ফন্ট সাইজ:
থিম:
কবুলের আড়ালে চুক্তি

১৬তম পর্ব

লেখক: অন্বেষা নীহারিকা

#কবুলের_আড়ালে_চুক্তি

পরিসমাপ্তি

#𝐀𝐧𝐯𝐞𝐬𝐡𝐚_𝐍𝐢𝐡𝐚𝐫𝐢𝐤𝐚

মারিয়া আর জোর করল না। শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর আবারও ডুবে গেল সেই ষোলো বছর আগের অসমাপ্ত অন্ধকারে, যে গল্পের শেষ আজও কাউকে শান্তি দেয়নি।

* হাওয়ার শেষ কথাটা রেখেছিল। তাকে আর সেই অভি'শপ্ত বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়নি। যে বাড়ির প্রতিটা দেয়াল তার নিঃশব্দ কান্নার সাক্ষী ছিল! যে বাড়িতে বেঁ'চে থেকেও সে প্রতিদিন একটু একটু করে মরে গিয়েছিল! সেই বাড়ির মাটিও আর তার নি'থর শরীর'টাকে স্পর্শ করার অধিকার পায়নি। হাওয়ার শেষ যাত্রার জন্য তার বাবা কাঁপতে থাকা হাতে সেই সাত লক্ষ টাকার মধ্য থেকেই কিছু টাকা বের করেছিলেন। সেখান থেকেই কেনা হয়েছিল কা'ফনের সাদা কাপড় আর এক নির্জন কবরস্থানে ছয় ফুট মাটি।

টাকাগুলো হাতে নেওয়ার সময় মানুষটার মনে হচ্ছিল, কেউ যেন তার বুক চিরে ক'লিজাটা টে'নে বের করে নিচ্ছে। এই সেই টাকা! যে টাকার বিনিময়ে তিনি নিজের মেয়ের জীবনটা ধ্বং'সের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।

আজ সেই টাকাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় অভি'শাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কা'ফনের কাপড় কেনার সময় তার হাত এতটাই কাঁ'পছিল যে দোকানদার পর্যন্ত অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। যেন প্রতিটা নোটে মেয়ের কান্না লেগে আছে। প্রতিটা ভাঁজে জমে আছে একটা অবুঝ মেয়ের ভাঙা স্বপ্ন।

হাওয়ার বাবা-মা কেউই মেয়ের লা'শ ছুঁতে পারেননি। সাহস হয়নি। যে মেয়েটা মৃ'ত্যুর আগমুহূর্তেও তাদের দিকে ফিরে তাকায়নি। তার নি'থর মুখের সামনে দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও যেন আল্লাহ তাদের কেড়ে নিয়েছিলেন। দু’জন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল দূরে। একদম নিশ্চুপ। কিন্তু তাদের বুকের ভেতরটা তখন চিৎকার করে কাঁদছিল। অপরাধবোধটা যেন বু'ক চিরে বেরিয়ে আসতে চাইছিল। কিন্তু গলাটা সায় দিচ্ছিল না। কিছু কান্না শব্দ হয়ে বের হয় না। শুধু মানুষটাকে ভেতর থেকে শেষ করে দেয়।

হাওয়ার মা বারবার আঁচল মুখে চেপে ধরছিলেন। হয়তো চিৎকার করে একবার “মা” বলে ডাকতে চাইছিলেন। কিন্তু সেই অধিকারটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছিলেন। আর হাওয়ার বাবা। তিনি শুধু একদৃষ্টিতে সাদা কা'ফনে মোড়া ছোট্ট নি'থর শরী'রটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। হয়তো এই প্রথমবার তিনি সত্যি বুঝেছিলেন,

"মানুষ টাকা হারালে নিঃস্ব হয় না! নিজের সন্তানের বিশ্বাস হারালে হয়।

কনিকা ভাবি, বড় মা আর আম্মু ক'বরস্থানের পাশের ছোট্ট ফাঁকা মাঠ'টার এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলেন। দূর থেকে তাদের মুখ দেখে বোঝার উপায় ছিল না। ভেতরে আদৌ কিছু চলছে কি না। তবে জায়গাটা যেহেতু ক'বরস্থান, মৃ''ত্যু যেখানে এত কাছ থেকে নিঃশ্বাস নেয়। তাই হয়তো লোক দেখানো কান্নাটুকুও করতেই হচ্ছিল। আর ঠিক সেই নিয়মটাই পালন করছে বলে মনে হচ্ছিল মানুষরূপী এই জা'নোয়ার'গুলো।

হাওয়া ভাবির বাকি বোনেরাও এসেছিল। সবাই কাঁদছিল। কেউ বুক চাপড়ে, কেউ মুখ ঢেকে, কেউ নিঃশব্দে চোখ মুছছিল। চারপাশটা কান্নার শব্দে ভারী হয়ে উঠেছিল। আমাদের ঘরোয়া আত্মীয়স্বজনও প্রায় সবাই এসেছিল। কেউ নিচু গলায় দোয়া পড়ছিল, কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল, আবার কেউ দূরে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে কথা বলছিল।

বড় আব্বু একটু আগেই জেনেছেন, হাওয়া ভাবি আসলে মায়ান ভাইয়ের স্ত্রী ছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তিনি কোনো চিৎকার করেননি, কোনো প্রশ্নও করেননি। শুধু কেমন অদ্ভুত রকম নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। মনে হচ্ছিল, মানুষটা এক মুহূর্তেই বহু বছর বুড়িয়ে গেছে।

আব্বু, বড় আব্বু, মায়ান ভাই আর হাওয়া ভাবির বাবা। চারজন মিলে হাওয়া ভাবির কা'ফনের সব কাজ সম্পূর্ণ করলেন। সাদা কাপড়ে মোড়া ছোট্ট নি'থর শরীরটা যখন ধীরে ধীরে কবরে নামানো হচ্ছিল, তখন আমার বুকের ভেতরটা মো'চড় দিয়ে উঠছিল।

মনে হচ্ছিল— একটা মানুষকে না, একটা অসমাপ্ত জীবনকে মাটির নিচে চা'পা দেওয়া হচ্ছে। যে মেয়েটা একটু ভালোবাসার জন্য সারাজীবন কেঁদেছে। শেষ পর্যন্ত তার ভাগ্যে জুটল শুধু ছয় ফুট নীরব মাটি।

মাটি দেওয়ার সময় হাওয়া ভাবির বাবা একবার কেঁপে উঠেছিলেন। হাতভর্তি মাটি কবরে ফেলতে গিয়ে যেন হাতটাই থেমে যাচ্ছিল। হয়তো এই প্রথমবার তিনি বুঝেছিলেন, মেয়ে মানুষকে বোঝা ভাবার শাস্তি কত ভ'য়ংকর হতে পারে।

একসময় সবাই একে একে বাড়ি ফিরে যেতে লাগল। কবরস্থানের চারপাশটা ধীরে ধীরে ফাঁ'কা হয়ে গেল। শুধু বাতাসে ভেসে রইল কাঁচা মাটির গন্ধ আর কিছু না-বলা কান্না।

