তোমার ই হাত ধরে রবের পথে
লেখক: নাহিদ মাতাব্বর
পর্ব: ২৮
পরের কয়েকটা দিন কলেজে বেশ শান্তভাবেই কাটল। পরীক্ষা শেষ হওয়ায় সবাই একটু স্বস্তিতে। কেউ গল্প করছে, কেউ ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছে, আবার কেউ ফলাফল নিয়ে চিন্তায়।
মুসআব আর তার বন্ধুরাও আগের মতো নিজেদের কাজে ব্যস্ত।
একদিন ক্লাস শেষে মুসআবের বন্ধু হামজা বলল,
— “মুসআব, আগামী সপ্তাহে যে দাওয়াতি সফরের কথা বলেছিলাম, সেটা সম্ভবত ঠিক হয়েছে।”
মুসআব বলল,
— “কয় দিনের?”
— “তিন দিনের।”
মুসআব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “তারিখটা নিশ্চিত হলে জানিও।”
হামজা মাথা নাড়ল।
কথাটা মাহিরার কানে গেল।
সে কিছু বলল না।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল।
আয়াত সেটা লক্ষ্য করল।
— “কী হয়েছে?”
মাহিরা বলল,
— “কিছু না।”
— “তুই চুপ হয়ে গেলি যে?”
মাহিরা একটু হেসে বলল,
— “ওরা আবার তিন দিনের জন্য গেলে কলেজটা ফাঁকা লাগবে।”
আয়াত কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
— “হুম।”
মাহিরা বুঝতে পারল না, নিজের কথার মধ্যে সে কত বড় সত্য লুকিয়ে ফেলেছে।
---
পরদিন দুপুরে কলেজের লাইব্রেরিতে মাহিরা আর আয়াত পাশাপাশি বসে পড়ছিল।
হঠাৎ মাহিরা বলল,
— “আয়াত, তোর কি মনে হয় মুসআবের মতো ছেলে কখনো কাউকে পছন্দ করবে?”
আয়াতের হাত থেমে গেল।
সে কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
— “জানি না।”
— “তুই কী মনে করিস?”
— “হয়তো করবে। তবে সে নিশ্চয়ই বিষয়টা খুব ভেবেচিন্তে দেখবে।”
মাহিরা বলল,
— “মানে?”
আয়াত বলল,
— “ও তো এমন ছেলে না যে হঠাৎ কারও সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে জড়িয়ে যাবে। পরিবার, দ্বীন, চরিত্র—এসব দেখবে।”
মাহিরা ধীরে মাথা নাড়ল।
— “হুম। সেটাই তো ভালো।”
তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “জানিস, আমারও এখন মনে হয় কোনো কিছু হলে সঠিক পথেই হওয়া উচিত।”
আয়াত তার দিকে তাকাল।
— “তুই বদলে যাচ্ছিস।”
মাহিরা হেসে বলল,
— “হয়তো কিছু মানুষকে দেখে মানুষ নিজের কিছু ভুল বুঝতে পারে।”
আয়াত আর কোনো কথা বলল না।
---
সেদিন বিকেলে মুসআব কলেজ থেকে বের হওয়ার সময় দেখল, তার এক বন্ধু কিছু বই হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
— “কী হয়েছে?”
— “এই বইগুলো তোমার ছিল না?”
মুসআব বইগুলো নিয়ে বলল,
— “হ্যাঁ। ধন্যবাদ।”
— “বাসায় নিয়ে যাচ্ছিস?”
— “জি।”
তারা দুজন হাঁটতে হাঁটতে গেটের দিকে গেল।
দূর থেকে মাহিরা দৃশ্যটা দেখছিল।
মুসআবের আচরণে কোনো বাড়তি কিছু নেই।
না অপ্রয়োজনীয় কথা, না অযথা হাসি।
মাহিরার কাছে এই সংযমটাই এখন সবচেয়ে বেশি ভালো লাগতে শুরু করেছে।
সে মনে মনে বলল,
“আমি কেন এমন একজন মানুষকে পছন্দ করছি, যে হয়তো আমার দিকে ফিরেও তাকাবে না?”
তারপর নিজের মনকে উত্তর দিল,
“কারণ ভালো লাগা সবসময় পাওয়ার জন্য হয় না।”
---
রাতে আয়াত নামাজ শেষে অনেকক্ষণ বসে রইল।
তার মনে আজ একটা নতুন চিন্তা এসেছে।
মাহিরা যদি সত্যিই মুসআবকে ভালোবেসে ফেলে?
তাহলে কি সে নিজের ভালোবাসার কথা কখনো বলতে পারবে?
তারপর সে নিজের মনকে থামিয়ে দিল।
“না। মাহিরা আমার বন্ধু। তার বিরুদ্ধে আমার মনে কোনো অভিযোগ থাকবে না।”
কিন্তু হৃদয়ের ব্যথাকে বোঝানো এত সহজ নয়।
আয়াত চোখ মুছে নিল।
“যদি মুসআব আমার জন্য না হয়, তাহলে আল্লাহ নিশ্চয়ই আমার জন্য অন্য কোনো ভালো পথ রেখেছেন।”
সে জানে না সেই পথ কেমন।
শুধু জানে, তাকে ধৈর্য ধরতে হবে।
---
আর মুসআব?
সে নিজের ঘরে বসে আগামী দিনের পড়াশোনা আর দাওয়াতি কাজের পরিকল্পনা করছিল।
মাহিরা তাকে পছন্দ করে—সে জানে না।
আয়াত তাকে ভালোবাসে—সেটাও জানে না।
তিনজনের গল্প একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু তিনজনের হৃদয়ের পথ তিনদিকে।
আর সামনে এমন একটা সময় আসছে, যখন মাহিরার অনুভূতি আর শুধু অনুভূতি হয়ে থাকবে না—সেটা তার সিদ্ধান্তগুলোতেও প্রভাব ফেলতে শুরু করবে।
চলবে...