গল্পের নাম: #পাতাবাহার_(অনূভুতির অশ্রুমালা)
পর্ব :(১২)
লেখিকা:#সাদিয়া_আফরোজ
•
•
•
আযান মায়ের এমন থাপ্পড় রোজ খায় এতে আফসোস নেই। কিন্তু তার এই ড্রামা কুইন মা সাথে করে নিয়ে আসা জিনিস পত্র গুলো না নিয়েই সানন্দে টিভি দেখছে এতেই আযান হা হয়ে গেছে,দিনে দিনে মায়ের নতুন রূপ বের হচ্ছে।
তিতির কোনো রকম হাঁসি থামিয়ে আযানের সামনে দাঁড়িয়ে বললো,, আন্টি অনেক মনোযোগ দিয়ে ছবিটা দেখছিল আর আপনি এতে ব্যাঘাত ঘটিয়ে দিলেন!এই জন্যই আপনাকে পাত্তা দেয়নি বরং পিটুনি দিয়েছে।
আযান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল, তাই বলে তুমি হাসবে?
তিতির আযানের হাত থেকে প্যাকেট গুলো নিতে নিতে বললো, এমন মজার মূহুর্ত রোজ রোজ আসে না তাই উপভোগ করছিলাম আরকি।
আযান তিতিরের কথা শুনে ভ্রু জোড়া সংকুচিত করে বললো,, দু বেনী ওয়ালী শত্রু কোথাকার! তোমার জন্য আজ রাতেই ভুত পাঠাবো দেখবে।
তিতির আযানের কথায় গুরুত্ব না দিয়ে প্যাকেট গুলো ডায়নিং টেবিলের উপর রাখতে রাখতে বলল, আমার কোনো ভয় নেই আমার পাশে আমার সুইট কিউট আন্টি আছে।
আযান মায়ের পাশে বসে মায়ের কাঁধে মাথা রেখে বললো, তোমার সুইট কিউট আন্টির জন্য রাক্ষসি পাঠাবো।
আনিতা শেখ ছেলের কথা শুনে ছেলের কান টেনে ইশারায় বললো,তোর জন্য দোতলায় এক প্যাকেট ইঁদুর পাঠাবো।
আযান আঁতকে উঠে আমতা আমতা করে বললো,মা তুমি এইসব কি বলছো?আধো তুমি আমার মা তো?নিজের ছেলের সাথে কেউ এমন করে?
তিতির আযানের ভয় জড়ানো মুখশ্রী দেখে আনিতা শেখের অন্য পাশে বসে বললো,কি ব্যাপার আন্টি?
আনিতা শেখ টি-টেবিলের উপর থেকে ডায়রি নিয়ে লিখলো,"আযান ইঁদুর ভয় পায় ওকে ইঁদুর দিয়েই শায়েস্তা করছি"।
আনিতা শেখ ডায়রিটা তিতিরের দিকে বাড়িয়ে দিতে নিলে আযান তাতে বাধসাধে। কিন্তু তিতির ছো মেরে ডায়রিটা নিয়ে নেয়।
তিতির ডায়রির লেখাটা পড়ে বাকা হেসে আযানের দিকে তাকিয়ে বলল,, তাহলে এই ব্যাপার!
আযান তিতিরের কথায় মায়ের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠে, দিলেতো সব শেষ করে?এইবার এই দুবেনী ওয়ালী বান্দরনী আমাকে ক্ষেপাবে।
আযানের কথায় তিতির এক ভ্রু কিঞ্চিত বাঁকা করে বললো, আমাকে এইসব বলা না? আপনার একদিন আর ইঁদুরের যা কয়দিন লাগে দেখবেন!
আযান মুচকি হেসে বললো, তোমাকে ওই ইঁদুর গুলোকে দিয়ে দিবো তখন বুঝবে মজা।
তিতির আযানকে ভেংচি কেটে বললো, আমি ওসব ভয় পাই না। বরং আপনার রুমে আমি ইঁদুর রেখে আসবো দেখবেন।
আযান আবার কিছু বলতে নিবে তার আগে আনিতা শেখ আযান আর তিতিরের শান্তি পূর্ণ ভেজালের মাঝে বেগড়া দিয়ে ইশারায় বললো, দুই বাঁদর যদি এখন মুখ বন্ধ না করো , দু'টোকেই ঘর থেকে বের করে দরজা আটকে দিবো। তখন দুজন বাইরে বসে আরামসে ভেজাল করতে পারবে।
তিতির কিছু বুঝলো না তাই প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে আযানের দিকে তাকালো। আযান তিতিরের তাকানোর কারন বুঝতে পেরে বললো, মা বলেছে, দুই বাঁদর যদি এখন মুখ বন্ধ না করি , দু'টোকেই ঘর থেকে বের করে দরজা আটকে দিবে। তখন দুজন বাইরে বসে আরামসে ভেজাল করতে পারবো।
তিতির ভাব নিয়ে বললো,আমি আপনার মত বুড়ো চাচার সাথে ভেজাল করবো না হুহ।
আযান আড় চোখে তাকিয়ে বললো,,,, আমারও শখ নেই কোনো দুবেনী ওয়ালী পেত্নী র সাথে ভেজাল করার।
আনিতা শেখ মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। দুটোকে থামাতে গিয়ে আরো বেশি করে ভেজালে ফেলে দিয়েছে।
এই দিকে তিতির আর আনান তাদের কথা কাটাকাটিতে ব্যাস্ত।
এক পর্যায়ে অনিতা শেষ উঠে কিচেনে চলে গেল। আযান তিতিরের দিকে তাকিয়ে বলল,মায়ের আবার কি হলো!
তিতির ভাবুক হয়ে বললো, মনে হয় আপনার জন্য উঠে গেছে।
আযান কিছু বলবে তার আগেই আনিতা শেখ খুন্তি নিয়ে হাজির হলো। আযান খুন্তি দেখেই আস্তে করে উঠে চলে গেল, এই দিকে তিতির দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে বসে আছে।
আনিতা শেখ তিতিরের এহেন কান্ডে মুচকি হেসে কিচেনের দিকে চলে গেল। আনিতা শেখের কাছে আযান আর তিতিরের ঝগড়া দারুন লাগে । কিন্তু উনি চায় না এই খুনসুটি ঝগড়া সব সময় চলতে থাকুক, এতে সম্পর্কের মধ্যে নতুনত্ব ও সৌন্দর্য বজায় থাকে না।তাই উনি মিথ্যে রাগ দেখিয়ে ঝগড়া থামিয়ে দেয়।
,,
আযান ফ্রেশ হয়ে বিছানায় বসলো। বড় শপিং ব্যাগ থেকে গিফ্ট পেরারে রেপিং করা দুটো বক্স বের করলো। যার মধ্যে একটার উপর "মা" লেখা, আর একটার উপর "দুবেনী ওয়ালী বান্ধবী" লেখা। লেখা গুলোর উপর হাত বুলিয়ে মুচকি হাসলো। টিশার্ট পরে বক্স দুটো হাতে করে দিয়ে ডায়নিং রুমের দিকে পা বাড়ালো।
টেবিলে খাবার সাজাচ্ছে আনিতা শেখ। তিতির আনিতা শেখের হাতে হাতে কাজ গুলো এগিয়ে দিচ্ছে। যদিও আনিতা শেখ অনেক বার মানা করেছে, কিন্তু তিতির বারন শুনার পাত্রী না।
আযান সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় দুজনের দিকে তাকিয়ে স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলল। আযানের কাছে দুইজনের মেলবন্ধনটা বরাবরই ভালো লাগে। আযান মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসলো। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে আজ ওবদি মাকে কখনো এতো উৎফুল্ল দেখেনি।তিতির আসার পর থেকেই মায়ের চোখে মুখে আলাদা একটা চমক দেখা যাচ্ছে , সাথে ঠোঁটের কোনে লেগে থাকা হাসির রেখা। মায়ের একাকিত্বের সঙ্গি হয়ে উঠেছে তিতির। মায়ের মুখে সারাক্ষণ লেগে থাকা এই মধুর হাসিটার এক মাত্র কারন তিতির। আযান তিতিরের এই ঋণ কখনো শোধ করতে পারবে না। আযান বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিয়ে সামনে পা বাড়ালো।
আনিতা শেখ টেবিল সাজিয়ে আযানকে ডাকার জন্য তিতিরকে পাঠাবে ভাবছে,তার আগেই আযানের আগমন ঘটলো।
আযান মুচকি হেসে বলল, দুজন এইদিকে আসো!
আনিতা শেখ ভ্রু কুঁচকে তিতিরের দিকে তাকালো। তিতির আনিতা শেখের দিক থেকে চোখ সরিয়ে আযানের দিকে তাকিয়ে বলল,এতো কষ্ট করে এতো টুকু এসেছেন আর একটু আসলে আমাদের কষ্ট করে ওই দিকটায় যেতে হবে না।
আযান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,আমি আসলে বক্স দুটো তোমার মাথার উপর রাখবো।
তিতির চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে আছে। আনিতা শেখ সামনে এগিয়ে ছেলে বাহুতে আদুরে হাতে চাপড় মেরে ইশারায় বললো, নওটঙ্কি কোথাকার কেন জ্বালাতন করছিস পিচ্চিটাকে!
আযান শব্দ করে হেসে উঠে বললো, তোমার পিচ্চি একটু বেশিই পিচ্চি সেই জন্য।
আযানের কথায় তিতির মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে।
আযান বক্স দুটো থেকে একটা মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো, এইটা আমার সুইট কিউট ড্রামা কুইন মায়ের জন্য।
আনিতা শেখ হেসে উঠে বক্সটা হাতে নিলো।
আযান আরেকটা বক্স নিয়ে তিতিরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, এইটা আমার এক মাত্র দুবেনী ওয়ালী বান্ধবীর জন্য।
তিতির ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল, অপমান না!
আযান মুখ টিপে হেসে বলে উঠলো, উঁহু! এইটা বান্ধবীর গিফ্ট।
তিতির কিছু বললো না। বরং চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
তিতিরের চুপ থাকা অনেক কিছু বলে দিচ্ছে আযানকে। আযান মায়ের দিকে তাকিয়ে ইশারা করতেই আনিতা শেখ তিতির পাশে দাঁড়ালো। তিতির আনিতা শেখের দিকে তাকাতেই আনিতা শেখ মুচকি হেসে ইশারায় নিতে বললো।
তিতির আযানের দিকে তাকিয়ে কিছু বলবে তার আগেই বাধসাধে আযান। মুচকি হেসে বলল,নাও তাড়াতাড়ি নয়তো সত্যি ভুত পাঠাবো।
তিতির মুচকি হেসে বক্সটা নিয়ে নিলো।
আনিতা শেখ তিতিরের হাত ধরে সোফায় বসিয়ে বক্স খুলতে বলে নিজেও বক্স খোলাতে উদ্ধত হলো।
আযান বুকে হাত গুজে দাঁড়িয়ে দুজনকে দেখছে।
দুজন একসাথে বক্স খুললো।
তিতির বক্স খুলে দেখে বক্সে নীল রঙের একটা জামদানী শাড়ি সাথে ম্যাচিং করা চুড়ি, ঝুমকো। আনিতা শেষ বক্স খুলে দেখে তাতে হালকা আকাশি রঙের জামদানী শাড়ি সাথে ম্যাচিং করা কানেরদুল আর চুড়ি। তিতির বক্সের জিনিস গুলো দেখে আযানের দিকে তাকালো।
আযান মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলো,, পছন্দ হয়েছে ম্যাম?
তিতির স্মিত হেসে বলল, খুব সুন্দর, পছন্দ হবেনা কেন!কিন্তু,,
তিতিরকে বলতে না দিয়ে আযান বললো, কোনো কিন্তু নেই এইখানে।
আযান মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখে মা খুব খুশি।
ছেলের আনা জিনিস গুলো খুব পছন্দ হয়েছে তার । আনিতা শেখ ছেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ইশারায় বললো, খুব সুন্দর,বেশ পছন্দ হয়েছে।
আযান হাত উঠিয়ে বললো, পছন্দ হয়েছে এতেই আমি খুশি। এইবার দুজন কাল বিকেলে এইগুলো পরে তৈরি হয়ে থাকবে। বিকেলে আমরা বের হবো।
আনিতা শেখ আযানকে থামিয়ে ইশারায় বললো, কোথায় যাওয়া হবে?
আযান ভাব নিয়ে বললো, দুজনকে কেজি মাপা বেঁচে দিবো সেইজন্য রেড়ি হয়ে থাকতে বলেছি। তাড়াতাড়ি খাবার দাও ক্ষিদে লেগেছে নয়তো এখনই বেঁচে দিবো।
আনিতা শেখ ছেলের এমন হেঁয়ালি কথায় বেশ বিরক্ত হলেন।তাই কাথা না বাড়িয়ে বক্স গুলো নিয়ে রুমে চলে গেল।
তিতির আযানের পাশ কাটিয়ে যেতে নিলেই আযান তিতির বলে ডেকে ওঠে।
তিতির আর সামনে এগোয় না। আযানের সামনে দাঁড়িয়ে বললো, হুম বলুন!
আযান স্মিত হেসে বলল,,শুনেছি মেয়েরা নাকি নিজের জমানো কথা আর অনূভুতি গুলো কাউকে বলার চাইতে লিখে রাখতে পছন্দ করে বেশি। জানি না কতটুকু সত্য!
তিতির আযানের দিকে তাকিয়ে বলল,হ্যা। তবে ততক্ষন ওবদি লিখে যতক্ষন না তাকে বুঝার মত একজন মানুষ পায়।
আযানের হাসির রেখা চওড়া হলো।আযান বিনা শব্দে তিতির সামনে থেকে সরে গেল।
তিতির বিস্মৃত হলো। বুঝতে পারলো না আযানের হাবভাব।
আযান টিভির পাশ থেকে একটা কালো রঙের কাগজের ব্যাগ এনে তিতিরের দিকে বাড়িয়ে দিল।
তিতির ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কি ?
আযান মুচকি হেসে বলল, ততক্ষন ওবদি লিখো যতক্ষন না তোমাকে বুঝার মত একজন একান্ত ব্যক্তিগত মানুষ পাও।
চলবে,,
(ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)