ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদয় অরণ্যে তুমি

৭ম পর্ব

লেখক: শ্যামলী রহমান

#হৃদয়_অরণ্যে_তুমি

লেখিকা:#শ্যামলী_রহমান
পর্ব: ৭
শরৎ মানেই এক অপার্থিব শুভ্রতার ঋতু। গ্রীষ্মের তাপ ও বর্ষার ভেজা গন্ধ মুছে দিয়ে শরৎ আসে নির্মলতা ও প্রশান্তির বার্তা নিয়ে। আকাশ তখন নীলচে তুলোর মতো সাদা মেঘে ছাওয়া।একেকটা মেঘ যেন পাখির পালকের মতো ভেসে বেড়ায় অনন্ত নীলিমায়।হঠাৎ হঠাৎ বাতাসে কাশফুলের ঢেউ ওঠে। মাঠের ধারে, নদীর পাড়ে কিংবা গ্রামের মেঠোপথে সারি সারি কাশফুল সাদা তুলোর মতো দুলতে থাকে। সেই কাশফুলে সূর্যের আলো পড়লে যেন সোনালি শুভ্রতার জোয়ার নামে প্রকৃতিতে।গাছে গাছে পাতাগুলোর রং হয় হালকা হলুদ আর কিছুটা শুকনো। বাতাসে হালকা শীতের পরশ, সকালে শিশিরভেজা ঘাসের সৌন্দর্য,আর সন্ধ্যায় ভেসে আসে শিউলি ফুলের সৌরভ।
এখন সময়টা শরতের শেষ ভাগ।শরতের বিকেল মানেই হালকা সোনালি রোদ,জোনাকির আলোয় ভেজা আকাশ,আর মন কেমন করা এক অনুভূতি,যা অনুভব করা যায় কিন্তু বলা যায় না।
অঁধরা ছাদে বসে আছে।হাতে একটা ডায়েরি, পাশে একটা বই।চোখে এখন আর অত আগের মতো অস্থিরতা নেই।একটা সময় ছিলো, যখন দিন শুরু হতো ইরফান স্যারের ভাবনায়,রাত শেষ হতো মনখারাপের অন্ধকারে।
কিন্তু সময় বদলেছে।
এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে কিছুদিন আগে।পড়াশোনারচাপ, টেনশন, দুশ্চিন্তা আর কিছু বিষাক্ত অনুভূতি সব কিছুর মধ্যে নিজেকে বদলে ফেলেছে অঁধরা।
সামিয়া আর লাভলু এখনো আগের মতোই পাশে আছে। এখন আর অঁধরা স্যারের কথা শুনলে বুক ধুকপুক করে না,নির্ঘুম রাতে মনে পড়ে না,তবে কিছু সময় স্মৃতি হিসাবে হঠাৎ মনে পড়ে শেষ বিকেলে।
সেই সময়ের কথা মনে পড়লো।পরীক্ষার আগের কথা.....!
ইরফান স্যার এখন আগের মতোই ক্লাস নেন,
অঁধরা নিজেকে বুঝাতে কিছুটা সক্ষম হয়েছে তবে সেই ব্যক্তির দিকে চোখ পড়লে মনের ভেতরে অবাঁধ্য অনুভূতির দেখা মিলে।
তার পর সময়ের সাথে সেই অনুভূতি চাপা পড়ে গেছে। 
কলেজে মেয়াদ শেষ হলো।সামনে পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে এসেছিলো।
শেষবার কলেজে আসতে হয়েছিলো প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার দিন।এতোদিন পর সেই মানুষটাকে দেখে শুধু হাঁসি এসেছিলো।সেই হাঁসি ভালোবাসার নাকি বিদ্রূপের তা বুঝা মুসকিল। অঁধরাকে দেখে ইরফান স্যার এগিয়ে আসে।অঁধরার সাথে সৌজন্য কথাবার্তা হলেও সেটা ছিলো খুব সাধারণ,একজন শিক্ষক আর শিক্ষার্থীর মাঝামাঝি স্বাভাবিক সীমারেখায় বাঁধা।
সবকিছু ভেবে অঁধরা দীর্ঘ শ্বাস ফেললো।পুরনো চিন্তা বাদ দিয়ে।সামনে তাকালো। 
ছাদে বসে অঁধরা আজ প্রকৃতিকে দেখছে একটু অন্য চোখে।হাওয়ায় ওড়ানো চুলগুলো এলোমেলো হলেও সে বিরক্ত না,বরং বাতাসের সেই কোমল পরশ তাকে মুক্ত মনে করাচ্ছে।দূরে কুকিলের মিষ্টি কন্ঠে ভেসে আসছে বিকেলের শান্ত আহ্বান।
এই শান্ত বিকেল,ঝকঝকে নির্মল আকাশ,বাতাসে ছাঁদে থাকা বেলি ফুলের ঘ্রাণ, সবকিছু আজ একটু বেশিই মুগ্ধকর লাগলো।চোখ বন্ধ করে অনুভব করলো বাতাস কিছু জানান দিচ্ছে। 
হঠাৎ চোখ খুলে নিজেকে প্রশ্ন করলো,
“এতোদিন যে আমি এমন করে প্রকৃতিকে দেখিনি কেন?
নিজের করা প্রশ্নের উত্তর আবার নিজেই দিলো,
"হয়তো তখন মন আটকে ছিলো কারো চোখে, হাসিতে,
আর আজ সে চোখ খুঁছে ফিরছে আকাশে, সবুজ পাতায়, ফুলে,ফুলে।
নীচে থেকে মা ডাকে,
— “অঁধরা? মা শোন চা তৈরি হয়ে গেছে।
— “আসি আম্মু।
নেমে যাবার আগে অঁধরা একবার আকাশের দিকে তাকায়।
শরতের আকাশ নীল একদম ঝকঝকে,
মনে হচ্ছে নতুন কোনো গল্প শুরু হতে চলেছে।
হয়তো আগামী দিনগুলোতে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটবে।
তবে এখন অঁধরা জানে, নিজের মন, নিজের ভবিষ্যৎ সব কিছুই তার নিজের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।
সে এবার শুধু ভালোবাসতে শিখবে না,
ভুলতেও শিখবে।
রাত আটটা বেজে বিশ মিনিট। 
আজ হঠাৎ অঁধরার আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করলো।
নিচে নেমে জাহানারা বেগম কে বললেন,
" চলে আম্মু আইসক্রিম খেতে যাই?
জাহানারা বেগম তখনি কোনো উত্তর দিলো না।একটু ভেবে হাঁসি মুখে বললো,
-চল যাই তবে।
অঁধরা আজকাল নিজের ইচ্ছে কে প্রধান্য দেয়।নিজের ইচ্ছে নিজেকে মেটাতে হবে।ওরা যেমন ছিলো তেমনই শুধু মাথায় ওড়নাটা টেনে নিয়ে বাসা থেকে বাহির হলো অঁধরা আর ওর মা।এই তো গেটের সামনে একটা দোকান আছে। কিন্তু ভাগ্য খারাপ ছিলো।অন্য সব আইসক্রিম থাকলেও নিজের পছন্দের স্ট্রবেরি ফ্লেভারের আইসক্রিম ছিলো না।মন খারাপ হলো একটু।আশে পাশে দোকান আছে তবে আরেকটু হাঁটতে হবে।এই দুই মিনিট মতো।অঁধরা ওর আম্মুর হাত ধরে হাঁটা ধরলো।একটু যাওয়ার পর জাহানারা বেগম মেয়ের মতিগতি বুঝে প্রশ্ন করে, 
-রিশাদ ছেলেটা খারাপ নয়।আমার তো পছন্দ হয়েছে তোর সাথে ভালোই মানাতো।
এখন তো এইচএসসি পরীক্ষা শেষ তবে.........
অঁধরা কথা শেষ হওয়ার আগেই বিরক্তি প্রকাশ করে বললো,
"আম্মু এমন সময়ে এসব বলে মুড খারাপ করে দিও না প্লিজ!পৃথিবীতে তিনি শুধু ভালো ছেলে নেই আরো অনেক ছেলে আছে। 
জাহানারা বেগমের আবার ঝটপট উত্তর, 
-তাহলে যারা আছে তাদের মধ্যে কাউকে পছন্দ কর।
অঁধরা চুপ হয়ে গেলো।কথা বাড়াতে ইচ্ছে করলো না।আম্মুকে যত বললে তত কথা বাড়বে এর চেয়ে চুপ থাকা ভালো। 
তার পর ও কিছু ভেবে জাহানারা বেগম কে উদ্দেশ্য করে বললো,
" জীবনে কাকে কার সাথে ভালো মানাবে এটা কি ইম্পরট্যান্ট?
জীবনে দেখতে মানানসই হওয়ার চেয়ে ভালো থাকাটা জরুরি।তাই কার সাথে মানালো আর কার সাথে মানালো না এসব নিয়ে যারা কথা বলে তারা হলো সবচেয়ে নিচ মন মানসিকতার মানুষ। 
জাহানারা বেগম মুখ ভার করলেন।অঁধরা তা চুপটি করে দেখলো,রাস্তার এক সাইডে এসে মায়ের কাঁধ জড়িয়ে ধরে বললো,
"খারাপ লাগলে সরি!কিন্তু তোমার ভাবনা ভুল আম্মু।তুমি যদি বলতে ছেলেটা ভালো তোকে ভালো রাখবে। তাহলে সেটা মানা যেত বুঝলে?
মেয়ের কথা ভেবে দেখলেন ভুল বলেনি।আসলেই আমরা শুধু চেহারা দেখি,সৌন্দর্য কে সবকিছু মনে করি।
সৌন্দর্য শুধু ভালোলাগা পর্যন্ত গড়াতে পারে ভালোবাসা নয়।
ভালোবাসায় চেহারার সৌন্দর্যের চেয়ে, মন মানসিকতা,ব্যক্তিত্ব,আচার-আচরণ সুন্দর হওয়া বেশি প্রয়োজন। 
____
অক্টোবরে শেষ ভাগ।সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমেছে ধরণীতে।
তারা ভরা আকাশ, মাঝে মাঝে জোছনার ঝিরিঝিরি আলো ছুঁয়ে যাচ্ছে ছাদের কার্নিশ।অঁধরা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে এক কাপ কফি হাতে।
এই একাকিত্ব এখন আর তাকে কষ্ট দেয় না, বরং নিজের সঙ্গে সময় কাটানোটা এক ধরনের স্বস্তি।
এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর এক মাস পার হয়ে গেছে।
সারাদিনে একেক সময় একেক কিছু করে দিন কাটে
বই পড়া, অনলাইনে ক্লাস, মাঝে মাঝে সামিয়া আর লাভলুর সঙ্গে আড্ডা।
মনখারাপের রাতগুলো এখন ডায়েরিতে বন্দী,
আর দিনের আলোয় সে খুঁজে বেড়ায় নিজেকে।
আজ একটু ব্যতিক্রম।ফোনের গ্যালারি ঘাটতে গিয়ে হাত থেমে যায়।কলেজের বিদায়ের কিছু মহূর্ত চোখের সামনে ভেসে উঠে,মনে যায় সেই কথা, ডুব দেয় সেই স্মৃতিতে।
সেদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ কলেজের গ্রুপে একটা মেসেজ আসে,
"আগামী সোমবার কলেজে বিদায়ী অনুষ্ঠান। সবাই উপস্থিত থাকো।
অঁধরা মেসেজটা দেখে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে।
কলেজের শেষ দিন…!
এই শব্দটা হঠাৎ যেন বুকের মধ্যে ভারি হয়ে আসে।
কত স্মৃতি, কত মায়া, কত না বলা কথা,
আর ইরফান স্যার।
বিদায় শব্দটা তো শুধু জায়গা ছেড়ে যাওয়া নয়,
কারো থেকে দূরে সরে যাওয়ার,
কখনোই আর ফেরা না হওয়ার একটা আভাস।
সোমবার.. 
কলেজ ক্যাম্পাস সাজানো হয়েছে ফুল আর ফেস্টুনে।
ছাত্রছাত্রীদের মুখে নানান রঙের এক্সপ্রেশন,
কেউ উচ্ছ্বসিত, কেউ মন খারাপ, কেউ চোখ লুকিয়ে কান্না চেপে রেখেছে।
অঁধরা কে সাদা সালোয়ার কামিজে আজ অপূর্ব লাগছে।
চোখে হালকা কাজল, ঠোঁটে শুধু একটা মৃদু লিপগ্লস।
সে যেন আজ নিজেকেই নতুন করে চেনে।
সামিয়া আর লাভলু পাশে।
একসাথে ছবি তুলছে, হাসছে, ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী করছে চার বছরের স্মৃতি।
ঠিক তখনই মাইকে ঘোষণা আসে,
“আমাদের সবার প্রিয় শিক্ষক ইরফান চৌধুরী স্যারকে অনুরোধ করছি মঞ্চে আসার জন্য।
সবাই হাততালি দেয়, কেউ কেউ স্লোগানও তোলে।
অঁধরার বুকটা ধক করে ওঠে।
হাঁটতে হাঁটতে মঞ্চে উঠে মাইকের সামনে দাঁড়ান ইরফান স্যার।
আজ তার পরনে ফরমাল শার্ট-প্যান্ট, চোখে চশমা,মুখে হালকা হাসি।
বক্তব্য শেষ করে ইরফান স্যার হাঁসলো।শেষে বললো,
আশা করছি তোমরা আমাদের এবং আমাদের কলেজের নাম উজ্জ্বল করবে,নিজেদের বাবা মায়ের স্বপ্ন পূরণ করবে।সবার জন্য দোয়া রইলো।
সবাই চুপ। অঁধরা নিঃশব্দে শুনছে।
হঠাৎ মঞ্চ থেকে স্যারের দৃষ্টি অঁধরার চোখে আটকে যায় এক মুহূর্তের জন্য।
অঁধরার চোখে পানি চলে আসে।
কিন্তু সে দ্রুত চোখের কোণে বাঁধা দিয়ে ফেলে।
কারণ আজ আর সে আগের মতো দুর্বল না।
বিদায়ের সময় ক্লাসরুমটা একবার দেখে নেয় অঁধরা।
যেখানে প্রথম দিন ইরফান স্যারকে দেখেছিলো,
যেখানে প্রথম বুঝেছিলো মন কি জিনিস,
আর যেখানে একসময় মন ভেঙে গিয়েছিলো,
সব জায়গা যেন আজ চুপচাপ তাকিয়ে আছে তার দিকে।
কলেজ গেটের বাইরে আসতেই সামিয়া বললো,
— “তোকে দেখে মনেই হচ্ছে তুই অনেক বদলে গেছিস দোস্ত।
অঁধরা হাঁসে।
— “হ্যাঁ বদলে গেছি। কারণ এখন আমি জানি,
যাকে ভালোবাসা যায়, সে না থাকলেও জীবনে ভালোবাসা থাকে।শুধু তার জায়গা বদলে যায়।
অতীত নিয়ে ভাবলে যন্ত্রণা বাড়ে।যে যন্ত্রণা ছেড়ে এসেছি, সেথায় আবার স্মৃতি জমানো ঠিক নয়।
কলেজ জীবনের আবেগের নাম দেওয়া প্রথম একপেক্ষিক প্রেম। 
হা,হা.... 
নিজের মনে হাঁসে অঁধরা তার পর বলে,
"না অনেক রাত হচ্ছে আব্বু হয়তো এসে গেছে যাই তাড়াতাড়ি। 
ছাঁদে থাকা বেঞ্চ থেকে উঠতে যাবে তখনই ফোনে কল আসে।অঁধরা দাঁড়িয়ে ফোনের স্কিন তাকায়।জ্বলজ্বল করছে একটি অচেনা নাম্বার।সাধারণত অচেনা নাম্বার থেকে কল আসলে ধরে না আজও তার ব্যতিক্রম নয়।কল কেটে গেছে ছাঁদ পেরিয়ে দরজার কাছে পৌঁছাতে আবার কল আসে।এবার কলটা ধরে হয়তো পরিচিত কেউ হতে পারে। 
" হ্যাঁলো?কে বলছেন?
অপরপ্রান্ত হতে কোনো উত্তর আসে না। শুধু ভেঁসে আসে ঝি ঝি পোকার আওয়াজ।মনে হচ্ছে কেউ নিরিবিলি কোনো স্থানে বসে কিংবা দাঁড়িয়ে আছে। 
উত্তর না পেয়ে অঁধরা বিরক্ত হলো।বিরক্ত হয়ে বলে দিলো কিছু তিক্ত কথা,
"কাজ নেই?ফোন দিয়ে ফাজলামো করেন কে?সামনে পাইলে থাপ্পড় মারতাম। 
অঁধরার কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে কল কেটে দেয়।
কান থেকে ফোন নামিয়ে আবারো বলে,
এদের থাপ্পড় দিলে সোঁজা হবে এবং ভয় ও পাবে।
তার পর মনে পড়লো এটা রিশাদ নয়তো?
কিছুমাস আগে মাঝে মধ্যে কল দিতো। একদিন খুব রাগ ঝেরেছিলাম তার পর আর কল দেয়নি।আজ হয়তো দিয়েছে ভয়ে কথা বলার সাহস পায়নি।
"সে যাই হোক আমার কি?এসবে আমার কোনো আগ্রহ নেই।ছাঁদের দরজা মাড়িয়ে চলে যায় নিজের রুমে।
চলবে….........?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন