ফন্ট সাইজ:
থিম:
পাতাবাহার

৩য় পর্ব

লেখক: সাদিয়া আফরোজ

গল্পের নাম: #পাতাবাহার_(অনূভুতির অশ্রুমালা)

পর্ব :(৩)

লেখিকা:#সাদিয়া_আফরোজ

আযান কোনো রকম হাঁসি থামিয়ে তার মায়ের দুগালে হাত রেখে আদুরে গলায় বলল,, মাআআআ! তুমি যা ভাবছো তা মোটেও না।বিয়ে করার হলে কি বিয়ে করে হাত পা ভেঙ্গে নিয়ে আসতাম?

আযানের কথায় তিতির থমকে গেল।

আযানের মা আযানের হাত ছাড়িয়ে ইশারা করে বললো, তাহলে কে এই মেয়েটা?আর বিয়ে করিসনি কেন? দেখতে তো মাশাআল্লাহ!

আযান নিজের মাথা চাপড়ে মায়ের হাত ধরে তিতিরের সামনে দাড় করিয়ে বললো,, তোমাকে সব কথা পরে বলবো। আগে তিতিরকে রুমে নিয়ে যেতে হবে। ওর এক্সিডেন্ট হয়েছে তাও আমার গাড়ির সাথে।

আযানের মা এক্সিডেন্টের কথায় রেগে আযানের বাহুতে দুটো থাপ্পড় দিয়ে তিতিরের সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো।

আযান মায়ের শাসন করার ধরন দেখে হেসে ফেললো।

তিতির নিষ্পলক চেয়ে আছে আযানের মায়ের দিকে। বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে।

আযানের মা তিতির মাথা হাত বুলিয়ে তিতিরের দুগালে হাত রাখলো।

তিতির আযানের মায়ের এহেন আচরণে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হয়েছে এইটা তার মা। চোখের জলে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো। তিতির অবচেতন মন বারবার জানান দিচ্ছে স্নেহ ভরা হাত দুটো তার মায়ের। তিতির"মা" বলে ঢুকরে কেঁদে উঠলো। তিতিরের বলা "মা" শব্দটা ঠিক মত শোনা না গেলেও তিতিরের কান্না দেখে আযানের মা ভড়কে গেল, আযান নিজেও চমকে উঠলো।

আযানের মা তিতিরের চোখের পানি মুছে দিয়ে ইশারায় কিছু বললো। কিন্তু তিতিরের কোনো কিছুই বোধগম্য হলো না। তিতির অশ্রুসিক্ত নয়নে আযানের দিকে তাকালো। আযান তিতিরের দিকে তাকিয়ে বলল,মা বলছে আপনি কাঁদছেন কেন? মাথায় কি বেশি ব্যাথা করছে?

তিতির অবাক হয়ে আযানের মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে।ভাবছে উনি মুখে কিছু বলছে না কেন!

আযান বুঝতে পেরেছে তিতির কেন অবাক হচ্ছে। আযান আবার বললো,,মা কথা বলতে পারে না। তাই যা বলার সাইন ল্যাংগুয়েজে বলে তাই হয়তো আপনি বুঝতে পারেন নি। তিতির মায়া ভরা চোখে আযানের মায়ের দিকে তাকালো। আযানের মা তিতিরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে উঠে দাঁড়ালো। আযান কিছু বলবে তার আগেই আযানের মা ইশারা করে বলে, মেয়েটা কতটা ব্যাথা পেয়েছে দেখেছিস? কালই আমি তোর গাড়ি ভেঙে ফেলবো। এখন ডেবডেব করে না তাকিয়ে ওকে নিয়ে আমার ঘরে আয়।

আযান বরাবরের মত মায়ের বকুনি খেয়ে হেসে উড়িয়ে দিলো। আযানের হাঁসি দেখে তার মা রেগে রুমে চলে গেল।

আযান মুচকি হেসে ঔষধের প্যাকেটটা টেবিলের উপর রেখে তিতিরকে নিয়ে মায়ের রুমে দিকে যেতে যেতে বললো,কাল আমার গাড়ি ভেঙ্গে ফেলবে বুঝলেন!

আযানের কথায় তিতির অবাক হয়ে কান্না জড়ানো গলায় বললো, কেন? আপনার তো কোনো দোষ নেই! তাহলে?

আযান মুচকি হেসে বলে,, মা মুখে বলেছে কিন্তু কিছু করবে না। আপনি এ নিয়ে চিন্তা করবেন না।

আযানের মা নিজের রুমে তিতিরের থাকার ব্যাবস্থা করলো। আযান তিতিরকে মায়ের রুমে পৌঁছে দিয়ে বেরিয়ে পড়লো। এইদিকে আযানের মা তিতিরকে ধরে বিছানায় বসিয়ে দিল। তিতির পুরোটা সময় চুপ করে ছিল।তিতিরের কাছে নিজেকে খুব বেশি অপ্রয়োজনীয় মনে হচ্ছে,এমন অপ্রয়োজনীয় জিনিস যা ওনারা বাধ্য হয়ে ফেলতে পারছে না। তিতির প্রতিটা মূহুর্তে নিজের মৃত্যু কামনা করছে। পরনির্ভরশীল জিবনের চাইতে তিতিরের কাছে মৃত্যুটা বেশি সহজ মনে হচ্ছে।

