#জমিদার_মহল
#পর্বসংখ্যা–১১
#শ্যামলী_রহমান
কুয়াশার চাদরে ঢেকে আছে চারপাশ।কাক ডাকা ভোরে শীতের প্রকোপ একটু বেশিই আছে।মেহেরনাজ ঘুমিয়েছে মধ্য প্রহরে।এখন আবার এই ভোরে কেউ ডাকছে।তার চোখ মেলতে ইচ্ছে করছে না।চোখ বুজেই আছে ঘুমেরা যেন মাথায় আরামের হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
“মেহেরনাজ উঠো।
ইমতিয়াজের কড়া কন্ঠে মেহেরনাজ ধড়ফড়িয়ে উঠলো।দিক বেদিক ভুলে কোনো মতো চোখ খুলে বলল,
“কি হয়েছে?
“ঘুম হয়নি?
“হয়েছে।আপনি কি এটা শোনার জন্য এই শীতে ভোর রাতে ডেকেছেন?
“না ভালোবাসতে ডেকেছি বাসবে?
মেহেরনাজ বড় বড় চোখে তাকালো।ইমতিয়াজ স্বাভাবিক ভাবে পালঙ্কে বসে আছে।সে আবার বলল,
“কোনো কথা ছাড়াই উঠে পড়ো।
মেহেরনাজ উঠলো।কোনো কথা না বলে শুধু দেখতে থাকলো।ইমতিয়াজ পাশ থেকে দুটো চাদর নিয়ে একটা নিজের গাঁয়ে জড়ালো আরেকটা এনে মেহেরনাজের গাঁয়ে জড়িয়ে দিলো।মেহেরনাজের দিকে চেয়ে হেঁসে ফেললো।তার অদ্ভুত না বুঝার দৃষ্টি দেখে বলল,
“তোমায় নিয়ে আজ পুরো রাজ্য ঘুরবো।ঘোড়ার পিঠে চড়ে টগবগিয়ে পাহাড়ের কিনারায় যাবো।
দূরন্তে পথে সঙ্গী হিসাবে তোমাকেই শুধু চাইবো।
“এই ভোর রাতে?
“হ্যাঁ।কোনো সমস্যা?দিনের আলোয় শত্রুর আনাগোনা বেশি থাকে,রাতের আঁধারে সবকিছু নিরাপদ লাগে।
“আঁধারেই তো শত্রুর আনাগোনা বেশি হয় জানি।
অবশ্য আঁধার যাদের সত্যি লুকায়িত রাখে,তাদের আঁধার পছন্দ হবেই।
ইমতিয়াজ শুনেও না শোনার ভান করলো।মেহেরনাজের হাত ধরে কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসলো।বাহিরে কুয়াশা পড়েছে শিশির বিন্দু পড়ছে।যদিও শীত কিছুদিনের তুলনায় একটু কমেছে।শীতের মৌসুম প্রায় শেষ হয়ে আসছে।
বাহিরে এসে সামান্য দূরে দেখলো একটা ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে।
গাছের সঙ্গে বাঁধা তার দড়ি।ঘোড়াটি ইমতিয়াজের অতি প্রিয় নাম তার টংটং।ইমতিয়াজ আগে ঘোড়ার পিঠে চড়লো।তার পর হাত বাড়িয়ে দিলো মেহেরনাজের দিকে।মেহেরনাজ তার হাতে হাত রেখে ঘোড়ার পিঠে উড়ে পড়লো।ইমতিয়াজ পিছনে আর মেহেরনাজ কে সামনে দিলো।
“আমি সামনে কেন?
“আলোতে যদি শত্রুর আগমন ঘটে তবে সে পিছন হতে আক্রমণ করবে।
“এতো ভালোবাসা আসলেই কি আছে?নাকি সবই মিথ্যে অভিনয়?
“সময় হলে বুঝবে।
“কবে আসবে সে সময়?
“না আসলেই ভালো।এরকম কি ভালো নেই?
“না আমি ভালো নেই।
ইমতিয়াজ মেহেরনাজের নিকটে হলো।একহাতে তাকে ধরে আরেক হাতে ঘোড়ার লাগাম টানলো।ঘোড়া ছুটলো টগবগিয়ে।এবার সে বলল,
“জগৎ সংসারে সবাই কে ভালো থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই।আমি ভালো থাকলেই হবে।
তুমি শুধু একজন বেগমের দায়িত্ব পালন করবে।
মেহেরনাজের রাগ হলেও প্রকাশ করলো না।
ঘোড়া চলছে শীতল বাতাস তাদের ছুঁয়ে দিচ্ছে।
ধীরে ধীরে কুয়াশা সরছে।গ্রামের মেঠোপথ আর ফলসের ক্ষেত দেখা যাচ্ছে।এবারে ফসল চাষ ভালো হয়নি।কত জমি ফাঁকা পড়ে আছে।আশেপাশে কত কুঁড়ে ঘর সারি সারি।মেহেরনাজের খুবই সুন্দর লাগলো কুঁড়ে ঘরগুলো দেখতে।
ইমতিয়াজ তার দৃষ্টি লক্ষ্য করে বলল,
“কুঁড়ে ঘর দেখতে সুন্দর লাগে,বিলাসবহুল জমিদার মহল রেখে নিশ্চয়ই মন চাচ্ছে এখানে একটু থাকতে পারলে বোধহয় শান্তি পেতাম, তাই না?বাস্তবতা কিন্তু অন্য বেগম জান।বর্ষায় যখন বৃষ্টির পানি টুপটুপিয়ে পড়ে স্ত্রী শিশুদের নিয়ে ঘুমহীন রাত্রি যাপন করতে হয় তখন তারা বুঝে অর্থ সম্পদের কি মূল্য।
“কুঁড়ে ঘরেও শান্তিতে থাকা যায়,যদি জীবন সঙ্গী মনের মতো হয়।”
মেহেরনাজের উত্তরে ইমতিয়াজ কেবলই হাঁসলো।
সেই হাঁসি শব্দ বিহীন।হুট করে মেহেরনাজের গাঁ থেকে চাঁদরটা ছিনিয়ে নিলো।মেহেরনাজ অবাক হলো।ঘোড়া ততক্ষণে থেমে গেলো।শীতে গাঁ শিইরে উঠলো,শীতে কাঁপতে লাগলো আর বলল,
“চাঁদর নিলেন কেন?
“শীত করছে?
“না উষ্ণতা লাগছে।
মেহেরনাজের রাগী কন্ঠে ইমতিয়াজ হেঁসে ফেললো।আবার চাঁদর খানা গাঁয়ে জড়িয়ে নিজেও জড়িয়ে ধরলো।কাঁধে থুঁতনি রেখে দূর পানে তাকিয়ে বলল,
“বস্ত্রহীন শীত কেমন কাঁটে তা মিনিটে সহ্য করতে পারলে না অথচ কুঁড়ে ঘরে থাকতে চাও?
হ্যাঁ থাকাও সম্ভব তারা পারলে তুমি কেন নয়?
তবে সে পথ খুব সহজ নয়।কল্পনা সুন্দর কিন্তু বাস্তবতা অধিক কুৎসিত বেগম জান।
মেহেরনাজ নড়লো না।সে ইমতিয়াজের কথা বুঝতে পেরেছে। পুরোটা সঠিক না হলেও ভুল ও নয়।আবারো ঘোড়া ছুঁটলো গ্রাম পেরিয়ে উঁচু পাহাড়ের দেখা মিললো।সবুজ পাহাড় সারি সারি সবুজ গাছ। সবকিছু সবুজে ভরপুর।
সূর্য তখন পাহাড়ের মাথায় কেবল উঁকি দিতে চাচ্ছে।পাহাড়ের কিছুটা দূরে তারা ঘোড়া থেকে নেমে পড়লো।সেখানে একটা নদীর ও দেখা মিললো।মেহেরনাজ এদিকে আগে কখনো আসেনি।জায়গাটা দুই গ্রাম পরিয়ে।এতদূর কখনো তার আব্বাজান আসতে সম্মতি দিতো না।
“চলো এগিয়ে যাই।
মেহেরনাজের হাত খানা সে ছাড়লো না।নদী সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।নদীর সচ্ছ জলে তাদের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠলো।
“নদীর সচ্ছ জলে প্রতিচ্ছবির মতো,
সারাজীবন তোমাকে পাশে চাই বেগম জান।”
“পদ্ম ফুলটি এনে দিন।
“আমি বলি ভালোবাসার কথা আর তুমি বলো পদ্মের কথা।কিসের মধ্যে কি?ইমতিয়াজ হতাশ হয়ে ওপাশে গেলো।পদ্ম ফুলটা নদীর কিনারায় তবে একটু দূরে।নদীর পাড়ে সে বসলো হাত বাড়িয়ে প্রথমে পেলো না আরেকটু এগিয়ে গেলো।হাত বাড়িয়ে নাগালে এসে ছুটে যাচ্ছে।সে হার মানলো না নদীর গভীরতা অনেক নামতে না পারলেও পিঠের পিছন থেকে তলোয়ারের দ্বারা পদ্ম ফুলের গাছটা সহ ছিঁড়ে আনলো।ফুলটা নিয়ে মেহেরনাজের হাতে তুলে দিলো।বলল,
“পদ্মের মতো তুমিও ফুঁটো আমার হৃদয়ের পুষ্কনীতে।রঙীন হয়ে আমায় বাঁধো তোমার চোখের কাজলেতে।
“মহলে চলুন দিনের আলো ফুঁটেছে।
ইমতিয়াজ ও সম্মতি দিলো।এমন ভোর সে মনে মনে শতবার চাইলো।ঘোড়া পিঠে উড়ে দুজনে আবার রওলা দিলো মহলের পথে।
মালিনীর সবে ঘুম ভেঙেছে।এক দাসি এসে খবর দিলো আজ নাকি মালি কাজে এসেছে।এই কথা শুনেই তার মুখে হাঁসি ফুটে উঠলো।পালঙ্ক থেকে নেমেই বাগানের দিকে ছুঁটলো।পিছিন থেকে তনিমা ডাকলেও সে শুনলো না।তার ছুটে চলা অনেকে ছেলেমানুষী ভাবলো।সে থামলো গিয়ে একেবারে বাগানের শেষ প্রান্তে।যেখানে মালি গাছে পানি দিচ্ছিলো।কারো ছুঁটে আসার আওয়াজে মালি চমকে পিছনে তাকালো।মালিনী কে দেখে অবাক হলো না যেন সে জানতো মালিনী আসবে।
“এতোদিন আসেননি কেন?
মালিনী প্রশ্নে সে আশে পাশে তাকালো। মিনমিনে স্বরে উত্তর দিলো,
“আব্বা অসুস্থ সাথে আমিও।
“এখন সুস্থ?
সে মাথা নাড়ালো।
“তাহলে নিত্যদিন আসবেন তো?
আবারো মাথা নাড়ালো।মালিনী বিরক্তবোধ করলো।
“মুখ থেকে কথা বের করুন।নাম কি আপনার?কি নামে ডাকবো?
“আপনার ইচ্ছে হলে মালি ডাকতে পারে।সে নামেই তো এখন সকলে জানে।
“আমি সকলের কথা জানতে চাইনি।
“আমার নাম মুহিব।আপনি এখন দয়া করে এখান থেকে যান।আপনার নিত্যদিন এখানে আসা জমিদারের নজরে পড়লে আমায় কাজ থেকে তাড়িয়ে দিবে।আর আপনি আসেন বা কেন?
মালিনী উত্তর দিতে পারলো না।সে আশে পাশে দেখে এসেছে এদিকে কেউ নেই।তবে রোজ আসলে সন্দেহ করবে কারো নজরে পড়বে।সে একবার মালির চোখে চেয়ে পাশের গাছ থেকে কয়টা ফুল নিয়ে চলে গেলো।ফুলগুলো নিলো কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবে ফুল তুলতে বাগানে গেছিলো।মুহিব মালিনীর গমনের দিকে চেয়ে রইলো।
“কি রে কাজ কর।চুপ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
প্রহরীর কথা শুনে মুহিব দৃষ্টি সরিয়ে কাজে হাত লাগালো।মনে মনে ভাবলে জমিদার কন্যার সঙ্গে কথা বলা তার করতে হবে বন্ধ।
সাইফুদ্দিন নওয়াজ খান কাচারি ঘরে বসে আছেন।আমিরাত তারই পাশে।তিনি বেশ চিন্তিত।
“আমিরাত ইমতিয়াজ ভোর রাতে একা বেরোয় কি করে?জানো না শত্রু চারদিকে?তাকে নিয়ে আমি এমনিতেই চিন্তিত থাকি।শত্রুর সাথে লড়াই করার মতে ক্ষমতা তার আছে জানি। কিন্তু তোমার কন্যা সঙ্গে আছে দুদিক সামলাতে গেলে সে কাবু হতে পারে।
“ইমতিয়াজ বলে যায়নি।প্রভাতে ঘুম থেকে উঠে দেখি ক্ষের দরজা খোলা ইমতিয়াজ এবং মেহেরনাজ কেউই নেই।ঘোড়া শাল থেকে ইমতিয়াজের ঘোড়াও নেই।হয়তো গেছে কোথাও আশে পাশে বেড়াতে।
সাইফুদ্দিন নওয়াজ উঠে দাঁড়ালো।সে ইতিমধ্যে কয়েকজন রক্ষী কে পাঠিয়েছে খোঁজ নিতে।তার ছুটে আসলো অনুমতি চেয়ে বলল,
“জমিদার মশাই জমিদার পুত্র কে গ্রামের অনেকে পূর্ব দিকের পাহাড়ের দিকে যেতে দেখেছে।আরেকজন জানালো তারা নাকি এখন ফিরে আসছে।সঙ্গে উনার বেগম ও আছেন।
খবর দিয়েই তারা চলে গেলো।সাইফুদ্দিন নওয়াজ কাচারি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। পিছনে আমিরাত ও আসলো।
হামিদা আর শারমিন রসুই ঘরে রন্ধনের কাজে ব্যস্ত।সালেদা অনেকটা সুস্থ হলেও শারমিন তাকে রসুই ঘরে আসতে মানা করেছে।হামিদার মুখ ভার।
তনিমা তখনই রসুই ঘরে উপস্থিত হলো।তনিমা কে দেখে হামিদা বলল,
“তনিমা যা তো আম্মা ওয়াসিফ কে ডেকে দে তো।বলবি আম্মাজান ডাকছে জরুরি কথা আছে। তনিমার কালকের কথা মনে পড়লো।একটু ভয় লাগলেও না করতে পারলো না। মাথা নাড়িয়ে রসুই ঘরে থেকে বেরিয়ে ওয়াসিফের কক্ষের দিকে অগ্রসর হলো।একটু পর কক্ষের সামনে পৌঁছালো।তার পায়ের চলন ধীর হলো।আধখোলা দরজার ফাঁক দিয়ে কাউকে দেখা গেলো না।দরজা একটু ফাঁক করে দিতেই ওয়াসিফের দেখা মিললো।আলমিরায় কিছু খুঁজছে কিন্তু পাচ্ছে না।
“আপনাকে চাচিজান ডাকছেন।
তনিমা কথায় ওয়াসিফ দরজা বরাবর তাকালো।তনিমা দাঁড়িয়ে আছে। আঙ্গুল জামার ওড়নায় গুটাচ্ছে।ও উঠে এলো।দাঁড়ালো তনিমার ঠিক সামনাসামনি।তনিমা মাথা তুলে চাইলো।ওয়াসিফের তিক্ষ্ণ দৃষ্টি সে ভয় পেলো।কিছু বলার চেষ্টা করলো কিন্তু শব্দ বাহির হচ্ছে না।তা দেখে ওয়াসিফ জোরেই হেঁসে দিলো।তনিমা তার হাঁসির দিকে তাকিয়ে রইলো।
“এখন ঠিক আছে?
“কি ঠিক থাকবে?
“এই যে হাঁসলাম।
“আপনাকে হাঁসিতে সুন্দর লাগে,আর গম্ভীরতাকে ভয় লাগে।
“কিছু ক্ষেত্রে ভয় থাকা ভালো।সব জয় করলে ভয়ের মধ্যেও যে স্নিগ্ধতা আছে তা বুঝবি কি করে?
“ভয়ের মধ্যেও স্নিগ্ধতা থাকে?
ওয়াসিফ আবারো হাঁসলো।যেতে যেতে উত্তর দিলো,
“ভয় মাথা মুখশ্রীতে যে স্নিগ্ধতা বিরাজ করে,ভয় না পেলে সেই স্নিগ্ধতায় মুগ্ধ হতাম কি করে?
তনিমা ঠিক বুঝলো না।সে ধীরে চললো।ওয়াসিফ তাকে রেখে অনেকটা দূরে চলে গেলো।ওয়াসিফের সরল উত্তর তার কাছে বড্ড কঠিন লাগলো।সে উত্তর এখন বুঝতে মালিনীর কক্ষে যাবে।
চলবে.....................?