#ইশক_বাদা_তীখা — ৬ (ক)
#লেখনীতে_আইজা
[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ ]
রাত ৩ টা।
আশপাশ নিস্তব্ধ! আকাশে মেঘেরা হানা দিয়েছে। চাঁদ মামা লুকিয়েছে নভশ্চরের আড়ালে। এশালকে পাঁজাকোলা নিয়ে আপনমনে হাঁটছে আরাইজ। রমণী তার গলা জড়িয়ে ধরে উপভোগ করছে সবটা। গত দুই ঘণ্টা যাবত তাকে এভাবে পাঁজাকোলা নিয়ে হাঁটছে লোকটা। অথচ তার চোখে মুখে এক মূহুর্তের জন্য ও বিরক্তির আভাস মেলে নি এতোক্ষণে। নিজেকে ভাগ্যবতী মনে হয় এশালের। এতো কেয়ারিং একটা মানুষ পেয়েছে। শুধু একটু রাগি তবে সেটুকু নিয়ন্ত্রণ করা এশাল শিখে গিয়েছে। আনমনেই হেসে ফেললো সে।
—" হাসছো কেন চড়ুই পাখি? তোমার এই মুক্তা ঝড়া হাসি আমার হৃদয় এফোঁড়ওফোঁড় করে দেয়। "
সামনের দিকে তাকিয়েই বাক্যটি উচ্চারণ করলো আরাইজ। রমণীর হাসি চওড়া হলো। গলায় জড়ানো হাতটা আরেকটু শক্ত করে নিলো। মিটিমিটি হেসে জিজ্ঞেস করল_
—" ভালোবাসেন? "
ততক্ষণাৎ পুরুষটির পদধ্বনি থেমে গেল। যেন জমে গিয়েছে সে। তড়িৎ বেগে তাকালো রমণীর পানে। যে ঠোঁটে চওড়া হাসি নিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। তাকে দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে সে জানে আরাইজের উত্তর কী হবে। আরাইজ গভীর নয়নে দেখলো রমণীকে। অতঃপর একটু ঝুঁকে অর্ধাঙ্গিনীর ললাটে ললাট ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বললো_
—" ভালোবাসা জিনিসটা ক্ষণস্থায়ী। যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে। তুমি আমার অভ্যাস! অভ্যাস ত্যাগ করা দুষ্কর। তবে আমার অনুসারে তা অসম্ভব্য! "
হয়তো তার উচ্চারিত বাক্যে কিছু একটা ছিল। নভশ্চরের অবসন্নতা ঘটে বর্ষন নামল ধারায়। ভিজিয়ে দিল একজোড়া অন্য জগতে বসবাস করা কপোত কপোতীর শরীর। রমণীর কর্ণপাতে যেন এখনো একই পদবিন্যাস বেজে চলছে। ভিজে জবজবে হয়ে গেছে সেদিকে তার বিন্দুমাত্র ভাবন নেই।
হঠাৎ একটা বজ্রপাতে রমণী সম্বিত ফিরে পেলো যেন। সেটে গেল ব্যক্তিগত পুরুষটির বুকে। আরাইজ মুচকি হাসলো।
—" ভয় পাচ্ছো বউ? "
অপর দিক থেকে উত্তর মিললো না বরং আরো সেটে গেল তার বক্ষেস্থলে। আরাইজ পুনরায় পা চালাতে শুরু করলো। মস্তিষ্কে অশনি চিন্তাধারা ভর করছে। মাথা ঝেড়ে ফেলে দিতে চাইলো তবে পারছে না। হৃদযন্ত্র অস্বাভাবিক গতিতে ছুটছে। এশাল স্পষ্ট টের পেল স্বামীর বুকের ধুকপুকানি। তবে সে একচুলও নড়লো না , নড়তে ইচ্ছে হলো না। একইভাবে মিশে রইলো অর্ধাঙ্গের বক্ষেস্থলে।
আরাইজ শুকনো ঢোক গিলে ক্ষীণ আওয়াজে ডাকলো_
—" বউ? "
—" হুঁ! "
আজ যেন চমকের পর চমক নিয়ে বসেছে এশাল। এই প্রথমবার বোধহয় রমণী বউ ডাকায় উত্তর করেছে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল হয়ে পড়ছে আরাইজের। নিজেকে সামলালো সে। ক্ষণে ক্ষণে বজ্রপাত হচ্ছে। আরাইজ চিন্তিত ভঙ্গিতে বললো_
—" বাজ পড়ছে বউ। বাড়ি যাই! "
