#প্রেমতৃষা
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#পর্ব_৩৮
হেতিজা দুপুরে ভাতের থালা ছুঁয়েও দেখেনি। বুকের ভেতরটা যেন কাঁটার বন। প্রেমা পাশে বসতেই তার চোখের জল আর্তনাদের মতো ফেটে বেরিয়ে এল।একটা শুকনো নদীর বুকে হঠাৎ জলোচ্ছ্বাস। প্রেমা মাকে বুকে টেনে নিল, হয়তো এই বুকেই মা আশ্রয় পাবে। তৃষা চলে যাওয়ার পর থেকে প্রত্যুষ রাতে বাসায় ফিরে না। দিনেও কোথায় খায়, কী করে—খোদা ছাড়া কেউ জানেন না। যে ছেলেটা একসময় সবার গর্ব ছিল, সেই ছেলেটির জীবন এখন হেতিজার চোখের সামনে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে। মায়ের বুকটা হাহাকার করে ওঠে। কেবল কান্নাই আসে। কেন যে ওই মেয়েটিকে ভালোবেসেছিল! এ ভালোবাসা তো জীবনটাকেই গিলে খাচ্ছে, ধ্বংস করে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।
‘প্রেমা, একবার কল কর তো তোর ভাইকে,’
হেতিজার গলা শুকনো, কাঁপা।
প্রেমা তাই করল। কিন্তু কল যেতেই স্ক্রিনে সেই একই দৃশ্য—ফোন বন্ধ। আজকাল যেন রিং হওয়ার থেকেও বন্ধ থাকার দৃশ্যটাই পরিচিত হয়ে গেছে। হেতিজার চোখে নিদারুণ ক্লান্তি। এই বাড়ির প্রতিটি জীবনের আলো কি এভাবেই নিভে যাবে? আল্লাহ, এই অভিশপ্ত পরিণতি থেকে কবে মুক্তি মিলবে?
-
রিসোর্ট থেকে ফিরে আজ অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমেছে ঘরেজুড়ে। দুপুরের রোদে বাড়িটা যেন তন্দ্রাচ্ছন্ন, জানালার পর্দায় আলো-ছায়ার খেলা থেমে গেছে। প্রেম আর তৃষা—দু’জনেই ক্লান্ত, কিন্তু ক্লান্তিরও এক রোমাঞ্চ আছে, যা শরীরের প্রতিটি শিরা টেনে রাখে কোনো এক অজানা টানের ভেতর। তৃষা বই পড়তে পড়তেই ড্রয়িং রুমের সোফায় ঘুমিয়ে পড়ে। নিস্তব্ধ ঘরে শুধু ঘড়ির কাঁটার শব্দ, আর দূরে কিচেন থেকে ভেসে আসে ছুরির সঙ্গে কাঠের টেবিলের ঘষাটানা। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় তৃষার। চোখের পাতার ফাঁক দিয়ে কিচেনের দিকে তাকাতেই সে মুহূর্তটা থমকে যায়। ওপেন কিচেনের আলোয় দাঁড়িয়ে আছে এক পুরুষ—কালো রঙের ট্রাউজার, আর শরীরের উপরে অন্ধকারের মতো দৃঢ় ছায়া। তার পিঠটা এতটাই চওড়া যে আলোর রেখাটাও সেখানে ভেঙে গেছে। তৃষা স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে। এই দৃশ্য যেন কোনো মানুষের নয়—বরং এক অনিবার্য মায়ার মতো, যা তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করে। ঘুম ভাঙার পর এমন দৃশ্য ক’জন নারীর কপালে জোটে? তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে আসে। পুরুষটি এখনো পেছন ফিরে তাকায়নি তবুও তার উপস্থিতি ঘরের প্রতিটি কোণে গায়ে গায়ে লেগে আছে, এক ধরনের অজানা উষ্ণতা হয়ে। তৃষার মনে হয়, এই মানুষটা যদি এখন ঘুরে তাকায়, তাহলে সে হয়তো নিজের সমস্ত ঘুম, সমস্ত নিঃশ্বাস হারিয়ে ফেলবে সেই চোখের ভেতর। সে ওঠে যায়। এক পা দুই পা করে কিচেনে গিয়ে পেছন থেকে ওঠে জড়িয়ে ধরে প্রেমকে। পিঠে চুমু খেয়ে বলে, 'আপনাকে অসীম ভালোবাসায় আমি ভালোবাসি।'
প্রেম পেছনে ঘুরে তৃষার নাকে নাক ঘষে ঠোঁট ঠোঁট বুলিয়ে বলল, 'আমিও মিসেস নেওয়াজ আপনাকে অসীম ভালোবাসি।'
'কি রান্না করেছেন?' তৃষা জিজ্ঞেস করল।
প্রেম তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, 'সব আপনার পছন্দের খাবার। আপনি এগুলো খাবেন আর আমি আপ.....' পুরোটা বলার আগেই তৃষা প্রেমের ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে তাকে থামিয়ে বলল, 'ইশশশশয়।'
প্রেম আঙুল সরিয়ে নিয়ে বলল, 'এমন ভাবে থামতে বললে কেন জানি আমার আরো বেশি করে শব্দ করতে ইচ্ছে করে।'
তৃষা হাসল। তারপর বলল, 'পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে। জলদি খাবার দেন। খাই আগে।'
'ইদুর দৌড়াচ্ছে? তাহলে তো ইঁদুর মারার বিষ খেতে হবে আপনাকে মিসেস নেওয়াজ। '
'আপনার মুখের যেই কথা। আর বিষ খাওয়ার দরকার নেই।'
'শালী মিঠা কথা তোমার দরবারে সয়ে না? তোমায় ডিম থেরাপিই দেওয়া উচিত, নট প্রেম থেরাপি।'
-
পাহাড়ি পথটা বিকেলের আলোয় ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ছিটকে আসা রোদ ঝিকমিক করছে মাটিতে। যেন কেউ সোনার গুঁড়ো ছড়িয়ে দিয়েছে। আজকে সারাদিন আধিবাসী গ্রামে ঘুরবে তারা। রাতে ক্যাম্পফায়ার করবে। প্রেম আর তৃষা পাথরের সরু পথ ধরে এগোচ্ছে। বাতাসে নরম একটা ঠান্ডা ছোঁয়া। মাটির সোঁদা ঘ্রাণে মন ভরে যাচ্ছে। কোথাও কাছেই হয়তো কারও উঠোনে চাল শুকোচ্ছে, আর তার পাশেই পাথর ঘেঁষে বসে আদিবাসী কিছু লোক গান গাইছে। বাঁশি বাজাচ্ছে। সেই সুর নেমে এসেছে পাহাড়ের বুক থেকে, মাটির ভেতর দিয়ে সোজা হৃদয়ে গিয়ে লাগে। তৃষা হাঁটা থামিয়ে চারপাশে তাকায়। তার চোখে অনির্বচনীয় বিস্ময়। পাহাড়ের পেছনে লুকোচুরি খেলছে সূর্য। আকাশে কমলা আর গোলাপি রঙের মিশেল। দূরে ধোঁয়া উঠছে রান্নাগুলো থেকে, তার সঙ্গে মিশে আছে পোড়া কাঠ আর পুড়তে থাকা পাটপাতার গন্ধ। তৃষা নরম স্বরে প্রেমকে বলল,
“সবকিছু যেন স্বপ্নের মতো লাগছে, প্রেম… এরা কত সরল, অথচ কত রঙিন! জানেন, এদের মুখে কোনো ক্লান্তি নেই। মনে হয় প্রকৃতি নিজেই হাসছে ওদের সঙ্গে।”
প্রেম থেমে গিয়ে একটু তাকাল তার দিকে। তৃষার চুলের পাশে সূর্যের আলো লেগে ঝলমল করছে। তার চোখে পাহাড়ের প্রতিফলন।
প্রেম মৃদু হেসে বলল, “এদের চোখে শহরের মতো ধোঁয়া নেই, আছে কেবল আলো। আর সেই আলোয় তুমিও আলাদা করে ঝলমল করছো আজ।”
তৃষা কিছু বলতে পারল না। শুধু চুপ করে তাকিয়ে রইল দূরের পাহাড়ের দিকে। বাতাসে দুলছে তার চুল, আর কানে বাজছে ঢোলের সুর। ঠিক তখনই একদল বাচ্চা ছুটে এলো। তাদের হাতে ছোট ছোট ফুলের তোড়া, আর রঙিন পাথর দিয়ে বানানো ব্রেসলেট। তারা হাসতে হাসতে তৃষার সামনে থামল। একটা মেয়ে এগিয়ে এসে তৃষার কব্জিতে পরিয়ে দিল লালচে পাথরের বালা। আরেকটা ছেলে ফুলের মালা গলায় পরিয়ে দিল প্রেমের। তৃষা প্রেমের দিকে তাকাতেই সে বলল, 'তুমি আমার জীবনের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তাই তোমার জন্য সামান্য একটু আয়োজন তো করতেই পারি?'
হঠাৎ গ্রামের কিছু পাহাড়ি মুরুব্বিরা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন। তাদের গলায় পাটের চাদর। একজন বলে উঠলেন,
“আজ তোমরা অতিথি, আর অতিথি হচ্ছে ইশ্বরের অন্য রূপ। আমাদের গ্রাম আমাদের কাছে সব কিছু। এই গ্রামে সূর্য ডোবে, কিন্তু ভালোবাসা কখনো ডোবে না।”
তৃষা মৃদু গলায় বলল, “প্রেম, মনে হচ্ছে আমি যেন আমার নিজের ঘরেই ফিরে এসেছি।”
প্রেম তার হাতটা ধরল, “হয়তো ভালোবাসা মানেই এমন এক জায়গা— যেখানে অপরিচিতরাও আপন হয়ে যায়, যেখানে প্রতিটা বাতাসে তোমার নামের মিষ্টি প্রতিধ্বনি শোনা যায়। তাই না?
তৃষা কিছুক্ষণ নীরব থাকল। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখো, সূর্যটা কেমন থেমে গেছে আমাদের জন্য।”
প্রেম হেসে বলল, “হয়তো সে-ও দেখছে, আজ শহরের দুই মানুষ মিশে যাচ্ছে পাহাড়ের মাটির সঙ্গে।”
দুজনেই এগিয়ে চলল গ্রামের ভেতর। যাওয়ার সময় তৃষা বলল, 'আপনি যেই মানুষ এখানে অসভ্যতামি করবেন না কিন্তু। '
প্রেম মুখ বাঁকিয়ে বলল,' দেখা যাক শালীর ঘরের বউ।'
গ্রামের ভেতর ঢুকতেই কিছু মেয়েরা এসে তৃষা আর প্রেমকে আধিবাসীদের পোশাক দিলো। তৃষা তো সেই পোশাক পড়ার জন্য মহা আগ্রহী। তবে প্রেম নাড়িয়ে চাড়িয়ে দেখল একবার। তারপর তৃষার কানের সামনে ফিসফিস করে বলল, 'এই সোনা তুমি চাইলে আমি পোশাক ছাড়াই থাকতে পারব। দেখবে এই পাহাড়ের থেকেও সুন্দরী প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখিয়ে ওদের মুগ্ধ করে দেব।'
' প্রেমের বাচ্চা চুপ থাক।'
'শালীর ঘরের বউ তুই চুপ থাক।' বলেই চুল ঠিক করে প্রেম সামনের মেয়ে গুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, 'এই গার্লস আমি এসব চাংচুং ড্রেস পড়তে পারি না। সাহায্য করলে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখাবো। ' মেয়ে গুলো সেই কথা বুঝলো কিনা কে জানে। তার আগেই তৃষা তার পায়ের ওপর পাড়া দিয়ে বলল, 'দেন আমি সাহায্য করছি।'
প্রেমের পোশাকটি হচ্ছে লালচে রঙের লুঙ্গি, সঙ্গে কাপড়ের শার্ট। আর তৃষারটি হচ্ছে অপূর্ব বেগুনি, হলুদ আর সবুজ রঙে বোনা হ্যান্ডলুম জামা, যার কাঁধে ঝুলছে নরম, শাড়ির মতো এক টুকরো কাপড়। সেই কাপড়ে সূক্ষ্ম নকশা— ফুল, পাখি, আর জলের ঢেউয়ের মতো নকশা, যেন প্রকৃতিরই অনুবাদ। তৃষা পোশাকটি পরে বের হতেই বাতাস যেন কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেল। জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া আলো তার গায়ে পড়তেই সে যেন গ্রামীণ রঙে মিশে গেল একেবারে। চুলের পাশে ছোট্ট ফুল গুঁজে সে হাসল, “এরা কত সুন্দর করে বুনে, প্রতিটা সুতোয় যেন একটা গল্প লুকিয়ে আছে।”
প্রেম তাকিয়ে রইল নিরবতায়, তারপর মৃদু হেসে বলল,
“ এই বউ বলবো না তোমাকে মহা সুন্দরী লাগছে। বাট গড প্রমিস হেব্বি বাসর পাচ্ছে আমার। একটু চিপায় আসো প্লিজ।"
তৃষা চারপাশে তাকিয়ে প্রেমকে চোখ রাঙায়। উফ এই লোকটাও না!
সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের কেন্দ্রস্থলে জ্বলতে শুরু করল অগ্নিকুণ্ড। একটা বড় হারিয়ে যাওয়া আঁচরীর মতো। যা ধুলোকে উড়িয়ে দিয়ে উষ্ণ আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে।বাঁশের ভেতর ভরা ভাত ফুঁপে ফুঁপে ধোঁয়া ছুঁড়ছে আকাশ। মাটির হাঁড়িতে সাজানো খাবারগুলো। বাঁশের মধ্যে রান্না করা মাংস, ঝকঝকে সবজি, ধোঁয়া ওঠা বুনো মুগরির ঝোল, ঝিঁঝির কাঁকড়া সবই আছে। সঙ্গে সিদ্ধ সবজি, সিদোল দিয়ে মরিচ ভর্তা কি নেই তাতে?
আর বাঁশপাতায় মোড়া মিষ্টি পিঠা তার কোনো তুলনা নেই। খাবার শেষে সবাই আগুনের চারপাশে গোল করে বসল। আগুনের ফটকার শব্দ কানে গম্ভীর তাল বেঁধে দিচ্ছে। বৃদ্ধ একটা লোক মাঝে বসা। সেই লোকটি স্বরে-স্বরে বলতে শুরু করল, পাহাড়ের আত্মা, নদীর রাণী, আর হারিয়ে যাওয়া প্রেমের কাহিনি। তৃষা প্রেমের কাঁধে মাথা রেখে সেই গল্প শুনতে ব্যস্ত। মাঝে মাঝে সে চুপচাপ হেসে উঠছে গল্পের কাতারে মুখ চেপে ধরত। গল্পগুলো ভীতিকর ছিল না বরং তারা ছিল বিশ্বাসোদযাপন, সেই বিশ্বাস যে মানুষকে জোড়া লাগায় প্রকৃতির সঙ্গে। গল্পের এক মুহূর্তে প্রেম বলল, “এদের গল্পে কোনো ভয় নেই, শুধু বিশ্বাস।” তৃষা ধীর করে বলল, “হয়তো এই বিশ্বাসটাই ভালোবাসার প্রথম পাঠ।”
'তাহলে বাসায় চলো জলদি তোমায় ভালোবাসার দ্বিতীয় পাঠের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেই।' তৃষা প্রেমের চুলে হাত বুলিয়ে দিলো। অতঃপর বলল, 'আমার না প্রেম বিরিয়ানি খেতে মন চাইছে।'
'মাত্র না তুই মেয়ে নাদানের মতো গিলল? এত খাবার যায় কই?'
'তোমার নানির পু...'
'চুপ। কোথায় সই করতে হয় আজকে যাই একবার বাসায় তখন বুঝাবো।'
'এই যে...'
'হুম।'
'বিরিয়ানি খাবো।'
'তেহারি নাকি কাচ্ছি?'
'মানুষের মাংসের।'
চলবে?
#প্রেমতৃষা
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#সারপ্রাইজ_পর্ব
' আমার মাংস কেটে দেই বিরিয়ানি করে খাও। বউয়ের ক্রেভিংস বলে কথা। না করি কেমন করে?' তৃষা হাসল। হেসে বলল, 'আরে মজা করছি।'
'আই নো।'
'বাসায় কখন যাব।'
'বাসায় তো যাচ্ছি না বউ। আজকে জঙ্গলেই রাত কাটাব।'
'কি?'
'আরে হ্যাঁ। তুমি বিদায় নিয়ে বাইকের কাছে যাও। অংকুর সব ব্যবস্থা করে রেখেছে।'
তৃষা ঘড়ির দিকে তাকালো। তাকে চিন্তিত মনে হলো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে উঠে গিয়ে সকলের থেকে বিদায় নিলো সে। তারপর চেপে বসল প্রেমের বাইকে। তার বাইকটা আজকে সে সঙ্গে করে নিয়ে আসেনি। বরের বাইকে না বসলে মজা লাগে না। পেছন থেকে বরটাকে চেপে না ধরলে শান্তি লাগে না। কেমন কেমন জানি ফাঁকা লাগে। তারচেয়ে মজা লাগে পেছনে বসে বসে স্বামীকে বিরক্ত করতে। প্রেম পাহাড়ি পথে বাইক চালায় ভালোই স্পিডে। হঠাৎ প্রেম হেলমেটের নিচ থেকে বলল, 'এই শালীর ঘরের বউ দূরত্ব বজায় রাখ। এত ঘষাঘষি করিস না বাল, যখন বাইক থামিয়ে জঙ্গলে নিয়ে যাব তখন বুঝবি।'
তৃষা মুখ ভেংচি দিয়ে হাসল। তারপর বলল, 'শখ কত!'
-
রাত একেবারে নিস্তব্ধ। পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়েছে জঙ্গলের কোলে। গাছের মাথায় কুয়াশা, পাতা থেকে টুপটাপ শিশির ঝরছে। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁর একটানা ডাক। সেই নিস্তব্ধতার মাঝখানে জ্বলছে একটা অগ্নিকুণ্ড। জঙ্গলের বুক ফুঁড়ে উঠে আসা আগুনের লাল শিখাগুলো কাঁপছে বাতাসের সঙ্গে।তৃষা হাঁটু মুড়ে বসে আছে আগুনের পাশে, উলের শালটা জড়িয়ে। তার মুখে আলো আর ছায়ার খেলা—এক মুহূর্তে লাল, পরের মুহূর্তে ছায়াময়। পাশে বসে আছে প্রেম। প্রেমের হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ। "ঠান্ডা লাগছে?" প্রেম জিজ্ঞেস করতেই তৃষা এক চিলতে হাসে, চোখ তুলে তাকায়,, "না।" প্রেম হেসে ওঠে। এক মুহূর্ত পর উঠে তৃষার গলায় শালটা একটু শক্ত করে জড়িয়ে দেয়। তার হাত ছুঁয়ে যায় তৃষার গাল, হালকা কাঁপুনি খেলে যায় তৃষার শরীরে। আগুনের আলোয় দু’জনের ছায়া এক হয়ে যায়। তৃষা তাকিয়ে থাকে আগুনের দিকে। বলে, “জানো প্রেম, এই আগুনটা যেন আমাদের মতো একটু কাছে গেলেই পুড়িয়ে দেয়, আর দূরে গেলেই নিভে যায়।”
প্রেম মৃদু হেসে তার আঙুল ধরে বলে, “তাহলে ঠিক মাঝখানে থাকি… যেখানে জ্বলা আর নিভে যাওয়া—দুটোই আমাদের।” একটা শুকনো ডাল আগুনে পড়তেই হঠাৎ ছিটকে ওঠে স্ফুলিঙ্গ। তৃষা চমকে প্রেমের বুকে হেলে পড়ে। প্রেম এক হাত দিয়ে তাকে আঁকড়ে রাখে, আরেক হাতে তৃষার কপালের উপর চুল সরিয়ে দেয়। তাদের নিঃশ্বাস মিশে যায় ঠান্ডা বাতাসে, এক মুহূর্তের জন্য জঙ্গলটা নিঃশব্দ হয়ে যায়। উপরে তাকিয়ে দেখা যায়, আকাশজুড়ে তারার ভিড়। প্রেম বলে, “এই তারাগুলোর মতোই থাকবো আমরা, তৃষা—যতই দূর হই না কেন, এক আকাশের নিচে।” তৃষা তার কাঁধে মাথা রাখল। তৃষা তাকায় আগুনের দিকে, ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি, “আগুনটা দেখুন, প্রেম। কত সহজে জ্বলে ওঠে… কিন্তু কেউ জানে না, কতটা কষ্টে সে জ্বলতে থাকে?" প্রেম তাকিয়ে থাকে তার মুখের দিকে। আগুনের শিখা কাঁপে, আর তার আলোয় তৃষার চোখে ধরা পড়ে অচিন এক গভীরতা। সে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে তৃষার শালের কিনারা টেনে নেয় নিজের দিকে।
“তাহলে আমাকেও জ্বলে থাকতে হবে, যতক্ষণ না তুমি নিভে যাও।” তৃষা নিঃশ্বাস ফেলে।
“আপনি পুড়বেন প্রেম, আমি ছাই হয়ে যাবো।”
“তবুও থাকবো তোমার মাঝেই।" বলল প্রেম।
"তবে একটা কথা কি জানেন? ভালোবাসা আগুন নয় তবুও পুড়িয়ে দেয়। "
প্রেম জবাব দিলো না। এই মেয়ে কি না কি বলছে? নিজেই ভালো জানে কি হয়েছে। সে হঠাৎ তৃষাকে নিজের দিকে তাকাতে বলল। তৃষা তাকাতেই প্রেম বলল, 'তোমার চোখে...'
তৃষা নিজের চোখে হাত দিলো। অতঃপর বলল, 'আমার চোখে? আমার চোখে কি?'
প্রেম হেসে তৃষাকে বুকে জড়িয়ে দিলো। তারপর তৃষাকে আকাশের দিকে তাকাতে বলে গান ধরল,
~ 'তোমার চোখে আকাশ আমার,
জাদু জানে পূর্ণিমা,
ভেতর থেকে বলছে হৃদয় তুমি আমার প্রিয়তমা।~
তৃষা লজ্জা পেল। বলল, 'ইশ আপনিও না প্রেম নেওয়াজ।'
বৃষ্টি শুরু হলো হঠাৎই। জঙ্গলের গন্ধে ভিজে গেল চারদিক। আগুনের শিখাগুলো একে একে নিভে যেতে লাগল, আর আকাশ থেকে নামল ঝরনার মতো টুপটাপ শব্দ। তৃষা ভিজে চুল সরিয়ে চোখ তুলে তাকাল প্রেমের দিকে, “চলুন, টেন্টে যাই… ঠান্ডা লাগবে।”
প্রেম মাথা নাড়িয়ে তার হাত ধরল। দু’জন দৌড়ে গেল আগুনের পাশে রাখা ছোট টেন্টটার দিকে। ভিতরে ঢুকতেই বাইরের পৃথিবীটা একেবারে থেমে গেল। শুধু বৃষ্টির শব্দ ক্যানভাসের ওপর টুপটাপ পড়ছে।
একটা লণ্ঠন জ্বলছে ভেতরে—নরম, কমলা আলোয় টেন্টটা সোনালি হয়ে উঠেছে। তৃষা কাঁধ থেকে শাল নামিয়ে রাখল পাশে। চুলের ডগা থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে গালে। প্রেম আস্তে করে বলল, “তুমি পুরো ভিজে গেছো…”
তৃষা ঠোঁট কামড়ে হাসল। “আপনি-ও তো কম ভেজেননি।” প্রেম তার দিকে এগিয়ে আসে। আলোটা দুলে ওঠে হাওয়ায়, আর তাদের ছায়া টেন্টের দেওয়ালে মিশে যায় একে অপরের সাথে। এক মুহূর্ত—দু’জনের চোখে চোখ হয়। বাইরে বজ্রপাতের আলো এসে ঝলকে যায়, আবার অন্ধকার। প্রেম তৃষার মুখের কাছাকাছি এসে থেমে যায়, ফিসফিস করে, “এই বৃষ্টি, এই রাত… যেন থেমে না যায় সোনা।”
তৃষা চোখ নামিয়ে বলে, “থামলে কি হবে?"
'দেখতে চাও কি হবে?'
'দেখান।'
'আরে বউ তুমি চেয়েছো না দেখিয়ে থাকি কি করে?' প্রেম গা থেকে শার্ট খুলে ফেলে দিলো। তৃষা তখনো নিচে দিকে তাকিয়ে আছে। লজ্জা করছে ভীষণ। প্রেম তৃষাকে নিজের দিকে তাকিয়ে হাস্কি স্বরে বলল, 'তোমার জামা ভিজে গেছে। মে আই হেল্প ইউ?'
তৃষা তখনো জবাব দিলো না। প্রেম বাঁকা হেসে নিজের হাত বাড়িয়ে দিলো। দু'জনের মধ্যকার উষ্ণ দূরত্ব কমে আসতেই প্রেম হাসল। তৃষার দেহের রহস্যময় জাল খুলতে খুলতে গেয়ে উঠল,
~tu hi meri shab hai
subha hai
tu hi din hai mera
tu hi mera rab hai
jahaan hai
tu hi meri duniyaaaa
tu waqt ! mere liyeeeee
main hoon tera lamha
kaise rahega bhalaaaaa
hoke tu mujhse judaaaaa~
_
মধ্যরাত তখন। তৃষার পানির তৃষ্ণায় ঘুম ভাঙতেই সে উঠে বসল। প্রেমকে ডেকে তুলতেই প্রেম ওঠে বসে জিজ্ঞেস করল, 'কি হয়েছে সোনা? খারাপ স্বপ্ন দেখেছো?'
'না। '
'তাহলে?'
'একটু আগে তৃষ্ণা পেয়েছিল তবে এখন তো ক্ষুধা ক্ষুধাও লাগছে।'
প্রেম ট্যান্টের মধ্যে খাবার খুঁজে দেখল। বলল, 'সব খেয়ে ফেলেছো?'
'ইয়ে মানে.....'