আযানের মা তিতিরকে আধশোয়া করে বসিয়ে একটা কলম আর ডায়রি নিয়ে এলো। তিতির আযানের মায়ের কান্ড দেখছে বসে বসে। আযানের মা ডায়রি খুলে প্রথম পাতায় কিছু লিখে তিতিরের দিকে বাড়িয়ে দিল। তিতির ডান হাত দিয়ে তা নিতে গিয়ে ব্যাথায় কেকিয়ে উঠলো। তিতিরের ব্যাথাতুর আওয়াজ শুনে আযানে মা ডায়রি বিছানায় রেখে দিয়ে, তিতিরের হাত ধরে ব্যাথার উৎস খুঁজতে গিয়ে চমকে উঠলো। এতোটা বিভৎস অবস্থা হাতের যে আযানের মায়ের চোখ জোড়া ভিজে উঠলো। উনি ডায়রি হাতে নিয়ে তিতিরের দিকে ঘুরালো। তিতির চোখের জল মুছে ডায়রির দিকে তাকিয়ে দেখে, ডায়রিতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা"তুমি এইখানে একটু বসো মা, আমি তোমার জন্য খাবার আর ঔষধ নিয়ে আসি।"

তিতির আযানের মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি কিছু খাবো না আন্টি আপনি শুধু শুধু কষ্ট করছেন।

আযানের মা ডায়রিতে আবার লিখে তিতিরের দিকে ঘোরালো। যেখানে লেখা"কোনো কথা না। আমি যা বলছি তাই হবে, তুমি একটু বসো মা"

তিতিরের কাছে লেখাটাতে অধিকার বোধ আর শাসন দুটোই মনে হলো । তিতির মুচকি হেসে মাথা নিচু করে ফেলল।

তিতির হাঁসি দেখে আযানের মা তাড়াতাড়ি রুমের বাইরে চলে গেল। তিতির বসে বসে রুমটার চারদিক পর্যবেক্ষন করছে।

এই দিকে কিচেনে আযানের মা তিতির আর আযানের জন্য খাবার বানাচ্ছে। আযান পাশে দাঁড়িয়ে আজকের ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনা খুলে বলছে। আযানের মা একপর্যায়ে কেঁদে উঠলো, এতো টুকু ছোট একটা মেয়েকে এতোটা কষ্টের মধ্যে মেনে নিতে পারেনি তিনি। আযান মাকে শান্তনা দিয়ে বললো, তাই আমি তিতিরকে এইখানে নিয়ে এসেছি । আযানের মা চোখ মুছে ইশারায় বললো,, একদম ঠিক করেছিস। আজ থেকে এইখানেই থাকবে কোথাও যেতে দিবো না। আযান মায়ের কথায় মুচকি হাসলো । আযান যানে তার মা এমনটাই বলবে।

আযানের মা খাবারের ট্রে নিয়ে রুমে চলে গেল। মায়ের সাথে আযানও ঔষধের প্যাকেটটা টেবিলের উপর থেকে নিয়ে রুমে ঢুকলো। তিতির খাটের কার্নিশের উপর মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। মনে হচ্ছে শরীরের ব্যাথাটা কয়েকশ গুন বেড়ে গেছে। ইতিমধ্যে শরীরে জ্বর চলে এসেছে। আযানের মা তিতিরকে এইভাবে মাথা ঠেকিয়ে রাখতে দেখে খাবারের ট্রে আযানের হাতে ধরিয়ে দিলো। আযানের মা তিতিরের কপালে হাত রেখে চমকে উঠলো। এতো জ্বর মেয়েটার শরীরের!

কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে তিতির চোখ খুলে তাকায়। আযানের মা আযানের দিকে তাকিয়ে ইশারা করে বললো,, মেয়েটা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।

আযান তিতিরের দিকে একপলক তাকিয়ে বললো, ডাক্তার বলেছে ব্যাথার কারণে জ্বর আসবে। তাই খাবার খাইয়ে ঔষধ গুলো নিয়ম করে খাইয়ে দিতে হবে। তাহলে ব্যাথা কমবে সাথে জ্বরটাও।

আযানের মা তিতিরের পাশে বসে খাবারের ট্রে থেকে প্লেট নিয়ে তিতিরকে খাইয়ে দিতে লাগল। তিতির নিজেও কিছু বললো না। বরং মায়ের মত কারো আদর,স্নেহ , ভালোবাসা লুফে নিতে ব্যাস্ত সে। আর নিবেই বা-না কেন!মা-বাবা মারা যাওয়ার দুটো বছর পার হলো। এই দুটো বছরে কেউ এমন যত্ন করে খাইয়ে দেয়নি।তাই তো তিতির চুপচাপ আযানের মায়ের হাতে খাবার খেয়ে নিচ্ছে।

আযান চেয়ারে বসে খাবার খাচ্ছে। পুরো দিন‌ কিছুই খাওয়া হয়নি। তিতিরকে খাইয়ে প্লেট রেখে ঔষধের প্যাকেটটা খুলে বসে আছে আযানের মা । আযান নিজেও খাবার শেষ করলো তখন। আযান তার মাকে ঔষধ গুলো বুঝিয়ে দিলো। একটা একটা করে ঔষধ গুলো খুলে নিয়ে আযানের দিকে তাকিয়ে ইশারা করে বললো,, এতো টুকু একটা মেয়ে এতো গুলো ঔষধ খাবে কি ভাবে?

আযান তিতিরের দিকে তাকিয়ে বলল, এতো টুকু মেয়েটার তো কম অসুখ না, তাই তো এতো এতো ঔষধ খেতে হচ্ছে মা।

আযানের মা তিতিরকে ঔষধ খাইয়ে দিয়ে ঠিক করে শুইয়ে দিলো। তিতিরের চোখের কোন বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুমালা কারন আজ যে মাকে খুব বেশি মনে পড়ছে! মা থাকলে ঠিক এই ভাবেই যত্ন নিতো। আযানের মা তিতিরের গায়ে ব্লাঙ্কেট জড়িয়ে দিয়ে চুলে হাত বোলাতে লাগলো। তিতির আস্তে আস্তে চোখ বুজে নিলো। আযান খাবারের প্লেট গুলো নিয়ে যাওয়ার সময় তিতিরকে একবার দেখ বাইরে বেরিয়ে গেল।

রাত প্রায় সাড়ে বারোটার দিকে আযান মায়ের রুমে ঢুকলো। রুমের দরজা সব সময় খোলা থাকে তাই খুব একটা অসুবিধা হলো না। রুমে ঢুকে দেখে তিতির একপাশে ঘুমিয়ে আছে আর তার পাশে খাটের কার্নিসে মাথা ঠেকিয়ে মা ঘুমিয়ে আছে। আযান মায়ের পাশে বসে মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বালিশ ঠিক করে দিয়ে মাকে ঠিক মত শুইয়ে দিলো। মায়ের গায়ে আরেকটা ব্লাঙ্কেট জড়িয়ে দিয়ে উঠে আসতেই হাত টান পড়লো আযানের। আযান তাকিয়ে দেখে তার মা হাত ধরে আছে। আযান মুচকি হেসে পাশে বসলো। আযানের মা ইশারা করে বলে,, মাকে দেখতে এসেছিস?

আযান মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আস্তে করে বললো, প্রতিদিনের মত মা'কেই দেখতে এসেছি তবে আজ তিতিরকেও দেখতে এসেছি মা।

আযানের মা তিতিরের দিকে একপলক তাকিয়ে বলে,মেয়েটা অনেক কষ্টে ঘুমিয়েছে, ঘুমের মধ্যে কিছুক্ষণ পর পর কেঁদে উঠে। কাল একবার ডাক্তারকে আসতে বলিস!

আযান মায়ের কথায় সায় দিয়ে উঠে দাঁড়ালো।তিতিরকে আরেকবার দেখে নিজের রুমের দিকে অগ্ৰসর হলো। আযানের খুব ইচ্ছে হচ্ছে তিতিরের সম্পর্কে জানতে, তিতিরের অসহায়ত্বের কারন খুঁজতে।আযান জানে তিতির নামক মেয়েটা নিজের কষ্টের ভার বইতে পারছে না, হয়তো কষ্টটাও বিশাল।

তিতিরের কষ্টের ভাগ নেওয়ার একটা সুপ্ত ইচ্ছে আযানের মনে উঁকি দিচ্ছে।আযান সেই ইচ্ছেটাকে সুপ্ত রেখে নিজের রুমের দিকে অগ্রসর হলো।নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ল। পুরো দিনের ক্লান্তি ভর করাতে নিমেষেই ঘুমিয়ে পড়লো আযান।

•

•

শীতের সকালের মিষ্টি রোদ মুখে পড়তেই আযান জেগে উঠলো। চোখ খুলে কিছুক্ষণ চুপ করে শুয়ে ছিল। হুট করে কালকের ঘটনা আর তিতিরের কথা মনে হতেই লাফিয়ে উঠে বসলো। পাশ থেকে টিশার্ট নিয়ে মায়ের রুমের দিকে রওনা দিলো। টিশার্ট পরে মায়ের রুমে ঢুকে দেখে তিতিরকে মা খাটে বসাচ্ছে।তিতির বাম হাতের উলটো পিঠ দিয়ে বার বার চোখ মুছছে। আযানকে দেখে তার মা ইশারায় বললো, দেখ মেয়েটা কাঁদছে আর বার বার বলছে কোথায় যেন চলে যাবে। ওকে নাকি বাঁচিয়ে ভুল করেছে।সে বাঁচতে চায় না।

মায়ের কথা শুনে আযানের মেজাজ গরম হয়ে গেল।কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিতিরের সামনে দাঁড়ালো। জিজ্ঞেস করেই ছাড়বে কিসের এতো দুঃখ তার! কেন এমন করছে সে?

চলবে,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন