#জমিদার_মহল
#পর্বসংখ্যা—৮-৯
#শ্যামলী_রহমান
রসুই ঘরে রান্নার তোরজোর চলছে।সালেহা বেগম আজ হুট করে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।আবহাওয়া বেজায় খারাপ।সেদিন থেকে টানা তিনদিন বৃষ্টি হয়েছে।আজ বৃষ্টি নেই তবে আকাশে রোদের দেখাও মিলেনি। রজ্যে অনেকে অসুস্থ হচ্ছে বলেও খবর আসছে।চিকিৎসার জন্য ডাক্তার প্রয়োজন। ইমতিয়াজ ডাক্তার আনতে ঘাটে গিয়েছে।পাশের রাজ্যে ভালো ডাক্তার আছে তাদেরই খবর পাঠানো হয়েছে।মেহেরনাজ আজ একাই রান্না করছে। যোগাড়যন্ত্র করে দেওয়ার জন্য দুজন আছে তারাও আজ আসেনি।তাদের বাড়িতেও নাকি অনেকে অসুস্থ।হাড়িতে ভাত ফুঁটছে আরেক হাতে তরকারি কাটছে তখনই শারমিন বেগম উপস্থিত হলো। মেহেরনাজ কে একা দেখে জিজ্ঞেস করলো,
“তুমি একা কেন হামিদা আসেনি?
মেহেরনাজ পিছনে তাকালো।প্রতিত্তোর করলো।
“না।আমি একাই পারি কি-না দেখতে হয়তো আসেনি।
“সে তো নিজেই বলে গেলো আসবে তোমাকে সাহায্য করবে।আমি তোমার শাশুড়ির কক্ষে ছিলাম।বুবু অসুস্থ তাই একটু সেবা করছিলাম।
মেহেরনাজ আর কিছু বললো না। সে ভালো করে জানে কেন আসেনি।জানিনা কি কারণে তিনি আমায় পছন্দ করেন না।শাশুড়ী আম্মা পছন্দ না করলেও চোখের বিষ ভাবেন না।মাঝে মধ্যে অন্যের কান পড়ায় মন বেদিক হয়ে যায়।এর মধ্যে শারমিন মেঝেতে বসে পড়লো।কাঁটা তরকারি গুলো ধুয়ে হাঁড়িতে দিচ্ছে।
“আম্মাজান আসবো?
পুরুষালী কন্ঠে মেহেরনাজ ও শারমিন দুজনে তাকালো।রসুই ঘরের সামনে শিহাব দাঁড়িয়ে আছে।
শারমিন বেগম তাড়াতাড়ি করে উঠে পড়লো।
“আয়।কিছু দরকার?
শিহাব ধীর পায়ে রসুই ঘরে প্রবেশ করলো। এক পলক মেহেরনাজের দিকে তাকালো।মেহেরনাজ ও তাকিয়ে ছিলো বিধায় চোখাচোখি হলো।স্বভাবগত তার শান্ত চাহনি।শারমিন বেগম কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আলমিরায় একটা দরকারি জিনিস রেখেছিলাম খুঁজে পাচ্ছি না।
“কি জিনিস?চল আমি খুঁজে দিচ্ছি। কিছু তো গুছিয়ে রাখতে পারিস না।
বলেই শারমিন বেগম বেরিয়ে গেলো। শিহাব ঠাঁই দাঁড়িয়ে।মেহেরনাজ রান্নার ফাঁকে তাকালো। দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে এলো। মহলে আসার কারণে শিহাব কে চিনে এবং এক দুবার কথাও হয়েছিলো।তাই জিজ্ঞেস করলো,
“কিছু বলবেন?
শিহাব একবার আশেপাশে তাকালো। সুক্ষ নজর বুলালো সামনের মানুষটার পানে। তার পর বলে উঠলো,
“ভাইজান কে নিকাহ করে আপনি সুখি?
জানেন তার বিষয়ে সবকিছু?
মেহেরনাজের হাত থেমে গেলো।তাকালো পাশে। মানুষটার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে উত্তর দিলো,
“নিকাহ কি সবাই সুখে থাকতে করে?
“তবে কি অ-সুখে থাকতে করেছেন?
“সুখ অ-সুখ সবই আল্লাহর দান। তিনি কপালে যা লিখে রেখেছেন তাই হবে। সুখ নয়তো অ-সুখ কোনো একটা কপালে জুটবে।
“দোয়া করি সুখই জুঁটুক।কপালের লিখন বদলে যাক,অ-সুখ বয়ে আনা সমস্ত মানুষ জীবন থেকে নির্বাসিত হোক।
এতটুকু বলেই শিহাব রসুইঘর ত্যাগ করতে উদিত হলো।দরজার আড়াল থেকে কেউ একজন সরে গেলো।পর্দা উড়লো আড়ালে।মেহেরনাজ চকিত নজরে তাকালো।শিহাব ততক্ষণে বেরিয়ে গেছে।রেখে গেছে একরাশ রহস্য।মেহেরনাজের মতিষ্কে হানা দিলো একটি কথা, কি বলে গেলো?কেন বলে গেলো?মেহেরনাজের চতুরতা আজ ব্যর্থ হলো।বুঝতে পারলো না তার কথা।
মালিনী মন খারাপ করে ছাঁদে বসে আছে।একটুও আগেও সে বাগান থেকে ঘুরে এসেছে।প্রতিদিন বাগানে ঘোরে কিন্তু মালির দেখা মিলে না। চারদিন হয়ে গেলেও মালি আসেনি।খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছে তার আব্বাজানের সাথে সেও নাকি অসুস্থ।এই খবরে তার মন আরো বিষিয়ে গেলো। মন খারাপ করে ছাঁদের এক কোনো বসে রইলো।আজকাল তার কিছু ভালো লাগে না। মন শুধু উচাটন করে বেড়ায়। কেন তার কয়দিনের পরিচয়ের মালির জন্য এতো আকুলতা?কেন চোখ দুটো তাকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে?এর উত্তর কি?ভয়ংকর নাকি সুখবিধান?
“এখানে একা করছিস?
মালিনী চমকে উঠলো।তনিমা কে দেখে শান্ত হলো, বলল,
“ভালো লাগছিলো না তাই বসে আছি।
“এভাবে চমকালি কেন?আর একা থাকলে তো ভালো লাগবে না।আমারো কিছু ভালো লাগছে না কি যে করি।
তনিমা মালিনীর পাশে বসলো।ওর ঘাড়ে মাথা রাখলো।মালিনী জিজ্ঞেস করলো,
“তোমার কেন ভালো লাগছে না বুবু?
তনিমা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে উদাসীন হয়ে বলল,
“মনের অসুখ হয়েছে মালিনীকাউকে বলতে পারিনা,বুঝাতে পারিনা।
মালিনী চমকালো।তড়িৎ গতিতে পাশে তনিমার দিকে তাকালো। তার চমকানো দেখে তনিমা হাঁসলো।মালিনী আবারো জিজ্ঞেস করলো,
“মনের অসুখ?কেমন বুবু?কার জন্য অসুখ?
“এক হৃদয়হীন পুরুষের জন্য।যার মনে ভালোবাসা বলে কোনো বস্তুই নেই।নয়তো কি আর আমার চোখে তার জন্য লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা দেখতে পেতো না?
“কার কথা বলছো বুবু?
তনিমা আশে পাশে তাকালো।দূরে ছাঁদের কিনারার একজন দাসি কি যেন করছে। তাই ধীর কন্ঠে বলল,
“তোর বীর পুরুষ ওয়াসিফ ভাইজানের কথা বলছি।
মালিনী যেন আরেক দফায় চমকে উঠলো। প্রশ্ন করলো,
“কি বলছো?সত্যি?ভাইজান যে কড়া একদম ইমতিয়াজ ভাইজানের মতো।কঠোর মন তার।
“হুম।এজন্য ভয় পাই বলতে।অথচ তাকে একটুখানি না দেখলে আমার অন্তরে গ্রীষ্মের খরার ন্যায় মন প্রান্তর খাঁ খাঁ।
মালিনী নিশ্চুপ হয়ে শুনলো।তার সাথেও মিল পাচ্ছে।তবে কি এজন্যই আমারো মন তাকে দেখার জন্য অপেক্ষা করে?
দুপুর গড়িয়ে গেছে ইমতিয়াজ আর ওয়াসিফ এখনো আসেনি।মেহেরনাজ সালেহা বেগমের কক্ষে তার মাথায় তেল মালিশ করে দিচ্ছে।তিনি আরামে চোখ বুজে আছেন।রাতে ঘুম হয়নি অসুখের জ্বালায়।তখনই সাইফুদ্দিন নওয়াজ খান উপস্থিত হলেন।নিজের কাজ শেষে বেগম কে দেখতে এসেছেন।মেহেরনাজের দিকে একবার কড়া নজরে তাকালেন।মেহেরনাজ ঠোঁটের কোনো হাঁসির রেখা ফুঁটিয়ে তুললো।কারো উপস্থিতি টের পেয়ে সালেহা চোখ খুললো।উঠে বসতে চাইলে সাইফুদ্দিন নওয়াজ মানা করেন।তিনি কক্ষের ভেতরে আসলে মেহেরনাজ বেরিয়ে যেতে উদিত হয়।সাইফুদ্দিন নওয়াজ তার উদ্দেশ্য বলে,
“তোমার আগমনে ভালো কিছু হোক এই আশা করি।আমার পুত্র ব্যতীত অন্য কেনো দিকে তোমার নজর যেন না দেখি।
মেহেরনাজ দাঁড়িয়ে গেলো।পিছনে তাকালো।সাইফুদ্দিন নওয়াজের প্রতিত্তোরে এগিয়ে এসে বলল,
“কেন অন্য দিকে চোখ দিলে কি ক্ষতি আপনার?ভয় পান নাকি?ভয় তারা পাবে যাদের অন্তরে পাপ আছে।
সাইফুদ্দিন নওয়াজ খান রেগে গেলেন।
“আমার পুত্রের খোঁজ রাখো,তাকে ভালো পথে আনো।পাপ পবিত্র তোমার বিচার না করলেও চলবে।জমিদার মহলের ঐতিহ্য নিশ্চয়ই তোমার কথায় বদলে যাবে না।
মেহেরনাজ আর কথা বাড়ালো না।পা চালিয়ে বেরিয়ে আসলো কক্ষে থেকে।আসার পথে মনে হলো তাকে কেউ খেয়াল করছে,কারো উপস্থিত টের পাচ্ছে।সে তড়িৎ গতিতে পিছনে তাকালো কেউ নেই, এমনি আশে পাশেও কেউ নেই। সামনে কিছু দাসি আর প্রহরী আছে।কিন্তু মনে হলো পিছনে কেউ আছে।
“ভাইজান এখানে কি করছেন?
জামশেদ নওয়াজ খান চমকে উঠলো।কক্ষে তালা ঝুলিয়ে আমতাআমতা করে বলল,
“এই কক্ষে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস ছিলো সেগুলো দেখতে এসেছিলাম।
শারমিন বেগম কিছু বললো না।জমশেদ কেমন যেন তাড়াহুড়ো করে চলে গেলো।সে একবার বন্ধ কক্ষের দিকে তাকালো।এইদিকের কক্ষে সব সময় তালা ঝুলানে থাকে,কখনে খোলা হয় না। এদিকটায় মানুষ কম আসে বললেই চলে। শারমিন বেগম একটু সন্দিহান চোখে তাকালো।তার পর আবার কিছু ভেবে মাথা থেকে ঝেরে ফেললো।তার কাজ আছে সেসব করতে হবে।তাই সে ওতো কিছু আর না ভেবে চলে গেলো।
হামিদা কক্ষে বসে আছে।পাশে তার প্রিয় পুত্র জাভেদ।প্রিয় বলার একটা কারণ আছে।ওয়াসিফ
খুব একটা কথা শোনোনা তার উপর আবার সব সময় ইমতিয়াজের সঙ্গে ঘোরে যা উনার একদম অপছন্দ।সহ্য করতে না পারলেও মুখে বলতে পারে না।সবার সামনে ভালোবাসা দেখায়,আড়ালে নিন্দা ছড়ায়।কিছু মানুষ এমনই হয়।সামনে মধু ঝরে,আড়ালে বিষে মারে।এমনটাই হলো হামিদা।
“ওয়াসিফ কখন আসবে জানিস?
“আসবে এখুনি।তাকে বলে দিও পরের জন্য দরদ না দেখিয়ে আমার কথা যেন শোনে।
হামিদা হা হুতাশ করে বলল,
“সে কি আমার কথা শোনে?মনে হয় আমাদের থেকেও ওই ইমতিয়াজ বেশি প্রিয় অথচ খাঁটায় শুধু কাজের লোকের মতো।সব সময় পিছনে নিয়ে ঘোরে যেন তার রক্ষী।
“তাকে তার মতো থাকতে দাও।অযথা ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই।
হামিদা আর জাভেদ পিছনে তাকালো।দরজার সামনে জমশেদ দাঁড়িয়ে আছে।তিনি এগিয়ে আসলেন।হামিদা স্বামীর দিকে চেয়ে শুধালো,
“তোমারো কি দরদ উতলে উঠলো?
“ভালো চাইলে যা বলছি শোনো।ইমতিয়াজের সঙ্গে থাকলে খারাপ হবে না।
জাভেদের তার সুনাম অসহ্য লাগলো।রেগেই বলল,
“এখানে কারো সুনামের খাতা খুলে বসা হয়নি।মেজাজ চওড়া করাতে না চাইলে বন্ধ করুন।
জমশেদ নওয়াজ পুত্রের মেজাজ বুঝে চুপ হয়ে গেলো।জাভেদ একবার রেগে গেলে তাকে দমানো মুসকিল হয়ে যায়।দেখতে শান্ত কিন্তু ভেতরে বাস করে অশান্ত মনষত্ব্য।জমশেদ কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দিলো।
মেহেরনাজ খাওয়া শেষ করে সবে কক্ষে এসে বসলো।ইমতিয়াজ এখনো ফেরেনি তারই অপেক্ষা করছে মন।বার বার উঁকি দিচ্ছে জানালা বরাবর।
সে নিজের মনের প্রতি অসন্তোষ হলো। কেন মন টানে তারই পানে?হঠাৎ ওয়াসিফের বলা কথাটা মনে পড়লো,“অন্তরে পবিত্রতা থাকে ভালোবাসার ফুল ফুঁটবে আপনার মনে।”
কথাটুকু মতিষ্কে বাজলো।এই কয়দিন নেশাদ্রব্য পান করে বলে মনে হয়নি।হয়তো নতুন নতুন ভালো সাঁজতে দেখাচ্ছে নয়তো এর পিছনে অন্য কোনো কারণ আছে।
কক্ষে একা তার ভালো লাগছে না।সেদিন প্রজারা এসেছিলো দুজন লোক জঙ্গলে গিয়ে আর ফেরেনি তাদের খোঁজ মিলেছে তবে জীবিত নয় মৃত হয়ে।শরীরে ছিলো আঁচড়ের দাগ।সকলে বলছে কেনো বিশাল আকৃতির জন্তু জানোয়ারের কাজ এটা।
মেহেরনাজ দেখতে যেতে চাইলে সাইফুদ্দিন নওয়াজ এবং ইমতিয়াজ কেউই তাকে যেতে দেয়নি।জমিদার মহল থেকে সেই জঙ্গল চোখে দেখা গেলেও দূরত্ব অনেকটাই।জঙ্গলের সামনে দিয়ে বয়ে চলে সামধী নদী।নদীর জল যেন সচ্ছ,তেমনই ভয়ংকর তার পাশের জঙ্গল।
ঘন জঙ্গলে জীব জন্তু থাকতেও পারে তবে কেন জানি মেহেরনাজের মন মানতে চায় না।
“ভাবি বেগম আপনাকে ভাইজান ডাকছে।
হাঁফাতে হাঁফাতে কথাটা বললো তনিমা।
মেহেরনাজ উঠে পড়লো। তনিমার সঙ্গে বেরিয়ে গেলো।ইমতিয়াজ ও ওয়াসিফ দাঁড়িয়ে আছে পাশে তিনজন লোক আছে।দু'জন স্বল্প বয়সী ওয়াসিফের মতোই আরেকজন মধ্য বয়স্ক।জানতে পারলো তারা ডাক্তার।মেহেরনাজ কে একপাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো ইমতিয়াজ।ওয়াসিফ কে বলল,
“অথিতি শালায় তাদের ব্যবস্থা করে দাও।জিরিয়ে নিয়ে আম্মাজানকে দেখে আসুক।তার পর গ্রামের অন্যদের দেখবে।
ওয়াসিফ বরাবরের মতোই আদেশ মানলো।তাদের কে নিয়ে অথিতি শালার দিকে নিয়ে গেলো। ওয়াসিফের দিকে তনিমা তাকিয়ে রইলো।সেও চোখের তৃষ্ণা মেটাতে ওপাশে আরেকটু সামনে গেলো।ইমতিয়াজ মেহেরনাজের দিকে এগিয়ে আসলো।মেহেরনাজের মুখোমুখি হয়ে বলল,
“অপেক্ষা করছিলে?
“না।অপেক্ষা করবো কিসের জন্য?আপনার জন্য অপেক্ষা করার কতজন আছে। যান না বলে হয়তো রাগ করে আছে।
ইমতিয়াজ হেঁসে উঠলো।মেহেরনাজ চোরা চোখে তাকালো।হাঁসিটা আজ বড় সুন্দর লাগলো,মন কাড়লো।ইমতিয়াজ তা খেয়াল করে আবার বলল,
“হাঁসি কি ঘৃণা লাগে নাকি সুন্দর লাগে?
মেহেরনাজ তাকলো উত্তর না দিয়ে কক্ষের দিকে অগ্রসর হলো।ইমতিয়াজ নিজেও পিছু নিলো।কক্ষে গিয়ে ইমতিয়াজ বসলো মেহেরনাজ আবার বেরিয়ে আসলো।ইমতিয়াজ শুধু তার গমন দেখলো।হাতের তলোয়ার টা পাশে রাখলো। আলমিরা থেকে তার প্রয়োজনীয় জিনিসটা বাহির করলো।দাঁড়ালো খোলা জানালার পাশে।তাকিয়ে রইলো দূর প্রান্তে।
“কি দেখছেন ওদিকে?ডাকছে নাকি বাঈজী মহলে?
ইমতিয়াজ পিছনে তাকালো।মেহেরনাজ খাবারের থালা হাতে দাঁড়িয়ে আছে। কথাটা বলে খাবারের থালাটা রাখলো পাশের জগ থেকে পানি ঢেলে দিলো।মতিয়াজ নিশ্চুপ। সে আবার বলল,
“খেয়ে নিন।
“খাবো না।
“কেন?আপনি না খেলে আপনার আম্মাজান আবার আমাকে দোষ দিবেন।খেয়ে নেন।আপনার আব্বা আম্মা সবার র্নিদেশ এই মহলে আমাকে আপনার জন্যই এনেছে পতিসেবা করতে। আসেন বসেন।
ইমতিয়াজ এসে বসলো। মেহেরনাজ যেতে নিলে তাকে আঁটকে দিলো।হাত ধরে টেনে পাশে বসালো। মেহেরনাজ হকচকিয়ে গেলো।ইমতিয়াজ হেঁসে বলল,
“পতিসেবার দায়িত্ব যখন নিয়েছো তবে খাইয়ে দাও।
মেহেরনাজ ছোট ছোট চোখ করে তাকালো।ইমতিয়াজ তার চাহনি লক্ষ্য করে আনার বলল,
“এভাবে তাকাইও না বেসালাম হয়ে যাবো।প্রেমে পড়বো সাথে তোমাকে নিয়ে প্রেম সাগর পাড়ি দিবো।
“আপনি নিজের হাতে খান।
“হাতে আঘাত পেয়েছি।বলেই ডান হাতটা সামনে ধরলো।মেহেরনাজ তাকালো।সত্যি হাতে আঘাত লেগেছে।দুটে আঙুল কেঁটে গিয়েছে,তালুতেও লাল হয়ে আছে।মেহেরনাজ না চাইতেও বিচলিত হলো।শুধালো,
“আঘাত কিভাবে পেলেন।
“ঘাটে গিয়েছিলাম সেখানে আঘাত পেয়েছি।
মেহেরনাজ হাতটা তার হাতের মধ্যে নিলো।ইমতিয়াজ তাকিয়ে রইলো। কিছু একটা ভেবে হাঁসলো।মেহেরনাজ বাহির হয়ে গেলো আবার তখনি ফিরে আসলো।হাতটা হাতে নিয়ে ব্যথানাশক ওষুধের প্রলেপ লাগিয়ে দিচ্ছে।
“আহহ।
“কি হলো?ব্যথা লাগলো?
মেহেরনাজ বিচলিত হয়েই জিজ্ঞেস করলো।ইমতিয়াজ মাথা নাড়ালো।মেহেরনাজ তার মুখের দিকে তাকিয়ে আলতো করে প্রলেপ লাগিয়ে দিলো।এবার আর ব্যথা লাগলো না।যদিও আগের বার ও লাগেনি ইমতিয়াজ ব্যথা পাওয়ার নাটক করেছিলো মেহেরনাজের অনুভূতি দেখার জন্য।
প্রলেপ লাগানো শেষে মেহেরনাজ হাত ধুয়ে এসে থালা থেকে ভাত নিয়ে ইমতিয়াজের মুখের সামনে ধরলো।ইমতিয়াজ মনে মনে আনন্দ নিয়ে মুখে নিলো।তার আনন্দের রেখা ঠোঁটে ফুঁটে উঠলো।
“আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি শুধু।হাতে আঘাত না পেলে খাওয়াতাম না।
“আঘাত পেয়ে যদি বেগমের আদর-যত্ন পাওয়া যায়,তবে সেই আঘাতে নেই কোনো ক্ষতি।”
মেহেরনাজ তার কথা না শোনার ভান করলো।কক্ষের আধখোলা দরজার ফাঁক দিয়ে সাইফুদ্দিন নওয়াজ খানের চোখে সেই দৃশ্য পড়লো।তিনি বেশ খুশি হলেন।তিনি পুত্র কে এমন বাঁধনে খুশি দেখতে চান।বাহির পানে সুখ যে ভয়ংকর অ-সুখ,ধ্বংস বয়ে আনবে।
সূর্য পতিত হয়েছে পশ্চিম আকাশে।আঁধারে নিমজ্জিত হয়েছে ধরণী।মহলের আনাচকানাচে হ্যারিকেনের আলো আর বাহিরে মশাল জ্বলছে।
সালেহা বেগম কে ডাক্তার দেখেছেন।রোগ বুঝে ঔষুধ দিয়েছে।অপেক্ষা করতে হবে অসুখ সারছে কিনা দেখতে।দাসিরা ডাক্তারের অতিথি আপ্যায়ন করছে।অনেক মানুষ আছে এখন।তারা গ্রামেও গিয়েছিলো রোগী দেখতে ফিরেছে একটু আগেই।
এখন খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিবে।মহলের সকলে অতিথিদের নিয়েই খেতে বসেছে।শারমিন আর হামিদা খেতে দিচ্ছে।মেহেরনাজ এগিয়ে দিচ্ছে।সে দু একবার কারো দৃষ্টি লক্ষ্য করলো।ইমতিয়াজ খেতে গিয়ে থমকে গেলো।পাশে তাকালো।তার পর থমথমে কন্ঠে মেহেরনাজ কে আদেশ করলো,
“কক্ষে যাও আমি আসছি।সকলে ইমতিয়াজের দিকে তাকালো।হামিদা বলেই ফেললো,
“কেন তার কি কাজ করতে অসুবিধা হচ্ছে?তোমার কাজ করতে দিতে ভালো লাগছে না?
ইমতিয়াজের সোজাসাপ্টা জবাব,
“নজর সহ্য হচ্ছে না।কেউ চমকে উঠলো। মেহেরনাজ ঠিক বুঝলো না।হামিদা বিষ চোখে তাকালো,অসহ্য লাগলেও সহ্য করে চুপ রইলো।
“কি হলো যাও।
মেহেরনাজ ধমকে চমকে উঠলো। তরকারির বাটিটা রেখে চলে গেলো।ইমতিয়াজ এবার খাওয়ায় মনোযোগ দিলো।সাইফুদ্দিন নওয়াজ ডাক্তারদের সঙ্গে গল্প করছে খাওয়ার মাঝে।
তার সেদিকে মনোযোগ নেই।তার মনোযোগ অন্য কিছুতে।ওয়াসিফ তার বামপাশে বসে।কানে কানে কি যেন বলল।তার প্রতিত্তোরে সেও ধীরে বলল,
“তার দিকে লোভাতুর নজর আমি সহ্য করবো না,তার দিকে নজর কেবল আমারই থাকবে।”
মধ্যরাত।সুনসান মহল যেন ঘুমিয়ে পড়েছে।প্রহরীরা দাঁড়িয়ে ঝিমাচ্ছে।ঘোড়াশালে মশাল জ্বলছে।হুট করে এই মধ্য রাতে মেহেরনাজের ঘুম ভেঙে গেলো।চোখ মেলে দৃষ্টি আটকালো পাশে ইমতিয়াজের দিকে।গাঁ থেকে চাদর সরে গেছে দেখে মেহেরনাজ তার গাঁয়ে চাদর টেনে দিলো।পালঙ্কে হতে নামলো।কক্ষে মিটিমিটি হ্যারিকেনের আলো জ্বলছে।তার পানি পিপাসা পেয়েছে।জগ থেকে পানি ঢেলে খেয়ে আসতে নিলে জানালার দিকে নজর গেলো। মন চাইলো জানালার পাশে পাশে দাড়াতে।কুয়াশায় বাহিরে কিছু দেখা যাচ্ছে না।পাশের সেই গাছটাও না।শিশির পড়ছে তা অনুভব করলো।হুট করে নজর এলো মহলের বামপাশ হতে আগুনের আলো দেখা যাচ্ছে কিছুটা।মনে হচ্ছে মশাল হাতে কেউ এগিয়ে যাচ্ছে।কোউকে দেখা যাচ্ছে না কেবল আগুনের মতো সোনালী বর্ণের কিছু একটা নজরে আসছে। কিন্তু কে এই মধ্য রাতে ওদিকে যাচ্ছে?ওদিকে তো বাঈজী গৃহ।কক্ষে ইমতিয়াজের দিকে একবার তাকালো।সে তো মহলে তবে কে গেলো?বাহিরের কেউ নাকি মহলের কেউ বুঝবো কি করে?
সে তাড়াতাড়ি করে তৈরি হলো বাহিরে যাবে বলে।
“কোথাই এই মধ্য রাতে?
যেই কক্ষের দরজা খুলেছে তখনই পিছনে থেকে পরিচিত কন্ঠ শুনে মেহেরনাজ থমকে গেলো। তড়িৎ গতিতে পিছনে তাকালো।ইমতিয়াজের তিক্ষ্ণ দৃষ্টি তারই পানে।
“পানি পিপাসা পেয়েছিলো তাই বাহিরে যাচ্ছিলাম।
“পানি তো কক্ষেই আছে।
মেহেরনাজ এবার দোটানায় পড়লো।কি জবাব দেবো এবার?
“কি হলো?
“ আসলে এই পানিতে একটা পোকা পড়েছে দেখলাম তাই।
ইমতিয়াজ হয়তো বিশ্বাস করলো।কোনো প্রশ্ন না করে আবার শুয়ে পড়লো।মেহেরনাজ বাহিরে গেলো কক্ষের সামনে একটু দাঁড়িয়ে থেকে আবার কক্ষে আসবে বলে ভাবলো। পানি খাবে বলে এসেছে।মিথ্যা হলেও বিশ্বাস করাতে বাহিরে এসেছে।কক্ষের সামনে থেকে সামান্য একটু এগিয়ে গেলো।
মেহেরনাজ অথিতি শালার পাশে কারো ছাঁয়া দেখতে পেলো। এগিয়ে গেলো আর বলল,
“কে ওখানে?
তার কন্ঠ শুনেই ছাঁয়া সরে গেলো।মেহেরনাজ দৌঁড়ে গিয়েও কিছু দেখতে পেলো না।ততক্ষণে সেই ব্যক্তি হাওয়া হয়েছে।আশেপাশে খুঁজেপ কাউকে পেলো না।
“কে ছিলো এখানে?অথিতিদের কক্ষের দরজা বন্ধ তবে কে?কেনই বা পালালো তাকে দেখে?
ভাবতে ভাবতে ফিরে আসতে উদিত হলো।নিচে কি যেন একটা চকচক করে উঠলো।মেহেরনাজের দৃষ্টি সেখানে পড়লো।উবু হয়ে জিনিসটি হাতে তুলে নিলো।তাকিয়ে রইলো চকচক করা জিনিসটার দিকে।
চলবে............?