#মাঝরাতের_রোদ্দুর
#পর্ব_১
#নওরিন_কবির_তিশা
ফেব্রুয়ারির মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে শিশির আর আনায়া ক্লাসের হাঁপ ছেড়ে ক্যাম্পাসের খোলা বাতাসে পা রাখল। সকাল থেকে টানা ক্লাস, প্রেজেন্টেশন, আর বইয়ের ভারে যেন দম বন্ধ হয়ে আসছিল। তবে ক্যাম্পাসের পরিবেশ আজ অন্যরকম।
ভালোবাসার এই মাসের শুরু থেকেই যেন চারদিকে একটা উৎসবের আমেজ লেগে আছে। লাল-গোলাপ হাতে প্রেমিক-প্রেমিকারা করিডোরের কোণে দাঁড়িয়ে ফিসফিসিয়ে কথা বলছে, কেউ আবার ক্যাম্পাসের খোলা জায়গায় বসে নির্লজ্জের মতো PDA চালাচ্ছে। শিশির এসব জিনিসকে মোটেও পছন্দ করে না। তার মতে, প্রেম যদি সত্যি হয়, তাহলে এত লোক দেখানোর কী দরকার?
ঠিক তখনই তারা একটা নাটকীয় দৃশ্যের সামনে পড়ল। একটু দূরে, সবাইকে তাক লাগিয়ে, একটা ছেলে হাঁটু গেড়ে বসে এক মেয়েকে প্রপোজ করছে। আশেপাশের কয়েকজন মোবাইল বের করে ভিডিও করছে, কেউ আবার হাততালি দিচ্ছে।
শিশির বিরক্ত মুখে আনায়াকে কনুই দিয়ে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলল, "দেখ, শুরু হয়ে গেছে ঢং! এই মাসটা একদম অসহ্য! খেয়ে-দেয়ে আর কোনো কাজ নেই, ক্যাম্পাসের মধ্যে ফালতু নাটক! ওই মেয়েটার জায়গায় আমি থাকলে ছেলেটাকে দাঁড় করিয়ে কষে একটা চড় মারতাম।"
আনায়া হেসে বলল, "তোর মতো মানুষ খুব কম আছে এই ক্যাম্পাসে। এরা তো এইসব ছাড়া ভালোবাসার কথা ভাবতেই পারে না!"
শিশির মুখ বাঁকিয়ে বলল, "ভালোবাসা এমন লোক দেখানো কিছু না। এসব সব আজাইরা ব্যাপার!"
আসলে শিশির ছোটবেলা থেকেও অনেক চঞ্চল এবং ইমম্যাচিউর হলোও এই একটা ব্যাপারে সে অনেক বেশি ম্যাচিওর আর আনায়া তার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী । শিশির তুলনায় অনেক বেশি ম্যাচিউর ও শান্ত স্বভাবের। যাই হোক শিশিরের কথা শেষ হতে না হতেই পেছন থেকে এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো। যেন তাদের খুব কাছে কেউ নিঃশ্বাস চেপে দাঁড়িয়ে আছে। দু’জনেই ঘুরে তাকাল।
ঠিক পেছনেই একটা ছেলে হাঁটু গেড়ে বসে আছে—সেও প্রপোজ করার জন্য প্রস্তুত।
কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, ছেলেটার মুখে একরাশ ভয়। শিশিরের ঠান্ডা অথচ তীক্ষ্ণ কথা শুনে তার পুরো শরীর যেন জমে গেছে।
আনায়া ঠোঁট টিপে হাসল, কিন্তু শিশিরের চোখে তখন রক্তগরম আগুন।
"কী ব্যাপার? এখানে থাপ্পড় খাওয়ার শখ হয়েছে?" শিশির চোখ সরু করে বলল।
ছেলেটা শুকনো ঢোঁক গিলে অসহায়ের মতো বলল, "না... মানে... আসলে..."
"আসলে কী?" শিশির এবার গলা আরও কঠিন করে ফেলল।
ছেলেটা পিছন ফিরে তাকাল।
তাদের ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে ফুয়াদ আহমেদ।
সিনিয়র, র্যাগিং মাস্টার, এবং একরোখা স্বভাবের জন্য ভয়ঙ্কর কুখ্যাত। তাছাড়া সে প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান। ক্যাম্পাসে তার একটা নিজস্ব গ্রুপ আছে, যারা তার সামান্য ইশারাতেই অন্যদের হয়রানি করতে পারে।
ছেলেটার দৃষ্টি অনুসরণ করে শিশিরও ফুয়াদের দিকে তাকাল। এবার সব পরিষ্কার হলো! ফুয়াদই ছেলেটাকে দিয়ে শিশিরকে প্রপোজ করানোর নাটক সাজিয়েছে।
ফুয়াদ ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে মাথা কাত করল। তার চোখে একরকম খেলা চলছে।
মনে মনে ভাবল, "এই তো! একদম মনের মতো মেয়ে পেয়েছি! পুরো সিংহী, আগুন!"
সে ধীর পায়ে এগিয়ে এল। চারপাশে থাকা উৎসুক দর্শকেরা মুখ চেপে হাসছিল, কেউ কেউ ফিসফিস করছিল।
"কী ব্যাপার, সিস্টার? কোনো সমস্যা? বললেই এই সিনিয়র এক্ষুণি সমাধান করে দেবে।"
ফুয়াদ এই ‘সিস্টার’ ডাকটা ইচ্ছা করেই ব্যবহার করেছিল। যেন একদিকে অপমান, অন্যদিকে ইঙ্গিত—একদম খেলা করার মতো মজাদার একটা কৌশল।
শিশিরের মেজাজ সপ্তম আকাশে উঠে গেল। এক মুহূর্ত দাঁড়াল না, দ্রুত পেছন ফিরল।
ফুয়াদ পেছন থেকে চিৎকার করে বলল, "কী গো সিস্টার, বুঝে গেলে? তাহলে এবার আমার কাছে ফিরে এসো। মন তো কবেই চুরি করে নিয়ে গেছো!"
শিশির মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। এই ছেলেটা কী বলে? তার মতলব কী? সে কি নিছকই মজা করছে, নাকি এর পেছনে অন্য কিছু আছে?
ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়ে কটমট করে তাকিয়ে বলল, "নির্লজ্জ! বেহায়া! এভাবে কথা বলতে লজ্জা করে না?"
ফুয়াদ হো হো করে হেসে বলল, "না গো সিস্টার! বলেছিলে ভাইয়া, কিন্তু আমি তো হয়ে গেছি ছাইয়া… যার মন নিয়ে তুমি অনেক আগেই গেছো পালাইয়া!"
ক্যাম্পাসের আশেপাশের সবাই এবার হেসে উঠল। কেউ কেউ শিশিরের সাহসের প্রশংসা করছিল কারণ ফুয়াদের সাথে এভাবে কথা বলার কারো সাহস নেই।
শিশির এবার আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। আনায়ার হাত টেনে ধরে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।
ফুয়াদ তখনও হাসছে, চোখে অদ্ভুত কিছু কে জানে এটা কি নিছক মজা নাকি কোনো এক অন্যরকম রহস্যের সূচনা......
চলবে???
(বি:দ্র: পর্ব টা ডিলিট হয়ে গিয়েছিল এজন্য আবার দিলাম)