ফন্ট সাইজ:
থিম:
পলাশ নয়নার প্রেমগাঁথা

১ম পর্ব

লেখক: তাসমিয়া তাসনিন প্রিয়া

#পলাশ_নয়নার_প্রেমগাঁথা

#পর্ব_১

#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া

ঝকঝকে ফ্ল্যাশলাইটের ঝলকানি আর ক্যামেরার অবিরাম ক্লিক-ক্লিক শব্দে কনফারেন্স রুমটা বেশ মুখরিত। ডায়াসের সামনে রাখা ডজনখানেক মিডিয়া হাউজের লোগো লাগানো মাইক্রোফোন। তার ঠিক পেছনেই বসে আছে এই মুহূর্তে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী পলাশ। পলাশের বয়স ত্রিশের কোঠায়। পরনে তার নিখুঁত ফিটিংসের ব্লেজার, চোখে গম্ভীর শান্ত ভাব। যে কেউ তার এমন উপস্থিতি আর বিত্তবৈভবের দিকে তাকালে মন্ত্রমুগ্ধ হতে বাধ্য। কিন্তু এই জৌলুসের পেছনের গল্পটা কতখানি অন্ধকার আর কষ্টের ছিল, তা কেবল পলাশই জানে। মামার বাড়ির অবহেলা আর লাঞ্ছনায় বড় হওয়া এতিম ছেলেটা যে আজ নিজের কণ্ঠ, পরিশ্রম আর ভাগ্যের জোরে এই অবস্থানে পৌঁছাবে, তা কেউ কোনোদিন ভাবেনি।

মাইক্রোফোন হাতে এক তরুণ সাংবাদিক দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল,

"পলাশ ভাই, আপনার নতুন অ্যালবামের গানগুলো তো অলরেডি ট্রেন্ডিংয়ে ওয়ান। কিন্তু বরাবরের মতোই আপনার গানগুলোতে একটা অদ্ভুত একাকীত্ব আর বিচ্ছেদের সুর পাওয়া যায়। “

পলাশ শান্তভাবে বলে,

“ এটা আমার নিজস্ব গান গাওয়ার ধরণ। আমি চাইলেও বদলাতে পারি না। সবারই তো একটা নিজস্বতা থাকে। “

সাংবাদিক আবার প্রশ্ন করে,

“ তা ঠিক। তবে কোটি ভক্তের একটাই প্রশ্ন–বাস্তব জীবনে পলাশের রিলেশনশিপ স্ট্যাটাসটা কী? আপনার জীবনে কি বিশেষ কেউ আছে?"

প্রশ্নটা শুনে কনফারেন্স রুমের গুঞ্জন এক মুহূর্তে থেমে গেল। সবাই অধীর আগ্রহে পলাশের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল এবার।

পলাশ ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলল। এই একটা প্রশ্ন, যা সে গত কয়েক বছর ধরে প্রতিটা সংবাদ সম্মেলনে এড়িয়ে গেছে। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। সে মাইক্রোফোনটা সোজা করে হালকা গলায় বলল,

"শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবন শুধুই তার নিজের। আজ বরং আমরা নতুন অ্যালবামের গানগুলো নিয়েই কথা বলি।"

উত্তরটা দিয়ে পলাশ যখন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। এরমধ্যে বাইরে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। অডিটোরিয়ামের কাঁচের দেয়াল বেয়ে নেমে আসা বৃষ্টির ফোঁটাগুলোর দিকে তাকিয়ে পলাশের চোখের কোণে একটা চেনা অবয়ব ভেসে উঠল। মিডিয়ার শত আলো আর কোটি ভক্তের ভালোবাসার মাঝেও, তার মনের এক কোণে জমে থাকা একটা নামটা আজও বড্ড বেশি জীবন্ত–নয়না! সে যত দ্রুত সম্ভব সংবাদ সম্মেলন শেষ করল।

সংবাদ সম্মেলন শেষ করে পলাশের মার্সিডিজ গাড়িটা এসে থামল ঢাকার অভিজাত এলাকার এক বিশাল, বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ির সামনে। পলাশ বাড়ির মূল ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই লিভিং রুমে মামুন চৌধুরীকে দেখতে পেল। ভদ্রলোকের চুলগুলো বয়সের ভারে কিছুটা পেকেছে, কিন্তু চোখে-মুখে এখনো চমৎকার ব্যক্তিত্বের ছটা। পলাশকে দেখেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। নিজের একমাত্র সন্তানকে হারানোর পর পলাশকেই তিনি বুকে টেনে নিয়েছিলেন, নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে তাকে আজকের এই অবস্থানে এনেছেন। পলাশও তাকে নিজের বাবার আসনেই বসিয়েছে।

মামুন চৌধুরী সোফা থেকে একটু ঝুঁকে জিজ্ঞেস করলেন,

"কেমন হলো আজকের সংবাদ সম্মেলন? মিডিয়ার লোকজন খুব বেশি জ্বালায়নি তো?"

পলাশ নিজের ভেতরের সব ক্লান্তি আর শূন্যতা এক নিমেষে লুকিয়ে মুখে অমায়িক হাসি ফুটিয়ে তুলল। বাবার সামনে সে কখনো নিজের ভেতরের অন্ধকারটা প্রকাশ পেতে দেয় না। মৃদু হেসে বলল,

"না বাবা, খুব ভালো হয়েছে। সবাই নতুন অ্যালবামটা নিয়ে বেশ এক্সাইটেড।"

মামুন চৌধুরী সন্তুষ্ট হয়ে মাথা নাড়লেন,

"যাক তাহলে ভালো। এবার নিজের রুমে যাও, ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি জেরিনকে ডিনারের ব্যবস্থা করতে বলছি।"

"আচ্ছা বাবা।" বলে পলাশ দোতলার সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল।

নিজের বিশাল, সুসজ্জিত বেডরুমে ঢুকেই পলাশ ভেতর থেকে দরজাটা লক করে দিল। দরজাটা আঁটকে দেওয়ার সাথে সাথেই যেন তার মুখের মেকি হাসিটা উবে গেল। এক নিমিষেই সে একজন একাকী, চূর্ণ-বিচূর্ণ মানুষে পরিণত হলো, যাকে বাইরের দুনিয়া চেনে না।

কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত কণ্ঠশিল্পী পলাশ ও দিনশেষে কারো ভালোবাসা জন্য ছটফটিয়ে মরে। সে ব্লেজারটা খুলে সোফায় ছুঁড়ে ফেলল। এরপর ঘরের এক কোণে রাখা ক্যাবিনেট থেকে হুইস্কির বোতল আর গ্লাসটা বের করে নিল। বরফ ছাড়াই কিছুটা লিকুইড গ্লাসে ঢেলে এক চুমুকে গলাধকরণ করল। তীব্র তরলটা তার গলা বেয়ে নামতেই চোখ দুটো বুজে এলো পলাশের।

চোখ বন্ধ করতেই মনের সব দেয়াল ভেঙে একটা নাম অবাধ্য ঝড়ের মতো ধেয়ে এলো। নয়না! এই একটা নাম, যা মনে পড়লেই পলাশের বুকের বাম পাশে একটা তীব্র, অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হয়। মনে হয় যেন হৃদপিণ্ডটা কেউ শক্ত মুঠোয় পিষে ফেলছে। আজ সে সফল, আজ সে বিত্তবান, আজ সে লাখো তরুণীর স্বপ্নের পুরুষ। কিন্তু যে নয়নার জন্য একসময় তার পুরো পৃথিবীটা থমকে গিয়েছিল, সেই নয়নাই তার জীবনে নেই। ড্রিংকসের গ্লাসটা শক্ত করে ধরে পলাশ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। অ্যালকোহলের তীব্রতাও যেন নয়নাকে ভুলে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়। পলাশ গ্লাসটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল। অ্যালকোহলের তীব্রতা মাথা ছুঁতেই বর্তমানের বিলাসবহুল ঘরটা যেন ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল। চোখের সামনে ভেসে উঠল তপ্ত দুপুরের চেনা এক স্কুল প্রাঙ্গণ, বাতাসে উড়তে থাকা ধুলোবালি আর শিমুল গাছের পাতা ঝরার শব্দ।

**

অতীতের পাতা…

পলাশ টেস্ট পরীক্ষা পরীক্ষা শেষ করেছে। সামনে তার এসএসসি পরীক্ষা। নুন-আনা পান্তা-ফুরানোর সংসারে মামার বাড়ির হাজারো অবহেলার মাঝেও, পড়াশোনা আর বন্ধুত্বের সাথে আড্ডার সময়টুকুই ছিল পলাশের একমাত্র আনন্দ।

দুপুরের কড়া রোদে পলাশ স্কুলের বারান্দা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। পরনে কিছুটা মলিন স্কুল শার্ট, কাঁধে এক ফিতার পুরনো ব্যাগ। কিন্তু তার আকর্ষণীয় চেহারা আর চোখের ভেতরের তীব্র জেদই তাকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা করে রাখত। ঠিক তখনই উল্টো দিক থেকে আসছিল নয়না। সে তখন সবেমাত্র ক্লাস এইটের নতুন ছাত্রী। গায়ে নীল-সাদা ফ্রক, চুলে দুটো শক্ত করে বাঁধা বেণী, আর বুকে জড়িয়ে ধরা একগাদা ক্লাস নোট খাতা।

পলাশকে দূর থেকে হেঁটে আসতে দেখেই নয়নার হাঁটার গতি হুট করে কম হয়ে এল। স্কুলের সব মেয়েরাই এই শান্ত, চাপা স্বভাবের ছেলেটার দিকে লুকিয়ে চুরিয়ে তাকাত, কারণ ওর গলায় ছিল জাদুকরী সুর। পলাশ খুব ভালো গান গাইতে পারে। কিন্তু নয়নার ভালো লাগাটা ছিল একটু অন্যরকম। কোনো কারণ ছাড়াই পলাশকে ভালো লাগে তার।

এরমধ্যে পলাশ যখন নয়নার একদম কাছাকাছি চলে এলো, নয়না তখন কী করবে বুঝতে না পেরে বুকের সাথে খাতাগুলো আরও শক্ত করে চেপে ধরল। তার ফর্সা দু-গাল মুহূর্তের মধ্যে লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। পলাশের সাথে চোখাচোখি হওয়ার ভয়ে সে তাড়াহুড়ো করে চোখ দুটো মাটির দিকে নামিয়ে নিল। তার হার্টবিট যেন স্কুলের ঘণ্টার চেয়েও জোরে বাজছিল। কিন্তু নয়না জানে পলাশ পুরোপুরি উদাসীন। ছেলেটা কোনো মেয়ের সাথে কথা বলা তো দূর ফিরেও তাকায় না। তবে নয়নার ব্যাপারে কখনোই উদাসীন ছিল না। সে আড়চোখে চঞ্চল, লাজুক মেয়েটিকে সবসময় লক্ষ্য করতো। নয়নার এমন অকারণ লজ্জা পাওয়া আর মাথা নিচু করে চলে যাওয়ার চেষ্টা পলাশের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলল।

নয়না পলাশকে পিছনে ফেলে আরও দু-কদম এগিয়ে গেল, তবে তার হাত-পা কাঁপছে এখনও। সে আলতো করে পেছনে ফিরে তাকাল। দেখল পলাশ সোজা হেঁটে চলে যাচ্ছে, একবারের জন্যও পেছন ফিরে তাকায়নি। নয়না একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ওড়নার খুঁট আঙুলে জড়াতে জড়াতে বিড়বিড় করল, "মানুষটা এত অহংকারী কেন!”

চলবে……..

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন