#মেহেরুন্নেছা
#শ্যামলী_রহমান
#পর্ব—৯-১০
শেহরাব তোমার সঙ্গে আমার কিছু জুরুরি কথা আছে।"
ও তখন সবে বাহির থেকে কক্ষে ফিরে পানি পান করছিলো তখনই সুলতান আলাউদ্দিন শাহ এসে দাঁড়ালো। শেহরাব পানি খাওয়া শেষ করে জানতে চাইলো,
“ বলুন? কিছু হয়েছে নাকি?"
তার কন্ঠে শঙ্কা কিছুটা। আলাউদ্দিন হেসে অভয় দিলেন ভয়ের কিছু নেই বুঝালেন। তার পর বললেন,
“ আমি মেহেরুন্নেছার নিকাহের বিষয়ে কথা বলতে এসেছি।" এতটুকু শুনেই শেহরাব স্থির হয়ে গেলো, একটু আগেই পানি পান করেছে অথচ গলা শুকিয়ে এলো। বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। আলাউদ্দিন শাহ এর কথায় হাসার চেষ্টা করলো সে। বলল,
“এ তো সুখবর। নিকাহ কবে হচ্ছে?"
“ এটা তো তুমি বলবে।"
শেহরাব চমকে উঠলো। বিস্ময়কর দৃষ্টি নিয়ে তাকালো। ঠিক বুঝতে পারলো না কথার অর্থ।
“ মানে?"
“ আমি চাই মেহেরুন্নেছার নিকাহ তোমার সঙ্গে দিতে। তোমার চেয়ে যোগ্য আর কেউ হবে না।
তুমি কি মেহেরুন্নেছা কে নিকাহ করবে?"
বিস্ময়ের উপর যদি কিছু থাকে তবে সেটা এ মুহূর্তে শেহরাব মাঝে দেখা যাচ্ছে। অবাক হয়ে কেবল তাকিয়ে আছে। সে কি ভুল শুনছে? অসম্ভব! কিন্তু শুনছে তো নিজের কানেই।
“আমি? সাধারণ এক সৈনিকের সঙ্গে শাহজাদীর নিকাহ? তিনি কি মানবেন? আপনি কি সজ্ঞানে বলছেন?"
আলাউদ্দিন শাহ এগিয়ে এলেন। সামনাসামনি দাঁড়িয়ে বাহবা দিয়ে বলল,
“ তুমি সাধারণ হলেও অসাধারণ কাজ করেছো ইতিমধ্যেই। আমার কন্যার জন্য তুমিই শ্রেষ্ঠ হবে।
এবার বলো তুমি কি রাজি? তবে তোমার মাতা, মামা আর কে আছে তাদের খবর পাঠাও। আলোচনায় বসে শিগগিরই নিকাহ সম্পূর্ণ করতে চাই।"
শেহরাবের বিস্ময়তা কাটছে না যেন। কি উত্তর দিবে ভেবে পাচ্ছে না। কথা বেরোচ্ছে না । তবুও ধীর কন্ঠে বলল,
“ আপনার কন্যা জানে? সে রাজি হয়েছে?"
“ আমার কন্যা জানে তার পিতা কখনো খারাপ সিদ্ধান্ত নিবে না। আর সে নিজে অমত করেনি, বলেছে আপনার সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই আমার জন্য ভালো হবে।"
“তাহলে আমার কোনো আপত্তি নেই। শুধু একবার শাহজাদীর সঙ্গে কথা বলতে চাই তার পর আমার আম্মাজান কে নিয়ে আসবো না-হয়।"
“ বেশ! কথা বলে নিও আজই।"
এই বলে আলাউদ্দিন শাহ বেরিয়ে গেলেন। শেহরাব বসে পড়লো পালঙ্কে। ভাবছে কিছু একটা। আনন্দ হওয়ার কথা কিন্তু ভয় হচ্ছে তার।
__________
“ দেখলে তোমার ভাইজান কি করলো? মোহসীন কে রেখে সামান্য এক সৈনিকের সঙ্গে নিকাহে রাজি হলো। না জানি কোন ঘরের সন্তান। সে হবে শাহজাদীর সুলতান। ভাবতে পারছো কি হবে?"
স্ত্রী'র কথায় রহমত শাহ ভাবতে লাগলো। কোনো কথা না বলে পায়চারি করছে। কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না আলাউদ্দিন শাহ তার পুত্র কে রেখে অন্য কাউকে মেহেরুন্নেছার যোগ্য মনে করছে।
“শোনো আমাকে একটা কাজে বেরোতে হবে।
যা হবে তা নিয়ে কাউকে কিছু বলবে না, ভাইজানের সামনে তো একেবারেই নয়ই।"
রহমত শাহ এবার মোহসীনের কাছে গেলো। কিছু একটা বলতেই ও বলল,
“এটা একান্তই বড় আব্বাজানের সিদ্ধান্ত আব্বাজান। এখানে আপনার,আমার হস্তক্ষেপ করার কিছু নেই। মেহেরুন্নেছা আমাকে তার ভাইজানের আগে সখা ভাবে।"
“ আব্বাজান আপনাকে বড় আব্বাজান ডাকছেন।"
দরজার সামনে লতিফা দাঁড়িয়ে আছে। রহমত শাহ ঘুরে তাকালো। শুনতে পেয়েছে কিনা তা নিয়ে সামান্য ভয় পেলো তবে তা প্রকাশ করলো না। মোহসীন তাকে আগেই খেয়াল করেছে।
“ যাচ্ছি যাও।"
রহমত শাহ এর ধমকানো কন্ঠে লতিফা কেঁপে উঠলো। তড়িঘড়ি করে সেখানে থেকে চলে গেলো।
_________
পাশাপাশি দুজন নিরবে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাসাদের ছাঁদে তাদের অবস্থান বর্তমানে। শেহরাব তাকিয়ে আছে প্রাসাদের বাহিরে থাকা বড় বট গাছটার পানে। মেহেরুন্নেছা দৃষ্টি কখনো শেহরাব কখনো বা আকাশের দিকে নিবন্ধ। নিরবতা ভেঙে শেহরাবই বলে উঠলো,
“ আপনার আব্বাজান কি বলেছেন আপনি শুনেছেন?"
মেহেরুন্নেছা অজানার ভান করলো। বলল,
“ না তো। আপনি কি শোনার কথা বলছেন? আব্বাজান তো আমাকে অনেক কিছুই বলে।"
“ মজা করছেন?"
“ আমাকে সেরকম মনে হয়?"
“ অনেককেই অনেক কিছু মনে হয় না।"
মেহেরুন্নেছা আর কথা বাড়ালো না। বলল,
“ হ্যাঁ শুনেছি।"
শেহরাব এবার তাকালো মেহেরুন্নেছার দিকে। সে তাকিয়েই ছিলো আগে থেকে। দুজনের দৃষ্টি মিলিত হলো। মেহেরুন্নেছা দৃষ্টি নিচু করে আবার তাকালো। তখনো শেহরাব একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কি ভাবছে এতো? জিজ্ঞেস করলো,
“ কি দেখছেন এভাবে? যেভাবে চেয়ে আছেন মনে হচ্ছে ঘোরে আছেন।"
“মদ্য পানের চেয়েও তীব্র নেশা,
আপনার দু'চোখে মেহেরুন্নেছা।
"নেশা হারাম আপনি কি তা জানেন না?"
“হারাম বলেই তো হালাল ভাবে ওই দু-চোখে দৃষ্টি রাখার অনুমতি চাইছি।"
“অনুমতি পাওয়া এতো সহজ না।"
“কি করলে অনুমতি মিলবে?"
" নিকাহ।"
“ অনুমতি না মিললে নিকাহ হবে কি করে?"
“ নিকাহের অনুমতি তো আব্বাজান দিয়ে দিয়েছেন।"
“ তাহলে বলছেন আপনার আমার হতে অমত নেই?"
মেহেরুন্নেছা কথা বলার সময় অন্য দিকে চেয়ে ছিলো। এবার একদম শেহরাবের চোখের দিকে তাকালো। সে তারই দিকে চেয়ে ছিলো। মেহেরুন্নেছা তাকাতেই দৃষ্টি নামিয়ে দিলো।
" মত না থাকলে নিশ্চয়ই দ্বিমত করতাম।"
“ আপনি তাহলে এবার মহলে যান।"
“কেন? ভালো লাগছে না আমার পাশে থাকতে?"
শেহরাব আবার তাকালো তার পানে। অদ্ভুত ভালোবাসা ছেয়ে গেলো হৃদয়ে। মেহেরুন্নেছার স্থির দৃষ্টির দিকে চেয়ে হেসে উত্তর দিলো,
“ হারাম নেশা আর ধরাতে চাই না। আপনি এভাবে চেয়ে থাকলে আমার হৃদয়ে তোলপাড় শুরু হচ্ছে শাহজাদী। কখন আবার মরে যাই বলা তো যায় না।"
মেহেরুন্নেছা নিঃশব্দে হাসলো। শেহরাবের দৃষ্টিগোচর হলো না সেই মৃদু হৃদয় কাড়া মুগ্ধতার হাসি। ছাঁদের কিনারা থেকে উঠে পড়লো মেহেরুন্নেছা। চলে আসার জন্য পা বাড়াতেই ওড়নায় টান পেলো। চমকে উঠলো সে।
“ আমি ধরিনি। যেদিন আপনি আমার হবেন সেদিন এই আঁচলে আমার হাত বাঁধবো।"
মেহেরুন্নেছা পিছনে ফিরে কাঁটাযুক্ত ফুল গাছ থেকে নিজের ওড়না ছাড়িয়ে নিলো। কিছুটা লজ্জাও পেলো শেহরাবের কথাতে। সে চলে যেতেই শেহরাব ও কিছুক্ষণ পর নেমে আসলো।
__________
পেরিয়ে গেছে চারটে দিন। শেহরাব তার নিজের বাড়ি গিয়েছে। ফিরে আসবে আজ কালকের মধ্যে।
তার পরই আনন্দে ছেঁয়ে যাবে পুরো প্রাসাদ। এই আশায় আছে সকলে।
মেহেরুন্নেছা আর তনুজা কক্ষে বসে গল্প করছিলো। গল্পের মধ্যমনি শেহরাব সিকান্দার।
তনুজা গল্প শেষে উঠে যাওয়ার সময় বলল,
“তুমি ভাগ্যবতী যার কারণে শেহরাব সিকান্দার কে পাচ্ছো। সেও ভাগ্যবান যার কারণে তোমাকে পাচ্ছে।"
মেহেরুন্নেছা নিঃশব্দে হাসলো। আসলেই ভাগ্যবতী? অবশ্যই সবদিক দিয়েই। পিতা,মাতা এমনকি আশে পাশের সকলের সম্মান ভালোবাসা পাওয়া শুধু ভাগ্যের নয় সৌভাগ্যের। শেহরাব সিকান্দার জীবনে হুট করে আসা জলন্ত মশাল। যে আঁধারে আলো বিলিয়ে দিয়েছে। যার হৃদয় হিংসাত্মক থেকে অনুভূতি প্রবণ হয়ে উঠেছে।
_______
রাতে ঘুমানোর আগে মেহেরুন্নেছা জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। হিমেল হওয়ায় কুয়াশা প্রবেশ করলো কক্ষে। গায়ের চাদর চেপে ধরলো সে।
কেন যেন মনটা আজ বিষন্ন। হুট করে শেহরাবের কথা মনে পড়ছে। আজও আসলো না ফিরে। মনে হচ্ছে কতদিন দেখে না তাকে। বাগানে,অস্ত্রাগারে,লড়াই করতে প্রায় নিত্যদিনই দেখতে পেতো। অনুভূতি কিছু একটা আছে তবে তার নাম অজানা। শুধু এতটুকু জানে মানুষটা তার মন জয় করতে পেরেছে।
তার পর মনে পড়লো চারদিন আগের কথা যেদিন শেহরাব চলে যায়। যাওয়ার আগে সিংহদ্বারের সামনে চোখের দিকে না তাকিয়ে শুধু বলেছিলো,
“ বিদায়।"
“ আলবিদা।"
শেষ কথা এতটুকুই ছিলো।
__________
দিন,সপ্তাহ, মাস পরিয়ে গেলেও শেহরাবের আর ফিরে আসেনি, খোঁজ মিলেনি, দেখা হয়নি কারো সঙ্গে।
যখন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলো তখন প্রহরী পাঠানো হয়েছিলো শেহরাবের গ্রামে। কিন্তু ওখানে গিয়ে শোনে কেউ নেই বাড়িতে। আলাউদ্দিন শাহ চিন্তায় পড়ে যায়। মেহেরুন্নেছা র্নিলিপ্ত ছিলো। তার পর দশ দিনের সুলতান নিজেও যায় সেখানে। সিমান্তের শেষ গ্রামে কেবল কয়েকটা পরিবারের বসবাস। তিনি গিয়েও খোঁজ পাননি। সেখানের সকলের কাছে খোঁজ করলে কেউ বলতে পারে না শেহরাব এবং তার মাতা,মামা-মামি, নানী কোথায় আছেন। তারা নাকি গত কয়েক মাস থেকে শেহরাব কে দেখেনি। তার পরিবারের সকলে নাকি আটদিন থেকে নেই বাড়িতে।
এর পর আলাউদ্দিন শাহ হতাশ হয়ে ফিরে আসে প্রাসাদে। মেহেরুন্নেছা এইবার অনেকটা চিন্তিত হলো। ভয় ও পায়। শেহরাবের কিছু হলো না তো? ডাকাত সর্দার জেনে গিয়ে যদি ক্ষতি করে? এতটুকু ভেবে বুক কেঁপে উঠলো। হারানোর ভয় সে দ্বিতীয় পেলো। প্রথম বার পিতাকে হারানোর ভয়, দ্বিতীয় বার প্রিয়জন কে। যার প্রতি কঠোর হৃদয়ে অজান্তে
ভালোবাসার পুষ্প স্ফুটিত হয়েছিলো।
মাস পেরিয়েছে কয়দিন হলো। মেহেরুন্নেছা কিছুটা বিষন্ন থাকে আজকাল। আজও ব্যতিক্রম নয়। বাগানে এলো কতদিন পর। মোহসীন তনুজা কে ডেকে নিয়ে আসলো তার কাছে। একা থাকলে বিষন্নতা বাড়ে বলে। তনুজা মেহেরুন্নেছার হাত ধরলো। বলল,
“ যা হওয়ার তা হবেই। সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা রাখো। তিনি চাইলে একদিন শেহরাব সিকান্দার ফিরবে।"
“ ফিরে আসার হলে এতোদিনে আসতো। মেহেরুন্নেছা তুমি এতো নরম কবে থেকে হলে?
ভুলে যাও যা নেই। এভাবে চললে হবে?"
মোহসীনের কথায় তনুজা বিস্ময় নিয়ে তাকালেও মেহেরুন্নেছা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না।
উঠে পড়লো ঘাসের উপর থেকে। শুধু বলল,
“ কঠোরতার জায়গা অন্যস্থানে, ভালোবাসা থাকেই হৃদয়ের গভীরে, অনুভূতি প্রবণ নরম স্থানে।"
__________
শীত পেরিয়ে বসন্ত এলো। পাতা ঝরলো আবার প্রকৃতি নতুন রূপে সাজলো। ফুলে,ফুলে ভরে উঠলো চারদিক।
রাজ্যে আপাতত কোনো দন্ড নেই। কিছুদিন আগে দুটো বাড়ি থেকে গরু চুরি হয়েছিলো। ওগুলো স্থানীয় কিছু মানুষই করেছিলো অর্থের অভাবে। নেশার কবলে পড়ে।
শাস্তি হিসেবে চাবুকের আঘাত প্রাসাদের সামনে পুষ্কুনি খননের কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলো সুলতান। চাষীদের দুটো গরু সুলতান নিজে কিনে দিয়েছেন আবারো। রাজ্য বেশ শান্ত।
সমস্ত আশা ছেড়ে দিয়ে আলাউদ্দিন শাহ আবারো মেহেরুন্নেছার নিকাহের কথা ভাবতে শুরু করলেন আশে পাশের সকলের প্ররোচনায়। কিন্তু এবার মেহেরুন্নেছা রাজি নয় নিকাহে। কারণ জানতে চাইলে নিশ্চুপ থাকে। চারদিন আগে এক লোক এসেছিলো তার সঙ্গে দেখা করতে। সেটা অবশ্য তনুজাদের মহলে। হুট করে তনুজা এসে তাকে টেনে নিয়ে যায়। গিয়ে দেখে অচেনা একটি মানুষ বসে আছে উঠোনে। আগে কখনো দেখেনি। সে ভাবলো তার সঙ্গে কি দরকার? যার জন্য লুকিয়ে বলতে হবে? সে সময় তনুজার আব্বাজান ছিলো না মহলে শুধু তার আম্মাজান ছিলো। তনুজা বলেছিলো লোকটা মেহেরুন্নেছার গুপ্তচর,ওকে কিছু জানাতে এসেছে। এজন্য আর কোনো প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়নি। মেহেরুন্নেছা এগিয়ে যায় শুনতে, যা তিনি বলতে এসেছেন এখানে ।
অচেনা লোকটার কথা গুলো এখনো কানে বাজছে। মেহেরুন্নেছা স্তদ্ধ হয়ে গেছে পরশু থেকে। সে বিষয়ে কাউকে কিছু বলেনি কেবলমাত্র তনুজা জানে।
সুলতানা ফাহিমা আসলেন। বসলেন কন্যার পাশে। বললেন,
“ নিকাহে রাজি হয়ে যাও। অপেক্ষার সময় ফুরিয়েছে মেহেরুন্নেছা। তোমার আব্বাজান যতটা আশা বেধেছিলো আজ ততটাই নিরাশা। কারো জন্য জীবন থেমে থাকে না তাছাড়া তোমার সঙ্গে তার তো কোনো সম্পর্ক ছিলো না তাই না?"
মেহেরুন্নেছা কেবলই তার আম্মাজানের দিকে তাকালো। উত্তর দিতে পারলো না। আসলেই ছিলো না? মুখে তো কখনো বলেনি কিন্তু হৃদয় তো চিৎকার করে বলে ভালোলাগা,ভালোবাসার জায়গাটুকুতে কেবলমাত্র শেহরাব সিকান্দারের বসবাস।
“ আমাকে তিনদিন সময় দিন আম্মাজান তার পর আমি তোমাদের মনমতো উত্তর জানাবো।"
মেহেরুন্নেছার উত্তরে সুলতানা খুশি হলো।
“ঠিক আছে।"
_________
তখন গভীর রাত্রি। সম্ভবত রাতের তৃতীয় প্রহর চলছে। অন্ধকারে প্রাসাদের পিছনের দিকে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। যার দৃষ্টি প্রাসাদের একটি কক্ষের দিকে। তার হাতদুটো কাঁপছে হঠাৎ। মৃত্যুর ভয় নয়, ভয়ে নয় সত্যের মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে। তখনই কক্ষের জানালা খুলে গেলো। আধারে মানুষটার ছায়া চিনতেও অসুবিধা হলো। খোলা জানালা আবারো বন্ধ হলো। প্রাসাদ থেকে সামান্য দূরে গিয়ে দাঁড়ালো শেহরাব। এদিকটায় প্রহরী নেই বললেই চলে। যারা ছিলো সম্ভবত ঘুমের জন্য ফাঁকি দিয়ে কোথাও শুয়ে আছে।
নিঃশব্দে দুজন হাঁটছে। পাশাপাশি হাঁটার কারণে একে অপরের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। খানিকটা এগিয়ে যাওয়ার পর থেমে গেলো দুজনে। সামনে নদী। সেখানে কতগুলো নৌকা বাঁধা আছে তবে মাঝি নেই। রাত্তিরে এদিকে কেউ আসে না।
শা শা করে বাতাস বইতে শুরু করলো। নিরবতা ভেঙে একজন বলে উঠলো,
“ আপনার ভয় করছে না শত্রুর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। যদি মে*রে ফেলি?"
মেহেরুন্নেছার কথায় শেহরাব তীর্যক হাসলো। বলল,
“ আপনার ভয় করছে না আমার সঙ্গে একা রাতে দেখা করতে আসলেন?"
“ আপনাকে ভয় পেতে হবে এটা কখনো ভাবিনি।"
“ আপনি আমাকে মেরে ফেলবেন এটা আমিও ভাবছি না। মৃত্যুর ভয় আমি করিনা আগেই বলেছি।"
মেহেরুন্নেছা চুপ হয়ে গেলো। দু পা বাড়ালো। আবারো বলল,
“ কেন মিথ্যার আশ্রয় নিলেন?কেন আমায় ঠকালেন?"
“ ঠকাতে আসিনি আমি। মিথ্যার আশ্রয় না নিলে প্রবেশ করা হতো না প্রাসাদে, আর না ভালোবাসা হতো আপনাকে। না আসলেই বোধ-হয় ভালো হতো। আমার অতি কৌতুহল নিজেকেই জ্বালিয়ে দিলো। যার সাহসিকতার কথা শুনে এসেছিলাম দেখতে তারই প্রেমে পড়লাম একপলকে।"
মেহেরুন্নেছা ক্ষোভে বলে উঠলো,
“ সবই মিথ্যে।"
“ শুধু আপনার প্রতি আমার ভালোবাসা ছাড়া।"
“ এতটুকু সত্যি বিশ্বাস করি কি করে? আপনি মানুষটাই মিথ্যে দিয়ে ভরা।"
“ নিজেকে প্রশ্ন করুন।"
“ করা শেষ। আপনি চলে যান আর কখনো আসবেন না সুন্দরগড়ে।" মেহেরুন্নেছার কন্ঠ কাঁপছিলো বলতে। শেহরাব মুঁচকি হাসলো। বলল,
“ক্ষতির উদ্দেশ্যে প্রাসাদে পা রাখিনি। যে কন্যা দাম্ভিকতায় সুলতান আজমির খান এর পুত্রের সঙ্গে নিকাহে রাজি হয় না, যুদ্ধে প্রান্তরে লড়াই করে তাকে দেখার ইচ্ছে জাগেছিলো মনে। তার পর সমস্ত খোঁজ নিয়ে আসি এখানে। আমার নামের সঙ্গে মিলে এমন কাউকে খুঁজে পাই হুট করেই। যেদিন প্রথম আপনাকে পালকির পর্দা সরিয়ে এক মুহূর্তের জন্য মুখটা দেখেছিলাম আমি থমকে গিয়েছিলাম, প্রজাদের সঙ্গে বিনয়ী আচরণ আমাকে মুগ্ধ করলো। এ ছাড়াও অনেকের কাছেই আপনার সুনাম শুনেছিলাম।
সেদিন গভীর রাত ছিলো। উদ্দেশ্য ছিলো রাতের আঁধারে প্রহরীদের সাহায্যে প্রাসাদের ভেতরের খোঁজ নেওয়া। সঙ্গে মুদ্রা ছিলো৷ এই কাজ বড় আব্বাজান দিয়েছিলেন। উনার অন্যায় কাজের ধারে কাছেও না থাকলেও সাহায্য করবো বলে এখানে এসেছিলাম কিন্তু আমার আসল উদ্দেশ্য আমার পিতা ব্যতীত কেউই জানতো না।
রাতের আঁধারে প্রাসাদের পিছনের দিকে আসবো তখনই দেখি কেউ একজন লুকিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে প্রাসাদ থেকে। কেবল ছায়াটা স্পষ্ট বেশি। আগ্রহ জাগলো কে হতে পারে? পিছু নিলাম নিঃশব্দে। কিছুটা যাওয়া পর আপনি অশ্বের পিঠে চড়লেন।
আমার কাছেও অশ্ব ছিলো বিধায় অসুবিধা হয়নি যেতে। বেশ দূরত্ব রেখে চললাম। আপনার মশালের আলো অনুসরণ করে যেতে সারারাত কেটে গেলো। আপনি দূরে যখন থেমে গেলেন আমিও থেমে গেলাম। আপনি একটি বাড়িতে অবস্থান করলেন আর আমি জেগে রইলাম খোলা মাঠে। আবারো রাত্রি নামলে আপনি পাহাড়ের উদ্দেশ্য যান তা খেয়াল করে পিছু নিই। তবে পথ আলাদা করে। কিন্তু পৌঁছায় দু'জনে একই জায়গাতে।
আপনি ডাকাতদের লক্ষ্য করছিলেন আর আমি আপনাকে। হঠাৎ নজরে পড়েছিলো একটি সাপ আপনার দিকে ফনা তুলেছে। আপনি শত্রুর আগমন বুঝতে পারেন অথচ সাপ এবং আমার আগমন টের ও পাননি। তার পরের কাহিনি তো আপনার জানাই। আমার উদ্দেশ্য সৈনিক হওয়া কিংবা বিশ্বাসভঙ্গ করা ছিলো না তবে আপনাকে মিথ্যে বাহানা দিতে গিয়ে হয়ে গেলাম, সুযোগ পেলাম প্রাসাদে প্রবেশ করার। লোভ হলো আপনার আশে পাশে থাকার,দেখার আপনাদের কার্যক্রম। আপনি পিতা শ্রেষ্ঠ সুলতান এটা মানতে অসুবিধা নেই।"
মেহেরুন্নেছা এতোক্ষণ ধরে মনোযোগ দিয়ে শুনলো সবটাই। শেহরাব বলা শেষ করে বসে পড়লো মাটিতে। মাথা উচু করে তাকালো মেহেরুন্নেছার দিকে।
“ শুধু এগুলো বলতেই এসেছেন?"
মেহেরুন্নেছার প্রশ্নের উত্তর দিতে শেহরাব একটু সময় নিলো। বলল,
“ হ্যাঁ সত্য মিথ্যে বলতে এসেছিলাম। নিজের কাছে নিজেকে অপরাধী লাগছিলো। আমি ভাবিনি আপনাকে ভালোবেসে ফেলবো,আপনার পিতার প্রিয় হতে পারবো। নিকাহ দিতেও আমাকে যোগ্য ভাববে। এটার আমার জন্য খুশির হলেও অন্যদিকে অনুশোচনার ছিলো। মিথ্যা পরিচয়ে নিকাহ করি কি করে? এর পর সারারাত ভাবলাম। আপনাকে বলতে গিয়েও বলতে পারিনি। কি বলতাম? মিথ্যে পরিচয়ে এসেছি? শত্রুর বংশের লোক আমি?
তার পর সিদ্ধান্ত নিলাম হারিয়ে যাবো, সময় পেরোলেই ভুলে যাবে সকলে। হয়তো সেটাই হতো কিন্তু আমি মন মানছিলো না, কষ্ট লাগছিলো ভেতরে। তাই সেদিন আমার আব্বাজান নিজে এসেছিলো। তার পর তিনি জানালেন আমারো আসা উচিত ক্ষমা চাইতে আর আপনিও দেখা করতে চেয়েছিলেন।
আসলে যা কিছু ঘটেছে এগুলো আমার পরিকল্পনায় এসব ছিলো না।"
একটু থেমে আবারো বলল,
“ সব মিথ্যা হলেও আমার ভালোবাসা কিন্তু মিথ্যে ছিলো না মেহেরুন্নেছা। আমি চন্দ্রগড়ের সুলতান আজমির খান এর ভাইপো, একই প্রাসাদে থাকি তবে আপনার পিতার উপর কোনো ক্ষোভ আমার ছিলো না, উনার ব্যবহার দেখে তো আরো নেই।"
“ ফিরে যান আপনার রাজ্যে। আমি চাই না কেউ এসব জানুক। আব্বাজান জানলে কষ্ট পাবেন।"
এই বলে মেহেরুন্নেছা পা বাড়ালো সামনে।
শেহরাব চট করে হাত ধরে ফেললো। উঠে পড়লো মাটির বুক থেকে।
“ আপনি আমাকে ঘৃণা করছেন?"
“ না।"
“ ভালোবাসেন?"
“ এর উত্তর মরে গেছে শেহরাব খান। আমি পছন্দ করতাম শেহরাব সিকান্দার কে।"
মেহেরুন্নেছার কড়া জবাবে শেহরাব তার সামনে গেলো। চোখে জল টলমল করছে। তা সে আড়ালে লুকাতে চাইলো কিন্তু শেহরাবের নজরে পড়লোই। সে হাত ছাড়িয়ে নিলো এক ঝটকায়। শেহরাবের বুকে ব্যথা অনুভব হচ্ছে। মনে হচ্ছে ভেতরের সবকিছু তছনছ করে করে দিচ্ছে অস্ত্রের আঘাতে।
শেহরাব ছাড়া ছাড়া কন্ঠে বলল,
“ আমাকে কি ক্ষমা করা যায় না? ভালোবাসার যোগ্য না হই ক্ষমাটুকু করে দিয়েন।"
মেহেরুন্নেছা হনহনিয়ে প্রাসাদের দিকে পা বাড়ালো। শেহরাব কেবল আশাহত চোখে তার গমন দেখলো। রাত্রি শেষ হওয়ার আগেই এখান থেকে চলে যেতে হবে। এই ভেবে উঠে পড়লো।
সে সবে পা বাড়াবে তখনই থেমে গেলো। চিৎকার করে উঠলো,
“আহহহহ।"
মেহেরুন্নেছা খানিকটা এগিয়ে গিয়েছিলো। শেহরাবের চিৎকারে ছুটে আসলো। দেখতে পেলো শেহরাব বুকে হাত ধরে ঢলে পড়ছে। বুকের পাশে বিঁধে যাওয়া তীর একটানে বাহির করলো নিজেই। ব্যথায় চিৎকার করে উঠলো আবারো। মেহেরুন্নেছা বসলো পাশে। ভয় পেলো। রক্তের স্রোত বইছে যেন। রাত হলেও কাছাকাছি দেখা যাচ্ছে। শেহরাবের পুরো বুক ভিজে যাচ্ছে। মেহেরুন্নেছা ভয়ে প্রায় কেঁদে ফেললো। কি করবে বুঝতে পারলো না। এখানে রেখে যাওয়া ঠিক হবে না। যে তীর ছুড়েছে সে আশে পাশে থাকতে পারে। অবশেষে ভয়ার্ত কাপা কন্ঠে বলল,
“ আপনি চলুন আমার কাঁধে ভর দিয়ে।"
মেহেরুন্নেছা উঠাতে চেষ্টা করলো। কিন্তু শেহরাব উঠতে চাইলো না। কষ্টে বলল,
“ ছলনা করা শাস্তি মেহেরুন্নেছা। নিঃশ্বাস যাওয়ার আগে মাফ করে দিও।"
“ মাফ করেছি। আপনার মিথ্যে, ছলনায় ক্ষতি ছিলো না। আপনি চলুন।"
শেহরাব হাসলো। বলল,
“ এবার মরে গেলেও শান্তি। আমি আপনাকে সত্যিই ভালোবাসি।"
“এমন বলবেন না চলুন।" মেহেরুন্নেছা টেনে তুললো। সামান্য উঠতেই আরো একটা তীর এসে শেহরাবের শরীরে বিঁধলো। এবার শেহরাবের শরীর পুরোপুরি নিতেজ হয়ে মাটিতে পড়লো। মেহেরুন্নেছা পিছনে তাকিয়ে চিৎকার করে কাঁদলো। দিশেহারা হয়ে শেহরাবের মাথা ঝাকালো কিন্তু ও চোখ মেললো না।
চলবে.............?