রমণীর মুখখানায় অন্ধকার নেমে এলো। তার এরকম থাকতে বেশ ভালো লাগছে। ভয় ডর কিছুই যেন তাকে ছুঁতে পারছে না। সে করুন স্বরে বলল_
—" অন্য একদিন আসবো আবার প্রমিস। আজ চল চড়ুই পাখি। "
এশাল বুঝদারের মতো মাথা ঝাঁকালো। হঠাৎ চমকে উঠলো সে। টানা দুঘন্টা ধরে লোকটা তাকে পাঁজাকোলা নিয়ে হাঁটছে। সে তো বেমালুম ভুলেই বসেছিল। আহাম্মক মনে হলো নিজেকে। দ্রুত আরাইজ'কে বললো_
—" আমায় নামিয়ে দিন। পায়ের ব্যথা কমেছে হাঁটতে পারবো আমি। আপনার কষ্ট হচ্ছে। "
—" তোমার এই চড়ুই পাখির ন্যায় শরীর কোলে নিয়ে হাঁটতে আমার কষ্ট হবে? লাইক সিরিয়াসলি Moonpie? "
রমণী কিছু মানতে নারাজ। ছটফট করতে লাগলো সে। অতঃপর আরাইজ হার মানলো , নামিয়ে দিলো এশালকে।
এশাল একপ্রকার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আরাইজ'কে বললো_
—" এবার চলুন? "
সে পা বাড়াতে চাইলো তবে কোন দিকে যাবে বুঝতে পারলো না। আরাইজের দিকে তাকাতেই জমে গেল রমণী। লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো ফোলা ফোলা গাল জুগল।
আরাইজ ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অর্ধাঙ্গিনীর পানে। রমণীর শরীরে জড়ানো শাড়িখানা লেপ্টে আছে দেহে। যা থেকে শরীরের প্রত্যেকটি ভাঁজ স্পষ্ট। আরাইজ বড় বড় পা ফেলে এসে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। রমণী কিছু বলবে তার সময় টুকুও পেলো না। ঠোঁট রুদ্ধ হয়ে গেল তার পূর্বেই। কোমর পেঁচিয়ে ধরল একজোড়া শক্তপোক্ত হাত। রমণীর শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। অক্ষিপল্লব রুদ্ধ হয়ে গেল আপনাআপনিই।
কেটে গেল অনেকটা সময়। রমণীর দম বন্ধ হয়ে আসছে এহেন সময় তাকে ছেড়ে দিলো পুরুষটি। কপালে কপাল ঠেকিয়ে নিঃশ্বাস টানতে লাগলো দ্রুত। চোখ বন্ধ করে করুন স্বরে আওড়ালো পুরুষটি_
—" এতো ছোট কেন তুমি? আরেকটু বড় হলে কী খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যেতো? "
আহাম্মক বনে গেল এশাল। কী আজগুবি কথা এটা? কিন্তু তাকে বড় হওয়ার কথা বলছে কেন এই লোক? মাথার উপর দিয়ে গেল সবকিছু। একটা আহাম্মকি প্রশ্ন করে বসলো সে_
—" বড় হয়ে কি হবে? "
আরাইজের ঠোঁটে ক্ষুদ্র হাসির রেখা দেখা দিল। রমণীর কপালে চুমু এঁকে দিয়ে বললো_
—" ওহে অবুঝ বালিকা প্লিজ তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাও। "
ততক্ষণাৎ একটি বজ্রপাত হল। বেশ কাছাকাছিই হয়েছে হয়তো। রমণী ঝাপটে ধরলো আরাইজ'কে। আরাইজ তাকে আগলে নিয়ে বললো_
—" ভয় পেও না বউ তোমার আরাইজ এখানেই আছে। "
তাকে জড়িয়ে ধরেই আশেপাশে কিছু খুঁজল আরাইজ। এবং পেয়েও গেলো। পাশেই একটা টং দোকান রয়েছে। এশালকে নিয়ে সেখানে চলে গেল। যদিও দোকানটা বন্ধ তাও বাহিরের দিকে বেশ বড় ছাউনী দেয়া আছে। পকেট হাতড়ে ফোন বের করে কল লাগালো সুন্দর'কে।
______________________________________________
হাজার কবিতা বেকার সবই তা
তার কথা কেউ বলে না........
সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা
সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা.........
জানালার পাশে বসে গিটারে টুং টাং শব্দ তুলে গাইছে সুন্দর চৌধুরী। চোখ তাহার জানালার কাচ ভেদ করে অদূর বৃষ্টিময় শহরে তাকিয়ে আছে। চোখে পানি টলটল করছে। ভাঙা স্বরে আওড়ালো_
—" কেন আমায় ছেড়ে চলে গেলে নীলাঞ্জনা? "
চোখ থেকে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। অদূরে তাকিয়ে পুরোনো স্মৃতি চারণে মগ্ন হলো সে। হঠাৎ রিংটোনের আওয়াজে ভাবনা থেকে বেড়োলো সে। চোখ মুছে ফোন হাতে নিয়ে ভ্রু কুঁচকালো। আরাইজ কল দিচ্ছে কেন? তাও এই রাত সাড়ে তিনটার সময়। কিছু হলো নাকি? তড়িঘড়ি গলা খাঁকারি দিয়ে কল রিসিভ করে কানে ধরলো।
—" হ্যালো? "
—" তুই ইমেডিয়েটলি কার নিয়ে এখানে আয় তো। আমি অ্যাড্রেস সেন্ড করছি। "
এইটুকুই তারপর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মেসেজ আসলো। সিন করতেই কপালে কয়েক খানা ভাঁজ পড়লো। এতো রাতে বৃষ্টিতে আরাইজ ওখানে কি করছে? আবার তাকে কার নিয়ে যেতে বলছে! মনে মনে ভাবলো হয়তো গাড়ির টায়ার পাংচার হয়ে গেছে।
দেড়ি করলো না সে। কারের চাবি নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল আরাইজের দেয়া অ্যাড্রেসের উদ্যেশ্যে।
_______________________________________________
এশাল ঠান্ডায় কুপোকাত হয়ে গেছে। কাঁপছে রীতিমত! তবুও ঠোঁট থেকে হাসি সরছে না তার। আরাইজের কপালে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট! কী করবে সে? নিজেও তো ভিজে জবজবে হয়ে আছে। বৃষ্টি থামার কোন নাম গন্ধ নেই। অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রমণীর পানে। এশাল তা খেয়াল করে বললো_
—" আমি ঠিক আছি এতো চিন্তিত হতে হবে না। "
আরাইজ কি আর সান্ত্বনা কথায় ভোলার মানুষ? তার নিজেকে অসহায় লাগছে। এশাল তার গা ঘেঁষে দাঁড়ালো। যতই বলুক ঠিক আছে কিন্তু তার মনে হচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যেই বরফ হয়ে যাবে সে।
আরাইজ বুঝলো বিষয়টি। সে নিজের শার্ট খুলে ফেলে এশালকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। যেন নিজের সবটুকু দিয়ে অর্ধাঙ্গিনী'কে উষ্ণ করতে চাইছে। রমণী লজ্জায় কুঁকড়ে গেলেও সরে যাওয়ার সাহস পেলো না। এমনিতেই ঠান্ডায় কাঁপছে তার উপর যদি আরাইজ রেগে যায় তাহলে কেল্লাফতে! রমণীর মনে হলো তার শরীর উষ্ণ হয়ে উঠছে। সে ফিসফিস করে বললো_
—" আজকের রাতটা আমার জীবনের সবথেকে সুন্দর রাত ছিল। থ্যাংক ইয়ু সো মাচ মি. এক্স রূঢ় পুরুষ এতো সুন্দর একটা রাত উপহার দেয়ার জন্য। "
আরাইজ ফিক করে হেসে দিল। এক্স রূঢ় পুরুষ? নামটা বেশ লেগেছে তার। আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো রমণীকে।
ঠিক সেই সময় , তাদের চোখে মুখে কয়েকটা লাইটের আলো পড়লো। চোখ কুঁচকে ফেললো আরাইজ। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাতেই বুঝলো কয়েক জোড়া পা দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসছে তাদের নিকট....
চলবে.........
( Guess করেন তো নেক্সট পর্বে কী হতে চলেছে?🐸 )