#জমিদার_মহল
#পর্বসংখ্যা–১৮-১৯
#শ্যামলী_রহমান
বাহিরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে।তীব্র হওয়ায় গাছের ডালপালা আঁচড়ে পড়তে চাইছে মাটিতে।সন্ধ্যে হতেই বৃষ্টির রেশ যেন আরো বাড়লো।হঠাৎ বৃষ্টিতে কৃষকেরা খুশি হলেও অতিবৃষ্টি ও আবার ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।মহলের প্রতিটি নারী তখন রসুই ঘরে রন্ধনের কাজে ব্যস্ত।এদিকে মেহেরনাজ নেই।সেই বিকেলে তার আব্বাজানের মহলে গেছে এখনো ফিরেনি।ইমতিয়াজ ও ফেরেনি বলে সালেহা বেগম বার বার খোঁজ নিচ্ছে কখন ফিরবে প্রিয় পুত্র।তনিমা মায়ের সঙ্গে কাজে সাহায্য করছে।মালিনী চুপচাপ বসে দেখছে।সে আজকেও মালি কে বলতে পারেনি।বলতে গিয়েছিলো কিন্তু বাঁধা হয়েছিলো কিছু প্রহরী।তাই ফিরে আসতে হয়েছে।সময়ের অপেক্ষায় থাকতে হবে।কিন্তু এই অপেক্ষা যেন সহ্য হচ্ছে না।মন তো চাইছে ছুটে যাই,জাপ্টে ধরে বলি,“ভালোবাসি আপনাকে আমি।
তিনি কি আমায় মানবেন?বাসবেন ভালো?
“কি রে কি ভাবছিস?চল কক্ষে যাই।
তনিমার হাতের ধ্বাক্কায় মালিনী ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসে। হকচকিয়ে উঠে বলে,
“হ্যাঁ কি বললে?আচ্ছা চলো।
তনিমা ভ্রু কুঁচকে তাকালো।মালিনীর এমন আবোলতাবোল কথা কেমন ভাবাচ্ছে।কি চলছে তার মনে?
মালিনী বলতে ভয় পায়।যদি অন্য কেউ আগেই জেনে যায় তবে ভয়ংকর কিছু হতে পারে।
আগে সখা জানুক তার পর না হয় সকলে জানবে।
ভালোবাসার আবদার নিয়ে দাঁড়াবো,ফিরিয়ে দেয় নাকি গ্রহণ করে এ্যাঁও দেখতে হবে।
তনিমা আর মালিনী চলে গেলো।সুযোগ বুঝে
হামিদা বলে উঠলো,
“তোমার পুত্রবধূ সেই গেলো এখনো এলো না যে বুবু?স্বামী কই যায়,কখন আসে তার একটুও খোঁজ ও রাখে না।এতকিছু দেখার পরও কি তোমার মনে হয় আমিরাত কন্যা আমাদের ইমতিয়াজ কে ভালো রাখবে?
সালেহা কিছুই বললো না তবে মুখ ভার ঠিকই হলো।হামিদা তা লক্ষ্য করে হাঁসলো।এভাবে কাজ এগুতে হবে।সরাতে হবে মেহেরনাজ কে এই মহল থেকে এবং ইমতিয়াজের জীবন থেকে।বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি তার।চোখের সামনে এমন তাবেদারি দেখতে ভালো লাগছে না।
মেহেরনাজ সেই কখন থেকে কক্ষে বসে আছে। মাহবুবা বেগম কিছু প্রশ্ন করলেও তার উত্তর দিচ্ছে না।চোখে মুখে হাঁসি নেই,আছে শুধু কষ্টের ছাপ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে থাকছে নিশ্চুপ।মাহবুবা বেগম ও হাল ছাড়ার মানুষ নন।তিনি আবারো জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে আম্মা?বল আমাকে।কেন এমন অসুখী ভাব মনের মধ্যে?
মেহেরনাজ এবার তার আম্মাজানের পানে তাকালো।নিশ্চুপ ঠোঁটে তীর্যক হাঁসির রেখা ফুটে তুললো।অদূরে জানালার পানে চেয়ে বলল,
“আম্মা মানুষ চেনা ঠিক কতটা কঠিন?মানুষ চিনতে কি কাছাকাছি থাকতে হয় নাকি সময়ের সঙ্গে চেনা যায়?”
“পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন কাজই হলো মানুষ চেনা।মানুষ চিনতে কাছাকাছি থাকতে হয় না। কখনো দূর থেকে এক পলক দেখলেও চেনা যায়। আবার কখনো একসঙ্গে যুগ যুগ পার করে দিলেও চেনা যায় না।
মেহেরনাজ মাহবুবা বেগমের দিকে তাকালো।তার আম্মাজানের চোখে জল দেখে হুট করে জড়িয়ে ধরলো।হু হু করে কেঁদে ফেললো।ভঙ্গুর কন্ঠে বলল,
“আমি কাছে থেকেও চিনতে পারছি না আম্মাজান।
জীবন এ কেমন পরিস্থিতির সম্মুখে আনলো?না পারছি বলতে আর না পারছি সহ্য করতে।
বললেও নিজের নামের পাশে বদনাম যোগ হবে,না বললে নিজের কাছে নিজেকে অপরাধী লাগবে।
এখন মনে হচ্ছে জন্ম না নিলেই বোধ-হয় ভালো হতো আম্মাজান।
মাহবুবা বেগম কন্যা কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।মেহেরনাজ কে বুকে রেখে নিজেও কেঁদে যাচ্ছেন।
আমিরাতকে এক কাজে কালকে গ্রামের বাহিরে পাঠিয়েছেন জমিদার সাইফুদ্দিন নওয়াজ খান।
মেহেরনাজের কিছু প্রশ্ন আবারো জানার ছিলো কিন্তু তার আব্বাজান নেই তাই মহলে ফিরতে হবে।
বৃষ্টির রেশ কমার অপেক্ষা করছে।মাহবুবা বেগম উঠে গিয়ে মেহেরনাজের পছন্দের জলপান আর সন্দেশ এনে দিলো।মেহেরনাজ এক নজর তাকালো।আজকাল পছন্দের কোনো কিছুই আর ভালো লাগছে না।তবে আম্মাজান এনেছে কষ্ট পাবে ভেবে একটুখানি মুখে দিলো।মাহবুবা বেগম শুধু তাকিয়ে রইলো।কন্যার কষ্ট সে বুঝতে পারছে কিন্তু কি বা করার আছে?
‘চাইলেই সুখ যেমন কেনা যায় না,
তেমনই,দুঃখ-কষ্ট ত্যাগ করা যায় না।’
বৃষ্টিতে ভিজেই মহলে ফিরলো মেহেরনাজ।ফেরার পথে দূরে বৃক্ষের আড়ালে একজনের দেখা মিললো।তবে আজকেও কাছে যাওয়ার আগেই ছুটে পালালো।হ্যাঁ সেদিনের সেই আধবুড়ো বয়সের মানুষটি।আচরণ কিছুটা পাগলের মতোই মনে হবে। আড়াল থেকে কেমন করে মেহেরনাজের দিকে তাকিয়ে ছিলো।সে দৃষ্টিতে ছিলো ভয়,দ্বীধা আর সংশয়।মেহেরনাজ সেসব কথা ভাবছে আর নিজ কক্ষের দিকে যাচ্ছে।
“দেখে চলতে পারো না?এখনি পড়ে যেতে।
মেহেরনাজ তড়িৎ গতিতে সরে এলো।সামনে জাভেদ নওয়াজ দাঁড়িয়ে আছে।দৃষ্টি তারই পানে,ঠোঁটের কোনে হাঁসি।
অনমনে হাঁটতো গিয়ে গায়ের উপর পড়ে গেছিলো।
জাভেদ ধরতে গিয়ে গায়ে হাত ও পড়েছিলো যা মেহেরনাজের কাছে অসস্থির লাগলো।ঝাঝালো কন্ঠে বলল,
“আমি না হয় দেখতে পাইনি। আপনি তো দেখতে পেয়েছিলেন?সামনে না এসে পাশ দিয়ে যেতেন তবে এমন ঘটতো না।”
মেহেরনাজের কথায় জাভেদ হো হো করে হেঁসে উঠলো।সেই হাঁসিতে মুগ্ধতা নয় বরং রাগ লাগলো।
“পড়তে গিয়ে বাঁচালাম এখন দোষ আমার?বাহ!কি চমৎকার প্রতিদান।”
জাভেদ হাত নাড়িয়ে বুঝালো।তার পর গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে চলে গেলো।মেহেরনাজ ঘুরে তাকালো।তার দৃষ্টি অন্য কিছুতে।কিছু একটা ইঙ্গিত তো পেলো।যত রহস্য ভেদ করতে যাচ্ছি তত রহস্যের জাল সামনে আসছে।
ওয়াসিফ আজ হাঁটতে পারছে।যদিও কিছুটা খুঁড়িয়ে তবে পড়ে তো যাচ্ছে না।কারো নিষেধ না শুনে চললো মেহেরনাজের কক্ষের দিকে।
ইমতিয়াজ এখনো ফিরলো না সে চিন্তায় সালেহা সহ অনেকে।সাইফুদ্দিন নওয়াজ কেবল নিশ্চুপ।পুত্রের খোঁজ সে জানে।সময় হলে আসবে মহলে।
ওয়াসিফ ধীরে হেঁটে হেঁটে কক্ষের সামনে দাঁড়ালো।
দরজার ঠকঠক আওয়াজ করতেই ভেতর থেকে ভেঁসে আসলো,
“কে?
“আমিই,ওয়াসিফ।
ভেতরে আসুন।অনুমতি পেয়ে ওয়াসিফ কক্ষে প্রবেশ করলো।মেহেরনাজ হিসাবনিকাশ করছিলো।
ওয়াসিফের আগমনে চোখ তুলে তাকালো।মেহেরজান বসতে বললেও সে বসলো না।
ওয়াসিফ দাঁড়িয়ে রইলো।একমাত্র ওয়াসিফ কে দেখে সঠিক আর সত্য মনে হয়।তার ভাইজানের জন্য জীবন দিতেও দ্বিধা করবে না বোধ-হয়।তবে এই অনুগত্যতা কি কেবল সত্যে?নাকি মিথ্যের জালেও জড়িয়ে আছে?
“আপনাকে আমার কিছু কথা জানানো আছে ভাবি বেগম।
মেহেরনাজ চমকে উঠলো।এই ডাকে,এই জানানো কথায়।কি জানাতে চায়?মেহেরনাজ নিজেও দাঁড়িয়ে গেলো।শুধালো,
“গোপন কোনো কথা?
“হুম।ভাইজানের বিষয়ে।
মেহেরনাজের স্থির দৃষ্টি আশে পাশে তাকালো। দেয়ালের কান আছে ভেবে কক্ষের দরজা বন্ধ করতে চাইলো।কিন্তু ওয়াসিফ বাঁধা দিলো।বলল,
“বাহিরে কেউ নেই।কক্ষের দরজা বন্ধ করলে অনেকে অন্য মন্তব্য করতে পারে।আমি চাই না আমাদের এই ভাবি দেবরের সম্পর্ক বাদে কেউ অন্য কিছু নিয়ে কানা ঘোষা করুক।আপনাকে আমি সম্মান করি।আজ বিশ্বাস করতেও আসলাম।কিছু কথা না বললে আপনার অবিশ্বাস থেকে যাবে।সেই অবিশ্বাস হয়তো অনেককিছু গ্রাস করবে।আমি অপেক্ষা করতে পারলাম না।আপনাকে বলতে চাই,জানাতে চাই আপনার সন্দেহের সকল কথা।ক
মেহেরনাজ ওয়াসিফের কথা একধ্যানে শুনছে।কক্ষের আধখোলা দরজার পর্দা বাতাসে নড়ছে।
মেহেরনাজ তবুও একবার দরজা পেরিয়ে বাহিরে নজর বুলালো।তার তিক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছু আটকালো না।কক্ষে ফিরে ওয়াসিফের সামনে দাঁড়ালো।জানার আগ্রহ তার বাড়তে আছে।ইমতিয়াজ কে আজকাল তার অন্য মতো লাগে।বাহির থেকে যতটা খারাপ মনে হতো,কাছে এসে তার একভাগও বুঝতে নাহি পারলো।
শিহাব কক্ষে বসে আছে।পাশে শারমিন বেগম।
কক্ষের বাহিরে কেউ একজন আড়ি পেতে আছে।
কক্ষের দরজা একটু বাদে বন্ধ হলো।ভেতরে কি কথা হলো তা শুনতে ব্যর্থ হলো আড়ি পেতে থাকা মানুষটি।বিরক্ত হয়ে হনহনিয়ে চলে গেলো।ফেলে গেলো সন্দেহ ভাজন একটি দৃষ্টি।
“কি করছিলো দরজার বাহিরে?
তনিমা ভাবতে ভাবতে দরজার কাছে আসলো।ভেতর থেকে বন্ধ বুঝতে পেরে শব্দ না করে চলে গেলো।ওয়াসিফের কক্ষে উঁকি দিয়ে তাকে দেখতে না পেয়েই এদিকে খুঁজতে এসেছিলো।কিন্তু কোথাই যে গেলো।খুঁজে পেলো না কোথাও।
“জমিদার কন্যা আপনাকে ডাকছেন আপনার আব্বাজান।
মালিনী মহলের ছাঁদ থেকে নেমে আসতেই একজন দাসি এ কথা বললো।মালিনী জিজ্ঞেস করলো,
“কোথাই আব্বাজান?
“কাঁচারি ঘরে অপেক্ষা করছে।আপনাকে সেখানে যেতে বলেছে।
দাসি বলেই চলে গেলো।আব্বাজান কি বলতে পারে এই ভাবতে ভাবতে সে চললো।
“আব্বাজান বলুন....
কাঁচারি ঘরে প্রবেশ করতে করতে বলছিলো মালিনী।তবে সামনের মানুষটিকে দেখে তার কন্ঠ থেমে গেলো।অনেকটা অবাক হলো।চকিত নয়নে তাকিয়ে রইলো।সাইফুদ্দিন নওয়াজ খান বলে উঠলো,
“মহিব আজকে জমিদার মহলের অতিথি।আমার পুত্র কন্যাদের প্রাণ বাঁচিয়েছে এজন্য তার কাছে কৃতজ্ঞতা।ইমতিয়াজ তাকে আসতে বলেছে।আজ সে এই মহলে থাকবে।অথিতি সালা পরিষ্কার করতে বলেছিলাম তুমি একটু দেখে এসো।আর হ্যাঁ দাসিদের সঙ্গে তুমি ও তার অতিথিয়তায় যেন কোনো ত্রুটি না হয়।
মালিনীর উত্তরের আগেই মুহিব বলে উঠলো,
“এতো ব্যস্ত হবার কিছু নেই।আমি সামান্য মালির ছেলে মাত্র।এই মহলের অতিথি ভোজন ও যে স্বপ্নের মতো।আমায় নিয়ে এতো ব্যস্ত হতে হবে না।
যাদের নুন খেয়ে বড় হয়েছি তাদের বাঁচানো আমার কর্তব্য।আমি শুধু সেটুকু পালন করেছি।
সাইফুদ্দিন নওয়াজ খান বেশ তুষ্ট হলেন।
এমন সরল মানুষ খুব কম হয়।মালির মতো তার পুত্র ও ভালো মানুষ বটে।
মুহিব এবার সামনের নারীর পানে চাইলো।সে তার পানেই চেয়ে আছে।দুজনের দৃষ্টি মিলতেই একজন মাথা নিচু করে নিলো।মালিনীর রাগ হলো।হনহনিয়ে চলে গেলো।যাওয়ার আগে বলে গেলো পিছু পিছু যেন আসে।
কিছুক্ষণ আগেই ওয়াসিফ কক্ষ্য ত্যাগ করেছে।মেহেরনাজ তখন থেকে ঝিম মেরে পালঙ্কে বসে আছে।এতোদিন যা সত্যি ভাবতো সব মিথ্যা আর যা ভাবতে পারতো না তা সবই সত্যি।এই জন্যই মনে হয় দাদি বলতো,
“চোখের সামনে যা দেখি তা সব সত্যি নহে,কিছু সত্যি আমাদের চোখের আড়ালে রহে।”
মেহেরনাজ এবার ঝটফট করতে লাগলো।ইমতিয়াজের অপেক্ষায় জালানা খুলে মহলের সিংহদ্বারের দিকে তাকিয়ে রইলো।বৃষ্টির রেশ কমেছে।ঝিরিঝিরি পড়ছে একটু করে।অনেক সময় পর মেহেরনাজ আর কক্ষে থাকতে পারলো না।
অন্দরমহলের দ্বারে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো।কখন আসবে এই অপেক্ষায় যেন আজ অস্থির কাগছে।তবে কি আজ ইমতিয়াজের সেই কথা সত্যি হতে যাচ্ছে?
“একদিন আমার জন্য তুমি ছটফট করবে।ভালোবেসে আগলে নিবে?
কতকিছু জানা হলো।তার পর ও আরো জানতে চায় সে।মহলের বাহিরের রহস্য উদঘাটন করতে চায়।কেন এতো ঘোলাটে সব?
সীমান্তনগরের এক ছোট গ্রামে আছে ইমতিয়াজ।
বৃষ্টির কারণে আশ্রয় নিয়েছে এক কৃষকের ঘরে।
বারান্দায় ছাউনি বেয়ে কিছু জায়গায় দিয়ে জল পড়ছে।ঘরে কৃষক তার বউ আর এক যুবতী কন্যা।
ইমতিয়াজ কে তারা যেন পারলে সোনার ঘরে রাখতো।সাধ্যের বাহিরে কিছু পারলে সে চেষ্টাও করতো।ইমতিয়াজ তাদের এই আতিথিয়েতায় খুশু হলো।কৃষক কন্যা মাঝে মধ্যে পাশের ঘর থেকে উঁকিঝুঁকি তাকে দেখছে।তা খেয়াল করে যে তাকাচ্ছে সেই আড়াল হয়ে যাচ্ছে।ঘর থেকে ফিসফিস কন্ঠে ভেসে আসছে।
“আব্বাজান জমিদার মহলে একদিন আমি যাবো।
জমিদার পুত্র আমাদের ঘরে আসতে পারলে আমরা কেন পারিনা?
প্রতিত্তোরে কৃষক বউ বলল,
“তারা জমিদার তাদের মহলে সকলের প্রবেশের নিয়ম নেই।যারা বড় মাপের মানুষ তারাই শুধু যেতে পারে।
ইমতিয়াজ সবই শুনলো।হাঁসলো কিছু একটা ভেবে।কেন এতো বিভেদের দেওয়াল মানুষের মাঝে?
বৃষ্টি থেমে যাচ্ছে এখন তার ফিরতে হবে।ইমতিয়াজ উঠে পড়লো।কৃষকের থেকে বিদায় নিলো।যাওয়ার আগে বলে গেলো,‘আপনার কন্যা কে নিয়ে কাল আমাদের মহলে আসবেন।পরিবার সহ আমন্ত্রণ রইলো।
ইমতিয়াজ চলে গেলো।এগিয়ে দিতে কৃষক নিজেও এলো।ঘোড়া ছুটিয়ে টগবগিয়ে চললো ইমতিয়াজ।
আনন্দে নেচে উঠলো কৃষক কন্যা নাঈমা।
কতদিনের স্বপ্ন তার জমিদার মহল ঘুরে দেখবে।অন্দরমহলের মানুষ গুলোকে দেখবে।সে সাধ তবে কি পূরণ হতে চলেছে।
খুশিতে তার আম্মাকে জড়িয়ে ধরলো।হাঁসতে হাঁসতে বললো,
“কে বলে আম্মা জমিদার পুত্র ভালো না?
বড় জমিদারের মতো সেও ভালো হবে দেখে নিও।
মেহেরনাজের অপেক্ষার অবসান ঘটলো।সিংহদ্বার পেরিয়ে ইমতিয়াজের দেখা মিললো।গায়ের পাঞ্জাবি ভিজে চিপ চিপে হয়ে গেছে।মেহেরনাজ দৌঁড়ে এগিয়ে গেলো।সাহেলা খবর পেয়ে ছুটে আসলো।একদিনে মনে হচ্ছে কতদিন পুত্র কে দেখেনি।ইমতিয়াজ আজ সোজা তার আম্মাজানের কাছে গেলো।মেহেরনাজ দাঁড়িয়ে রইলো।
“আম্মাজান আমি ঠিক আছি।এসেছি দেখো।
আমি তো যুদ্ধে কিংবা লড়াই যাইনি যে ভয় পেতে হবে।আমি গিয়েছিলাম সন্ধানে।কাজ শেষ করে ফিরে এসেছি।ডাকাতের ভয়ে মহলে থাকলে চলবে?
প্রজাদের সুরক্ষার দায়িত্ব আমাদের তো নিতে হবে।
সালেহা পুত্র কে জড়িয়ে নিশ্চুপ আছে।ওয়াসিফের আহতের পর তার ভয় বেড়েছে।একমাত্র পুত্রের কিছু হলে সে বাঁচবে না।
ইমতিয়াজ তার আম্মাজান কে সম্মুখে দাঁড় করি হেঁসে বলল,
“তোমার পুত্র মরণের ভয় করে না আম্মাজান।
মৃত্যুর মালিক আল্লাহ।তিনি চাইলে কক্ষে থেকেও নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
সালেহার চোখে জল চিকচিক করছে।এবার নজর পড়লো ডান পাশে।মেহেরনাজ তারই দিকে চেয়ে আছে।চোখে মুখে কৌতুক,প্রেম বিষাদ কতকিছু দেখা দিচ্ছে।
ইমতিয়াজ সালেহা বেগম কে বলল,
“আম্মা ভোজনের আয়োজন করুন আমার খুব খিদে পেয়েছে।
পুত্রের এ কথা শুনতেই তিনি ছুটলেন।দাসিদের আদেশ দিলেন বাকি কাজ করতে।
ইমতিয়াজ ধীর পায়ে মেহেরনাজের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
“চোখে কেন এতো অস্থিরতা?
প্রেম নাকি বিষাদের ছায়া?
কোনটা লুকিয়ে আছে তোমার ওই দৃষ্টিতে?
আমি কেন হারিয়ে যাই একপলক তাকালে?
“আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।কিছু জানার আছে।
মেহেরনাজের প্রবল তাড়া নিয়ে বলা কথার প্রতিত্তোর ইমতিয়াজ সঙ্গে সঙ্গে দিলো।
“আমি বললে বিশ্বাস করবে?সত্যি বললেও তো মিথ্যে মনে হবে।
মেহেরনাজ অপমানিত বোধ করলো না।তবে ঠিকই বুঝতে পারলো ইমতিয়াজ তাকে কটাক্ষ করেই এমন বলেছে।
“সত্যি মিথ্যে পরে প্রমাণ হবে।আজ না হয় আপনার কথা শুনলাম।
ইমতিয়াজ কিছুটা এগিয়ে আসলো।মেহেরনাজের দিকে মাথা ঝুকে পড়লো।মুখ বরাবর হলো।দুজনের দৃষ্টি একত্রে সোজাসুজি হয়ে বলল,
“অপেক্ষা করো।আজ রাত্রি না হয় আমাদের হবে,একত্রে বসে জীবনের গল্প বলা যাবে।
তোমার মনের বিষাদ কিছুটা কমিয়ে ভালোবাসার ছোঁয়া লাগবে।তুমি কি অপেক্ষা করবে?
মেহেরনাজ মাথা নাড়ালো।ইমতিয়াজ সন্তুষ্টির হেঁসে চলে গেলো।মেহেরনাজ তার পথের দিকে চেয়ে রইলো।সে প্রবেশ করলো তার আব্বাজানের কক্ষে।
অপেক্ষারা এখন আশার প্রহর গুনবে।রাত্রি গভীর হলে নতুন প্রহর নামবে।
মালিনী অতিথি শালার দিকে যাচ্ছে।তার মালি সেখানে আছে।তখন তার আব্বাজান থাকার কারণে কথা বলতে পারেনি।তবে আজ সে কথার জালে বন্দি করবে।পালাতে চাইলে পথ আগলে ধরবে।কক্ষের বাহিরে যাওয়ার উপায় নাই পাবে।
“আসবো?
“আসুন।
অনুমতি পেয়ে মালিনী প্রবেশ করলো।তার আগে চারপাশ নজর বুলিয়ে নিলো।মহলের সকলে তখন নিজ কাজে মশগুল।
“আপনাকে ভোজনের জন্য আব্বাজান,ভাইজানরা ডাকছে।
মুহিব চোখ তুলে তাকালো।সে পালঙ্ক থেকে নামলো।মালিনীর দিকে আর না তাকিয়ে বাহির হতে নিলো।
সামনে দাঁড়ালো মালিনী।মুহিব থেমে গেলো।নজর তখনো নিচু রাখলো।তাকালে যেন ভয়ংকর কিছু হয়ে যাবে।
“চোখ তুলে তাকান।আমি কি কুৎসিত দেখতে?
মহিব বামে ডানে মাথা নাড়ালো যার অর্থ না।
“তাহলে তাকাচ্ছেন না কেন?এমন করছেন যেন আমার চোখের আগুন আছে তাকালেই পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে।
“ধ্বংসের আগুন আছে।যে আগুনে কারো হৃদয় পুড়তে পারে।কি দরকার আছে ধ্বংসের দিকে নিজেকে এগিয়ে দিয়ে?
আপনি ভীষণ সুন্দরী।আপনার দিকে তাকানো অনেক পুরুষের স্বপ্ন।আমি শুধু স্বপ্ন দেখতে চাই।
স্বপ্ন কখনো ধরা যায় না জানেন তো?তবে আপনি স্বপ্ন হয়ে থাকুক।ধরা ছোঁয়া বাহিরে চাঁদ হয়ে দূর আকাশে জ্বলে উঠুন।
“কিন.....
মালিনী কে বলার সুযোগ না দিয়ে মুহিব বেরিয়ে গেলো।মালিনী চেয়েও আটকাতে পারলো না। সে থমকে রইলো সেখানে।প্রতিটি কথা এখনো তার কানে প্রতিধ্বনি হয়ে বাজছে।আসলেই কি ধ্বংস আছে?
“ভালোবাসা যদি হতো ধ্বংসের কারণ,
তবে এই পৃথিবীতে ভালোবাসা নামক অদৃশ্য মায়ার সম্পর্কটি থাকতো না।উঠে যেত প্রেম ভালোবাসএই পৃথিবীর বুক থেকে।নিঃস্ব হতো না প্রেমিক প্রেমিকার হৃদয়।”
এতটুকু উত্তর কেবল তার ভেতরের প্রেমময় হৃদয় দিলো।পথ কি তবে বদলে ফেলতে হবে?
তখনই মনে পড়লো গুনিজন বলে গেছেন,
“ব্যর্থ হলে পথ বদলাও গন্তব্য নয়।”
চলবে…..................?