ফন্ট সাইজ:
থিম:
কিশোরী কন্যা

২৩তম পর্ব

লেখক: হামিদা আক্তার ইভা Hayat

#কিশোরী_কন্যা

#হামিদা_আক্তার_ইভা_Hayat

২২.

তাহসান গম্ভীর হয়ে ঠাই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।তাহসিন ভাইয়ের কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে।সে কী কিছু ভুল কথা বলে ফেলেছে?উত্তর,হ্যা!দুই মাস কারোর পেট খারাপ থাকে?তাহসিন ভাইকে বলেছে তার দুই মাস পেট খারাপ ছিল।সে শুষ্ক ঠোঁট জোড়া ভিজিয়ে নিচু গলায় বলল,

“বলতে চাচ্ছিলাম যে,আমি আসলেই একটু সিক ছিলাম ভাইয়া।”

তাহসান কোমর থেকে বন্দু’ক বের করে ভাইয়ের বুকে চেপে ধরল।তাহসিন নির্বাক।যেন ভয় বলতে কোনো জিনিস তার মধ্যে নেই।তাহসান দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“বুক ফু’টো করে দেই?”

“দাও।”

“ভয় করছে না?”

“না।”

তাহসান সেটা সরিয়ে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

“বাড়িতে পা রেখেছিস কেন?না এলেই পারতি।”

“তোমরা সবাই এমন করছ কেন?দরকার ছিল তাই আসতে পারিনি।”

“কী দরকার শুনি?”

“তোমায় বলা যাবে না।টেস্টে আগে পাস করি তারপর বলব।”

তাহসান আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।দুই ভাই মিলে প্রবেশ করল বাড়ির ভেতর।দুই ভাই’ই শ্যামবর্ণের।উচ্চতায় দুই জনই প্রায় সমান।তাহসান মাহতাবের কয়েক মাসের ছোট।তাহসিন আর রুহুল প্রায় সমবয়সী সেই ক্ষেত্রে দুইজনকেই বাড়ির ছোট ছেলে বলা হয়।মাহতাব যেমন রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকত,ঠিক তেমন তাহসান নিজের কাজে।সিনিয়র অফিসার হওয়ার কারণে চাপটাও একটু বেশি’ই ছিল।বাড়িতে তাকে পাওয়া মুশকিল।তবে তাহসিন যেহেতু এসেছে তাই সে ভাবল এবার কয়েকদিন একটু রেস্ট নেয়া দরকার।কাজের চাপ বেশি হয়ে গেলে তাকে আর খুঁজেই পাওয়া যাবে না।

সকাল বেলা খাবার দেয়া হচ্ছিল সবাইকে।অর্পিতা বসেছিল স্বামীর পাশে।অর্পিতা আর আফিয়া দুজনকেই তাহসিন ভাবি কম বোন বেশি মনে করত।বিশেষ করে অর্পিতার সাথে তার সম্পর্ক ছিল টম এন্ড জেরির মতো।তবে কিছু কিছু সময় ঠিক তার উল্টো।খাবারের মাঝে মাঝে তাহসিন নাক ছিঁটকে প্লেট থেকে মাছ উঠিয়ে উঠিয়ে অর্পিতার প্লেটে দিচ্ছে।ইলিশ মাছ খুব কম খায় সে।তাহসান ভ্রু কুঁচকে ভাইয়ের দরদ দেখছে।শেষে গম্ভীর হয়ে বলল,

“মার খেয়েছিস?আমার বউকে এত ভালোবাসা দেখানো হচ্ছে কেন?”

তাহসিন মাছের কাটা বাছতে বাছতে বলল,

“কারণ তোমার বউয়ের পেটে আমার পুতুল সোনা আছে।ভাবিকে ভালোবাসা দেখাব কোন দুঃখে?তার জন্য তো তুমি আছোই।”

অর্পিতা ঠোঁট টিপে হেসে বলল,

“আমার যদি মেয়ে হয় তাহলে ওর নাম পুতুল রাখব।সুন্দর হবে না বলো?”

তাহসান কিছু বলার আগেই তাহসিন চোখ তুলে তাকায় ভাবির দিকে।বলে,

“নামটা সুন্দর না ভাবি?তাহলে মেয়ে হলে পুতুল নামই রাখা হবে ফাইনাল।”

এই হচ্ছে তাদের আলাপ আলোচনার মূল একটা কারণ।প্রত্যেকদিন অর্পিতার বাচ্চা নিয়ে আলোচনা করা রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।সেদিনের পর কাটল আরও কয়েকদিন।আগামীকাল ঈদ।তাহসান ছুটিতে আছে আপাতত।এই কয়েকদিন পরিবারের সাথে অনেক সময় কাটানো হয়েছে।আজ চাঁদ রাত।বাড়ির মেয়েরা হাতে মেহেদী দিচ্ছে।সন্ধ্যার পর বসেছে মেহেদী দিতে।এশার নামাজ পড়ে বাড়ির ছেলেরা বাড়িতে প্রবেশ করতেই শুনতে পেল অর্পিতার ব্যথা উঠেছে পেটে।তাহসান পাগল হয়ে ছুটল নিজের ঘরে।তবে ভেতরে আর প্রবেশ করা হলো না।আম্মারা সবাই ঘরে অর্পিতাকে নিয়ে চেষ্টা করছেন।হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে একটা বাচ্চার কান্নার শব্দ ভেসে এলো।রজনী বেগম আলহামদুলিল্লাহ উচ্চারণ করলেন।কিছুটা উচ্চস্বরে বললেন,”আমার তাহসানের মাইয়া হইছে।”

