#বসন্তের_ফিনল্যান্ড
#সূচনা_জাফরিন
#পর্ব-৫
নতুন নতুন কাজ করতে আফশীনের ভালোই লাগে,এক সপ্তাহ ধরে সে জেরিমির অফিসে কাজ করছে।
অফিস রুমের একপাশে রয়েছে অসংখ্য ফাইলের সেল্ফ। আর অন্যপাশে রয়েছে মাঝারি আকারের ল্যাব, যেখানের সেল্ফে তাকে তাকে সাজানো রয়েছে ছোট ছোট উদ্ভিদ তাও কাঁচের বড় ছোট বোতলে।
আবার একটি সেল্ফে রয়েছে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ যা তাকে ধরতে নিষেধ করেছে জেরিমি।
জেরিমি ৩ দিন যাবৎ বেশ ব্যস্ত, নিজের অফিসে আসেনি, ভার্সিটির ল্যাবে বসেই রিসার্চের কাজে রাত কাটিয়েছে।
অফিসের দুটো ডেস্ক আছে একটি জেরিমির অন্যটি সেক্রেটারি আফশীনের যা কিছুটা দূরেই আছে।জেরিমির ডেস্ক কাঁচের দেওয়ালে ঘিরা। উইন্ডো শাট অন,অফ করা যায়, যাতে প্রাইভেসি ম্যান্টেন হয় দুজনরই।
আরেকটি কর্মচারী ছেলে আছে, যে এই অফিসের পরিষ্কার পরিছন্নতার কাজ করে। আফশীন ফাইল থেকে কিছু নাম্বার অন্য খাতায় নোট করছে আর কথা বলছে ছেলেটার সাথে।
ছেলেটির নাম, গাপি।আফশীন প্রথমদিন অনেক হেসেছিল কারণ গাপি হলো এক প্রকার পোষা মাছের নাম।
গাপি, আফশীন কে ফিনিশ ভাষা শিখায় টুকিটাকি। যদিও আফশীন এদেশে আসার আগেই প্র্যাক্টিস শুরু করে দিয়েছিল তারপর ও যখনই সুযোগ মিলে দিনে কয়েকবার, বই কিংবা মোবাইল এপ্স থেকে ভাষাটি রপ্ত করার প্রয়াস চালিয়ে যায়।
:
:
আফশীন ফিনিশ ভাষায় বলল "আচ্ছা এখানের সবচেয়ে সুন্দর সমুদ্র কোনটা তুমি জানো?
গাপি একটু চিন্তা করে বলল"আলান্ড আরকিপেলাগো।এখানকার সেরা সুন্দর জায়গার একটি। অনেকেই সেখানে গিয়ে ক্যাম্পেইন করে।
"বাহ! আমিও যেতে চাই। "
:
:
:
জেবিন আজ ঘুম থেকে উঠতে বেশ দেরি করে ফেলেছে। ঘড়ি দেখে বুঝলো বেলা ১ টা, ফিনল্যান্ডের গ্রীষ্মকালে বিশ ঘন্টা সূর্যের আলো থাকে আর রাত হয় ৪ ঘন্টার।
মাথা হ্যাং হয়ে আছে।একটুপর রুম থেকে বের হয়ে জোহরা কে ব্ল্যাক কফি দিতে বললো।
লিভিং রুমে বসে চিন্তা করলো "রাতে কার সাথে এসেছে সে? "
জোহরা আপা ট্রে তে করে লেবুর পানি এবং কফি এনেছে।
ফর্সা বরণ গায়ের রং,উন্নত চেহরা। ব্ল্যাক লেগিংস আর হোয়াইট টিশার্ট পড়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে বসে আছে সোফায়, হাইলাইট করা লম্বা কোকড়া চুল গুলোতে একটু পরপর হাত বুলাচ্ছে জেবিন।
ওপেল কেলিয়ান রুম থেকে বের হতে নিয়েছিল কিন্তু হঠাৎ লিভিং রুমে বসা মেয়েটা কে দেখে এতোক্ষণ আড়ালে তার পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছে।
সাধারণত পাব এ গেলেও জেবিন কখনো ড্রিংক্স করেনি। মা বাবার কড়া বারণ আছে কিন্তু কাল এমন কি খেয়েছিল?
বয়ফ্রেন্ড পোলেন কে বহুবার কল করেছে কিন্তু রিসিভ করছেনা তার উপর দু একবার কেটেও দিয়েছে।
দ্রুত নিজের রুমে গিয়ে চেইঞ্জ করে বের হয়ে গেল হন্তদন্ত করে।
ওপেল সবটা দেখে ভাবলো কাল রাতের কথা। ঘরের দরজায় বেল দিয়ে সে লুকিয়ে গিয়েছিল।জোহরা আপা দরজা খুলে জেবিন কে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ঘরে প্রবেশ করায়।
:
:
:
রাতে ইউহান ঘরে এসে,ব্যাগ সোফায় ছুড়ে। টি টেবিলের উপর পা দুটো তুলে দিয়ে মাথা হেলান দিলো সোফায় ।
ছোট বোন জেমি এসে পাশের সোফায় বসলো, হাতে পপকর্ণ তার , টিভি অন করতেই কমেডি শো দৃশ্যমান হলো।
ইউহান একবার বোনের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ বুজলো।
জেমি টিভির দিকে মুখ করে জিজ্ঞেস করলো " কিছু কি হয়েছে ব্রো? "
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল "আমি বোধহয় প্রেমে পড়েছি। "
জেমি হেসে কুটিকুটি হয়ে বলল কত তম গার্লফ্রেন্ড এটা তোমার?
ইউহান "মুখ বাকিয়ে বলল এটা মোটেও আগের মতো না। "
"তবে কেমন? "
"ইটস ডিফারেন্ট "
ব্রো তুমি এসব বাধ দিলেই পারো।"
"কিন্তু সমস্যা হলো, মেয়েটি আমাকে এভয়েড করছে। "
"তাহলে ওর পেছনে যাওয়ার কি দরকার?"
জোর করে তো আর গার্লফ্রেন্ড বানানো যায় না।
"কেন যাবে না? মানি থাকলে সব হয়।"
"ওকে, লেট সি "
"ঠিকাছে ট্রাই করি।"
"তুমি যদি তাকে সত্যিই ভালোবাসো তবে যেতে দিবে, আর যদি না বাসো দেখবে তুমি এতটুকুতেই ক্লান্ত হয়ে গেছো। "
"তাই! এতসব তুমি কিভাবে জানো? "
"টিভি থেকে "
ধ্যাত "বলেই ইউহান নিজের রুমে চলে গেল।"
ইউহান যাওয়ার পর আফশীন এসে বসলো সোফায়।
জেমি একবার তাকিয়ে বলল "তোমার আবার কি হয়েছে? "
"ক্লান্ত লাগছে। "
"আমি তো ভেবেছি তুমিও কারো প্রেমে পড়েছ"
গ্লাসের পানিতে চুমুক দিতেই "আফশীন ভীষম খেয়ে উঠলো।"
জেমি অবাক চোখে তাকালো "ঠিক তেমন কিছু ঘটেছে? "
আফশীন বলল"মোটেও না, মা আমাকে জানে মেরে দিবে ওমন কিছু করলে।"
"এটা তো মনের ব্যাপার, হয়ে গেলে কী করবে শুনি?"
আফশীন গ্লাস টা টেবিলে রেখে বলল।"হওয়ার আগেই চোখ বন্ধ করে নেব।"
"জেমি হাসলো "গুড আইডিয়া "
:
:
::::ভোর ছয়টা, জেরিমির প্রতিদিনের অভ্যাস, খুব ভোরে রাস্তায় বেরিয়ে পড়া। ম্যাপলের আগুন ঝরা পাতা মাড়িয়ে বেশ কয়েক রাউন্ড সেড়ে বসে পড়লো বেঞ্চে, এটেলপুইস্টো পার্কের। সে প্রায় আসে এই পার্কে। স্বচ্চ নদীর পাশে হাটাহাটি করে হাঁপিয়ে উঠে আবার বসে, নদীর দ্বারা শান্ত হওয়ার যে, শান্তিই আলাদা।
:
:
অফিসে গিয়ে দেখলো আফশীন লিখালিখি করছে।
"মিস আফশীন তোমার কাজ কতটা বাকি?"
আফশীন মুখ তুলে বলল"কেন স্যার, কোনো কাজের কি ডেড লাইন ছিল? "
জেরিমি হেসে বলল"রিল্যাক্স! ভয় পাচ্ছ কেন?
"না স্যার"
"তুমি দুমাসে অনেক কিছুই শিখে গেছ।এত দ্রুত সব রপ্ত করবে আমি ভাবি নি।
আফশীন একটু হাসলো "জ্বি স্যার ধন্যবাদ।"
"চলো আজ আমরা বাইরে কাজ করবো।"
"জ্বি স্যার। কিছু কি নিতে হবে?"
""হ্যাঁ আমার কেবিনে লাল ব্যাগ আছে ওটা নিয়ে এসো, আমি গাড়িতে আছি।"
আফশীন একটু পর নিচে নেমে গাড়িতে বসলো।
সে আশেপাশের সবকিছু বেশ ভালো করে দেখছে।
জেরিমি কি যেন ভাবলো।হয়তো মেয়েটা বিদেশ নিয়ে একটু বেশিই এক্সাইটেড।
সোরসেলাম্পি বোটানিক্যাল গার্ডেনে গেছে তারা।
খুবই সুন্দর একটা পার্ক, যেখানে মন খারাপ রাখা অসম্ভব। গাড়ি থেকে নামার পর ছোট এক পাথুরে উঁচু রাস্তা পার করে, কাঠের ব্রিজে উঠলো তারা।পাইন,আস্পেন,হ্যাজেল, এলম লিন্ডেন গাছের ছড়াছড়ি এখানে।রাস্তার দুপাশে বুনো ফুল গুলো দাঁড়িয়ে যেন তাদের দেখছে অসংখ্য বেগুনী ফুল।জেরিমি প্রয়োজনীয় উদ্ভিদ গুলো ছবি তুলে নিচ্ছে ক্যামেরার মাধ্যমে।
পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘে ভরা নীল আকাশ।
সাদা মেঘ গুলো নদীর পানিতেও যেন ভাসছে।নরওয়ে তে বেশির ভাগ, হ্রদ এবং নদীতে সারা শহর ঘিরে থাকে। প্রাচীরের মধ্যখানেও নদী বয়ে যায়।কী এক অপরুপ দৃশ্য।
জেরিমি কিছু উদ্ভিদ সংগ্রহ করলো আর আফশীন ছোট কাঁচের বোতল গুলো লাল ব্যাগে রাখছে।
কিছু স্যাম্পল কালেক্ট করার পর জেরেমি বলল চলো আরেকটি জায়গায়। পাশ ফিরতেই হ্রদে বেশ কয়েকটা হাঁস দেখতে পেলো,আফশীন তো খুবই খুশি । বাচ্চাদের মতো বললো "আমার ধরতে ইচ্ছে হচ্ছে এসব।
আবার জেরিমিকে দেখে নিজেকে সংযত করল। আরেকটু গিয়ে আবার থামল, স্যার আমি এখান থেকে দুই একটা ফুল নিলে কি সমস্যা হবে?
জেরিমি বিশেষ ভাবে তাকিয়ে বলল"সমস্যা নেই নিতে পারো। "
চঞ্চল প্রকৃতির মেয়েটি হঠাৎ বলে উঠলো "তিনি পৃথিবীকে স্থাপন করেছেন সৃষ্টজীবের জন্যে।(আর রাহমান ১০)"
জেরিমি প্রশ্ন করল"তুমি এখন কি বলেছো?
আফশীন খেয়াল করেনি কথাটা যে শোনা যাবে, বোকা হেসে বলল "ইয়ে মানে আমি একটা আয়াত পড়ছিলাম। "
আমাকে একটু শোনাবে প্লিজ?
আফশীন খুশিমনে বলল"সত্যিই শুনবেন কিন্তু কেন শুনবেন?"
"বলবো আগে শোনাও"
ঠিকাছে পড়ছি।আফশীন প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে পড়তে লাগলো।
"
তিনি পৃথিবীকে স্থাপন করেছেন সৃষ্টজীবের জন্যে।
এতে আছে ফলমূল এবং বহিরাবরণবিশিষ্ট খর্জুর বৃক্ষ।
আর আছে খোসাবিশিষ্ট শস্য ও সুগন্ধি ফুল।
অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের পালনকর্তার কোন কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করবে?
সূরা আর রাহমান : ১০,১১,১২,১৩)"
"জেরিমি বলল খুব সুন্দর। "
"আপনি আয়াত বুঝেন? অর্থাৎ এই বিষয়ে জানেন?
জেরিমি অকপটে স্বীকার করল "হ্যাঁ, আমার পরিচিত কেউ একজন এসব খুব পছন্দ করতো। "
"
"আমার মত করে কি আপনার সামনে পড়তো সে? "
জেরিমি মৃদু হেসে বলল "না আমি তার ছোট বোন থেকে জেনেছিলাম। "সে নাকি এসব লেখালেখি করত ডাইরিতে। "
"ওহ আচ্ছা, খুব ভালো তো।"
জেরিমি হাঁটতে হাঁটতে প্রশ্ন করল "তুমিও কি ডায়েরীতে লিখ?
"না আমার কোনো কিছু সুন্দর লাগলে কিংবা আমি যখন একা থাকি তখন যা মনে আসে ওটার সাদৃশ্যে আয়াত মিলিয়ে পড়তে ভালো লাগে। আমি পড়ি আর মুগ্ধ হই, এই মুগ্ধতা এই প্রশান্তি যেন শেষ হওয়ার নয়। "
"বাহ, তাহলে একটুপর যেখানে যাব ওই জায়গাটা দেখে তোমার মনে যা আসবে, তুমি আমাকেও শোনাবে, রাজি? "
আফশীন মুগ্ধ হল "সত্যিই শুনতে চান? "
"সত্যি "
চলবে,,,,