শাবিহা আপু। সে আপনাকে কখনোই ভালোবাসে নাই। হ্যাঁ, অতীতে অনেক কিছু হয়েছে। এর জন্য সে অনেকবার অনুতপ্ত হয়েছে আমার কাছে। ক্ষমা চেয়েছে৷ আপনাকে এতো ভালো বাসলো আমাকে তো বলতোই তার জীবন থেকে চলে যেতে। আমি নিজে চলে যেতাম। সে আমাকে বোঝা ভাবলে, তার জীবনে আমাকে আটকে রাখতো না। আমাকে বেহায়া বলছেন, অথচ বিবাহিত একটা ছেলের জন্য কান্নাকাটি করছেন। এটা আপনার কেমন আত্মসম্মান? আসলে আমাকে যেসব কথা বলছেন, সেসব আপনিই। আপনার আত্মসম্মান নেই তাই আমাকে বেহায়া বলছেন আপনি।"

শাবিহা চাঁদনীর গালে চড় বসাতে গেলো। তটিনী হাত ধরে ফেললো ওর। শাবিহা ছাড়িয়ে নিলো ওর হাত।

ধাক্কা বসালো চাঁদনীর গায়ে। চাঁদনী দুপা পিছিয়ে গেলো। পরতে পরতে সামলালো নিজেকে। শাবিহা রাগে কাপছে। বারবার তেড়ে আসছে চাঁদনীর দিকে।

হাসনা আর বৃষ্টি এসে দেখলো জটলা বেঁধেছে। দু'টো মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, চাঁদনীর সামনে। সেখানে একজন রেহানের বোন। হাসনা দৌড়ে এলো৷ চাঁদনীকে ধরে চেঁচিয়ে বললো

-"এমন করছেন কেনো আপনি?

শাবিহা নিজের মতো বললো

-"আরেকজনের জিনিস কেঁড়ে কি শান্তি পাস? তোদের মতো মেয়েদের ভালোমতো চেনা আছে আমার। ছেলে দেখলেই তোদের শুরু হয়ে যায়, ভিক্টিম কার্ড প্লে করা।

চাঁদনী ভঙ্গুর গলায় বললো

-"ভালো করছেন না এসব। সে আপনাকে কখনোই ভালোবাসেনি। মেনে নিন। কেনো মিথ্যে অহং ধরে বসে আছেন! মরিচীকার পেছনে ছুটবেন না আপু।"

-"তোরে ভালোবাসে? সে হিসেবে তো তোকেও ভালোবাসে না। তোকে ভালোবাসলে তো আমাকে কিছু হলেও বলতো। তোর এতোবড় ক্ষতি করতে চাইলাম আমি। তোকে তিন তিনটা ছেলের হাতে ছেড়ে দিলাম। তোর সম্মান শেষ করে দিতো ওরা। এতোসব জানার পরও আঁধার আমাকে কিছু বলেনি।"

চাঁদনী যথাসম্ভব নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে বললো

-"মিথ্যে বলবেন না আপু। আমি চিনি তাকে। আপনার চেয়েও বেশি। যদি আমার ক্ষতি করার পেছনে আপনার হাত থাকতো। সে সেদিনই আপনার সাথে সব সম্পর্ক শেষ করে দিতো। কিছু না অনেক কিছুই বলতো আপনাকে।"

শাবিহা দমলো না। রাগে কিড়মিড়িয়ে বললো

-"তোর জামাই আমারে কিচ্ছু বলে নাই। আমাদের বন্ধুত্ব আগের মতোই আছে। রিক শাস্তি পেলেও আমার কিছুই হয়নি। আমাকে একটা উচ্চ বাক্য পর্যন্ত বলেনি ও। দেখেছিস, তোর অবস্থান টা কোথায়! তারপরও বলবি, তুই গুরুত্বপূর্ণ। তোরে ভালোবাসে। তুই জিজ্ঞেস করিস আঁধার থেকে। আমারে কিছু বলছে কি-না। একটা ফুলের টোকাও দেয় নাই। অথচ পুরো ঘটনা ও জানতে পেরেছিলো। রিকের সব কারসাজির পেছনে আমার ইন্ধন ছিলো।"

