#মাঝরাতের_রোদ্দুর
# পর্ব ৬
#নওরিন কবির তিশা
গাড়ি থেকে নামতেই ফারিন এক গভীর শ্বাস নিল।
প্রথম দিন!
তার সামনে বিশাল খুলনা সিটি কলেজের ক্যাম্পাস।
চারপাশে ছড়ানো সবুজ গাছপালা, পুরনো অথচ রাজকীয় বিল্ডিং। ব্রিটিশ আমলের লালচে ইটের স্থাপত্যশৈলী মিশ্রিত এই কলেজ যেন একদম অন্যরকম। বিশাল গেট পেরিয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকতেই রাস্তার দুই পাশে সারি সারি কৃষ্ণচূড়া, বকুল আর রাধাচূড়া গাছ।
তারপরও আজকের সকালটা তার জন্য এত সুন্দর নয়।
আজ তার প্রথম ক্লাস!
nervousness কাজ করছে তার ভিতর
নতুন শহর, নতুন কলেজ, নতুন মানুষ…
কিন্তু এখন এসব ভাবার সময় নেই!
ঘড়িতে তাকিয়ে দেখে, ক্লাস শুরু হতে আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি!
তার মানে আজ আর পুরো কলেজ ঘুরে দেখা হবে না!
সে দ্রুত পা বাড়াল প্রথম বর্ষের ক্লাসরুমের দিকে।
ক্লাসরুমে ঢুকতেই সে দেখল, বেশিরভাগ সিট ভরে গেছে। কিন্তু ভাগ্যক্রমে এক কোণে একটা ফাঁকা জায়গা পেয়ে দ্রুত গিয়ে বসল।
তারপরই শুরু হলো প্রথম ক্লাস—গণিত!
সবার চোখ দরজার দিকে।
হাঁটার ভারী শব্দে কেঁপে উঠল কাঁচের জানালাগুলো।
ক্লাসরুমের দরজা খুলে গেল…
ভেতরে ঢুকল সেই মানুষটা—
যার গাড়িতে চড়ে ফারিন আজ কলেজে এসেছে!
তার রক্ত হিম হয়ে গেল!
তারপর আসল ধাক্কাটা লাগল, যখন লোকটা গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
"Good morning, students. I am Professor Nirjhor Chowdhury."
"এই লোক...!"
ফারিনের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল!
তার পাশে বসা এক মেয়ে ফারিনের দিক তাকিয়ে হাসল।
"তুমি কি নতুন?"
ফারিন মাথা ঝাঁকালো, "হ্যাঁ…"
মেয়েটি উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলল, "তাহলে নির্ঝর স্যার সম্পর্কে কিছু জানো না, তাই না? দেখছো না, স্যার কত হ্যান্ডসাম? আমি প্রথম দিন দেখেই ক্রাশ খেয়েছিলাম!"
তারপর একটু ফিসফিসিয়ে বলল,
"কিন্তু পরে বুঝেছি, উনি একেবারে পাষাণ! প্রচণ্ড রাগী! ছাত্রদের সামনে ধুয়ে দিতেও দুইবার ভাবেন না!"
ফারিনের তখনই মনে পড়ল, রাস্তার সেই কথা…!
"নির্ঝর স্যার নাকি কারণে-অকারণে স্টুডেন্টদের অপদস্ত করেন!"
ফারিনের বুক ধক করে উঠল!
সারা রাস্তা যার নামে বাজে কথা বলল, সে লোকটা আসলে তারই প্রফেসর!
🔹 নির্ঝরের রহস্যময় কণ্ঠ…
ঠিক তখনই নির্ঝর চৌধুরীর কণ্ঠ গম্ভীর হয়ে উঠল।সে হাতের কলম ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
"আমি শুনলাম, আমি নাকি খুব কঠোর একজন অধ্যাপক। কেউ কেউ ভাবে আমি অপ্রয়োজনীয়ভাবে রূঢ়। আরও মজার ব্যাপার হলো, কেউ কেউ তো মনে করে তার মাত্র একটা তুড়িতেই আমায় শায়েস্তা করা যায়"
ক্লাসে মুহূর্তেই নীরবতা নেমে এল!
ক্লাসের সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস শুরু করল।
"কি হইছে?" "তুই কিছু জানিস?"
🔹চোখাচোখি!
সবাই বিস্ময়ের সঙ্গে একে অপরকে দেখছে।
কিন্তু ফারিন স্পষ্ট বুঝতে পারল—এই কথাগুলো তাকেই উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে!
ঠিক তখনই, নির্ঝর চোখ সরু করে তাকাল ক্লাসের এক কোণের দিকে।
সেই দিকে এক পলক তাকিয়েই বলল,
"The last seat, left corner. You!"
ফারিনের হার্টবিট দ্বিগুণ হয়ে গেল!
"এবার বুঝি সবার সামনে অপমান করবে?"
তারপরও গলা শক্ত করে বলল,
"Yes, sir?"
নির্ঝর ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলল,
"Are you new?"
ফারিন শুকনো ঢোঁক গিলে মাথা নেড়ে বলল,
"Yes, sir."
নির্ঝর ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,
"Introduce yourself."
ফারিন গলাটা একটু খাঁকারি দিয়ে বলল,
"I am Farin Mustafa, from Dumuria."
নির্ঝর চোখের ভ্রু একটু উঁচু করল। তারপর মাথা নেড়ে বলল,
"Okay. Sit down."
ফারিন থতমত খেয়ে গেল! এতটুকুই? আর কিছু বলবে না?
সারা ক্লাসে এরপর আর কোনো সমস্যা হয়নি। নির্ঝর নিজের মতো লেকচার দিয়ে চলে গেল।
কিন্তু এরপর থেকে ক্লাসে যখনই নির্ঝর আসে, ফারিন তাকে এড়িয়ে চলে।
কিন্তু নির্ঝর?
ছোটখাটো কথা দিয়েই তাকে জ্বালিয়ে মারে!
বিরতির সময় ফারিন ক্লাসে বসে ছিল, তখন পাশে বসা নেহা একধাক্কা দিল।
"কি রে, এখনো তোর নির্ঝর স্যারকে নিয়ে ভাবছিস?"
ফারিন বিরক্ত মুখে বলল,
"হুহ! ভাবার কিছু আছে নাকি? ওই হিটলার তো আমাকে দেখলেই জ্বলে ওঠে!প্রশ্ন করবে এমন জায়গা থেকে যে আমি কোনদিন শুনিই নি। এমনিতেই আমার গণিত ভালো লাগে না । তারপরে যদি স্যার হয় এরকম। ধ্যাত কেন যে মরতে প্রথম দিন ওনার গাড়ির সামনেই আমার পড়তে হলো। "
নেহা আরেকটু খোঁচা দিয়ে বলল,
"মনে হয় তোর জন্যই স্যার ক্লাসে থাকেন! তুই না থাকলে কি আর ভালো লাগে?"
ইমন যোগ দিল,
"This is called love at first sight!"
ফারিন এবার একদম চটে গেল!
"তোদের ফাও কথা শুনতে আমার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই! ওই বজ্জাত স্যারকে দেখলেই আমার মেজাজ গরম হয়ে যায়!"
এই বলে ফারিন ব্যাগ গুছিয়ে উঠে চলে গেল।
নেহা আর ইমন পেছন থেকে হাসতে লাগল…
অন্যদিকে......
ঢাকা – ইউনাইটেড হাসপাতালে
ঢাকার সবচেয়ে বড় এবং আধুনিক হাসপাতালের একটি বিশেষ কেবিনে চেতনাহীন অবস্থায় শুয়ে আছে ফুয়াদ আহমেদ।
আজ চতুর্থ দিন।
তবুও কোনো সাড়াশব্দ নেই।
অক্সিজেন মাস্ক পরানো মুখটা এতটাই নিস্তব্ধ, যেন সে ঘুমিয়ে নেই—একটা গভীর শূন্যতায় ডুবে গেছে।
ডাক্তারেরা উদ্বিগ্ন।
"তার জ্ঞান এখনো ফিরেনি। আজকের মধ্যে যদি অবস্থার উন্নতি না হয়, তাহলে বিদেশে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া আর কোন উপায় নেই।"
ফিরে যাওয়া সেদিনের ঘটনায়...
শিশির তখনো রাগে গজগজ করতে করতে আনায়াকে টেনে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে আসছিল।
পেছনে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসছিল ফুয়াদ আহমেদ।
এই মেয়েটা একেবারে অন্যরকম।
তার খেলা তো এখনো শুরুই হয়নি!
কিন্তু আজ দেরি করা যাবে না।
তাকে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হবে।
তাই নিজের গ্রুপকে বিদায় জানিয়ে ফুয়াদ গাড়ির দরজা খুলে স্টিয়ারিংয়ে বসল।
ইঞ্জিন স্টার্ট দিল।
গাড়ি চলতে লাগল ঢাকার ব্যস্ততম সড়ক দিয়ে।
হালকা সন্ধ্যা নেমে এসেছে।
ফুয়াদ নিজের মুড ঠিক রাখতে গান গুনগুন করছিল,
"তোকে দেখে মনে মনে
বাজল যে গিটার 🎸 🎸
প্রেমে জলে ভেসে গেল
মনটা যে আমার 🎶
আয় তুই আমার হবি
আয় আয় আয় 🎶"
তবে গানের সুর মুখে থাকলেও, আজ তার ভেতরটা একদম ফুরফুরে লাগছে না।
মনে হচ্ছে... কিছু একটা ঠিক নেই!
কিন্তু কী?
ঠিক তখনই!
হঠাৎ সামনে মালবোঝাই একটা ট্রাক চলে এলো!
ফুয়াদ তৎক্ষণাৎ ব্রেক চাপল।
কিন্তু...
গাড়ির ব্রেক কাজ করছে না!
তার হাত-পা মুহূর্তেই ঠান্ডা হয়ে গেল!
"কী হচ্ছে এটা?"
ফুয়াদ দ্রুত গিয়ার পরিবর্তন করতে গেল।
না!
কিছুই হচ্ছে না!
তার পুরো শরীর ঘামে ভিজে গেল!
ট্রাকটা আরও কাছে আসতে লাগল....
শুধু কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধান!
বিস্ফোরণের মতো এক বিকট শব্দ হলো!
চারপাশ কেঁপে উঠল!
পাশের গাড়িগুলো একসঙ্গে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে গেল!
পথচারীরা হতভম্ব হয়ে ছুটে এলো!
রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গাড়ির ভাঙা কাঁচের টুকরো গুলোতে হেডলাইটের আলো পড়ে চিকচিক করছে!
কেউ একজন চিৎকার করে উঠল—
"এক্সিডেন্ট! এক্সিডেন্ট!"
লোকজন ছুটে এসে দেখল, গাড়িটা দুমড়ে-মুচড়ে গেছে!
ড্রাইভিং সিটে বসা ছেলেটার পুরো শরীর রক্তে ভিজে গেছে...
এরপর লোকজন তাকে ঐখানকার একটি পাবলিক হাসপাতালে এডমিট করা এবং তার বাবাকে খবর দেয় পরে তার বাবা এসে তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে এডমিট করায় ।
---
বর্তমান – ইউনাইটেড হাসপাতাল
ফুয়াদের বাবা, ফরিদ আহমেদ, জানালার কাচের ওপার থেকে ছেলের নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে আছেন।
তার কপাল কুঁচকে আছে।
তার মাথার ভেতরে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
"এটা কি সত্যিই দুর্ঘটনা?"
তার মন বলছে, "না, এটা নিছক দুর্ঘটনা নয়। এটা পরিকল্পিত!"
কিন্তু কে?
কে তার ছেলেকে মেরে ফেলতে চাইবে?
তার মন তার ১৯ বছর আগের এক ঘটনা মনে করিয়ে দিল। তিনি মনে মনে বলেন,
তাদের কারো বেঁচে থাকা সম্ভব না। আর যদি থাকেও তাহলে তো আমাকে চেনা সম্ভব না.....
চলবে.....???
(নোট: আপনাদের অনুরোধে বিকালের আগেই আমি গল্পটা দিলাম ❤️ অনেকে গল্পটা পড়তেছেন কিন্তু কমেন্ট করতেছেন 😕😕 না আপনারা যারা গল্পটা করতেছেন তাদের কাছে আমার একটাই অনুরোধ একটু কমেন্টে আপনাদের মূল্যবান মতামত টা জানাবেন☺️☺️ এরপর আপনারা কমেন্ট না করলে পরবর্তী পর্ব দিতে কিন্তু দেরি হবে 🙂🙂 ধন্যবাদ ❤️)