ফন্ট সাইজ:
থিম:
জমিদার মহল

১৫তম পর্ব

লেখক: শ্যামলী রহমান

#জমিদার_মহল

#পর্বসংখ্যা–১৪-১৫

#শ্যামলী_রহমান

গভীর রাত হয়েছে।জেগে উঠেছে সাইফুদ্দিন নওয়াজ খান।তিনি কক্ষের বাহিরে আসলেন। হঠাৎ নজর পড়লো মহলে পায়চারি করছে হামিদা,জাভেদ আর জমশেদ। সালেহা ঘুমিয়েছে কিছু সময় পূর্বেই।

“তোমরা সবাই জেগে কেন?

জাভেদ নওয়াজ এগিয়ে এলেন।

“ভাইজান ওয়াসিফ তো মালিনী তনিমা কে নিয়ে এখনো ফিরেনি।

“কি বলছো?যাত্রা এখনো শেষ হয়নি?প্রহরী পাঠাও কতদূর খোঁজ লাগাও।

হামিদা এদিক সেদিক দেখছে।জাভেদ কে বলছে,

“ইমতিয়াত কে ডেকে নিয়ে তুই একটু যা। দেখ কোথাই আমার ওয়াসিফ।

গোলমেলে আওয়াজে সালেহার ঘুম ভাঙলো। এক এক করে শারমিন সহ দাসীরাও জেগে উঠলো।

ইমতিয়াজ তখন ও কক্ষে ঘুমচ্ছিলো।সালেহা বেগম চিন্তিত হয়ে অস্থির পায়ে ছুটে গেলো।কক্ষের দরজায় কড়া নাড়লে ইমতিয়াজ একা বেরিয়ে আসে।মেহেরনাজ চাইলেও বেরোতে পারেনা।সে বসে রয়।

“কি হয়েছে আম্মাজান?আপনাকে এতো উতলা দেখাচ্ছে কেন?

সালেহা বেগম অস্থির হয়।কিছুটা ভয় পেয়ে জবাব দিলো,

“রাত্রি কতটা হয়েছে দেখেছো?ওয়াসিফ যে তনিমা আর মালিনি কে নিয়ে যাত্রা দেখতে গিয়েছিলো এখনো তো ফেরেনি।এতোক্ষণে যাত্রা শেষ হবার কথা।তোমার আব্বাজান খোঁজ নিয়ে দেখেছে যাত্রা শেষ করে অনেকে ফিরে এসেছে।

“কি বলো এখোনি ফিরেনি?

“না।

ইমতিয়াজের কপালেও চিন্তার সূক্ষ রেখা দেখা গেলো।তবে তার আম্মাজান কে বুঝতে দিলো না।

বলল,

“আমি আসছি।বলেই কক্ষে প্রবেশ করলো। তলোয়ার খানা হাতে নিতেই মেহেরনাজ প্রশ্ন করলো,

“কি হয়েছে বাহিরে?

“ওয়াসিফ,তনিমা,মালিনী কেউই যাত্রা দেখে এখনো মহলে ফেরেনি।আমি যাচ্ছি ওদের খুঁজতে।যদি কোনো বিপদ হয়,বলা তো যায় না।

মেহেরনাজ নিশ্চুপ।ইমতিয়াজ এক পলক তাকিয়ে তলোয়ার খানা নিয়ে বেরিয়ে গেলো।মেহেরনাজ নিজের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো,জানা-অজানা কারণে চোখ বন্ধ করে দু’ফোটা চোখের জল বিসর্জন দিলো।নিজেকে প্রশ্ন করলো,“কেন এমন হলো?

নিজ সত্তা থেকে উত্তর আসলো,“এমন হওয়া কি স্বাভাবিক নয়?সে তোমার স্বামী মেহেরনাজ।তার অধিকার আছে তোমার উপর।স্ত্রী'র কর্তব্য পালন করা তোমার ধর্ম। সে যদি পাপ কাজে লিপ্ত থাকে জানতে পারো,তবে সেদিন নিজ ইচ্ছায় সরে এসো।

জাভেদ আর ইমতিয়াজ ঘোড়ার পিঠে চড়ে রওনা দিলো।হামিদা বেগম চিন্তায় কাঁদছে আর মালিনী, তনিমা কে দোষারোপ করছে।শারমিন বেগম নিশ্চুপ।শিহাব টা ব্যবসায়ীক কাজে আবারো বাহিরে গেছে।দুজনের ঘোড়া নিয়ে ছুঁটে চললো।যেখানে যাত্রা হচ্ছে সে পথে একটা ছোট জঙ্গল পড়ে।অন্ধকার ছিমছাম জঙ্গল।রাত্রে যেন ভয়ানক রূপ ধারন করেছে।এ পথে মানুষ খুব কম যাতায়াত করে।অনেকে বলে ভূত পেতের আসর আছে এ জঙ্গলে।রাত্রি নামলে তাদের উপদ্রব বাড়ে।জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে ইমতিয়াজ কিছুর শব্দ শুনে থেমে গেলো।কান খাড়া করে স্পষ্ট শুনলো।তখন জাভেদ কে বলল,

“ভাইজান কিছুর আওয়াজ পাচ্ছেন?

জাভেদ ও থামলো। কান পাতলো, শোনার চেষ্টা করতেই শুনতে পেলো।

“হ্যাঁ।বাম দিক থেকে আওয়াজ আসছে,চল।

দুজনের জঙ্গলের মধ্য প্রান্তে ছুটে গেলো।খানিক বাদে যা দেখলো দুজনে হতভম্ব হয়ে গেলো।

ঘোড়া থেকে নেমে দুজনে সেখানে ছুঁটলো।

জমিদার মহলে সকলে চিন্তিত মুখে বসে আছেন।সকালে নজর মহলের সিংহদ্বারের দিকে। সাহেলা, শারমিন কন্যাদের আশায় আকুল হয়ে আছেন।হামিদা সেই থেকে মালিনী আর তনিমা কে দোষারোপ করে যাচ্ছে। সাইফুদ্দিন নওয়াজ এবার বিরক্ত হলো, বলল,

“চুপ করো।তাদের কি দোষ?হয়তো কোনো সমস্যায় পড়েছে ইমতিয়াজ গেছে নিশ্চয়ই ফিরবে।

হামিদা চুপ হলো।রাগে ফুঁসলো ভেতরে ভেতরে।

জমশেদ আর সাইফুদ্দিন নওয়াজ খান মহলের সামনের দিকে গেলেন।তিন বধূ অন্দরমহলের দ্বারে অপেক্ষা করতে থাকলেন।কিছুক্ষণের মধ্যে অপেক্ষা বোধ-হয় ফুরলো। টগবগিয়ে ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ আসলো।ঘোড়ার গাড়ির টংটং শব্দ ও।একজন প্রহরী দৌড়ে এসে খবর দিলো সকলে এসে পড়েছে। খানিকবাদে মালিনী তনিমা আমাবস্যার ন্যায় আঁধারে নিমজ্জিত মুখ নিয়ে মহলে প্রবেশ করলো। সালেহা আর শারমিন দৌঁড়ে গেলো।হামিদা শুধালো,

“আমার ওয়াসিফ কোথাই?ঠিক আছে তো?এতো দেরি কেন হলো?

মালিনী আর তনিমা দুজনে চুপ রইলো। তখনই চোখের সামনে দূরে ওয়াসিফের দেখা মিললো।একপাশে ইমতিয়াজ আরেক পাশে জাভেদ দুজনে ধরে তাকে নিয়ে আসছে।হামিদা ছুটে গেলো।

“কি হয়েছে আমার পুত্রের?তার এই অবস্থা কেন?

