দেশে থাকতে কখনো একা ঘুরতেও যায়নি আর আজ দুঃসাহস দেখিয়ে যাদের ভরসায় বিদেশ পারি দিয়েছে তাদেরই কোনো খবর নেই।
এই সমস্ত কথা গুলো ভাবতে ভাবতে হঠাৎ শুনতে পেলো বিদেশি একসেন্টে কেউ বলছে "আর ইউ ম্যারিরমা?"
মেয়েটি পাশ ফিরে তাকালো, দেখলো বেশ লম্বা একটা বিদেশি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে,তাকে দেখতেও মাথা উঁচু করতে হলো। ছেলেটি আবার হাতের মোবাইলে তাকিয়ে কি যেন মিলিয়ে নিয়ে বলল"তুমিই ম্যারিরমা তাই তো?"
মেয়েটি অপ্রসন্নতা মুখে বলল"কোন মেয়ের মা?"
ছেলেটি তাকে নিজ মোবাইলের স্ক্রিন দেখালো যেখানে মেহেরিমা আফশীন এর ছবি সহ পরিচয় পত্র আছে।
আফশীন দাঁড়িয়ে গেল মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছেনা মনে হচ্ছে সে জীবনেও ইংরেজি উচ্চারণ করেনি অনেক কষ্টে বলল "হোয়াই?"
ছেলেটি বলল"দেন ফলো মি"
আফশীন আবার বলল"হোয়াই? "
এবার ছেলেটা একটু বিরক্ত হলো তবে প্রকাশ না করে বলল"শ্যায়লা আন্টি কে চেনো? উনি আমাকে পাঠিয়েছে।"
ছেলেটা সামনের দিকে এগিয়ে গেলেও আফশীন দাঁড়িয়ে আছে এখনো। পিছনে ফিরে আবার বলল"হোয়াট হ্যাপেন্ড?"
"আমাকে আফশীন ডাকবে বুঝলে?আর তোমার সাথে কেন যাব?"
এবার ছেলেটি বিরক্ত হয়ে বিরবির করলো"ফিনল্যান্ড এর মতো শান্তির দেশে এ কোন পাগল এসে পড়েছে"
কোনো কথা না বাড়িয়ে নিজের ফোন থেকে কল দিয়ে আফশীনের কানে ধরিয়ে দিলো।
ফোনের অপর পাশে আফশীনের খালামনি শায়লা রহমান বলল"হ্যালো আফশীন দুঃখিত একটু দেরি হয়ে গেছে তাইনা? তুই মন খারাপ করিস না, কেলিয়ান এর সাথে চলে আয় ঘরে। "
আর কী করার শেষমেশ এমন একটা ছেলের সাথে নতুন ঠিকানায় যেতে হলো যে কিনা আফশীনের নামটা পর্যন্ত নিতে জানেনি।
এক ঘন্টা ৪৮ মিনিট হয়ে গেছে কিন্তু তবুও প্লেনের ঝা ঝা আওয়াজ ঘুরপাক করছে মাথায়। পুরো সতেরো ঘন্টা জার্নির পর মেয়েটি এতোক্ষণ "ফিনল্যান্ড এর টাম্পেরে পিরকালা বিমানবন্দরেই বসে ছিল। এভাবে একা বসে থেকে কান্না পাচ্ছিল তার,কিন্তু প্রথমবার ভিনদেশে এসেছে তাই নিজের ওয়েলকাম টা কান্না দিয়ে করতে চায়নি।
যতটা কান্না এতোক্ষণ বিমানবন্দরে অপেক্ষা করে এসেছিল, তার চাইতেও বেশি নিজের বিকৃত নাম শুনে এসেছে।
রাস্তায় যেতে যেতে আফশীন ভেবেছিল ছেলেটা হয়তো একটু মিশুক হবে কথা বলবে, কিন্তু না বড়ই একঘেয়ে।অন্তত নিজের পরিচয় দিয়ে ভাব বিনিময় করতে পারতো কিন্তু তাও করেনি।খালামনি বলেছিল কি যেন একটা নাম অনেকটা "দাঁত কেলানো "টাইপ।
::
::
বাসায় পৌঁছে যাবার পর আফশীনের বিস্ময় যেন কাটছেই না এতো সুন্দর বাসাটা।দেখতে মনে হচ্ছে এতো সিম্পল কিন্তু ইন্টেরিওর টা এতো দারুন সবকিছুর মিশেলে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে।
ঘরে উপস্থিত ছিল শায়লা রহমান এবং তার স্বামী সায়মন জেস্টন। বড় খালার দুই মেয়ে আর এক ছেলে। তাদের মধ্যে শুধু ছোট মেয়ে জেমি ই উপস্থিত ছিল। বড় দুজন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।
আর আছে নানুমনি, শায়লা রহমান তাকে নিজের কাছেই এনে রাখতো প্রায় যেহেতু একটা মেয়ের বিশেষ সময়ে মায়ের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি হয় ।
আফশীন ভীষণ খুশি কাছের মানুষ গুলোকে পেয়ে।
ঘরে আছে আর একজন বাঙালি পরিচারিকা জোহরা খালা তিনি নানু বাড়িতেই বড় হয়েছিল। পরে শায়লা রহমান যখন গর্ভবতী ছিলেন তখন তাকে মায়ের সাথে এদেশে নিয়ে আসে।
শায়লা রহমান বলল যাও এবার ফ্রেশ হয়ে এসো, খাবার খেয়ে ঘুম দিও।
আফশীন বলল"আমার খেতে ইচ্ছে করছেনা একটু ঘুম দিলে হয়তো ভালো হতো।
"আচ্ছা ঠিকাছে তোর যেভাবে ইচ্ছা ওভাবেই কর।"
আফশীন নিজের জন্য বরাদ্দ ঘরে গিয়ে দেখলো বেশ পরিপাটি একটা ঘর, নীল রঙ্গা থিমে সাজানো।সাথে লাগানো বারান্দা দেখতে পেয়ে দ্রুত চলে গেল সেদিকে,দরজা খুলতেই প্রচুর বাতাস, আফশীনের যেন চক্ষু চড়াকগাছে সাত তলা থেকে নিচের পরিবেশটা দেখতে যেন স্বর্গীয় একটা অনুভূতি হচ্ছে,যদিও স্বর্গ একটি অতুলনীয় ব্যাপার তবে এই দৃশ্য যেন তার আংশিক খুশি প্রকাশের ভাষা ।নগরে বহমান নদী যা বড় বড় দালানের বাঁকে বাঁকে প্রবাহিত হচ্ছে
দেখেই মুখে এলো "সুবহান আল্লাহ"
তিনিই আল্লাহ, যিনি নভোমন্ডল ও ভুমন্ডল সৃজন করেছেন এবং আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে অতঃপর তা দ্বারা তোমাদের জন্যে ফলের রিযিক উৎপন্ন করেছেন এবং নৌকাকে তোমাদের আজ্ঞাবহ করেছেন, যাতে তাঁর আদেশে সমুদ্রে চলা ফেরা করে এবং নদ-নদীকে তোমাদের সেবায় নিয়োজিত করেছেন।(সূরা ইব্রাহীম ৩২)
নীচের থেকে চোখ সরিয়ে যখন উপরে তাকালো, ভাসমান মেঘ দলে দলে যেন যাত্রাপালায় যাচ্ছে সূর্যের আলো উঁকি দিচ্ছে তাদের মাঝখান থেকে। এক আকাশী অনুভূতি যা বলে ব্যক্ত করা যাবেনা, নীচে নদ উপরে আকাশ,গায়ে জড়াচ্ছে ভুবনজয়ী বাতাস।
"এবং তোমাদের সেবায় নিয়োজিত করেছেন সূর্যকে এবং চন্দ্রকে সর্বদা এক নিয়মে এবং রাত্রি ও দিবাকে তোমাদের কাজে লাগিয়েছেন।(সূরা ইব্রাহীম : ৩৩)
;মুখে আওড়ালো সে বাক্য গুলো।
:
:
পুরো চার ঘন্টা ঘুমানোর পর রুম থেকে বাইরে গিয়ে লিভিং এ দেখা হলো কাজিন জেবিন এবং জেমির সাথে।
জেবিন ও আফশীন সমবয়সী আর জেমি পাঁচ বছরের ছোট হবে তাদের।
ইউনিভার্সিটি অব টাম্পেরে তে পড়ালেখা করছে জেবিন।
আর আফশীন অনার্স শেষ করেছে দেশের প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে তার বাবার সাথে বেশ যুদ্ধ করেই ফিনল্যান্ড এসেছে মাস্টার্স করার উদ্দ্যেশে,তাই হাফ স্কলারশিপ নিয়ে এদেশে" এম বি এ "তে ভর্তির সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে তার খালু মেয়ের ইউনিভার্সিটিতেই। তবে ডিপার্টমেন্ট ভিন্ন তাদের।
আফশীন এর জন্য পড়ালেখার চাইতেও বেশি দেশ ছাড়ার তাড়া ছিল। সে জানে তার বাবা সম্বন্ধ খুঁজছে কিন্তু আফশীন কোনোভাবেই বিয়ে করে দেশে আটকা পড়তে চাইনা তার চাওয়া পাওয়া ভিন্ন,সে ছোটবেলা থেকেই ভিনদেশের স্বপ্ন দেখেছে।
জেবিন বলল"তোমাকে সে ছোটবেলায় দেখেছিলাম।"
"হ্যাঁ খুব খেলেছিলাম সে বার। "
"ভিডিও কলে দেখলেও তবে তুমি সামনাসামনি ও বেশ সুন্দর।
আফশীন হেসে বলল "ধন্যবাদ তোমাকে।"
"তুমি কি কাল থেকে ভার্সিটি জয়েন করবে? "
"না, আমি আরেকটু ঘুছিয়ে তারপর যাব।"
"ঠিকাছে সিস, টেইক ইউর টাইম। পরে দেখা হবে।"
আফশীন কে বিদায় দিয়ে জেবিন নিজের ঘরে চলে গেল।মেয়েটা দেখতে পুরোই বিদেশি তার মুখে কেউ বাংলা শুনলে অবাক হবে। এরা তিন ভাই বোন ই বিদেশির মতো কারণ তাদের বাবা ফিনল্যান্ডের অধিবাসী, শায়লা কে বিয়ে করে মুসলিম হয়েছিল।
মাঝে মাঝে ভিডিও কলে দেখতো তাদের।
:
:
আফশীন খাওয়া দাওয়া শেষ করে টেবিলে বসে ছিল। পেছন থেকে একটা ছেলে কন্ঠ বলল"ইউ মাস্ট বি আফসিন?"
আফশীন পেছন ফিরে তাকালে দেখলো সাদা টি-শার্ট পড়া একটা ছেলে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আফশীন এর কাছে এসে হাত বাড়ালে সেও বসা থেকে দাঁড়ালো।
"তুমি কি ইউহান ভাইয়া?"
"ইয়েস আই এম বাট ডোন্ট কল মি ভাইয়া।"
আফশীন হাসলো।
ইউহান কে খুব একটা দেখেনি সে তবে ছবি দেখেছে বহুবার।কলে ও তেমন কথা হয়নি।খালার সাথেই একটু কথা হতো আর অন্যদের ছবিতে দেখতে পেতো।
ইউহান বয়সে আড়াই বছরের বড় তবে আফশীন বুঝতে পেরেছে এই ঘরে সেই ই একটু মিশুক সব থেকে।
:
:
সন্ধ্যায় ছোটবোন জেমি বলল সিস চলো নিচে ,তোমাকে একটু ওয়াক এ নিয়ে যায়, এতে তোমার মন মেজাজ ফুরফুরে হয়ে যাবে।
তারা দুজন নিচে যাওয়ার জন্য লিফটে উঠলো,দুই ফ্লোর পরেই লিফটের ডোর ওপেন হলে আরো দুজন ভেতরে ঢুকলো। একজনের হাতে ছিল একটি ছোট্ট ডগ পাপ্পি, যেটা আফশীনের দিকেই তাকিয়ে আছে। গ্রাউন্ড ফ্লোর যাওয়া অব্দি আফশীন জেমিকে এতটা শক্ত করে হাতে চেপে ধরেছে, এক পর্যায়ে জেমি বলল
"আউউচ্চ, সিস আমার হাত পুরোই শেষ, কী হয়েছে তোমার?"
"ডগ টা কে ভয় করছে। "
"জেমি হেসে বলল "হোয়াই আর ইউ স্কেইর্ড?ইট্স সাচ এ কিউট পাপ্পি।"
"আমার ফোভিয়া আছে লোমশ জিনিসের প্রতি।বিড়াল, খরগোশ, নরম জাতীয় সব প্রাণী গুলোকে ভয় পাই আমি।"
"সো স্যাড এতো কিউট জিনিস কে ভয় পাও তুমি? "
নিচে নেমে কী যে ভালো লাগছে এতো পরিষ্কার ঝকেঝকে বিশেষ পাথরের রাস্তা, সারি করে ফুল গাছ লাগানো,সাথে রাস্তার আলোকবাতি গুলো। সারা শরীরে ঝিরিঝিরি বাতাস বয়ছে, এই সময়টা তে সবাই নিজেদের রিলেক্স করতে নেমেছে, কেউ পোষা প্রাণী নিয়ে হাটছে তো কেউ একাই দৌড়োচ্ছে, এমন সময় কে যেন কাপড় টানছে মনে হলো, আফশীন পিছু ফিরে দেখলো নিচে ছোট পাপ্পিটি তার কাপড় ধরে টানছে।
লজ্জাসংকোচ এর মাথা খেয়ে এক চিৎকারে দৌড়াতে গিয়ে সামনেই এক ছেলের ধাক্কা খেলো, তখন তার মাথায় কেবল কুকুরছানায় ঘুরছে, ছেলেটির পেছনে গিয়ে একবার বামে একবারে ডানে ঘুরপাক করছে আফশীন।
কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলো ছেলেটিই কুকুরের মালিক।
আশেপাশের সবাই মুচকি হেসে চলে যাচ্ছে। আফশীনের লজ্জা অনুভব হয়েছে ঠিক তখন, যখন অপরিচিত ছেলেটি কাধ থেকে তার হাত ধরে নামিয়ে সামনে ফিরেছে।
#বসন্তের_ফিনল্যান্ড
#সূচনা_জাফরিন
#পর্ব-১
ডিয়ার সুইডেন এর একটা সিকুয়েল করছি।।পাশে থাকবেন,,,🥰🥰