চাঁদনীর অবিশ্বাস্য দৃষ্টি। ঠোঁট তিরতির করে কাঁপছে কিছু বলার জন্য। শাবিহা ওর আওয়াজ বন্ধ করে দিয়েছে।

-"তুই ওর কাছে কোনো মাইনে রাখিস না বুঝেছিস। আরে তোর এতো বড় ক্ষতি করতে চেয়েছি আমি। তোর ইজ্জত, সম্মান সেখানেই শেষ হয়ে যেতো। সমাজের চোখে কলঙ্কিত হয়ে বাচতি সারাজীবন।এতো কিছুর পরও আঁধার আমার সাথে বন্ধুত্ব ভাঙলো না। এতো বড় বড় যে কথা বলছিস। তোদের এই নাম মাত্র বিয়ে থেকে, আঁধারের কাছে আমাদের বন্ধুত্ব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চলে যা ওর জীবন থেকে। আর কতো বেহায়ার মতো পরে থাকবি!"

আশেপাশে কিছু স্টুডেন্ট, ওঁদের গার্ডিয়ানরা দাঁড়িয়ে আছে। সবাই দেখছে ওঁদের। মজা নিচ্ছে চাঁদনীর অপমানের। বাঙালি এসব জটলা, ঝামেলা ভালোই পছন্দ করে। চাঁদনী বলতে পারলো না কিছু শাবিহাকে। ও পাথর হয়ে দাড়িয়ে থাকলো।

তটিনী থামাতে পারলো না শাবিহাকে। ওর মুখে যাই আসলো তাই বলে গেলো ও চাঁদনী কে। তটিনী টেনে নিয়ে গেলো শাবিহাকে। শাবিহা চিল্লাতে থাকলো, ছাড় আমাকে। আমার কথা শেষ হয়নি। যেতে যেতেও অনেক কিছু বলে গেলো চাঁদনীকে।হাসনা ধরে আছে চাঁদনীকে।

চাঁদনীর ঝাপসা দৃষ্টিতে শুধু দেখলো, শাবিহাকে তটিনী টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

#চলবে

📌#কাজলরেখা বইটি অর্ডার করতে পারেন অক্ষরবিন্দু প্রকাশনী, বুকফাইল, বইকাঘর, বইবেলী, রংতুলি, বইঅঙ্গন, বই প্রাঙ্গন সহ যেকোনো অনলাইন বুকশপ থেকে।#কাজলরেখা

#পর্ব:৫৭(দ্বিতীয়াংশ)

#তানজিনা ইসলাম

তটিনী, শাবিহাকে টেনে নিয়ে এলো কলেজের বাইরে। গাড়ির কাছে এসেই ঝাড়া মেরে শাবিহার হাতটা ছেড়ে দিলো তটিনী। শাবিহা এখনো সাপের মতো ফোঁসফোঁস করছে। ওর কলিজা শান্ত হয়নি এখনো। প্রতিশোধের নেশায় বুঁদ হয়ে ও মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলেছে। চাঁদনীকে ঠাটিয়ে কয়েকটা চড় মারতে পারলে হয়তো ওর মনের জ্বালা মিটতো। কলিজা শান্ত হতো। কিন্তু তটিনীর জন্য পারলো না। এখন তো তটিনীর উপরও রাগ হচ্ছে ওর। তটিনী কপট রাগ দেখিয়ে, চাপা স্বরে বললো

-"ওর কাছে যা যা স্বীকার করেছিস, সব কি সত্যি?"

​শাবিহার রাগ তাতে একটুও কমলো না, বরং এই প্রশ্নে আরও তেতে উঠল সে। ঝাঁঝালো গলায় বললো

-"হ্যাঁ, তো? কী করবি তুই?"

​তটিনী বাকহারা হয়ে কিছুক্ষণ ওকে পরখ করলো। যে বিশ্বাস ও কাল অবধি বহন করেছিল, তা আজ এমনভাবে চূর্ণবিচূর্ণ হলো যা ওর কল্পনাতীত ছিল। ঘৃণায়, ধিক্কার দিয়ে তটিনী বললো

-"ছি, শাবিহা! ছি! তুই আমার বন্ধু? সেই ইনোসেন্ট শাবিহা? একটা বাচ্চা মেয়ের সাথে তুই এমন জঘন্য একটা কাজ করলি। অথচ, কাল পর্যন্ত আমি আঁধারের সাথে ঝগড়া করে আসছিলাম। কেনো তোর সাথে বন্ধুত্ব ভাঙলো ও। তোর দোষ নেই, দোষের প্রমান নেই। আজ তুই নিজের মুখে স্বীকার করলি। কার জন্য এতো লড়লাম আমি, শাবু? একবার আঁধারের দিকে তাকিয়ে অন্তত পিছু হটতে পারতি! এতোটা অসভ্য কখন থেকে হয়ে গেলি? তোর ওইসব বন্ধুদের সাথে মিশে মিশে এতটা নিচে নেমেছিস তুই!"

-​"তাতে তোর কী? আঁধার তাকিয়েছে আমার দিকে? আমি যে ওর দিকে তাকাবো! সব দায়িত্ব আমার? ঘৃণা হচ্ছে তোর? চলে যাবি? যা। তুইও চলে যা। একটা তো চলেই গেলো, তুই আর থেকে কী করবি! আমি তো খারাপ, আর খারাপ মানুষদের সাথে থাকা যায় না।"

​তটিনী ওর বাহু ধরে ঝাঁকিয়ে বললো

-"মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর, শাবিহা! উন্মাদ হয়ে গেছিস তুই। কী করছিস, কী বলছিস—নিজেও বুঝতে পারছিস না। চাঁদনীর চোখে আমাকে কতটা নিচে নামিয়ে দিলি তুই! এই, আঁধার তোর সাথে বন্ধুত্ব ভাঙেনি? মিথ্যা বললি কেনো ওঁকে? তোর মুখ থেকে স্বীকারোক্তি শুনে আমি এতোটাই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যে, আমি সত্যি টা বলতেই পারিনি ওঁকে। শাবিহা, কী হয়েছে তোর?"

-"ছাড়!"​চেঁচিয়ে উঠলো শাবিহা। চোখমুখ টকটকে লাল হয়ে আছে ওর। নাক ফুলিয়ে বললো

-"ওই মেয়ের নাম নিবি না! কালসাপ একটা। ও আমার বন্ধুত্ব ভেঙেছে তটিনী। ওর সংসার না ভাঙা পর্যন্ত এই শাবিহার শান্তি নেই।"

​ তটিনী দাঁতে দাঁত চেপে বললো

-"আঁধার মেরে ফেলবে তোকে! একবার ছাড় দিয়েছে বলে ভাবিস না বারবার পার পাবি। ও কিন্তু সবসময় প্রতিশোধ নেয় না,ও আসল জায়গায় পাকড়াও করে। খুব দুর্বল জায়গায় আঘাত করে ও।"

-​"আঘাত করার আর কী বাকি আছে? ও নিজেকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে, আমার বন্ধুত্ব ভেঙে দিয়ে যে আঘাতটা আমাকে দিল, সেটার চেয়ে বড় আঘাত আর কী হয়? ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া না নিয়েই, মুখ ফিরিয়ে নেবে? আমাকে জ্বালিয়ে দিয়ে নিজে সুখে থাকবে? তাহলে ও ভুল ভাবছে।"

তটিনী আর ওঁকে কিছু বলার এনার্জি পেল না।মেয়েটার বোধবুদ্ধি সব লোপ পেয়েছে। ওর সঙ্গে থাকতে, এই মুহূর্তে রুচিতে বাজলো তটিনীর। ও আর সেখানে রইল না। শাবিহাদের বাড়ির গাড়িতে করে এলেও, এখন ফেরার পথে সে আলাদা করে রিকশা নিল। রিকশায় বসে তটিনী চিন্তায় মগ্ন হলো—'শাবিহা সেদিন, ওর বড় ভাইকে ছুঁয়ে বলেছিলো এসব ঘটনায় ওর কোনো হাত নেই। অথচ আজ চাঁদনীর সামনেই বলে এল যে ও ইন্ধন জুগিয়েছে! ছি! কেমন বোন ও! ভাইকে ছুঁয়ে মিথ্যে বলে? ছেলেটা চট্টগ্রামে ফিরে গেছে, সাবধানে পৌঁছেছে কি না কে জানে!' তটিনীর মনে ভয় জাগে। এক অসম্ভব দুশ্চিন্তায় হৃদয় পর্যবসিত হয় হৃদয়।। কসম করা বা ছুঁয়ে কথা বলায় ও বিশ্বাস করে না। ওর কাছে এসব কুসংস্কার। কিন্তু শাবিহা রাতকে ছুঁয়ে মিথ্যে বলেছে— ব্যাপারটা খুব সেন্সিটিভ তটিনীর জন্য। ছেলেটার এমনিতেই বিপদের শেষ নেই। এটা কী করলো ও! তটিনী হাত কচলাতে থাকে। রাতের নাম্বারটা আছে ওর কাছে। বেশ কয়েকবার কল দিলে হয়তো রিসিভ করে ফেলতে পারে। আবার ব্যস্ততায় বা হাজারো কনটাক্ট নাম্বারের আড়ালে ওর নাম্বার হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু তটিনীর যে মন মানে না। ফোন করলে ব্যাপারটা বেশিই ছ্যাচড়ামি হয়ে যাবে।

​আঁধারকে কি একবার বলবে ও, শাবিহা এখানে কী কী ঘটিয়েছে? আঁধার তো পাল্টা প্রশ্ন ছুড়বে—শাবিহা সেখানে কার সাথে গিয়েছিল? তটিনী যখন উপস্থিত ছিলই, তখন চাঁদনীকে পুরো সত্যিটা ও বলেনি কেন? আঁধার তো বন্ধুত্ব ভেঙে দিয়েছে। কিন্তু তটিনীরও তো দোষ নেই; এমন আকস্মিক ঘটনায় ও কিছু ঠাওরই করতে পারছিল না। ও আসলে চেয়েও বলতে পারেনি। শাবিহার সত্য স্বীকার করা দেখে ওর কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কত বড় মুখ করে ও আঁধারকে বলেছিলো,শাবিহা এমন করতে পারে না। ওর বান্ধবী এমন নয়! সব তো মিথ্যা হয়ে গেল। ওর কথার কোনো মূল্যই থাকল না। শাবিহার কিছু হওয়ার আগে দোষ আসবে তটিনীর ওপর। আঁধার ওকে একশটা কথা বলে জেরা করবে, ওর সাথে শত্রুতা ঘোষণা করবে। বন্ধুকে শত্রু বানানোর মতো মানসিক অবস্থা আপাতত তটিনীর নেই। ওর চিন্তা অন্য জায়গায়—রাত ভালো আছে তো? ছুঁয়ে মিথ্যে বলার কারণে কারো ক্ষতি হয় কি না তটিনীর জানা নেই, কিন্তু তটিনীর চিন্তায় ঘাম ছুটে যাচ্ছে। ইশ! একটু যদি কল করে ছেলেটার খোঁজ নিতে পারতো!

,

আঁধার চাঁদনীকে নিতে এসেছে। আজ আসতে একটু বেশিই দেরি করে ফেলেছে ও। আকিব শিকদারের সাথে, ঢাকা ব্রাঞ্চের হেড অফিসে যেতে হয়েছিলো ওঁকে। সব কাজ শেষ করে, কীসের উপর যে এসেছে ও, তা শুধু আঁধারই জানে। এখনো ঘেমে আছে ছেলেটা। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পরে আছে কপালের উপর। আঁধার ড্রাইভিং এ মত্ত। চাঁদনী পাশের সিটে বসে আছে।

চাঁদনী একদৃষ্টে সামনে তাকিয়ে আছে। পাথুরে দৃষ্টি ওর, চোয়াল শক্ত। আঁধার বুঝতে পারছে না ওর কী হয়েছে! এমন চুপচাপ কেনো মেয়েটা?গাড়িতে উঠার পর থেকে একবারো ওর সাথে কথা বলেনি। আবার কী নিয়ে মেয়েটার ভেতরে রাগ জমেছে? আঁধার জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলো

-"কী হয়েছে রে? চুপচাপ কেনো? সকাল থেকে আজকের দিনটা নিয়ে কতটা এক্সাইটেড ছিলি তুই!

​চাঁদনী পাশ ফিরে তাকালো ওর দিকে। পাংশুটে মুখে, কাঠগলায় বললো

—"আঁধার ভাই।"

চাঁদনীর অদ্ভুত কণ্ঠস্বর। আঁধারের খটকা লাগলো।সুক্ষ্ম স্বরে উত্তর দিলো

—"হুঁ।"

-"আমি তোমার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?"

-"কীরকম? বুঝলাম না।"

-"তোমার জীবনে আমার গুরুত্ব কতোটা? আমি তোমার জীবনে কতোটুকু মাইনে রাখি? কী করতে পারবে তুমি আমার জন্য?"

-"কী বলছিস? আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছি না আমি।"

-"বলো না! আমার যদি কেউ ক্ষতি করতে চায়, তুমি তার সাথে কী করবে?"

আঁধার বুঝলো না চাঁদনী এসব কেনো বলছে৷ কিছুসময় কপালে ভাজ ফেলে তাকিয়ে রইলো ও চাঁদনীর দিকে। পরক্ষণে ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললো

-"যে চাঁদনীর ক্ষতি করতে চায়বে, সে আঁধারের হাতে খুন হয়ে যাবে। নয়তো খুব জঘন্য কিছুর সম্মুখীন হবে, যেটা সে সারাজীবনেও ভুলতে পারবে না।"

​চাঁদনী হেঁসে দিলো। আঁধার অবাক হয়ে তাকালো ওর দিকে। চাঁদনী,ব্যঙ্গাত্মক কণ্ঠে বললো

-"ওওও! তাহলে তুমি শাবিহা আপুকে কিছু বললে না কেন?সেও তো আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে? না, সে পরোক্ষভাবে করেছে বলে, তার শাস্তির দরকার নেই?

আঁধার বিশাল এক ধাক্কা খেলো। চাঁদনীর তো জানার কথা নয় শাবিহার ব্যাপারটা। এটা তো শুধু ও জানে। তটিনীও বিশ্বাস করে না। আঁধার ভেবে নিলো, চাঁদনী হয়তো সন্দেহের ভিত্তিতে বলছে। ও অনেকবারই এসব নিয়ে কথা বলতে চেয়েছে আঁধারের সাথে। আঁধার নিজেকে সামলো বললো

-"তোকে না এসব বিষয়ে কথা তুলতে মানা করেছি আমি! ভুলতে কেন পারছিস না তুই? যতবার মনে করবি আর ব্যাপারগুলো নিয়ে খোঁচাবি, তত কষ্টটা বেড়ে যাবে চাঁদ। অনেকদিন তো কেটে গেছে চাঁদ, এবার স্বাভাবিক হ, প্লিজ।"

​চাঁদনীর মনে অভিমান জমে। ভাঙা গলায় বললো ও,

-"চাইলেই কি স্বাভাবিক হওয়া যায়? ভুলে যাওয়া এত সোজা? আমার সাথে অন্যায় করা মানুষগুলো বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওদের একটু অনুশোচনা পর্যন্ত নেই, উল্টো আমাকেই কথা শুনিয়ে যাচ্ছে। তোমার কি কোনো দায়িত্ব নেই?"

​আঁধার সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো

-"কী হয়েছে? কে কথা শুনিয়েছে তোকে? আমাকে বল। খোলাসা করে তো বলছিসও না।"

-"তোমার জন্যই তো সব হলো, তাই না? না তুমি এমন মানুষগুলোর সাথে বন্ধুত্ব করতে, না ওরা আমার এত বড় ক্ষতি করতো! শাবিহা আপুকে কিছু বলেছ তুমি আঁধার ভাই? সে কি জড়িত ছিল না এসবে?"

​এতদিন পর হঠাৎ কেন চাঁদনী শাবিহার কথা জিজ্ঞেস করছে, আঁধার বুঝে উঠতে পারল না। সে পালটা প্রশ্ন করল—"শাবিহা তোকে কী বলেছে চাঁদ? শাবিহাকে কোথায় দেখলি তুই? তোদের তো দেখা হওয়ার কথা না!"

​চাঁদনী চোয়াল শক্ত করে চাপা রাগে বললো

-"না, আমি তাকে কোথায় দেখব? তার সাথে আমার দেখাও হয়নি, কথাও হয়নি। আমার শুধু মনে আসলো ব্যাপারটা। আসলে তোমার কাছে কে গুরুত্বপূর্ণ? তোমাদের বন্ধুত্ব তো আগের মতোই আছে, তাই না? তুমি তাকে কিচ্ছু বলোনি। আমার এতো বড় ক্ষতি করতে চাওয়ার পরও, তুমি তার সাথে নিজের বন্ধুত্ব ঠিক রেখেছো।"

আঁধারের কখনো কাউকে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে না। কেউ ভুল বুঝলে বুঝে বসে থাকুক, নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার অত ঠেকা ওর নেই। তবুও চাঁদ ওর কাছে আলাদা, ভীষণ স্পেশাল কেউ। ওর জন্য আঁধার নিজের সব অভ্যাসই বদলে ফেলতে পারে। আঁধার হাতের আজলায় চাঁদনীর মুখটা তুলে নিল। নরম গলায় ওকে বোঝানোর জন্য বললো

-"শাবিহা নিজেও জড়িত ছিলো। আমি জানার পর, সেদিনই ওর সাথে বন্ধুত্ব ভেঙে দিয়েছি। আমার কাছে তুই-ই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, চাঁদ। আর কেও না।

​চাঁদনী টইটুম্বুর চোখে, চেয়ে বললো

-"সে কি কোনো শাস্তিই ডিজার্ভ করে না? আমার সাথে এতো বড় অন্যায় করলো মেয়েটা। ওনার বন্ধুদের ইন্ধন জোগালো আমার ক্ষতি করতে! একটা মেয়ের বেঁচে থাকার কারণ শেষ করে দিতে। সেদিন যদি তোমরা সময়মতো না আসতে, মৃত্যু ছাড়া আমার আর কোনো উপায় থাকত না আঁধার ভাই! তুমি অর্পিতা আপুর সাথে কী করেছিলে মনে আছে? স্রেফ আমাকে একটা থাপ্পড় মেরেছিল বলে! ও আমাকে সত্যগুলো বলে দিয়েছিল বলে ওর সাথে তুমি যা করেছ, আমি নিজের চোখে দেখেছি। আমি কি এটুকু আশা করতে পারতাম না যে তুমি আমার জন্য একটু লড়বে?"

-​"কীভাবে লড়তাম আমি, বল? যুদ্ধ করতাম ওর সাথে? ও আমার সাথে ছোটবেলা থেকে বড় হওয়া আমার অতি পরিচিত চাচাতো বোন নয়, যে চাইলেই একটা চড় বসিয়ে দিতে পারি। অর্পিতার সাথে কী করলে ও কষ্ট পাবে বুঝতে পারছিলাম না বলে ওর চুল পর্যন্ত টেনে দিয়েছিলাম আমি। কিন্তু ও অর্পিতা নয় চাঁদনী, ও শাবিহা।তোদের সম্মানিত এমপির বোন! বন্ধুত্বের খাতিরে আমি ওকে অনেক কিছুই বলতে পারতাম, ওকে কষ্ট দিয়ে লড়তে পারতাম। কিন্তু যেখানে আমি ওর সাথে বন্ধুত্বই চুকিয়ে দিয়েছি, সেখানে এত প্রভাবশালী একটা পরিবারের মেয়ের সাথে আমি আর কী-ই বা করতে পারতাম?"

চাঁদনী মানতে পারে না, আঁধার শাবিহাকে কিছু বললো না। কেনো বললো না? ওর বলা উচিত ছিলো৷ প্রভাবশালী পরিবারের মেয়ে বলে, যা মন চায় করতে পারবে এমন তো হতে পারে না। চাঁদনী শ্লেষাত্মক স্বরে বললো

-​"আমার খুব রাগ লাগছে, জানো! অসহ্য লাগছে সবকিছু। কেনো তুমি শাবিহা আপুকে কিছু বললো না? কেনো আঁধার ভাই? আসব মানতে পারছি না। এটা তোমার ভালোবাসা? এই ভালোবাসার কারণ দেখিয়ে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলে আমাকে। বান্ধবী কে কিছু বলতে পারোনি, সেটা বলো না! প্রভাবশালী পরিবার, ক্ষমতাশীল এসব হ্যানত্যান বলে বুঝ দিচ্ছো কেনো?"

​চাঁদনীর ছলছল চোখ বেয়ে দু-ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পরতে চাইলো। আঁধার অস্হির হয়ে ওর গালে হাত রাখলো। ওর হাতটা শক্ত করে মুঠোয় নিয়ে বললো

-"তুই ছাড়া আমার আর কে আছে বল? বুঝ দিচ্ছি না তোকে, চাঁদ। তোর কী মনে হয়, ওঁকে এতো সহজেই ছেড়ে দেবো আমি? তোর সাথে এতো বড় অন্যায় করার পরও! ভুল বুঝিস না, প্লিজ। ওর আসল জায়গায় পাকড়াও করতে হবে চাঁদনী! এসব দুধভাত শাস্তি ও ডিজার্ভ করে না।"

-"ভুল বুঝছি না।ঠিকটাই বুঝছি। এতোদিন ভুল বুঝেছিলাম।তোমার জীবনে, আসলে আমার একআনা দাম নাই। সব নাটক করো তুমি। যেদিন চলে যাবো, সেদিন বুঝবে।"

-"আমাকে ভুল বুঝে, ছেড়ে যাবি? আমার জীবনে সবচেয়ে দামী মানুষ তুই, চাঁদ। বিশ্বাস কর, আমি থাকতে পারবো না তোকে ছাড়া। কখনো যাস না প্লিজ।এতো ঠুংকো কারণে আমার ভালোবাসা মিথ্যা ছিলো, এটা বলিস না।"

​চাঁদনী কাঁদছে না ঠিকই, কিন্তু ওর কণ্ঠে এখনো কান্নার রেশ। ভাঙা ভাঙা গলায় ও বললো

-"হুঁ। তোমার কাছে ঠুংকো। কিন্তু আমার কাছে অনেক বড় একটা বিষয়। কী করে তুমি শাবিহা আপুকে কিছু বললে না! আসলেই তো, বেহায়া বলেই থেকে গেলাম। নয়তো যেভাবে অপমান করেছো তুমি আমাকে, কারো নূন্যতম আত্মসম্মান থাকলেও সে তোমার সাথে থাকতো না।"

​আঁধার ওর অভিমানের সুর ধরতে পেরে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।পরক্ষণে বাঁকা হাসলো ওর দিকে তাকিয়ে।চাঁদনীর চোখে চোখ রেখে,স্বভাবগত আচরণেই চাঁদনীর অভিমান আর রাগ বাড়িয়ে দিতে বললো

-"অবশ্য তুই যাবিই বা কই! আমি ছাড়া তোকে আর কেউ রাখবে নাকি?"

​ফুসে উঠল চাঁদনী। তেতে যাওয়া কণ্ঠে বললো

-"আমার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই,এমন ভুল ধারণা নিয়ে বসে আছ কেন তুমি? বাবাকে বললেই বাবা এসে আমাকে নিয়ে যাবে।"

​আঁধার ওর কথা আমলে না নিয়ে বললো

-"শুধু শুধু চাচ্চুর সাথে আমার ক্যাচাল বাধাস না তো! তোকে নিয়ে গেলে মনে হয় আমি আনতে পারবো না! এমন ভাব করছিস।"

-"বলবো আমি বাবাকে সব। মিথ্যুক একটা! ভালোবাসার মিথ্যা বুলি আওড়াচ্ছো। অথচ নিজের বান্ধবী কে কিছু বলতে পারো না। হাহ! বন্ধুত্ব শেষ করলেই কী সেটা শাস্তি হয়?"

-"সেটাই ওর জন্য সবচেয়ে বড় শাস্তি। খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু ওর থেকে কেড়ে নেওয়া। বন্ধুত্ব টুকু ওর কাছে খুব দামী ছিলো রে।"

-"বাহ! খুব চেনো তাকে। ভালো। এবার আমাকে চিনবে তুমি। আজকের কথাগুলো খুব গায়ে লাগলো বিশ্বাস করো। তোমার কথা হজম করে নিয়েছিলাম। কিন্তু এই যে, শাবিহা আপু কোনো শাস্তিই পেলো না, এ বিষয়টুকু হজম হলো না। আমি থাকবো না।"

-"থাকবি না তো, জোর করে রাখবো।"

-"সবসময় জোর করতে পারো বলে, টেকেন ফর গ্রান্টেড ভেবে নিয়েছো। কিন্তু এবার সেটা হবে না। আমি বাবাকে সব বলবো। তুমি শাবিহা আপুর থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কেড়ে নিলো তো। আমি জানি না আমি তোমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কি-না। তবে আমি আর ফিরবো না৷ যদি সেটা শাবিহা আপুর শাস্তি হয়, এটা তোমার শাস্তি হবে।"

আঁধার চকিতে তাকালো। চাঁদনীর চোখ মুখ খুব সিরিয়াস। আঁধার ব্যগ্র স্বরে বললো

-"বেশি হয়ে যাচ্ছে চাঁদ! ফিরবি না মানে কী? তোকে ফিরতেই হবে। আমি ছাড়া, বাকি সব রাস্তা বন্ধ তোর। আমার কাছে ফেরা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।"

-"বাবাকে বলবো আমি সব। কীভাবে কষ্ট দিয়েছো তুমি আমাকে!"

-"বলিস। কিন্তু ছেড়ে যাস না। তুই ছাড়া আমার আর কেও নেই। তুই চাস আমি মরে যাই?"

-"ইমোশনাল ব্লেকমেইল আর কতো করবা?"

-"ব্লেকমেইল না। সত্যি বলছি, মরে যাবো আমি। আগরবাতির ঘ্রাণ তোকে ঘুমাতে দেবে না।"

-"হাহ! নাটক করবে না একদম। মিথ্যুক একটা। মৃত্যু এতো সহজ নাকি।"

-"আরে, যেদিন মরে যাবো সেদিন বুঝবি। কাঁদবি আমার জন্য। কিন্তু আমি ফিরবো না। তখন বুঝবি, আমার মূল্য। এখন বুঝতে পারছিস না। সহজলভ্য তো তোর কাছে, তাই।"

#চলবে

📌#কাজলরেখা বইটি অর্ডার করতে পারেন অক্ষরবিন্দু প্রকাশনী, বুকফাইল, বইকাঘর, বইবেলী, রংতুলি, বইঅঙ্গন, বই প্রাঙ্গন সহ যেকোনো অনলাইন বুকশপ থেকে।

https://www.facebook.com/share/1AfmLuGL2k/

https://www.facebook.com/share/1AfmLuGL2k/

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন