#মাঝরাতের_রোদ্দুর
#পর্ব ২২
#নওরিন_কবির_তিশা
লোকেশন: যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিক্রেট অপারেশন রুম, ওয়াশিংটন ডিসি রাত ২:১৭ মিনিট
ঘরটা নিঃস্তব্ধ, চারদিকে আধো অন্ধকার।
দেয়ালের উপর বিশাল প্রজেক্টরে ভেসে উঠছে একের পর এক তথ্য—ক্যালিফোর্নিয়ার অভিজাত স্কুলের ফুটেজ,হামলার ছবি, সন্দেহভাজনের blurry ফুটেজ, নিউজ ক্লিপিংস।
ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে দুই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন অফিসার,একজন অভিজ্ঞ স্পেশাল অপারেটিভ—ইলিয়াস রহমান, আর তার পাশে সদ্য নিয়োগ পাওয়া সায়েদ ফারুক।
সায়েদ হঠাৎই কাঁপা গলায় , মুখ চিন্তায় ভারী করে বলল,,
— “২১ জন বাচ্চা নিখোঁজ, স্যার।
তা-ও আবার ক্যালিফোর্নিয়ার সবচেয়ে সুরক্ষিত প্রাইভেট স্কুল থেকে!
এটা কীভাবে সম্ভব?”
সাঈদের এমন কথায় ইলিয়াস গম্ভীর গলায়, ঠোঁটে চাপা বিরক্তি নিয়ে বললো,,
— “Wellington International Academy একটা সাধারণ স্কুল নয়, সায়েদ।
ওখানে পড়ে বিলিয়নিয়ারের সন্তান, সেনেটরের মেয়ে, আন্তর্জাতিক ভিআইপিদের উত্তরসূরি।
এই হামলা শুধু নিরাপত্তার ব্যর্থতা না—এটা সরাসরি আমাদের মুখে চপেটাঘাত।”
সায়েদ:— “আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়টা জানেন কী, স্যার?যারা টাকা দিয়েছে, তাদেরও বাচ্চারা ফিরে আসেনি।”
স্লাইড বদলিয়ে, গলা গভীর করে ইলিয়াস বলে,,
— “তাই তো বলছি—এই কেস আমরা নিজেরা ম্যানেজ করতে পারছি না।FBI ব্যর্থ, Homeland ব্যর্থ… এমনকি আমাদের ব্ল্যাক অপারেটিভ টিমও কিছু করতে পারেনি।
এখন আমাদের দরকার এমন কাউকে,যার জন্য শত্রুরা এলাকা ছাড়ে।”
ভুরু কুঁচকে সামান্য ভাবুক হয়ে সায়েদ বলে,,
— “মানে?”
স্লাইডে ক্লিক করেন, ঝাপসা একটা মুখ ভেসে ওঠে—সাদা হুডি, সানগ্লাস, তীক্ষ্ণ চোয়াল সেদিকে তাকিয়ে ইলিয়াস বলে,,
— “এইজন্যই ওকে আনতে হয়েছে।A.R.(Alpha Reaper).”
ঘরের বাতাস হঠাৎ ঘন হয়ে ওঠে। নিস্তব্ধতা যেন কানে তালা লাগিয়ে দেয়।
সায়েদ ফিসফিস করে, নিঃশ্বাস আটকে বলে—
— “ওই নামটা শুনলেই... শরীর জমে যায় স্যার।
উনিই তো, যাকে নামানো মানেই... যুদ্ধের শেষ ঘোষণা?”
আরেকজন পাশ থেকে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বলে ওঠে,,
— “হ্যাঁ।'One man wipeout unit'।
ও কথা কম বলে, কাজ বেশি করে।
ওকে যারা চিনে, তারা আর দাঁড়ায় না।”
সায়েদ:— “কিন্তু স্যার, আপনি কি নিশ্চিত… ওনি এখনো মিশনে নামে?”
ইলিয়াস চোখ নিচু করে হালকা গলায় ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি নিয়ে বলে,,
— “ও কখনো 'অবসর' নেয় না, সায়েদ।
ও শুধু 'অদৃশ্য' হয়ে যায়।
আর ফিরে আসে তখনই, যখন দরকার হয় যুদ্ধ শেষ করার।
এবং হ্যাঁ—এই মিশনের ডাক ও গ্রহণ করেছে।
কারণ এটা শুধু অপারেশন না...
