গল্পের নাম: #পাতাবাহার_(অনূভুতির অশ্রুমালা)
পর্ব :(৭)
লেখিকা:#সাদিয়া_আফরোজ
•
•
•
প্রায় আটটা বাজতে চললো।ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে আছে তিতির। রিমোট হাতে নিয়ে বারবার চ্যানেল চেঞ্জ করছে। কিন্তু বিরক্তির রেশ বাড়ছে বই কমছে না। চ্যানেল চেঞ্জ করতে করতে একটা চ্যানেলে গিয়ে থামলো, সেখানে সিনড্রেলা শুরু হয়েছে মাত্র। তিতিরের কাছে সিনড্রেলা সব সময় ভালোলাগতো এখনো লাগে তাই পাশে রিমোট রেখে পা ঠিক করে নড়েচড়ে বসলো। আনিতা শেখ কিচেন থেকে বারবার এসে তিতিরকে দেখে যাচ্ছে। তিতির আনিতা শেখের কান্ড দেখে হেসে উঠে বলে, আন্টি তুমি কিচেনে কি করছো? আমার পাশে এসে বসো না! বারবার এসে দেখে যাচ্ছো মনে হচ্ছে আমি ছোট বাচ্চা।
তিতিরের কথায় আনিতা শেখ মুচকি হেসে ডায়রিটা তিতিরের দিকে এগিয়ে দিল।
তিতির ডায়রি হাতে নিয়ে দেখে তাতে লেখা "ছোট বাচ্চাইতো! আমার পিচ্চি বাচ্চা তাইতো বারবার এসে দেখছি"। তিতির লেখাটা পড়ে মুচকি হেসে আনিতা শেখের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি বলেছো ঠিক আছে। তবে ভুলেও এই কথা তোমার ছেলের সামনে বলবে না, আমাকে এইগুলো বলে বলে রাগায়।
তিতিরের কথায় আনিতা শেখ মুখ টিপে হেসে তিতিরের কপালে চুমু দিয়ে ইশারায় বললো, ঠিক আছে।
তিতির টিভির দিকে তাকিয়ে মনোযোগ দিলো। আনিতা শেখ তাড়াতাড়ি কিচেনে চলে গেল। মিনিট পাঁচেক পর হাতে করে একটা বড় বাটি নিয়ে আবার আসলো। তিতির তাকিয়ে দেখে বাটিতে পপকর্ন নিয়ে এসেছে।
তিতির কিছু বলবে তার আগেই কলিং বেল বেজে উঠল তাও একবার না,সেকেন্ডেই তিন চারবার।এতে বুঝতে বাকি নেই আযান এসেছে।
তিতির আনিতা শেখের দিকে তাকিয়ে দেখে উনি বেশ রেগে গেছে। তিতির মুচকি হেসে সিনড্রেলা দেখতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ল,কারন আযানের এই কাজটা রোজ ঘটে যাওয়া ঘটনার মত। আযান বাড়িতে আসলেই বারকয়েক কলিং বেল বাজাবে আর আনিতা শেখ রেগে শলা কিংবা খুন্তি নিয়ে দরজা খুলবে।
কিন্তু আনিতা শেখ দরজা খুলে দেখে ওনার ছেলে কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
তিতির টিভির দিক থেকে চোখ সরিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে আজও আযান কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
তিতির সেইদিকে তাকিয়ে শব্দ করে হেসে উঠলো। অদ্ভুত দৃশ্য বিবাহ উপযুক্ত ছেলে কোট টাই সুট বুট পরে কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তিতির হাসছে দেখে আযান চোখ ছোট ছোট করে তাকালো। তিতির তৎক্ষণাৎ হাঁসি বন্ধ করে ফেললো। এইদিকে আনিতা শেখ আযানের বাহুতে দুটো থাপ্পড় মেরে হন হন করে কিচেনে চলে গেল। আযান দরজা লক করে ল্যাপটপের ব্যাগটা সোফায় রেখে তিতিরের দিকে তাকিয়ে বলল, খুব হাসি পাচ্ছে না?
তিতির ঠোঁট চেপে হেসে বলল, কই নাতো!
আযান চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলে, ঘরের শত্রু দুবেনী ওয়ালী বিভীষণ একটা! কোথায় ফ্রেন্ডকে বাঁচাবে তা না, উনি হাসছে?
তিতির চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে বলে, কীহ? এতো মোটা কথা?আমি এক্ষুনি আন্টিকে বলে দিবো। নিজে ছোট বাচ্চাদের মত কাজ করে আবার আমাকে দুবেনী ওয়ালী বিভীষণ বলছে! আপনি যা করেছেন তার জন্য বেদম পেটানো উচিত ,ঠিক আমাদের বাড়ির চারতলার আন্টির ছেলের মত।
তিতিরের কথায় আযান শব্দ করে হেসে উঠে বললো, বলে দিও আমি মোটা কথা বলেছি।
তিতির ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বল,হুহ্! আন্টি আপনাকে আরো দুটো দিলে খুশি হতাম।
আযান মুচকি হেঁসে বলে, তুমি তোমার আন্টিকে ডেকে আমার নামে নালিশ করো ততক্ষণে আমি চেন্জ করে আসছি।
তিতির আযানের দিকে তাকিয়ে ভেংচি কেটে টিভির দিকে তাকালো।
তিতিরের কান্ড দেখে আযান নিঃশব্দে হাসলো।
কিছুক্ষণ পর আযান এসে সোফায় বসলো। কিন্তু তিতিরের সেইদিকে খেয়াল নেই।সে এতোটাই মনোযোগ দিয়ে ছবি দেখছে যে মনে হচ্ছে টিভির ভেতর ঢুকে গেছে। আযান তিতিরের হাতের পাশ থেকে পপকর্নের বাটিটা নিয়ে পপকর্ন খেতে শুরু করলো। তিতির টিভির দিকে তাকিয়ে পপকর্নের বাটিতে হাত দিতেই দেখে বাটি নেই। চমকে উঠে পাশে তাকিয়ে দেখে আযান প্রায় সবটা খেয়ে ফেলেছে।
তিতির ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল, বাটিটা রাখার কি আছে ?ওটা খেয়ে ফেললে কি হয়?
আযান পপকর্ন চিবোতে চিবোতে বলে, ওহ্ আচ্ছা তুমি টিভি থেকে বেরিয়ে গেছো?
তিতির মুখ ফুলিয়ে বললো, মানে?
আযান তিতিরের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি রেখে বললো, যেভাবে টিভি দেখছিলে মনে হচ্ছে টিভির মধ্যে ঢুকে গেছো।আমি যে সেই কখন থেকে এইখানে বসে আছি তোমার সেই খেয়াল আছে?
তিতির আযানের কথা শুনে টিভির দিকে তাকিয়ে বলে আমি টিভি দেখার সময় টিভির ভেতর ঢুকে যাই এটা আবার নতুন কি! এই জন্য মা সব সময় বকা দিতো। বলতো " ঢুকে যা ঢিভির ভেতর"। মায়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই বাবা বলতো" আহ অনু !কেন বকছো আমার মাকে? তুমি জানো না আমার মা যা করে তা মনোযোগ দিয়েই করে।"
তিতিরের কথা শুনে আযানের বেশ হাসি পেলো।
কথা গুলো বলার সময় তিতিরের ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটে আছে। তিতির হাসি রেখা বজায় রেখে বেশ আগ্ৰহ নিয়ে বলল, জানেন বাবা যখন বাড়িতে থাকতো, তখন কেউ আমাকে বকা দিতে পারতো না। বকলে বাবা তাকে উল্টো বকে দিতো। কিন্তু এখন মাও আর বকে না, বাবাও বকা থেকে বাঁচায় না। তিতির জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে বুকে মধ্যে হঠাৎ জমা হওয়া কষ্টটাকে কমাতে চাইছে। কিন্তু কমলো না বরং বেড়ে গেলো। তিতিরের চোখ জোড়া নোনা জলে সিক্ত হয়ে গেছে। তিতির জোর পূর্বক হাসার চেষ্টা করে বললো, এখন বকার মানুষটাও নেই আর বাঁচানোর মানুষটাও নেই। দুজন খুব বেশি স্বার্থপর আমাকে একা রেখে চলে গেছে। একবারও ভাবলো না আমি কি ভাবে ,কার কাছে থাকবো! আপনিই বলুন স্বার্থপর না?
আযান বলার জন্য কিছু পেলো না,তাই চুপ করে আছে।
তিতির চোখ মুছে মাথা নিচু করে বসে আছে।
আযান তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে ডাকলো, তিতির !
আযানের ডাকে সাড়া দিলো না তিতির। আযান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,আমি জানি না তোমার জিবনে আসলে কি ঘটেছিল ,তবে হ্যা জানতে চাই। কখনো ইচ্ছে হলে বলো।
আযানের কথায় তিতির আযানের দিকে তাকালো।
আযান তিতিরের দিকে একপলক তাকিয়ে বললো, শুনো তিতির তোমাকে একটা কথা বলি!সবার জিবনেই কিছু কষ্ট থাকে। তোমার জিবনে যেমন আছে ঠিক আমার জিবনেও ছিলো আর এখনো কিছুটা ছাপ রয়ে গেছে। তুমি হয়তো জানো আমার বাবা নেই। কিন্তু একটা সময় আমি আমার মা আর বাবা মিলে আমাদের ছোট একটা সংসার ছিল। হ্যা ছোটবেলায় অনেক টানাপোড়েনের সংসার ছিল আমাদের, কিন্তু সেই সংসারের মধ্যে একটা প্রশান্তি ছিল। কারন বাবা ছিল তখন,বাবা যাকে আমি আমার বন্ধু আর আইডল দুটোই ভাবতাম। আমি না,দায়িত্ব কর্তব্য পালন এইসব বুঝতাম না, বুঝার প্রয়োজনও পড়েনি কখনো। কিন্তু হঠাৎ একদিন বাবা দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়ে নিলো। বলা নেই কওয়া নেই সব দায়িত্ব আমার ওপর চাপিয়ে দিয়ে সর্বশান্ত হয়ে গেল। দায়িত্ব কি ভাবে পালন করতে হয় তাও শিখিয়ে দিয়ে গেলো না। শুধু দায়িত্ব কাঁধে চাপিয়ে চলে গেল।তবে হ্যা বাবার খাটিয়া কাঁধে নেওয়ার পর পরই দায়িত্বের ভারটা বুঝতে পারলাম আর বেশ দায়িত্ববানও হয়ে গেলাম।কষ্ট করে মাকেতো সামলে নিলাম কিন্তু আমার ভেতর আমিটাকে সামলাতে পারলাম না। মায়ের সামনে এমন ভাবে থাকতাম মনে হতো এইসবে আমার কোনো ফারাক পড়ছে না। কিন্তু বন্ধ দরজার ভেতরে আমার আমিটা খুব বেশি অসহায় হয়ে পড়তো। সকল ছেলেমানুষী ছেড়ে মায়ের দায়িত্ব নিয়ে নিলাম।হয়ে গেলাম দায়িত্ববান।জানো তিতির পায়ের তলার মাটি গুলো শক্ত করতে অনেকটা সময় লেগে গেছে। বাবা না থাকলে বুঝা যায় পৃথিবীতে টিকে থাকা কতটা কঠিন।
তিতির আযানের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এই ছেলেটাকে দেখলে বোঝার উপায় নেই কখনো তার জিবনেও দুঃখ কষ্ট ছিল।
আযান তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে তিতিরের দিকে তাকিয়ে দেখে তিতির তার দিকে তাকিয়ে আছে।
আযান মুচকি হেসে বলল, এইবার বুঝলে তুমি একা নও যে, নিজের মানুষ গুলোকে মিস করো,আমিও আছি কিন্তু।
তিতির মুচকি হেসে বলল, হুম বুঝলাম। কিন্তু আমার জিবনের গল্পটা একটু অন্যরকম।
আযান ঘড়িতে সময় দেখতে দেখতে বললো, অন্যরকম গল্পটা শুনতে চাই যদি তুমি কখনো বলতে চাও।
তিতিরে কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে আযান তিতিরের দিকে তাকিয়ে বলে, দুঃখ জমিয়ে পাহাড় করার প্রয়োজন নেই , মাঝে মাঝে দুঃখ গুলোকে শূন্যে উড়িয়ে দিয়ো দেখবে নিজেকে বেশ হালকা মনে হচ্ছে।
তিতির মুচকি হেসে বলল, আগে নিজেকে কিছুটা সামলে নেই তারপর নাহয় শূন্যে উড়িয়ে দিবো।
•
•
সকালের সোনালী রোদ মুখে পড়তেই আযানের ঘুম ভেঙ্গে গেল। উঠে বসে টিশার্ট গায়ে জড়িয়ে নিল।ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বারান্দায় গিয়ে দাড়ালো। বারান্দায় যেতেই চোখ পড়লো গার্ডেন এরিয়াতে,যেখানে তিতির হুইলচেয়ারে বসে আছে। আযান মুচকি হেসে রুমের দিকে পা বাড়ালো উদ্দেশ্য গার্ডেন এরিয়া।
এইদিকে তিতির হাতের দিকে তাকিয়ে সেই বিদঘুটে দিনের কথা ভাবছে।
চলবে,,
(ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)