#মেঘবরণ_প্রেম
পর্ব - ৩৭
লেখা - আসফিয়া রহমান
অনুমতি ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ❌
--- কী ব্যাপার শুভ্র! আশেপাশে কোথাও বেরিয়েছিস নাকি? ভিউটা তো চমৎকার!
--- ফার্মহাউসের পুকুরঘাট এটা। এই দেখ কি সুন্দর বকুল ছড়িয়ে আছে পুরো ঘাটজুড়ে।
--- ওহ্ মাই গড! বিউটিফুল! কিন্তু ভাবিকে দেখছি না যে? তুই একা এসেছিস?
ঘাটে বসে আপনমনে হাতের মুঠোয় একটা একটা করে বকুল জমাচ্ছে অনিন্দিতা। শুভ্র ওর দিকে তাকিয়ে হালকা গলায় বলল,
"আদিল খুঁজছে তোমাকে, ফুল। একটু কথা বলবে?"
শুভ্রর ওপর থেকে চোখ সরিয়ে ইতস্তত করে ফোনের স্ক্রিনে তাকালো অনিন্দিতা। শুভ্র স্ক্রিনটা ঘুরিয়ে ধরতেই একগাল হেসে হাত নাড়ল আদিল,
--- কেমন আছেন ভাবি? আজকেও কি মন খারাপ নাকি?
আদিলের কথা বলার এই সহজ ভঙ্গিটা অনিন্দিতার জড়তা কাটাতে আজও কাজ করলো ম্যাজিকের মতো। অনিন্দিতা একটু হেসে ছোট করে উত্তর দিল,
--- না, ভালো আছি।
অনিন্দিতা যেহেতু স্বেচ্ছায় নিজের মন খারাপের ব্যাপারটা আড়াল করতে চাইছে, আদিল তাই যেচে গত রাতের ভয়াবহতার ওই প্রসঙ্গে ঢুকল না। বরং খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
--- ভাবি, বকুল ফুলগুলো দিয়ে একটা মালা গেঁথে ফেলুন তো! আপনার খোঁপায় কিন্তু দারুণ মানাবে।
আদিলের কথা শুনে অনিন্দিতা হাতের মুঠোয় জমানো ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে লাজুক হাসল। ছোট ছোট ঘিয়ে রঙের ফুলগুলো থেকে কেমন মাদকতাভরা ঘ্রাণ বেরোচ্ছে।
--- মালা গাঁথার সুতো পাবো কোথায়?
--- সেটা শুভ্রকে বলুন। প্রয়োজনে নিজের শার্ট ছিঁড়ে সুতো বের করে দেবে ও! তাই না রে, শুভ্র?
আদিলের রসিকতায় অনিন্দিতা এবার শব্দ করে হেসে ফেলল। শুভ্রও যোগ দিল সেই হাসিতে। আদিলের এই স্বতঃস্ফূর্ত কথোপকথনে মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানাল ও। পরিবেশটা সহজ হতেই আদিল আড়চোখে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে এবার নতুন প্রসঙ্গে ঢুকল।
--- কিরে শুভ্র, তোর অফিসের কী খবর? তুই তো দেখি রাজশাহী এসে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস! অফিসের সব দায়িত্ব কে সামলাচ্ছে?
শুভ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনের ক্যামেরাটা নিজের দিকে ঘোরালো।
--- আপাতত আব্বুই সামলাচ্ছে। সিজনাল কালেকশন লঞ্চ হবার কথা ছিল এই সপ্তাহে। হুট করে এখানে চলে আসায় খানিকটা গোলমাল হয়ে গেছে।
--- আরে বলিস কী! সিজনাল কালেকশন লঞ্চ পিছিয়ে গেল?
আদিলের গলায় কৃত্রিম উদ্বেগ,
--- আঙ্কেল একা এত কিছু সামলাবে কী করে! তুই এখান থেকেই কো-অপারেট করছিস না কেন? একটু সময় করে ল্যাপটপ নিয়ে বসে অ্যাপ্রুভাল দিয়ে দিলেই তো হয়ে যায়!
--- ডিজাইনগুলো প্রায় আশি পার্সেন্ট কমপ্লিট। বাকি ২০ পার্সেন্ট আটকে আছে লাস্ট ফিনিশিং আর কালার প্যালেটের কিছু খুঁটিনাটি পরিবর্তনের জন্য। আমার পিএস সৌরভ এসেছে সকালে। ওর সাথে বসবো লাঞ্চের পর, দেখি একটু দেরি হলেও সামলে নেব ইনশাআল্লাহ!
শুভ্র আড়চোখে তাকালো অনিন্দিতার দিকে।
--- অ্যাকচুয়ালি অনিন্দিতার শরীরটা একটু খারাপ যাচ্ছে। ওকে টাইম দিতে গিয়ে অন্যদিকে তাকানোর ফুরসৎ পাচ্ছি না।
আদিল ফোনের ওপাশ থেকে মাথা নেড়ে শুভ্রর কথায় সায় দিল ঠিকই, তবে ওর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তখন ফোনের স্ক্রিনের এক কোণায় থাকা অনিন্দিতার ওপর। মেয়েটা হাতের তালায় বকুল ফুলগুলো নিয়ে অন্যমনস্কভাবে নাড়াচাড়া করছে। আদিল খুব শান্ত গলায় বলল,
--- বুঝতে পারছি। তবে শুভ্র, তুই কি জানিস, মানসিক ক্লান্তির সবচেয়ে বড় থেরাপি হলো নিজেকে কোনো কাজে ব্যস্ত রাখা? অনিন্দিতা ভাবি এখন যা কিছুর মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, সেখানে ওনার সবচেয়ে বড় ওষুধ হতে পারে ওনার নিজের সৃজনশীলতা।
আদিলের মুখে নিজের নাম শুনে উৎসুক হয়ে তাকালো অনিন্দিতা। আদিল সরাসরি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে হাসল।
--- ভাবি, আমি কিন্তু জানি আপনার ফ্যাশন সেন্স খুব স্ট্রং। আপনাকে পাশে রেখেও যে শুভ্র কাজের পুরো চাপটা একা নিজের মাথায় নিচ্ছে এরকম গাধামি শুধু ওর দ্বারাই সম্ভব! ডিজাইনের 'ডি'-ও বোঝে না, অথচ একগাদা দায়িত্ব নিয়ে বসে আছে! ওর ওই নিরস মস্তিষ্ক দিয়ে কি আর সিজনাল কালেকশনের কালার প্যালেট ঠিক করা সম্ভব? আপনিই বলুন!
অনিন্দিতা অপ্রস্তুত হয়ে গেল কেমন,
--- না.. আমি আসলে ওভাবে কখনও ভাবিনি। শুভ্রর কাজ ও নিজেই ভালো বোঝে। আমি এখন ঠিক...
--- ভাবি, একটা রিকোয়েস্ট করি? অনিন্দিতাকে কথা শেষ করতে দিল না আদিল।
--- শুভ্রর ল্যাপটপে ডিজাইনগুলোতে একবার চোখ বুলিয়ে দেবেন? আপনি জাস্ট ওগুলোর ফিনিশিং টাচটা দিয়ে দিন। শুভ্রর টেনশনটাও এতে কমবে, আঙ্কেলও একটু স্বস্তি পাবেন।
মেয়েটার ওপর অযথা চাপ বাড়ানোর কী দরকার ভেবে মাঝে শুভ্র একবার বাধা দিতে চাইলেও আদিলের চোখের ইশারায় থেমে গেছে। অনিন্দিতা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইল। পুকুরের টলটলে জলের ওপর রোদের ঝিলিক পড়ছে। অবচেতনেই নিজের বাঁ অনামিকার আংটিটা স্পর্শ করল অনিন্দিতা। সেদিন রাতের ভয়ংকর সেই সময়টার পর ওর মনে হয়েছে 'অনিন্দিতা' নামের প্রাণোচ্ছ্বল তরুণীটি হারিয়ে গেছে চিরতরে। কিন্তু আদিলের এই 'প্রয়োজনীয়তা' অনুভব করানোর চেষ্টাটা ওর ভেতরে অদ্ভুত একটা শিহরণ তুলে গেল। ও কি সত্যিই এখনও কারো কাজে আসতে পারে?