এটা একেকটা মায়ের বুকফাটা কান্না থামানোর মিশন।
এবং এখন, এটা শুধু কিডন্যাপ না—
এটা একটা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের সূচনা।”
ঠিক তখনই দরজাটা খুলে যায়।
একটা ছায়া ঢোকে ঘরে—চেহারার অর্ধেক ঢাকা, চোখে সানগ্লাস, গায়ে কালো জ্যাকেট।
সে কিছু বলে না—শুধু চারপাশে একবার তাকায়।
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে যায়।
প্রজেক্টরে লেখা ভেসে ওঠে:
Alpha Reaper
Clearance Code: RED-ZERO
Status: LIVE
Location: Washington D.C.
----
ঘরের ভেতর জ্বলছিল একটিমাত্র নরম আলো,যেন নিঃশব্দে জেগে থাকা কোনও স্বপ্নের টুকরো।ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে নিজের চুলে আলতো করে আচড় দিচ্ছিল শিশির।
চুল আচড়ানো শেষ হলে, হিজাব আনতে ধীরে পাশের আলমারির দিকে এগিয়ে গেল সে।
আলমারির দরজা খুলতেই তার চোখ আটকে গেল ডান পাশে।সেখানে যত্ন করে সাজানো ছিল হিজাবের রঙিন কম্বো।নীল, মেরুন, খয়েরি, হালকা ধূসর… একেকটা যেন একেকটি মুঠোভরা গল্প।একেকটা নীরব স্মৃতি।
শিশির থমকে দাঁড়ায়।
তার স্মৃতির মানসপটে ভেসে ওঠে একটি স্নিগ্ধ সুন্দর বিকেলের প্রতিচ্ছবি...
যেদিন নাহিয়ান তাকে জোর করে এক বুটিকে নিয়ে গিয়েছিল, কিনে দিয়েছিল হিজাবের রাজ্য।
একটা-দুটো নয়—বুটিকে থাকা সব কালারের সব মডেলের হিজাব।তখন শিশির একরকম জেদ করেছিল—হিজাব সে পরবে না।কিন্তু সেই জেদ শেষমেষ গলতে বাধ্য হয়েছিল নাহিয়ানের মিষ্টি ধমকের কাছে।সেদিনই প্রথম, শিশির বাইকে করে ঘুরে বেড়িয়েছিল ঢাকা শহরের অলিগলি—
খোলা বাতাসে উড়ছিল চুল,
আর মনের গোপনে জমে উঠছিল অচেনা এক অনুভব।
সেই স্মৃতির ছায়া এসে ছুঁয়ে যায় শিশিরের মুখে।
ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক অদ্ভুত সুন্দর চাপা মুচকি হাসি।
তারপর নেভি ব্লু রঙের হিজাবটা হাতে তুলে নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে ফিরে এসে হিজাবটা গুছিয়ে বাঁধতে শুরু করে সে।
-----
প্রায় এক সপ্তাহ পর কলেজে প্রবেশ করল ফারিন।
তবে কলেজে ঢুকেই বাধল এক বিপত্তি।
আর মাত্র দুই দিন পরেই কলেজে বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।আর সেখানে একটি রবীন্দ্রসংগীতের ডুয়েট পারফর্মেন্সে ফিমেল সিঙ্গার হিসেবে রাখা হয়েছে তাকে।
অথচ সে নিজে কিছুই জানত না!আর বিষয়টা এসেছে সরাসরি প্রিন্সিপাল স্যারের নির্দেশে।
প্রিন্সিপাল স্যার ফারিনের বাবার পুরনো বন্ধু—তাই তাকে বরাবরই একটু বাড়তি স্নেহ দিয়ে থাকেন।
এমনকি প্রথমদিকে তাকে নিজের বাসায় থাকার সুযোগটাও দিয়েছিলেন।রবর্তীতে কলেজ আর টিউশনির দূরত্বের কথা ভেবে নিজস্ব গাড়ির ব্যবস্থাও করতে চেয়েছিলেন, যদিও সেটা ফারিন গ্রহণ করেনি।
তাই পরে তার থাকার জন্য আলাদা বাসার ব্যবস্থা করে দেন।এই সব কিছুর জন্য প্রিন্সিপাল স্যারের প্রতি ছিল অশেষ শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা।তাই তার কথা অমান্য করা মানে শুধু স্যারের অসম্মান নয়, নিজেকে অকৃতজ্ঞ প্রমাণ করাও।তাই আর কিছুই করার নেই ফারিনের।শেষমেশ চুপচাপ মেনে নিতে হয় ফারিনকে।ক্লাস শেষে ফারিন আর নেহা কলেজ ক্যাম্পাস থেকে বের হচ্ছিল।হঠাৎ নেহা ফারিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তাহলে কি সিদ্ধান্ত নিলি? পারফর্ম করবি?
দেখ, তুই তো বেশ কিছুদিন অসুস্থ ছিলি।
একটু প্র্যাকটিসও করিসনি।
এভাবে তিন দিনে কি আদৌ সম্ভব?”
ফারিন সেদিকে তাকিয়ে বলে,
— “কি আর করবো বল তো? প্রিন্সিপাল স্যার তো আমাকে অনেক স্নেহ করেন, জানিসই।
উনি তো নিজে নিজের বাসায় থাকতে দিয়েছিলেন।
টিউশনি দূর হয়ে যাচ্ছে দেখে নিজের গাড়ির ব্যবস্থাও করতে চেয়েছিলেন, যদিও আমি নিইনি।
পরবর্তীতে আমার জন্য আলাদা বাসা ঠিক করে দিয়েছেন।
তাহলে এখন উনার কথার অবাধ্য হওয়া মানে তো নিজেকে অকৃতজ্ঞ প্রমাণ করা, তাই না?”
তার কথা শুনে নেহা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলে,
— “সেটা ঠিক, কিন্তু তুই তো অসুস্থ ছিলি? এর আগে যারা এই পারফরম্যান্সটা করত, তারা অনেক আগে থেকেই প্র্যাকটিস করত শুনেছি। সেখানে তুই তো গান গাওয়া ছেড়ে দিয়েছিস অনেক আগেই। তার ওপর আবার প্র্যাকটিস ছাড়া পারবি কি?”
— “পারতেই তো হবেই”।জানি, অন্য বারের মতো এবার হয়তো খুব সুন্দর হবে না, কিন্তু চেষ্টা তো করতে পারি।
তুই শুধু বল, আমার সাথে মেল সিঙ্গারটা কে?”
— “সেটা তো জানিনা। হবে হয়তো কোনো সিনিয়র, অথবা আমাদের ক্লাসমেট।কিন্তু ক্লাসমেট হলে তো জানতাম।”
নেহার এমন কথা শুনে ফারিন ছোট্ট করে বলে,
— “ওহ।”
তখনই পিছন থেকে ফারিনের মাথায় জোরে একটা থাপ্পড় বসায় ইমন।
ফারিন মাথায় এমন আঘাত পেয়ে হাত রেখে পিছনে তাকায়—দেখে, ইমন তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে।
ইমনের এমন হঠাৎ থাপ্পড়ে সে কটমট করে তাকিয়ে বলে,
— “তোকে কতবার বলেছি, আমার মাথায় থাপ্পড় দিবি না!তোর কারণেই,আমার মাথায় ব্যথার সমস্যা হয়েছে !”
ইমন সেদিকে তাকিয়ে দুষ্টু হেসে বলে,
— “হাহ্, শুনলাম তোর শরীর অসুস্থ হলে নাকি কারো মনে ব্যথা হয়!এইজন্যই তো যে কিনা কারো খোঁজখবর রাখে না,সে-ই আবার সামান্য জ্বরে পড়লেও তোকে দেখতে যায়!
বাব্বা...!”
ইমনের কথায় অবাক হয়ে ফারিন বলে,
— “মানে…??”
ইমন ভ্রু কুঁচকে বলে,
— “নাটক কম কর, পিও।
নেহা আমাকে সবই বলেছে।
শুনলাম, আমাদের নির্ঝর স্যার—মানে, তোর হিটলার—নাকি তোকে দেখতে গিয়েছিল!”
ফারিন এক ঝলক নেহার দিকে তাকায়।নেহা তখনও মুচকি মুচকি হাসছে।তারপর ইমনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “আরে, সেরকম কিছুই না।
উনি শুধু ওনার গণিতের টেস্টের কথা বলতে গিয়েছিলেন।
এইজন্যই তো আজকে আসলাম, না হলে কে আসতো?”
— “ও ওওও… তার মানে এই জন্যই আপনি অসুস্থতা সত্ত্বেও আজ টেস্ট দিতে এসেছেন!”
— “মেজাজ গরম করা কথা বলিস না ইমন।
সেরকম কোনো কথা না।
আজকে শরীরটা ভালো লাগছিল, এইজন্য এসেছি।
না হলে আসতাম না—সেটা গণিতের টেস্টই হোক, আর আদার্স সাবজেক্টের।”
ইমন সেদিকে তাকিয়ে দুষ্টু হাসির ঝলক টেনে বলল,
— “হ্যাঁ, সেটা তো ভালো করেই জানি।
আদার্স সাবজেক্টে তো আর নির্ঝর স্যারের মতো স্মার্ট, হ্যান্ডসাম স্যার নেই।ওগুলোর সময় তুই ঠিকমতো আসতিস কিনা, তা-ও সন্দেহ আছে!
আফটার অল, নির্ঝর স্যার তো পুরো কলেজের মেয়েদের ক্রাশ!তার ক্লাস আর টেস্ট কেউ মিস দেয় নাকি?”
ফারিন এবার ইমনের দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— “একদম উল্টাপাল্টা কথা বলবি না!
আর ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন,
উনি আর সবার ক্রাশ হলে কী হবে, আমার কাছে উনি একজন নাক-উঁচু, গম্ভীর হিটলার!যার রক্তে পড়ে আছে হিটলারগিরি!মনে হয় হিটলারেরই কোনো দূরসম্পর্কের ভাই!”
ফারিনের এমন কথায় নেহা আর ইমন দুজনেই হেসে উঠল।
তারপর নেহা তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
— “তোরা কি এখানে দাঁড়িয়েই এসব বলবি, নাকি বাসায় যাবি?
আর ফারিন, তোর না প্রোগ্রাম আছে?
প্র্যাকটিস করবি না? চল, এখনই বাসায় চল!”
ফারিন মুখ ভার করে হাঁটা ধরল, আর পেছন পেছন হাসতে হাসতে এগিয়ে চলল ইমন আর নেহা।
অন্যদিকে, কলেজ ভবনের দ্বিতীয় তলার করিডোরে দাঁড়িয়ে, পুরোটা দৃশ্য লক্ষ্য করছিল নির্ঝর।
তার চোখে ফুটে উঠেছিল এক অদ্ভুত রকমের হাসি—নিঃশব্দ, নরম অথচ ব্যাখ্যাতীত।
নির্ঝর নিজেও বুঝলো না সে কেন এমন হাসল।
তবে এটা ঠিকই বুঝল—সে আর আগের মতো নেই।
হয়তো... ভেতরে ভেতরে কিছু একটা পরিবর্তন হচ্ছে।
চলবে...????#মাঝরাতের_রোদ্দুর
#পর্ব ২২ (শেষ অংশ)
#নওরিন_কবির_তিশা
রেডি হয়ে নিচে নামতেই শিশির দেখতে পেল, ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আছেন তার বাবা-মা ও ফুফু। ফুফুর সামনে পড়ার কোনো ইচ্ছে নেই শিশিরের। তাই পিছন দিয়ে নিঃশব্দে চলে যাচ্ছিল সে। কিন্তু দরজার কাছাকাছি যেতেই বাবার গলা ভেসে এলো,,
— “কোথায় যাচ্ছিস, মামনি?”
শিশির পিছন ফিরে কিছু বলার আগেই ফুফু, শিরিন শাহ, বললেন তীক্ষ্ণ কণ্ঠে—
— “ওকে কিছু বলছিহ কেন, সিকদার?দেখছিস না, আমার সাথে কথা না বলার জন্যই নিঃশব্দে পিছন দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে!”
শিশির তার স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,
— “আমি কেন কথা বলতে চাইবো না, ফুপ্পি?তুমিই তো বরং আমার সঙ্গে কথা বলো না!”
শিশিরের এই সোজাসাপ্টা কথায় শিরিন শাহ মুখ গোমড়া করে বললেন,
— “দেখেছো? মেয়ের মুখের কথা?বড়দের সম্মান দিতে জানে না—উল্টো মুখের ওপর কথা বলে।এই জন্যই রোদেলাকে বলি, মেয়েকে এত আস্কারা দিও না!”
রোদেলা জামান নরম গলায় বললেন,
— “আপা, ও একটু এরকমই…”
তারপর মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “এটা কী, নুয়া?তুমি ফুপ্পির সঙ্গে কথা না বলে বেরিয়ে যাচ্ছিলে কেন?আর এই অসময়ে কোথায় যাচ্ছ?”
শিশিরের কিছু বলার আগেই ফুফু আবারও বললেন,
— “ও একটু ওইরকম মানে?কি বোঝাতে চাইছো তুমি, রোদেলা?বড়দের সম্মান করবে না? তাই তো বলেছিলাম, আমার ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দাও—একেবারে শাসন করে ঠিক করে দেব!”
