#জমিদার_মহল
#পর্বসংখ্যা—১৭
#শ্যামলী_রহমান
রাজ্যে কাল রাত্রে ও ডাকাতু হয়েছে।এক দূর গ্রামে নদীর অন্ত বর্তী এলাকায়।একপাশে পাহাড় অন্য পাশে নদী আর ঠিক মাঝে একটি ছোট গ্রাম।প্রজাদের সম্বল গরু,ছাগল টাকা পয়সা সব লুট করে নিয়ে গেছে। সাইফুদ্দিন নওয়াজ খান সকাল হতেই সে গ্রামে গিয়েছে।প্রজারা কাঁদছে।কিছু জন তো পায়ের সামনে পড়ে বলল লাগলো,
“জমিদার মশাই এখন আমাদের কি হবে?ছোট ছোট পুত্র কন্যাদের কি খাওয়াবো?ফসল তো সব নষ্ট হয়ে গেছে।আমরা বাঁচবো কি করে?
সাইফুদ্দিন নওয়াজ খান বেশ চিন্তায় পড়েছেন।বেশ কিছুদিন থেকে চেষ্টা করেও এই ডাকাত দলের খোঁজ কিংবা ঠিকানা পাওয়া যায়নি।
“তোমরা সব জমিদার মহলে যাবে।তোমাদের ব্যবস্থা আমি করবো।
জমিদারের এই একটা কথায় প্রজাদের দুঃখী মুখে একটু হাঁসির ঝলক মিললো।
“আপনি শত বছর বাঁচুন জমিদার মশাই।আপনার মতো দয়াবান জমিদার ভাগ্য করে পেয়েছি।
প্রজাদের সুখ দুঃখ কেবল আপনি বুঝেন।
জমিদার সেসবে কান দিলেন না।তার চিন্তা অন্য। এভাবে চলতে থাকলে কোষাগার হবে খালি।
কে আছে এই ডাকাত দলের সঙ্গী?সকালের নজর ফাঁকি দিয়ে চালাচ্ছে এমন কারবারি?
মেহেরনাজ আর মালিনী পুষ্কুনিতে গোসল সারতে গেছে।কিছুজন দাসি পাহারা দিচ্ছে।এদিকে অবশ্য পুরুষ মানুষ আসে না বলাই আছে।
মেহেরনাজ আর মালিনী সাঁতার কাটছে।মেহেরনাজ সাঁতার কাটতে,কাটতে মালিনীর উদ্দেশ্য বলল,
“আজকাল মনের অসুখ করেছে দেখি।একমাত্র সখীর থেকে অনেক কিছুই লুকাস।কিন্তু আমার নজরে সবই আসে।বুঝতে পারি কিন্তু বলিনা।
মালিনী সাঁতার কাটা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে পড়লো।মেহেরনাজ ও তাই করলো।মালিনী পুষ্কনির চারপাশ খেয়াল করলো।মেহেরনাজের দৃষ্টি তার দিকেই ছিলো।স্পষ্ট স্বরে বলল,
“মালি কে আমার পছন্দ হয়েছে,ভালো লাগে মনের অজান্তে।এ কি প্রেম নাকি ভালোবাসা? তা জানিনা।শুধু এতটুকু জানি মালি কে না দেখলে আমার পরাণ পুড়ে,হৃদয় ঝটপট করে।তাকে এক নজর দেখার অপেক্ষায় পাগল,পাগল লাগে।কেন এমন হয় বলতো ভাবি বেগম?
মেহেরনাজ এতক্ষণ সবটা মম দিয়ে শুনলো।এবার সে হেঁসে উঠলো।আমার ধারণা তবে ভুল ছিলো না।
মালিনীর উত্তরের অপেক্ষা দেখে সে বলল,
“প্রেম নাকি ভালোবাসা তা তোমার হৃদয় বলবে।
নিজেকে হৃদয় কে প্রশ্ন করো।কি উত্তর আসে?
“যদি ভালোবাসা আসে,তবে ভাবি বেগম মহলে কেলেঙ্কারির হয়ে যাবে।আব্বাজান কি মানবেন?
মেহেরনাজ হাতে জল খেলতে খেলতে প্রতিত্তোর করলো,
“কেলেঙ্কারির ভয় করলে কি আর ভালোবাসা যায়?
ভালোবাসলে বুকে সাহস রাখতে হয়,ভালোবাসার মানুষ কে আপন করতে শত বাঁধা পাড়ি দিতে হয়।
মালিনী যেন সাহস পেলো।মেহেরনাজের হাতখানা ধরে আবার বলল,
“কিন্তু সে আমার থেকে দূরে পালিয়ে যায়।ভালোবাসার কথা বলার সুযোগটা কোথাই?
“দূরে পালায় ভবিষ্যৎ ভেবে।জমিদার কন্যা কে পাওয়ার আশা করা যে অনেক র্দূবীষহ জীবনে আনবে বয়ে।
“তুমি আমার সঙ্গে থেকো,ভাইজান কে একটু বুঝাইও।আমি মালি কে নিজের মনের কথা জানিয়ে দিবো।
মেহেরনাজ হাতখানা ছাড়িয়ে নিলো।ঠোঁটের কোনে ব্যঙ্গ হাঁসি ফুটিয়ে বলল,
“তোমার ভাইজান আমার কথা শুনবে?সে কি আমার মনের মানুষ যে আমার কথায় বাঁধা পড়বে?
“ভাইজানের মধ্যে আজকাল পরিবর্তন দেখি।তোমার আগমনে তার চোখে তোমাকে হারানোর ভয় দেখি,ভালোবাসাও দেখি।তুমি কেন বলো সে তোমায় ভালোবাসে না?
মেহেরনাজ ঘাটের দিকে উদিত হলো।মালিনীও পিছু নিলো।যেতে যেতে বলল,
“চোখের সামনে যা দেখি সব সময় তা সঠিক হয় না।মানুষ চেনা বড় দায় বুঝলি?যেদিন কাছের মানুষের আসল মুখোশ টা দেখবি,সেদিন নিজেকে নিঃস্ব লাগবে,পৃথিবীর সমস্ত কিছু বিষাদ মনে হবে।
মানুষ উপরে উপরে যেমন দেখায় আসলে তারা তেমন নয়।খোলস পরে থাকে,আড়ালে ঠিকই কুকর্ম করে।
মালিনী কিছুই বুঝলো না। একটু ভেবে প্রশ্ন করলো,
“কি বিষয়ে বললে?
“সময় হলে বুঝবি।আপন মানুষের আসল রূপ যেদিন জানবি।
মালিনী এবারো কিছু বুঝলো না। দুজনে পুষ্কনি থেকে উঠে পড়লো।দাসিরা এগিয়ে আসলো কিছু লাগবে কিনা জানতে।তখনই বিশাল আকৃতির একটি বাঁদর এসে পুষ্কনির পাশে হাজির হলো।
দু-একজন দাসি ভয়ে পালালো।তা দেখে মেহেরনাজ হেসে উঠলো।সে ধীর পায়ে বাঁদর টার সামনে গেলো।কিন্তু মালিনী তাকে আর যেতে দিলো না টেনে নিয়ে গেলো।
“সামনে যাচ্ছো কেন?যদি কামড় দেয় কিংবা আঁচড় কাটে তখন?পশুর বিশ্বাস নেই।এরা বিষাক্ত হয়।বলেই দাসিদের বলল আমরা গেলে প্রহরীদের জানাবে এটা যেন তাড়িয়ে দেয়।মেহেরজান যেতে যেতে পিছনে ফিরলো।বাঁদরটার দিকে তাকিয়ে মালিনীর প্রশ্নের উত্তর দিলো,
“পশুর চেয়েও কিছু মানুষ বেশি বিষাক্ত।পশুরা রূপ বদল করতে পারে না কিন্তু মানুষ রূপ বদল করে থাকে।তারা মানুষ পশু দুটোর রূপ ধারন করে।সময়ের সাথে তাদের আসল রূপ বেরিয়ে আসে।
মালিনীর মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে সব কথা।মেহেরনাজ আজকাল কেমন রহস্যজনক কথা বলে।যা সে কিছুই বুঝে না।এতোকিছু বোঝার বয়স হয়নি নাকি মাথায় ঢোকেনি?
ইমতিয়াজ কাল বেরিয়েছে আজ ও মহলে ফিরেনি।কোথায় গেছে সাইফুদ্দিন নওয়াজ ছাড়া আর কেউ যানেনা।সালেহা বেগম কয়েক জিজ্ঞেস করেছেন কিন্তু স্বামীর থেকে কোনো উত্তর পায়নি।
মেহেরনাজ ও জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করেনি।তার মন এমনি বিষন্ন।এই বিষন্নতা কবে কাঁটবে?কিছু সময় এমন পরিস্থিতিতে দাঁড় করার না পারা যায় সহ্য করা,আর না যায় উপেক্ষা করা।
মেহেরনাজ হাতের কাজ শেষ করে কক্ষে বসে ছিলো।হঠাৎ তার মনে পড়লো সেদিনের সেই পুরনো কক্ষে পাওয়া চিঠির কথা।পালঙ্ক হতে নেমে লুকিয়ে রাখা চিঠিটি বাহির করলো।তার আগে কক্ষের দরজা বন্ধ করতে ভুললো না।
চিঠিটি হাতে নিয়ে ভালো করে দেখলো। অর্ধ লেখাটা আবারো ভালো করে পড়লো। জমিদার মহলের ধ্বংস কার হাতে?যদি সকলে বুঝতে না পারে?কে চায় ধ্বংস লিলা?যদি বিশ বছর আগে চাইতো তবে কেন এখনো অপেক্ষা করে আছে?
মেহেরনাজের হিসাব মিলছে না।
কি করবে কিছু বুঝতে পারছে না।মন বলছে যদি কেউ পাশে থাকতো সমস্ত কথা কাউকে বলা যেত,তবে ভালো হতো।আজম খানের বিষয়ে জানতে হবে।একবার কি জমিদার কে জিজ্ঞেস করবে?
ওয়াসিফ এখন অনেকটা সুস্থ।হাঁটতে পারে কিছুটা।না পারলেও চেষ্টা করে জোর করে হাঁটে।
এই তো এখন কক্ষের বাহিরে যেতে উঠতে নিচ্ছে।
খড়ম পরতে গিয়ে ব্যথা পেলো।চোখ বন্ধ করে সহ্য করলো।কাউকে না ডেকে উঠে পড়লো।দরজার কাছে যেতে হুট পা ফেলাতে গড়মিল হয়ে পড়ে যেতে নিলো।তনিমা দৌঁড়ে এসে আগলে নিলো।সে সামনেই ছিলো কক্ষের দিকেই আসছিলো।
“আপনি হাঁটতে পারছেন না তবুও জোর করে হাঁটতে চাচ্ছেন কেন?আরো ব্যথা পেতে চান।আপনাকে না বলা হয়েছে বাহির হবেন না।আগে না শুনতেন এখন না হয় একটু কথা শোনেন।চাচি আম্মা বকবে দেইখেন।
আকুতিভরা কন্ঠে ওয়াসিফ তাকালো।
তনিমা এমন চাহনিতে হকচকিয়ে গেলো।
ওয়াসিফ নিঃশব্দে হেসে বলল,
“আমি ব্যথা পেলে সবার এতো উতলা?
“সবাই আপনাকে ভালোবাসে তাই।
“তুই ও বাসিস?
তনিমা চমকে তাকালো।ওয়াসিফের নজর তখনো তারই পানে ছিলো।মাদকতা নাকি আসক্তি কি আছে ওই দৃষ্টিতে?
“কি হলো বল?
তনিমা হুসে আসলো।আমতা আমতা করে বলল,
“বাসসো না কেন?আপনি আমার ভাইজান হন সে হিসাবে ভালোবাসা থাকবে অস্বাভাবিক কিছু নয়।
ওয়াসিফের মুখখানা চুপসে গেলো।তনিমার উত্তর তার মোটেও পছন্দ হলো না।হৃদয়ে ভালোবাসার সুবাস ছড়িয়ে,এখন আলকাতরা ঢালতে চাইছে।
ওয়াসিফ ধীর পায়ে আবার পালঙ্কের উপর গিয়ে বসলো।তনিমাও পিছু নিলো।সামনে গিয়ে বলল,
“আপনার কিছু লাগবে?চাচি আম্মা কাজ করছে তাই পাঠালো।
“না কিছু লাগবে না।তুই এখন যেতে পারিস।
গম্ভীর কন্ঠ শুনে তনিমা অবাক হলো।এই তো ভালো ছিলো এখন আবার কি হলো?
মানুষের ভাবমূর্তি বোঝা বড় মুসকিল।তনিমাও আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। মালিনী তাকে ডেকেছে যেতে হবে।তাই সেও তাড়াতাড়ি করে বেরিয়ে গেলো।ওয়াসিফ শুধু চেয়ে দেখলো।
চঞ্চলী কন্যার ছুটে বেড়ানো।
“এভাবে ছুটছিস কেন?
তনিমা থামলো।হাসিমাখা মুখখানা মিলিয়ে স্বাভাবিক হলো।সামনে শিহাব দাঁড়িয়ে আছে।
ভাইজানের প্রশ্নে তনিমা বলল,
“ওই ভাইজান মালিনী ডাকছিলো তাই যাচ্ছি।তাড়া ছিলো তাই ছুটছিলাম।
শিহাব সন্দেহ ভাজন দৃষ্টিতে তাকালো তবে আর কোনো প্রশ্ন করলো না।তনিমা ধীর পায়ে তার ভাইজান কে পেরিয়ে গেলো।শিহাব কে সে ভয় পায়।সবাই কেমন রাগি আর গম্ভীর কন্ঠে কথা বলে।একমাত্র ওয়াসিফ কে আজকাল হাসিহাসি লাগে।কি যে দারুন দেখতে লাগে হাঁসি মুখের চিত্র।
“আপনি আজম খান নামে কাউকে চিনেন?
সাইফুদ্দিন নওয়াজ খান নিজ কক্ষের দিকে সবে আসছিলেন।তখনই পিছন থেকে এমন প্রশ্ন শুনে থ
ঘুরে তাকালো।মেহেরনাজ ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে।
ঠোঁটের কোনো প্রশ্ন আর উত্তর জানার তীব্র আগ্রহ।তবে সামনের ব্যক্তির মুখশ্রী পরিবর্তন হয়েছে।কেমন যেন চমকেও উঠেছে। মেহেরনাজ একটু এগিয়ে আসলো।
“কি হলো চমকে উঠলেন যে?চিনেন এই নামে কাউকে?
সাইফুদ্দিন নওয়াজ অস্থির হলো।পা জোড়া চলতে চাইলো,প্রশ্ন এড়াতে কি বলবে তা খুঁজলো।কিন্তু এড়িয়ে গেলে পালাবে ভাববে তাই তিনিও শুধালো,
“এই নাম তুমি কি করে জানলে?
“আপনার পুত্র বলেছে।আজম খান নাকি এক সময় আপনার বন্ধু ছিলো।
সাইফুদ্দিন নওয়াজ বাঁকা চোখে তাকালেন,বললেন,
“ইমতিয়াজ বলেছে?কিন্তু কেন তার বাম হঠাৎ?
“গল্প শুনালো এই জমিদার মহলে কত রহস্য লুকিয়ে আছে তা জানালো।এবার বলুন।
“হ্যাঁ চিনতাম কিন্তু সে আর এই পৃথিবীতে নেই তাই আর তার নামে কিছু বলতে চাচ্ছি না। বলেই চলে যেতে নিলো।
“কেন উনার মৃত্যু হলো?হঠাৎ কি এমন ঘটেছিলো?আপনার বন্ধু ছিলো হয়তো খনিকের। কিন্তু বন্ধু তো।আপনার তার মৃত্যু অস্বাভাবিক লাগেনি?
সাইফুদ্দিন নওয়াজ খান থেমে গেলো। পিছনে ফিরে উত্তর দিলো,
“অস্বাভাবিক কেন লাগবে?হঠাৎ মৃত্যু কি কারো হচ্ছে না?কত-শত মানুষই তো ঘুমন্ত অবস্থায় পরপারে চলে যাচ্ছে তবে তোমার কোন এতো বছর অস্বাভাবিক লাগবে?আর কেনই বা তুমি এসব নিয়ে ঘাটছো?
“কারণ... বলতে গিয়েও মেহেরনাজ থেমে গেলো। নজর পড়লো দূরে পর্দার আড়ালে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে।মেহেরনাজ সেদিকে দৌঁড়ে গেলো।
সাইফুদ্দিন নওয়াজ খান কিছুই বুঝলো না। তবে কিছুটা রাগ হলো।ইমতিয়াজ ফিরলে এ বিষয় নিয়ে তুলকালাম হবে বলেও ভাবলো।
“তুমি এখানে কি করছো?
মেহেরনাজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দাসিটি ভয়ে কাঁপতে লাগলো।মাথা নিচু করে ভয়ার্ত কন্ঠে বলতে চেষ্টা করছে,
“ আ আ আমি এখানে পরিষ্কার করছিলাম।আপনারা কথা বলছিলেন তাই আর সামনে যাইনি।মাফ করবেন এমন আর কখনো হবে না।
মেহেরনাজ কিছু বললো না।দাসিটি ছুঁটে পালালো ভয়ে।মেহেরজান ও সেই স্থান ত্যাগ করলো। ততক্ষণে সাইফুদ্দিন নওয়াজ খান ও নিজ কক্ষে চলে গেছেন।মেহেরনাজ চলে যেতেই তার ঠিক পিছনে পর্দার আড়াল হতে কেউ একজন সরে পড়লো।যে এতক্ষণ ধরে সবই দেখলো এবং শুনলো।বাতাসে নতুন রহস্যের সুবাস ছড়িয়ে পড়লো।
চলবে.........................?