হাতের মুঠোয় থাকা বকুল ফুলগুলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল অনিন্দিতা। তারপর খুব নিচু স্বরে বলল,
--- আমি তো এখন খুব বেশি গভীরে যেয়ে কোনোকিছু চিন্তাই পারি না, কেমন জট পাকিয়ে আসে সব। আমার প্রত্যেকটা দিন অতিবাহিত হচ্ছে শুধুই শুভ্রকে কেন্দ্র করে। আমি কি ওসব সিরিয়াস কাজ সামলাতে পারব?
ফোনের ওপাশ থেকে মৃদু হাসল আদিল; আশ্বাসের হাসি। খুব কোমল স্বরে বলল:
--- কেন পারবেন না ভাবি? আপনার পৃথিবীটা শুভ্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে বলেই তো শুভ্রর কপালে চিন্তার ভাঁজগুলো মুছে দেওয়ার জন্য আপনার এই কাজে অংশ নেওয়া উচিত। এটা আহামরি কিছু সিরিয়াস কাজ নয়! তাই না, শুভ্র? আপনি শুধু আপনার চোখের মায়াটুকু দিয়ে নকশাগুলো দেখবেন। ভালো লাগলে 'হ্যাঁ' বলবেন, না লাগলে স্রেফ 'না'-- ব্যাস! এর চেয়ে বেশি কিছু করতে হবে না। আমি ঠিক বলছি তো, শুভ্র?
আদিলের কথা বলার ধরণ দেখে শুভ্র অবাক হচ্ছিল অনবরত। অবাক হয়ে ও দেখে গেল সাইক্রিয়াটিস্ট আদিল রেদওয়ান কীভাবে একটা ভাঙাচোরা মনের ফুরিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাসকে একটু একটু করে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
কৃতজ্ঞ চোখে আদিলের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লো শুভ্র। তারপর অনিন্দিতার একটা হাত টেনে নিজের হাতের মুঠোয় নিল। অনিন্দিতার আঙুলগুলো ম ম করছে বকুলের ঘ্রাণে। শুভ্র খুব নরম গলায় বলল,
"আদিল ঠিক বলছে, নন্দিতা। ডিজাইনগুলো সব রেডি, শুধু কালার কম্বিনেশন নিয়ে আমি একটু কনফিউজড। তুমি তো জানো আমি সব সময় একটু ডার্ক শেড পছন্দ করি, কিন্তু এবারের থিমটা একটু ব্রাইট হওয়ার কথা ছিল। তুমি একটু দেখে দিলে আমার সত্যিই খুব উপকার হতো। সৌরভকেও আমি বলে রেখেছি যে তুমি একবার চোখ বুলিয়ে দেবে।"
অনিন্দিতা শুভ্রর চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। যে মানুষটা ওর জন্য নিজের সবকিছু এত অবলীলায় বিসর্জন দিতে পারে, তার জন্য এতটুকু করতে পারবে না ও?
"পারবে না, ফুল?"
অনিন্দিতাকে অমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে ওর ধরে রাখা হাতটায় একটু চাপ দিল শুভ্র। স্ক্রিনের ওপার থেকে আদিল তাকিয়ে আছে চিন্তিত চোখে।
একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে খুব ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল অনিন্দিতা,
"চেষ্টা করব.. কিন্তু আমি যদি ভুল কিছু করি, তখন রাগ করবেন না তো?"
শুভ্রর চোখেমুখে তখন রাজ্যের আনন্দ। ও দ্রুত অনিন্দিতার কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল, "আমার মেঘফুলকে ভুল করলেও আমার কাছে সেটা স্পেশাল!