রোদেলা জামান এবার সামান্য গম্ভীর হয়ে বললেন,
— “না আপা, আমার মেয়েকে শাসন করতে হলে আমি নিজেই পারি।আর সবচেয়ে বড় কথা, আমার মেয়ে বড়দের ঠিকই সম্মান করে।”
শিরিন শাহ এবার একটু চটেই বলে উঠলেন,
— “মানে তুমি কী বোঝাতে চাইছো রোদেলা? এই তোমার মেয়ের সম্মানের নমুনা?”
এই তীব্র মুহূর্তের মাঝে সিকদার শাহ শান্ত গলায় বললেন,
— “তোমরা এখন নিজেদের মধ্যে ঝগড়া শুরু করবা নাকি?আমি তো শুধু জানতে চাইলাম, নুয়া কোথায় যাচ্ছে—তাকে অন্তত দুটো কথা বলতে দাও।”
বাবার কণ্ঠে হালকা অনুযোগ শুনে শিশির ধীরে বলল,
— “বাবা-মা, আমি নওরিফা আন্টির বাসায় যাচ্ছি।সকালে আমার কিছু জরুরি জিনিস নেওয়ার ছিল, তাই এসেছিলাম।এখন আমাকে যেতে হবে, আন্টি অনেক অসুস্থ।”
শিশিরের কথা শুনে সিকদার শাহ মাথা নেড়ে বললেন,
— “আচ্ছা মা, তুমি যাও।”
তারপর আনোয়ার সাহেবকে ডাকলেন,
— “আনোয়ার, তুমি মামণিকে নওরিফাদের বাসায় পৌঁছে দাও।আর সাবধানে যেও।”
আনোয়ার সাহেব সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মাথা নেড়ে বললেন,
— “আচ্ছা ভাই, আমি মামণিকে নিরাপদেই পৌঁছে দেব।”
আনোয়ার সাহেব বেরিয়ে গেলেন।শিশিরও তার বাবা-মাকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে যায় দরজা পেরিয়ে।
---
আনায়া.??
একটা পরিচিত কণ্ঠস্বরে আনায়া পিছন ঘুরে দেখল তার ঠিক পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে সাইফ। তাকে দেখে আনায়া বলল,,
কিছু বলবি?
তুই এখানে?
সাইফের এমন কথায় আনায়া মুচকি হেসে বলল,
আরে।আপু এই রোডের একটা মেয়েকে পড়াতো। কিন্তু বিয়ের পর ভাইয়া আপুকে পড়াতে বারণ দিয়েছে।আর মেয়েটার সামনে এসএসসি এক্সাম। এজন্যই আপু আমাকে বলল পড়িয়ে দিয়ে যেতে। তাই আসলাম। কিন্তু তুই এখানে?
একটা ফ্রেন্ডের বাসায় যাচ্ছি। সকাল থেকে কতবার কল দিলাম,ধরল না। তাই।
ওওহ আচ্ছা।
আনায়ার সাথে কথা বলতে বলতে সাইফ সামনের দিকে তাকিয়ে বলল,,
আচ্ছা তাহলে তুই যা ওই তো চলে এসেছে ওর বাসা।
আচ্ছা।
সাইফ মাথা নেড়ে বিদায় নিয়ে চলে গেল।সাইফ চলে যেতেই আনায়া নিজের বাসার পথ ধরল নিঃশব্দে।চারপাশে সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসছিল।রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে উঠছিল একে একে।ঠিক তখনই, পেছন থেকে ভেসে এলো একটানা হর্নের শব্দ।আনায়া একটু পাশে সরে দাঁড়াল।কিন্তু তাতে হর্ন থামল না বরং বেড়েই চলল।আনায়া এবার বিরক্ত গলায় বলল,,
— “আরে, কী সমস্যা আপনার?পাশে তো সরে দাঁড়িয়েছি, তাও এত হর্ন কেন?”
কথাটা বলতে বলতে পিছন ঘুরেতেই আনায়া দেখতে পায় গাড়ির ভেতরে বসে আছে রিদিত।রিদিতকে দেখেই আনায়ার মুখটা মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল।একটাও কথা না বলে, দ্রুত পা চালিয়ে সামনে এগিয়ে গেল সে।অন্যদিকে রিদিত জানালার কাঁচে কনুই রেখে তাকিয়ে থাকল আনায়ার দিকে।তার ঠোঁটে হালকা এক নিঃশব্দ হাসি, চোখে একরাশ বিস্ময় আর মুগ্ধতা।সে মনে মনে বলল,
— “ও আয়নিন!তুমি কতটা বোকা, জানো?
যেখানে আমার মনের সবচেয়ে নিরাপদ দরজায় কেউ কোনোদিন ধাক্কা দেয়নি—সেখানে তুমি নিঃশব্দে এসে দখল নিয়েছো।আর এখন ভাবছো, ওই ছোট ছোট পা টেনে আমার দৃষ্টির আড়ালে চলে যাবে?হাহ… এমন ভাবনা ভাবাই তোমার সবচেয়ে বড় ভুল।”
রিদিত গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট দিল।আনায়া যত দ্রুত হাঁটছিল, ততটাই দ্রুত রিদিত তাকে ছুঁয়ে ফেলল।গাড়ি নিয়ে একদম তার সামনে এসে দাঁড়াল।গাড়ির হেডলাইটে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা আনায়ার মুখে পড়ল হালকা আলো।তাতে তার চোখদুটো আরও বেশি গভীর দেখাল রিদিতের চোখে।আনায়া দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে বলল,
— “আবারও?কি সমস্যা আপনার??”
রিদিত জানালার কাঁচ নামিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল তার চোখে। তারপর এক নিঃশ্বাসে বলল,
— “গাড়িতে উঠো আয়নিন।সব কথা গাড়ির ভেতরেই হবে।রাস্তার উপর এই সিনক্রিয়েট করো না প্লিজ।”
রিদিতের এমন কথা শুনে আনায়া এবার একটু চটে গিয়ে বলল,
— “আমি কেন আপনার গাড়িতে উঠতে যাব?আর রাস্তার উপর সিনক্রিয়েট আমি করছি নাকি আপনি করছেন?এক্ষুনি আমার পথ ছাড়ুন, না হলে কিন্তু আমি চিৎকার করতে বাধ্য হবো!”
আনায়ার এমন হুমকিতে রিদিত ঠোঁটে মুচকি হাসি টেনে জানালার কাঁচ নামাল।চোখ নামিয়ে নয়, চোখে চোখ রেখে বলল—
— “চিৎকার?আহা, কী সুন্দর হবে জানো?
তুমি চিৎকার করবে, সবাই ভাববে আমি তোমার পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছি,তোমাকে বিরক্ত করছি… তোমার ক্ষতি করতে চাইছি।তারপর একে একে একশো জন জড়ো হয়ে যাবে… কেউ বিচার চাইবে, কেউবা সমাধান।
আর যদি দেখা যায়… এই ঝগড়া থেকেই তাদের মধ্যে থেকে কেউ বলে ফেলল'তোমাদের বিয়ে দিয়ে দিলেই সব মিটে যায়।’ উফফফ তাহলেতো মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। আমার তো লাভই, তাই না?চিৎকার করো না প্লিজ…
কারণ আমি এমন সুযোগগুলো হাতছাড়া করতে পারি না।”
রিদিতের এমন কথায় আনায়ার চোখ রাগে জ্বলতে লাগল।
চোয়াল শক্ত করে বলল,
— “এসব বাজে কথা বন্ধ করুন।আর আমার পথ থেকে সরে যান।”
— “যদি না সরি, তাহলে?”
আনায়া রাগে আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে না থেকে রাস্তার অন্য দিক ঘুরে যেতে চাইল।কিন্তু রিদিত যেন আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল—সে দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে আনায়ার সামনে এসে তার কব্জি চেপে ধরল।রিদিতের এমন আচমকা স্পর্শে ফুস করে উঠে আনায়া। আনায়া ফুস করে ওঠে।নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে ধস্তাধস্তি শুরু করে সে ,
এক ঝাঁকুনিতে মুক্ত করতে চায় নিজের হাত—কিন্তু রিদিতের শৈল্পিক শরীরের মজবুত গ্রিপের কাছে।তার ক্ষীণ দেহ যেন এক অবুঝ প্রতিবাদ মাত্র।
রিদিত স্থির দৃষ্টিতে তার চোখে তাকিয়ে নরম কণ্ঠে বলল,,,
—"চেয়েছিলাম তুমি ভালই ভালই নিজে থেকেই গাড়িতে উঠ। কিন্তু যেহেতু উঠলে না তাই এখন আমার শক্তির প্রয়োগ করতেই হচ্ছে।"
রিদিত এরপর আর কোনো কথা না বলে,প্রায় জোর করেই আনায়াকে গাড়ির ভেতরে বসিয়ে দেয়।আনায়া তখনও হাঁসফাঁস করছে,নিজেকে ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টায় লড়ছে নিজের সত্তার সঙ্গেই।কিন্তু রিদিতের কঠিন অথচ স্থির প্রতিক্রিয়ায় এক সময় তার সব আপত্তি যেন থেমে যায়।অবশেষে সে নিজে থেকেই শান্ত হয়ে যায়।রিদিত তার দিকে তাকায়,মুখে খেলে যায় এক অদ্ভুত চাপা হাসি। তারপর সিটবেল্ট লাগিয়ে গাড়ি স্টার্ট দেয় সে।
----
নরম মৃদু আলোয় সাজানো অভিজাত রেস্টুরেন্টের এক কোণে, জানালার পাশে রাখা টেবিলটায় মুখোমুখি বসে আছে রিদিত আর আনায়া।চারপাশে অল্প আলো, ঝকঝকে পরিবেশ, ক্লাসিক মিউজিক বাজছে মৃদুস্বরে—কিন্তু টেবিলের উপর যেন জমে আছে এক অদৃশ্য উত্তেজনা।
রিদিত ধীর কন্ঠে বলে,
— “আমি তোমাকে জোর করে গাড়িতে তুলিনি, আনায়া।
আমি শুধু তোমার থেকে একান্তে একটু সময় চেয়েছি কারণ... আমি চাই, তুমি জানো—সব পুরুষ একই রকম হয় না। আর সেরকমই আমিও ওই ছেলের মতো নই।
আমি তোমাকে কষ্ট দেবার জন্য এখানে আসিনি।আমি চাই তুমি বিশ্বাস করো—আমাকে।”
রিদিতের কণ্ঠে এক অনুনয় ভরা দৃঢ়তা। আনায়া এক ঝলক তার দিকে তাকায়। সে বুঝতে পারে তার অতীতের সব কথাই শিশির রিদিতকে বলেছে। সে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে,তারপর একটু থেমে, গলা খানিকটা কাঁপিয়ে ধীরে বলে,
— “বিশ্বাস...?”
একটা চাপা হাসি ঝরে তার ঠোঁটের কোণে।
— “আমি তাকেও বিশ্বাস করেছিলাম... অন্ধের মতো।
জানেন?আমি এতটাই বিশ্বাস করেছিলাম যে চোখ বুজেও তার পাশে হাঁটতে প্রস্তুত ছিলাম।কিন্তু তার ফল...আমি একা না, আমার আপুও ভোগ করেছে।আমার জন্য আমার আপুর বিয়ে পর্যন্ত ভেঙে গিয়েছিল সেদিন।”
আনায়ার গলা কেঁপে উঠল।
কথা থামিয়ে সে একবার চোখ বন্ধ করল, যেন কষ্টের ঢেউগুলো আটকাতে চায়।রিদিত নীরবে তাকিয়ে রইল তার দিকে।তাকে থামানোর মতো কোনো শব্দ খুঁজে পেল না সে।শুধু অনুভব করল—এই মেয়েটা কতটা ভেঙে গেছে ভেতরে ভেতরে।আনায়া ধীরে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল রিদিতের চোখের দিকে।তার দৃষ্টিতে ছিল না কোনো অভিমান, ছিল কেবল নির্মম এক বাস্তবতা।
— “তাই বলছি...
আমার পক্ষে আর কাউকে বিশ্বাস করা সম্ভব নয়।আর
এই জীবনে তো নয়ই, কখনোই নয়।তাই দয়া করে আমার পিছনে ঘুরে নিজের মূল্যবান সময় নষ্ট করবেন না।”
কথাগুলো বলার সময় আনায়ার কণ্ঠে ছিল না কোনো রাগ,ছিল শুধুই গুমরে ওঠা এক নিঃশব্দ কান্না।এক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো টেবিলের উপর।চারপাশের মৃদু হাসির শব্দ, মিউজিক, আলো...সবই যেন দূরে কোথাও মিলিয়ে গেল।রিদিত তাকিয়ে রইল আনায়ার মুখের দিকে।
চোখের গভীরে জমে থাকা অভিমান আর কষ্টে শক্ত হয়ে যাওয়া মেয়েটাকে দেখে মনে হলো,সে এই মুহূর্তে সমস্ত পৃথিবী দিয়ে হলেও তার ব্যথা মুছে দিতে পারলে হয়তো তার শান্তি লাগতো।কিন্তু আনায়া আর একটা মুহূর্তও বসে থাকল না।চুপচাপ উঠে দাঁড়িয়ে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে খুব নরম গলায় বলল,
— “আর দয়া করে...কখনো আমাকে আর যাই বলুন বিশ্বাস করতে বলবেন না।কারণ, আমি আর পারি না।”
এইটুকু বলে আনায়া ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটা শুরু করল।
নীরব পায়ে, অভিমানে ঢাকা মাথা উঁচু করে।রিদিত একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়া পথের দিকে—
চোখে একরাশ অপরাধবোধ, অসমাপ্ত কথা, আর অদৃশ্য প্রতিজ্ঞার রেশ নিয়ে।রেস্টুরেন্টের আলো মৃদু নরম রঙে জ্বলছিল।কিন্তু রিদিতের ভেতরটা ডুবে যাচ্ছিল...এক অপূরণীয় শূন্যতায়।নিজের মনে ফিসফিস করে রিদিত বলল—
“তোমার অবিশ্বাসের পাহাড় ভেঙ্গে...
আমার ভালবাসার নরম ছোঁয়ায়..একদিন ঠিকই আবদ্ধ করব তোমায়। শুধু দরকার কিছু সময়ের। যা আমি পার করবো ধৈর্যের সাথে হোক তা এক বছর কিংবা হাজার বছর।"
----
রাত প্রায় দশটা।নওরিফা খানমকে রাতের খাবার খাইয়ে ওষুধ দিয়ে নিজের রুমে ঘুমাতে পাঠিয়ে দিয়েছে শিশির।
কিন্তু...তার চোখে ঘুম নেই।একটা প্রশ্ন বারবার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে,কে সেই 'সুহাসিনী'?চিন্তার জটিলতায় সে আর বসে থাকতে পারে না।রুম থেকে বেরিয়ে সরাসরি নাহিয়ানের রুমের উদ্দেশ্যে হাঁটা দেয়।
নাহিয়ানের রুমের সামনে এসে থমকে দাঁড়ায় শিশির।মনে পড়ে যায় প্রথমবারের সেই দিনের কথা,যেদিন এই রুমে নাহিয়ানের কাছ থেকে নিজের গিফট নিতে এসেছিল সে।
স্মৃতির গলিতে পা রাখতেই ঠোঁটের কোণে মিষ্টি এক হাসি খেলে যায় তার।আলতো হাতে দরজায় ধাক্কা দেয়।
দরজাটা শব্দ না করেই খুলে যায়, যেন আগেই অনুমতি নিয়ে রেখেছে।শিশির দ্রুত রুমে ঢুকে, সাবধানে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয়।
রুমে ঢুকেই প্রথমে তার চোখে পড়ে সেই লম্বা কাঠের ড্রেসিং টেবিল—যেটা একেবারে নাহিয়ানের জন্য বিশেষভাবে তৈরি।আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এক ঝলক নিজের প্রতিবিম্ব দেখে নেয় সে।তারপর চুপচাপ এগিয়ে যায় বিশাল আলমারির সামনে।
নওরিফার রুম থেকে অনেক কষ্টে, অনেকটা গোপনে এনে রাখা চাবির গোছা হাতে নেয় শিশির।একটা একটা করে আলমারির কাবার্ড খুলতে থাকে।
কিন্তু...
কোথাও মেলে না কোনো খোঁজ।কোথাও নেই সেই কাঙ্ক্ষিত লাগেজের চিহ্ন।শেষমেশ যখন শেষ কাবার্ডের কাছে পৌঁছায়,তখনই সে দেখে—এই কাবার্ডের জন্য কোনও চাবিই নেই ওই গোছায়।শিশির বুঝে ফেলে,
এই কাবার্ডের চাবি শুধু নাহিয়ান চৌধুরীর কাছেই আছে।আর তার পরিকল্পনা ব্যর্থ। এটা ভেবেই মুখ মলিন হয়ে যায় শিশিরের। কিন্তু পরক্ষণেই ঠোঁটে এক বাঁকা হাসি টেনে সে এসে মনে মনে বলে,,
— "কি ভেবেছেন নাহিয়ান চৌধুরী?
আপনার সুহাসিনীর রহস্য আমি কোনোদিনই জানতে পারবো না?একদিন না একদিন আমি ঠিকই এই রহস্যের দরজা খুলে ফেলবো...আপনি চাইলেও থামাতে পারবেন না আমাকে।"
চলবে...????