ফন্ট সাইজ:
থিম:
কিশোরী কন্যা

৮ম পর্ব

লেখক: হামিদা আক্তার ইভা Hayat

#কিশোরী_কন্যা

#হামিদা_আক্তার_ইভা_Hayat

৮.

চম্পার সাথে ময়ূরীর বেশ কথা কাটাকাটি হলো।মেয়েটা অবাক না হয়ে পারছে না।বাড়ির কাজের লোকের এহেন ব্যবহার মানতে কষ্ট হচ্ছে।সে তো কিছু ভুল বলেনি,তাহলে সমস্যাটা কোথায়?দেবর,ভাসুর,জামাইয়ের সামনে এভাবে একটা মহিলা খোলা-মেলা ভাবে চললে তার মেজাজ খারাপ হবে না?হওয়ারই কথা।বাড়ির পুরুষেরা আছেন বলে ময়ূরী বেশি তর্কে জড়াল না।

রাতের আয়োজন শেষে আফিয়া সব কাজ সেরে নিজের ঘরে গিয়ে দেখল মাহতাব চেয়ারে বসে আছে।

ভীষণ আশ্চর্য হলো মেয়েটা।আজ হঠাৎ তার ঘরে?সপ্তা খানিক ধরে মাহতাব তার কাছে আসে না,তবে আজ হঠাৎ এলো কেন?

সে এগিয়ে গিয়ে নরম গলায় বলল,

“আপনি আমার ঘরে?”

মাহতাব বন্ধ চোখ খুলে আফিয়ার ক্লান্ত বদন পানে তাকালো।চোখের ইশারায় বিছানায় বসতে বলল তাকে।আফিয়া বিছানার নিকট এগিয়ে যেতেই দেখল সেখানে একটা কালো রঙের বড় শপিং ব্যাগ আছে।পাশে গিয়ে বসল সে।

“আপনি হঠাৎ আমার ঘরে এলেন যে?আপনার বউ দেখলে রাগ করবে না?”

মাহতাব শান্ত চোখে মেয়েটার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো।আফিয়া দৃষ্টি সরিয়ে বাইরে খোলা জালানার দিকে তাকালো।আজ মন চাইছে এই খাঁচা থেকে খোলা আকাশে উঁড়ে যেতে।যেখানে কোনো দুঃখ থাকবে না,শুধু থাকবে এক টুকরো শান্তি।

মাহতাব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।গায়ে জড়ানো সাদা পাঞ্জাবির হাতা গুঁটিয়ে আফিয়ার পাশে এসে বসল।শপিং ব্যাগ থেকে একটা গাঢ় নীল রঙের শাড়ি,কাঁচের রেশমী চুড়ি আর একটা লাল গোলাপ বের করে আফিয়ার কোলের ওপর রেখে বলল,

“গাবতলী গিয়েছিলাম আজ।কাজ শেষে ফেরার সময় একটা দোকানে এই শাড়িটা দেখে ভালো লেগেছিল।তোমার তো নীল রঙ পছন্দ,তাই ভাবলাম নিয়ে আসি।”

আফিয়া নিঃশব্দে শাড়িটা পাশে রেখে দিলো।মাহতাবের চোখে চোখ রেখে বলল,

“আপনার ছোট বউ রাগ করবে না?তাকে রেখে হঠাৎ আমার জন্য এসব নিয়ে এলেন কেন?”

“তাকে আজ অব্দি কিছু দিয়েছি আমি?”

“দেননি কেন?এত শখ করে বিয়ে করে নিয়ে এসেছেন,আপনিই তো দিবেন।”

“এভাবে কথা বলছো কেন?”

আফিয়া উঠে দাঁড়াল পালঙ্ক থেকে।মাথা থেকে আঁচল নামিয়ে জালানার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।দূর পথে দৃষ্টি রেখে বলল,

“ভীষণ ক্লান্ত লাগে নিজেকে।আমায় কী মুক্তি দেয়া যায় না,মাহতাব?আমায় মুক্তি দিচ্ছেন না কেন আপনি?আপনার তো এখন নতুন একটা সংসার হয়েছে।আমার মতো একটা ঝামেলা কেন বেঁধে রেখেছেন নিজের সাথে?”

মাহতাব আফিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

“যদি বলি ভালোবাসি বলে?”

আফিয়া হাসল,

“ভালোবাসা?ভালোবাসা কি বলুন তো?ভালোবাসা আসলে কী,সেটাই ভুলে গেছি।”

মাহতাব পালঙ্ক থেকে নেমে আফিয়ার কাছে এগিয়ে এলো।আফিয়ার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে দুহাত বুকে গুঁজে বুক টানটান করে দাঁড়াল।দেয়ালের সাথে হ্যালান দিয়ে আফিয়ার চোখে চোখ রাখল।

“এই পাপীকে এত ঘৃণা করো তুমি?আফি,তাকাও আমার দিকে?”

“আপনার দিকে তাকাতে ইচ্ছে করে না।ভাগের জিনিস পছন্দ নয় আমার।”

মাহতাব আলতো হাসল।দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে একবার পিছু ফিরে বলল,

“শাড়িটা খুব পছন্দ হয়েছে আমার।একবার গায়ে জড়িয়ে দেখা দিও আমায়।”

ঘরটা নীরবতায় ছেয়ে গেলো।মাহতাব চলে গেছে।জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছে আফিয়া।দৃষ্টি শূন্য।সে আড়চোখে বিছানায় থাকা শাড়ির দিকে তাকালো।সে নীল শাড়িতে প্রথমবার সামনে এসেছিল মাহতাবের।

৭ বছর আগে আফিয়ার বয়স কত ছিল?১৬ বছর হবে হয়তো।মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে সে।বাবা ছিলেন কৃষক।ছোট সুখী একটা পরিবার তাদের।

সেই সময়ে আফিয়ার এসএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছিল।সময়টা ছিল এপ্রিলের শুরু।

দিনটা ছিল শুক্রবার,৯ তারিখ।বোরহান সওদাগর,মাহতাব,তাহসিন এবং কিছু মানুষ গিয়েছিলেন তাদের বাড়ি।প্রস্তাব দিলেন আফিয়াকে সওদাগর বাড়ির বড় বধূ বানাবেন।আফিয়ার বাবা খুশিতে আত্মহারা হয়ে সেদিনই রাজী হয়ে যান বিয়ের জন্য।আফিয়া নীল শাড়ি গায়ে জড়িয়ে আব্বার ঘরের দরজার সামনে ভীতু চোখে তাকিয়ে ছিল শ্যাম বর্ণের এক সু-দর্শন যুবকের দিকে।তখন মাহতাবের বয়স ২৬।নতুন নতুন রাজনীতির সাথে জড়িত হয়েছে।

বোরহান সওদাগর আফিয়ার বাবার সাথে কথা বলছিলেন।মাহতাব হঠাৎ করেই আফিয়ার আব্বার ঘরের দিকে তাকায়।দেখতে পায় এক কিশোরী নীল শাড়ি গায়ে জড়িয়ে দরজার পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে।মিষ্টি একটা মুখ!ভীষণ সুন্দর সেই নারী।তারপর,দুজনের চোখে চোখ পড়েছিল।ভয়ে মেয়েটা দৌঁড়ে ঘরের ভেতর চলে যাওয়ার পর মাহতাব ঠোঁট কামড়ে হেসেছিল।

সপ্তা খানিক পর মাহতাবের বউ বানিয়ে নিয়ে এলো সওদাগর বাড়ি।নতুন মানুষ,নতুন পরিবেশ সব মিলিয়ে নতুন জীবন শুরু হয়েছিল।সংসার হয়েছিল লোকটার সাথে।আহারে,শখের জিনিস গুলো এভাবেই বোধহয় নষ্ট হয়ে যায়?কত শখের সংসারই না ছিল মেয়েটার।আজ কিচ্ছু নেই।

•

রাত তখন গভীর হয়েছে।ময়ূরী ঘরে শুয়ে ছিল পুতুলের সাথে।তাহসিন এখনো বাড়ির বাইরে।লোকটা কোথায় গেছে কে জানে!

সে উঠে বসল বিছানায়।চিন্তা হচ্ছে খুব।আড়চোখে পুতুলের দিকে তাকালো।মেয়েটা তার শাড়ির আঁচল মুখের ভেতর নিয়ে কামড়ে ধরে ঘুমাচ্ছে।

হঠাৎ দরজায় শব্দ হলো।বাইরে থেকে তাহসিনের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে।ময়ূরী পুতুলের মুখ থেকে আঁচল বের করে সাবধানে ঘরের দরজা খুলে দিলো।তাহসিন দাঁড়িয়ে বাইরে।তাকে ভেতরে আসার জন্য ময়ূরী এক কোণায় গিয়ে দাঁড়াল।তাহসিন ভেতরে এসে বলল,

“তুমি এখনো জেগে আছো কেন?”

ময়ূরী কপালে গভীর ভাঁজ ফেলে তাহসিনের দিকে তাকালো।লোকটার গায়ের শার্ট এমন ভিজে আছে কেন?বৃষ্টি তো হয়নি।সে তাহসিনের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধোয়,

“এতরাত অব্দি বাইরে কী করছিলেন?”

তাহসিন দৃষ্টি সরিয়ে আলমারির দিকে এগিয়ে গিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

“পুরুষ মানুষ,একটু আকটু রাত অব্দি বাইরে থাকতেই পারে।”

ময়ূরী শক্ত গলায় বলল,

“অবশ্যই থাকতে পারে,তাই বলে রাত ৩টা অব্দি কোন মহা পুরুষ বাড়ির বাইরে থাকে?”

তাহসিন আশ্চর্য হয়ে ঘুরে দাঁড়াল।ময়ূরীকে আজ অন্যরকম লাগছে।সে চোখ টানটান করে ময়ূরীকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করল।

“তুমি রাগ দেখাচ্ছ?”

“দেখাচ্ছি।আপনার বিয়ে করা বউ আমি।সেই অধিকারটুকু আমার আছে বলে আমি মনে করি।”

তাহসিনের ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।আলমারির নিকট না গিয়ে সোফার ওপর থেকে টাওয়াল নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে বলল,

“তোমাকে আমার বড্ড মনে ধরেছে মেয়ে।বাঘিনী আমার বেশ পছন্দ!”

তাহসিন ওয়াশরুমে ঢুকলো।ময়ূরী বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে রইলো সেদিকে।লোকটা উত্তর তো দিলোই না,উল্টো আরও তার মেজাজ খারাপ বানিয়ে গেলো।

খানিকক্ষণ পর তাহসিন কোমরে টাওয়াল প্যাঁচিয়ে বের হলো।ময়ূরী তার জন্য খাবার এনে বিছানার এক কোনায় রেখেছে।ওয়াশরুমের দরজায় শব্দ হতেই ঘাড় ঘুরিয়ে সেদিকে তাকিয়ে চোখ কপালে উঠিয়ে মুখ কুঁচকে ফেলল লজ্জায়।

“আপনার কী শরম লজ্জা নেই?এভাবে বের হয়েছেন কেন?”

তাহসিন ফ্যানের নিচে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল।গরমে অবস্থা খারাপ তার।ময়ূরীর কথা শুনে স্বাভাবিক গলায় বলল,

“শরম করবে কেন?”

ময়ূরী লজ্জায় যেন কথাই বলতে পারছে না।ছোট একটা টাওয়াল,তাও আবার বেহায়া পুরুষদের মতো কেমন করে কোমরে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে।সে বিছানা থেকে নেমে বলল,

“খেয়ে নিন।”

ময়ূরী উল্টো ঘুরে পুতুলের কাছে যেতে চাইলে তাহসিন ময়ূরীর হাত চেপে ধরে।ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেয়ে শরীরটা হালকা কেঁপে উঠেছে মেয়েটার।তাহসিন হাতে টান দিতেই সে কিছুটা তাহসিনের দিকে ঘনিষ্ঠ হলে শ্বাস আঁটকে বলে,

“আপনি বলেছিলেন আমার কাছে আসবেন না।”

তাহসিন হঠাৎ আলতো করে ময়ূরীর হাত পেছনে মুচড়ে ধরে।ঘাড়ের চুল একপাশে সরিয়ে দিয়ে কানের কাছে ফিসফিস করে বলে,

“কাছে আসা মানে কোন আসার কথা বলেছিলাম জানো?”

রুহুর পানি শুকিয়ে খাঁখাঁ করছে ভয়ে।

“ছাড়ুন,ভালো হচ্ছে না।”

তাহসিন ছেড়ে দিলো ওর হাত।পেছন দিক থেকে ময়ূরীর মাথায় জোরে টোকা মেরে বলল,

“বোকারাণী।”

সে চেঞ্জ করে এসে বিছানায় বসল।মাথা থেকে ঝরঝর করে পানি ঝরছে।ময়ূরী ঠোঁট কামড়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।

“আপনি মাথা ভালো করে মুছলেন না যে?”

“তুমি মুছিয়ে দাও।বিয়ে করেছি কিসের জন্য?তুমিই বা কেমন বউ?স্বামীর যত্ন কিভাবে করতে হয় জানো না?”

ময়ূরীর রাগ হলো খুব।বদ লোক একটা!গোসল সেরে শরীর মুছতে পেরেছে,মাথা মুছতে পারেনি।

তাহসিন মাথা নিচু করে বলল,

“আঁচল দিয়ে মাথা মুছে দাও।”

তাহসিন মাথা নত করেছে,তাকে বারণ করার সাহস হলো না।আঁচল মাথায় রেখে আলতো হাতে চুল গুলো মুছে দিলো।খাওয়ার সময় ময়ূরীকে জিজ্ঞেস করলে বলে সে রাতে খেয়েছে।দুজনের মাঝে আর কথা হয় না।চুপচাপ যে যার মতো বালিশে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে।

পরেরদিন সকালে রোদের তাপে শরীর ঝলসে যাওয়ার জো হলো।হিমলতলা মাঠে মেম্বার বাড়িতে বিশাল আয়োজন চলছে।দুপুরে গ্রামের মানুষ খাওয়ানো হবে।মেম্বার বাড়ির চারপাশ জুড়ে মানুষ গিজগিজ করছে।এসব দেখে মাহতাব ভীষণ বিরক্ত।তাদের দাওয়াত দেয়া হয়েছে সেখানে।সকালেই দাদা নিয়ে এসেছেন বাড়ির ছেলেদের।তাদের জন্য আলাদা আয়োজনের ব্যবস্থা সেখানে।

তাহসিন ঠোঁট কামড়ে চারপাশে চোখ বুলাচ্ছে।চারপাশে সব রাজনীতির মানুষ।অদ্ভুত আচার-আচরণ।রুহুল তাহসিনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।তাহসিনের চোখে পড়ল মাঠের ডান পাশের বড় রাস্তা ধরে তিনটা তেলের গাড়ি যাচ্ছে।বড় বড় ড্রাম নেয়া হচ্ছে সেখানে।আর তার ঠিক পেছনে পাইকারি মাছের ট্রাক।তাহসিন সেদিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থেকে পাশে দাঁড়ানো রুহুলকে জিজ্ঞেস করে,

“এই গাড়ি গুলো কোথায় যাচ্ছে?”

রুহুল রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলে,

“বড় বাজারে যাচ্ছে ভাই।”

“কোত্থেকে আসছে এসব?”

“ঢাকা থেকেই তো আসে।”

#চলবে…?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন