ফন্ট সাইজ:
থিম:
কিশোরী কন্যা

১২তম পর্ব

লেখক: হামিদা আক্তার ইভা Hayat

#কিশোরী_কন্যা

#হামিদা_আক্তার_ইভা_Hayat

১২.

ময়ূরী লজ্জায় লাল হয়ে এবার কটমট করে তাহসিনের দিকে তাকালো।নির্লজ্জ বলে এত?সে দাঁত চেপে বলল,

“আপনার কী একটুও লজ্জা নেই?”

তাহসিন কপাল কুঁচকে দুষ্টু হেসে বলল,

“যাও বউ তোমার মাইন্ড নষ্ট।আমি তো ওই ভালোবাসার কথা বলিনি।তুমি সারাদিনই এসবই ভাবো?ছিঃ, বউ এসব নোংরা জিনিস।”

ময়ূরী হতভম্ব হয়ে চোখ কপালে উঠিয়ে তাকিয়ে রইল।ধড়িবাজ লোক একটা।সে হালকা করে তাহসিনের বুকে ধাক্কা দিয়ে বলল,

“সরুন তো আপনি!শুধু শুধু আমার পেছনে লেগে আছেন কেন?”

তাহসিন ঠোঁট টিপে হাসল।ময়ূরীর কানের কাছে একটু ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল,

“বড় হও মেয়ে,তোমার স্বামী বউয়ের ভালোবাসা না পেয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে।”

লজ্জায় গাল দুটো টমেটোর মতো হয়ে এলো।ঠোঁট কামড়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।সে বেশ বুঝতে পারছে তাহসিনের সাথে কথা বাড়ালে আরও লাগাম ছাড়া কথা বলবে।

রাতে পুতুল আজ বায়না করল সে নানির কাছে ঘুমাবে।নানি তাকে ভীষণ সুন্দর সুন্দর গল্প বলে শোনায়।ফিরোজা বেগম খুশি হয়ে নাতনিকে নিজের সাথেই রাখলেন।এদিকে ময়ূরী পড়েছে মহা বিপদে।তাহসিন বড্ড জ্বালায় তাকে।তার মধ্যে আজ একা পেয়ে কী রেখে কী বলবে আল্লাহ ভালো জানেন।

মেয়েটা দাঁত চেপে বিছানা পরিষ্কার করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খোঁপা করা চুল গুলো খুলেছে।উদ্দেশ্য চুল আঁচড়াবে।তাহসিন এতক্ষণ বাইরে থাকলেও বেশ রাত করেই বাড়ি ফিরল।ঘরে এসে দেখল ময়ূরী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করতে ব্যস্ত।আশেপাশে পুতুলকে না পেয়ে বলল,

“পুতুল কোথায়?”

ময়ূরী পিছু ফিরল।তাহসিনের ভাঁজ পড়া কপাল খানা দেখে বলল,

“আম্মার কাছে ঘুমাবে বলে জেদ করছিল।তাই আম্মা নিয়ে গেছে।”

তাহসিন মাথা নাড়ল।বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে ভীষণ।সে ছাতা নিলেও প্রায় ভিজে গেছে।এগিয়ে এসে হঠাৎ ময়ূরীর আঁচল টেনে ধরল সে।মেয়েটা ভয়ে চোখ বড় বড় করে ফেলল।

“কী করছেন?”

তাহসিন মাথা মুছতে মুছতে বলল,

“বউয়ের শাড়ির আঁচল ধরে রাখলে মোহাব্বত বাড়ে জানো?তুমি তো আমায় ভালোবাসো না,তাই ভাবলাম এখন থেকে তোমার আঁচল ধরেই থাকব।”

“আপনি কিন্তু কথায় কথায় আমাকে লজ্জা দিচ্ছেন।”

তাহসিন সোজা হয়ে দাঁড়ায়।ঘাড় ঝুঁকিয়ে কিশোরীর লজ্জা রাঙা মুখ দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসে।সে হাত বাড়িয়ে চিবুক ধরে উঁচিয়ে নিজের দিকে ফেরায় ওকে।দুজনের চোখে চোখ পড়েছে।লজ্জায় মেয়েটার শরীর কাঁপছে,এটা বেশ বুঝতে পারল তাহসিন।খুবই নিচু স্বরে চোখে চোখ রেখে বলল,

“আজ একটু অবাধ্য হই?”

হঠাৎ যেন সময় থেমে গেল।

তাহসিনের আঙুলের শক্ত টানটায় ময়ূরী নিজের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল।চোখ বড় বড় হয়ে তাকিয়ে ছিল সে,কিন্তু পরের মুহূর্তেই সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেলো।তাহসিন ঝুঁকে এসে নিঃশব্দে ওর ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরল।

বাতাসে হালকা বৃষ্টির গন্ধ মিশে আছে।ঘরের জানালা আধখোলা,পর্দা উড়ে এসে দু’জনের গায়ে লাগছে।বাইরে বজ্রপাতের আলোয় মুহূর্তের জন্য ঘর আলোকিত হয়,আর ময়ূরীর হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়।

তার কাঁধে তাহসিনের হাতের চাপটা দৃঢ়,কিন্তু অস্থির নয় বরং তাতে একরাশ অধিকার মিশে আছে।মেয়েটা চোখ বন্ধ করে ফেলল অনিচ্ছায়,বুকের ভেতর কেমন জানি গলগল করে কিছু একটা নেমে যাচ্ছে।শরীরটা কাঁপছে,কিন্তু সে আর পিছু হটে না।

তাহসিন ধীরে ধীরে ঠোঁট সরিয়ে নিয়ে ওর কানের পাশে ফিসফিস করে বলল,

“এমন করে লজ্জা পেও না,বউ।ছুঁয়ে দেয়ার আগে বউয়ের এত স্বামীর সামনে শরম পেতে নেই।”

ময়ূরী লজ্জায় ওর বুক থেকে সরে যেতে চাইল,তার আগেই তাহসিন হাত বাড়িয়ে ওর চুলের একগুচ্ছ আঙুলে জড়িয়ে হালকা টান দিলো।

“ বউ মানে তো অর্ধেক প্রাণ,তাই না?”

ময়ূরী চোখ খিঁচে বলল,

“ভয় করছে আমার।আপনি..আপনি দূরে সরুন।”

তাহসিন নিঃশব্দে ওর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো।

“ভয় না পেয়ে একবার ভালোবেসে দেখো,ময়ূরী। আমার এই পাগলামিগুলো তোমার জন্যই।”

বাইরে তখন বৃষ্টির শব্দ আরও জোরে বাড়ছে।

ঘরের মৃদু আলোয় দু’জনের ছায়া একাকার হয়ে মিশে আছে।ময়ূরী চোখ বন্ধ করে নিঃশব্দে বলল,

“সময় হলে অনুমতি চাইতে হবে না,ময়ূরী নিজেই ধরা দিবে তার হালাল পুরুষের কাছে।”

•

বৃষ্টি নেই বাইরে।মধ্যরাতেই বৃষ্টি থেমে গেছে।ময়ূরীর বদ্ধ জানালার ফাঁক দিয়েও হালকা একফালি রোদ্দুর এসে ঘুম ভাঙিয়ে দিলো তার।পিটপিট করে চোখ খুলে আরেক দফা অবাক হলো সে।তাহসিন ঝাঁপটিয়ে আঁকড়ে ধরেছে তার শরীর খানা।মেয়েটা লজ্জাবতীর ন্যায় শিটিয়ে এলো।পিঠের ওপাশে তাহসিনের দুই হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরা তার শরীরটা।

তাহসিন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।সে নিজেকে কোনোরকম ছাড়িয়ে উঠে বসল।ঘাড় ঘুরিয়ে একবার তাকালো লোকটার দিকে।খালি গায়ে উপুড় হয়ে শুয়েছে এখন।ময়ূরী মনে মনে “বজ্জাত লোক একটা” বলে মুখ বাঁকাল।হতচ্ছড়া কাল একা পেয়ে কী কাজটাই না করল।সে বিছানা থেকে নেমে গায়ের এলোমেলো শাড়ি ঠিক করে ঘরের দরজা খুলে দিলো।বিচ্ছু পুতুল বোধহয় দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল।নতুন মা দরজা খুলে দিতেই খিলখিল করে হেসে দৌঁড়ে ঘরে এলো।বিছানার চাদর টেনে উপরে উঠে বাবার শরীর ঘেঁষে শুয়ে পড়ল।বাবার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

“বাবা,তোমার পুতুল এসে গেছে।”

তাহসিন একটু নড়েচরে মেয়েকে ঝাঁপটে ধরে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল।পাতলা কাঁথা গায়ে জড়িয়ে ঘুমঘুম গলায় বলল,

“আম্মা কথা বইলেন না।ঘুমান একটু।”

ময়ূরী হতবাক হয়ে বাবা মেয়ের কাণ্ড দেখল।পুতুলের মায়ের জন্য বড্ড খারাপ লাগল তার।মেয়েটার একটা মা ছিল না এতদিন।একটা বাচ্চাকে তাহসিন একা মানুষ করেছে।সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের বাইরে এলো দরজা চাপিয়ে।বক্কর হয়তো বাজারে গেছেন।ফিরোজা বেগম উঠোন পরিষ্কার করে সবে রুটি বানাতে রান্নাঘরে বসেছেন।ময়ূরী সামনে এগিয়ে গেলে হঠাৎ ফিরোজা বেগম ময়ূরীর দিকে তাকালেন।মেয়েকে দেখে যেন ভীষণ লজ্জা পেলেন তিনি।

ময়ূরী চেয়ার টেনে বসতে গেলে ফিরোজা বেগম বললেন,

“এই,যা গোসল সেরে আয়।”

ময়ূরী আশ্চর্য হয়ে বলল,

“এই সাতসকালে গোসল করব কেন আম্মা?”

“যা বলেছি সেটা কর।বিয়ের এতদিনেও কী সকালে গোসল করিসনি তুই?”

ময়ূরী মাথা নাড়িয়ে বলল,

“একদিন করেছিলাম।যেদিন বিয়ে হলো তার পরেরদিন সকালে করেছিলাম।”

ফিরোজা বেগম নাক মুখ কুঁচকে মাথা নিচু করলেন।ময়ূরী আরাম করে চেয়ারে বসল।ফিরোজা বেগম চোখ রাঙিয়ে বললেন,

“তোর কী আক্কেল নেই?স্বামীর সাথে থাকলে সকালে গোসল করতে হয়।যা গোসল দিয়ে আয়।”

ময়ূরী মায়ের দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকালো।পরমুহূর্তে কিছু একটা মনে হতেই লজ্জায় লাল হয়ে এলো।মা যে উল্টো পাল্টা কিছু ভাবছে সেটা ধরতে পেয়ে ভারী লজ্জায় পড়ল।তাড়াতাড়ি চেয়ার থেকে উঠে ঘরের দিকে ছুটে গেলো।মাকে তো আর চিৎকার করে বলা যায় না—“তুমি যা ভাবছো তেমন কিছুই হয়নি আম্মা”।

ময়ূরী ঘরে এসে দেখল বাপ বেটি আরাম করে ঘুমাচ্ছে।সে কাপড় নিয়ে কলপাড়ে গিয়ে গোসল সেরে মাথায় গামছা প্যাঁচিয়ে বের হলো আধ ঘণ্টা পর।তাহসিন তখন ময়ূরীর একটা গামছা নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে।ভীষণ গরম পড়েছে রাতে বৃষ্টি হওয়ার পরও।হঠাৎ চোখ যায় উঠোনে কলাপাতা রঙের শাড়ি গায়ে তার কিশোরী বধূ ভেজা শাড়ি দড়িতে ছড়িয়ে দিচ্ছে।সদ্য গোসল সেরে বের হয়েছে বোধহয়।কাপড় ছড়িয়ে দিয়ে মাথার গামছা খুলে চুল গুলো খুব যত্ন করে মুছে আড়চোখে তাহসিনের দিকে তাকালো।দুজনের চোখে চোখ পড়তেই মেয়েটা লজ্জায় উল্টো ঘুরে দাঁড়াল।কাল রাতের ঘটনা যেন মাথা থেকে সরছেই না।

ফিরোজা বেগম রান্না ঘর থেকেই আড়চোখে দুজনের দিকে তাকিয়ে কাজে মনোযোগী হলেন।

ময়ূরী কী করবে বুঝে উঠতে পারল না।লোকটা একচুল পরিমাণ নড়ছে না,আর না তার দিক থেকে দৃষ্টি সরাচ্ছে।হঠাৎ তাহসিন কলপাড়ের দিকে যেতে গেলে ফিরোজা বেগম বললেন,

“ময়ূরী,জামাইকে কল চেপে দিয়ে আয়।”

তাহসিন কলপাড়ের দিকে যেতে যেতে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল।ময়ূরী চোখ খিঁচে দাঁড়িয়ে রইল।মা আরেকবার ধমক দিতেই বাধ্য হয়ে গেলো সেদিকে।

ময়ূরী আঁচল কোমরে গুঁজে কলপাড়ে ঢুকল।সূর্যের আলোয় কলপাড়টা ঝিকমিক করছে,পাশের গাছ থেকে পানির ফোঁটা ঝরে পড়ছে টুপটাপ শব্দে।সে কল চাপতেই ঠান্ডা পানি ঝরে পড়তে লাগল।তাহসিন ওদিকেই দাঁড়িয়ে ছিল হাত গুটিয়ে,ঠোঁটে আধো হাসি,চোখদুটো কেমন যেন দুষ্টু ঝিলিক ছড়াচ্ছে।

ময়ূরী নিচের দিকে তাকিয়ে পানির ঝর্ণা দেখতে ব্যস্ত,যেন ওর দিকেই তাকাতে সাহস পাচ্ছে না।

তাহসিন একপা,দুইপা করে এগিয়ে এলো।

“সকালে গোসল করেছ কেন?”

ময়ূরী চোখ না তুলেই বলল,

“গরম লাগছে তাই দিলাম।”

তাহসিন ভ্রু উঁচিয়ে হেসে বলল,

“আজ হঠাৎ সকালে গোসল কেন বলো তো?”

ময়ূরী হালকা চমকে তাকালো তার দিকে।তাহসিনের চোখে খেলা করছে সেই একই মিষ্টি দুষ্টুমি।সে ঠোঁট কামড়ে নিচু স্বরে বলল,

“একদম চুপ করুন।”

তাহসিন এবার আরও কাছে এলো।ওর কানের পাশে ঝুঁকে নিঃশব্দে ফিসফিস করে বলল,

“বৃষ্টি হয়েছে রাতে,গরমও পড়েছে।তবে আমার মনে হয় গোসলের আসল কারণ অন্য কিছু।”

ময়ূরীর মুখে লাল আভা ছড়িয়ে পড়ল।সে কল বন্ধ করে পেছন ফিরে দাঁড়াতেই তাহসিন একগোছা ভেজা চুলে আঙুল ছোঁয়াল।

“এই চুলের গন্ধে কী যেন আছে? মাথা ঘুরে যায়।”

ময়ূরী ঝট করে চুল টেনে নিলো,চোখ বড় বড় করে বলল,

“আপনার কী কোনো কাজ নেই?সারাক্ষণ আমার পেছনে লেগে থাকেন কেন?”

“কারণ তুমি আমার সামনে থাকলে অন্য কিছু দেখাই যায় না।”

“বেহায়া লোক!”

তাহসিন মাথা কাত করে তাকাল,

“আচ্ছা বউ,একটা কথা বলি?”

“না,শুনবো না।”

“শোনো না।আমি ভাবছিলাম আজ রাতেও যদি বৃষ্টি হয়…”

“থামুন!” ময়ূরী দু’হাত তুলে থামাল,বলল,

“আর একটা শব্দ বলবেন না!এখনই কিন্তু আম্মাকে ডাকব।”

তাহসিন হাসি চেপে গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,

“ডাকো।আম্মাকে বলো তোমার জামাই সকাল সকাল বউকে গোসলের কারণ জিজ্ঞেস করেছে।”

ময়ূরী চোখ রাঙিয়ে ফিরে গেল,মুখে বিড়বিড় করতে করতে বলল,

“বজ্জাত লোক একটা! লজ্জা বলে কিছুই নেই।”

ময়ূরী তাড়াতাড়ি ঘরের দিকে ছুটে গেল,বুকের ভেতর যেন কেমন জানি শিহরণ খেলছে।তার নিজেরই রাগ হচ্ছে ভীষণ।লোকটা নির্লজ্জ!

রান্নাঘর থেকে ফিরোজা বেগম তখন গলা উঁচু করে বললেন,

“ময়ূরী,জামাইকে নাস্তা দিয়ে দে।আর ওয়াহিদকে ডেকে তোল।”

•

আদনান সকালে নাস্তা খেয়ে ড্রয়িংরুমে বসে ছিল।কথা হচ্ছে নুপুরের বিয়ে নিয়ে।বিরাট বড় আয়োজন করা হবে।আদনানের আব্বা আম্মাও আসবেন বিয়ের আগে।বেচারার দুঃখের শেষ নেই।ছোট বোনের বিয়েটাও হয়ে যাচ্ছে কিন্তু তার?এই হিমিকে যে কী করে বিয়ের জন্য পটাবে বুঝতেই পারছে না।

আফিয়া আর কুসুম মিলে একটা বড় কাঁথা ফ্লোরে রেখে সেলাই করছে।আদনান পা ঝাঁকিয়ে সেদিকে তাকিয়ে আছে গালে হাত দিয়ে।আফিয়া ওকে অমন করে বসে থাকতে দেখে বলল,

“দেবর মশাইয়ের মন খারাপ কেন?”

আদনান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“ভাবি,একটা বিয়ে করা দরকার।তাহসিন বাটপারও বিয়েটা করে ফেলেছে,এবার আমি চুপ করে বসে থাকলে আমার গুষ্টির মানইজ্জত নষ্ট হয়ে যাবে।”

“তুমি বিয়ে করবে? কোন মেয়ে তোমার মতো বেকার,বেহায়া,গরমমেজাজি ছেলের সাথে বিয়ে করতে রাজি হবে বলো দেখি?”

আদনান চোখ ছোট করে বলল,

“ভাবি,এমন কথা বলো না।আমার চেহারা দেখলে মেয়েরা তো এক পলকেই ‘হ্যাঁ’ বলে দেয়। শুধু একটাই সমস্যা।”

কুসুম সেলাই থামিয়ে কৌতূহলভরে তাকালো,

“সমস্যা আবার কী?”

“তারা বলে, ‘চেহারা ভালো, কিন্তু ঘটে মগজ নাই।’”

“ঠিক কথাই বলেছে।তোমার কপালে বিয়ে নেই।”

“তুই চুপ কর ডিমের কুসুম।”

কুসুম মুখ বাঁকিয়ে বলল,

“ভাবি,আজ তো বর্ষা আপুর আসার কথা।দাদি বলেছে সে আজ আসবে।”

আফিয়া বলল,

“আমাকে তো কিছু বলেননি,আমি জানি না।”

কথার মাঝেই সদর দরজা দিয়ে ঢুকলো একটা মেয়ে।হাতে ছোট একটা কাপড়ের ব্যাগ।দৌঁড়ে এসে আফিয়ার গলা জড়িয়ে চিৎকার করে বলল,

“ভাবি,চলে এসেছি আমি।”

আফিয়া হতভম্ব হয়ে তাকায়।বর্ষা এসেছে।বর্ষা তাহসিনের সম্পর্কে ফুপুর মেয়ে হয়।দুরসম্পর্কের আত্মীয়।আফিয়া ওকে ছাড়িয়ে অবাক হয়ে বলল,

“মাত্রই তোর কথা বলছিলাম।”

বর্ষা মুচকি হাসল।

“আমি জানতাম।কেমন আছো তুমি?”

“খুব ভালো।সাথে কেও আসেনি?একা এসেছিস?”

“কাছেই বাড়ি,সাথে আবার কে আসবে?”

বলতে বলতে চোখ গেলো আদনানের দিকে।আদনান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে ছিল তার দিকে।মূলত সে বর্ষাকে চেনে না,আর না কখনো দেখেছে।বর্ষা ওকে দেখে লাজুক হাসল।আদনানকে চোখ টিপ মারতেই বেচারা হকচকিয়ে গেলো।সে চোখ বড় বড় করে বলল,

“আপনি আমাকে চোখ মারলেন কেন?”

বর্ষা ভাব নিয়ে বলল,

“হবু জামাইয়ের সাথে বিয়ের আগে একটু দুষ্টুমি করতে চাচ্ছিলাম।”

“হবু জামাই মানে?এই মেয়ে,হবু জামাই কাকে বলছেন?”

বর্ষা উঠে দাঁড়াল।সোজা হয়ে বলল,

“সেটা নাহয় পরেই জানতে পারবেন।”

আফিয়া সব কাজ রেখে কুসুমকে বলল কাঁথাটা ঘরে রেখে দিয়ে আসতে।কুসুম মাথা নাড়িয়ে চলে গেলে কনক আর রজনী বেগম এলেন সেখানে।বর্ষাকে দেখে রজনী বেগম ভীষণ খুশি হলেন।তিনিই বর্ষাকে আসতে বলেছেন এই বাড়িতে।বর্ষা দাদিকে সালাম দিয়ে বলল,

“এইযে বুড়ি,চলে এসেছি আমি।”

“খুব ভালো করছস।”

তারপর আদনানকে বললেন,

“শোন আদনান,এহন একটু আক্কেল নিয়া ঘুরার চেষ্টা কর।”

আদনান বিরক্ত হয়ে সেখান থেকে উঠে বাড়ির বাইরে যেতে যেতে বলল,

“আক্কেল দিয়ে আমার কাম নাই দাদি।”

আদনান বেরিয়ে গেলে রজনী বেগম বর্ষার চিবুক তুলে বললেন,

“এইডাই পোলা।পছন্দ হইছে?”

বর্ষা লাজুক হাসল উত্তর না দিয়ে।রজনী বেগম যেন উত্তর পেয়ে গেছেন।ভাবলেন নূপুরের বিয়ের সময় আদনানের মা বাবার সাথে কথা বলবেন।কনক বর্ষাকে নিয়ে গেলো নিজের সাথে।ঘরে এসে বসতেই কনক ফ্যান ছেড়ে দিয়ে বিছানায় এসে বসল।বর্ষা বলল,

“তাহসিন ভাইয়া কী আর গ্রামে আসেনি?”

কনক মলিন মুখে মৃদু হাসি টেনে বলল,

“এসেছে।এসে বিয়ে করে বউ ঘরে তুলেছে।”

বর্ষা চমকে তাকালো।

“বিয়ে?উনি বিয়ে করেছেন?কাকে?”

“এই গ্রামেরই,বক্কর চাচার ছোট মেয়ে।”

“কী বলছিস তুই?তুই না উনাকে..মানে কিভাবে কী হলো?”

“ভাগ্যে ছিল না।”

বর্ষা হতবাক।কনক তাহসিনকে ভীষণ ভালোবাসে।বন্ধুমহলের সবাই জানে তাহসিন নামক এক শ্যাম বর্ণের পুরুষকে কনক ভালোবাসে।ভীষণ ভালোবাসে।

•

রাজনীতি নিয়ে দিব্যি দিন কেটে যাচ্ছে মাহতাবের।আজকাল যেন শ্বাস নেয়ার সময় টুকু পাচ্ছে না।

সকালবেলা খাওয়া দাওয়া করে সোজা বেরিয়ে যায় ইউনিয়ন অফিসে,সেখান থেকে জেলা পরিষদ, আবার গতকাল বিকেল নাগাদ ঢাকার পার্টি অফিসে মিটিং-এ গিয়েছিল।

আজ মাহতাব বাড়িতেই আছে।সকাল থেকে শরীরটা ভীষণ খারাপ লাগছে।দুপুরের আযান তখনও দেয়নি।সে গোসল করে ট্রাউজারের সাথে একটা পাতলা কালো রঙের টি-শার্ট পড়ে বের হলো ঘর থেকে।ভেজা চুল থেকে তখনও পানি ঝরছে।সে আড়চোখে আফিয়ার ঘরের দিকে তাকিয়ে পা বাড়াল সেদিকে।ঘরের সামনে এসে দরজায় নক করলে খানিকক্ষণ পর আফিয়া ব্যস্ত হয়ে দরজা খুলে দেয়।সে রান্না বান্না শেষে সবে গোসল করেছে।মাথায় তখনও তোয়ালে প্যাঁচানো।হঠাৎ করে দরজার সামনে মাহতাবকে দেখে আফিয়া ভ্রু কুঁচকে বলল,

“কিছু বলবেন?”

মাহতাব তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।আফিয়ার ভেজা চুলের ফাঁকে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ছে গলার নিচে।গায়ের বেগুনি রঙের শাড়িটা ভেজা, কাঁধের আঁচলটাও জায়গামতো নেই।মাহতাব শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে আফিয়া ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেলো।আফিয়া পিছু ঘুরে তাকালো তার দিকে।মাহতাব এগিয়ে গিয়ে বিছানায় পা উঠিয়ে বসে কী যেন খুঁজল। পেয়ে আফিয়াকে বলল,

“মাথাটা একটু মুছে দাও তো।জ্বর জ্বর ভাব রাত থেকে।”

আফিয়া লম্বা শ্বাস টেনে বলল,

“আমার ঘরে মাথা মুছতে এসেছেন?সেটা তো আপনার আদরের বউও করতে পারত।”

“এত কথা বলো কেন?দাও না!”

আফিয়া মাথার তোয়ালে খুলে ছুড়ে মারল মাহতাবের দিকে।মাহতাব সেটা ক্যাচ করে ধরে ফেলল।নাক কুঁচকে বলল,

“অসভ্য মহিলা।”

সে নিজেই মাথা মুছে বালিশ ঠিক করে টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল সেখানে।আফিয়ার পাতলা কাঁথার ভাঁজ খুলে গায়ে জড়িয়ে বলল,

“তোমার বিছানাটা ভীষণ পছন্দ আমার।আজ আমি এখানেই থাকি।”

আফিয়া বিরক্ত হলো।লোকটা দিনদিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে।আজকাল একটু বেশি’ই তার কাছে আসা হচ্ছে।কিন্তু কেন?ঘরে নতুন বউ রেখে আবার তার কাছেই কেন আসে লোকটা?শান্তাকে বিয়ে করার পর প্রায় ১মাস মাহতাব বাড়িতে আসেনি।কেন আসেনি সেটা কেউ জানে না।

আযানের শব্দ ভেসে আসছে বাইরে থেকে।সে খুব করে বুঝল মাহতাব আজ আর মসজিদে যাবে না।ঘরের দরজা আঁটকে দিয়ে এলোমেলো হয়ে থাকা ঘরটা পরিষ্কার করল।তখন কাজ শেষে আগে গোসল করেছে সে।যেই গরম পড়েছে।কাজ শেষ হতে হতে প্রায় আধ ঘণ্টার মতো লেগে গেলো।

আড়চোখে মাহতাবের দিকে তাকিয়ে দেখল লোকটা ঘুমিয়ে গেছে।সে শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলো বিছানার কাছে।একটু পা উঁচিয়ে দেখল সত্যি’ই ঘুমিয়ে কিনা।সে হাত বাড়িয়ে মাহতাবের কপালে রাখল।দেখল সত্যি শরীরটা ভীষণ গরম।কপালে ভাঁজ পড়ল তার।বাইরে নামাজের পর খাবারও দেয়া হবে।খাবার না খেয়ে তো আর ঔষধ খাওয়ানো যায় না।কিছু একটা ভেবে সে ঘর থেকে বের হলো।ফিরল খানিকক্ষণ পর হাতে খাবারের প্লেট নিয়ে।সেটা বেড সাইডের টেবিলের উপর রেখে মাহতাবকে কয়েকবার ডেকে উঠল।

মাহতাব চোখ খুললে বলে,

“বাড়ির সবার খেতে অনেক দেরি।আপনি বরং খাবারটা খেয়ে ঔষধ নিন একটু।”

মাহতাবের চোখ লাল হয়ে গেছে।মাথাটাও ভীষণ ব্যথা করছে।সে কোনোরকম উঠে বসল।বলল,

“মাথা ব্যথা করছে আমার।খাব না আমি।”

আফিয়া ভ্রুযুগল কুঁচকে ফেলল।

“না খেলে আরও ব্যথা বাড়বে।ঔষধ খেয়ে আমাকে উদ্ধার করুন।”

“খাইয়ে দিলে খেতে পারি।”

“আপনার ছোট বউকে গিয়ে বলুন।”

“তোমার কী হাত নেই?তুমি খাইয়ে দাও।”

আফিয়া চোখ বন্ধ করে দাঁত চাপল।তারপর চোখ খুলে শক্ত গলায় বলল,

“আপনার এই নাটক আমার পছন্দ হচ্ছে না মাহতাব।কী সমস্যা বলুন তো?আপনি কেন আমার ঘরে এসেছেন?আর কেনোই বা আমাকে জ্বালাচ্ছেন?”

“তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছো আমি তোমার কী হই।”

“সেটা তো আপনি ভুলে যেতে বাধ্য করেছেন।”

মাহতাব চুপ করে গেলো।বিরক্ত হয়ে খাটের সাথে হ্যালান দিয়ে আধ শোয়া হয়ে চোখ বন্ধ করল।আফিয়া বিছানায় গাল ফুলিয়ে বসে শক্ত গলায় বলল,

“তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে আসুন।আমার আরও কাজ আছে।”

মাহতাব বোধহয় মনে মনে হাসল।ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে আফিয়ার শাড়ির আঁচল টেনে মুখ মুছল।মেয়েটা আশ্চর্য হয়ে শুধু কাণ্ড দেখল।বয়স হয়েছে ৩৩ অথচ কাজ বাজ কিশোরদের মতো।মাহতাব সোজা হয়ে আফিয়ার সামনে বসলে আফিয়া ভাত মাখিয়ে লোকমা মুখের সামনে ধরল। মাহতাব নাক ছিঁটকে বলে,

“এসব কী রান্না হয়েছে বাড়িতে?”

“কচু দিয়ে ইলিশ আর রুই মাছ রান্না করেছি।”

“তুমি জানো না আমি ইলিশ খাই না?”

“কাটা বেছেই দিয়েছি।”

মাহতাব কথা না বাড়িয়ে চুপ চাপ খাওয়ায় মন দিলো।খাওয়া শেষ হলে সে আবার শুয়ে পড়ল।আফিয়ার কাজ নেই আর।সে বাইরে গিয়ে সবার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করল।হিমি,আদনান পাশাপাশি বসেছে।বর্ষা বসেছে ঠিক আদনানের সামনে।বর্ষা বেশ কয়েকবার আদনানের দিকে লাজুক চোখে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিয়েছে।হিমি সেটা খেয়াল করছে প্রথম থেকেই।

রজনী বেগম আদনানের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বললেন,

“আদনান,তোর লাইগা মাইয়া পাইয়া গেছি।”

আদনান খাওয়ার মাঝে খুঁকখুঁক করে কেঁশে উঠল।হিমি পানি বাড়িয়ে দেয়ার আগে বর্ষা গ্লাস এগিয়ে দিলো।আদনান পানি খেয়ে আশ্চর্য হয়ে বলল,

“মানে?”

“মানে তোর লাইগা মাইয়া পছন্দ করা শেষ।”

“আমার লাইগা আবার কারে পছন্দ করলা?”

রজনী বেগম বর্ষাকে দেখিয়ে বললেন,

“এইযে বর্ষা।সম্পর্কে তাহসিনের ফুপাতো বইন লাগে।এই গ্রামেরই মাইয়া।ঘর সংসার খুব মন দিয়া করবো।”

আদনান হতবাক হয়ে বর্ষার দিকে তাকালো।হিমি খাওয়া রেখে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।তাকালো মেয়েটার দিকে।গোলগাল চেহারার মায়াবী মুখ বর্ষার।আদনানের সাথে বোধহয় ভালোই মানাবে।সে শুকনো ঢোক গিলে মাথা নত করল।বর্ষা আড়চোখে আদনানের বিস্মিত বদন দেখে বলল,

“আগে খেয়ে নিন,তারপর মন ভরে দেখবেন।”

উপস্থিত সবাই শব্দ করে হাসল।বাড়িতে পুরুষ মানুষ নেই।সবাই কাজে ব্যস্ত।বর্তমানে বাড়ির বাইরে মাহতাবের লোকজন আর বাড়ির ভেতর বাড়ির মহিলারা আছেন।

মাহতাব যেহেতু ঘরে তাই ডাইনিং টেবিলে আদনান একাই।এত এত মেয়ে মানুষের সামনে ভীষণ লজ্জা লাগল তার।তার মধ্যে হিমির রিঅ্যাকশন কেমন সেটা দেখার সাহসও হলো না।মেয়েটা রাগ করল নাকি কিছুই যায়-আসলো না?

খাওয়া দাওয়া শেষে বাড়ির মহিলারা মিলে সব পরিষ্কার করে রাখলেন।আফিয়া রান্না ঘরে সব জিনিস রেখে বের হচ্ছিল।হঠাৎ নজরে এলো চম্পা নিজের ঘর থেকে বের হচ্ছে।মেয়েটা প্রায় ২বছর ধরে এই বাড়িতে কাজ করছে।অথচ এর আচার আচরণ দেখে মনে হবে সে এই বাড়ির গিন্নি।ছোট চাচা শ্বশুর যেন একটু বেশিই করেন এই চম্পাকে নিয়ে।সে বেশি একটা ভাবল না।কাজ শেষ করে নিজের ঘরে এসে দরজা লাগিয়ে দিলো।মাহতাব তখনও ঘুমাচ্ছে।আফিয়া ঘরের জানালার পর্দা টেনে সময় দেখে নিল একবার।দুপুর ২:৫৭ মিনিট।শরীর ভালো না থাকায় আজ আর নামাজে দাঁড়ানো হলো না।চোখ লেগে আসছে ঘুমে।বিছানার অন্যপাশ দিয়ে উঠে মাহতাবের থেকে দুরত্ব রেখে বালিশে মাথা রাখল সে।এবার একটু ঘুম প্রয়োজন।শরীরটা আজ কাল ভীষণ দুর্বল লাগে।মনে হয় এই বুঝি শেষ নিঃশ্বাসটা বেরিয়ে যাবে।

#চলবে…?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন