ফন্ট সাইজ:
থিম:
জমিদার মহল

১৩তম পর্ব

লেখক: শ্যামলী রহমান

#জমিদার_মহল

#পর্বসংখ্যা–১৩

#শ্যামলী_রহমান

দিনের আলো ফুরিয়ে ফুরিয়ে যাবে বলে।সূর্য অস্ত যাচ্ছে পশ্চিম আকাশে।সোনালী বর্ণের আকাশে এক ঝাঁক পায়রা উড়ছে।পায়রা গুলো জমিদার মহলের ছাঁদে তাদের নিদিষ্ট খুপরিতে এসে ঢুলকো।

হওয়ার তীব্রতা নেই।গাছের পাতা নড়ছে না একটুও।মেহেরনাজ আমিরাত সাহ্ এর কক্ষে বসে আছে।অপেক্ষা করছে তার আব্বাজানের আসার।

কিছু কথা জানা খুবই প্রয়োজন।কালকে থেকে মনের মধ্যে প্রশ্ন উতালপাতাল করছে।সময় সুযোগের জন্য এই মহলে আসতে পারেনি।আজ ইমতিয়াজ কাজে বাহির হয়ে যেতেই এসেছে।

মাহবুবা বেগম কন্যার পাশে বসলেন। চিন্তিত মুখ দেখে শুধালো,

“কি হয়েছে মেহেরনাজ?তোমাকে এতো চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?

মেহেরনাজ তার আম্মাজানের বহু জড়িয়ে ধরলো। কাঁধে মাথা রেখে আদুরে সুরে বললো,

“আম্মাজান জমিদার মহল এতো রহস্য কেন?

রাজ্য আজকাল এমন ঘটনা ঘটছে বা কেন?

মাহবুবা কন্যার হাত রাখলেন।আগলে নিয়ে বললেন,

“তুমি নিজেকে রক্ষা করিও।সাবধানে থেকো তোমাকে যে সেদিন এ মহলে এসে মারতে চেয়েছিলো সে আবারো চেষ্টা করবে।তোমার শত্রু কোথা থেকে আসলো বলোতো?

“জমিদার মহলের সঙ্গে জীবন জুঁড়ে যাওয়ার পর থেকে।

“জমিদার গিন্নি তোমায় মেনে নিয়েছে?

“তিনি ভালো মানুষ।দূর থেকে অন্য রকম মনে হলেও কাছে থেকে বুঝলাম ভালো তবে মতিষ্কে বুয় ঢালে এজন্য ব্যবহার করে এমন।

“তোমার আব্বাজানের সঙ্গে কি কথা বলবে?

মেহেরনাজ মাহবুবা বেগম কে ছেড়ে দিলো।তার দিকে তাকিয়ে বলল,

“আম্মাজান এটা শুধুমাত্র আব্বাজানের সঙ্গে একান্ত কথা।তোমায় বলবো পরে কখনো। আপাতত আমি আগে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করি।

ঠিক বেঠিক না জেনে কোনো কিছু বলতে পারবো না।

মাহবুবা বেগম আর কিছু জানতে চাইলো না। কন্যার জন্য তার চিন্তিত দৃষ্টি মেহেরনাজের চোখ এড়ালো না।তা দেখে মেহেরনাজ ভরসা দিলো।

“চিন্তা করিও না আম্মাজান আমি সঠিক পথে থাকবো নিজেকে রক্ষা করবো।

“ইমতিয়াজ কি এখনো বাঈজী গৃহে যায়?নেশাদ্রব্য পান করে?

“কাল গিয়েছিলো কিন্তু মিনিটের মধ্যে বেরিয়ে এসেছে নেশাদ্রব্য পান করেনি।

মাহবুবা বেগম চমকে উঠলেন।চোখে মুখে হানার আগ্রহ জাগলো।

“তুই কিভাবে জানলি?

মেহেরনাজের সরল শিকারোক্তি।

“আমি কাল পিছু নিয়েছিলাম।বাঈজী গৃহে প্রবেশ করেই বাহির হয়ে আসলো।দেখার সুযোগ পেলাম না কি করতে যায় সেখানে।

“ জিজ্ঞেস করিস নি?

“সময় আসলে উত্তর মিলবে,জিজ্ঞেস করলে বাহানা খুঁজবে।

আমি বাহানা নয় সত্যি জানতে আগ্রহী।

“আসবো?

আমিরাত এসেছে।কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

মেহেরনাজ আসতে বললো।তাদের আলাপ বন্ধ হলো।

“নিজের কক্ষে আসতে অনুমতি নিতে হবে?

“আমার আম্মাজান আর আম্মাজান আলাপ করছে সেখানে অনুমতি না নিয়ে আসা যায়?

আমিরাত হেঁসে হেঁসে বলতে বলতে কক্ষে প্রবেশ করলো।মেহেরনাজ মাহবুবা বেগমের দিকে তাকালো।ইশারা বুঝতে পেরে তখনই মাহবুবা বেগম কক্ষ ত্যাগ করলো।রয়ে গেলো মেহেরনাজ আর আমিরাত।সে চিন্তিত কিসের জন্য এই জুরুরি তলব?জমিদারের কোনে বিষয়ে নয়তো?জমিদার মোটেও পছন্দ করবে না তার বিষয়ে নাক গলানো।

মেহেরনাজ কক্ষের দিকে তাকিয়ে এবার তার আব্বাজানের দিকে তাকালো।তড়াক দৃষ্টি নিয়ে বলল,

„আব্বাজান আপনি কি জানেন বিশ বছর আগে জমিদার মহলে একজন বনিক আসে এবং জমিদারের সঙ্গে বেশ সুমধুর সম্পর্ক গড়ে উঠে।

বেশ কিছুদিন পর মহলের এক কক্ষে উনার অক্ষত মৃত দেহ পাওয়া যায়।

আমিরাত সাহ্ চমকে উঠলো।হুট করে যেন বসা থেকে উঠতে চাইলো।নিজেকে স্বাভাবিক করতে আবার বসলো।কন্যার পানে চেয়ে আমতা আমতা আমতা করলো।এসব মধ্যে তিনি কন্যা কে জড়াতে দিতে চান না বলে বাহানা খুঁজতে লাগলো।মেহেরনাজ সবই দেখলো।

“চমকে উঠলেন কেন আব্বাজান? কি নাম ছিলো সেই বনিকের?

“তুমি কীভাবে জানলে সেই বনিকের কথা?

“সত্যি হাওয়ায় ভাঁসে আব্বাজান।সত্যের গন্ধ কম হলেও চাপা থাকে না। যখন বাহির হতে শুরু করে পুরো মোহিত করে।

আমিরাত কন্যার পানে চাইলো।কন্যার মাথায় হাত রেখে অনুনয়ের সুরে বললো,

“তুমি এসবের থেকে দূরে থাকো।জমিদার মহলে রহস্য আছে আমি নিজেও জানি।কিন্তু কি সে রহস্য তা জানিনা।আমি বুঝতে পারঋি তুমি খুঁজতে চাইছো কিন্তু সেসব তোমার জন্য ভয়ানক হতে পারে।সেদিন যে ক্ষতি করতে চেয়েছিলো পরবর্তীতে সুযোগ খুঁজতে।তোমায় নিয়ে আমি সারাক্ষণ চিন্তায় থাকি।তুমি ছাড়া আমাদের কে আছে?ছোট থেকে আগলে রেখেছি তোমার কিছু হলে আমরা শেষ হয়ে যাবো।

মেহেরনাজ তার আব্বাজানপর হাতখানা ধরলো।আকুল আবেদনে বলল,

“আব্বাজান আমি কিছু করবে না আপনি শুধু বনিকের নামটা বলেন।আমার জানার আগ্রহ জাগলো তাই জানতে চাইছি।

“বিশ বছর আগে জমিদার মহলে যে বনিক উপস্থিত হয় এবং মৃত্যু হয়ে বাহির হয় তার নাম ছিলো আজম খান।

মেহেরনাজের সত্তা কেঁপে উঠল।তার ধারণাই তবে সত্যি হলো।বিস্ময়তা প্রকাশ করলো না। নিজের মধ্যে আঁটকে রাখলে সমস্ত কিছু।

“আব্বাজান রাত্রি হয়ে এলো উনার মহলে ফেরার সময় হয়ে এসেছে আমি যাচ্ছি।

মেহেরনাজ চলে গেলো।আমিরাত কক্ষে বসে রইলো।কন্যার জন্য মনে বড় র্দূচিন্তা হয়।জমিদার মহলের আশে পাশে অজানা কত শত্রু ঘোরে ফিরে কিন্তু কেউ টের পায় না।

মেহেরনাজ মহলের সিংহদ্বারের সামনে আসতেই ইমতিয়াজ ও আসে।ঘোড়া থেকে নেমে মেহেরনাজের সামনে যায়।মাহমুদ তাকে সালাম দেয়।

“এই সন্ধ্যারাতে মহলে বাহিরে একা আর বেরোবে না।

ইমতিয়াজের কথায় মেহেরনাজ ধারালো উত্তর,

“কেন বেরোবো না?আপনার কক্ষে বন্ধিনী হয়ে থাকবো।

ইমতিয়াজ আশে পাশে তাকালো৷ ধীরে এগিয়ে এসে সন্নিপনে মেহেরনাজের হাতটা ধরে মহলের ভেতরে হাঁটা দেয় আর তার প্রশ্নের উত্তরে বলে,

“সারাজীবন আমার হৃদয়ের বন্দিনী হয়ে থেকো।

মেহেরনাজ আর কথা বাড়ালো।হাত ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টাও করলে না।

ওয়াসিফ অপেক্ষা করছে।মালিনী আর তনিমার আসার নাম নেই।সেই কখন থেকে তারা তৈরি হচ্ছে।এক প্রকার বিরক্ত হয়ে এক দাসীকে পাঠালে তাদের ডাকতে।তখনই দুজনে হাজির হলো। মালিনী বলল,

“চলো ভাইজান আমরা তৈরি।

ওয়াসিফ তাকালো।মালিনী পাশে তনিমা তার দিকে চেয়ে আছে হাঁসি মুখে।তার মধ্যে যেন ঈদ আনন্দ বিরাজ করছে তেমনই ভঙ্গি।

“চলো তাড়াতাড়ি।বাহিরে ঘেড়ার গাড়ি অপেক্ষা করছে।ফিরতে অনেক রাত্রি হবে।

মালিনী সামনে চললো।ওয়াসিফ মাঝে আর সবার পিছনে তনিমা।হাঁটতে হাঁটতে হুট করে ওয়াসিফ থেমে যায়।তনিমা নিচু হয়ে চলার জন্য ওয়াসিফের পিঠে ধ্বাক্কা খায়। ব্যথা অনুভব করে কপালে হাত দেয়।ওয়াসিফ পিছিনে তাকায়।

“ঈদ আনন্দ বিরাজ কিসের জন্য?আর এতো জমকানো পোশাক কেন?কার দৃষ্টি আর্কষণ করতে যাচ্ছিস?

তনিমার হাঁসি মাখা মুখখানা মুহূর্তে চুপসে গেলো।

মাথা নিচু করলো।ওয়াসিফ ওর তাকিয়ে আছে।মাথা নিচু করে উত্তর দিলো,

“যার দৃষ্টি আর্কষণ করতে চাই সে তো ফিরেও তাকায় না,সেখানে অন্য কাউকে আর্কষিত করার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।

“জমকানো পোশাক দিয়ে দৃষ্টি আর্কষণ করা যায় কিন্তু হৃদয় নয়।হৃদয় আর্কষণ করতে ভালোবাসা মিশ্রিত হৃদয়ের প্রয়োজন হয়।”

তনিমা মুখ তুলে চাইলো।ওয়াসিফ ততক্ষণে সামনে গমন শুরু করেছে।সে কিছু একটা ভেবে হেঁসে দৌঁড়ে গিয়ে ওয়াসিফের পাশাপাশি হলো,জিজ্ঞেস করলো,

“ভালোবাসা মিশ্রিত হৃদয় থাকলে তাকে পাবো?

ওয়াসিফ না থেমে সামনে তাকিয়ে উত্তর দিলো,

“তার হৃদয়ে তোর জন্য অনুভূতি থাকলে পেতেও পারিস না থাকলে পাবি না।ভালোবাসা হলো হৃদয়ের মেল বন্ধন যা বলে নয় অজান্তে হয়।

তনিমা থেমে গেলো।প্রথম আর শেষ টুকু ভালো লাগলেও মাঝের কথাটা ভালো লাগলো না।মালিনী ডাক ছাড়লো।তনিমা শুনে আবার ছুটলো।

মেহেরনাজ মাত্র ভোজন কক্ষের দিকে আসছে।সকলের খাওয়া শেষে তারা বসে।

ইমতিয়াজ আগে থেকে কক্ষে এসেছে।মেহেরনাজ আনমনে কিছু ভাবছে আর আসছে। হঠাৎ জামশেদের মুখোমুখি হয়।তিনি মেহেরনাজ কে শুধায়,

“ইমতিয়াক কে নজরে রেখো তার অবনতি ঘটলে হারাবে রাজ্য।

“আপনি কি চান?ভালো নাকি মন্দ?

তিনি রসিকতায় হাঁসলেন,

“চাচাজান হই ভালো ছাড়া মন্দ চাইবো না নিশ্চয়ই।

মেহেরনাজের আজ রাত্রে আরো কিছু কাজ আছে এজন্য তাড়াতাড়ি কক্ষে গিয়ে ঘুমানেরুভান ধরা প্রয়োজন।তাই সে কথস না বাড়িয়ে চলে আসলো।

কক্ষের দরজার কাছে এসে থেমে গেলো।ভ্রু কুঁচকে এলো।কক্ষ অন্ধকার কেন? ইমতিয়াজ তো থাকার কথা।

হুট করে কেউ হাত টেনে নিলো।কক্ষের দরজা বন্ধ করে দিলো।সেই আওয়াজে মেহেরনাক চমকালো।

কক্ষের হ্যারিকেনের আলো টিমটিমে জ্বালাতেই ইমতিয়াজের মুখশ্রী সামনে এলো।

মেহেরনাজের দিকে এগিয়ে এসলো।মিহি কন্ঠে বলল,

“অনেক তো হলো দূরে থাকা এবার না-হয় কাছে এসো।

মেহেরনাজ নড়লো না তবে ক্ষিপ্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো।ইমতিয়াজ হেঁসে ফেললো আবারে বলল,

“আর্দশ স্বামী না-হয় হবো তার আগে তুমি আর্দশ স্ত্রী'র দায়িত্ব পালন করো।

বলতেই মেহেরনাজের নিকটে গেলো।ছুটে যেতে চাইলে ইমতিয়াজের বাঁধনে আটকা পড়লো।পবিত্র ছোঁয়ায় বেড়ে গেলো তার হৃদ স্পন্দন।না চাইতেও বিমোহিত হলো ভালোবাসায়।হ্যারিকেনের টিমটিমে আলো জ্বলতে থাকলো সারা রাত্রী।

চলবে........................?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন