ফন্ট সাইজ:
থিম:
পাতাবাহার

১ম পর্ব

লেখক: সাদিয়া আফরোজ

বাইশ কি তেইশ বছর বয়সী একটা কুমারী মেয়ে বিধ্বস্ত অবস্থায় এলোমেলো পায়ে যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়! তখন সবার নজরটা একটু অন্যরকমই হয়। তারউপর মেয়েটা যদি একা আর অন্যমনষ্ক হয় , তাহলেতো কথাই নেই। একজনের কাছে ব্যাপারটা এক এক রকম হলেও তিতির নামক মেয়েটার কাছে ভিত্তিহীন শহরে ধ্বংসলীলার দিকে এগিয়ে যাওয়ার মত। রাস্তার ধারে টং দোকান গুলোতে বসে থাকা সব মানুষের কথা কানে না এলেও কিছু মানুষের কথা ঠিকই শুনতে পেয়েছে তিতির। যার দরুন এতটুকু বুঝতে পেরেছে, এই শহরে একা থাকা মানে, নিজেকে কোনো পশুর হাতে স্বজ্ঞানে সপে দেয়া। পরনের পুরোনো শাড়ির ছেঁড়া আচলটা হাতে গুটিয়ে নিয়ে , চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুমালা গড়িয়ে পড়ার আগেই মুছে নিলো তিতির,, জিবনটা আসলেই অন্যরকম! কখন যে হঠাৎ নিজের গতিবিধি বদলায়,তা কেউ বলতে পারে না। ঠিক যেমনটা বদলে গেছে তিতিরের মা বাবা মারা যাওয়ার পর। এই দুই বছরে জিবনটা একটু বেশিই বদলে গেছে। ভরে গেছে তিক্ততায় আর অসহায়ত্বে। দুই বছরে প্রতিটা দিন নিজের বাড়িতে নিজেকে খুব বেশি অসহায় মনে হতো। কিন্তু আজ সব চেয়ে বেশি মনে হচ্ছে। আসলে লোকে ঠিকই বলে ! মা-বাবা ছাড়া পৃথিবীর কেউই আপন না। মা-বাবা ছাড়া বড্ডো বেশি নিষ্ঠুর এই পৃথিবীটা , যেখানে সবাই স্বার্থ খুঁজে। তা-না হলে এই ভরদুপুরে তাকে এইভাবে নিজের বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হতো না। আর না শুনতে হতো কিছু বিকৃত মানসিকতার মানুষের অরুচিকর নোংরা কথা। তিক্ত কথা গুলো মনে করতে করতে চোখ জোড়ায় নোনা জল জমে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেলো, ঠিক তখনই একটা গাড়ির এসে সামনে থেকে খুব জোর ধাক্কা দিলো , যার দরুন ছিটকে অনেকটা দুরে গিয়ে পড়লো তিতির। ব্যাথাতুর চোখ জোড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে ঠোঁট জোড়ায় তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো। এই বুঝি মুক্তি মিললো এই নিষ্ঠুর পৃথিবী থেকে! চোখ জোড়া বন্ধ হওয়ার পর গড়িয়ে পড়লো দুফোঁটা অশ্রুমালা।

•

•

অফিস থেকে বেরিয়ে ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে গাড়ি ড্রাইভ করছে আযান। আজ আযানের বার্থডে। প্রতি বছর বার্থডেতেই সে তার মায়ের জন্য মায়ের পছন্দের কিছু না কিছু তো নিয়ে যাবেই। মায়ের জন্য কি কিনবে না কিনবে তা নিয়ে চিন্তা করতে করতে হঠাৎ একটা মেয়ে তার গাড়ির সামনে চলে আসে। আযান যতক্ষনে ব্রেক লাগায় ততক্ষণে খুব বেশি দেরি হয়ে যায়। মেয়েটা ছিটকে অনেকটা দুরে গিয়ে পড়ে। আযান গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে মেয়েটার কাছে চলে যায়। চারপাশে মানুষ জড়ো হয়ে গেছে। আফসোস করার বদল সবাই মেয়েটাকেই দোষ দিচ্ছে। অদ্ভুত ব্যাপার মেয়ের থেকে মেয়ের মা বাবাকে দোষ দিচ্ছে বেশি। মেয়েটার কপাল চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে। গায়ে জড়ানো শাড়িটা এলোমেলো হয়ে গেছে, যার ফলে শরীরের কিছুটা অংশ প্রায় দৃশ্যমান। মানুষে মনুষ্যত্ব লোপ পেয়েছে অনেক আগেই সেটা আযান জানে। তাই আযান সেই দিকে পাত্তা না দিয়ে তাড়াতাড়ি মেয়েটার শাড়ি ঠিক করে দিলো, এবং একটা লোকের সাহায্য নিয়ে মেয়েটাকে গাড়িতে তুলে নেয়। আযান ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট করে, অতঃপর হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

এইদিকে আযানের মা তার ছেলের জন্য অপেক্ষা করছে। এই একটা দিন আযান কখনোই দেরী করে না। অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা মায়ের কাছে চলে আসে। মাও তার ছেলেকে সাদরে বুকে জড়িয়ে নেয়, ছেলের পছন্দের সব কিছু রান্না করে টেবিল সাজিয়ে বসে থাকে। কিন্তু আজ আযান খুব বেশি দেরি করছে।যার দরুন আযানের মা একটু বেশিই চিন্তিত।

অন্যদিকে আযান হাসপাতালের করিডোরে বসে আছে। কিছুক্ষণ আগেই হাসপাতালের সকল ফর্মালেটি শেষ করেছে। মেয়েটিকে ডাক্তার জরুরি বিভাগে নিয়ে গেছে। কপালের কাঁটা দাগটা চোখে পড়লেও ইন্টার্নাল ইনজুরি কতটা হয়েছে , তা প্রপার চেকআপ করা ছাড়া বলতে পারছে না। আযান বসে আছে বার বার ঘড়ি দেখছে। এমন সময় আযানের ফোন বেজে উঠল। এতো টেনশনের মাঝেও মোবাইল হাতে নিয়ে "আম্মাজান" লেখা দেখে মুচকি হেসে উঠলো আযান। কল রিসিভ করতেই ভেসে উঠলো মমতাময়ী চেহারাটা। আযানের মা ইশারায় জিজ্ঞেস করলো, আজ এতো দেরি হচ্ছে কেন? কিছুকি ভুলে গেছিস?

আযান মুচকি হেসে মায়ের মুখের দিকে তাকালো, মাঝে মাঝে আযানের খুব ইচ্ছে করে , মায়ের মুখ থেকে "আযান" নামটা শুনতে। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস ! তা আর কখনো হয়ে উঠবে না। আযানের বয়স যখন সাত কি আট ! তখন আযানের মায়ের গলায় কোনো একটা অসুখ হয়।সেই সময় আযানদের অবস্থাও তেমন ভালো ছিল না, যার দরুন ভালো চিকিৎসা করাতে পারেনি। গ্ৰামের এক ডাক্তার থেকে চিকিৎসা নিয়েছিল , অনভিজ্ঞ গ্ৰাম্য ডাক্তারের হাতে চিকিৎসা হলে যা হয় আরকি! ভুল চিকিৎসা আর ভুল ঔষধের ফলে কথা বলার শক্তিটা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে। পরে বড় বড় ডাক্তার দিয়েও কাজ হয়নি। আযান তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে নিজের ইচ্ছেটাকে নিজের মধ্যে লুকিয়ে ফেললো। মায়ের মুখটা দেখছে এতেই অনেক আর কি চাই!আযান মুচকি হেসে বলল,, আসলে মা তোমার ছেলে কোনো কিছুই ভুলেনি বরং একটা সমস্যার কারনে আটকে গেছে তাইতো দেরি হচ্ছে, তা না হলে তোমার ছেলে কখনো দিনটার কথা ভুলেছে?

আযানের মা তার ছেলের কথায় মুচকি হেসে ইশারায় বললো,, ঠিক আছে বুঝেছি, কিন্তু কোথায় এখন তুই?

আযান জানে, এক্সিডেন্ট এর কথা বললে মা এখনই টেনশন শুরু করবে আর অসুস্থ হয়ে যাবে। যা বলার তা বাড়ি গিয়ে বুঝিয়ে বলবে তাই কোনো রকম কথা কাটাতে বললো, মা আমি আমার এক ফ্রেন্ডের অসুস্থ বোনকে হাসপাতালে দেখতে এসেছি, তাই একটু বেশিই দেরি হচ্ছে।

আযানের মা একটু চিন্তিত হয়ে ইশারায় বললো,, ঠিক আছে ! তাহলে ধীরে সুস্থে বাড়ি আয়, তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই।

আযান যানে যতক্ষন সে বাড়ি যাবে না ততক্ষণ মা খাবার মুখে তুলবে না। তাই আযান মুচকি হেসে বলল,, আমার ফিরতে হয়তো বিকেল হবে , তুমি খেয়ে নিও মা।

আযানের মা মুচকি হেসে কল কেটে দিলো।

আযান জানে মাকে বলা বৃথা, বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে এখন ওবদি কখনো আযান না মাকে রেখে খাবার খেয়েছে ,না মা তাকে রেখে খাবার মুখে তুলেছে।

আযান মোবাইল পকেটে রেখে জরুরি বিভাগের সামনে পায়চারি করতে লাগলো। মেয়েটা কেমন আছে সেই টেনশনে আযানের মাথা ফেটে যাচ্ছে।

এর মধ্যে কেটে গেল দেড় ঘণ্টা, এই দেড় ঘন্টায় দুইজন ডাক্তার আবার জরুরি বিভাগে প্রবেশ করলো।আযানের অলরেডি হাত পা ঠান্ডা হয়ে এসেছে, এই ভেবে যে মেয়েটার খারাপ কিছু হয়ে গেল নাতো! আযান পাশের একটা চেয়ারে বসে মেয়েটার সুস্থতা কামনা করছে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর ডাক্তাররা বের হলো। আযান উঠে ডাক্তারদের কাছে যেতেই , একজন ডাক্তার বললো,, ডোন্ট ওয়ারি। এখন সব ঠিক আছে।

আযান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করলো, কি হয়েছিল?

ডাক্তার মাস্ক খুলতে খুলতে বলল, মাথায় আঘাত লেগেছে আল্লাহ সহায় ছিল তাই মাথায় মেজর কিছু হয়নি ,তবে ডান পায়ের একটা হাড় ফেটে গেছে আর হাত পায়ের কিছুটা অংশ ছিলে গেছে। মাথায় পাওয়া চোট তাড়াতাড়ি সেরে গেলেও পা ঠিক হতে সময় লাগবে।

আযান তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বললো,, ওনাকে বাড়ি নেওয়া যাবে কখন?

ডাক্তার মুচকি হেসে বললো, যেহেতু অবজারবেশনে রাখতে হবে না ,তাই চাইলে ওনার জ্ঞান ফেরার আধ ঘন্টা পর নিয়ে যেতে পারেন, তবে জ্ঞান ফেরার পর আরেকবার চেকআপ করতে হবে। আর হ্যা বাড়ি নেওয়ার পর ওনাকে প্রপার টেক কেয়ার করা লাগবে।

আযান ডাক্তারের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে বললো,ঠিক আছে।

ডাক্তারদের মধ্যে একজন মহিলা ডাক্তার আযানকে উদ্দেশ্য করে বলল,,,তবে মিস্টার একটা কথা বলার ছিল।

আযান ডাক্তারের হাবভাব দেখে কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে বললো,, হ্যা বলুন!

ডাক্তার কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে বললো,, আঘাত কখনো কোনো ভুলের সমাধান হয় না। তাই ভালোবেসে বুঝিয়ে দেখুন , সে হয়তো নিজের ভুল সুধরে নিবে, কিংবা আপনার মন মত হয়ে যাবে।

আযান ডাক্তারের কথার কিছু বুঝে উঠতে পারলো না। তাই অবাক হয়েই বলে উঠলো,, মানে! কি বলছেন? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

ডাক্তার মলিন হেসে বললো,আপনার ওয়াইফের শরীরের অসংখ্য দাগ। কিছু পুরোনো আর কিছু নতুন। প্রতিটা দাগ বেল্টের , তবে হাতের উপরে পোড়া দাগটা আজকের যা কিনা লোহার খুন্তি টাইপের কিছু দিয়ে পোড়া। প্রতিটা দাগ বলে দিচ্ছে কতটা যন্ত্রনা ছিল এই আঘাত গুলো।তাই বলছি ভালোবেসে বুঝিয়ে দেখুন হয়তো আঘাত করার প্রয়োজন পড়বে না।

মহিলা ডাক্তারের কথায় আর সব ডাক্তার মাথা নিচু করে ফেললো। কারন তারা হাতের পোড়া দাগটা দেখেছে। আযান স্তব্ধ হয়ে গেছে‌। ডাক্তারের প্রতিটা কথা শুনে আযানের শরীর শিউরে উঠলো,বলার মত কিছু খুঁজে পাচ্ছে না। মেয়েটা তার স্ত্রী নয় ঠিক আছে , কিন্তু কেউ কি ভাবে একটা মেয়েকে এতোটা কষ্ট দিতে পারে! সেটা ভেবে কুল কিনারা পাচ্ছে না আযান।

ডাক্তার তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বললো, হারিয়ে যাওয়ার পর মর্ম বুঝে লাভ নেই। তাই হারানোর আগে আঁকড়ে ধরতে শিখুন।

আযান চুপ করে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে আছে। ডাক্তাররা সবাই প্রস্থান করলো কিন্তু আযান এখনো স্তব্ধ হয়েই আছে। ভেতরটা কেমন জানি ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। আচ্ছা মেয়েরা তো মায়ের জাত হয় ! তবে তাদের আঘাত করে কেন! নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে চুপ হয়ে গেছে আযান। কারন উত্তর জানা নেই।

চলবে,,

(ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)

গল্পের নাম:#পাতাবাহার (অনূভুতির অশ্রুমালা)

সূচনা পর্ব (১)

লেখিকা:#সাদিয়া_আফরোজ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন