#প্রেমতৃষা
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#পর্ব_৪২ (প্রথম অর্ধেক)
ভোর তখনও পুরোপুরি হয়নি। আকাশের গায়ে ফিকে ধূসর মেঘের ওপর প্রথম সূর্যালোকের কমলা ছোঁয়া পড়ছে। দিগন্তজোড়া সমুদ্র যেন এখনো ঘুমের ভেতর। ঢেউ আসে, ফিরে যায়, আবার আসে, যেন সে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। সবকিছুই কেমন একটা ধোঁয়াটে। হাওয়া, আলো, বালির ওপর ছড়ানো ছায়া, এমনকি মানুষের মুখও। তৃষা হালকা নীল শালটা কাঁধে জড়িয়ে বালির ওপর বসে আছে। তার চোখের নিচে কালচে ক্লান্তি, তবু আজকে সেটি নরম দেখাচ্ছে। রাতে ঘুমানোর চেষ্টা করেছিল। তবে মাঝ রাতে একটা খারাপ স্বপ্ন দেখল। তারপর আর ঘুম এলো না। নিজেও ঘুমাতে পারল না, প্রেম কেউ জাগিয়ে রাখল।
তৃষার সামনে কফির কাপ। ধোঁয়া উঠছে, কুয়াশার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। দূরে, খুব দূরে, সমুদ্রের কিনারায় একাকী দাঁড়িয়ে আছে প্রেম। কালো টি-শার্ট, ভেজা পায়ের ছাপ, হাতে একটা পুরনো ক্যামেরা। তৃষা তাকাতেই প্রেম ঝুঁকে ক্যামেরায় কিছু ছবি ক্লিক করে। তারপর হঠাৎই ফিরে তাকায়। দৃষ্টিটা সোজা তৃষার চোখে এসে ধাক্কা খায়। তৃষা হাসে না, শুধু ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য একটু নড়াচড়া। প্রেমের ঠোঁটেও উঠে আসে একটা অদ্ভুত হাসি। ধীরে ধীরে প্রেম এগিয়ে আসে।
বালিতে হাঁটার শব্দটা এত কোমল যে মনে হচ্ছে প্রতিটি পদক্ষেপ সমুদ্রের তরঙ্গকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। সে এসে তৃষার পাশে বসে পড়ল। একটু নীরবতা। কেবল ঢেউয়ের শব্দ, আর কফির ধোঁয়া কথা বলল নিজেদের মধ্যে। তৃষা ধীরে প্রেমকে বলল, “এখানে সকালটা অন্যরকম লাগছে।” প্রেম তাকালো না, শুধু হালকা স্বরে বলল,
“কারণ সূর্য এখনো জানে না, তুমি জেগে উঠেছো।”
তৃষা হেসে ফেলল “সবসময় এমন কথা বলেন কেন?”
“কারণ সাধারণ সকাল তো আর তোমার সঙ্গে মানায় না।” তৃষা কিছু বলল না। কফির কাপটা তুলে নিলো, ধোঁয়া তার মুখের সামনে নাচছে। প্রেমের চোখ সেই ধোঁয়ার আড়ালে তার মুখে পড়ল। একটা মৃদু হাওয়া এসে তৃষার চুলগুলো উড়িয়ে দিলো, এক ঝলকে কফির গন্ধ আর সমুদ্রের নোনতা হাওয়া মিশে যাচ্ছে। সূর্য তখন ধীরে ধীরে উঠে আসছে। আলো পড়ছে তৃষার গাল বেয়ে, চোখে এক মোলায়েম ঝিলিক।
প্রেম সেই আলো দেখতে দেখতে বলল, “তোমার মুখে সূর্যের আলো পড়তেই মনে হলো আজকের সকালটা তোমার সৌন্দর্য দেখে গান গাইছে।”
তৃষা হাসল, “আপনি আবারও কাব্যিক হয়ে গেলেন?”
“না, কেবল সত্যিটা বললাম।”
তৃষা তার দিকে গভীরভাবে তাকালো। তার চোখে কিছু কথা জমে আছে, যা বলা হয়নি কখনও। তবুও প্রেম বুঝে যায়। কারণ তার এই নীরবতাই সবচেয়ে জোরালো উচ্চারণ। কয়েক মিনিট এভাবেই কেটে যায়।
দু’জন চুপচাপ বসে থাকে, কেউ কিছু বলে না।
তৃষা কফির শেষ চুমুক নেয়, তারপর কাপটা বালির ওপর রাখল। বালিতে আঙুল দিয়ে একটা নাম লিখল।“প্রেম”। তারপর ঢেউ এসে মুছে দিলো সেটা।
প্রেম দেখে, একটু হেসে বলল, “তুমি জানো, নামটা মুছে গেলেও সমুদ্র সেটা ধরে রাখে। " একটু থেমে সে যোগ করল, “তুমি কি কখনও ভেবেছো, ভালোবাসা হয়তো সূর্যোদয়ের মতো? শুরুটা নিঃশব্দ, আলোর আগমনের আগে একরাশ কুয়াশা, তারপর আস্তে আস্তে সবকিছু দৃশ্যমান হয়ে ওঠে?”
তৃষা চুপ থাকে কিছুক্ষণ, তারপর বলে, “হয়তো তাই। হয়তো সেই কুয়াশার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে ভালোবাসার আসল রূপ।” তৃষা তাকিয়ে থাকে দিগন্তের দিকে। সূর্য এখন পুরোপুরি উঠে গেছে।
আলো ছড়িয়ে পড়েছে সাগরের ঢেউয়ের গায়ে, বালির ওপর, তাদের মুখে। তবুও তৃষার মনে হয়, সকালটা এখনো অর্ধেক জেগেছে। প্রেমের হাত আলতো করে তৃষার হাত ছুঁয়ে যায়। তৃষা চমকে ওঠে না, কেবল আঙুলের ভেতর আঙুল মেলিয়ে নেয়। তাদের হাতের ফাঁকে জমে থাকা নরম উষ্ণতা যেন পুরো সকালটাকে জাগিয়ে দেয়। তৃষা বলে, “যদি কখনও এই মুহূর্তটাকে ভুলে যাই?” প্রেম শান্ত গলায় বলে, “তাহলে চোখ বন্ধ করবে, দেখবে মুহূর্ত ফিরে এসেছে।" তৃষা চুপ করে থাকল। তার মুখে সূর্যের আলো, চোখে সাগরের প্রতিফলন। দূরে একটা ছোট নৌকা যাচ্ছে, ঢেউয়ের ফেনা বাতাসে উড়ে এসে তাদের মুখে লাগে।
প্রেম হঠাৎ ক্যামেরা তোলে। ক্লিক করে একটা মুহূর্ত চিরকালের জন্য বন্দি করে ফেলে। তৃষা বলল,,
“ছবি তুললে?”
“হ্যাঁ, কারণ সময় থামানো যায় না, কিন্তু তার ছায়া ধরা যায়।”
তৃষা হাসল। তার হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় বাতাসে, কুয়াশায়, সমুদ্রের গর্জনে। সবকিছু মিলেমিশে এক অদ্ভুত লহমা তৈরি হয়। সূর্য এখন উঁচুতে।
তবুও তাদের চারপাশে যেন এখনো সেই প্রথম আলোর মায়া রয়ে গেছে। প্রেম হাত ধরে বলল,
“চলো, একটু হেঁটে আসি?”
তৃষা বলল, “হাঁটব কোথায়?”
“যেদিকে সূর্য গেছে।”
তারা হাঁটতে থাকল, একসাথে।
তাদের পায়ের নিচে বালির ওপর পড়ে থাকে ছায়া দু’জনের, একটার ভেতরে আরেকটা। তৃষা একবার পেছনে তাকায়। ওখানে, বালির ওপর এখনো হালকা করে লেখা আছে তার নামের কিছু ভাঙা অক্ষর।
ঢেউ এসে আবার মুছে দিচ্ছে। তৃষা শক্ত করে প্রেমের হাত ধরে তার কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে হাঁটল। হঠাৎ কি একটা ভেবে জিজ্ঞেস করল, " আমাকে ছাড়া থাকতে পারবেন?"
প্রেম তৃষার কপালে চুমু দিয়ে গুনগুনিয়ে গানের স্বরে বলল,
~ কঠিন
তোমাকে ছাড়া একদিন
কাটানো এক রাত, বাড়াও দুহাত
হয়ে যাও আজ বাধাবিহীন~
-
সকাল শেষ হয়ে দুপুর গড়িয়ে এসেছে।
আকাশে তখন সাদা। সোনালি আলোর বিস্তার। সূর্য মাথার ওপরে, কিন্তু বাতাসে লবণমিশ্রিত একটা ঠান্ডা ছোঁয়া এখনো রয়ে গেছে। সমুদ্র তখন জেগে উঠেছে সম্পূর্ণ। তৃষা হাঁটু গেড়ে বসে আছে বালুর ওপর।
তার পাশে প্রেম, বালু দিয়ে ঘর বানানোর চেষ্টা করছে।
তৃষা হাসছে, “আপনি তো পুরো বাচ্চা!”
প্রেম চোখ না তুলে বলল, “না, আমি তোমার ভবিষ্যত বাচ্চার বাবা।" তৃষা হেসে ফেলল। তার হাতের মুঠোয় ভেজা বালু, সে তা প্রেমের মাথায় ছুঁড়ে দিল।
প্রেম অবাক হয়ে চুল থেকে বালু ঝাড়তে ঝাড়তে বলে,
“ওহ, যুদ্ধ চাও বুঝি?”
“হ্যাঁ! এখন যুদ্ধ।” প্রেম মুঠো ভর্তি করে বালু নিতেই তৃষা দৌড় দিলো। প্রেম তার পেছনে ছুটতে ছুটতে বলল, "এবার ধরতে পারলে ফেরার সময় দাদার বংশধর নিয়ে ফিরব রে তৃষার বাচ্চার।"
"ধরে তো দেখান মিস্টার হাইব্রিড করলা।"
"শালীর ঘরের বউ থাম।"
তৃষা থামলো না। দৌড়াতে দৌড়াতে পেছন ফিরল। তারপর গতি আরো বাড়িয়ে খিলখিলিয়ে উঠল।
ওদিকে অংকুর ও শিমলাও বালুর ঘর বানাতে ব্যস্ত।
অংকুরের মাথায় রোদ পড়েছে, ঘাম গড়িয়ে পড়ছে গলায়, তবু সে অমনোযোগে বালুতে কাঠি গেঁথে ছোট ছোট দেয়াল তুলছে। শিমলা একদিকে নারকেলপাতা এনে সাজাচ্ছে তাদের “বালুর ঘর।”
সে হেসে বলল, “এই ঘরে আমি থাকতে পারি, যদি পাশে তুমিই থাকো।”
অংকুর চুপচাপ, হাসি থামিয়ে তাকায় শিমলার দিকে।
তার চোখে সোনালি আলো। রোদ পড়ে তার গালের পাশে একরাশ আলোর রেখা তৈরি করেছে।
অংকুর ধীরে বলল, "তাহলে ঘরটা ভাঙতে দেব না।”
শিমলা বলল, “ঢেউ তো তবু আসবে।”
“আসুক। আমি আবার বানাব।” তাদের কথা শুনে দূর থেকে প্রেম মুখ বাঁকিয়ে বলে, " শালা ঘর বানানো বাদ দিয়ে তোর ভাবীকে বোঝা। বংশের বাত্তি শালীর জন্য জ্বালাতি পারছি না। বার বার সুইচ অফ করে দিচ্ছে। শালীর ঘরের বউয়ের জন্য ওপরে বসে বসে বাচ্চাগুলো আমার অভিশাপ দিচ্ছে।" প্রেমের কথা শুনে সবাই হেসে ওঠে। হাসির মধ্যে ঢেউ এসে ঘরটার এক পাশ ভেঙে দিল। তা দেখে শিমলা বলল, “দেখলে?”
অংকুর শান্তভাবে বলল, “ঘর ভাঙলেও, হাতটা তো এখনো ঠিকঠাক আছে? আবার বানাবো সমস্যা নেই।"
শিমলা মৃদু হেসে মাথা নিচু করে বলল, "তুমি ঘর বানাও, ঘর ভর্তি তোমার বাচ্চা মানুষ করার দায়িত্ব আমার। " সেই কথা শুনে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা তৃষাকে প্রেম মুখ বাঁকিয়ে বলল, "শীমলার পা ধোঁয়া লিকুইড খেয়ে কিছু শিখ শালীর বউ।"
তৃষা মুখ বাঁকিয়ে পুনরায় একটা দৌড় দিলো। অভ্র আর আয়েশা একটু দূরে দাড়িয়ে, দু'জনেই পানিতে। একেবারে অল্প পানিতে। হাঁটছে তারা মৃদু কিনারার সেই জলে। বাতাসে আয়েশার চুল উড়ছে, সমুদ্রের ফেনা তার হাঁটুর কাছে লেগে আছে।
অভ্র হাত ছুঁইয়ে দেয়, বলে, “ভয় লাগছে না?”
“সমুদ্রের ভয় নেই, কিন্তু তোমার চুপ থাকা ভয় পাই।”
অভ্র কিছু বলল না। দূরে তাকিয়ে থাকে। ঢেউয়ের দিকে, যেখানে সূর্যের আলো ভেঙে ঝিকমিক করছে।
তারপর ধীরে বলল, “চুপ থাকলে যদি তোমার চোখে আমার কথা শোনা যায়, তাহলে আর কিছু বলার দরকার কী?” আয়েশা তার হাত চেপে ধরল।
তাদের চারপাশে নোনাজল উড়ছে, গাঙচিল উড়ছে মাথার ওপর দিয়ে। আয়েশা অভ্রর দিকে তাকিয়ে বলল, " অনেক ভালোবাসি তোমায়।"
"তাহলে আরো চারটা বিয়ে করতে দাও,প্রমাণ চাই আমার।"
আয়েশা রেগেমেগে একাকার সে কথা শুনে। ক্ষেপা কণ্ঠে বলল, "সরকারের বাচ্চার, তোর খাবারে থু দেব, লুঙ্গিতে তেলাপোকা ছাড়ব। রাতে বাথরুমে শোয়াবো।"
"এই ঘরণী মাফ চাই বউ, আর ভুলবাল কথা মুখ থেকে বের হবে না।" অভ্রের কথা শুনে পাশ থেকে ফারাজ বলল, "ছোটলোক মানুষের সঙ্গে ছোটলোকি কারবারই হবে। দাড়া ভাই এবার ঝমেলার সঙ্গে তোর একটা সেটিং করিয়েই ছাড়ব।"
"ভাই পেছনে আমার গুলি মারেন বন্দুক ঢুকিয়ে। তাও এইসব বইলেন না।" ফারাজ মুখ বাঁকিয়ে চিত্রার কাছে চলে গেল। ফারাজের চোখে সানগ্লাস, শরীরে সমুদ্রের জল টলমল করছে। সে খালি গায়ে সমুদ্রের জলে নেমেছে। চারপাশে কত মেয়ে মানুষ। ফারাজের শরীরের দিকে তাকিয়ে আছে। চিত্রার রাগ হচ্ছে খুব। বেহায়া মেয়েলোক। বিবাহিত পুরুষের দিকে নজর দেয়। মন তো চায় জলে চুবিয়ে মারতে সব গুলোকে। " এই হয়েছে অনেক ভিজেছেন। উঠে পড়ুন এইবার।"
"আরে আগুন সুন্দরী এখনো আবার সুরক্ষা বস্ত্রও ভিজেনি। আর তুমি বলছো উঠে আসতে?"
"আর ভেজানোর দরকার নেই। উঠুন। মেয়ে মানুষ আপনাকে নেংটা দেখে জ্বালা মেটাচ্ছে, হা করে তাকিয়ে আছে এসব দেখতে খুব ভালো লাগছে?"
"কোন শালী নজর দেয়? ওরা কি জানে না দুনিয়ার সব নারীর আব্বা লাগি। আমি খালি আমার বউয়ের স্বামী।"
"বউয়ের তো স্বামীই হবেন। নানা তো আর না? এখন ঢং না করে উঠে আসুন।"
ফারাজ উঠে এসে চিত্রার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল, "চলো রুমে যাই। গরম গরম লাগছে। গরম লাগলে কি করি আমি জানো না?"
"ছি আপনি এত মানুষের সামনে এসব কি বলছেন?"
ফারাজ অসহায়ের মতো তাকালো চিত্রার দিকে। বলল, "গরম লাগলে এসির বাতাস খাই। সেটাই বলেছি।"
"উফস ওইটা? আমিও না।"
"আবুলের নানতি যা গিয়ে সমুদ্রের নোনা জল নিয়ে কালা মাইন্ডটা পরিষ্কার করে সাদা বানিয়ে আন। হুহ!"
চলবে?
#প্রেমতৃষা
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#পর্ব_৪২ ( শেষ অর্ধেক)
রাতের সমুদ্রের নিজস্ব ভাষা আছে। দিনের চিৎকার থেমে গেলে, যখন ঢেউয়ের গর্জন আর বাতাসের গুঞ্জনই একমাত্র শব্দ হয়ে থাকে, তখন সমুদ্র ধীরে ধীরে নিজের গল্প বলতে শুরু করে। রাতের কক্সবাজার আজ থেমে আছে শুধুই প্রেমতৃষার জন্য। চাঁদের আলো নেমে এসেছে সমুদ্রের জলে, ঢেউয়ের মাথায় রুপোলি ফেনা ঝিকিমিকি করছে তাদের চোখের প্রতিচ্ছবির মতো। সমুদ্রতটে সাজানো এক ছোট কাঠের ডেক। তার চারপাশে ফুল, মালা আর সারি সারি মোমবাতির নরম আলো জ্বলজ্বল করছে। বাতাসে মিশে আছে সমুদ্রের নোনাভাব আর সাদা লিলির সুবাস। তৃষা ধীরে ধীরে হেঁটে আসে। তার নরম সাদা পোশাকে বাতাসে দোল করছে। প্রিমরোজ ফুলের জুয়েলারিতে তাকে লাগছে দারুণ। মনটা যদিও খারাপ। কারণ চিত্রা সহ বাকিরা চলে গেছে। তারাও আর এক দু'দিন থেকে চলে যাবে। সুন্দর সময় কত জলদি ফুরিয়ে যায় তাই না? ঠিক তখনই টেবিলের অপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকে প্রেম তার দিকে তাকায়। প্রেমের চোখ তৃষার ওপর থেকে সরছে না। তৃষাকে কোনো অংশে ডিজনি প্রিন্সেসের থেকে কম লাগছে না। তৃষাও প্রেমের দিকে তাকায়। সাদা শার্টের ওপর হালকা ধূসর ব্লেজার, হাতের ঘড়িতে কেমন যেন একটা চাঁদের আলো পড়ে চিকচিক করছে। তার বাদামী রঙের ফক্সআই গুলো নেশালো হায়নার মতো দৃষ্টিপাত করেছে তৃষার ওপর। তৃষা তাকিয়ে থাকে, কিছু বলার আগেই তার ঠোঁটের কোণে একটা নরম হাসি জমে যায়। প্রেম চেয়ার টেনে বলল, “মাই লেডি।” তৃষা হেসে বসল। বাতাসে মোমের শিখা কেঁপে ওঠছে। টেবিলে সামুদ্রিক খাবার, হালকা সালাদ, আর একজোড়া ওয়াইন গ্লাস।
কোনো অতিরিক্ততা নেই, শুধু আন্তরিকতা, যেমন তাদের ভালোবাসা। তৃষা বলল,
“এই জায়গাটা স্বপ্নের মতো।”
প্রেম মৃদু হাসল, “স্বপ্ন না হলে ভালোবাসা কেমন?” প্রেম তৃষাকে খাবার সার্ভ করতেই বলল, 'এখন তুমি পেট ভরে খাবে, তারপর আমার পালা।'
'মানে?'
'কিছু না খাও।'
'আপনি খাবেন না?'
'খাওয়ার জন্যই তো এত আয়োজন।'
ঢেউয়ের ছন্দে ডিনার এগিয়ে চলল । পাশেই দু'জন লোক ভায়োলিন বাজাচ্ছে। চারপাশটা সাজানো হয়েছে হলুদ বাতি দিয়ে। কি দারুণ লাগছে। ডিনার শেষে প্রেম উঠে দাঁড়ায়। দূরে বালির ওপর রাখা একটা ছোট পিয়ানো, চারপাশে গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো, আর পাশে সারি সারি মোমবাতি। সে তৃষার দিকে তাকিয়ে বলল, “আজ তোমার জন্য কিছু বাজাব।”
তৃষা হালকা অবাক হয়ে হাসে, “তুমি পিয়ানো বাজাও?”
প্রেম বলে, “এই তো এমনে এমনে শেখা।” সে পিয়ানোর সামনে বসল, আঙুল ছোঁয়ালো পিয়ানোতে। সমুদ্রের গর্জনের মাঝখানে ভেসে উঠল সুর। নরম, ধীর, ভালোবাসায় ভেজা একটা মেলোডি। তৃষার সাদা গাউনটা অত্যাধিক লম্বা হওয়ায় বাতাসে সব কেমন যেন উড়ছে। তৃষা পেছন থেকে প্রেমের কাঁধে তার হাতটা রাখল। চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনল সেই সুর। তার চোখে মোমের আলো ঝিকিমিকি করছে। মাঝে মাঝে বাতাসে তার চুল উড়ে এসে প্রেমের মুখ ছোঁয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে সুরটাও ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছে ঢেউয়ের আওয়াজে, রাত আরও গভীর হয়। সুর থেমে গেলে প্রেম ধীরে ধীরে উঠে আসে, তার হাত বাড়িয়ে দেয়।
“নাচবে?” তৃষা হেসে বলল, “সুর তো শেষ।”
প্রেম মাথা নাড়ল, “না, এখন শুরু।” পেছনে বাজতে শুরু করল নরম জ্যাজ। স্যাক্সোফোনের হালকা ঝংকার, সমুদ্রের ছন্দে মিশে গেল। তৃষা তার বুকের কাছে এসে দাঁড়ায়, প্রেম তার কোমরে হাত রাখে।
মোমবাতির আলোয়, চাঁদের তলায়, ঢেউয়ের ছন্দে
দু’জনের ছায়া বালির ওপর দুলে ওঠে। তৃষার মাথা ঠেকে থাকে প্রেমের কাঁধে, প্রেমের ঠোঁট ছোঁয়ায় তার চুলে, বাতাসে শুধু একটাই সুর, তা হচ্ছে "ভালোবাসা।"
ঢেউ এসে আলতো ছুঁয়ে যায় তাদের পা, মোমের আলো কেঁপে ওঠে তাঁদের বুক। পাশে সমুদ্রের গর্জন, বাতাসে তৃষার চুল উড়ে এসে প্রেমের মুখে লাগে। প্রেম মৃদু হেসে বলল, তোমার চুলেও কি সমুদ্রের গন্ধ লেগে আছে, বিটারহার্ট?
তৃষা তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর হেসে বলে, "গন্ধটা আমার নয়, তোমার তীব্র স্পর্শের।"
"আজ তোমাকে কিছু বলতে ইচ্ছে করছে।"
"বলুন, থামছেন কেন?"
জানো, এই সমুদ্রটাকে যতবার দেখি, মনে হয় ও আমার মতোই। বাইরে শান্ত, কিন্তু ভেতরে তোলপাড়।
" তাহলে আমি কী?"
"তুমি সেই ঢেউ, যে আমায় প্রতিদিন ছুঁয়ে যায়, আবার ফুরিয়ে যায়।"
তৃষা সমুদ্রের ঢেউয়ের দিকে তাকায়। "ফুরিয়ে গেলে আর থাকি কেমন করে?"
" স্মৃতি তো থাকবে, আর সেটাই সবচেয়ে ভয়ংকর সুন্দর। দূরে আরেকটি ঢেউ ভেঙে পড়ল তীরে।
"আপনি জানেন আমি কখনও কাউকে এত ভয় পাইনি যতটা আপনাকে হারানোর ভয় পাই।"
" আমি তো তোমারই, হারাবে কিভাবে?"
" মানুষ হারায় না, তবে সময় যে তাদের হারিয়ে দেয়।"
" তাহলে সময়কে আটকে রাখো।"
"কী দিয়ে?"
"তোমার একটুখানি ভালোবাসা দিয়ে।"
তৃষা হেসে মাথা নাড়ল, " আপনি সবকিছুর উত্তর ভালোবাসায় দেন।"
"কারণ সেটাই একমাত্র উত্তর, যেটা ভুল হলেও সুন্দর লাগে।"
"আচ্ছা আপনার জীবনে যদি আমি না থাকতাম?
"তাহলে এই সমুদ্রটা শুধু এক টুকরো জল হতো, ঢেউহীন, প্রাণহীন, আর জীবনটা হতো সেই প্রাণহীন সমুদ্রের মতো।"
"ওই দেখুন মোমবাতিটা নিভে যাচ্ছে প্রেম।"
" নিভে যেতে দাও। আলো থাকলে মুখ দেখা যায়, আর অন্ধকারে হৃদয়।
তৃষা একটু থেমে বলল, কখনো কি ভাবেন, যদি এই মুহূর্তটাই শেষ হয়?"
" না, কারণ তোমার সঙ্গে প্রতিটি মুহূর্তই অনন্তের মতো।"
" আর যদি অনন্ত শেষ হয়?"
তাহলে আমি আবার জন্ম নেব, শুধু তোমাকে ভালোবাসার জন্য।"
তৃষা আস্তে বলল, "আপনি জানেন প্রেম, ভালোবাসা কখনও একদিনে হয় না।
" জানি, তবু আমি প্রতিদিন নতুন করে তোমায় ভালোবাসি।"
" এই সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো?"
" না, ঢেউ তো ফিরে আসে। আমি ফিরব না, তোমার ভেতরেই থাকব।
তৃষা হালকা হেসে বলল, " কথাগুলো সিনেমার মতো শোনাচ্ছে। কোন সিনেমার সত্যি করে বলুন তো!"
"সিনেমা নয় কিন্তু একটা কথা কি জানল? ভালোবাসা হচ্ছে সিনেমার চেয়েও সত্যি।"
" তাহলে বলুন, সবচেয়ে প্রিয় জিনিস আপনার কী?"
" এই মুহূর্ত, যেখানে তুমি আছো, আমি আছি, আর সমুদ্র আমাদের সাক্ষী।" প্রেম একটু থেমে বলল,
"তৃষা?"
" বলুন।"
"এই সমুদ্রটা কেমন লাগে তোমার?"
"বিশাল। আপনার ভালোবাসার মতো, যার শেষ আমি খুঁজে পাই না।"
"আজ চাঁদটা দেখেছো?"
" হ্যাঁ, কিন্তু আপনার চোখে জোছনার চেয়ে বেশি আলো। আচ্ছা আপনার আবারও খিদে পেয়েছে?
" হ্যাঁ, কিন্তু খাবার নয়,তোমার কথার ক্ষুধা।"
"বাতাসটা বেশ ঠান্ডা। আপনার ঠান্ডা লাগছে না?"
" সমস্যা নেই। তোমার গভীর স্পর্শে উষ্ণ হয়ে যাব। আচ্ছা তুমি জানো, এ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শব্দ কী?"
" বলুন।"
“তৃষা।” ঢেউতেও এর প্রতিধ্বনি শোনা যায়।"
তৃষা হেসে বলে, আর আমার প্রিয় শব্দ?
“প্রেম?"
"ভুল বললে।"
" তাহলে কী?"
“আমরা।”
-
প্রেম আর তৃষা রাতে বিচের একটা রুমেই রাত কাটায়। চোখে যখন শেষ রাতে তৃষা তীব্র ঘুম ঠিক তখনই হঠাৎ করে তৃষা প্রেমকে বলল, "আমার না লাল গোলাপ ছুঁয়ে দেখতে মন চাইছে। আচ্ছা লাল গোলাপ আপনার কেমন লাগে?" প্রেম তৃষাকে বুকে জড়িয়ে বলল, "তুমি এখন ঘুমাবে? জলদি ঘুমাও তো সোনা।" তৃষা আর কিছু বলল না। প্রেমের বুকে মাথা রাখল।
ফজরের সময় যখন ঘুম ভাঙল তখন দেখল প্রেম উঠেছে। ঘুমের চোখে এত পাত্তা দিলো না। ভাবল আর কই যাবে? নিশ্চয়ই ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্যই উঠেছে। সবে সকাল সাতটার দিকে তৃষার দরজায় কে যেন কড়া নাড়ল। কয়েকবার কড়া নাড়ার পর ঘুম ভাঙল তার। চোখ কচলে পাশে তাকাতেই দেখল, "প্রেম নেই।" মানে কি? প্রেম কোথায় গেল? মনে পড়ে গেল ফজরের কথা। তার মানে কি? প্রেম কি তখন বাইরে গিয়েছে? কিন্তু এত ভোরে কেন? সে উঠে দরজা খুলতেই দেখল হোটল ম্যানেজমেন্ট থেকে একজন লোক এসেছে। সে তৃষাকে দেখে বলল, "স্যার আপনার জন্য এই লাল গোলাপের বুকে পাঠিয়েছে।" লোকটা তৃষাকে একটা কাগজ দিয়ে বলল, 'স্যার আপনাকে এটাও দিতে বলল।"
তৃষা সেখানে একটা ঠিকানা দেখতে পেল। সেই সঙ্গে লেখা," তোমার অপেক্ষায় বিহারহার্ট।"
তৃষা মনে মনে খুশি হলো। বলল, "আর কত সারপ্রাইজ দিবেন হাইব্রিড করলা?"
সে তৈরি হয়ে ঠিকানার উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করল। হোটেলের পশ্চিমে একটা বিরাট ঝাউ বন। একটা লোককে বিচে জিজ্ঞেস করে সেদিকটায় হাঁটা ধরল। ৭:৩০ এর মতো বাজে। এখনই কত মানুষ বিচে। তবে ওই ঝাউ বনের দিকটা ফাঁকা। মানুষ নেই বললেই চলে। কিছু শিশু বনের শুরুর দিকে বসে ছিল। তৃষার দিকে একবার কেমন করে যেন তাকালো। তৃষা পাত্তা না দিয়ে বনের মধ্যে প্রবেশ করল। প্রেমের চিঠি অনুযায়ী একটা বাড়ি থাকার কথা। খুঁজে পাচ্ছে না সে। অনেকটা হেঁটে ভেতরে দিকে এগিয়ে এগিয়ে যেতেই হঠাৎ আঁধার আরো বেশি ঘনিয়ে আসতে শুরু করল। শেষে বনের মাঝ বরাবর একটা কাঠের বাড়ি দেখে থমকে গেল। খুশিতে চোখ জ্বলজ্বল করল। দৌড়ে গেল সেই বাড়ির সামনে। ভাঙা একটা কাঠের বাড়ি। অনেক পুরোনো মনে হচ্ছে। তৃষার কেমন যেন গা ভার হচ্ছে। সে তবুও একবার মৃদু কণ্ঠে তৃষার নাম ধরে ডাকতেই পুরো নিস্তব্ধ জঙ্গলে কেবল তারই গলা ভেসে এলো। সে ফাঁকা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে হঠাৎ বলল, "প্রেম আছেন?" রুমে পা রাখতেই চোখ ছানাবড়া। রুমটা জীবন্ত আতঙ্কে থরথর করছে। তৃষা ভেতরে পা রাখতেই বাতাসের গন্ধ বদলে গেল। নোনাধরা সমুদ্রের গন্ধটাকে ছাপিয়ে উঠল এক অদ্ভুত লোহাধাতুর গন্ধ, "রক্তের গন্ধ।" ছাদ থেকে একফোঁটা পানি পড়ছে টুপটাপ শব্দে, কিন্তু সেটাও যেন রক্তের ছন্দে মিলিয়ে যাচ্ছে। মেঝেটা স্যাঁতসেঁতে, অন্ধকারে লালচে ছোপগুলো আলোর রেখা পেলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, হয়তো কেউ এখানে দীর্ঘক্ষণ কষ্টে ছটফট করেছে, রক্ত গড়িয়ে গেছে মেঝের ফাঁক বেয়ে। হঠাৎ পুরোনো একটা গ্রামোফোনের হুইসেল শোনা গেল,
চিরচেনা সুরে ভেসে এলো,
“প্রেম আমার… প্রেম আমার…”
তৃষা স্তব্ধ হয়ে গেল। তার নিঃশ্বাস আটকে গেল গলার কাছে। দেয়ালজুড়ে সারি সারি ফ্রেম—সব ছবিতেই তৃষা নিজে। এক ছবিতে সে সমুদ্রের ধারে হাসছে, অন্যটায় তার চোখে কান্না, আরেকটায় তার হাতের সেই ক্ষত।
সব ছবিতেই লাল দাগে ঘেরা। তৃষার চোখের কোণ কাঁপতে লাগল, একটা ছবির নিচে সে দেখল নিজের নামের পাশে লেখা, “শেষ সাক্ষাৎ।”
হঠাৎ বাতাসে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল প্রচণ্ড শব্দে।
বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে রুমের আলো নিভে গেল। রক্তমাখা দেয়ালগুলো যেন আরও কাছে এগিয়ে আসছে। তৃষা পেছনে ফিরতেই দেখল—দরজার পাশে ঝুলছে একটা কালো হুডি। হঠাৎ অনুভব হলো কেউ পেছন থেকে এগিয়ে আসছে। তৃষা পেছনে ফেরার আগেই পেছন থেকে এক জোড়া হাত তাকে ঝাপটে ধরে বলল, "উফস তৃষা, মৃত্যুর কত কাছাকাছি চলে এসেছো!"
চলবে?