এই খুশি আর কে দেখে?বাড়ি জুড়ে হইহুল্লোড় লেগে গেল।বোরহান সওদাগর ছোট ছেলেকে নিয়ে তৎক্ষণাৎ বাইরের বাইরে বের হলেন মিষ্টি কিনতে।পুরো এলাকায় খবর দিতে হবে না?বংশের প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে।এ যে বিশাল বড় খুশির সংবাদ।

বাচ্চাটাকে বাইরে আনলেন না কেউ।এদিকে তাহসান বউ বাচ্চাকে দেখার জন্য পাগল প্রায়।ঘণ্টা দেড়েক পর দরজা খুললেন অরুণিমা বেগম।অর্পিতাকে পরিষ্কার করিয়ে ঘর পরিষ্কার করেছেন তারা।অর্পিতা বিছানায় শুয়ে তখন বাচ্চাকে পাশে রেখে শুয়ে আছে।রাত তখন ১টা ছাড়িয়েছে।একটু একটু ব্যথা উঠেছিল আরও ২দিন আগে।তবে তাকে নিয়ে হসপিটালে যাওয়া হয়নি।রজনী বেগম বলেছেন বংশের প্রথম সন্তান বাড়িতে হওয়াই ভালো।

তাহসান সর্বপ্রথম স্ত্রীর নিকটে এগিয়ে গিয়ে পাশে বসল।পাশে ফুটফুটে বাচ্চাটার ঘুমন্ত মুখ দেখে হঠাৎ করেই চোখের উপর হাত রেখে কেঁদে উঠল।অর্পিতা হাসল।সেই হাসি ছিল প্রাপ্তির,সুখের।তাহসান আর তাহসিনের মাঝে এক প্রকার যুদ্ধ শুরু হলো কে আগে বাচ্চাকে কোলে নিবে।সর্বপ্রথম তাহসিন বুকে তুলে নিল বাচ্চাটাকে।একদম শান্ত হয়ে চুপটি করে একটা পুতুল ঘুমিয়ে আছে।তাহসিন কোলে নিয়ে তাকিয়েই রইল কিছুক্ষণ।ছোট ছোট হাত, ছোট চোখ,ছোট নাক,ছোট পা—সব মিলিয়ে এক জীবন্ত পুতুল।

রাত তখন গভীর।আকাশের চাঁদও যেন আলগোছে নিচের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছে—এই আনন্দঘন মুহূর্তটার সাক্ষী হতে।বাড়ির আঙিনাজুড়ে এখনো লোকজনের হাঁটা-চলার শব্দ, মাঝেমধ্যে চাপা হাসি,কোথাও দূর থেকে ভেসে আসা আতশবাজির আওয়াজ—সব মিলিয়ে খানদানি বাড়িটা যেন উৎসবে মেতে উঠেছে।

তাহসিন যখন বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিল,তখন তার মুখে যে বিস্ময় আর প্রশান্তি ফুটে উঠল,তা দেখলে মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে কোমল জিনিসটা সে নিজের হাতে ধরে রেখেছে।তার শক্ত, রুক্ষ স্বভাবের আড়ালে যেন সেই মুহূর্তে লুকানো ছিল এক অপার মমতা।বাচ্চাটার ছোট্ট আঙুলগুলো তার বুকে স্পর্শ করতেই সে হালকা কেঁপে উঠল।মনে হলো, জীবনে প্রথমবার কোনো জিনিস তার ভিতরটাকে নরম করে দিচ্ছে।

তাহসান ধীরে ধীরে ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখল।গলাটা ভারী হয়ে এসেছে।

“দে,আমার মেয়েকে একটু কোলে নিই।”

তাহসিন চোখ না তুলেই বলল,

“ধরতে পারবে? পড়ে না যায় যেন? এহ,আমার পুতুল সোনা রে!”

অর্পিতা হাসতে হাসতেই বলল,

“এই দুই ভাই আমার বাচ্চাকে নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছে!”

অবশেষে,অনিচ্ছায় হলেও তাহসিন বাচ্চাটাকে তুলে দিল বড় ভাইয়ের হাতে।তাহসান যখন প্রথমবার মেয়েকে কোলে নিল,তার দু’চোখ ছলছল করে উঠল।এ যেন এক অচেনা অনুভূতি—গর্ব, ভয়,আনন্দ, বিস্ময়—সব একসাথে জড়ো হয়ে বুকের ভেতর ঝড় তুলছে।মেয়েটার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়েই ফিসফিস করে বলল,

“তুই আমার,সত্যি আমার? ছোট্টটুকুন?”

বাচ্চাটি নিঃশ্বাস ফেলল খুব ধীরে,যেন বাবার বুকে মাথা রেখে নিজের জায়গাটা খুঁজে পেয়েছে।তাহসান নিজের বুকের কাছে মেয়েকে আরও জড়িয়ে নিল।তার কঠিন মুখভঙ্গি এক মুহূর্তে গলে গিয়ে শিশিরে ভেজা মাটির মতো নরম হয়ে গেল।

রজনী বেগম দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলেন।চোখে জল চিকচিক করছিল।তিনি বললেন,

“এই বংশের প্রথম মাইয়া,এতো সৌভাগ্য সবার হয় না।”

অরুণিমা বেগম অর্পিতার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,

“মা,তুই অনেক কষ্ট করেছিস।আল্লাহ তোকে সুখে রাখুক।”

চাঁদের আলো ফাঁক ফাঁক জানালা দিয়ে ঘরে এসে পড়ছে।হালকা বাতাস পর্দা দোলাচ্ছে।ঘরটা যেন এক পবিত্র প্রশান্তিতে ভরে আছে।

চারদিক জুড়ে হৈ-হুল্লোড়।মধ্যরাতের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল নতুন শিশুর জন্মের উষ্ণতা।বিছানায় আধশোয়া অর্পিতা চুপচাপ তাকিয়ে আছে তার স্বামী আর মেয়ের দিকে।ওদের মুখে লেখা সুখ, তৃপ্তি,এ যেন তার জীবনের সবচেয়ে দামি দৃশ্য।

আর তাহসান?তার দৃষ্টি থামছে না মেয়ের মুখে।যেন বারবার যাচাই করছে—স্বপ্ন নয় তো?

পরেরদিন সকাল সকাল মিষ্টি বিরতন শুরু হলো।বাড়িতে সেকি এলাহি কাণ্ড।আত্মীয়সজন আসছে,বাচ্চাটাকে দেখছে আবার ঈদ সালামীও দিচ্ছে।সেদিন ছিল স্বপ্নের মতো।

পুতুলের যখন ১৩ দিন চলছে তখন।সেদিন তাহসান অর্পিতাকে নিয়ে হসপিটালে যাওয়ার জন্য বের হয়েছে বউকে নিয়ে।অর্পিতার শরীর খারাপ ভীষণ।ডাক্তার না দেখালে সমস্যা হতে পারে।রজনী বেগম বারণ করেছিলেন।বলেছিলেন ৪০ দিন পার না হওয়া অব্দি অর্পিতাকে বাইরে না যেতে।কে শোনে কার কথা?

বিকেলটা ছিল খুবই সাধারণ।পাড়ার গলির ধুলোভরা রোদ্দুরের নিচে কোথাও কোনো অশুভ সংকেত ছিল না।অর্পিতাকে নিয়ে বের হওয়ার সময় তাহসান দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একবার তাকিয়েছিল মেয়ের দিকে—কোলের ওপর চাদর প্যাঁচিয়ে ঘুমিয়ে আছে পুতুল।ছোট্ট বুক ওঠানামা করছে শান্ত শব্দে।

তাহসান হাসল,

“তোমায় রেখে যাচ্ছি।ফিরে এসে জড়িয়ে ধরব।”

অর্পিতা হেসে বলেছিল,

“দ্রুত ফিরতে হবে কিন্তু।আমাকে না পেলে কাঁদবে ভীষণ।”

কেউ কি জানতো,সেই বিকেলের সোনালি আলো ডুবে যাবে রক্তে,কান্নায়,আর আতঙ্কে?

রাত ঠিক আটটা বাজতে না বাজতেই হৈচৈ শুরু হয়ে গেল বাড়ির উঠোনে।রজনী বেগম প্রথমে কিছু বুঝতে পারেননি।দো’তলার সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই দেখলেন রুহুল দৌঁড়ে আসছে—মুখ থরথর করছে,নিঃশ্বাস দ্রুত নিচ্ছে।

“কী হইছে রে? এমন কইরা হাপাস কেন?”

রুহুল শব্দ বের করতে পারছিল না।অবশেষে কণ্ঠে কাঁপন নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল,

“তাহসান ভাই…ভাবি…এক্সিডেন্ট…”

মুহূর্তেই ঘরের বাতাস ভারী হয়ে এলো।

অরুণিমা বেগম চিৎকার করে উঠলেন,

“কী হয়েছে ওদের?ওরা কোথায়?”

রজনী বেগম পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

বাড়ির ছেলেরা একসাথে বেরিয়ে গেল।কেউ ফোন করছে,কেউ রিকশা থামাচ্ছে,কেউ মোটরসাইকেলে উঠে অন্ধকারে ছুটে যাচ্ছে।চারপাশে কান্না, ভয় আর আতঙ্কে যেন পুরো উঠোন জমে গেল বরফের মতো।পুতুল তখন ফুপুর কোলে নিশ্চুপ ঘুমিয়ে।একটুও বুঝতে পারছে না তার ছোট্ট পৃথিবীটা কী ঝড়ে উলটে গেছে।

হসপিটালের করিডোর – রণক্ষেত্রের মতো হসপিটালের ইমারজেন্সির আলোটা খুবই কড়া।সেখানে দৌঁড়ে পৌঁছাতেই দেখা গেল দু’জনকেই স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।অর্পিতার মুখে রক্ত, চোখ বন্ধ।তাহসানের বুকে ব্যান্ডেজ দেওয়া হচ্ছে, মুখ ফ্যাকাসে,চোখ আধখোলা—কিন্তু তার ঠোঁট কাঁপছে কেবল এক নাম উচ্চারণ করছে।

“অর্পিতা!”

ডাক্তারের গলা কঠোর।

“তাড়াতাড়ি ওটিতে নিন! দু’জনকেই!”

অরুণিমা বেগম দৌঁড়ে এসে ছেলের শুয়ে থাকা শরীরটাকে ধরে কেঁদে উঠলেন।

“তুই কথা বল,তুই চোখ খুল! আমাকে দ্যাখ!”

তাহসান খুব কষ্ট করে বলল,

“আম্মা,পুতুল? কাঁদছে না তো?”

অরুণিমা বেগম উত্তর দিতে পারলেন না।

স্ট্রেচার ঠেলে অপারেশন থিয়েটারের দিকে নিয়ে গেল ওয়ার্ডবয়।দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল ভেতর থেকে।বাইরে রয়ে গেল ভাঙা হৃদয়, কান্না আর দীর্ঘশ্বাস।অপারেশন থিয়েটারের সামনে বসে আছে পুরো সওদাগর পরিবার। অরুণিমা বেগম বারবার দোয়া পড়ছেন।রজনী বেগমের হাত কাঁপছে,চোখের জল থামছে না।তাহসিন দাঁড়িয়ে আছে দেয়ালে ঠেস দিয়ে।চোখ লাল, মুখ শক্ত,বুকের ভেতর উত্তাল ঢেউ।

কেউ ওকে কোনোদিন এমন কাঁপতে দেখেনি।

অপারেশন হলো।দু’জনকে দুই রুমে শিফট করা হলো।কারোর অবস্থাই বেশি ভালো নয়।পরেরদিন সকাল হলেও তাহসানের জ্ঞান ফেরেনি।তার কাছে বর্তমানে অরুণিমা বেগম আছেন।অর্পিতার কাছে রজনী বেগম আর আফিয়া ছিল।ছোট পুতুল তখন মায়ের বুকের উপর শুয়ে আছে।ডাক্তার বলেছেন রোগীর সাথে বেশি কথা বলা যাবে না,তবু অর্পিতা আকুতি-মিনতি করেছে।

অর্পিতা তাহসিনকে ডাকতে বলল।তাহসিন ভেতরে প্রবেশ করে বসল ভাবির সামনে।অর্পিতা তার ক্ষত হাত দ্বারা তাহসিনের হাত মুঠোয় নিয়ে খুব কষ্টে ঠোঁটে হাসি টানল।তাহসিনের বুকে ব্যথা হচ্ছে ভাই-ভাবির এই অবস্থা দেখে।ছোট পুতুলের জন্য জ্বলছে এই বুক।ডাক্তার তো ভালো কিছু বলেনি।চিন্তায় তার মাথা নষ্ট প্রায়।

অর্পিতা নিচু স্বরে খুব কষ্ট করে বলল,

“আমার একটা কথা রাখবে মিশু?”

তাহসিন উত্তর না দিয়ে তাকিয়ে রইল শুধু।অর্পিতার চোখের কোণা বিয়ে গড়াল চোখের জল।সে বলল,

“আমাদের কিছু হয়ে গেলে আমার মেয়েটাকে আগলে রেখো।কখ..কখনো তাকে বুঝতে দিও না—সে এতিম।নিজের মেয়ের মতো করে আগলে রাখবে তাকে কথা দাও?”

অর্পিতার হাতটা তখনও কাঁপছে—সেই কাঁপুনি যেন সরাসরি গিয়ে ধাক্কা দিচ্ছে তাহসিনের বুকের ভেতর।রুমটা নিস্তব্ধ।ইসিজি মেশিনের টুং-টুং শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না।তাহসিন গলার ভেতর জমে থাকা ঢোক গিলল।ভাবির চোখে যে ভয়,যে অনুনয়—ওটা তার জগৎ উল্টে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

“কথা দাও না?” অর্পিতা ফিসফিস করে আবার বলল।কণ্ঠে ব্যথা,আর অদ্ভুত এক নিশ্চুপ আতঙ্ক।

তাহসিনের বুকটা ঝাঁকিয়ে উঠল।সে দুই হাত দিয়ে ভাবির হাতটাকে শক্ত করে ধরল, মুখটা অর্পিতার হাতের কাছে ঝুঁকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“তোমাদের কিছু হবে না ভাবি।”

“যদি হয়?”

“হবে না।”

“আমার বোধহয় আর বাঁচা হলো না মিশু।আমি সব থেকে বেশি তোমাকে বিশ্বাস করি।কথা দাও,আমার মেয়েকে আগলে রাখবে?আমার মেয়েটা আজ থেকে নাহয় তোমার সন্তান।আমার মেয়েটাকে আমি তোমায় দিলাম,মিশু।”

তাহসিন স্থির হয়ে ঠাই বসে রইল।রজনী বেগম আর আফিয়া হুহু করে কাঁদছে।তাহসিন শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,

“পুতুল আমার সন্তান।”

অর্পিতা চোখ বন্ধ করল স্বস্তির মতো একটা নিঃশ্বাস নিয়ে।তার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল।

“মিশু,তোমার উপর ভরসা রেখে দুনিয়ার মায়া ছাড়ছি।আমার পুতুল আজ থেকে তোমার দায়িত্ব।”

তাহসিনের চোখ লাল হয়ে উঠেছে।ঠিক তখনই ছোট্ট পুতুল কেঁদে উঠল।একটা ক্ষীণ,কষ্টভরা কান্না।রজনী বেগম দ্রুত বাচ্চাটাকে আলতো করে মা’র পাশে শুইয়ে দিলেন।অর্পিতা কাঁপা হাতে মেয়ের মাথায় হাত রাখতেই সেই ছোট্ট প্রাণটা শান্ত হয়ে এলো।মায়ের গন্ধ যেন ছুঁয়ে গেল তাকে।

কিন্তু অর্পিতা?তার শ্বাস অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে শুরু করল।

“মিশু…”

ডাকল সে।তাহসিন সামনে ঝুঁকে এলো নিকটে।আফিয়া তখন দৌঁড়ে বের হয়েছে ডাক্তারকে ডাকতে।অর্পিতা ক্লান্ত চোখে তাকাল তাহসিনের দিকে।তার চোখে ভরপুর মমতা।সে সব সময় তাহসিনকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতো দেখে এসেছে।সে তাহসিনের চাপ দাড়ি ভর্তি গালে আলতো হাত ছুঁইয়ে বলল,

“তুমি আমার তাহসানের দেখাশোনাও করবে।ও ভেতরে খুব নরম,নিজেকে দেখাতে পারে না।ওর হাতটা ধরে রাখবে সবসময়।”

তাহসিন এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না।চোখ বেয়ে টুপটাপ করে গড়িয়ে পড়ল চোখের জল।

“ভাবি,তোমার কিছু হবে না।”

“মিথ্যে বলো না।আমি বুঝতে পারছি আমার ভালো লাগছে না।”

মেয়েটা একটু চুপ থেকে বলল,

“তোমার ভাইকে একটাবার দেখার উপায় নেই,মিশু?তাকে একটাবার দেখতে চাই আমি।”

হসপিটালের করিডোরে তখন আরও নিস্তব্ধতা।মাঝে মাঝে নার্সদের তাড়াহুড়ো পায়ের শব্দই কেবল ভেঙে দিচ্ছিল সেই নিস্তব্ধতা।ঘড়ির কাঁটা যেন দাঁড়িয়ে গেছে—সময় শুধু জমে আছে,তীব্র,ভারী হয়ে।ডাক্তারদের সাথে কথা বলে বোরহান সওদাগর ব্যবস্থা করলেন।

তাহসানকে অর্পিতার কাছে আনা হবে।

ভাবির শেষ ইচ্ছা,তার শেষ অনুরোধ ছিল স্বামীকে একবার দেখা।অন্তত শেষ নিঃশ্বাসের আগে।

তাহসানের জ্ঞান ফেরার অপেক্ষা করতে করতে সবার মুখ তখন ফ্যাকাসে।তাহসানের অবস্থাও স্থির নয়।জ্ঞান নেই।শরীরে যেন একসাথে একশোগুলো ব্যথা চেপে ধরেছে।দুই কেবিনের মাঝের দরজা খোলা হলো।

ওয়ার্ডবয় আর দুই নার্স মিলে খুব সতর্কভাবে স্ট্রেচার ঠেলে নিয়ে এলেন তাহসানকে।তার বুক ব্যান্ডেজে মোড়া,শ্বাস ভারী,চোখ আধা বন্ধ—অচেতন অথচ মুখে কষ্টের রেখা স্পষ্ট।

অর্পিতা তখন চোখ আধখোলা।শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ভীষণ।মেয়ের ছোট্ট আঙুল তার হাতে আঁকড়ে আছে।কিন্তু তার দৃষ্টি বারবার দরজার দিকে—যেন অপেক্ষা করছে প্রিয় মানুষটার জন্য।

নিঃশব্দে দরজা খুলে গেল।স্ট্রেচার আনা হলো ধীরে ধীরে।অর্পিতা ভাঙা কণ্ঠে বলল,

“মিশু,ও এসেছে?”

তাহসিন তার পাশে বসে কাঁপা গলায় বলল,

“হু!”

অর্পিতা দুই হাত বাড়াতে পারল না,শরীরটা খুবই দুর্বল।ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল স্বামীর দিকে।

অচেতন তাহসান,নিঃশ্বাস ভারী, ঠোঁট ফ্যাকাসে,

তবুও সেই মুখই তো তার জীবন,তার ভালোবাসা, তার সবকিছু।

তার ঠোঁট কাঁপল,

“তুমি এসেছ? আমি…আমি তোমাকে শেষবার দেখছি তাহসান।আমায় একটাবার দেখবে না তুমি?”

তাহসিন হাত দিয়ে অর্পিতার মাথা ধরে একটু উঁচু করে দিল যাতে সে স্বামীর মুখটা ভালো করে দেখতে পারে।অর্পিতা তাকাল,যেন সেই দৃষ্টির মধ্যেই লেখা ছিল হাজার বছরের ব্যাকুলতা, ভালোবাসা,অপার আকুলতা।তারপর খুব কষ্টে হাত বাড়াল।তাহসিন দ্রুত বুঝে নিয়ে তার হাতটা ধরে নিয়ে আলতো করে এনে রাখল তাহসানের বন্ধ মুঠোর উপর।

দুটো হাত ছুঁতেই একটা হালকা কম্পন গেল অর্পিতার শরীর জুড়ে।তার চোখ জলে ভরে উঠল।খুব কষ্টে সে ফিসফিস করে বলল,

“তুমি আমার জীবনের সুখ ছিলে।আমাদের আর একসাথে পথ চলা হলো না।আল্লাহ তোমাকে ভালো রাখুক।”

মেয়েটা চোখ ঘুরিয়ে তাহসিনের দিকে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে আবারও বলল,

“আমার কথা রেখো মিশু।আমার পুতুল,ও যেন কখনো মা-বাবা হারানোর কষ্ট বুঝতে না পারে।ও তোমার মেয়ে,শুধু তোমার।”

তারপর সে ধীরেধীরে মেয়ের মাথায় আলতো চুমু খেলো।ছোট্ট পুতুলও যেন বুঝল কিছু।কেঁদে উঠল হালকা স্বরে।অর্পিতা মেয়ের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,

“আমার সোনা মা…!”

তার শ্বাস তখন দ্রুত উঠানামা করছে।মুখটা সাদা হয়ে এসেছে।চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে।

তাহসিন বারবার বলছে,

“ভাবি…ভাবি চোখ খোলা রাখো।ভাবি কথা বলো!”

অর্পিতা শেষবার তাহসীনের হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,

“আমার কথাটা রেখো মিশু।”

এটাই ছিল তার শেষ কথা।নিঃশব্দে থেমে গেল সবকিছু।মনিটরের টুং-টাং শব্দ থেমে গিয়ে সোজা একটানা শব্দে ঝাঁকুনি দিল পুরো রুমে।রজনী বেগম চিৎকার করে উঠলেন।অরুণিমা বেগম মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন।তাহসিন স্তব্ধ হয়ে গেল।কিছুক্ষণের জন্য নিঃশ্বাসও যেন বন্ধ হয়ে গেল তার।

আর সেই অচেতন তাহসানের হাতের উপর নিথর হয়ে আছে অর্পিতার হাত।যেটা সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগে স্পর্শ করেছিল।

তাহসিনের মনে কেবল একটা কথাই গুঞ্জরিত হতে থাকে।

“পুতুল তোমার সন্তান।আজ থেকে সে তোমার মেয়ে।”

ছোট্ট দুধের শিশু রেখে সেদিন অর্পিতা দুনিয়ার মায়া ছেড়েছিল।আর ঠিক তার দু’দিন পর যখন তাহসানের জ্ঞান ফিরল তখন স্ত্রীর মৃত্যু সংবাদ শুনে সেও দুনিয়ার মায়া ছাড়ল।এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর বুকে ছোট্ট পুতুল তখন তাহসীনের বুকে লুকিয়ে ছিল নিষ্পাপ ফুলের ন্যায়।ছোট বাচ্চাটার তো কোনো দোষ ছিল না,তবু কেন এতিম হতে হলো তাকে?আল্লাহ হয়তো চেয়েছিলেন তাই।তাহসিন তখন একদম পাথর।ভাইয়ের মেয়েকে সে নিজের মেয়ের স্বীকৃতি দিয়েছিল।অদ্ভুত হলেও বাচ্চাটা তার কোল ছাড়া কোথাও যেন শান্তি পেত না।তার কোলে এলেই একদম শান্ত বাচ্চা হয়ে যেত।বাড়ির সবাই কত করে বোঝাল গ্রামে পুতুলকে রাখতে।আফিয়া আবদার করল তার তো সন্তান নেই,সে পুতুলকে নিজের সন্তানের মতোই বড় করবে।তাহসিন এই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি।ছোট্ট দুধের শিশুকে নিয়ে সে গ্রাম ছেড়েছিল কিছুদিন পরেই।ঢাকায় গিয়ে বড় একটা ফ্ল্যাট কিনেছিল।বোরহান সওদাগরই কিনে দিয়েছিলেন।সেখানেই তাহসিন মেয়েকে নিয়ে একা থাকত।প্রথম প্রথম অরুণিমা বেগম গিয়ে ছেলের সাথে থেকেছিলেন।তারপর হিমি যখন পুতুলের দেখা-শোনা শুরু করল তখন তাহসিন মাকে গ্রামে পাঠিয়ে দিল।একটা সময় এই স্বার্থপর তাহসিন বাচ্চা মেয়েটাকে নিয়ে ভীষণ কষ্ট করেছে।সেই ছোট্ট পুতুল আজ কত বড় হয়েছে।তাহসিনকে এখন “বাবা” বলে ডাকে।

•

তাহসিন সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এলো।নিজের ঘরে এসে দেখল পুতুল দুই পা মেলে দিয়ে হিমিকে রাগ দেখিয়ে আঙুল উঁচিয়ে কী কী যেন বলছে।তাহসিন আসতেই হিমি গভীর নিঃশ্বাস ফেলে ঘরের বাইরে যেতে যেতে বলল,

“তোর মেয়ে একদিন আমায় পাগল বানিয়ে ফেলবে।তুই’ই সামলা ওকে।”

পুতুলের ছোট্ট কোলে তাহসিন মাথা রেখে শুয়ে আছে।চোখ দু’টো খোলা রেখে মেয়ের মায়াবী মুখশ্রী পানে দৃষ্টি রেখেছে।এই সন্তান তার।পুরো দুনিয়াও যদি তার বিপক্ষে যায়,তবুও সে বলবে,”এই সন্তান আমার।পুতুল আমার মেয়ে।”

পুতুল বাবার চুলে যত্ন করে ছোট ছোট হাত দিয়ে বিলি কেটে দিচ্ছে।মাঝে মধ্যে উকুন আনার ভান করে উৎফুল্ল হয়ে বলছে,

“বাবা,তুমি পঁচা হয়ে গেছো।তোমার মাথায় ইয়া বড় বড় উকুন হয়েছে জানো?”

নিজে নিজে বলেই খিলখিল করে হাসছে।তাহসিন মেয়ের বানানো মিথ্যে কথায় আলতো হাসল।বলল,

“আম্মা,আপনার হাসিটা খুব সুন্দর।”

পুতুল যেন বাবার মুখে এমন কথা শুনে বেশ অবাক হলো।সে কী বুঝেছে বাবা তাকে কী বলেছে?বাচ্চাটা কুটুরকুটুর চোখে বাবার বিষণ্ণ মুখ-খানা দেখে তোতাপাখির মতন তু তু করে বলল,

“তোমার হাসিটাও খুব সুন্দর বাবা।কিন্তু মায়ের হাসি সব থেকে বেশি সুন্দর।মা যখন হাসে,তখন মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে আমার খুব ভালো লাগে।”

তাহসিন দেখল মেয়েটার মুখ।চোখ দু’টো চিকচিক করছে মায়ের জন্য।এত ভালোবাসা,এত টান কবে হলো?কবে ময়ূরিকে এত আপন করে নিল মেয়েটা?পুতুল কারোর সাথে তেমন কথা বলে না,ঠিক ময়ূরীর মতোই।সে সবার সাথে মিশতেও পারে না।ছোট থেকে তাহসিন তেমন একটা মানুষের ভিড়ে রাখেনি।এতে তাহসিনেরই ভীষণ অস্বস্তি হয়।

পুতুল হঠাৎ কিছু একটা মনে করে বলল,

“বাবা,আমায় একটা পুতুল কিনে দিবে?”

তাহসিন বলল,

“আপনার তো ঘর ভর্তি পুতুল আম্মা।নতুন পুতুল দিয়ে কী করবেন?”

সহসা পুতুল ঠোঁট উল্টে বলল,

“মামাকে দিব।”

“ফাহাদ?”

“উম!”

তাহসিন ফাহাদকে অনেক খেলনা কিনে দিয়েছিল এই বাড়িতে নিয়ে আসার পর।বাচ্চাটার মুখ-খানা ভেসে উঠল চোখের সামনে।গালে গাল লাগিয়ে আদুরে কণ্ঠে বলা ‘দুলাবাই’ ডাকটা।শুকনো ঢোক গিলল সে।পুতুল বাবার চোখের কোনায় টলমলে পানি দেখে মন খারাপ করে বলল,

“সবাই তোমাকে খুব বকেছে,তাই না বাবা?আমি সবাইকে বকে দিব।বলব,আমার বাবাকে কেউ বকবে না,নাহলে আমি কিন্তু কারোর সাথে কথা বলব না।”

তাহসিন মৃদু হাসল।খানিকক্ষণ পর সে মেয়েকে তৈরি করে ঘরের বাইরে বের হলো।নিচে বোরহান সওদাগর,অরুণিমা বেগম এবং আফিয়া অপেক্ষা করছে তার জন্য।

বাইরে থেকে স্পষ্ট সওদাগর বাড়ির মানুষদের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে।শাশুড়ি আর দাদা শ্বশুর এসেছে বোধহয়।তারা আম্মার-আব্বার সাথে কথা বলছেন।ময়ূরী ঘরে বসেই পুতুলের ‘মা’ ডাকটা শুনতে পেল।ফাহাদকে বারে বারে ধমক দিয়ে জিজ্ঞেস করছে,

“এই মামা,সত্যি করে বলো আমার মা কোথায়?”

ফাহাদ পুতুলের প্রশ্ন শুনে উত্তর দিল,

“আপা তু গরে।”

পুতুল মায়ের ঘরের সামনে এলো।ময়ূরী চাতক পাখির ন্যায় দরজার দিকে তাকিয়ে ছিল পুতুলকে দেখার জন্য।পুতুল সাদা একটা জামা পরেছে।কোমর সমান চুল গুলো বাবা যত্ন করে দুইপাশে বেণী করে দিয়েছে।পায়ে একটা পুতুল জুতা পরে বুকে গোলাপি রঙের একটা বিড়াল পুতুল শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ছলছল চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে।ময়ূরীর চোখ ঝাঁপসা হয়ে এলো।বিছানা থেকে নেমে দু’হাত বাড়িয়ে দিতেই মেয়েটা ছুটে এসে মায়ের বুকে হামলে পড়ল।ময়ূরী মেয়েটাকে বুকে আগলে নিয়ে মাথায় চুমু খেয়ে বলল,

“মা,তুমি এসেছ?”

পুতুল বলল,

“তুমি আমায় রেখে এসেছ কেন?জানো,আমি কত কেঁদেছি?”

ময়ূরী মেয়েকে নিয়ে বিছানায় বসল।বাচ্চাটার চোখের পানি মুছে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,

“সরি।”

“আমায় কেন নিয়ে এলে না?”

ময়ূরী উত্তর দিতে পারল না।পুতুল ঠোঁট উল্টে ফের জড়িয়ে ধরল তাকে।তার ভাষ্যমতে ময়ূরীর অবয়ব থেকে মা মা একটা ঘ্রাণ পায় সে।মায়ের কাছে থাকলে তার আনন্দ হয়।এক রাতেই ময়ূরীর মনে হলো একটা বছর ধরে সে পুতুলকে দেখে না।ময়ূরীর মায়া হলো খুব।বাচ্চাটার দোষ কোথায় এখানে?বাবা মায়ের জন্য মেয়েটা কষ্ট পাচ্ছে।পুতুল চুপটি করে মায়ের বুকে পড়ে রইল।এখানেই তো শান্তি,ভরসা,সুখ।হঠাৎ দরজার সামনে একটা লম্বাটে কালো ছাঁয়া এসে থামল।ময়ূরী ছাঁয়া খানা দেখে মুখ ফিরিয়ে নিল।সে জানে এই ছাঁয়ার মালিককে।চেনে সেই পুরুষকে।মেয়েটা দৃষ্টি নত করে পুতুলকে বুকে জড়িয়ে ধরে বসে রইল।তাহসিন ব্যথাতুর চোখে সেই দৃশ্য দেখে এগিয়ে এলো গুটি গুটি পায়ে।ময়ূরীর পাশে এসে দুরুত্ব রেখে বসল।কারোর মুখে তখন কোনো কথা নেই।কীই বা বলবে?তাহসিন কথা খুঁজে পেল না।আচমকা ঘরে ঢুকলেন ফিরোজা বেগম।জামাই আর মেয়েকে এক ঘরে দেখে কিছুটা থমথমে খেলেন।তিনি এসেছিলেন ময়ূরীকে ডাকতে।অরুণিমা বেগম ময়ূরীর সাথে কথা বলতে চাইছেন।ময়ূরী মাকে দেখে শান্ত হয়ে বলল,

“কিছু বলবে আম্মা?”

ফিরোজা বেগম ঘনঘন মাথা নেড়ে নাতনিকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন,

“পুতুলকে আমি নিয়ে যাচ্ছি।বাচ্চাটা এখনো খায়নি কিছু।”

তিনি তাড়াতাড়ি প্রস্থান করে ঘরের দরজা চাপিয়ে দিলেন।ঘরে নেমে এলো নীরবতা।ময়ূরী শূন্য দৃষ্টি মেলে বিছানার চাদরের দিকে তাকিয়ে আছে।একটাবারও সে তাহসিনের দিকে তাকায়নি।তাহসিন আজ সাহস করে বলতে পারছে না,”এই মেয়ে,তাকাও আমার দিকে।আমায় না দেখলে তোমার দিন ভালো কাটবে কী করে?তাকাও বলছি!”

#চলবে…?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন