তোমার ই হাত ধরে রবের পথে
লেখক: নাহিদ মাতাব্বর
পর্ব: ৩৭
সকালের আলো তখনও পুরোপুরি তীব্র হয়ে ওঠেনি। কলেজের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে মুসআব আর তার বন্ধুরা শেষবারের মতো নিজেদের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছিল। তিন দিনের দাওয়াতি সফর—সময়টা খুব বেশি নয়, কিন্তু সবার মধ্যেই একটা আলাদা উৎসাহ কাজ করছে।
হামজা ব্যাগটা কাঁধে তুলে বলল,
— “সবাই এসেছে তো?”
মুসআব চারপাশে তাকিয়ে বলল,
— “একবার নামের তালিকাটা মিলিয়ে নে।”
হামজা তালিকা বের করে একে একে সবার নাম মিলিয়ে নিল।
— “হ্যাঁ, সবাই আছে।”
মুসআব বলল,
— “আলহামদুলিল্লাহ।”
তারপর সে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “একটা কথা মনে রাখিস। আমরা শুধু কয়েকটা দিনের জন্য বাইরে যাচ্ছি না। নিজেদেরও একটু যাচাই করার সুযোগ পাচ্ছি। সময়টা যেন অযথা নষ্ট না হয়।”
হামজা হেসে বলল,
— “বুঝেছি ভাই। বক্তৃতা শুরু করার দরকার নেই।”
সবাই হেসে ফেলল।
মুসআবও মৃদু হাসল।
তারপর আবার নিজের ব্যাগটা ঠিক করে নিল।
কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে মাহিরা আর আয়াত পুরো দৃশ্যটা দেখছিল।
মাহিরার চোখ বারবার মুসআবের দিকে চলে যাচ্ছিল। সে নিজেও বুঝতে পারছিল না, কেন আজকের এই সাধারণ দৃশ্যটাও তার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে।
আয়াত সেটা লক্ষ্য করেও কিছু বলল না।
কিছুক্ষণ পর মাহিরা ধীরে বলল,
— “ও সত্যিই চলে যাচ্ছে।”
আয়াত বলল,
— “হুম।”
— “তিন দিনের জন্য।”
— “জানি।”
মাহিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “তিন দিন আগে হলে হয়তো এত কিছু মনে হতো না।”
আয়াত তার দিকে তাকাল।
— “এখন হচ্ছে?”
মাহিরা একটু থেমে বলল,
— “হ্যাঁ।”
আয়াত আর কিছু বলল না।
কারণ তার নিজের মনেও একই অনুভূতি।
মুসআবরা রওনা হওয়ার আগে কয়েকজন শিক্ষককে সালাম করে বিদায় নিল।
একজন শিক্ষক বললেন,
— “ভালোভাবে যেও। আর ফিরে এসে পড়াশোনায় মন দিও।”
মুসআব বলল,
— “জি স্যার। ইনশাআল্লাহ।”
তারপর সবাই গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
হামজা হঠাৎ মুসআবকে বলল,
— “ভাই, একটা কথা।”
— “বল।”
— “ফিরে এসে কিন্তু আমাদের পড়াটা ধরিয়ে দিবি।”
মুসআব হেসে বলল,
— “নিজের পড়া নিজে শিখতে হবে।”
— “তাহলে তুই বন্ধু কিসের?”
— “দাওয়াতের সময় বন্ধু, পড়াশোনার সময় শিক্ষক!”
হামজা হেসে উঠল।
সবাই গাড়িতে উঠল।
মুসআবও উঠে বসার আগে একবার কলেজের দিকে তাকাল।
তার চোখে কোনো বিশেষ প্রত্যাশা ছিল না। শুধু পরিচিত জায়গাটাকে একবার দেখে নিল।
তারপর গাড়ি ছেড়ে দিল।
মাহিরা আর আয়াত দূরে দাঁড়িয়ে রইল।
গাড়িটা চোখের আড়াল হয়ে যাওয়ার পর মাহিরা ধীরে বলল,
— “চল?”
আয়াত মাথা নাড়ল।
— “চল।”
কলেজের করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মাহিরা হঠাৎ বলল,
— “আয়াত?”
— “হুম?”
— “তুই কি মনে করিস, মুসআব কোনোদিন বুঝতে পারবে?”
আয়াত বুঝে গেল প্রশ্নটা কী নিয়ে।
সে ধীরে বলল,
— “কী বুঝবে?”
— “আমাদের মধ্যে কেউ ওকে পছন্দ করে।”
আয়াত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— “হয়তো বুঝবে। হয়তো কখনোই বুঝবে না।”
মাহিরা বলল,
— “যদি বুঝে?”
— “তাহলে সিদ্ধান্ত তার।”
— “আর যদি সিদ্ধান্তটা আমাদের কারও পক্ষে না হয়?”
আয়াত মৃদু হেসে বলল,
— “তাহলে মেনে নিতে হবে।”
মাহিরা এবার চুপ হয়ে গেল।
সে বুঝতে পারল, আয়াত কথাগুলো মুখে যত সহজে বলছে, মেনে নেওয়া হয়তো তার জন্য ততটা সহজ হবে না।
সেদিন ক্লাসে মুসআব আর তার বন্ধুরা না থাকায় পরিবেশটা একটু অন্যরকম লাগছিল।
হামজার জায়গাটাও ফাঁকা।
ক্লাসের শুরুতে শিক্ষক উপস্থিতি নিতে গিয়ে মুসআবের নাম বললেন।
কেউ উত্তর দিল না।
মাহিরার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
আয়াত খাতায় লিখছিল।
শিক্ষক পরের নাম বললেন।
ক্লাস চলতে লাগল।
কিন্তু মাহিরার মন বারবার ফাঁকা বেঞ্চটার দিকে চলে যাচ্ছিল।
আয়াত সেটা বুঝতে পেরে ধীরে বলল,
— “পড়ায় মন দে।”
মাহিরা হেসে বলল,
— “দিচ্ছি।”
— “না, দিচ্ছিস না।”
— “তুই এত কিছু কীভাবে বুঝিস?”
আয়াত বলল,
— “বন্ধু তো।”
দুজনেই মৃদু হাসল।
সেদিন দুপুরে কলেজের ক্যান্টিনে বসে মাহিরা আর আয়াত চা খাচ্ছিল।
মাহিরা হঠাৎ বলল,
— “আমি একটা কথা বুঝেছি।”
— “কী?”
— “মুসআবকে পছন্দ করার পর আমি নিজের অনেক কিছু নিয়ে ভাবতে শুরু করেছি।”
আয়াত চুপ করে শুনছিল।
মাহিরা বলল,
— “আগে আমি রাগী ছিলাম। কেউ একটু কিছু বললেই উত্তর দিয়ে দিতাম। এখন মনে হয়, সব কথার উত্তর দিতে হয় না।”
আয়াত বলল,
— “এটা ভালো।”
— “আর আগে আমি ভাবতাম, কেউ আমাকে সম্মান করলে আমিও তাকে সম্মান করব। এখন বুঝি, কাউকে সম্মান করার জন্য তার কাছ থেকে কিছু পাওয়ার দরকার নেই।”
আয়াত এবার তার দিকে তাকাল।
মাহিরা বলল,
— “হয়তো মুসআব আমাকে কখনোই সেভাবে দেখবে না।”
আয়াতের চোখে এক মুহূর্তের জন্য কষ্ট ফুটে উঠল।
মাহিরা সেটা দেখতে পেল।
— “তুই কষ্ট পেলি?”
আয়াত মাথা নাড়ল।
— “না।”
মাহিরা ধীরে বলল,
— “তুই মিথ্যা বলিস না।”
আয়াত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু তোর ওপর না।”
মাহিরা তার হাত ধরল।
— “আমি তোকে হারাতে চাই না।”
আয়াত বলল,
— “আমিও না।”
দুজনেই চুপ করে গেল।
এদিকে তিন দিনের সফরের প্রথম দিন মুসআসাবরা নতুন জায়গায় পৌঁছে নিজেদের থাকার ব্যবস্থা করল।
সবার মধ্যে কাজ ভাগ করে দেওয়া হলো।
কেউ খাবারের ব্যবস্থা করছে, কেউ থাকার জায়গা গুছাচ্ছে, কেউ স্থানীয় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
মুসআব সবকিছুর মাঝেও নিজের কাজের পাশাপাশি বন্ধুদের সহযোগিতা করছিল।
একজন বন্ধু বলল,
— “মুসআব, তুই একটু বস। সকাল থেকে কাজ করছিস।”
মুসআব বলল,
— “সবাই কাজ করলে আমি বসে থাকব কেন?”
বন্ধু হেসে বলল,
— “তুই না থাকলে আমাদের কাজের গতি কমে যায়।”
মুসআব বলল,
— “একজনের ওপর নির্ভর না করে সবাই কাজ শিখে নে।”
সন্ধ্যার পর সবাই একসঙ্গে বসে দিনের কাজ নিয়ে আলোচনা করল।
মুসআব চুপচাপ শুনছিল।
একজন বলল,
— “আজকে বুঝলাম, মানুষকে কিছু বোঝানোর আগে নিজের আচরণ ঠিক করা কত গুরুত্বপূর্ণ।”
মুসআব বলল,
— “ঠিক। আমরা কথা দিয়ে যতটা বোঝাতে পারি, আচরণ দিয়ে তার চেয়ে বেশি বোঝাতে পারি।”
সবাই মাথা নাড়ল।
অন্যদিকে কলেজে সন্ধ্যার পর মাহিরা বাড়ি ফিরে ফোন হাতে নিল।
মুসআবের কোনো খবর নেই।
সে নিজেই অবাক হলো—কেন সে খবরের অপেক্ষা করছে?
তারপর ফোনটা পাশে রেখে দিল।
“না। আমি নিজে থেকে কোনো খবর নেব না।”
সে নিজের মনকে বোঝাতে চাইল।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার ফোনটা হাতে নিল।
কোনো নতুন মেসেজ নেই।
সে বিরক্ত হয়ে ফোনটা টেবিলে রেখে দিল।
ঠিক তখন আয়াতের মেসেজ এল।
“বাসায় পৌঁছেছিস?”
মাহিরা উত্তর দিল,
“হ্যাঁ।”
তারপর কিছুক্ষণ পর লিখল,
“তুই কি ওদের কথা ভাবছিস?”
আয়াত উত্তর দিল,
“কিছুটা।”
মাহিরা লিখল,
“আমিও।”
আর কোনো কথা হলো না।
রাত গভীর হলে আয়াত নামাজ পড়ে বসে রইল।
তার মনে হলো, মুসআবের প্রতি তার ভালোবাসাটা এখন আর শুধু কাউকে পাওয়ার ইচ্ছে নয়।
এটা এমন একটা অনুভূতি, যেটাকে সে আল্লাহর কাছে রেখে দিতে চায়।
সে দোয়া করল,
“আল্লাহ, আমি জানি না ভবিষ্যতে কী আছে। কিন্তু আমার মনকে এমন কিছু থেকে রক্ষা করুন, যা আমার জন্য ভালো নয়। আর যদি আমার জন্য কোনো ভালো কিছু লেখা থাকে, তাহলে সেটা সঠিক সময়ে, সঠিক পথে আমার কাছে পৌঁছে দিন।”
তার চোখের কোণে পানি জমে উঠল।
সে মুখ মুছে নিল।
তিন দিনের সফরের দ্বিতীয় দিন।
মুসআবরা সকালে ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ আদায় করে দিনের কাজ শুরু করল।
হামজা বলল,
— “আজকে কাজ অনেক।”
মুসআব বলল,
— “তাহলে সময় নষ্ট না করে শুরু করি।”
দিনভর বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকার পর বিকেলে সবাই একটু বিশ্রাম নিল।
হামজা হঠাৎ বলল,
— “মুসআব, তোর কি কলেজের কথা মনে পড়ছে?”
মুসআব মৃদু হেসে বলল,
— “পড়াশোনার কথা মনে পড়ছে।”
হামজা বলল,
— “শুধু পড়াশোনা?”
মুসআব বলল,
— “আর কী?”
হামজা হাসল।
— “কিছু না।”
মুসআবও আর প্রশ্ন করল না।
তার মন এখনো নিজের কাজেই।
এদিকে কলেজে মাহিরা আর আয়াতের দিনগুলোও স্বাভাবিকভাবে কাটছিল।
তবে একটা পরিবর্তন হয়েছে।
আগে মুসআবকে নিয়ে কথা উঠলে মাহিরা নিজের অনুভূতি লুকাত।
এখন সে আর সেটা অস্বীকার করে না।
একদিন আয়াত বলল,
— “মাহিরা?”
— “হুম?”
— “তুই যদি কোনোদিন সত্যিই মনে করিস, মুসআবের সঙ্গে তোর ভবিষ্যৎ হতে পারে, তখন কী করবি?”
মাহিরা দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
— “পরিবারকে জানাব। নিজের মতো করে কোনো সিদ্ধান্ত নেব না।”
আয়াত বলল,
— “আর যদি আমার কথা সামনে আসে?”
মাহিরা চোখ নামিয়ে বলল,
— “তখন...”
তার গলা আটকে গেল।
কিছুক্ষণ পর বলল,
— “আমি জানি না।”
আয়াত মৃদু হেসে বলল,
— “সত্যি উত্তর।”
মাহিরা বলল,
— “আমি তোকে হারাতে চাই না।”
আয়াত বলল,
— “আমিও তোকে হারাতে চাই না।”
তৃতীয় দিনের সন্ধ্যায় মুসআসাবদের সফর শেষের দিকে।
সবাই বসে দিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলছিল।
মুসআব বলল,
— “আমরা ফিরে গিয়ে যেন আবার আগের জীবনে হারিয়ে না যাই।”
হামজা বলল,
— “চেষ্টা করব।”
মুসআব বলল,
— “চেষ্টা না। সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
কথাটা সবাইকে চুপ করিয়ে দিল।
মুসআব আবার বলল,
— “দাওয়াত শুধু কয়েক দিনের সফর না। মানুষকে নিজের জীবনেও পরিবর্তন আনতে হয়।”
সবাই সম্মতি দিল।
অন্যদিকে সেই রাতেই মাহিরা আর আয়াত জানতে পারল, মুসআবরা পরদিন সকালে কলেজে ফিরবে।
মাহিরা খবরটা শুনে অজান্তেই হেসে ফেলল।
আয়াত বলল,
— “কী হলো?”
মাহিরা বলল,
— “কিছু না।”
— “আবার?”
— “হ্যাঁ, আবার কিছু না।”
আয়াতও হেসে ফেলল।
কিন্তু দুজনের মনেই একই অপেক্ষা।
পরদিন মুসআব ফিরে আসবে।
তারা জানে না, তার সঙ্গে শুধু তিন দিনের সফরের অভিজ্ঞতাই ফিরবে না।
ফিরবে এমন কিছু পরিবর্তন, যা ধীরে ধীরে তাদের গল্পের পরবর্তী অধ্যায়ের দরজা খুলে দেবে।
আর সেই অধ্যায়ে প্রথমবারের মতো মুসআবের পরিবার, তার ভবিষ্যৎ এবং বিয়ে নিয়ে কিছু আলোচনা সামনে আসতে শুরু করবে।
তবে এখনো কেউ জানে না—সেই আলোচনার সঙ্গে ভবিষ্যতে কার জীবন কীভাবে জড়িয়ে যাবে।
চলবে...