'আরে বউ সমস্যা নেই। তুমি খাবে না তো আর কে খাবে? যত খেতে হয় খাবে। চৌদ্দ গুষ্টির নাম ডুবিয়ে খাবে।' বলেই প্রেম হাসল।
'প্রেম।'
'আরে সরি সোনা। বাই দ্য ওয়ে আমারও কিন্তু ক্ষুধা পেয়েছে।' বলেই সে চুমু খেলো তৃষাকে। এত আরামের ঘুম বিসর্জন দিয়ে বলল, 'বউয়ের জন্য ঘুম কেন? জীবনটাও বাজি লাগাতে পারি।'
বলে সে ট্যান্ট খুলতেই তৃষা থামিয়ে দিয়ে বলল, 'এই এভাবে যাবেন। সম্পদ ঢাকুন।' বলেই শার্টটা প্রেমের মুখে ছুঁড়ে মারল। প্রেম শার্টটা নিয়ে বলল, 'শালার কপাল। পিচ্ছি মেয়ে যে কিনা আমায় দেখলে ভয়ে মুতে দিতো সে এখন মাঝ রাতে আমার শখের ঘুম ভাঙিয়ে নিজের খাবার আনাচ্ছে।' বলেই বাইরে গেল সে। বাইক স্টার্ট দিতেই তৃষা হেলমেট পড়ে তার পেছনে বসে পড়ল। দু'জনে রাইড করে অনেকদূর চলে এলো। মাঝে প্রেমকে পেছনে বসিয়ে কিছুপথ তৃষা নিজে রাইড করে। কিন্তু বেশিক্ষণ করতে পারল কই? এই লোক যা মানুষ। তার আবার পেছন থেকে খোঁচানোর স্বভাব।
সামনের দিকে দু'টো রাস্তা চলে গেছে। একটা সদরের দিকে। প্রেম অন্যটা দিয়ে যেতে নিলে তৃষা বাঁধা দিলো। বলল সদর দিয়ে যান। ওখানে ভালো ভালো দোকান আছে। প্রেমের মন সায় দিচ্ছিলো না। খাবারের জিনিসই তো। কাছ থেকে নিলেই হতো। কিন্তু বউয়ের কথা ওই যে ফেলতে পারে না। বাইকের গতি প্রেম বাড়িয়ে দিলো। তৃষা হঠাৎ পেছন থেকে বলল, 'আমি চলন্ত বাইক দাঁড় হই? আপনার সামনে এসে উল্টো হয়ে বসি?'
'সোনা ইন্ডিয়ান মুভি একটু কম দেখো। নইলে বাইক থেকে কিক মেরে ফেলে নতুন আরেকটা বিয়ে করব।'
'শালা মুখের কি ছিঁড়ি। বিয়ে করলে আপনার সম্পদ কেটে সদকা দিব।'
'শালীর ঘরের বউ আমার।'
প্রেম আরেকটু গতি বাড়িয়ে সামনে যেতেই হঠাৎ করে ট্রাফিক বিভাগের লোক রাস্তার সামনে দাঁড়াতেই প্রেম বাইক থামিয়ে দিয়ে হেলমেট খুলে। গাড়ির সামনে দু'জন লোক দাঁড়িয়ে ছিল। ফোনের দিকে একবার তাকিয়ে প্রেমের দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, 'আপনার লাইসেন্স আছে।'
'সব আছে।'
'আপনি প্রেম নেওয়াজ?'
প্রেম ভ্রু কুঁচকে তাকালো। এই লোক তার নাম কি করে জানে? প্রেম কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই লোকটি অপর লোকটিকে কিছু বলতে সে গাড়ির কাছে গেল। তারপর প্রেমকে বলল, 'আপনার নামে মামলা আছে। অপহরণের মামলা। আপনাকে থানায় যেতে হবে। এখানকার লোকাল থানায়।'
প্রেমের মাথা গরম হয়। এই লোক বলছে কি? কাকে অপহরণ করেছে সে? 'কিসের অপহরণ? এখানে সার্কাস চলছে?'
হঠাৎ অফিসারদের পেছন থেকে একটা গলা ভেসে এলো। গম্ভীর সেই কণ্ঠের মালিক বলল, 'সার্কাস চলেনি এখন চলবে।'
লোকটি সামনে আসতেই তৃষা থমকে যায়। তবে প্রেম স্বাভাবিক। তৃষা কিছু বলতে যাবে তার আগেই প্রত্যুষ তার লোকেদের আদেশ করল। ' এক মুহূর্ত বসে না থেকে হ্যান্ডকাফ পড়াও।' তৃষা সামনে এসে জিজ্ঞেস করল, 'কিন্তু কোন অপরাধে? আর এসব কি হচ্ছে প্রত্যুষ?'
প্রেম প্রত্যুষের দিকে এগিয়ে এসে বলল, 'তাহলে তুমি আইনের লোক আসল ফর্মে চলেই এসেছো? আর কতদিন ভালো হয়ে থাকতে বলো? এখন ছোট ভাইকে হিরোর মতো মাঝ রাস্তায় আঁটকে কি প্রমাণ করতে চাইছো?'
' আর নিজে যে বড় ভাইয়ের বউ নিয়ে চলে এসেছো?'
'বউ না, হবুবউ। তোমার না হওয়া সুন্দরী এখন আমার মিসেস। মিসেস প্রেম নেওয়াজ।'
প্রত্যুষ রাগে হাত মুষ্টি বদ্ধ করল। একটা নিশ্বাস ছেড়ে তৃষাকে বলল, 'তৃষা আমি জোর করার আগেই আমার সঙ্গে আসো।'
'যাবে না আমার বউ তোর মতো ছাগলের সঙ্গে।'
'তৃষা!'
তৃষা তখনো চুপসে দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্যুষ তার দিকে তাকিয়ে আছে। 'জলদি আসো। এসে গাড়িতে বসো। অনেক নাটক হয়েছে।'
তৃষা তখনো চুপ। প্রেম তাকে বলল, 'আমি অংকুরকে কল করছি। তুমি শিমলা আর অংকুরের সঙ্গে বাড়ি যাও।'
'উঁহু বললাম না তৃষা আমার সঙ্গেই যাবে।' প্রত্যুষ মাঝ দিয়ে বলল। প্রেম রাগে তার দিকে চেয়ে বলল, 'দেখ ভাই মাথাটা বিগড়ে দিস না। এখানে বালের নাটক মারাতে আসেনি প্রেম। '
প্রেম অংকুরকে কল করতে যাবে তার আগেই প্রত্যুষের আদেশে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি ফোন কেড়ে নেয় প্রেমের। প্রেমের এবার পা অব্দি মাথা পর্যন্ত জ্বলছে। তৃষা একবার তার দিকে তাকায়। অন্যবার প্রত্যুষের দিকে। প্রেম মুখ বাঁকিয়ে বলল, 'শালার ভাই কাহিনি খতম করো। এখানে সিন্নি বিলাচ্ছি না বাল। আমার বউ তোর মতো বালের সঙ্গে যাবে না। তুই সামনের থেকে সরতো।'
'দেখবি ভাই তোরটা আমার সঙ্গে যায় কিনা?' বলেই প্রত্যুষ তৃষার দিকে তাকিয়ে হাসল। আর কিছু বলতে হলো না তাকে। তার আগেই তৃষা তার দিকে এগিয়ে গেল। প্রেম সেই দৃশ্য দেখে অবাক। কিছু বলার আগেই পাশের লোক তার হাতে হ্যান্ডকাফ পড়িয়ে দিলো। তৃষা প্রেমের সামনে প্রত্যুষের গাড়িতে উঠে গেল। প্রেমকে আইনের লোক দু'জন টেনে পেছেনের গাড়িতে উঠানোর চেষ্টা করছে। প্রেমকে টেনে নিয়ে যেতে পারছে না। প্রেম বার বার চিৎকার করে বলছে, 'তৃষা নেমে পর। খোদার কসম জানে মেরে ফেলব। প্রত্যুষের সঙ্গে গেলে মেরে ফেলব কিন্তু তৃষা। তুই অন্তত আমার হাতে জবাই হতে চাস না? এই তৃষা। বউ নেমে পড়। আমি বাড়ি ফিরলে শনি আছে তোর কপালে। বউ, নাম প্লিজ, প্লিজ নাম।' প্রেমের হাহাকার তৃষার কানে পৌছাল কি? প্রেমকে গাড়িতে বসানো হলো। তৃষা কথা বলছে না। নিচের দিকে তাকিয়ে সিটে বসে আছে। প্রত্যুষ গাড়িতে ওঠার আগে প্রেমের গাড়ির কাছে যায়। লোকেরা প্রেমকে আঁটকে রাখতে পারছে না। প্রেম পারছে না সবাইকে এখানেই শেষ করে ফেলে। রাগে শরীরের রগ নীল হয়ে এসেছে। প্রত্যুষ গর্ভের সহিত প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে সালাম ঠুকে বলল, 'থানায় দেখা হবে বে আইনের লোক।'
চলবে?