তোমার ই হাত ধরে রবের পথে
লেখক: নাহিদ মাতাব্বর
পর্ব: ২২
তিন দিনের দাওয়াতি সফরের শেষ দিন।
ভোরের আলো ফুটতেই মুসআব ও তার বন্ধুরা দিনের কাজের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। গত দুই দিনের মতো আজও তাদের সময়টা নির্ধারিত ছিল বিভিন্ন দাওয়াতি কাজে।
ফজরের নামাজের পর সবাই কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইল।
হামজা বলল,
— “দেখতে দেখতে তিন দিন শেষ হয়ে গেল।”
মুসআব মৃদু হেসে বলল,
— “সময় তো এভাবেই চলে যায়।”
— “ফিরে গিয়ে আবার সেই পড়াশোনা, ক্লাস, পরীক্ষা…”
মুসআব মাথা নাড়ল।
— “দায়িত্ব থেকে তো পালানো যাবে না।”
সবাই হেসে উঠল।
তারপর তারা দিনের কাজে বেরিয়ে গেল।
সারাদিন বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে দেখা করা, দ্বীনের কথা বলা এবং নিজেদের সময়কে কাজে লাগানোর মধ্য দিয়ে শেষ দিনটাও কেটে গেল।
বিকেলের দিকে সবাই এক জায়গায় ফিরে এলো।
একজন বন্ধু বলল,
— “এই তিন দিনে একটা জিনিস বুঝলাম—দাওয়াত শুধু অন্যকে বলা নয়, নিজের জীবনেও সেটা আনার চেষ্টা করা।”
মুসআব বলল,
— “ঠিক বলেছেন। নিজের সংশোধনটাই আগে দরকার।”
হামজা মুসআবের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তুই আগের মতোই আছিস, কিন্তু মনে হচ্ছে এই তিন দিনে তোর ভেতরেও অনেক কিছু বদলেছে।”
মুসআব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “আমাদের সবারই বদলানো দরকার।”
তারপর সবাই মিলে আগামী দিনের পরিকল্পনা করল।
রাতের খাবারের পর মুসআব নিজের ব্যাগ গুছিয়ে রাখল।
কাল সকালে তারা বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেবে।
---
এদিকে কলেজে তৃতীয় দিনও প্রায় শেষ।
মাহিরা ক্লাস থেকে বের হয়ে করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিল।
আয়াত এসে বলল,
— “কাল ওরা আসবে।”
মাহিরা একটু অবাক হয়ে বলল,
— “হুম।”
— “তুই খুশি হয়েছিস?”
মাহিরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— “কেন খুশি হব?”
আয়াত মৃদু হাসল।
— “এমনি জিজ্ঞেস করলাম।”
মাহিরা কিছু বলল না।
কিছুক্ষণ পর সে বলল,
— “আসলে একটা জিনিস বুঝেছি।”
— “কী?”
— “কেউ কাছে থাকলে তার উপস্থিতি আমরা বুঝতে পারি না। কিন্তু হঠাৎ কয়েকদিন না দেখলে বুঝি, মানুষটা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কতটা জায়গা নিয়ে ফেলেছে।”
আয়াত চুপ করে গেল।
কথাটা তার নিজের ক্ষেত্রেও সত্যি।
কিন্তু সে জানে, মাহিরাকে সে নিজের মনের কথা বলতে পারবে না।
মাহিরা হঠাৎ বলল,
— “চল, বাসায় যাই।”
দুজন গেটের দিকে হাঁটতে লাগল।
---
সন্ধ্যায় আয়াত বাসায় ফিরে নিজের ঘরে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
তিন দিন ধরে মুসআবকে দেখেনি।
তার মন বারবার বলছিল—
“কাল আবার দেখা হবে।”
কিন্তু সে জানে, মুসআবের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অনুভূতির কথা বলা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
সে নিজের মনকে বোঝাল,
“যা হওয়ার, আল্লাহর ইচ্ছাতেই হবে।”
তারপর বই খুলে পড়তে বসে গেল।
---
অন্যদিকে মাহিরাও নিজের ঘরে বসে ছিল।
মুসআবের অনুপস্থিতিতে গত তিন দিনে সে একটা বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝেছে—
তার মনে মুসআবের জন্য শুধু সম্মান নেই।
তার চেয়ে বেশি কিছু একটা তৈরি হচ্ছে।
কিন্তু সে সেই অনুভূতিকে কোনো নাম দিতে চাইল না।
সে শুধু ভাবল,
“কাল ওকে দেখব।”
তারপর নিজের মনেই হাসল।
কেন হাসছে, সে নিজেও জানে না।
---
রাত গভীর হলো।
একদিকে মুসআব তার ব্যাগ গুছিয়ে ঘুমাতে গেল।
অন্যদিকে মাহিরা আর আয়াতও নিজেদের ঘরে।
তিন দিনের সফর শেষ।
আগামীকাল মুসআব আবার কলেজে ফিরবে।
কেউ জানে না, তার ফিরে আসার পর প্রথম দেখা, প্রথম সালাম, প্রথম কয়েকটি মুহূর্ত—কার মনে কী প্রভাব ফেলবে।
তবে একটা বিষয় নিশ্চিত—
এই তিন দিনের দূরত্বের পর, প্রত্যেকেই নিজের মনের কিছু সত্য আগের চেয়ে একটু বেশি বুঝতে পেরেছে।
চলবে...