গল্পের নাম: #পাতাবাহার_(অনূভুতির অশ্রুমালা)
পর্ব :(৫)
লেখিকা:#সাদিয়া_আফরোজ
তিতিরের ভয় পেয়ে চমকে ওঠা আযানের দৃষ্টি এড়ায় নি।আযান মুচকি হেসে সামনে এগিয়ে গেল। এইদিকে তিতির শক্ত হয়ে বসে আছে,না পারছে পেছনে ফিরতে না পারছে বসে থাকতে। আযান তিতিরের সামনে দাঁড়িয়ে তিতিরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,ভয় পেয়েছেন?
তিতির চুপ করে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে,এই প্রথম সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের কথার উত্তর দিতে সংকোচ বোধ করছে।
আযান বুঝতে পারলো তিতির তার কথার উত্তর দিতে সংকোচ বোধ করছে। তিতিরকে স্বাভাবিক করতে আযান বলে উঠলো, আচ্ছা তিতির আপনি আমার নাম জানেন?
তিতির মাথা নেড়ে বলে, হ্যা জানি। আপনার নাম আযান শেখ।
আযান মুচকি হেসে বলল, আপনি কি ভাবে জানলেন?আমিতো বলিনি!আর মাতো কথা বলতে পারে না, তাহলে?
তিতির আযানের দিকে একপলক তাকিয়ে বলল,, আন্টি কথা বলতে পারে না তো কি হয়েছে!লিখতে তো পারে!
আযান বাগানে রাখা বেতের চেয়ার গুলো থেকে একটা চেয়ার টেনে তিতিরের পাশে বসলো। তিতির আড় চোখে তাকিয়ে চুপ করে গেল। আযান তিতিরের কোলের উপর রাখা ডায়রিটা নিতে গেলে তিতির তা বাম হাত দিয়ে ডায়রিটা সরিয়ে ফেলে। আযান অবাক হয়ে বললো, আরে ! সরালেন কেন?দেখি আমিও একটু পড়ি।
তিতির নাকোচ করে বললো,, উঁহু! পড়া যাবে না। এইখানে আন্টির কথা যা আমাকে বলেছে। আপনি কেন পড়বেন?
আযান মুচকি হেসে মাথা চুলকে বলে, ঠিক আছে ঠিক আছে পড়বো না।
তিতির ডায়রিটা আবার নিজের কোলের উপর রাখে আযানের দিকে তাকিয়ে বললো, আমি একটা বাড়তি টেনশন হয়ে গেলাম তাইনা?
আযান সামনের গাছ গুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি নিজেকে বড্ডো বেশি অপ্রয়োজনীয় মনে করেন তাই এই কথা মনে হচ্ছে। ইভেন আমাদের কাছে আপনাকে তেমন মনে হলে,আমরাও আপনাকে বাড়তি টেনশন ভাবতাম। আযান তিতিরের দিকে তাকিয়ে বললো, কিন্তু আমার মা কিংবা আমার কাছে সেটা মনে হচ্ছে না।
তিতির জোর পূর্বক হাসার চেষ্টা করে বললো, এতো বেশি ভালো হবেন না। বেশি ভালো মানুষ গুলো একটা সময় খুব বেশি কষ্ট পায়। কারন তারা ছলনা করতে পারে না, মিথ্যা মায়া দেখাতে পারে না,আর না পারে আঘাত করতে।
আযান তিতিরের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলে উঠে, আমার মা বলে আপনি পিচ্চি একটা মেয়ে। কিন্তু মা তো জানে না পিচ্চি মেয়ে পাকা পাকা কথা বলে!
তিতির আযানের কথায় মুচকি হেসে বলে উঠলো, আমি অতোটাও পিচ্চি না, টুয়েন্টি টু প্লাস বুঝেছেন!
আযান শব্দ করে হেসে উঠে বললো,, মা ঠিকই বলে , পিচ্চি মেয়ে।
আযানের কথায় তিতির অবাক হয়ে বলে, পিচ্চি!
আযান ভাবুক হয়ে বললো, তা নয়তো কি? আমার কাছে তো পিচ্চিই।
তিতির আযানের দিকে তাকিয়ে বলল, একটা কথা বলি?
আযান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল, অনুমতি নেয়ার কি আছে!বলে ফেলুন।
তিতির কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,আন্টির কাছে শুনেছি আপনার মাথা অনেক গরম মানে বদ মেজাজি টাইপের কিন্তু আমার কাছে তা মনে হয় না।
তিতিরের কথায় আযান হাঁসি আটকে রাখতে পারল না। এক প্রকার হাসতে হাসতে বলল, সিরিয়াসলি!মা এইটা বলেছে?আমি শিওর আপনাকে ভয় দেখানোর জন্য বলেছে।
আযানের হাঁসি দেখে তিতির মিন মিন করে বলে উঠলো,আমি জানতাম এমনটাই হবে।
আযান হাঁসি থামিয়ে বললো,বাট ওইটা বলেছে যাতে আপনি কোনো কিছুতে অমত না করেন।
তিতির ডায়রির উপরে হাত বুলিয়ে বললো, তবে আন্টি অনেক ভালো, ওনার মধ্যে এখনও বাচ্চা সুলভ আচরণ আছে। আচ্ছা আন্টি কথা বলে না কেন?
আযান তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বললো, বেশি না একুশ বছর হলো কথা বলে না।
আযানের কথায় তিতির চকিত হয়ে তাকালো।
আযান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,,আমরা তখন গ্ৰামে থাকতাম। সাত বছর শেষে সদ্য আট বছরে পদার্পণ করেছি। তখন মায়ের আস্তে আস্তে গলায় সমস্যা শুরু হয়। প্রথম প্রথম পাত্তা দেয়নি, অবশ্য যাদের টাকা পয়সা বেশি থাকে তারা সামান্য জ্বর হলেও ডাক্তারের কাছে ছুটে যায়। আমাদের এতো টাকা পয়সা ছিল না তাই মায়ের অসুখটাও চোখে পড়ে নি,আর মাও খারাপ লাগাটা বলতো না। আস্তে আস্তে সমস্যা বাড়তে লাগলো,তা দেখে বাবা মাকে নিয়ে আমাদের গ্রামের ডাক্তারের কাছে ছুটে যায়। মায়ের চিকিৎসা শুরু হয় কিন্তু আমারা বুঝতে পারিনি মায়ের এই চিকিৎসাটা মায়ের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। অনভিজ্ঞ গ্ৰাম্য ডাক্তার তার উপর ভুল ঔষধ ব্যাস মায়ের কথা বলা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল।পরে বড় বড় ডাক্তার দেখিয়েও লাভ হয়নি।
কথা শেষ করে তিতিরের দিকে তাকিয়ে দেখে তিতির চোখ মুছছে।
আযান মুচকি হেসে বলল, আপনি একদম আমার মায়ের মত, যে কোনো কথায় কেঁদে ফেলেন।
তিতির চোখ মুছে বলল,কেউ সুখে থাকলে কাঁদে না বুঝলেন!
আযান মুচকি হেসে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, বুঝলাম এইবার চলুন বাগান ঘুরে দেখি।আমার মায়ের নিজের হাতে সাজানো বাগান।
তিতির ডান হাতের তালুর দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল, আপনি যান আমি নাহয় পরে ঘুরে দেখবো।
আযান তিতিরের অবস্থা বুঝতে পেরে হুইলচেয়ারের হাতল ধরে সামনে এগিয়ে যেতে যেতে বললো, আভি নেহি তো কাভি নেই। বাকির নাম ফাঁকি বুঝলেন?
তিতির সামনে তাকিয়ে বললো, আপনি আমার বড় তাই আমাকে আপনি করে বলবেন না, শুনতে কেমন জানি লাগে। যেহেতু আমি আপনার ছোট তাই "তুই" কিংবা "তুমি" করে বলতে পারেন।
আযান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ছোট বেলার বন্ধু ছাড়া কাউকে তুই করে বলি না। ঠিক আছে তোমাকে "তুমি"করেই বলবো।
তিতির মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
আযান তিতিরকে নিয়ে পুরো গার্ডেন এরিয়াটা ঘুরে দেখলো , সাথে তিতিরকে বাগানের গাছ গুলো সম্পর্কে বললো।
বেশ কিছুক্ষণ পর আনিতা শেখ তিতির আর আযানকে ডাক দিল। আযান তিতিরকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
তিতিরের জিবনটা অন্য দিকে মোড় নিলো। দুর্বিসহ জিবনটা আগের মত দুর্বিসহ না হলেও একা সময় ঠিকই আগের কথা আর আঘাত গুলোকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
এর মধ্যে কেটে গেল পাঁচটা দিন। এই পাঁচদিনে তিতির আনিতা শেখ আর আযানের সাথে অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ডাক্তার এসে তিতিরের মাথার ব্যান্ডেজটা খুলে ওয়াশ করে দিয়েছে।তিতিরের হাতের ঘা অনেকটাই শুকিয়ে গেছে। সন্ধ্যায় আনিতা শেখ তিতিরের চুল আঁচড়ে দিচ্ছে, এমন সময় আযান অফিস থেকে ফিরলো। চেঞ্জ না করেই মায়ের রুমে এসে হাজির। আযানকে দেখে তিতির মাথায় ঘোমটা দিয়ে বসলো। আযান হাতে করে আনা দুটো প্যাকেট বিছানার উপর রেখে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,মা আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি তুমি প্যাকেট গুলো খুলো।
আনিতা বিরক্ত ভঙ্গিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে। আনিতা শেখের মতে তার ছেলেটা একদম নওটঙ্কি। আযান মায়ের চাহনি উপেক্ষা করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তিতির আযানের যাওয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ঘোমটা খুলে দিলো। আনিতা শেখ ভাবলেশহীন ভাবে তিতিরের চুল আঁচড়ে সুন্দর করে দুবেনী করে দিয়েছে। তিতিরের বেনী করা একদম পছন্দ নয় তিতির মুখ ফুলিয়ে বললো,, আন্টি বেনী পছন্দ না।
আনিতা শেখ পাশ থেকে ডায়েরিটা নিয়ে লিখলো,, কিন্তু তোমাকে তো দু বেনীতে একদম পিচ্ছি পরীর মত লাগছে।
আনিতা ডায়েরিটা তিতিরকে দিলো। তিতির লেখাটা পড়ে আনিতা শেখকে জড়িয়ে ধরে বলল, জানো আন্টি আমি যখন বেনী করতে মানা করতাম তখন আমার মা ঠিক এইটাই বলতো।
আনিতা শেখ মুচকি হেসে তিতিরের কপালে চুমু দিয়ে ইশারায় বললো, আমিও কিন্তু তোর মা।তিতির এই প্রথম আনিতা শেখের ইশারায় বলা কথাটা বুঝলো।
তিতির মুচকি হেসে বলল, হুম আরেকটা মা!
আনিতা শেখ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে, তিতির তার কথা কি ভাবে বুঝলো তা ভাবছে।
তিতির কিছু বলবে এমন সময় আযান এসে উপস্থিত। আযান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল, দুই ড্রামা কুইন বসে আছে কি করতে বললাম আর কি করলো?
আনিতা শেখ আযানের দিকে চোখ রাঙানি দিতেই আযান মুচকি হেসে বলল,মেরি মা প্যাকেটে তোমার প্রিয় ফুচকা আছে তাই চোখ রাঙ্গানি পরে দিও, তাড়াতাড়ি বসে স্কুল ছাত্রীকে নিয়ে ফুচকা খাও।
স্কুল ছাত্রী বলায় তিতির একদম অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো। আনিতা শেখ আযানের বাহুতে দুটো থাপ্পড় দিয়ে ইশারায় বললো, কোথায় দেখলি স্কুল ছাত্রী ! ভালো করে তাকিয়ে দেখ মেয়েটাকে একদম পিচ্ছি পরীর মত লাগছে।
আযান মায়ের বকুনি আর মার খেয়ে শব্দ করে হেসে উঠে বললো, সরি,, সরি,, মা ! আর কখনো তোমার দুবেনী ওয়ালা পিচ্চি পরীকে স্কুল ছাত্রী বলবো না।
আযানের এহেন কথায় তিতির মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। আনিতা শেখ ছেলের দুষ্টুমির কাছে হার মেনে কিচেনে বাটি আনতে চলে গেল।আযান বিছানার অন্য প্রান্তে বসে তিতিরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে, মুখ ফুলিয়ে রাখতে তোমাকে আরো বেশি পিচ্চি লাগে। তিতির ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,আর আপনাকে বুড়ো চাচা লাগে।
আযান চকিত হয়ে তিতিরের দিকে তাকালো। আযানের তাকানোতে তিতির মুখ চেপে হেসে উঠলো। আযান এই প্রথম তিতিরকে হাসতে দেখছে। এক প্রকার মুগ্ধ হয়ে তিতিরের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে উঠলো,,তুমি হাসো না কেন?
চলবে,,
(ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)