কান্নারত হামিদার প্রশ্নের জবাব জাভেদ দিলো,

“আম্মা পরে সব বলছি।আগে ওকে কক্ষে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।ইমতিয়াজ ওয়াসিফের ডান কাঁধটা নিজের কাঁধে নিয়েছে।মালিনী আর তনিমার কাছে যেতে ওরা দুজনো মাথা নিচু করে রইলো।আসার পথে ইমতিয়াজ তাদের অনেক বকাঝকা করেছে।ওয়াসিফ অবশ্য বলেছে ওদের কোনো দোষ নেই।হামিদা পুত্রের পিছু পিছু ছুটলো।ওয়াসিফ হাত-পায়ে ব্যথা পেয়েছে। হাঁটতে পারছে না।মালিনী তনিমা দুজনে ঠিক আছে। কোনো আঘাত তাদের লাগেনি।নালিনী এবার তাকালো সিংহদ্বারে দাঁড়িয়ে থাকা মালির পানে।তার জন্যই তাদের শেষ রক্ষা হয়েছে।সাইফুদ্দিন নওয়াজ খান মালির সঙ্গেই কি যেন কথা বলছে।একটু পর সে চলে গেলো।সালেহাও বকতে বকতে মালিনী কে কক্ষে আনলো।কি হয়েছিলো তার আসল কারণ জানতে।

ওয়াসিফ কে পালঙ্কে শোয়ানো হয়েছে।এতো রাতে ডাক্তার আনানো সম্ভব নয় তাই গ্রামের এক কবিরাজ কে ডাকা হয়েছে।তিনি এসে দেখলেন।

পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বললেন,

“হাতের জখম হয়েছে সারতে কিছুদিন সময় লাগবে।পায়ের গোড়ালি এবং উরতের জায়গার মাংসে রক্ত জমাট বেঁধে লাল হয়েছে। কিছু ঔষুধ আর তেল দিয়ে যাবে নিয়মিত মালিশ করলে ঠিক হয়ে যাবে।

কবিরাজ চলে গেলো।জমশেদ তাকে নায্য পাওয়া বুঝিয়ে দিয়ে এগিয়ে দিয়ে আসলো।

ইমতিয়াজ এবার বসলো আসল কারণ ওয়াসিফের মুখ থেকে জানতে।ওরা নিজেও সব জানেনা এখনো।

“কি হয়েছিলো এখন খুলে বল।

ওয়াসিফ সকলের দিকে একবার তাকালো।বাম পা সামান্য সরাতে গিয়ে ব্যথা পেলো।ব্যথা গিলে নিয়ে বলতে শুরু করলো,

“আমরা যাত্রা দেখে ঘোড়ার গাড়ি করে আসছিলাম।জঙ্গলের পথে আসতেই হঠাৎ দূর থেকে নারী কান্নার কন্ঠ ভেঁসে আসে। এই মধ্য রজনীতে কে এই জঙ্গলে?মনে প্রশ্ন জাগলো কেউ বিপদে পড়েনি তো?ঘোড়ার গাড়ি আমার নির্দেশ মতো থাকলো।তনিমা আর মালিনী কে রেখে সেই কন্ঠ কোনদিক থেকে ভেঁসে আসছে কান পেতে বুঝতে পারলাম। ধীরে ধীরে পশ্চিম দিকে পা বাড়ালাম।খানিকটা যেয়েও কাউকে দেখতে পেলাম না।আর সেই নারী কন্ঠ ও বন্ধ হয়ে গেলো। হঠাৎ মতিষ্ক জানান দিলো এটা কোনো ফাঁদ নয়তো?বুঝতে পেরে ছুটে আসলাম। এসে দেখি কিছু লোক কালো কাপড় মুখে বেঁধে তনিমা আর মালিনীর গহনা খুলে নিচ্ছে।দুজনে ভয়ে বাঁধা দিতে চেয়েও দিচ্ছে না।যেই আমি পৌঁছালাম তারা সকলে আমাকে দেখে বলল,

“যা,যা আছে সব বাহির করে দে নয়তো শেষ করে দিবো।

“জানিস আমি কে?

“তুই কে জানার প্রয়োজন নেই।তাড়াতাড়ি বাহির কর।

এগিয়ে গিয়ে আড়ালে তলোয়ার বাহির করে একজনের উপর চালাতেই সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।তখনই আরেকজন তনিমা আর মালীনির গলায় তলোয়ার ধরে।তখনই থেমে যাই বাঁধ্য হয়ে।

তারা সুযোগ বুঝে একজনকে আঘাত করার প্রতিশোধ নিতে হাতের উপর তলোয়ার চলায় এবং পায়ে আঘাত দেয়। আরো জখম হতাম যদি আমাদের বাগানে কাজ করা মালি কাকার পুত্র না আসতো।সেও যাত্রা দেখে পায়ে হেঁটে আসছিলো পিছন থেকে তাকে দেখতে পায়নি। আমার ইশারায় দূরে পড়ে থাকা তলোয়ারটা তুলে একজনের গলায় ধরে।সে বড় সাহসী।তনিমা আর মালিনী কে ছেড়ে দেয় এবং যার গলায় ছুরি ধরেছিলো তাকে তাদের দলের একজন তলোয়ার দিয়ে আঘাত করে বাকি গুলো পালিয়ে যায়।তার পর তোমরা আসলে।মালি কাকার পুত্রের জন্য এ যাত্রায় বেঁধে গেলাম বলা যায়।তার কাছে আমার জীবনের কৃতজ্ঞতা রইলো।

ওয়াসিফ সবটা বলে থামলো।সকলে মনোযোগ দিয়ে শুনলো। সাইফুদ্দিন নওয়াজ খানের চিন্তা আরো বাড়লো।রাজ্যে নিত্যদিন কিছু না কিছু অঘটন ঘটছেই।এর মাঝে হামিদা প্রশ্ন করলো,

“তাদের দলের লোকটাকে কেন মারলো?

ওয়াসিফের আগেই জাভেদ উত্তর দিলো,

“তাকে ছেড়ে গেলে ধরা পড়ে যেতো। নিজের স্বার্থের জন্য দলের লোকদের মারতে তাদের কোনো অনুশোচনা হয় না।এমনটাই তাদের নিয়ম হয়তো।

ইমতিয়াজ নিশ্চুপ হয়ে শুনলো।সাইফুদ্দিন নওয়াজ খান সকল কে নির্দেশ দিলো নিজ নিজ কক্ষে যেতে।ওয়াসিফ এখন বিশ্রাম নিবে।সকলে ধীরে ধীরে চলে গেলো।হামিদা থাকতে চাইলেও ওয়াসিফ থাকতে দিলো না। দূর হতে তনিমা উঁকি দিয়ে দেখছে।কেউ খেয়াল না করলেও ওয়াসিফ করলো।নজরে পড়লো আঁধারে নিমজ্জিত শুষ্ক মুখশ্রী।সকলে যখন বাহির হচ্ছিলো তখনই সে ছুঁটো পালায়।হামিদা কক্ষের দরজা বন্ধ করে দিয়ে বেরিয়ে আসে।আসতেআসতে জমশেদ কে বলে,

“ডাকাতের প্রভাব বাড়লো কি করে?

“রাজ্যে যখন র্দূভির্ক্ষ দেখা দিবে সাধারণ প্রজাও তখন ডাকাতের রূপ নিবে।

হামিদা ঠিক বুঝলো না।জাভেদ তখন বললো,

“আম্মাজান আপনার প্রিয় পুত্র কে রাত্রে বাহিরে যেতে নিষেধ করবেন।ভাইজান প্রীতি দেখাতে গিয়ে যেন জান টা না হারায়।

হামিদা ভয় পেলো।সে যেমনই হোক পুত্র কে হারানোর ভয় সবকিছুর উর্ধে।কাল সকালে সে বুঝাবে,দূরে রাখবে ইমতিয়াজ কিংবা মহলের সকলের থেকে।

ইমতিয়াজ মাত্র ভোজন শেষ করে আসলো।আসার পথে ওয়াসিফ কে একবার দেখেও আসলো।

আঘাত অনেকটা লেগেছে তাই তো ব্যথা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।বৃদ্ধি হয়ে সেরে যাবে।মেহেরনাজ কাল রাতের পর আজ সকাল দুপুর পেরিয়ে গেলেও একটা কথা বলেনি।

চোখের দিকে তাকালে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে।ইমতিয়াজ সেরকম একটা গুরুত্ব দেয়নি। তখনই মেহেরনাজের আগমন ঘটলো।কক্ষের প্রবেশ করে কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি নিয়ে আবার বাহির হতে চাইলো।ইমতিয়াজ পথ আগলে দাঁড়ালো সামনে।

মেহেরনাজ পথে বাঁধা পেয়ে তাকালো তবুও একটা কথা বললো না।

“মুখে কি কুলু পেটেছো?কথা বলছো না কেন?

তবুও নিশ্চুপ। আবারো প্রশ্ন করলে মেহেরনাজ ধ্বাক্কা দিয়ে সরিয়ে চলে যায়।ইমতিয়াজ কক্ষের বাহিরে তার দিকে তাকায়। মুঁচকি হেঁসে ধীর কন্ঠে আওড়ায়,

“যে ভালোবাসায় আজ ঘৃণা লাগছে বেগমজান,কাল সেই ভালোবাসা পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেবে তোমার মন ও প্রাণ।”

মালিনী মন খারাপ করে বসে আছে।কাল সালেহা বেগম বেশ বকেছে।কেন তারা যাত্রা দেখার বায়না করেছে?ওয়াসিফ জখম হতো না যদি না যেত।তনিমা মালিনী দুজনে বলেও বুঝাতে পারেনি তারা যেতে বায়না ধরেনি।শেষে দুজনে চুপ হয়ে আছে।

মালিনী আজ ও বাগানে গিয়েছিলো কিন্তু মালি আসেনি আজ।তার হৃদয় ব্যাকুল হয়ে থাকে তাকে দেখার জন্য।তার এই আকুলতা হবে না তো একদিন অভিশপ্ত?

তনিমা সেই থেকে ওয়াসিফের কক্ষের সামনে ঘুরঘুর করছে। ভেতরে হামিদা আছে বলে যাচ্ছে না।ওয়াসিফ সামান্য ওড়নার অংশ দেখতে পেলো।বুঝতে পারলো ওড়নার মালিক কে।

“আম্মা আমার জন্য কিছু ফল কেঁটে আনেন তো।

হামিদা পুত্রের কথামতো সঙ্গে সঙ্গে ফল আনতে ছুটলো।আড়াল হলো তনিমা। হামিদা যেতেই ওয়াসিফ বলে উঠলো,

“বাহিরে না থেকে ভেতরে আয়।

তনিমা চমকে উঠলো।কেঁপে উঠলো কিছুটা।তিনি কি করে জানলো আমি বাহিরে?

ভাবতে ভাবতে কক্ষে প্রবেশ করলো। দাঁড়ালো ওয়াসিফের ঠিক পাশে।ওয়াসিফ তাকালো শুকনো মুখপানে।

“দুপুরে খাসনি নাকি?

তনিমা একবার বামে ডানে মাথা নাড়ালো।হুস ফিরে আবার উপর নিচে মাথা নাড়ালো।

তার এমন ভুলভাল উত্তরে ওয়াসিফ নিঃশব্দে হাঁসলো।হাঁসি টুকু গিলে গম্ভীর কন্ঠে বলল,

“খেয়ে তার পর আসবি।তোদের জন্য আঘাত পেয়েছি মাঝে মধ্যে সেবা করবি।

তনিমা যেন এটাই চেয়েছিলো।ঠোঁটের কোনে হাঁসির রেখা ফুটে উঠলো।হাঁসি মুখে মাথা নাড়িয়ে বেরিয়ে আসলো।ওয়াসিফ তার পানে তাকিয়ে হাঁসলো।মনে মনে বলল,

“ভালো লাগে না আঁধারে বিলীন হওয়া তার হাঁসি,

তার হওয়া সমস্ত সুখ টুকু'কে আমি ভীষন ভালোবাসি।”

ধমনীতে আঁধার নেমেছে।আলো ফুরিয়েছে অনেক আগেই।শীতকাল চলে গিয়েছে অনেকটা।এখন চলছে ফাল্গুন মাস।প্রকৃতিতে চলছে খোলস ছেড়ে নতুন আগমনের ডাক।গাছের পাতা ঝরছে,নতুন পাতা গজাচ্ছে,গাছে গাছে ফুল ফুঁটছে।সবকিছু কেমন নতুন লাগছে।প্রকৃতি নতুন সাজে সাজছে।

রাতের আঁধারে সবকিছু নিকষ কালো লাগছে।

আজ ইমতিয়াজ কক্ষে অপেক্ষা করছে।মেহেরনাজ এখনো আসছে না।সারাদিন কথা বলেনি।বিকেলে একটা কাজে বেরিয়েছিলো সন্ধ্যে হতে ফিরেছে। ভোজন শেষে সাইফুদ্দিন নওয়াজ খান ডেকেছিলেন কাচারি ঘরে।বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ আলোচনা হলো।কি করতে হবে এ্যাঁ জানালো।তার পর ইমতিয়াজ চলে এসেছে।এতক্ষণে সকলের ভোজন শেষ হওয়ার কথা।

ইমতিয়াজ কক্ষের বাহিরে কয়েক বার উঁকি দিলো

কিন্তু মেহেরনাজের দেখা নেই। আবার অস্থির হয়ে পালঙ্কে এসে বসলো।আবার উঠে দাঁড়ালো দেওয়াল বরাবর তাকালো।আলমিরা হতে কিছু একটা পাঞ্জাবীর পকেটে রাখলো।

“ভাইজান আসবো?

“আয়।

অনুমতি পেয়ে মালিনী প্রবেশ করলো। ইতস্তত বোধ করেও বলল,

“ভাইজান,ভাবি বেগম আজ আমার সঙ্গে আমার কক্ষে থাকবে বলেছে।আপনি অনুমতি দিন আমরা কতদিন একসঙ্গে হয়ে গল্প করিনা।

ইমতিয়াজ বোনের পানে চাইলো।মালিনী ভাইজানের কুঁচকানো দৃষ্টি দেখে মাথা নিচু করলো।

ইমতিয়াজ কিছু একটা ভেবে হাঁসলো,উত্তর দিলো,

“ঠিক আছে।

মালিনী চোখ তুলে তাকালো।অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তরে আনন্দিত হলো।ছুঁটে গেলো মেহেরনাজ কে এই খবর দিতে। মালিনী যেতেই ইমতিয়াজ কক্ষের দরজা বন্ধ করে দিলো।মেহেরনাজ একটু দূরে পর্দার আড়ালে ছিলো। মালিনীর পিছনে পিছনে সেও চললো।তার মাথায় চলছে অন্য কিছু।

গভীর রাত্রি সকলে তখন বিভোর ঘুমে।সজাগ কেবল মেহেরনাজ আর একজন।মালিনী গল্প করতে করতে অনেক আগেই ঘুমিয়েছে।মেহেরনাজ তার নিজ কক্ষ বরাবর পর্দার আড়ালে সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছে।কিন্তু দরজা খুলছে না।মেহেরনাজের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙলো।কক্ষের দিকে অগ্রসর হলো।কক্ষের দরজায় হাত দিলে সামান্য ধাক্কা দিতেই খুলে গেলো।পুরো কক্ষ ফাঁকা পড়ে আছে।কেউ নেই কক্ষে।মেহেরনাজ জানালার সামনে দাঁড়ালো প্রথমে নজর পড়লো দূরে ছোট একটি গৃহে।তার পর সে বেরিয়ে পড়লো। অন্দরমহলের সবাই ঘুমিয়ে।অন্দরমহলর সামনে দুটো প্রহরী ঝিমচ্ছে।মেহেরনাজ তাদের পেরিয়ে চলে গেলো।থেমে গেলো সিংহদ্বারের সামনে।সেখানে প্রহরীরা সজাগ।এবার কি করবে?

আশে পাশে তাকালো।হঠাৎ মাথায় বুদ্ধি আসলো।পা চালিয়ে মহলের পিছন দিকে গেলো।উঁচু উঁচু দেওয়াল টপকানো ছাড়া উপায় পেলো না। দিনেই সে ব্যবস্থা করে রেখেছিলো একটি মই।সারাদিন কথা না বলা,মালিনীর কক্ষে থাকা সবই তার অভিনয়।

মই বেয়ে দেওয়াল টপকালো।ওপাশে নেমে আশে পাশে তাকিয়ে দেখলো সামনে দুজন প্রহরী টহল দিচ্ছে। মেহেরনাজ আড়াল হলো।প্রহরী দুজন যখন পিছন ঘুরলো সেই সুযোগে মেহেরনাজ স্থান ত্যাগ করলো।ধীরে ধীরে এগিয়ে চললো সামনের দিকে।অনেকটা যেতেই স্পষ্ট হলো বাঈজী গৃহ।

মেহেরনাজ থামলো।আলো জ্বলছে সেই মহলের সামনে।কক্ষ অনেক কয়টা বলা যায়।

মেহেরনাজ আশে পাশে তাকিয়ে পিছন দিকে গেলো।এক এক করে সেই কাঙ্ক্ষিত কক্ষটি খুঁজে বাহির করলো।আমিরাতের থেকে যে কক্ষের বর্ননা শুনেছিলো।ভেতরে না গেলে জানবে কি করে?

কিন্তু কক্ষের দরজা নিশ্চয়ই খোলা থাকবে না?

মেহেরনাজ ধীরে ধীরে সামনের দিকে গেলো।বাঈজী মহলে সংগোপনে প্রবেশ করলো। আশ্চর্যের বিষয় হলো সদর দরজা খোলা পেলো।তবে তার সন্দেহ ঠিক হলো?প্রথমের দুটো কক্ষের দরজা বন্ধ।ধীরে ধীরে পা টিপে কাঙ্ক্ষিত কক্ষটির সামনে গেলো।কিন্তু এই কক্ষের দরজাও তো বন্ধ।

হঠাৎ কারো আগমনের শব্দে মেহেরনাজ কিছুটা ভয় পেলো।সেখানে একটা বড় মটকার পিছনে লুকিয়ে পড়লো।আঁধারের কারণে দেখতে পেলো না।তবে মেহেরনাজ দেখতে পেলো একটি অপরুপ সুন্দরী নারী উঁকিঝুঁকি দিয়ে আবারো পাশের কক্ষে প্রবেশ করলো।মেহেরনাজের সামনে কক্ষের জালানা ছিলো।আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো জালানা লাগানো নেই শুধু পর্দা ভিড়ানো। মেহেরনাজ এগিয়ে গেলো।জানালার পর্দা ধীরে সরিয়ে মাথা উঁচিয়ে যা দেখলো তাতে মেহেরনাজ স্তব্ধ হয়ে গেলো।আচমকা হাত মুখ চেপে ধরলো। কক্ষের ভেতরে একজন সুন্দর নারীর হাত ধরে খুবই নিকটে বসে আছে কেউ।তার মুখ দেখা না গেলেও পোশাক খুবই পরিচিত।মেহেরনাজ আর দেখতে পারলো না।জানালার পর্দা ছেড়ে দিয়ে বসে পড়লো।শরীর অবস হয়ে আসছে,নিজেকে অসহায় লাগছে।কেন এমন মুহূর্ত দেখতে হলো?আল্লাহর কাছে জানতে চাইলো।নিঃশব্দে।।। চোখের কুর্ণিস বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো।কান্নারা দলা পাকিয়ে নিঃশব্দে ছড়লো। সাহসী মেহেরনাজ ও ভেঙে পড়লো।ভালোবাসার কিংবা সম্পর্ক যাই বলেন দুটোর কাছে সবাই দুর্বল।

চলবে...................?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন