তোমার ই হাত ধরে রবের পথে
লেখক: নাহিদ মাতাব্বর
পর্ব: ৪০
পরীক্ষার আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। পুরো কলেজজুড়ে এখন পড়াশোনার চাপ। করিডোরে আগের মতো আড্ডা নেই, ক্যান্টিনেও ভিড় কম। সবাই যেন নিজের নিজের বই, নোট আর প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত।
মাহিরা আর আয়াতও লাইব্রেরির এক কোণে বসে পড়ছিল। দুজনের সামনে অনেকগুলো বই খোলা, কিন্তু মাহিরার মন বারবার অন্যদিকে চলে যাচ্ছিল।
আয়াত খেয়াল করে বলল,
— “কী হলো? পড়ায় মন নেই কেন?”
মাহিরা বইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “মন তো দিচ্ছি।”
— “তুই গত দশ মিনিট ধরে একই পৃষ্ঠা পড়ছিস।”
মাহিরা একটু লজ্জা পেয়ে বই বন্ধ করে বলল,
— “ঠিক আছে, বুঝে গেছিস।”
আয়াত মৃদু হাসল।
— “কী নিয়ে ভাবছিস?”
মাহিরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
— “জীবন নিয়ে।”
— “এত বড় বিষয়!”
— “হুম।”
— “কী ভাবলি?”
মাহিরা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— “কখনো কখনো মনে হয়, মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে যত পরিকল্পনাই করুক, শেষ পর্যন্ত সবকিছু নিজের হাতে থাকে না।”
আয়াত মাথা নাড়ল।
— “সবকিছু তো আমাদের হাতে থাকার কথাও না।”
— “তাহলে?”
— “আমাদের হাতে চেষ্টা আছে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভেবে দেখা আছে। আর বাকিটা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া।”
মাহিরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
— “তুই কি সত্যিই সবকিছু এত সহজভাবে মেনে নিতে পারিস?”
আয়াত মৃদু হেসে বলল,
— “সহজভাবে না। চেষ্টা করি।”
মাহিরা এবার বুঝতে পারল, আয়াতের কথার আড়ালেও অনেক না-বলা কষ্ট আছে।
সে আর প্রশ্ন করল না।
ঠিক তখন লাইব্রেরির দরজা দিয়ে মুসআব ঢুকল।
তার হাতে কয়েকটা বই। সঙ্গে হামজা।
মুসআব লাইব্রেরিয়ানের সঙ্গে কথা বলে বইগুলো নিয়ে একটা টেবিলে বসে পড়ল।
মাহিরা একবার তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিল।
আয়াতও নিজের বইয়ের দিকে মন দিল।
কেউ কোনো কথা বলল না।
---
কিছুক্ষণ পর লাইব্রেরির একটা তাক থেকে কয়েকটা বই পড়ে গেল।
মুসআব উঠে সেগুলো তুলতে লাগল।
লাইব্রেরিয়ান বললেন,
— “বাবা, এগুলো একটু গুছিয়ে দাও তো।”
— “জি।”
মুসআব একে একে বইগুলো সাজিয়ে রাখল।
তারপর একটা বই হাতে নিয়ে বলল,
— “এই বইটার জায়গা কোনটা?”
লাইব্রেরিয়ান তাক দেখিয়ে দিলেন।
মুসআব বইটা সেখানে রেখে আবার নিজের জায়গায় ফিরে গেল।
মাহিরা পুরো ব্যাপারটা দেখছিল।
তার মনে হলো, মুসআবের ভালো লাগার বিষয়গুলো সবসময় বড় কোনো ঘটনা নয়। বরং তার ছোট ছোট আচরণগুলোই তাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে।
আয়াত হঠাৎ বলল,
— “তুই ওর দিকে তাকিয়ে আছিস।”
মাহিরা একটু চমকে বলল,
— “না তো!”
— “আমি দেখেছি।”
মাহিরা মৃদু হেসে বলল,
— “আচ্ছা, দেখছিলাম।”
আয়াত কিছু বলল না।
মাহিরা এবার ধীরে বলল,
— “তুই কি কখনো ভাবিস, ওর সঙ্গে জীবন কাটানো কেমন হতে পারে?”
আয়াতের হাতের কলম থেমে গেল।
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— “এভাবে ভাবা ঠিক না।”
মাহিরা বুঝতে পারল, কথাটা আয়াতকে কষ্ট দিয়েছে।
সে সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— “সরি। আমার এমন বলা উচিত হয়নি।”
আয়াত মাথা নাড়ল।
— “কোনো সমস্যা নেই।”
কিন্তু তার চোখের ভেতরের অস্বস্তিটা মাহিরার চোখ এড়াল না।
---
সেদিন বিকেলে কলেজ থেকে ফেরার সময় মাহিরা আয়াতকে বলল,
— “আমি চাই না আমার কারণে তুই কখনো কষ্ট পাস।”
আয়াত বলল,
— “সবকিছু তো আমাদের ইচ্ছেমতো হয় না।”
— “কিন্তু আমরা চাইলে কিছু জিনিস এড়াতে পারি।”
— “কীভাবে?”
মাহিরা কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
— “নিজের সীমা বুঝে।”
আয়াত তার দিকে তাকাল।
— “তুই নিজের কথা বলছিস?”
মাহিরা ধীরে মাথা নাড়ল।
— “হয়তো।”
আয়াত বলল,
— “নিজের মনকে জোর করে থামিয়ে রাখিস না।”
— “তাহলে?”
— “যেটা সত্যি, সেটা মেনে নে। কিন্তু সঠিক পথের বাইরে যাস না।”
মাহিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “তুই জানিস, তুই মাঝে মাঝে আমার চেয়ে বেশি পরিণত কথা বলিস।”
আয়াত হেসে বলল,
— “আর তুই মাঝে মাঝে আমার চেয়ে বেশি সাহসী।”
দুজনেই হাসল।
---
সেদিন রাতে মুসআব বাড়ি ফিরতেই তার মা তাকে ডাকলেন।
— “বাবা, একটু বসো।”
মুসআব মায়ের পাশে বসল।
মা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
— “তোমার আব্বুর সঙ্গে তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা হয়েছে।”
মুসআব শান্তভাবে বলল,
— “জি।”
— “তোমার বিয়ের ব্যাপারটাও একসময় ভাবতে হবে।”
মুসআব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— “এখনই কি কিছু ঠিক করা হয়েছে?”
— “না। শুধু আলোচনা হয়েছে।”
— “আমি এখনো পড়াশোনা করছি।”
— “আমরা জানি। তাই তো তাড়াহুড়ো করছি না।”
মুসআব মাথা নাড়ল।
তারপর বলল,
— “যখন সময় হবে, আপনারা যাকে উপযুক্ত মনে করবেন, তার ব্যাপারে অবশ্যই আমার মতামতও নেবেন।”
মা মৃদু হেসে বললেন,
— “অবশ্যই।”
মুসআব বলল,
— “আর একটা বিষয় চাই।”
— “কী?”
— “সবকিছু যেন দ্বীনের নিয়ম মেনে হয়।”
মা বললেন,
— “ইনশাআল্লাহ।”
মুসআব নিজের ঘরে চলে গেল।
তার মাথায় কোনো নির্দিষ্ট মানুষের কথা নেই।
সে শুধু ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা দায়িত্ববোধ অনুভব করল।
---
অন্যদিকে মাহিরার বাড়িতেও সেদিন বিয়ে নিয়ে একটা সাধারণ আলোচনা চলছিল।
তার এক আত্মীয়ের বিয়ের প্রসঙ্গ উঠেছিল।
মাহিরার মা বললেন,
— “জীবনে ভালো মানুষ পাওয়া আল্লাহর বড় নিয়ামত।”
মাহিরা চুপচাপ শুনছিল।
মা আবার বললেন,
— “শুধু পড়াশোনা বা বাহ্যিক বিষয় না, মানুষের চরিত্র আর দ্বীন দেখতে হয়।”
মাহিরার মনে সঙ্গে সঙ্গে মুসআবের কথা এলো।
সে কিছু বলল না।
মা জিজ্ঞেস করলেন,
— “কী ভাবছিস?”
মাহিরা মৃদু হেসে বলল,
— “কিছু না।”
মা বললেন,
— “তোমার আবার সেই ‘কিছু না’!”
মাহিরা হেসে ফেলল।
কিন্তু তার ভেতরে একটা প্রশ্ন জেগে রইল—
“কেউ কি সত্যিই শুধু ভালো চরিত্রের কারণে এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে?”
সে উত্তরটা জানত।
---
পরদিন কলেজে আয়াত একটু অসুস্থ বোধ করছিল।
মাহিরা বলল,
— “তুই আজ বাসায় চলে যা।”
— “না, পরীক্ষা সামনে।”
— “শরীর খারাপ করে পড়াশোনা করে কী লাভ?”
আয়াত বলল,
— “আমি ঠিক আছি।”
ঠিক তখন মুসআব পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।
সে কথাটা শুনে থেমে না দাঁড়িয়েই নিজের বন্ধুকে বলল,
— “ওদের কাছে পানি আছে কি না দেখে আসিস।”
বন্ধু পানি নিয়ে আয়াতের কাছে গেল।
— “এটা নিন।”
আয়াত অবাক হয়ে বলল,
— “কোথা থেকে?”
— “মুসআব ভাই দিয়েছেন।”
আয়াত বোতলটা নিয়ে বলল,
— “ধন্যবাদ।”
দূর থেকে মুসআব শুধু মাথা নাড়ল।
আর কোনো কথা বলল না।
মাহিরা ঘটনাটা দেখছিল।
তার মনে হলো, মুসআবের এই স্বভাবটাই তাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে—সে কাউকে অযথা কাছে টানে না, কিন্তু প্রয়োজনের সময় সাহায্য করতে পিছিয়ে যায় না।
আয়াত পানি খেতে খেতে বলল,
— “কী দেখছিস?”
মাহিরা মৃদু হেসে বলল,
— “কিছু না।”
আয়াত বলল,
— “তুইও এখন আমার ভাষা ব্যবহার করিস!”
দুজনেই হেসে ফেলল।
---
সেদিন বিকেলে মাহিরা নিজের পড়ার টেবিলে বসে একটা নতুন রুটিন তৈরি করল।
সকালে পড়াশোনা।
নামাজের সময় ঠিক রাখা।
কলেজের কাজ।
বাড়ির কাজে সাহায্য।
রাতে নির্দিষ্ট সময় পড়া।
সবশেষে সে একটা লাইন লিখল—
“নিজেকে বদলাতে হলে প্রতিদিন একটু একটু করে চেষ্টা করতে হয়।”
লাইনটা লিখে সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল।
তারপর মনে হলো, এই কথাটা সে নিজের জন্যই লিখেছে।
মুসআবকে পছন্দ করার আগে সে নিজের এত কিছু নিয়ে ভাবত না।
এখন অন্তত সে নিজের রাগ, আচরণ আর সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে ভাবতে শিখছে।
---
পরীক্ষার আগের দিন কলেজে সবাই শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত।
মুসআব কয়েকজন বন্ধুকে পড়া বুঝিয়ে দিচ্ছিল।
হামজা বলল,
— “ভাই, তুই না থাকলে আমরা অনেক কিছুই বুঝতাম না।”
মুসআব বলল,
— “নিজের পড়া নিজে শিখতে হবে। আমি শুধু বুঝিয়ে দিতে পারি।”
হামজা হেসে বলল,
— “ঠিক আছে স্যার।”
মুসআবও হাসল।
কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে মাহিরা আর আয়াত তাদের দেখছিল।
মাহিরা বলল,
— “একটা ব্যাপার খেয়াল করেছিস?”
— “কী?”
— “মুসআব কাউকে আলাদা করে গুরুত্ব দেয় না।”
আয়াত বলল,
— “হুম।”
— “এটাই হয়তো ওর সবচেয়ে ভালো দিক।”
আয়াত মৃদু হেসে বলল,
— “হয়তো।”
মাহিরা বলল,
— “আমি চাই না আমার অনুভূতি আমাকে এমন কিছু করতে বাধ্য করুক, যেটা ওর পছন্দ না।”
আয়াত তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তাহলে তুই ইতিমধ্যেই অনেক কিছু বুঝে গেছিস।”
মাহিরা বলল,
— “শিখছি।”
---
পরীক্ষার দিন চলে এলো।
সবাই হলে বসেছে।
মুসআব নিজের আসনে বসে প্রশ্নপত্র হাতে নিল।
মাহিরা আর আয়াতও নিজেদের জায়গায়।
পরীক্ষা শুরু হলো।
কয়েক ঘণ্টা পর সবাই একে একে বের হতে লাগল।
বাইরে এসে মাহিরা বলল,
— “কেমন হলো?”
আয়াত বলল,
— “আলহামদুলিল্লাহ।”
মাহিরা মুসআবের দিকে তাকিয়ে দেখল, সে বন্ধুদের সঙ্গে প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করছে।
কিছুক্ষণ পর মুসআব বলল,
— “যেটুকু পারছি, আলহামদুলিল্লাহ।”
তারপর বন্ধুরা অন্যদিকে চলে গেল।
মুসআবও নিজের ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে গেল।
মাহিরা তাকে দূর থেকে দেখল।
আয়াত বলল,
— “চল।”
মাহিরা মাথা নাড়ল।
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
কেউ জানে না, সামনে তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে।
মুসআবের পরিবার ধীরে ধীরে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছে।
মাহিরার অনুভূতি প্রতিদিন গভীর হচ্ছে।
আর আয়াতের নীরব ভালোবাসা তাকে এমন এক সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যেদিন সে হয়তো প্রথমবারের মতো নিজের মনের কথা প্রকাশ করার সাহস করবে।
কিন্তু সেই দিন আসতে এখনো সময় আছে।
কারণ গল্পের এই অধ্যায়ে তাদের জীবনে আরও অনেক ঘটনা ঘটবে।
আর সেই ঘটনাগুলোর মাঝেই ধীরে ধীরে পরিষ্কার হবে—
কে কাকে ভালোবাসে, কে কাকে ছেড়ে দিতে শিখবে, আর শেষ পর্যন্ত কার জন্য কোন পথ লেখা আছে।
চলবে...!