#জমিদার_মহল
#পর্বসংখ্যা–২১
#শ্যামলী_রহমান
তপ্ত দুপুরে কড়া রোদে ঝলসে যাচ্ছে গাছের পাতা।চৌচির হচ্ছে মাটির বুক।আজকে রোদ গায়ে ফুঁড়ছে যেন।ফসল কেঁটে এনে নতুন করে লাগাচ্ছে আবারো।ফসল হয়নি খুব একটা।নষ্ট হয়েছে অধিক।বৃষ্টির প্রয়োজন এখন কিন্তু হচ্ছে না।অসময়ে বৃষ্টি হয়,প্রয়োজনের সময় দেখা মিলে না।
সূর্য প্রখর তাপ ঢেলে দিচ্ছে মালিনী,তনিমা আর মেহেরনাজ গোসল সেরে সবে ফিরছে।
সেদিনের পর আরো একটি দিন কেঁটে গেছে।
মেহেরনাজ আনমনে হাঁটছে।তার মতিষ্কে কেবল অন্য চিন্তা।আশে পাশে নজর নেই বললেই চলে।
হুট করে তনিমার প্রশ্নে থেমে গেলো।
“ভাবি বেগম আপনার মুখশ্রী এমন গম্ভীর কেন?
নাইতে গিয়ে দেখলাম চুপচাপ ছিলেন।ভাইজানের সঙ্গে কি কিছু হয়েছে?
“তোমার কি সব সময় মনে হয় তোমার ভাইজানের সঙ্গে আমার মিলে না?তাকে সুখে রাখতে পারবো না?
তনিমা থতমত খেলো।সে এমন বলতে চায়নি।তাই বুঝাতে আবারো বলল,
“না আমি বুঝাইনি।আপনি ভুল বুঝছেন।
“চিন্তিত অন্য কিছু কারণে।আচ্ছা তোমার আম্মা কোথাই গেছে বলতে পারো?
“হ্যাঁ আম্মা তো কবিরাজের কাছে গেছে।
“কেন?
“ভাইজান বাহুতে ব্যথা পেয়েছে তাই ঔষুধ আনতে।
আম্মার কোমর ব্যথা বেড়েছে তার জন্যও।সাথে হামিদা চাচিজান ও গেছেন।
মেহেরনাজ চলতে চলতে ভ্রু জোড়ায় ভাজ পড়লো।কিছু একটা ভেবে আবারো জিজ্ঞেস করলো,
“তিনি কেন গেছেন জানো?
“সেটা তো জানিনা।মনে হয় কোনো দরকারে গেছে।হতে পারে ওয়াসিফ ভা..ভাইজানের জন্য কোনো ব্যথা নাশক তেল আনতে।
“ভাইজান বলতে এতো থেমে গেলে কেন?পছন্দ কারো তা চাচিজান কিংবা তোমার ভাইজান কেও বলতে পারো।
তাহলে তো আর এই নামে ডাকতে হয় না।
তনিমা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ালো।মালিনী মুখ বুঝে হাঁসলো।মেহেরনাজ তার দিকে এক পলক তাকিয়ে কিছুটা এগিয়ে গেলো।সামনে ওয়াসিফের দেখা পেলো।বরাবর দাঁড়িয়ে চোখের দিকে তাকিয়ে আবারো বলল,
“ভালোবাসলে সময় থাকতে বলে দিতে হয়,
নয়তো সময় ফুরোলে শুধু আফসোস পড়ে রয়।”
মেহেরনাজ সবাই কে পেরিয়ে চলে গেলো।
মালিনী ও তাদের রেখে পালালো।মহলের এক কোনো তারা দুজনে রইলো।তনিমার মাথা নিচু করে রাখা।ওয়াসিফ ধীর পায়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।জেনেও না জানার ভান ধরে শুধালো,
“ভাবি বেগম কার কথা বললো?
কাছাকাছি উপস্থিতি টের পেয়ে তনিমা ওয়াসিফের দিকে তাকালো।প্রতিত্তোরে বলল,
“আমি কি জানি?বললো তো আপনার সামনে আপনার দিকে চেয়ে।
“আম্মাজান কে বলবো?
তনিমা ভয় পেলো।তার আম্মা কে বলবে নাকি?ভেবে কাঁপা-কাঁপি কন্ঠে জানতে চাইলো,
“আম্মা কে কি বলবেন?
“আমার আম্মা কে বলবো।
“কি?
“এই যে এক কন্যা আমাকে মন দিয়ে বসে আছে।
প্রেম সাগরে ভাসাইতে তার প্রিয় পুত্র কে ব্যাকুল করেছে।ভালোবাসা নামক অসুখে জর্জরিত করতে বাধ্য করছে।হৃদয় নগরে সে উতালপাতাল ঢেউ তুলছে।
এসব অপরাধে তাকে শাস্তি দিতে,অভিযোগ করতে।
“ক কে?ক কার কথা বলছেন?
ওয়াসিফ শব্দ করে হেঁসে উঠলো। তনিমার ভয় পাওয়া মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে হাঁসি যেন থামছে না।
তনিমা ভয়ার্ত চোখ ছোট ছোট করে তাকালো।শুধালো,
“কি হলো?এভাবে পাগলের মতো হাঁসছেন কেন?
“এক ভিতু কন্যার কথা ভেবে।
“আমি যাই?আপনি পাগল হয়ে গেছেন।
“ঠিক আছে।
ওয়াসিফ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো।
তনিমা যেন ছুঁটে পালালো।ওয়াসিফ আবারো হেঁসে উঠলো।তনিমা কিছুদূর গিয়ে থামলে।ওয়াসিফের প্রতিটি কথা তারই জন্য।তার মন ঠিকই বুঝলো।তাই-তো পিছু ঘুরে বলে গেলো।
“অভিযোগ বরং দিন।শাস্তি স্বরুপ আপনি না-হয় আমার হবেন।”
তনিমা আর দাঁড়ালো না।কথাটা বলেই ছুঁটে গেলো।
ওয়াসিফের ঠোঁটের কোনো হাঁসি রয়েই গেলো।পিছন ঘুরে যেতে নিলে তখনই কারো সঙ্গে ধ্বাক্কা লাগলো।
“ভাইজান তুমি এতো তাড়াহুড়ো করে কোথাই ছুটছো?
“একটা কাজ ছিলো।চাচাজান পশ্চিমের গ্রামের প্রজাদের সমস্যার কথা জানতে পাঠিয়েছিলো।সেসব জেনে আসলাম। এখন চাচাজান কে জানাতে যাচ্ছি।
“ওহ।ঠিক আছে যাও।
জাভেদ চলে গেলো সাইফুদ্দিন নওয়াজ খান এর কক্ষে।ওয়াসিফ মহল থেকে বেরিয়ে গেলো।ইমতিয়াজ তাকে একটা কাজ দিয়েছে।দিনের আলোতে করতে হবে।দুপুর বেলায় মানুষ কম বেরোবে এখনই সুবিধা হবে।
মাহবুবা বেগম বিকেলে মহলে এসেছেন।
মেহেরনাজ তার কক্ষে সামনাসামনি বসে আছেন।
মাহবুবা বেগমের চোখে দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।
শাড়ির আঁচলে লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করছে কিন্তু অশ্রুরা আজ বাঁধ মানছে না।মেহেরজানের চোখ আজ জল নেই।সে শক্ত করেছে নিজেকে।
ভেঙে পড়লে গুড়িয়ে যাবে,যুদ্ধ করতে নিজেকে শক্ত করতে হবে।
সংসার,আপনজন সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করা যুদ্ধের চেয়ে কম নয়।
“কেন আম্মাজান সবকিছু জেনেও চুপ ছিলে?
মাহবুবা বেগম চোখের জল মুছে উত্তরে বলল,
“চুপ থাকা নারীর ধর্মের ন্যায়।এই সমাজে নারী সামান্য পন্য ছাড়া কিছু নয়।সমাজ বলে স্বামী যাই করুক তা লুকিয়ে রাখতে হবে।নয়তো তারা প্রশ্ন করবে কেমন স্ত্রী যে স্বামীকে বেঁধে রাখতে পারোনি?অথচ তারা জানেনা যে যাওয়ার সে আঁটকে থাকবে না। চরিত্রবান পুরুষ কখনো অন্য নারীতে মজবে না।যারা মজে তারা পুরুষ নয় পশু।
“আম্মা তাই বলে তুমি পাপ সহ্য করবে?
“সহ্য করা ছাড়া উপায় ছিলো না।তবে জানো তোমার আব্বাজান আগে এমন ছিলো না।
হুট করে কেমন হয়ে গেলো।জানতে পারলাম এইতো বছর আগে।একদিন তার পাঞ্জাবীতে নাক ফুল পেলাম।সন্দেহ খুবটা করিনি।কারণ বিশ্বাস ছিলো আগাধ।তার পর জানতে চাইলাম এ নাক ফুল কার?আপনার পাঞ্জাবিতে কেন?
প্রশ্নে তিনি থতমত খেয়ে গেছিলো।কন্ঠে শব্দ যেন আঁটকে ছিলো।তার পর কোনো মতো বলেছিলো‘ হবে হয়তো কারো।এতটুকু বলেই পালিয়ে গেলো।এর পর আর জিজ্ঞেস করে উত্তর পাইনি।যুবতী কন্যা ঘরে আছে বদনাম হলে তোমার নিকাহ নিয়ে সমস্যা হবে।অনেককিছু ভেবে কাউকে কিছু বলিনি।সহ্য করে গেছি।তবে তোমার আব্বাজান তোমায় ভীষণ ভালোবাসেন।
মেহেরনাজ ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিলো।চোখ বন্ধ করে রাগ সংবরণ করলো।
“ভালো তো তোমাকেও বাসতো আম্মাজান।তবে এমন কেন করলো?এর জবাব তুমি না চাইলেও আমি চাইবো।তোমাকো ঠকানোর শাস্তি আমি দিবো।অন্যায় মানা যায় কিন্তু পাপ নয়।
“তুমি কিছু করবে না মেহেরনাজ।তোমার আব্বাজান আসলে আমি না হয় বুঝাবো।
মানুষ জানলে সবার বদনাম হবে।কলঙ্ক লাগবে আমার গায়ে।তুমি কি তা চাও?
মেহেরনাজের কন্ঠ থেমে গেলো।ঘুরে তাকালো তার আম্মাজানের পানে।
নারী বলেই কি সব সহ্য করতে হবে?
সমাজে নারী কি কেবল দাসীই হয়ে রবে?
অন্যায় কে অন্যায় বলতে শিখবে না?
কখনো পারবে না সম্মুখে দাঁড়িয়ে কথা বলতে?
নারী পুরুষ যদি হয় একে অপরের পরিপূরক তবে, কেন নারী এখনো এই সমাজে প্রাণী নামক বস্তু হিসাবে রইলো?
সব দন্ড ভেঙে গুড়িয়ে দিতে মন চায়।কিভাবে বা সম্ভব হবে?এই সমাজে নারীরা নিজেও নিজেকে ছোট চোখে দেখে।একজন যদি স্বামীর খারাপ চরিত্র প্রকাশ করে,সেখানে আরেক নারী এসে বলে,সামান্য ব্যাপার টুকু গোপন রাখলে কি হতো?সংসার টিকিয়ে রাখার মন নাই তাই তো?
অসুস্থ সমাজে নারী অধিকার কখনো সম্ভব হবে না।তাদের মতামতের মূল্য কখনো পাবে না।কেবল তারা দাসী হিসাবে রয়ে যাবে।
রসাই ঘরে আজ মেহেরনাজ একা।মহলের কেউ নেই শুধু দুটো দাসী।সে নিজেই কাউকে আসতে না করেছে।সাইফুদ্দিন নওয়াজ খান হঠাৎ সন্ধ্যে হতে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।ডাক্তার এসেছিলো কিন্তু রোগ
ধরতে পারেনি।স্বাভাবিক অসুস্থতা ভেবে চিকিৎসা করছে।মহলের সকলে সেখানে রয়েছে।মেহেরজানের মনে শত প্রশ্ন জমাট বেঁধে আছে।
বিকেলে মাহবুবা বেগম চলে যাওয়ার পর ইমতিয়াজ আর মেহেরনাজ সাইফুদ্দিন নওয়াজ খান এর কক্ষে গিয়েছিলেন।তখন তো ঠিক ছিল এমনকি তাদের প্রশ্নের উত্তর ও দিয়েছিলো।
সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা করা ছিলো।তার পর হঠাৎ এমন হলো।ডাক্তার বলছিলো ভোজনের সমস্যা হতে পারে।
“ছোট বেগম তরকারি পুড়ে যাবে।
দাসির কথায় মেহেরনাজের ভাবনা চ্যুত হলো।
কড়াইয়ে তরকারি পুড়ে যাওয়ার মতো।তড়িঘড়ি করে পানি দিলো।রন্ধন শেষ করে ইমতিয়াজের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
“আপনি কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত ছোট বেগম?
“না।আচ্ছা একটা কথা বলো তো।
“কি কথা?
“সেদিনের চ......
মেহেরনাজ থেমে গেলো।দৃষ্টি পড়লো অদূরে।
পর্দার আড়ালে কারো ছাঁয়া দেখা যাচ্ছে।
“কি হলো বলুন?
“না কিছু না।
দাসি মেহেরনাজের কথা ঠিক বুঝলো না। বলতে চাইলো না বিধায় আর প্রশ্ন করলো না। মাঝ পথে কথা থেমে যাওয়াতে পর্দার আড়ালে ছায়ামূর্তি হয়তো কিছু বুঝতে পারলো।মুহূর্তে ছায়া সরে গেলো।মেহেরনাজ দৃষ্টি এখনো সেখানেই স্থির রইলো।
ইমতিয়াজ মাত্র তার আব্বাজানের কক্ষে হতে এসেছে।মেহেরনাজের সঙ্গে কথা বলতে হবে।আজকে সমস্ত কিছু পরিকল্পনা বাদ দিতে হবে।এমতাবস্থায় মহল ছেড়ে বেরোনো ঠিক হবে না।
তখনই দরজা খোলার আওয়াজ হলো।মেহেরনাজ এসেছে।ইমতিয়াজের অপেক্ষাকৃত অস্থির দৃষ্টি সে টের পাচ্ছে।
“কিছু হয়েছে?
মেহেরনাজ কক্ষের দরজা বন্ধ করে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো।ইমতিয়াজ মেহেরনাজের কাছে আসলো। প্রতিত্তোরে বলল,
“আজকে সমস্ত পরিকল্পনা বাদ দিতে হবে।আব্বাজান কে এমতাবস্থায় রেখে মহলের বাহিরে যাওয়া ঠিক হবে না।আব্বাজানের অসুস্থতা আমার কাছে রহস্যময় লাগছে।তুমি কি বলছো?
“আপনার তাই মনে হচ্ছে?আমিও এমনই ভাবছিলাম।আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের আশে পাশের কেউ এসবের মধ্যে জড়িয়ে আছে।হয়তো বন্ধু সেজে নয়তো মহলের সুরক্ষার কাঁধে।
“কি করবো এখন তাহলে?
দুজনে ভাবতে বসলো।বন্ধ কক্ষে আবার নতুন পরিকল্পনা করলো।মহলের দেওয়াল কেবল তাদের কথোপকথনের সাক্ষী থাকলো।দুজনে একসাথে জোট হয়ে বুদ্ধি করে ফাঁদ পাতবে।শত্রু নাকি মিত্র কে জাঁলে বন্ধি হবে?তারা জানলো না প্রতিটি কোনায় ষড়যন্ত্রের ফাঁদ আছে।সত্যি কি হবে পরবর্তীতে?
চলবে......................?