ফোনের ওপার থেকে আদিল একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
--- দ্যাটস মাই ভাবি! চাপ নেওয়ার দরকার নেই, যতক্ষণ ভালো লাগবে, ততক্ষণ করলেই যথেষ্ট। গেট ইট, শুভ্র?
--- ইয়েস!
--- আমি তাহলে আসছি, ভাবি। আবার কথা হবে ইনশাআল্লাহ! ও হ্যাঁ, বকুলের মালাটা গাঁথা হলে মনে করে আমাকে একটা ছবি দেবেন কিন্তু! টা-টা!
কলটা ডিসকানেক্ট হতেই ঘাটজুড়ে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। অনিন্দিতা নিজের মাথাটা শুভ্রর কাঁধে এলিয়ে দিতেই শুভ্র খুব সন্তর্পণে প্রশ্নটা করল,
"তাহলে লাঞ্চের পর আমরা কিছুক্ষণ ল্যাপটপ নিয়ে বসি? তুমি আর আমি? সৌরভকে সাথে নেবে? বেচারা এতদূর থেকে এসেছে!"
প্রশ্নটা শুনতেই একটা সূক্ষ্ম কম্পন বয়ে গেল অনিন্দিতার শরীরজুড়ে। গত রাতের প্যানিক অ্যাটাকটার রেশ এখনও বিদ্যমান রন্ধ্রে রন্ধ্রে। অপরিচিত কিংবা স্বল্প পরিচিত কোনো পুরুষের উপস্থিতি কল্পনা করতেই ওর ভেতরে সেই গুমোট আতঙ্কটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইল কেমন।
অনিন্দিতা চোখ বন্ধ করে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল-- সৌরভ তো শুভ্রর অতি বিশ্বস্ত। শুভ্রর সাথে ছায়ার মতো থাকে ছেলেটা। আর শুভ্র তো পাশেই থাকবে।
কিন্তু না, মস্তিষ্কের নিউরনগুলো ইতোমধ্যেই সতর্ক সংকেত পাঠাতে শুরু করেছে। পুরুষালী কণ্ঠস্বর বা উপস্থিতির কথা ভাবলেই রায়ানের ওই শক্ত হাতের কবজি চেপে ধরার স্মৃতিটা চাবুক মারছে মস্তিষ্কে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেই রাত-- সেই পৈশাচিক হাসি, সেই জঘন্য স্পর্শ।
নিজের অজান্তেই শুভ্রর টি-শার্টের হাতাটা খামচে ধরল অনিন্দিতা। বাহুডোরে আবদ্ধ থাকা নরম শরীরটা মূহুর্তের ব্যবধানে শক্ত হয়ে উঠেছে অনুভব করতেই সতর্ক হলো শুভ্র। অনিন্দিতার কপালে তৎক্ষণাৎ একটা চুমু খেয়ে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল,
"ওকে, ওকে রিল্যাক্স! সৌরভকে ডাকবো না, আমরা দুজন বসবো শুধু। সৌরভ ড্রয়িংরুমে থাকবে, তুমি ডিজাইনগুলো ফাইনাল করে দেওয়া মাত্রই ও ফিরে যাবে। ওকে?"
ভীতি কাটানোর এই প্রক্রিয়াটা যে খুব দ্রুতগতিতে সম্ভব নয়, শুভ্র, আদিল দুজনেই জানে সেটা। হুট করে ওকে ভিড়ের মাঝে বা অপরিচিত মানুষের সামনে ঠেলে দেওয়া মানেই হলো হিতে বিপরীত হওয়া। জেনেও শুভ্র একবার চেষ্টা করতে চেয়েছিল, যদি একটু একটু করে আগানো যায়, তাই! অথচ অনিন্দিতার মনের ক্ষতগুলো এখনো অনেকটাই কাঁচা।
শুভ্রর বুকের ভেতর সেঁধিয়ে গিয়ে অনিন্দিতা একটু সময় নিয়ে কয়েকবার লম্বা শ্বাস ফেলল। তারপর ধীর স্বরে প্রায় ফিসফিস করে বলল, "আমি আসলে... আমি জানি ও ভালো ছেলে। আপনি ওকে বিশ্বাস করেন, তাই আমিও করি। কিন্তু... কিন্তু আমার ভয় লাগে শুভ্র। কেউ আমার দিকে তাকালে মনে হয় সে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমার শরীর একা একাই রিঅ্যাক্ট করে ফেলে। আই অ্যাম স্যরি, শুভ্র।"
"বোকা মেয়ে! স্যরি কেন বলছ? ইটস নট ইওর ফল্ট। আমরা খুব ধীরে আগাব, কোনো তাড়া নেই।" শুভ্র ওকে নিজের বুকের সাথে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, "রোদ বাড়ছে, চলো ঘরে যাই..."
***
জোবেদা খালার কাছ থেকে সুঁই-সুতো নিয়ে বকুলের মালা গাঁথতে বিছানায় বসেছে অনিন্দিতা। শুভ্র ল্যাপটপ নিয়ে ঘরে ঢুকতেই দেখল অনিন্দিতার মালা গাঁথা শেষের পথে। ল্যাপটপটা বিছানায় রেখে ঝুঁকে এসে অনিন্দিতার গালে টুপ করে একটা চুমু খেল ও।
"আমার ফুলের হাতে এসে দেখি এগুলোর সৌন্দর্যই অন্যরকম বেড়ে গেছে, হুঁ? কে বেশি সুন্দর বলো তো, নন্দিতা? আমার ফুল, নাকি তোমার?"
অনিন্দিতা লাজুক হাসল। মালাটা শুভ্রর হাতে দিয়ে মৃদু স্বরে বলল, "আপনি বলুন!"
অনিন্দিতার বিনুনি গাঁথা চুলগুলোয় বকুলের মালাটা জড়িয়ে দিয়ে নাক ডোবালো ঘাড়ের কাছে। বকুল ফুলের সাদা মালাটা ওর কালো চুলের অরণ্যে জ্বলজ্বল করছে একঝাঁক নক্ষত্রের মতো। ঘাড়ের কাছে নাক ঘষতেই বকুলের মাদকতা আর অনিন্দিতার শরীরের নিজস্ব ঘ্রাণ মিলেমিশে একাকার হয়ে ধরা দিল শুভ্রর নাসারন্ধ্রে।
"তুমি কি জানো, এই বকুলের চেয়েও হাজার গুণ বেশি নেশা তোমার গায়ের গন্ধে?"
নাক ঘষতে ঘষতে একটা গভীর নিঃশ্বাস টানতেই অনিন্দিতা জমে গেল কেমন, "শু-শুভ্র!"
শুভ্র জবাব না দিয়ে পেছন থেকেই মুখটা অগ্ৰসর করল ধীরে ধীরে। ঘাড়ের অংশ পেরিয়ে ঠোঁট ছোঁয়ালো কন্ঠনালিতে। অনিন্দিতা শিউরে উঠে চোখ বন্ধ করে ফেলল তৎক্ষণাৎ।
"ক-কাজ কর-করবেন না?"
মসৃণ গ্ৰীবাদেশ ছোট ছোট চুমুতে ভরিয়ে দিতে অস্ফুট স্বরে শুভ্র বলল, "কাজই তো করছি, উমম.. ভেরি ইম্পর্টেন্ট ওয়ার্ক!"
পুরু ঠোঁটের মৃদু চাপ আর উষ্ণ নিশ্বাসে অনিন্দিতার দম আটকে আসার উপক্রম। শুভ্রর ঠোঁটের তপ্ত ছোঁয়া যখন ওর কণ্ঠনালির খাঁজে স্থির হলো, অনিন্দিতার মনে হলো শিরদাঁড়া বেয়ে একটা মৃদু বিদ্যুৎপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। অনুভূতির তীব্রতায় সরু কোমর জড়িয়ে রাখা বলিষ্ঠ হাত দুটো খামচে ধরল মেয়েটা।
"উমম.. শুভ্র.. উঁহু.. সুড়সুড়ি লাগছে তো.. সরুন!"
শুভ্র মুখ তুলল না। উল্টে গলার নরম অংশে আলতো করে কামড় বসাল। ব্যথার চেয়েও এক অদ্ভুত শিহরণে অনিন্দিতা একটা অস্ফুট শব্দ করল। সারা শরীর যেন অবশ হয়ে আসছে। শুভ্রর অবিন্যস্ত চুলগুলো অনিন্দিতার থুতনিতে সুড়সুড়ি দিচ্ছে অনবরত, কিন্তু সেই সুড়সুড়িতে খিলখিল করে হেসে ওঠার বদলে গভীর আবেশে ও দুই হাতে খামচে ধরেছে শুভ্রর চওড়া দুই কাঁধ।
কলারবোনের ওপর শেষ একটা চুমু খেয়ে শুভ্র সরে এসে অনিন্দিতাকে আলতো করে ঘুরিয়ে নিল নিজের দিকে। অনিন্দিতার মুখটা লজ্জায় লাল টুকটুকে, চোখের মণি দুটো কাঁপছে আবেশে। শুভ্র ওর নাকে নাক ঘষে ঠোঁটের একদম কাছে মুখ নিয়ে এলো। অনিন্দিতা নিজের অজান্তেই একটু এগিয়ে এসেছে কাঙ্ক্ষিত স্পর্শের আশায়। শুভ্র মৃদু হেসে ওর ঠোঁটের কোণে আলতো ছুঁয়ে দিয়ে সরে এলো আচমকাই।
"এখন না.. ডিজাইনার ম্যামের সাথে একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে এখন আমার। আগে কাজ শেষ করি, তারপর উই উইল ব্যাক টু দিস 'ইম্পর্টেন্ট ওয়ার্ক'! অলরাইট, মিসেস শুভ্র?"
অনিন্দিতা থতমত খেয়ে গেল শুভ্রর হঠাৎ সরে যাওয়ায়। পরক্ষণেই ওর দুষ্টুমি বুঝতে পেরে গাল দুটো রক্তিম হয়ে উঠল দ্বিগুণ। হাতের কাছের বালিশটা তুলে শুভ্রর দিকে ছুড়ে মারল ও। ঠোঁটে তখনো লেগে আছে উষ্ণ পরশের রেশ, হৃদপিণ্ডটা সজোরে ড্রাম পেটাচ্ছে বুকের ভেতর। শুভ্র বালিশটা লুফে নিয়ে হাহা করে হেসে উঠে ল্যাপটপটা অনিন্দিতার কোলের ওপর রাখল।
"দেখুন ম্যাডাম, আপনার পিএস হিসেবে মিস্টার তাহমিদ রায়হান শুভ্র আপনার সামনে এই ফাইলগুলো প্রেজেন্ট করছে। দয়া করে আপনার জহুরি চোখের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাকে উদ্ধার করুন!"
শুভ্রর রসিকতায় অনিন্দিতা হাসল। ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে 'রায়হান ক্রিয়েশনস'-এর নতুন সিজনাল কালেকশনের স্কেচগুলো। বিভিন্ন রঙের সমারোহ আর সূক্ষ্ম সব এমব্রয়ডারি ডিজাইনে ঝলমল করতে থাকা স্ক্রিনটা চোখের সামনে ভেসে উঠতে হঠাৎই মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করে উঠলো অনিন্দিতার।
স্ক্রিনের উজ্জ্বল আলোর সাথে অসংখ্য সূক্ষ্ম কারুকাজ মস্তিষ্কের ভেতরে জট পাকিয়ে দিচ্ছে যেন। অনিন্দিতা কয়েকবার পলক ঝাপটে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল। শুভ্র ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল বলেই সাথে সাথে টের পেল ব্যপারটা।
অনিন্দিতার আঙুলগুলো কাঁপছে। ল্যাপটপের ওপর রাখা ওর হাতটা শক্ত হয়ে এসেছে। শুভ্র তড়িঘড়ি করে ল্যাপটপটা একটু দূরে সরিয়ে নিয়ে অনিন্দিতার কাঁধে হাত রাখল।
"নন্দিতা? কী হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে, ফুল?"
শুভ্রর গলায় উদ্বেগ। অনিন্দিতা একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে নিজেকে স্থির করল। না, এবার ও পিছু হটবে না। আদিলের কথাগুলো ওর কানে বাজছে-- নিজের জন্য নয়, শুভ্রর জন্য অন্তত চেষ্টা করতে হবে।
"ঠিক আছি। আপনি স্ক্রল করুন, আমি দেখছি..."
শুভ্র ওর হাতদুটো নিজের হাতের ভেতর টেনে নিয়ে নরম গলায় বলল, "প্রেসার ফিল করলে করার দরকার নেই, সোনা। আই উইল ম্যানেজ। তুমি চাপ নিও না, রিল্যাক্স!"
অনিন্দিতা মৃদু হাসল, "আ'ম ফাইন, শুভ্র! লেট মি ডু ইট!"
শুভ্র ওর হাত দুটোতে একে একে ঠোঁট ছুঁইয়ে ছেড়ে দিল। তারপর স্ক্রল করে দেখাতে শুরু করল ডিজাইনগুলো। প্রথম কয়েকটা সালোয়ার-কামিজের ডিজাইন দেখে অনিন্দিতা কোনো মন্তব্য করল না, তীক্ষ্ণ চোখে পর্যবেক্ষণ করে গেল শুধু। তারপর একটা নীল রঙের মসলিন শাড়ির স্কেচ আসতেই ও থামিয়ে দিল শুভ্রকে।
"এই ডিজাইনটা... পাড়ের কাজটা কি বেশি ভারি হয়ে যাচ্ছে না?" অনিন্দিতার গলায় একচিলতে আত্মবিশ্বাস উঁকি দিচ্ছে যেমন, "গ্রীষ্মের কালেকশন যেহেতু, মানুষ আরাম খুঁজবে। এই পাড়টা যদি একটু সরু করে সেখানে রুপোলি সুতোর কাজ দেওয়া যায়, তবে দেখতে অনেক বেশি এলিগেন্ট লাগবে।"
শুভ্র অবাক হয়ে ডিজাইনটার দিকে তাকাল, "ইউ আর রাইট! আমি তো এটা খেয়ালই করিনি। পাড়টা সরু হলে ড্র্যাপিংটাও সুন্দর হবে।"
পরের এক ঘণ্টা অনিন্দিতা যেন অন্য এক মানুষ। ও ভুলে গেল কয়েক ঘণ্টা আগের শ্বাসকষ্ট, ভুলে গেল কয়েকদিন আগের সেই বিভীষিকা। ও এখন শুধুই একজন দক্ষ ডিজাইনার। শুভ্র মুগ্ধ হয়ে ওর কথাগুলো শুনতে শুনতে দ্রুত নোট নিচ্ছিল। মনে মনে ও আদিলকে ধন্যবাদ দিল সহস্রবার। কাজের মাঝে ডুবে থেকে অনিন্দিতা যেন ভুলে গেছে ও অসুস্থ। ওর চোখের শূন্যতা এখন সৃজনশীলতার আলোয় উজ্জ্বল।
কাজ শেষ করে অনিন্দিতা যখন ল্যাপটপটা বন্ধ করল, ওর কপালে তখন কয়েক ফোঁটা ঘাম জমেছে। অথচ চোখদুটো কেমন অদ্ভুত তৃপ্তি। ও শুভ্রর দিকে তাকিয়ে একটু লাজুক হাসল।
"আমি কি খুব বেশি ভুল ধরেছি?"
শুভ্র ল্যাপটপটা পাশে সরিয়ে রেখে অনিন্দিতাকে জাপটে ধরল, "ভুল নয় নন্দিতা, তুমি এই কালেকশনটাতে প্রাণের সঞ্চার করলে। আব্বু শুনলে যে কী খুশি হবে! তুমি জানো না আজ তুমি আমার কত বড় একটা টেনশন কমিয়ে দিলে, ফুল!"
To be continued...