#প্রেমোত্তাপ
#মম_সাহা
পর্ব: পঁচিশের প্রেম
ঝড় হচ্ছে অবিশ্রান্ত। অক্লান্ত বর্ষণ ধারায় ভিজছে পিচঢালা কংক্রিটের রাস্তাখানি। তার সাথে ভিজছে নিশ্চুপ, নিরবে দাঁড়িয়ে থাকা শত যুগের হলুদ বাল্ব গুলো। যার আলোয় ভেজা রাস্তাটিকে মনে হচ্ছে কুড়ির কৃষ্ণকলি। যৌবন যার দেহে টইটম্বুর। বৃষ্টির এই মধ্যরাত একা। এই ব্যস্ত রাস্তায় রাত বাড়তেই ঝুপ করে নেমে আসে একাকীত্ব। সেই একাকীত্বকেই সঙ্গী করে ভিজছে এক অভিমানী রঙ্গনা। প্রেমিকের বুকে যত্নে থাকা অবাধ্য ক্যাকটাস ফুল।
কম্পনরত হৃৎপিণ্ডটুকু নিয়েই এই একা রাস্তায় ছুটে এসেছে বাহার ভাই। অষ্টাদশীর শখের প্রেমিক পুরুষ। মাথা ভর্তি ঝাকড়া চুল গুলো বৃষ্টির ছোঁয়ায় অবাধ্য হয়ে লেপ্টে আছে কপালে। খুব শান্ত, নিবিড় ভাবে। নীল রাঙা টি-শার্টটাও বৃষ্টির কল্যাণে ভিজে একাকার। শ্যামলা পুরুষটির ছিমছাম শরীরে বৃষ্টিকে মনে হলো শৌখিন প্রেমিকা। যে প্রেমিকা, প্রেমিকের দেহ বেশ প্রেম নিয়ে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। চিত্রাকে এই ফুটপাতের এক কোণায় গুটিশুটি মেরে বসে থাকতে দেখে বাহারের হৃৎপিণ্ড শান্ত হলো কিন্তু কণ্ঠ হলো রুষ্ট। সে প্রায় বাজখাঁই গলায় চেঁচালো,
“এখানেই থাকবে সারারাত?”
হঠাৎ রাশভারি পুরুষ কণ্ঠে চিত্রার গুরুগম্ভীর ধ্যানে ভাঁটা পড়ল। সে ঘোলা-ঘোলা দৃষ্টিতে সামনে চাইল। একটানা বৃষ্টিতে ভেজায় চোখ জ্বালা করছে তার। জ্বর আসবে কী! ঠিক ঠাহর করতে পারল না সে। তবে প্রেমিকের রুষ্ট চোখ জোড়া সে ঠাহর করতে পারল। তাই কিছুক্ষণ মৌন থেকে জবাব দিল,
“আপনাকে আসতে বলেছে কে?”
“আর কে বলবে? তোমার পরিবারের মানুষ ছাড়া? তারা তো ভাবেই আমি আজাইরা। আমার কোনো কাজকর্ম নেই। তাদের মেয়ের মতিভ্রম হবে আর আমি আমার সকল কর্ম ফেলে সেই মতিভ্রমের পিছে বলদের মতন ঘুরবো। আছিই তো আমি। বিনে পয়সার বলদ।”
কথা থামল বাহার ভাইয়ের আর ক্ষত-বিক্ষত হলো চিত্রার অন্তর। সে ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে রইল মানুষটার দিকে। মনে মনে অভিমানও করল। মানুষটা তাহলে তার কথা ভেবে এখানে আসেনি? তাকে আসতে নিশ্চয় জোর করা হয়েছিল তাই এসেছে। সেজন্যই কী এত রেগে গিয়েছে? হয়তো! ভেতরে-ভেতরে কথা গুলো ভেবেই তপ্ত শ্বাস ফেলল চিত্রা। তার এই ছোট্ট জীবনে সবচেয়ে বড়ো আফসোস হলো- মানুষটা তাকে ভালোবাসে না। আর এই আফসোস সবচেয়ে যন্ত্রণার। বাহার ভাই তাকে ভালোবাসলে, তার বোধহয় আর দুঃখ থাকত না।
চিত্রার অভিযোগের গোপন শ্বাস অগোচর হলো না প্রেমিকের। সে-ও এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আসলে চিত্রার প্রতি তার রাগ না, একটা গোপন ভয় তৈরী হয়ে গিয়েছিল। যখন শুনলো মেয়েটা এত রাতেও বাড়ি ফেরেনি, তখন অনাকাঙ্খিত ভয়ে তার মাথা দপ করে উঠেছিল। এই বুঝি মেয়েটা কিছু করে বসল। সেই ভয়টাই কণ্ঠে রাগ হয়ে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। বাহার হতাশার শ্বাস ফেলল। বড়ো বড়ো পা ফেলে খুব নিরবে গিয়ে বসল চিত্রার পাশে। নিভৃতে তাকাল মেয়েটার মুখের দিকে। চোখ গুলো কেমন লাল হয়ে গিয়েছে না মেয়েটার? অথচ সে হুশ কী তার আছে? না, নেই। মেয়েটা আজকাল কেমন জেদি হয়েছে। নিজের সকল সিদ্ধান্তে একরোখা মনোভাব প্রকাশ করছে। কীভাবে তাকে বুঝাবে যে দায়বদ্ধতার কাছে ভালোবাসাও বড়ো রঙহীন হয়ে যায় যে! অবুঝ মেয়েটা কী সেটা বুঝবে? বাহার নিবিড় দৃষ্টি পথের দিকে নিবদ্ধ করল,
“এত জেদ করে কী লাভ হয়, রঙ্গনা?”
“প্রেমিককে পাওয়া যায়।” চিত্রার তৎক্ষণাৎ উত্তর। হাসল বাহার ভাই,
“প্রেমিককে পেলে কী হয়, রঙ্গনা?”
“প্রেম স্বার্থক হয়।”
চিত্রার আবার দ্রুতগামী উত্তরে বাহার ভাই একপলক চাইল তার পানে। বেরিয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস, সাথে ছন্নছাড়া মানুষটির গোছানো কথা,
“প্রেমিককে পেলেই প্রেম স্বার্থক.... কে বলেছে, মেয়ে? প্রেম স্বার্থক হয় নিঃস্বার্থ ভালোবাসায়। যেখানে চাওয়া-পাওয়া থাকে সেখানেই স্বার্থ জড়িয়ে যায় যে! আর সম্পর্কে স্বার্থ চলে এলে সঠিক ভাবে ভালোবাসা-বাসি আর হয়ে উঠে না। তখন মানুষ লেগে পড়ে স্বার্থ উদ্ধার করার কাজে। ভালোবাসা হলো খোলা আকাশ। যার দৈর্ঘ্য থাকবে না, প্রস্থ থাকবে না। যার পুরোটা জুড়েই থাকবে প্রশান্তি। হোক প্রাপ্তি কিংবা অপ্রাপ্তি, ভালোবাসা হতে হয় অমলিন। যা কখনো, কোনো কিছুর বিনিময়ে হারাবে না। নৈকট্য পেলেই প্রেম থাকবে, দূরত্ব পেলে প্রেম হারাবে— এমন প্রেম যে খাঁটি নয়। নৈকট্য হোক কিংবা দূরত্ব, ভালোবাসার পরিমাণ যখন বদলাবে না, তখনই তো হবে প্রেম স্বার্থক। বুঝলে, রঙ্গনা?”
“খাঁটি প্রেম দিয়ে কী হবে, বাহার ভাই? যদি চাঁদনী আপার মতন না পাওয়ার যন্ত্রণা নিয়ে বাঁচতে হয়?”
চিত্রার গলার স্বর কিছুটা কোমল। হুট করে এমন প্রশ্নে থতমত খেল বাহার ভাই। তড়িৎ গতিতে তাকাল চিত্রার পানে। মেয়েটার চোখে-মুখে অসহায়ত্ব। বা-চোখটা দিয়ে খুব গোপনে মুক্তোর মতো অশ্রুকণা ঝরে পড়ল। এটাও অগোচর হলো না বাহারের। সে খুব গোপনে তপ্ত এক শ্বাস ফেলল।
“চাঁদনীর হয়তো না পাওয়ার যন্ত্রণা আছে তবে সে এটা জেনে শান্তি পায় যে তার তরফ থেকে সে যথেষ্ট ছিল। যখন আমরা নিঃস্বার্থ ভালোবাসি তখন আমরা নিজেরাই ভেতর ভেতর একটা শান্তি অনুভব করি। আমরা জানি, পুরো পৃথিবী মিথ্যে হতে পারে তবে আমাদের ভালোবাসা একমাত্র সত্যি। আর এই শান্তিটা জীবনকে একটি অনন্য মাত্রায় নিয়ে যায়, রঙ্গনা। কেবল পেতেই হবেতে আটকে থাকলে তুমি সেই অনুভূতি অনুভব করতে পারবে না, মেয়ে।”
“আপনি আমাকে যতই বুঝান বাহার ভাই, আমি পেতেই হবেতেই থেকে যাব।”
মেয়েটার একরোখা জেদ অটল রইল। বাহার ভ্রু কুঁচকালো খানিক। বিরক্ত হলো কি-না ঠিক বুঝা গেল না। তবে সে তার জায়গা থেকে উঠে দাঁড়ালো। বাহারকে উঠে দাঁড়াতে দেখে তৎক্ষণাৎ তাকাল চিত্রা। আবারও অভিমান হানা দিল তার বুকে। বাহার ভাই কি আবারও অষ্টাদশীর অভিমান না বুঝেই মুখ ঘুরিয়ে চলে যাবে? বুকের ভেতর জবাব বিহীন প্রশ্ন হামাগুড়ি দিতেই চিত্রা বলে উঠল,
“চলেই যেহেতু যাবেন, এসে ছিলেন কেন?”
মেয়েটার প্রশ্নে গা-ছাড়া ভাবে হাসল বাহার। মাথার ঝাকড়া চুল গুলো ঝেড়ে নিল নিঃসংকোচে। অতঃপর একটু নিচু হয়ে চিত্রার ডান হাতের বাহু আঁকড়ে ধরল এবং হেচকা টেনে দাঁড় করিয়ে দিল আকষ্মিক। মেয়েটাও থতমত খেল প্রায়। চিত্রার থতমত হওয়া চেহারার লাল চোখের পাতা গুলো খুব আলতো ছুঁয়ে অগোছালো বাহার ভাই বলল,
“থেকে যাওয়ার জন্যই তো এলাম। রেখে দাও। তোমার কথাই রইল, খুব শীগ্রই আমাদের বিয়ে হবে। রঙ্গনার অবাধ্য বাহার ভাই তার হবে। এবার চলো বাড়ি। নিজের প্রতি তোমার এত অবহেলা আমার একদম পছন্দ নয়, মেয়ে। মনে রেখো, তুমি মানে কেবলই তুমি নও। তুমি মানে কখনো কখনো আমি। তাই তোমার যত্নের নামে তুমি একটু আমার যত্ন নিও।”
চিত্রা এই আকস্মিক প্রেম প্রস্তাবে হতবিহ্বল। অথচ বাহার বেপরোয়া। বেখেয়ালি কণ্ঠে গান ধরল,
“যদি তুমি ভালোবাসো
ভালো করে ভেবে এসো
খেলে ধরা কোনোখানে রবে না
আমি ছুঁয়ে দিলে পরে
অকালেই যাবে ঝরে
গলে যাবে যে বরফ গলে না
আমি গলা বেচে খাবো
কানের আশেপাশে রবো
ঠোঁটে ঠোঁটে রেখে কথা হবে না
কারো একদিন হবো
কারো এক রাত হব
এর বেশি কারো রুচি হবে না
আমার এই বাজে স্বভাব
কোনোদিন যাবে না...”
#চলবে
[অনেক অসুস্থতার পর আবারও শুরু করলাম। যদিও সুস্থ নই এখন। তবুও আপনাদের এত অপেক্ষা দেখে দিলাম। রেসপন্স করবেন। ভালোবাসা নিবেন।]