মায়ান ভাই তখনও কবরে পাশে বসে ছিল। একদম নিঃশব্দে। দুই চোখ স্থির হয়ে আছে সেই কবরটার দিকে। যেন এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না, যে মানুষটা একটু আগেও তার বু'কের মধ্যে শেষ নিঃশ্বাস নিচ্ছিল, সে এখন মাটির নিচে। তার কাঁধ দুটো কেমন ভেঙে পড়েছিল। মনে হচ্ছিল, এই মানুষটা আর কোনোদিন সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। হয়তো এটা ভালোবাসা ছিল! নয়তো অপরাধবোধ। কিন্তু যাই হোক, অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।

আমি দূর থেকে ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম। অদ্ভুতভাবে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। কারণ মানুষটা জী'বিত হাওয়াকে যতটা বোঝেনি, মৃ'ত হাওয়ার সামনে এসে হয়তো তার সব অনুভূতিই একসাথে জেগে উঠেছে।

মায়ান ভাই হাওয়া ভাবির ক'বরটা দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তারপর হঠাৎ করেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। সেই কান্নার শব্দে পুরো ক'বরস্থানটা যেন থমকে গেল। যেন একটা মানুষ না, একটা ভেঙে চু'রমার হয়ে যাওয়া আত্মা কাঁদছে। আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। হাঁটু গেড়ে ঠান্ডা মাটির উপর বসে পড়লাম। চারপাশটা অদ্ভুত রকম নিস্তব্ধ। শুধু কাঁচা মাটির গন্ধ আর একটা মানুষের বুকফাটা কান্না। মায়ান ভাই ক'বরটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে লাগল,

“আমাকে ক্ষমা না করে কীভাবে চলে গেলে, হাওয়া? এই অপরাধের বোঝা কাঁধে নিয়ে আমি কীভাবে বাঁ'চব? তুমি কেন শেষবার আমার পুরো কথাটা শুনে গেলে না?”

কথাগুলো বলতে বলতে তার গলা বারবার ভেঙে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল প্রতিটা শব্দ বু'ক চি'রে বের হচ্ছে। সে কাঁদতে কাঁদতেই আবার বলল,

“তুমি একা না, আমিও তোমাকে ভালোবেসেছি! ভীষণ, ভীষণ ভালোবেসেছি!”

আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। মাথার ভেতরটা ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। এ কী বলছে ভাইয়া? তাহলে এতদিন যা দেখলাম, যে অবহেলা, যে নির্দয়তা, যে নীরব নিষ্ঠুরতা সব কী ছিল? যদি সত্যিই সে হাওয়া ভাবিকে ভালোবেসে থাকে, তাহলে একটা মানুষ কীভাবে নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে প্রতিদিন একটু একটু করে শেষ হতে দেখতে পারে? কীভাবে? ভালোবাসা কি এমন হয়?

যে মেয়েটা শুধু একটুখানি ভালোবাসার আশায় কান্না করেছে। যে মেয়েটা মৃ'ত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত নিজেকে “ হা'রাম, অভি'শাপ, অপ্রয়োজনীয়” ভাবতে ভাবতে নিঃ'শেষ হয়ে গেল! সে কি কোনোদিন জানতে পেরেছিল, যে মানুষটার জন্য সে নিজের পুরো পৃথিবী ত্যা'গ করেছিল, সেই মানুষটাও তাকে ভালোবাসত? নাকি এই স্বীকারোক্তিটাও খুব দেরি করে এসে পৌঁছাল?

মায়ান ভাই তখনও কবরের উপর মাথা রেখে কাঁদছিল। এমনভাবে কাঁদছিল যেন এই মাটির নিচে শুধু একটা মানুষ না, তার পুরো পৃথিবীটা চা'পা পড়ে গেছে। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে নি'ষ্ঠুর সত্যিটা হয়তো এটাই, কিছু মানুষ ভালোবাসে! খুব গভীরভাবে ভালোবাসে। তবুও সেই ভালোবাসার মানুষটাকেই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। আর যখন সেটা বুঝতে পারে! তখন ক'বরের মাটি ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।

হঠাৎ করেই আমার মাথায় ব'জ্র'পাতের মতো একটা সত্যি এসে আঘাত করল। হাওয়া ভাবি প্রে'গন্যান্ট ছিল! মানে শুধু হাওয়া ভাবি না, তার সাথে একটা নিষ্পাপ, অবুঝ প্রাণও পৃথিবী দেখার আগেই মাটির নিচে চা'পা পড়ে গেছে!

ভাবনাটা মাথায় আসতেই আমার বু'কের ভেতরটা মো'চড় দিয়ে উঠল।

মনে হচ্ছিল কেউ বু'কের উপর বিশাল পাথর চা'পা দিয়েছে। দ'ম নিতে কষ্ট হচ্ছিল। আর ঠিক তখনই ক'বর জড়িয়ে ধরে মায়ান ভাইয়ের সেই বু'কফাটা কান্না আমার কানে বাজল। কেন জানি না সেই মুহূর্তে ওনার প্রতি ভ'য়ংকর রাগ জন্মাল। মনে হচ্ছিল এই মানুষটার কান্না করার কোনো অধিকার নেই। যে মানুষটা বেঁ'চে থাকতে হাওয়া ভাবির চোখের জল দেখেও নির্বাক ছিল! সে আজ কেন কাঁদছে? কেন?

আমি আর নিজেকে আটকে রাখতে পারলাম না। হুট করে উঠে দাঁড়িয়ে ভাইয়ার পেছনে গিয়ে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে তাকে টান মে'রে ক'বর থেকে সরিয়ে দিলাম। কান্না করতে করতেই তী'ব্র, কাঁপা গলায় বলে উঠলাম,

“এখন এখানে বসে নাটক না করে বাড়িতে গিয়ে শান্তি উপভোগ করো!তোমার বউ-বাচ্চা নিয়ে সুখে থাকো! এখানে বসে এই মিথ্যে স্বীকারোক্তি কাকে দিচ্ছ তুমি?”

মায়ান ভাই আমার দিকে নিস্পলক তাকিয়ে রইল। সেই চোখ দুটো কেমন মৃ'ত মানুষের মতো ফাঁ'কা লাগছিল। কিন্তু তখন আমার চোখের সামনে শুধু ভাসছিল, র'ক্ত'মাখা রাস্তায় পড়ে থাকা হাওয়া ভাবির অসহায় শরীরটা, তার কাঁপতে থাকা ঠোঁট! তার শেষ কথাগুলো!

আমি চোখ বন্ধ করে মুখ ঘুরিয়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করলাম। পারলাম না। মনে হচ্ছিল বু'কের ভেতরে জমে থাকা সব কষ্ট একসাথে ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে। শরীরের সমস্ত শক্তি যেন মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল।আমি আবার মাটিতে বসে পড়লাম। তারপর কান্না করতে করতে ভাইয়ার বু'কে দু’হাতে কি'ল-ঘু'ষি মা'রতে মা'রতে বলতে লাগলাম,

“তুমি এত পা'ষাণ কেন, ভাইয়া? কীভাবে পারলে এতটা নি'ষ্ঠুর হতে?একটা জা'নোয়ারও হয়তো তোমার থেকে ভালো হয়!”

আমার হাতের আ'ঘাতগুলো খুব জোরে লাগছিল না। কারণ আমি তখন নিজেই কাঁপছিলাম। কিন্তু প্রতিটা শব্দ যেন ভাইয়ার বু'ক চি'রে ঢুকে যাচ্ছিল। মায়ান ভাই কোনো বাধা দিল না। চুপচাপ দু’হাতে আমাকে আগলে নিল। আর সেই নীরবতাটাই যেন আরও ভ'য়ংকর লাগছিল। আমি কাঁপতে থাকা আঙুল তুলে কবরটার দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বললাম,

“তুমি কি জানো, এই মাটির নিচে শুধু একজন না, দু’টো প্রাণ চা'পা পড়ে আছে?”

মায়ান ভাই হঠাৎই আমাকে দু’হাতে সরিয়ে দিল। তার চোখে তখন এমন আতঙ্ক ছিল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে ভ'য়ংকর কথাটা সে শুনেছে। সে থরথর কাঁপা গলায় বলল—

“মা, মানে…?”

আমি বুঝলাম, সে সত্যিই জানত না। একটুও না। আমি হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের পানি, নাকের পানি মুছলাম। কিন্তু কান্না কিছুতেই থামছিল না। গলাটা এত ভার হয়ে গিয়েছিল যে কথা বের করতেও কষ্ট হচ্ছিল। তবুও কোনোমতে বললাম,

“হাওয়া ভাবি তিন মাসের প্রে'গন্যান্ট ছিল! তোমার আসার পাঁচ-ছয় মিনিট আগেই আমরা হসপিটাল থেকে চেক'আপ করিয়ে বের হয়েছিলাম!

কথাটা শুনে মায়ান ভাই যেন পাথর হয়ে গেল। তার চোখের পলক পড়া বন্ধ হয়ে গেল। ঠোঁট কাঁপছিল কিন্তু কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল এক মুহূর্তে তার পুরো পৃথিবীটা থেমে গেছে। ধীরে ধীরে সে ক'বরটার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিটা এতটাই অসহায়, এতটাই ভাঙা ছিল যে আমার বু'ক কেঁপে উঠল। হয়তো এই প্রথমবার সে সত্যি বুঝল, এই মাটির নিচে শুধু হাওয়া ঘুমিয়ে নেই। ঘুমিয়ে আছে তার একটা অংশও। তার অজানা সন্তান। যে পৃথিবীতে আসার আগেই নিজের বাবার ভালোবাসাহীন জীবনের শাস্তি পেয়ে গেল।

মায়ান ভাই হঠাৎ করেই অ'স্বাভাবিক রকম শান্ত হয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটা কবর জড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদছিল, সে এখন একদম নিশ্চুপ। এই নীরবতাটা কান্নার চেয়েও ভ'য়ংকর লাগছিল। সে ধীরে ধীরে আমার দিকে তাকাল। চোখ দুটো লাল, ফুলে গেছে। কিন্তু সেখানে এখন কান্নার চেয়ে বেশি কিছু ছিল,ভ'য়ংকর এক শূন্যতা। কাতর গলায় বলল,

“এসব কনিকা জানত, তাই না?”

আমি কিছুটা চমকে উঠলাম। ভাইয়া কীভাবে বুঝল? আমার গলা শুকিয়ে আসছিল। তবুও কোনোভাবে বললাম,

“হুম, জানত।

আর কাল রাতেও সিঁড়িতে কিছু ছিল না। হাওয়া ভাবি পানি নিয়ে উপরে ওঠার সময় হঠাৎ সিঁড়িতে তেল এলো কীভাবে?” আমার কথাটা শুনে মায়ান ভাই কিছুক্ষণ ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে রইল। একদম নিথর।হয়তো তার ভেতরে কিছু একটা ধীরে ধীরে ভেঙে চুর'মার হয়ে যাচ্ছে। তারপর হঠাৎই সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। আমার দিকে আর তাকাল না।সামনের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

“তোর আম্মু দিয়েছে! আজ সকালে অফিসে যাওয়ার সময় কনিকাকে কারও সাথে এই ব্যাপারে কথা বলতে শুনেছি!

কথাগুলো শুনে আমার বু'কের ভেতরটা হঠাৎ কেঁ'পে উঠল। আমি আপনা-আপনি দু’পা পিছিয়ে গেলাম। না, না, এটা হতে পারে না। আমি জানতাম আম্মু হয়তো এসবের সাথে অল্প'স্বল্প জড়িত। হয়তো চুপ থেকেছে! হয়তো অ'ন্যায় দেখেও থামায়'নি! কিন্তু নিজের হাতে এমন একটা কাজ? একটা অনাগত শিশু'সহ একটা মানুষকে মৃ'ত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া?

আমি কোনোভাবেই মানতে পারছিলাম না। হঠাৎ করেই চোখ চলে গেল ক'বরটার দিকে। কাঁচা মাটিগুলো বাতাসে সামান্য দুলছিল। সেই মাটির নিচে এখন হাওয়া ভাবি ঘুমিয়ে আছে। আর তার ছোট্ট অনা'গত সন্তানও।

ভাবতেই বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। মনে হচ্ছিল কেউ ভিতর থেকে বু কটা ছিঁ ড়ে ফেলছে। চোখ ভরে উঠল পানিতে। আমি ধীরে ধীরে কবরের মাটিতে হাত রাখলাম। মাটি ঠান্ডা ছিল। ভীষণ ঠান্ডা। আর সেই ঠান্ডাটা যেন হাত বেয়ে পুরো শরীরে ছড়িয়ে যাচ্ছিল। আমি ফুঁপিয়ে কেঁদে নিজে নিজেই বলতে লাগলাম,

“আমিও তো রাস্তা পার হওয়ার সময় ভাবির পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলাম! আ'জরাইল কি আমায় দেখেনি? আমাকেও নিয়ে গেল না কেন?”

কথাগুলো বলতে বলতে গলা ভেঙে যাচ্ছিল। আমি কাঁপা কাঁপা গলায় আবার বললাম,

“আমারও তো এসব আর সহ্য হচ্ছে না! আমাকে মুক্তি না দিয়ে এমন নি'ষ্ঠুর একটা ঘটনার সা'ক্ষী বানিয়ে রাখল কেন, আল্লাহ?”

সেই মুহূর্তে সত্যিই মনে হচ্ছিল, এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে বড় শাস্তি। কারণ কিছু দৃশ্য মানুষ কখনও ভুলতে পারে না। র'ক্তমা'খা রাস্তা, হাওয়া ভাবির কাঁপতে থাকা ঠোঁট! শেষ নিঃশ্বাসের আগে তার ভাঙা স্বর! আর এই কবর! সবকিছু যেন আমাকে ভিতর থেকে শেষ করে দিচ্ছিল। আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। তারপর টলতে টলতে মায়ান ভাইয়ার পেছনে হাঁটতে শুরু করলাম।

ক'বরস্থানের বাতাসটা তখনও ভারী হয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল, সেই মাটির নিচ থেকে এখনও একটা মেয়ে নীরবে কাঁদছে। আমি হাঁটতে হাঁটতে ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম,

“তুমি যদি সত্যিই হাওয়া ভাবিকে ভালোবেসে থাকো, তাহলে ওকে এত কষ্ট দিলে কেন?”

আমার প্রশ্নটা শুনে মায়ান ভাই হঠাৎ করেই থেমে গেল। তার থেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমিও দাঁড়িয়ে পড়লাম। চারপাশটা কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ হচ্ছিল, কিন্তু সেই শব্দটাও যেন মৃ'ত লাগছিল। ভাইয়া কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। মনে হচ্ছিল, সে নিজের ভিতরের কোনো ভয়ংকর সত্যির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর বু'কভরা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীরে ধীরে বলল,

“সেদিন হাওয়াকে দেখতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমি এই বিয়েতে রাজি ছিলাম না। মনে হতো টাকার বিনিময়ে একটা মেয়েকে এনে সংসার করব, ব্যাপারটা খুব অ'স্বস্তিকর!

সে থামল। চোখ দুটো কেমন ফাঁকা হয়ে গেছে।

“আমি হাওয়াকে আগে কখনও সামনে থেকে দেখিনি। শুধু কনিকার মোবাইলে দু’-একবার ছবি দেখেছিলাম। কিন্তু যেদিন সামনে দেখলাম!জানি না কেন? একটা অদ্ভুত মায়া কাজ করেছিল। মনে হয়েছিল, মেয়েটা খুব নরম, খুব মায়া'ময়.!

আমি এক পলক দেখেই বিয়েতে রাজি হয়ে যাই। তারপর আমাদের বিয়ে হয়। সবাই খুব খুশি ছিল বিশেষ করে কনিকা। কারণ ও ভাবছিল, এবার ও মা হতে পারবে! আমি চুপচাপ শুনছিলাম। ভাইয়ার চোখে তখন অপরাধবোধ জমে আছে।

“কিন্তু হাওয়া আমাদের বাড়িতে আসার পর সব বদলে যেতে শুরু করল। আমি নিজেও বুঝিনি কখন ওর প্রতি দুর্বল হয়ে গেছি। ও খেয়েছে কিনা! ও ঘুমিয়েছে কিনা! ও ভয় পেয়েছে কিনা! সবকিছু নিয়ে অজান্তেই ভাবতে শুরু করেছিলাম।”

সে একটু থামল। তারপর ভাঙা গলায় বলল—

“আমি কনিকার সাথে কথা বললেও বেশিরভাগ কথার মাঝেই হাওয়া এসে পড়ত। হয়তো তখনই কনিকা বুঝে গিয়েছিল আমি হাওয়াকে ভালোবেসে ফেলেছি!

আমার বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছিল। মায়ান ভাই দূরে কোথাও তাকিয়ে বলল,

"তারপর সবাই বাচ্চা নেওয়ার জন্য চা'প দিতে শুরু করল। কিন্তু হাওয়া তখন খুব ছোট ছিল। আমি রাজি হইনি! হয়তো তখন আমি পুরোপুরি হাওয়ার প্রতি আটকে গিয়েছিলাম।

বাতাসটা কেমন ঠান্ডা লাগছিল। ভাইয়া আবার বলতে শুরু করল,

“কনিকা এটা নিয়ে আমার সাথে ঝগড়া করত। পরে আমি রাজি হলাম! কিন্তু হাওয়ার বাচ্চা হচ্ছিল না। তখন কনিকা'কে আম্মু বাইরে ডাক্তার দেখানো শুরু করে। বিদেশি ডাক্তার পর্যন্ত দেখিয়েছে!

ভাই হঠাৎ থেমে গেল। গলাটা কেমন আটকে যাচ্ছিল।

"এর মাঝেই কনিকা বুঝে যায়, আমি ধীরে ধীরে ওর থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আমি হাওয়ার চোখে হারিয়ে যাচ্ছিলাম!

আমি নিঃশ্বাস আটকে শুনছিলাম। ভাইয়া কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল,

“তারপর একদিন, কনিকা আর আম্মু দু’জন মিলে আম্মুর মাথায় হাত রেখে ক'সম করায়! আমাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করানো হয়! আমি যেন কখনও হাওয়াকে কনিকার থেকে বেশি গুরুত্ব না দিই! কখনও তাকে ভালোবাসি এ-কথা না বলি!

তার চোখ বেয়ে ধীরে ধীরে জল গড়িয়ে পড়ল।

"শুধু তাদের ক'সম না! হাওয়ার দি'ব্যি! এমনকি আমার অ'নাগত সন্তানের দি'ব্যিও দেওয়া হয়েছিল।" তারপর থেকে আমি নিজেকে জোর করে বদলে ফেলতে শুরু করি। হাওয়া কাঁদলেও চুপ থাকতাম। ও অভিমান করলেও দূরে সরে যেতাম!

মায়ান ভাইয়ের গলাটা বারবার ভেঙে যাচ্ছিল।

“কিন্তু জানিস মারিয়া? প্রতিটা রাতে আমি নিজেকে ঘৃ'ণা করতাম!

আমার বু'ক মোচড় দিয়ে উঠল।

“হাওয়া ঘুমিয়ে গেলে আমি লুকিয়ে ওর পাশে বসে থাকতাম। ওর ফুলে থাকা চোখ দেখতাম।

ভাইয়ার চোখ দিয়ে একফোঁটা জল মাটিতে পড়ে ভিজিয়ে দিল।

“ও যখন আমার দিকে তাকিয়ে বলত! ‘আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন না! তখন আমার বুকের ভেতরটা ছিঁ'ড়ে যেত! “ইচ্ছে করত ওকে জড়িয়ে ধরে বলি, হাওয়া আমি তোমাকে এত বেশি ভালোবাসি যে তোমার কান্না দেখলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে…!”

মায়ান ভাই শিশুর মতো কাঁদতে কাঁদতে বলল,

“কিন্তু আমি পারিনি! আমি কা'পুরুষ ছিলাম! আমি আমার ভালোবাসার মানুষটাকে নিজের হাতেই শেষ করে ফেলেছি!”

আমার মনে হচ্ছিল, এই পৃথিবীতে সবচেয়ে ভ'য়ংকর শব্দ হয়তো, একজন দেরিতে ভেঙে পড়া মানুষের কান্না।

মায়ান ভাই আর আমি বাড়িতে ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় সাতটা বেজে গেল। বাড়ির ভিতরে পা রাখতেই বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠল। পুরো ড্রয়িংরুম জুড়ে থমথমে নীরবতা। এই বাড়িটার দেয়াল পর্যন্ত আজ শোক পালন করছে। সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। বড় আব্বু হাতে একটা লাগেজ নিয়ে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হয়তো তিনি আমাদের ফেরার অপেক্ষাতেই ছিলেন।

আমি আর মায়ান ভাই গিয়ে নিঃশব্দে একপাশে দাঁড়ালাম। বড় মা আঁচলে মুখ গুঁজে কাঁদছিলেন। তবে সেই কান্নায় কেমন যেন ভয় মিশে ছিল… অপরাধবোধ মিশে ছিল। মায়ান ভাই শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কি হয়েছে? সবাই এভাবে দাঁড়িয়ে আছে কেন?”

বড় আব্বু ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন। তার চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকম শান্ত। কিন্তু সেই শান্তির নিচে ভয়ংকর একটা ভাঙন লুকিয়ে ছিল। তিনি মায়ান ভাইয়ের হাত টেনে ধরে একটা মোটা ফাইল তার হাতে দিলেন। তারপর ভাঙা গলায় বললেন,

“আমি চলে যাচ্ছি!

জানি না আর কখনও এই নরকে ফিরব কিনা! কথাটা বলেই তিনি চারপাশে একবার তাকালেন। তার চোখে তখন এমন এক ক্লান্তি ছিল, যেন বহু বছর ধরে তিনি ভিতর থেকে ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছিলেন।

“আল্লাহর কাছে সবসময় দোয়া করব তোমরা যেন ভালো থাকো।

এই ফাইলে বাংলাদেশে আমার যত সম্পত্তি আছে, সবকিছুর কাগজ তোমার নামে করে দিয়েছি। সবাইকে নিয়ে ভালো থেকো! মায়ান ভাই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বড় আব্বু এরপর ধীরে ধীরে বড় মার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। বড় মা মাথা নিচু করে কাঁদছিলেন। তিনি কিছু বলার আগেই বড় আব্বু শান্ত অথচ কাঁপা কণ্ঠে বললেন,

“আজকের পর থেকে তোমার সাথে আমার শুধু নামের সম্পর্ক থাকবে।”

কথাটা শুনে বড় মা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। কিন্তু বড় আব্বু থামলেন না।

“আশা করি, যেটা পাওয়ার জন্য তুমি এত নিচে নেমেছিলে, সেটা পেয়ে তুমি সুখে থাকবে।”

তার গলায় ঘৃ'ণা ছিল না। ছিল শুধু অসীম ক্লান্তি।

“কখনও কোনো সাহায্য লাগলে কল করে বলো। সবাই তো মানুষকে সাহায্য করে। আমি না হয় কিছু অমানুষকেই সাহায্য করলাম!

বড় মা কাঁদতে কাঁদতে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বড় আব্বু আর সুযোগ দিলেন না। তিনি সোজা দাদা-দাদির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

“জানি না তোমাদের জীবনের চাকা আর কতদিন ঘুরবে। দোয়া করি, অনেকদিন বেঁচে থাকো।”

দাদি হঠাৎ চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। দাদা কাঁপা হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়লেন। কিন্তু বড় আব্বু একবারও পিছনে ফিরে তাকালেন না। তিনি ধীরে ধীরে কনিকা ভাবির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। কনিকা ভাবি নি'থর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। বড় আব্বু তার দিকে তাকিয়ে এমন একটা কথা বললেন, যেটা শুনে আমার বুক পর্যন্ত ঠান্ডা হয়ে গেল

“তোমার দীর্ঘায়ু কামনা করছি। আমি মানুষ দেখেছি, অ'মানুষও দেখেছি! নি'ষ্ঠুর জা'নোয়ারও দেখেছি! কিন্তু তোমার মতো ভয়ংকর জা'নোয়ার আজ পর্যন্ত দেখিনি।”

ড্রয়িংরুমে তখন পিনপতন নীরবতা। কারও মুখে কোনো শব্দ নেই।

শুধু চাপা কান্নার শব্দ ভেসে আসছিল। বড় আব্বু ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে হঠাৎ থেমে মায়ান ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“আমি যদি বিদেশে মারা যাই, আমার লা'শ কেউ দেশে আনবে না।”

তার গলাটা কেঁপে উঠল।

“আর যদি বাংলাদেশেই ম'রি তাহলে ওই মেয়েটার ক'বরের পাশে আমাকে দা'ফন করে দিও।

আমার বুকটা হুহু করে উঠল। তিনি শেষবারের মতো চারপাশে তাকিয়ে খুব ধীরে বললেন,

“তোমাদের প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। এই বাড়িটা মানুষের বসবাসের জায়গা না! তাই চলে যাচ্ছি। সবাই ভালো থেকো। কথাটা বলেই বড় আব্বু বেরিয়ে গেলেন।

কেউ তাকে আটকায়নি। হয়তো সবাই বুঝে গিয়েছিল, কিছু মানুষ শরীর নিয়ে বাড়িতে থাকলেও, মন থেকে অনেক আগেই চলে যায়। বড় আব্বু চলে যাওয়ার পর একে একে হাওয়া ভাবির বাড়ির সবাইও বিদায় নিয়ে চলে গেল। বাড়িটা আবার নিঃশব্দ হয়ে গেল। কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেও মনে হচ্ছিল, এই বাড়ির প্রতিটা দেয়ালে এখনো হাওয়ার কান্না লেগে আছে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে নিচে নামলাম। পুরো বাড়িটা কেমন যেন অস্বাভাবিক নিঃশব্দ লাগছিল। মনে হলো, এই বাড়ি থেকে শুধু একজন মানুষ না, সবটুকু প্রা'ণই হারিয়ে গেছে। চারপাশে এমন এক শূ'ন্যতা ছড়িয়ে আছে, যেন দেয়ালগুলো পর্যন্ত শোক পালন করছে।

আমি চোখ বন্ধ করে একটা শান্তির নিঃশ্বাস নিতে চাইলাম। কিন্তু এই বাড়ির বাতাসের সাথে এখনও হাওয়া ভাবির না-পাওয়া যন্ত্রণা মিশে আছে। প্রতিটা নিঃশ্বাসে যেন তার চাপা কান্নার গ'ন্ধ। প্রতিটা কোণায় তার ভাঙা হৃদয়ের আ'র্তনাদ।

হঠাৎ সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি আম্মু নিচে নামছে। তাকে দেখেই বুকের ভেতরটা মো'চড় দিয়ে উঠল। আমি সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নিলাম। কেন জানি আজ তার দিকে তাকাতেই ভীষণ ঘৃ'ণা লাগছিল। এই মানুষটার মুখ দেখার শক্তিটুকুও আমার আর অবশিষ্ট নেই। আম্মু আমাকে কিছু একটা বলে ডাক দিল। তার গলায় আগের মতোই স্বাভাবিক সুর ছিল। কিন্তু আমার কাছে সেই স্বরটা কেমন যেন ভয়ংকর ঠেকছিল। আমি একবারও ফিরে তাকালাম না। চুপচাপ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলাম।

ঠিক তখনই স্টোররুমের দরজা খুলে মায়ান ভাইকে বের হতে দেখলাম। আমি থমকে দাঁড়ালাম। তার হাতে একটা কাপড়ের ব্যাগ। ভালো করে তাকাতেই বুকটা ধক করে উঠল। এটা হাওয়া ভাবির কাপড়ের ব্যাগ। ভাইয়ার হাতের আঙুলগুলো ব্যাগটার উপর এত শক্ত করে চেপে ছিল, যেন সে ভয় পাচ্ছে, এটুকুও যদি হারিয়ে যায়, তাহলে হাওয়ার শেষ অস্তিত্বটুকুও আর তার কাছে থাকবে না। আমি ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

“এগুলো কী করবে ভাইয়া? রুম থেকে বের করলে কেন?”

আমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগেই কনিকা ভাবি রুম থেকে বেরিয়ে এলো। ভাইয়ার হাতে ব্যাগটা দেখে সে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল।তারপর ঠোঁট শুকিয়ে গিয়ে ভাঙা গলায় বলল,

“এটা স্টোররুমে রেখে আসো! হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছ কেন?”

মায়ান ভাই তার কথার কোনো উত্তর দিল না। একবারও তার দিকে তাকাল না। সে শুধু ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে রইল। এমনভাবে, যেন এই কাপড়গুলোর ভাঁজে এখনও হাওয়ার স্পর্শ লেগে আছে। তারপর ধীরে ধীরে নিজের রুমের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

“এগুলোতে হাওয়ার গন্ধ রয়েছে! এগুলো সবসময় আমার সাথে, আমার রুমেই থাকবে।”

কথাগুলো বলার সময় তার গলাটা কেঁপে যাচ্ছিল। যেন সে কাপড় না, নিজের মৃত ভালোবাসাটাকেই বু'কের কাছে আগলে রেখেছে। কনিকা ভাবি কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু মায়ান ভাই এবার থেমে তার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিটা এত ঠান্ডা এত ক্লান্ত যেন মানুষটা এক রাতেই বহু বছরের বুড়িয়ে যাওয়া কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছে। সে ধীরে, খুব ধীরে বলল,

“আশা করি আর কোনো বাড়াবাড়ি করবে না। আর যদি করো, তাহলে কী হবে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ।”

একটু থেমে আবার বলল,

“এমনিতেই আমার স্ত্রীর জিনিস নিয়ে আমি কী করব, সেটা তুমি ঠিক করে দেবে না।”

‘আমার স্ত্রী’ কথাটা শুনে কনিকা ভাবির চোখ ভিজে উঠল। কিন্তু আজ তার কান্নার কোনো অধিকার নেই। হয়তো সে নিজেও বুঝে গেছে, কিছু মানুষকে হারানোর পর শুধু মানুষটাই হারায় না! অনেক সম্পর্ক, অনেক অধিকার, অনেক দাবি চিরতরে ম'রে যায়।

মায়ান ভাই আর কিছু না বলে রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। কনিকা ভাবি নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। কিন্তু সেই কান্নায় আজ কোনো জোর ছিল না। কারণ কিছু অপরাধ মানুষকে এমন জায়গায় এনে দাঁড় করায়, যেখানে কান্না করলেও আর কেউ তাকে বিশ্বাস করে না।

* হাওয়া ভাবির মৃ'ত্যুর পর এই বাড়িতে আর কোনোদিন সত্যিকারের শান্তি ফিরে আসেনি। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল। মানুষ খাচ্ছিল, ঘুমাচ্ছিল, কথা বলছিল। কিন্তু ভিতরে ভিতরে পুরো পরিবারটা ধীরে ধীরে মৃ'ত মানুষের মতো বেঁচে ছিল।

সবচেয়ে ভ'য়ংকর শাস্তিটা পেয়েছিল মায়ান ভাই। কারণ মানুষকে মে'রে ফেললে শাস্তি একরকম, আর নিজের ভা,লোবাসার মানুষটাকে নিজের হাতেই ধীরে ধীরে মৃ'ত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার অপরাধ'বোধ— সেটা মানুষকে প্রতিদিন একটু একটু করে শেষ করে দেয়।

মায়ান ভাই আর কোনোদিন স্বাভাবিক হতে পারেনি। রাত হলেই সে হাওয়া ভাবির কাপড়ের ব্যাগটা বের করে বসে থাকত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কখনো একটা ওড়না বুকের সাথে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে রাখত। মনে হতো, গন্ধটা হারিয়ে যাওয়ার আগেই শেষবারের মতো মানুষটাকে ছুঁয়ে দেখতে চাইছে। অনেক রাতে তার রুমের পাশ দিয়ে গেলে চাপা কান্নার শব্দ পাওয়া যেত।

একটা পুরুষ মানুষ যখন নিঃশব্দে কাঁদে, সেই শব্দ পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর শব্দগুলোর একটা। সে প্রায়ই হাওয়া ভাবির ছবির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলত,

“একবার ফিরে আসো হাওয়া! আমি এবার তোমাকে ভালোবেসে আগলে রাখব! একবার শুধু ফিরে আসো!

কিন্তু মৃ'ত মানুষ কখনো ফিরে আসে না। শুধু তাদের রেখে যাওয়া অপরাধবোধগুলো বেঁচে থাকে।

কনিকা ভাবির শাস্তিটা আরও ভ'য়ংকর ছিল। কারণ সে প্রতিদিন নিজের চোখের সামনে দেখতে শুরু করল। মায়ান ভাই শরীর নিয়ে তার পাশে থাকলেও, মনটা সম্পূর্ণ অন্য কারও হয়ে গেছে। একই বিছানায় থেকেও তাদের মাঝে বহু বছরের দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

মায়ান ভাই আর কখনো কনিকা ভাবির চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলত না। কখনো ঝগড়া করত না। কখনো অভিযোগও দিত না শুধু ধীরে ধীরে দূরে সরে গিয়েছিল। আর মানুষ সবচেয়ে বেশি ভাঙে তখনই, যখন তার প্রিয় মানুষটা তাকে ঘৃ'ণাও করে না শুধু অনুভূতিহীন হয়ে যায়।

একদিন মাঝরাতে কনিকা ভাবিকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে দেখেছিলাম। সে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বলছিল,

“আমি তো শুধু ওকে নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিলাম! তাহলে কেন সব হারিয়ে ফেললাম!

কিন্তু তখন আর কান্না কোনো কাজের ছিল না। কারণ কিছু পাপের ক্ষমা হয়তো আল্লাহ দেন, কিন্তু মানুষ নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারে না। হাওয়া ভাবির বাবা একেবারে চুপচাপ মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন। আগে যে মানুষটা টাকার অ'হংকারে বুক ফুলিয়ে হাঁটত, সে এখন মানুষের সামনে মাথা তুলেই দাঁড়াতে পারত না। প্রতি শুক্রবার ক'বরস্থানে যেতেন। একদিন দূর থেকে দেখেছিলাম, লোকটা কবরের মাটি জড়িয়ে ধরে শিশুর মতো কাঁদছে। বারবার শুধু একটা কথাই বলছিল,

“সাত লাখ টাকার জন্য আমি আমার মেয়েকে বি'ক্রি করে দিলাম আল্লাহ, তুমি আমাকে কেন বাঁচিয়ে রাখছ।

তার কান্না শুনে আমার বুকটা পর্যন্ত ফেটে যাচ্ছিল। হাওয়া ভাবির মা ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কারণ পৃথিবীতে সন্তানের কবর দেখে বেঁচে থাকার চেয়ে বড় অভিশাপ কোনো মায়ের জন্য নেই। তিনি প্রায়ই হাওয়ার পুরনো জামা বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে মেয়ের নাম ধরে ডাকতেন। তারপর নিজেই বুঝতে পারতেন। যাকে ডাকছেন, সে আর কোনোদিন সাড়া দেবে না। তারা এখন পুরোপুরি নিঃস্ব একটা জীবন কাটাচ্ছে। মাঝে মাঝে মেয়েরা এসে দেখে যায়, এই পর্যন্তই।

আর আমি! আমি সেই দিনটার পর পুরো পরিবার থেকেই মানসিকভাবে দূরে সরে গিয়েছিলাম। এক ছাদের নিচে থেকেও কাউকে নিজের মানুষ মনে হয়নি আর। কারণ আমি নিজের চোখে দেখেছি, কিভাবে কিছু মানুষ মিলে একটা নি'ষ্পাপ মেয়েকে ধীরে ধীরে মৃ'ত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। আমি আজও আব্বু-আম্মুর সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বলি না।

বড় মা সেদিনের পর থেকেই একেবারে ভেঙে গিয়েছেন। বড় আব্বু আর কোনোদিন বড় মায়ের সাথে কথা বলেননি। মাঝে মাঝে শুধু আমাকে কল করে খোঁজ'খবর নেন, এই পর্যন্তই। সবচেয়ে ভ'য়ংকর ব্যাপারটা হয়েছিল পরে।

হাওয়া ভাবির মৃ'ত্যুর কয়েক মাস পর তোদের আর কায়রার জন্ম হয়। কিন্তু সেদিন ভাই তোদের কোলে নিয়েও হাসতে পারেনি। কারণ যতবার তোদের মুখ দেখত, তার মনে পড়ত! আরেকটা ছোট্ট প্রা'ণ হাওয়ার সাথে মাটির নিচে চা'পা পড়ে আছে। একদিন তাকে বলতে শুনেছিলাম,

“আমি বাবা হওয়ার অধিকারটাই হারিয়ে ফেলেছি!

সেদিন প্রথমবার বুঝেছিলাম, কিছু শাস্তি আদালত দেয় না। জীবন দেয়।আর সেই শাস্তি মৃ'ত্যুর থেকেও ভয়ংকর হয়। হাওয়া ভাবির মৃ'ত্যুর তিন মাস পর দাদাভাই মা'রা যান। আর তোদের জ'ন্মের এগারো মাস পরে দাদিও মা'রা যান। অদ্ভুত'ভাবে তাদের মৃ'ত্যু দেখে আমার কষ্ট হয়নি। বরং মনে হয়েছিল আর একটা বছর আগে যদি দাদাভাই মা'রা যেতেন,। তাহলে হয়তো হাওয়া ভাবির জীবনটা এমন হতো না। তোদের যখন দুই বছর বয়স, তখন আমার বিয়ে হয়ে যায়। তারপর থেকে দুই কি তিনবার ওই বাড়িতে পা রেখেছিলাম।

আজ পর্যন্ত আর যাওয়া হয়নি। ধীরে ধীরে বাড়িটা একটা জীবন্ত মৃ'ত্যুপুু'রীতে রূপা'ন্তরিত হয়েছিল। সবাই বেঁ'চে ছিল। কিন্তু ভিতরে ভিতরে প্রতিটা মানুষ প্রতিদিন একটু একটু করে ম'রছিল। কেউ কিছু বলতে পারছিল না। কারণ মানুষটা চলে যাওয়ার পর সবাই বুঝেছিল,

"এই গল্পে সবচেয়ে নিষ্পাপ, সবচেয়ে পবিত্র, সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতে জানা মানুষটা- হাওয়াই ছিল।"

* মারিয়া সম্পূর্ণ কাহিনী বলা শেষ করতেই চারপাশটা অদ্ভুত নিস্তব্ধ হয়ে গেল। পার্কের বাতাস পর্যন্ত যেন ভারী হয়ে উঠেছিল। কায়ান অনেকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না। সে নিথর হয়ে বসে রইল। চোখ দু’টো রক্তিম হয়ে উঠেছে। ঠোঁট কাঁপছে। মনে হচ্ছিল, এই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ছেলেটা বহু বছরের বড় হয়ে গেছে। হঠাৎ সে দু’হাতে মুখ চেপে নিচু হয়ে গেল। তার কাঁধ কাঁপছিল। সে কাঁদছিল। সেই কান্নাটা ছিল না শুধু চোখের পানির, ওটা ছিল একটা মানুষের ভিতর থেকে ভেঙে পড়া, যে আজ জানতে পেরেছে তার জন্মের বহু আগে একটা নিষ্পাপ মেয়ে কী ভ'য়ংকর যন্ত্র'ণা নিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছিল। অনেকক্ষণ পর সে কাঁপা গলায় বলল,

“ফুপ্পি! আব্বু কি সত্যিই হাওয়া মা'কে ভালোবাসত?”

মারিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর খুব আস্তে বলল,

“ভালোবাসত! ভীষণ ভালোবাসত। কিন্তু কিছু ভালোবাসা মানুষ খুব দেরি করে বুঝে।”

কায়ান মাথা নিচু করে বসে রইল। তার বুকের ভিতরটা কেমন ভারী হয়ে আসছিল। রাত প্রায় সাড়ে নয়টার দিকে তার ফোন আবার বেজে উঠল। স্ক্রিনে “আব্বু” নামটা জ্বলছিল। কায়ান কিছুক্ষণ ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে কলটা রিসিভ করল। ওপাশ থেকে মায়ানের ক্লান্ত গলা ভেসে এলো,

“কোথায় তুমি? খেয়েছ কিছু?”

এই সাধারণ কথাটুকু শুনেই কায়ানের বু'কটা হঠাৎ মো'চড় দিয়ে উঠল। কারণ আজ প্রথমবার সে বুঝতে পারছিল। এই মানুষটার বুকের ভিতরেও কত বছরের জমে থাকা ভয়, অপরাধবোধ আর না বলা কান্না লুকিয়ে আছে। সে শান্ত গলায় বলল,

“ফুপ্পির সাথে আছি।”

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর পাশ থেকে কনিকা খুব আস্তে বলল,

“বেশি রাত করো না বাবা, বাসায় চলে আসো।”

“বাবা” শব্দটা শুনে কায়ানের চোখ আবার ভিজে উঠল। কলটা কেটে দেওয়ার পর সে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর হঠাৎ বলল,

“ফুপ্পি! এই মহিলা কি এখনো হাওয়া মায়ের কথা মনে করে?”

মারিয়া প্রশ্নটা শুনে স্থির হয়ে গেল। তার চোখ ভিজে উঠল। সে ধীরে ধীরে বলল—

“মনে করে, প্রতিটা দিন।”

হাওয়া মারা যাওয়ার পর কনিকা ভাবি আর কোনোদিন আগের মতো ছিল না। সে ধীরে ধীরে ভিতর থেকে শেষ হয়ে গিয়েছিল। রাতে ঘুম ভেঙে চিৎকার করে উঠত। মাঝে মাঝে বলত, হাওয়া নাকি র'ক্তমা'খা কাপড় পরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। অনেকদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই থা'প্পড় মা'রত।”

কায়ানের বুকটা ধক করে উঠল। মারিয়া কাঁপা গলায় বলল,

“একদিন আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, এভাবে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছ কেন? জানিস ও কি বলেছিল?”

কায়ান নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। মারিয়ার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। সে বলল,

"আমি নিজের সুখ বাঁচাতে গিয়ে একটা নিষ্পাপ মেয়ের জীবন শেষ করে ফেলেছি মারিয়া! আল্লাহ আমাকে কেন এখনও বাঁ'চিয়ে রেখেছে?"

কায়ান চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার মনে হচ্ছিল, এই গল্পে কেউ জেতেনি। সবাই হেরে গেছে। কেউ ভালোবাসা হারিয়ে, কেউ মানুষ হারিয়ে, কেউ নিজের আত্মাটাই হারিয়ে।

“জানিস সবচেয়ে ভয়ংকর কি ছিল?”

কায়ান ফিসফিস করে বলল,

“কি…?”

মারিয়া ভাঙা গলায় বলল,

“কনিকা ভাবি শেষ পর্যন্ত মায়ান ভাইকে পেলেও, কোনোদিন তার ভালোবাসাটা আর পুরোপুরি পায়নি। এক ছাদের নিচে থেকেও তারা বহু বছর ধরে অপরিচিত মানুষের মতো বেঁচে ছিল। মায়ান ভাই কখনো ওকে অপমান করেনি। কখনো চিৎকারও করেনি। শুধু ধীরে ধীরে দূরে সরে গিয়েছিল। আর মানুষ সবচেয়ে বেশি ভাঙে তখনই, যখন তার প্রিয় মানুষটা তাকে ঘৃণাও করে না, শুধু অনুভূতিহীন হয়ে যায়।”

কায়ানের চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছিল। তার হঠাৎ খুব করে নিজের আম্মুর জন্য কষ্ট হতে লাগল। কারণ সে বুঝতে পারছিল,

কিছু ভুলের শাস্তি মানুষ বেঁচে থাকতেই প্রতিদিন পেতে থাকে। কিন্তু কোন এক বাঁধার কারণে সে কনিকা'কে ক্ষমা করতে পারছে না। হঠাৎ মারিয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,

“জানিস কায়ান, কিছু মানুষ পৃথিবী ছাড়ার পরও শেষ হয়ে যায় না। তারা বেঁচে থাকে, কারও অপরাধ'বোধে, কারও কান্নায়, কারও না-পাওয়া ভালোবাসায়।“হাওয়াও ঠিক তেমনই।”

হাওয়া ভাবির খুব ইচ্ছে ছিল, তার যদি কোনোদিন মেয়ে সন্তান হয়, তাহলে নাম রাখবে “হিয়া”। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, হাওয়া চলে যাওয়ার পর মায়ান ভাই আর কনিকা ভাবির সম্পর্ক আর কোনোদিন স্বাভাবিক হয়নি। তাদের সংসারে আর কখনো নতুন কোনো সন্তানও আসেনি।

তবে হয়তো আল্লাহ কিছু অনুভূতি একেবারে অপূর্ণ রাখেন না। একদিন হাওয়া ভাবির কবরের পাশেই মায়ান ভাই এক নিষ্পাপ ফুটফুটে ছোট্ট মেয়েকে খুঁজে পেয়েছিল। মেয়েটার পৃথিবীতে আপন বলতে কেউ ছিল না। মায়ান ভাই কোনো দ্বিধা না করেই শিশুটিকে বাড়িতে নিয়ে আসে।

আর হাওয়া ভাবির বহুদিন আগের সেই স্বপ্নের নামটাই মেয়েটাকে দেয়,

“হিয়া”।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, কনিকা ভাবি মেয়েটাকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছিল। হয়তো নিজের সমস্ত পাপ, অপরাধবোধ আর অপূর্ণ মা'তৃত্ব ঢেলে দিয়েছিল ছোট্ট শিশুটার উপর।

আর মায়ান ভাই, সে আজও প্রতি রাতে হাওয়া রেখে যাওয়া ডায়েরি আর পোশাক বুকে জড়িয়ে ঘুমায়। মনে হয়, মানুষটা এখনও বিশ্বাস করে, কোনো এক গভীর রাতে হাওয়া ফিরে এসে বলবে,

“এবার আর আমাকে হারিয়ে ফেলো না!

হাওয়া মা'রা গেছে! কিন্তু এই বাড়ির প্রতিটা মানুষের ভিতরে এখনও বেঁচে আছে।”

কায়ান মাথা নিচু করে বসে রইল। সেদিন প্রথমবার তার মনে হয়েছিল, কিছু গল্পের কোনো খলনায়ক থাকে না। থাকে শুধু ভুল সিদ্ধান্ত, ভুল ভালোবাসা, আর অনেক দেরিতে বুঝতে পারা সত্য।

রাত বাড়ছিল। পার্ক ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কিছু গল্প কখনো শেষ হয় না। কিছু মানুষ মারা যাওয়ার পরও বেঁচে থাকে, অপরাধ'বোধে, স্মৃতিতে, না-পাওয়া ভালোবাসায়। আর কিছু মানুষ…

সব কষ্টের পরও সবার হৃদয়ে সবচেয়ে পবিত্র হয়ে থেকে যায়।

"হাওয়ার মতো।"

************** সমাপ্ত **************

বিদ্রঃ এই গল্পটা লিখতে গিয়ে আমি শুধু একটা চরিত্রের মৃ'ত্যু লিখিনি…

লিখেছি ধীরে ধীরে ভেঙে যাওয়া একটা নি'ষ্পাপ জীবনের আ'র্তনাদ।

হাওয়া শুধু একটা নাম ছিল না। সে ছিল সেইসব মেয়েদের প্রতিচ্ছবি, যারা ভালোবাসার আশায় সবকিছু সহ্য করে যায়! কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আঘাত পায় নিজের মানুষদের কাছ থেকেই।

গল্পে হয়তো অনেক কষ্ট ছিল, অনেক কান্না ছিল। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি চাইনি এটা শুধু একটা “ট্র্যাজেডি” হোক। আমি দেখাতে চেয়েছি, কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পরও শেষ হয়ে যায় না। তারা বেঁচে থাকে মানুষের অপরাধ'বোধে, না-পাওয়া ভালোবাসায়, আর গভীর অনুশোচনায়।

হাওয়া শেষ পর্যন্ত কাউকে অভিশাপ দিয়ে যায়নি। তবুও তার চলে যাওয়াটাই সবার জীবনের সবচেয়ে বড় শাস্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর একটা কথা, যদি কোনো জায়গায় আপনাদের চোখে পানি এসে থাকে, তাহলে বুঝব, হাওয়া শুধু আমার কল্পনার চরিত্র হয়ে থাকেনি, সে আপনাদের মনেও একটু জায়গা করে নিতে পেরেছে।

পুরো গল্পটা ধৈর্য ধরে পড়ার জন্য সত্যিই অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা। অদক্ষ হাতের এলোমেলো লেখা। ভুল-ত্রুটি হলে ক্ষমা'সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। 🙏🙏🙏

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন