গল্পের নাম:#পাতাবাহার_(অনূভুতির অশ্রুমালা)
পর্ব :(২৪ অসমাপ্ত সমাপ্তি)
লেখিকা:#সাদিয়া_আফরোজ
•
•
•
•
আজ কাল আযান বুঝতে পারে তিতির তাকে পছন্দ করতে শুরু করেছে। এটাও জানে তিতির অনূভুতি গুলোকে অগ্রাহ্য করে, অনূভুতি গুলোকে প্রশ্রয় দেয়া না। আযান এটাও জানে তিতির কেন অনূভুতি গুলো থেকে নিজেকে আড়াল করে নেয়। তিতিরের ক্ষেত্রে এইটাই স্বাভাবিক। আযান সব জেনেও চুপ করে থাকে, কারন সে চায় না নিজের অনূভুতি গুলো তিতিরের উপর চাপিয়ে দিতে।
••••••
শুক্রবার হওয়াতে আযান বাড়িতেই আছে। দশটার দিকে আনিতা শেখ তিতিরকে জোর করে পাঠালো আযানের ঘরে। যাতে তিতির নাস্তা করার জন্য আযানকে ডেকে নিয়ে আসে। তিতির একরাশ লজ্জা নিয়ে আযানের ঘরের দিকে অগ্রসর হলো।
এই দিকে আযান গোসল করছে আর জোরে জোরে গান গাইছে,,
যাব লাইফ হো আউট অফ কন্ট্রোল,
হোটো কো কারকে গোল সিটি বাজাকে বোল, আল,, ইজ,, ওয়েল,,!
তিতির হা করে বাথরুমে সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কি বলবে বুঝতে পারছে না । এমন ফাটা বাঁশের মত গলা আর জিবনে কারো শুনেছে বলে মনে হয় না। তিতির জোরে জোরে দরজা ধাক্কা দিতে লাগল।আযান গান বন্ধ করে দরজা খুলে মাথাটা হালকা বের করলো।
তিতির ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রেগে বলল,, খবরদার এমন বেশুরা ফাটা বাঁশের মত গলায় কখনো গান গাইবেন না। মাথা ধরে গেছে আমার।
আযান চোখের উপর থেকে সাবানের ফেনা সরিয়ে পূর্ণ দৃষ্টি রাখলো তিতিরের উপর।
তিতির ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে।
আযান মুচকি হেসে বলল, ঠিক আছে গাইবো না ।কিন্তু আমি যখন গোসল করবো তখন তুমি ওয়াশ রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে গান গাইবে। আর আমি গোসল করব।বুঝই তো গান গেয়ে গোসল করার অভ্যাস আছে।
আযানের কথায় তিতিরের রাগ সপ্তম আসমান ছুই ছুই করছে। তিতির রেগে দাঁত কটমট করে বললো, বয়েই গেছে আমার। আমি গেলাম আন্টি আপনাকে নিচে নাস্তা করতে ডাকছে। দয়া করে হুলো বেড়ালের মত তাকিয়ে না থেকে ফ্রেশ হয়ে নিচে আসুন।
আযান কিছু বলবে তার আগেই তিতির ধুপ ধাপ পা ফেলে রুমের বাইরে চলে গেল।
আযান তিতিরের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে শব্দ করে হেসে উঠলো। বুঝতে বাকি নেই তার প্রেয়সী বড্ডো বেশি ক্ষেপেছে ।
এই দিকে তিতির আর আনিতা শেখ টেবিলে বসে আযানের অপেক্ষা করছে। কিন্তু আযান আসার নাম নেই। তিতির মুখ ফুলিয়ে বসে আছে,তা দেখে আনিতা শেখ মুচকি হাসছে।
আনিতা শেখ তিতিরকে ইশারা করতেই তিতির সিঁড়ির দিকে তাকায়।
সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে আযান।পরনে সাদা পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামা।চুল গুলো কপাল ছুঁই ছুঁই করছে।আযান হাতের ঘড়িটা ঠিক করতে করতে নামছে।সে মোটেও টের পায়নি তার মুগ্ধময়ী মুগ্ধ চোখে তাকেই অবলোকন করছে।
তিতির মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে আছে আযানের দিকে। আযান কে দেখে তিতির মনে মনে একটা শব্দ আওড়াতে লাগলো "শুভ্র"। শুভ্র সুন্দর লাগছে আযানকে যার দরুন তিতির একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
আনিতা শেখ তিতিরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে উঠে কিচেনে চলে গেল। আযান ঘড়ি থেকে চোখ সরিয়ে সামনে তাকালো। তিতির থুতনিতে হাত রেখে একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে কিছুটা অবাক হল। মুগ্ধ ময়ী তাকে মুগ্ধ চোখে দেখছে এতেই আযান আহ্লাদে আটখানা হয়ে গেছে।সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে মুচকি হেসে মাথা চুলকাতে চুলকাতে সামনে এগোলো আযান।
•
•
•
বসন্ত পেরিয়েছে সেই কবেই। কিন্তু তিতিরের জন্য সবে মাত্র বসন্তের আগমন ঘটেছে। তিতির আযানকে ভালোবাসে ,খুব বেশিই ভালোবাসে। আযানের প্রতি তার অনূভুতি গুলো তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। আযানে সার্নিধে পুরোটা সময় কাটানোর ইচ্ছা জাগছে। আযানের সাথে সন্ধ্যায় কাটানো সময়টা পুরো দিনের মধ্যে বেষ্ট একটা সময় মনে হয় এখন। কেন জানি আযান আশেপাশে থাকলে সময় থামিয়ে দেয়ার মত অসম্ভব ইচ্ছে জাগে।
গোধূলি বেলায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আযানের কথা গুলোই ভাবছে তিতির। আযানের কথা চিন্তা করতেই ঠোঁটের কোনে হাসির রেখা ফুটে উঠলো।কল্পনাময়ী মেয়েটা এখন সারাদিন তার কল্পনায় একজনের জল ছবিই আঁকছে।
তিতিরের ভাবনায় ছেদ পড়ে গাড়ির হর্ন এর শব্দে। তিতির সামনে তাকিয়ে দেখে আযানের গাড়িটাই এসেছে। তিতির কিছুটা অবাক হলো । এতো তাড়াতাড়ি আযানের ফেরার কথা না। তাহলে এই সময় বাড়িতে কেন?
গাড়ির দরজা আনলক করে আযান বেরিয়ে অপর পাশের দরজা খুলে দিলো।
তিতির ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে তাকিয়ে আছে।
অপর পাশের দরজা খুলতেই একটা মেয়ে গাড়ি থেকে বের হলো। ফর্সা গায়ের রং, গোলগাল চেহারা লম্বা ঠিক তিতিরের মত। পরনে এ্যাশ কালারের লং শার্ট আর ব্লাক প্যান্ট চুল গুলো উঁচু করে ঝুঁটি করা, দেখেই মনে হচ্ছে বেশ ক্লাসি। আযান হেসে হেসে কথা বলছে তার সাথে, মেয়েটাও তাই।
তাদের কথা গুলো শুনতে না পেলেও হাঁসি মাখা চেহারা তিতিরের চোখ এড়াবার নয়। তিতিরের ভেতরটা এক প্রকার নাড়া দিয়ে উঠলো। এতোটা সময় যেই হাসির রেখা ঠোঁটের কোনে লেগে ছিল তা আর নেই। মন ভার , চোখ কাতর , দৃষ্টি স্থির আর ঠোঁট শুকনো। তিতিরের মস্তিষ্ক এক কথা বলছে আর মন অন্য কথা । মস্তিষ্ক মনের কাছে হেরে গেল যার দরুন তিতির একরাশ অভিমান নিয়ে রুমে চলে গেল।
এই দিকে আযান বেশ খোশ মেজাজে রোমা কে নিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো। রোমা তার স্কুলের বান্ধবী,প্রায় বছর দশ পর তার সাথে দেখা। স্কুলে থাকা অবস্থায় পাঁচজন নিয়ে তাদের গ্ৰুপ ছিল ,যার মধ্যে মেয়ে ছিল রোমা আর সবাই ছেলে। এরপর আস্তে আস্তে সবাই শহর মুখি হয়। বাড়তে থাকে দূরত্ব কমাতে থাকে যোগাযোগ। আজ হঠাৎ রোমাকে দেখে পুরোনো স্মৃতি গুলো তাজা হয়ে গেলো। রোমাও মায়ের সাথে দেখা করার জেদ ধরেছে যার ফলে আযান সাথে করে নিয়ে এসেছে। অবশ্য আরো দুটো বিশেষ কারনও আছে বটে তাইতো রোমা একপ্রকার তোড়জোড় শুরু করেছে।
আনিতা শেখ প্রথমে রোমাকে চিনতে না পারলেও পরে ঠিকই চিনে ফেলেছে। রোমা বসে গল্প শুরু করে দিয়েছে ফাঁকে ফাঁকে এদিক ওদিক তাকিয়ে কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করছে।
আযান গলা খাঁকিয়ে বললো, রোমু তোর চোখ এতো ঘুর ঘুর করছে কেন?
রোমা মুচকি হেসে বলল, তুই ঘুর ঘুর করার জন্য বসিয়ে রেখেছিস তাই।
আনিতা শেখ বেশ বুঝতে পেরেছে আযান রোমাকে তিতিরে কথা বলেছে যার ফলে রোমা তিতিরকে দেখার চেষ্টা করছে।
আনিতা শেখ ছেলের দিকে তাকিয়ে ইশারায় তিতিরকে ডাকতে বললো।
আযান এই ব্যাপারে মায়ের বাধ্য সন্তান তাই তাড়াতাড়ি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।
আযানের তাড়াহুড়ো দেখে রোমা মুচকি হেসে আনিতা শেখকে উদ্দেশ্য করে বলল,, আন্টি এইবার শুভকাজটা সেরে ফেলা উচিৎ হবে। আযান তো শুধু কবুল বলার অপেক্ষা করছে দেখছি।
আনিতা শেখ মুচকি হেসে ইশারায় বললো, আমি তাই ভাবছি।
,
,
তিতির ডায়রিটা গুছিয়ে রেখে পেছন ফিরতেই চমকে উঠে। আযান পকেটে হাত গুঁজে দরজায় হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে ঠোঁটে সেই মাতাল করা হাসি। তিতির হঠাৎ আযানের উপস্থিতি টের পেয়েই চমকে উঠলো। কি বলবে তা ভেবে পাচ্ছে না তাই হাত কচলাতে কচলাতে এদিক ওদিক তাকাতে লাগল।
আযান দৃষ্টি স্থির করে তিতিরের ভাব ভঙ্গি পর্যবেক্ষন করতে ব্যাস্ত। মেয়েটার সব রূপ বরাবরই বিমুগ্ধ করার মত । এই যে হাত কচলে এদিক ওদিক তাকিয়ে নিজের বিভ্রান্তি দূর করতে চেষ্টা করছে তাতেও তার মাঝে মুগ্ধতা বিরাজ করছে।
আযান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দু'কদম সামনে এগিয়ে বললো,,এই পিচ্চি নিচে চলো কেউ একজন তোমার সাথে দেখা করতে এসেছে।
তিতির আযানের দিকে তাকিয়ে বলল, সেই কেউ একজন কি খুব বেশি স্পেশাল?
তিতিরের কথায় আযানের কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়লো। পরক্ষনেই আযান রহস্য করে বললো, উঁহু ! শুধু স্পেশাল নয় বরং খুব বেশি স্পেশাল কেউ।
আযানের কথা শুনে তিতিরের হৃদস্পন্দন হঠাৎ থমকে যাওয়ার মত অনূভুতি হলো। হারিয়ে ফেলার কষ্ট গুলো গলায় দলা পাকিয়ে গলা ব্যাথা শুরু হয়ে গেল। তিতির কোনোরকম নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,, ওহ্ আচ্ছা।
আযান তিতিরকে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষন করছে। আযানের বুঝতে বাকি নেই যে তিতিরের খুব বেশি কষ্ট পেয়েছে। তিতিরের এই কষ্ট দেখার জন্যই আযান রহস্য করে কথাটা বললো। আযান জানতো এমন কিছুই হবে ।বাড়িতে ঢোকার সময় প্রথমে নজর তিতিরের ঘরের বারান্দার দিকেই যায়।
তিতির যখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাদের দেখছিলো তখনই আযান তিতিরকে দেখে ফেলেছে।
আযান তিতিরের দিক থেকে চোখ সরিয়ে টেবিলে রাখা ডায়েরিটার দিকে তাকিয়ে বলল,, চলো সে অপেক্ষা করছে।
আযান কথাটা বলে আর অপেক্ষা করলো না । বরং সামনে হাঁটা ধরলো।
তিতির তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে যথাসাধ্য সামলে নিয়ে আযানকে অনুসরণ করে আযানের পিছন পিছন যেতে লাগল। আর মনে মনে একটা কথাই বারবার আওড়াতে লাগলো,
সব ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না তিতির,,
তোরটাও না হয় অপূর্ণ থাক।
ক্ষতি কি তাতে !
তাকে চাওয়া বারণ, ভালোবাসাতো নয়!
(অসমাপ্ত সমাপ্তি)