ফন্ট সাইজ:
থিম:
ফের বসন্ত

১৭তম পর্ব

লেখক: ঐশী রহমান

#বসন্তের_ফিনল্যান্ড

#সূচনা_জাফরিন

#পর্ব-১৭

তিনিই সে মহান সত্তা, যিনি বানিয়েছেন সূর্যকে উজ্জল আলোকময়, আর চন্দ্রকে স্নিগ্ধ আলো বিতরণকারীরূপে এবং অতঃপর নির্ধারিত করেছেন এর জন্য মনযিল সমূহ, যাতে করে তোমরা চিনতে পারো বছরগুলোর সংখ্যা ও হিসাব। আল্লাহ এই সমস্ত কিছু এমনিতেই সৃষ্টি করেননি, কিন্তু যথার্থতার সাথে তিনি প্রকাশ করেন লক্ষণসমূহ সে সমস্ত লোকের জন্য যাদের জ্ঞান আছে।সূরা ইউনুস : ৫

আফশীন প্লেইনের জানালায় চেয়ে আছে। পেঁজা পেঁজা সাদা মেঘ ছোট ছোট টিলাভূমি সবটা দেখতে বেশ ভালো লাগলেও মনের ভীষন্নতার সামনে হার মানছে এসব।

আফশীন জানে দেশে গেলে সব বদলে যাবে তার। অনার্স দ্বিতয় বর্ষে থাকাকালীন একদিন খুব সম্ভবত বৃষ্টির দিন ছিল,সেদিন মুষলধারায় বৃষ্টি হওয়াতে ভার্সিটি যেতে পারেনি আর, বাসায় ফেরত আসতে হয়েছিল ।

বিকেলে ঘুম থেকে উঠে দেখে বাসায় কারা যেন এসেছে। অচেনা হওয়াতে আফশীন লিভিং রুমে প্রবেশ করেনি সোজা পড়তে বসেছে নিজের রুমে। খানিকবাদে একটি মহিলা বেশ সম্ভ্রান্ত ঘরের মনে হলো ,আফশীনের ঘরে ঢুকে তার সাথে কথা বলতে শুরু করল"মা তোমার নাম কি? কীসে পড়ছো?ইত্যাদি "

এসমস্ত যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর দেওয়া শেষ করে খানিকবাদে মহিলা মোবাইল ফোন বের করে আফশীনের একটি ছবি তুললো পাশে বসে।

আফশীন না ও বলতে পারলো না তার আবদারে।

কী একটা অবস্থা কে এই মহিলা ইশারায় জানতে চাইলো মায়ের কাছ থেকে।

মিসেস রেনু তড়িঘড়ি করে জানালো "উনি তোর আন্টি হয়, পুলিশ কমিশনার এর স্ত্রী,উনারা এই আবাসিক এর ২য় রোড এ থাকেন এবং উনার ভাসুর জেলা ম্যাজেস্ট্রেট।

আফশীন সব বুঝলো কিন্তু উনারা হঠাৎ এখানে? হয়তো তার বাবার কাছে এসেছে আর কিছু না ভেবে নিজের পড়ায় মন দিলো আবার।

কিন্তু আফশীন কে অবাক করে দিয়ে একটু পর মহিলা নিজের মোবাইলের স্ক্রিন তার সামনে ধরতেই একটা ছেলের চেহরা ভেসে উঠলো।

বলল"এটা আমার ছেলে, তুমি দেখা করবে?"

সেদিন মেহমান চলে যাওয়ার পর থেকে আফশীন কান্নাকাটি করে ভাত খায়নি দুদিন। বাবা অনেক বুঝিয়েছে এখন তাকে বিয়ে দিবেনা কিন্তু তার মা এক পায়ে খাড়া, কোনোভাবেই সে এতো ভালো সম্বন্ধ হাতছাড়া করবেনা, এমন নাম ডাক ওয়ালা পরিবার এতো সহজে আসে না।তার মতে আফশীনের ভাগ্য ভালো এমন বাড়ির ছেলে কোনো এক ক্ষণে তাকে পছন্দ করেছিল।

রোজ সকালে আফশীন রিকশার অপেক্ষাকৃত অবস্থায় খেয়াল করতো কেউ তার উপর নজর রাখছে। প্রথম প্রথম বেশ ভয় পেলেও পরে বুঝতে পারলো, এই নজর ক্ষতির জন্য নয় কেবল তার বিষয়ে জানার জন্য।

দুই সপ্তাহ পর ছাতা হাতে বাড়ি ফেরার জন্য ঠিক রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে রিকশা খুঁজছিল সে,

হঠাৎ পাশ থেকে বলল কেউ"কষ্ট হচ্ছে?"

পুরুষ কন্ঠে বলা কথায় একটু চমকে গেল আফশীন, এক পলক তাকিয়ে সরে গেল।

যুবক আবার বলল"আমি ওয়াহিদ হোসেন, আমার মা আপনার বাসায় গিয়েছিল।"

ছাতার নিচ থেকে মাথা তুলে তাকালো আফশীন "তার মানে এই সে ছবির ছেলেটি কিন্তু এখন এভাবে সামনে কেন এলো তার?"

ওয়াহিদ বলল"আপনাকে বাসায় পৌছে দিবো? এমন বৃষ্টিতে রিকশা সুরক্ষিত নয়।"

"জ্বি ধন্যবাদ, আমি যেতে পারবো। "

"সংকোচ এর কিছু নেই আমি সাথে যাব না, কেবল গাড়ি পৌছে দিবে।

আফশীন কিছুটা সামনে হেটে গেল সি এন জি পেয়ে দ্রুত উঠে পড়লো তাতে।"

ওয়াহিদ একটু হাসলো নিজের ছাতা সরিয়ে, চোখ বন্ধ করে ভিজলো কিছুক্ষণ।

এরপর থেকে আফশীন আর দেখেনি ছেলেটিকে।এই ব্যাপারে ঘরেও কেউ কিছু বলেনি,তবে তার প্রতি দূরদৃষ্টি আছে সেটা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করেই গেছে।

:

:

হেলসিংকির পেই পার্ক এ হাটছে জেরিমি। সে ভাবছে আফশীন বাংলাদেশ চলে গেছে!গাপি থেকে জেনেছে তার বাবা অসুস্থ ,আচ্ছা সে কি ফিরবে আর? মেয়েটার ব্যাপারে তো সে খুব বেশি জানে ও না।

পেই পার্কের ব্রিজে দাঁড়িয়ে লেইকের দিকে স্থির চোখ তার।থেকে থেকে ফোয়ারা চালু হচ্ছে লেইকের। সন্ধ্যায় জায়গাটা অধিক সুন্দর দেখায়। সাদা লাল ব্রিজের সাথে নীল ফোয়ারা, যে কারোই মন হারাবে এই পরিবেশে কিন্তু জেরিমির বিশেষ কিছু অনুভব হচ্ছেনা। আফশীন কে নিয়ে সে যতবার বাইরে গিয়েছে ততবারই মেয়েটির দেওয়া বর্ণনায় মুগ্ধ হয়েছে।প্রকৃতির ভালো জ্ঞান আছে মেয়েটির, জেরিমি নিজেও প্রকৃতি প্রেমি, ইচ্ছে হলো ইশ এখন যদি আফশীন থাকতো পাশে,তাহলে এই পার্ক টা হয়তো তার চোখে দেখতে পেত সে।

পরক্ষণে নিজের মনে বলল"সে অবশ্যই আসবে, তার যে এই প্রকৃতির উপর নিগূঢ় টান, তার যে আরো অনেক কিছু দেখার বাকি আছে।

:

:

প্রায় সতেরো ঘন্টা পর আফশীন দেশে ফিরলো। বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়েই বেরিয়ে পড়লো হস্পিটালের উদ্দ্যেশে।

আওসাফ ও সাথে ছিল।

বাবার অপারেশন কাল, এতোদিন অব্জারভেশন এ ছিল। ডাক্তারের কথা শুনে বেশ কষ্ট পেল মেয়েটি।ছোটবেলা থেকেই বাবা তাকে সব কষ্ট থেকে আড়াল রাখার চেষ্টা করেছে। খারাপ লাগলো এই মানুষটি না থাকলে সে যেন একা হয়ে পড়বে।

:

:

ওপেল রাত করে ঘরে ফিরেছে, সে খুব বেশি কাজ না থাকলে এমন করে না।

ডাইনিং টেবিলের পাশেই তার ঘর, সেদিক টায় যেতে জেবিন কে দেখতে পেলো, মাথা রেখে শুয়ে আছে, আরেকটু দেখতে ইচ্ছে হলে সে কাছে গেল।

জেবিনের স্নিগ্ধ মুখ ভারি মিষ্টি লাগছে,মনেই হচ্ছেনা সে ঘুমোচ্ছে, চোখ পিটপিট করতেই ওপেল কিছুটা সরে গেল।

মেয়েটি টেবিল হাতড়ে কিছু খুঁজছে, ঘুম ঘুম চোখে মাথা তুলতেই এলোমেলো কোকড়া চুল গুলো বাঁধুনি থেকে সরে এসছে।

মোবাইল হাতে পেয়ে সময় দেখে নিলো। তারপর মোড়ামুড়ি করতেই হাতে বারি লাগলো কিছুর সাথে, পেছনে ফিরে দেখে ওপেল। এতোক্ষণের সব আলসেমি উড়ে গেল, চেহেরায় হাসি ফুঁটে উঠলো।

"কখন এলে তুমি? আমাকে দেখছিলে?"

ওপেল নির্ভয়ে উত্তর দিলো "না রুমে যাচ্ছিলাম। "

জেবিন ভেবেছিল হয়তো জিজ্ঞেস করবে, সে টেবিলে কেন ঘুমিয়েছে কিন্তু জনাব হনহন করেই চলে গেল।

জেবিন ও গেল পিছেপিছে রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করতে যাবে তখনই ওপেল তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো।

ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করল

"কি চাই?"

"তেমন কিছু না, এভাবেই । "

ওপেল বুঝলো সে ভেতরে আসতে চাইছে।আচ্ছা এসো"

জেবিনের হাসি প্রশস্ত হলো "ঠিকাছে।"

ওপেল হাতের চাবি, ওয়ালেট, হেলমেট খুলে রাখলো এক পাশে।গায়ের পরিধেয় জ্যাকেট খুলতেই জেবিন তার দিকে নজর দিলো, কালো টি শার্ট এবং জিন্সে বেশ মোহনীয় লাগছে ছেলেটি কে।

ব্যস্ত হাতে সব ঠিক ঠিক জায়গায় ঘুছিয়ে রাখছে ছেলেটি।খানিকটা লম্বা চুল, কালোর সাথে সোনালি মিশেল।লম্বাটে চেহরায় বেশ মানিয়েছে চুলের কাটিং টা।হাতের কালো স্পোর্ট ওয়াচ টা খুলতে খুলতে জেবিনের দিকে একবার তাকালো।

আচ্ছা জেবিন ওকে এভাবে দেখছে কেন? ওর তো কখনো মনেই হয়নি জেবিন এতোটা মিশুক স্বভাবের হতে পারে, এতোদিন যাবৎ সে কখনো জেবিন কে এমন দেখেনি।সবসময় নিজের মধ্যে ব্যস্ত থাকতো মেয়েটি, খেতে গেলেও মোবাইলের দিকে মন থাকতো তার।

"কি হলো?"জেবিনের প্রশ্ন শুনে ধ্যান ভাঙলো ।

"বললেনা যে, কি চাই?"

"তেমন কিছু না এমনিতেই এলাম, কেন আসা যাবেনা?"

ওপেল আর কিছু না বলে জোরে ফু দিয়ে ক্লান্তি প্রকাশ করল,তারপর ডেম কেয়ার ভাব করে বাথরুমে চলে গেল।

জেবিন এটার সুযোগ নিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে টেবিলের কাছে এলো, প্রথমেই ওয়ালেট হাতে নিয়ে দেখলো,খুলতেই দাদির সাথে ছেলেটির একটি ছবি দেখতে পেলো।কিছুক্ষণ স্পর্শ করে পূর্বের জায়গায় রেখে তারপর ড্রয়ার, সেল্ফ চেক করলো কিন্তু জেবিনের সাথে সম্পৃক্ত এমন কিছুই পাওয়া গেল না। হতাশ হয়ে সে রুম থেকে বেরিয়ে পড়লো।

খানিক বাদে সাদা ট্রাউজার পরিহিত উদম শরীরে বের হলো ওপেল,রুমে কাউকে দেখতে পেলো না। চেয়ার থেকে তোয়ালে নিয়ে ভেজা চুল মুছতে মুছতে নজর দিলো ওয়ালেটের দিকে, নিজের মনে কিছু একটা ভেবে দরজার দিকে তাকালো একবার।

:

:

:

আফশীনের বাবা এখন কিছুটা সুস্থ,হার্টের অপারেশন হয়েছে চারদিন আগে। সবাই এখন আশংকা মুক্ত পরিবেশে আছে। বাবার পাশে অনেক্ষণ ধরেই চেয়ার টেনে বসেছিল সে, মাথায় হাত বুলতেই চোখ ছুটলো,"বাবা কখন উঠলে? কিছু লাগবে?"

"মা তুই বাসায় গিয়ে ঘুমিয়ে পর, আমি এখন ভালো আছি।এখানে এভাবে থাকলে শরীর খারাপ করবে তোর "

আফশীন উঠে দাঁড়ালো "ঠিকাছে ভাইয়া আসবে এখন, কিছু লাগলে বলো আমাকে।"

অনেকদিন পর নিজের রুমে এসে পুরোনো স্মৃতি গুলো মনে পড়ে গেল। আলমারি খুলে নিজের অনেকদিন না পড়া জামা গুলোতে হাত বুলালো। একটা জামা নিতেই হঠাৎ একটি কাগজ পড়লো ফ্লোরে, সচকিত চোখে তুলে নিলো সেটি, মনে পড়লো একদিন ভার্সিটির গেইটে দাঁড়ানো অবস্থায় একজন তাকে একটি বক্স দিয়ে গিয়েছিল, সেই বক্সে ছিল একটি বেশ দামি ঘড়ি আর এই ছোট কাগজটি যেখানে লিখা আছে"যতদূর আমি যাই, রবো তোমারি কাছে। ভালো থেকো শীঘ্রই ফিরবো। মিস ইউ ।"

আফশীন প্রথমে বুঝতে না পারলেও পরে ঠিকই বুঝেছে ঘড়িটি রেখেছিল ফেরত দিবে বলে কিন্তু আর দেখা পায়নি কারো।কাগজটি সরিয়ে ফেলেছিল কিন্তু ঘুরেফিরে আবার চোখের সামনে কিভাবে এলো সে নিজেও জানেনা।

বিদেশ গিয়ে বেশ ভালোই ভুলে গিয়েছিল সব এখন আবার চিন্তারা উঁকি দিচ্ছে।

:

:

জেবিন বসে আছে ক্যান্টিনে ভাবছে আজ কীভাবে জ্বালানো যায় ওপেল কে কিন্তু ওপেল কে জ্বালানো যেন শুধু শুধু পুকুরে সাঁতরে বেড়ানোর কাজ।পেছন থেকে কেউ একজন ডাকলো, জেবিনের মুখ চুপসে গেল "পোলান তুমি এখানে?"

"হ্যাঁ! আসলে আমি তোমাকে,,

জেবিন দাঁড়িয়ে বলল"কি হয়েছে, এভাবে আটকে যাচ্ছো কেন? কোনো সমস্যা?"

"আমি তোমাকে খুব স্মরণ করেছি।জানি তুমি কষ্ট পেয়েছ আমার কথায় কিন্তু তবুও বলবো প্লিজ সব ভুলে আবার ডেইট করি?"

এই মুহূর্তে কি জেবিনের খুশি হওয়া উচিত ছিল? এটাতো সে ও চেয়েছিল কিন্তু এখন আর তেমন লাগছে না কেন?

একদমে কথা গুলো বলে পোলান একগুচ্ছ স্টার গেজার ফুল হাতে ধরিয়ে ক্ষমা চাইলো জেবিনের কাছ থেকে।

জেবিন শুধু দাঁড়িয়ে রইলো। শুভ্র স্টার গেজার তার পছন্দের ফুল, পোলান পূর্বেও বেশ কয়েকবার দিয়েছিল তাকে। ফুলের দিকে তাকিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন হলো জেবিন, ইতিমধ্যে পোলান হাসিমুখে এক হাতে তার কোমড় জড়িয়ে পাশে দাঁড়ালো। আশেপাশে থাকা বন্ধুরা তালি দিলো ।

বেশ দূরে থেকে একজন বলল"আরে ওটা জেবিন না? পোলান তাকে সবার সামনে প্রোপজ করছে কেন? অন্যজন বলল"কিন্তু ওরা তো আগে থেকেই সম্পর্কে ছিল, তবে কি এবার বিয়ের প্রস্তাব?

সামনের বেঞ্চে বসা ওপেল নজর উপরে তুললো, কথাটা বেশ সজোরে লেগেছে কানে, যদিও দৃশ্যটা দেখা যাচ্ছে না তবে হাতে থাকা এন্টি কাটার টা বেশ চুবেছে আঙ্গুলে, চুঁইয়্যে চুঁইয়্যে রক্ত পড়ছে নিজের নকশা করা পৃষ্ঠের উপর।এতোক্ষণের সব করা কাজ যেন বিফলে গেল রক্তের ফোটায়।পেন্সিল চোখা করতে গিয়ে যেন সব নষ্ট হয়ে গেল।

চলবে,,,

(দুঃখিত, আজই লিখার সময় পেয়েছি।ভুল থাকলে জানাবেন এডিট করতে গিয়ে বেশ প্যারায় পড়েছি,এতো দেড়ি হয়ে গেল।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন