"আমি ওকে বিয়ে করতে পারব না, মা।"
হিমালয়ের কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা।
"তোমরা কীভাবে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিলে? একবারও কি আমার মতামত জানার প্রয়োজন মনে হলো না? শুভ্রতাকে আমি ছোটবেলা থেকেই নিজের বোনের মতো দেখেছি। ওর প্রতি আমার কোনো রোমান্টিক অনুভূতি নেই। আমি ওকে একজন বোন হিসেবেই ভালোবাসি, জীবনসঙ্গিনী হিসেবে কখনো ভাবতে পারব না।"
কথাগুলো একনাগাড়ে বলে থামল হিমালয়। তারপর কিছুটা ইতস্তত করে আবার বলল,
"আর একটা কথা... আমি রিয়াকে ভালোবাসি। শুভ্রতার বান্ধবী রিয়া।"
মুহূর্তেই পুরো ড্রয়িংরুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ আগেও যেখানে বিয়ের আলোচনা নিয়ে সবার মুখে হাসি ছিল, সেখানে এখন নেমে এসেছে অস্বস্তিকর নীরবতা। উপস্থিত প্রত্যেকের চোখেমুখে বিষণ্নতার ছাপ স্পষ্ট।
মিস্টার সালমান চৌধুরীর চোখ রাগে লাল হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, রুবিনা বেগম ছেলের মুখে এমন কথা শুনে বাকরুদ্ধ। চোখ ভরে উঠেছে জলে।
ছেলের কাছ থেকে এমন উত্তর তারা কেউই কল্পনা করেননি।
হিমালয়ের কথার ধাক্কা সামলাতে না পেরে রুবিনা বেগম মাথা ঘুরে ঢলে পড়তে গেলে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শীতল দ্রুত তাকে ধরে ফেলে।
ভারী কণ্ঠে সালমান চৌধুরী বললেন,
"তোমার একমাত্র ফুপি হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। তার শেষ ইচ্ছা, নিজের চোখে তোমাদের বিয়ে দেখে যাওয়া। ছোটবেলা থেকেই তোমার ফুপু, ফুপা আর আমরা ঠিক করে রেখেছিলাম—একদিন তোমার সঙ্গে শুভ্রতার বিয়ে দেব।"
হিমালয় শান্ত থাকার চেষ্টা করল।
"বাবা, একটা সম্পর্ক শুধু পারিবারিক সিদ্ধান্তে হয় না। দুজন মানুষের অনুভূতিও গুরুত্বপূর্ণ। শুভ্রতাকে আমি কখনো সেই দৃষ্টিতে দেখিনি। ও আমার কাছে পরিবারেরই একজন।"
একটু থেমে সে বলল,
"তাছাড়া, ওরও তো নিজের মতামত আছে। ও আদৌ এই বিয়ে চায় কি না, সেটা কি কেউ জানতে চেয়েছে?"
সালমান চৌধুরীর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
"শুভ্রতার মতামত নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না।"
তিনি কিছুক্ষণ থেমে আবার বললেন,
"তোমার ফুপা লন্ডনে ফিরে যেতে চায়। আমি চাই না আমার বোন আর তার পরিবার আমাদের থেকে দূরে চলে যাক। শুভ্রতা যদি এই বাড়ির বউ হয়, তাহলে তারা চাইলেও আমাদের ছেড়ে যেতে পারবে না।"
হিমালয় গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।
"কাউকে আটকে রাখার জন্য বিয়ে দেওয়া কি ঠিক হবে, বাবা?"
সালমান চৌধুরী কঠোর দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকালেন।
"আমি এ বিষয়ে আর কোনো কথা শুনতে চাই না।"
আর একটি শব্দও উচ্চারণ করল না হিমালয়। সবার দিকে একবার তাকিয়ে ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত পরই বাড়ির প্রধান দরজা জোরে বন্ধ হওয়ার শব্দে আবারও নেমে এল ভারী নীরবতা।
হিমালয় চৌধুরী চৌধুরী পরিবারের বড় নাতি। তার বাবা সালমান চৌধুরী এবং মা রুবিনা বেগম। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী একটি বড় বাংলো বাড়িতে তারা সবাই একান্নবর্তী পরিবার হিসেবে বসবাস করেন।
সালমান চৌধুরীর একমাত্র ছোট বোন আলেয়া বেগম। তার স্বামী আয়মান রহমান ব্যবসার কারণে দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনে বসবাস করছেন। তবে আলেয়া বেগম ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার সুবিধার জন্য বেশিরভাগ সময় দেশেই থাকেন, ভাইয়ের পরিবারেই।
আলেয়া বেগমের দুই সন্তান—বড় ছেলে তুষার রহমান এবং ছোট মেয়ে শুভ্রতা রহমান। আজকের পারিবারিক আলোচনার সময় তুষার বাড়িতে ছিল না। তাই বিষয়টি সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই।
অন্যদিকে, সালমান চৌধুরীর ছোট ভাই মিনার চৌধুরীও একই বাড়িতে থাকেন। তার বড় মেয়ে শীতল। এছাড়া আরও দুই ছোট সন্তান রয়েছে, যাদের বয়স যথাক্রমে পাঁচ ও তিন বছর। বড়দের পাশাপাশি ছোটদের কোলাহলেও সারাক্ষণ মুখর থাকে চৌধুরী বাড়িটি।
হিমালয়ের বয়স পঁচিশ বছর। ২০২০ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় করোনা মহামারি এবং পরপর টাইফয়েডে আক্রান্ত হওয়ায় তার পড়াশোনায় দীর্ঘ বিরতি পড়ে। ফলে নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা দিতে পারেনি। পরে সুস্থ হয়ে ২০২৩ সালে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করে। ছোটবেলা থেকেই বুয়েটে পড়ার স্বপ্ন ছিল তার। বর্তমানে সে বুয়েটে ভর্তির প্রস্তুতির পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনে যাওয়ার প্রক্রিয়াও চালিয়ে যাচ্ছে।
উচ্চতা পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি। মুখে দাড়ি-গোঁফ নেই বললেই চলে। পরিষ্কার, কোমল মুখাবয়ব আর শান্ত স্বভাবের কারণে তাকে বয়সের তুলনায় অনেক কমবয়সী মনে হয়। কোরিয়ানদের মতো মিষ্টি চেহারা আর ভদ্র ব্যক্তিত্বের জন্য পরিচিতদের কাছে সে বেশ জনপ্রিয়। এলাকার অনেক মেয়েই তাকে নীরবে পছন্দ করলেও এসব বিষয়ে হিমালয়ের কখনোই বিশেষ আগ্রহ ছিল না।
শুভ্রতা রহমানের বয়স সতেরো বছর। সে বর্তমানে একাদশ শ্রেণিতে পড়ছে। গায়ের রং ফর্সা, উচ্চতা পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি। কাঁধ পর্যন্ত সোজা, সিল্কি ছোট চুলই তার আলাদা পরিচয়। শাড়ি বা সালোয়ার-কামিজের চেয়ে জিন্স, টি-শার্ট, শার্ট কিংবা ফতুয়াতেই তাকে বেশি দেখা যায়। ছেলেমানুষি স্বভাব আর ছোট চুলের কারণে প্রথম দেখায় তাকে অনেকের কাছেই বয়সের তুলনায় ছোট মনে হয়।
শীতল ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামলা। মায়াবী মুখ আর শান্ত স্বভাবের জন্য পরিবারের সবার খুব আদরের।
রিয়া শুভ্রতার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো হাঁটু ছুঁয়ে যাওয়া লম্বা, সিল্কি চুল। তবে শুধু সৌন্দর্য নয়, তার ভদ্রতা, কোমল ব্যবহার আর প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্বও খুব সহজেই মানুষকে আকৃষ্ট করে। ধীরে ধীরে সেই সরলতা আর মায়াবী হাসিতেই মুগ্ধ হয়ে পড়েছিল হিমালয়।
শুভ্রতা ছোটবেলা থেকেই হিমালয়কে অন্যরকম চোখে দেখত। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ভালো লাগা নীরবে গভীর ভালোবাসায় রূপ নেয়। তবে নিজের অনুভূতির কথা সে কখনো কাউকে জানায়নি।
হিমালয় পড়াশোনার কারণেই বছরের বেশিরভাগ সময় বাড়ির বাইরে থাকত। ছুটিতে কয়েক দিনের জন্য বাড়ি এলেও পরিবারের ছোটদের সঙ্গে খুব একটা সময় কাটাত না। শান্ত, অন্তর্মুখী স্বভাবের হওয়ায় প্রয়োজন ছাড়া কারও সঙ্গে বেশি কথা বলত না। তাই শুভ্রতার ভালোবাসা একতরফাই থেকে যায়।
অন্যদিকে, রিয়া ছিল শুভ্রতার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। দুজনের বন্ধুত্ব এতটাই গভীর ছিল যে একে অপরের কাছে কোনো কথা লুকাত না। অথচ জীবনের সবচেয়ে বড় খবরটাই শুভ্রতার অজানা ছিল।
সেদিনের কথা আজও স্পষ্ট মনে আছে শুভ্রতার।
সারাদিনের গুমোট গরমের পর বিকেল থেকেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল। বৃষ্টি তার ভীষণ প্রিয়। তাই ভিজতে ভিজতেই ছাদে উঠে গিয়েছিল সে।
ছাদের এক কোণায় পৌঁছাতেই আচমকা থমকে দাঁড়ায়।
কয়েক হাত দূরে হিমালয় আর রিয়া একে অপরকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরমুহূর্তেই তাদের ঠোঁট এক হয়ে যায়।
মুহূর্তের জন্য যেন শুভ্রতার চারপাশের পৃথিবী থেমে গেল।
ঠিক তখনই আকাশ চিরে বজ্রপাত হলো। কিন্তু সেই শব্দের চেয়েও প্রবল একটা ঝড় বয়ে গেল শুভ্রতার বুকের ভেতর।
সে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু আর বৃষ্টির ফোঁটা একসঙ্গে মিশে যেতে লাগল।
হঠাৎ রিয়ার চোখ পড়ল শুভ্রতার দিকে।
সে তাড়াতাড়ি হিমালয়ের কাছ থেকে সরে দাঁড়াল। হিমালয়ও শুভ্রতার দিকে একবার তাকিয়ে অস্বস্তিতে চোখ নামিয়ে নিল। কোনো কথা না বলে দ্রুত সিঁড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।
হিমালয় চলে যেতেই রিয়া ধীরে ধীরে শুভ্রতার সামনে এসে দাঁড়াল।
মুখে স্পষ্ট অস্বস্তির ছাপ।
"তুই... কখন এলি?" কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল সে। "আসলে ব্যাপারটা..."
শুভ্রতা তাকে থামিয়ে দিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
"হিমভাইয়ার সঙ্গে তোর সম্পর্ক কবে থেকে?"
রিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে মৃদু হেসে বলল,
"প্রায় দুই মাস।"
শুভ্রতা ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলল,
"বাহ! আমার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী প্রেম করছে, তাও আবার আমার ভাইয়ের সঙ্গে। অথচ আমি কিছুই জানলাম না!"
রিয়া অপরাধী মুখে বলল,
"সরি, শুভ্র। হিমালয়ই মানা করেছিল। ও চায়নি পরিবারের কেউ এখনই জানুক। তাই তোকে বলতেও পারিনি।"
শুভ্রতা ধীরে মাথা নাড়ল।
"আচ্ছা, বাদ দে। বল তো, শুরুটা কীভাবে হলো? হিমভাইয়াকে তো কখনো এসব নিয়ে ভাবতেই দেখিনি।"
রিয়ার ঠোঁটে লাজুক হাসি ফুটে উঠল।
"প্রতিদিন বিকেলে ছাদে দেখা হতো। তারপর রাস্তায়ও কয়েকবার দেখা হয়। একদিন সিয়ামের হাতে একটা চিঠি আর একটা গোলাপ পাঠিয়েছিল। তারপর দেখা করে নিজের মনের কথা বলেছিল।"
একটু থেমে লজ্জা মিশ্রিত হাসিতে আবার বলল,
"এত ভদ্র আর সুন্দর একটা ছেলে যখন ভালোবাসার কথা বলল... তখন আর না বলতে পারিনি।"
শুভ্রতা হাসল।
"ভালোই হয়েছে। তাহলে আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু একদিন আমার ভাবি হবে।"
রিয়া মৃদু হেসে বলল,
"জানি না, শেষ পর্যন্ত কী হবে। তবে একটা কথা জানিস? হিমালয় বলেছে, আমার সবচেয়ে সুন্দর জিনিস নাকি আমার লম্বা চুল।"
শুভ্রতা মৃদু হেসে উত্তর দিল,
"তোর মতো মেয়েকে পছন্দ না করার কোনো কারণই নেই।"
রিয়া মজা করে বলল,
"তোরও তো কলেজে সবচেয়ে বেশি প্রপোজ আসে।"
শুভ্রতার হাসিটা এবার একটু ফিকে হয়ে গেল।
"প্রপোজ পেলেই সবাই ভাগ্যবান হয় না, রিয়া।"
"মানে?"
শুভ্রতা আকাশের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,
"কারণ... আমার ভালোবাসার মানুষটা তোকে ভালোবাসে।"
কথাটা শুনে রিয়া কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেল না।
অস্বস্তিতে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে সে পাশের বাড়ির ছাদে চলে গেল।
রিয়া চোখের আড়াল হতেই শুভ্রতা ধীরে ধীরে ছাদের ভেজা মেঝেতে বসে পড়ল।
বৃষ্টি তখনও ঝরছে।
মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকাতেই তার চোখ থেকে নেমে আসা অশ্রুগুলো বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।
সেদিন প্রথমবার সে বুঝেছিল, নীরবে কাউকে ভালোবাসার কষ্ট ঠিক কতটা গভীর হতে পারে।
চলবে....
#সূচনা_পর্ব
#হিমশুভ্রতা