#দহনচক্র
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#পর্ব_৫
গভীর রাত্রির নিবিড় স্তব্ধতাকে ভেদ করে অরণ্যা গ্রামের বাড়িতে পৌঁছাল। দীর্ঘ পথযাত্রার ক্লান্তি তার দেহ-মনে এমনভাবে আচ্ছন্ন হয়ে ছিল যে, ভেতরে প্রবেশ করেই আর নিজেকে সামলে রাখতে পারেনি। বাসযাত্রার অস্বস্তিকর স্মৃতিগুলো তখনও তার চিন্তার গভীরে অস্থির ঢেউ তুলছে। হয়তো প্রতিটি মুহূর্তে সেই অনভিপ্রেত যাত্রার ক্লান্তি ও বিরক্তি তাকে অনুসরণ করে চলেছে। সবশেষে আর ভাবতে পারল না। নিদ্রা তাকে গ্রাস করে নিলো। সেই ঘুম ভাঙল বেলা করে। বুঝাই যাচ্ছে ক্লান্তির কারণে ২দিন যে ঘুমাতে পারেনি সে।
সূর্যের আলো তখন ঘরের ভেতর নিজের বিস্তার ঘটিয়েছে, কিন্তু অরণ্যার মনে কোনো প্রশান্তি এনে দিতে পারেনি। জাগ্রত হতেই তার ভেতরে অস্বস্তি দানা বাঁধতে শুরু করে। গ্রামে পৌঁছানোর পর থেকেই সে বারবার বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেছে। একের পর এক সব নম্বরে কল দিয়েছে। তবুও কোনো সাড়া মেলেনি। বাড়িতে কিছু আবার হয়ে যায়নি তো? খালা রাবেয়া তাকে নিশ্চিত করে বলেন, "কিরে অরু বাড়িতে আবার কি হবে? তব ঠিক আছে তুই চিন্তা করিস না।"
অরণ্যার খালার বাড়িতে অনেক বছর পর আসা। গ্রামের মধ্যে খালাদের অবস্থা ভালো। খালুদের বাড়ি হলো ব্যাপারি বাড়ি। ভালোই নাম ডাক। তবে নাম-ডাক যতোই থাকুক না কেন অরণ্যার খুব বেশি একটা পছন্দ না। এর যদিও কারণ আছে। এই বাড়ির মানুষ এই যুগে থেকেও তাদের চিন্তাধারা যেন রয়ে গেছে কলি যুগে। মেয়ে মানুষ ওইটা করতে পারবে না, এইটা করতে পারবে না। এইযে অরণ্যা চাকরি করে তা নিয়ে তো জ্ঞানের অভাব নেই। কিন্তু বাবা এখন এখানে পাঠিয়েছে করার কিছু তো নেই। থাকতে হবে। তবে চাকরির একটা ব্যবস্থা করে জলদি বিদায় হলেই হলো। যেই বাড়িতে নারীরাও নারীদের মাটিতে দাবিয়ে রাখে সেখানে অরণ্যার শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। তার ওপর এই বাড়িতে একজন তো আছেই যাকে অরণ্যা দুই চক্ষে সহ্য করতে পারে না। রাবেয়া খালার ছোট ছেলে ইমন ব্যাপারি। ওই ইমনের চোখ ভালো না, চরিত্রে দোষ আছে। এখন এইটা নিয়ে যদি কোনো মেয়ে প্রতিবাদ করতে আসে উল্টো গ্রামের মানুষ তাকেই টেনে হিঁচড়ে নিচে নামাবে। ওই ছেলের কিছুই হবে না। হ্যাঁ এভাবেই তো এই গ্রাম চলে। তাইতো অরণ্যার এই গ্রাম পছন্দ না। ফরিদপুরকে বড্ড ঘৃণা করে সে। তার পূর্ব পুরুষদের বাড়িও ফরিদপুর অথচ জন্মের পর থেকে ঢাকায় মানুষ হয়েছে। গ্রামের বাড়ি বলতে কিছুই নেই তাদের। অরণ্যার দাদা ঢাকায় এসে বিয়ে করেছিলেন। এখানে ঘর-সংসার বাঁধেন । তারপর সেই ধারায় দেওয়ান বাড়ি এভাবেই চলছে। তবে যাই হয়ে যাক না কেন, মরে গেলেও অন্তত ফরিদপুরের বউ হতে চায়না অরণ্যা। এখন দুনিয়ার শেষ পুরুষ ওই ফরিদপুরের ছেলেই বা হোক না কেন।
-
দুপুরে এত গরম পড়েছে। রাবেয়ার বড় ছেলের বউ জুনু তরমুজ কেটে বাড়ির পুরুষদের উঠানে খাওয়ার জন্য দিয়েছে। এই জুনুর স্বামী ইমরান ব্যাপারীই কাল রাতে অরণ্যাকে বাসায় নিয়ে এসেছিল। রাতে কি করবে উপায় না পেয়ে খালার কাছে কল করতেই খালা ইমরান ভাইকে পাঠায়। ইমরান ভাইয়ের বউ জুনু সারা বেলা কাজ করে। বয়স কত হবে? মনে তো হয় অরণ্যার কাছাকাছি বয়স। এই বয়সে পাঁচটা ছেলে-মেয়ে। এদের নিয়ে সব একা হাতে সামলায়। রাবেয়া খালারও কম সন্তান হয়নি। হয়েছে আর মরেছে কলেরায়। রাবেয়ার বড় ছেলের বউ জুনুর কাজ শেষ হতেই অরণ্যা পুকুরঘাটের দিকে এগোতে থাকে। দুপুরের আলো তখন চারপাশে নরমভাবে ছড়িয়ে আছে, পানির উপর ঝিলমিল করছে সূর্যের প্রতিফলন।
ঘাটে পৌঁছে অরণ্যা থেমে যায়। চারপাশে খোলা। কোথাও তেমন আড়াল নেই। দু-একজন মহিলা ইতিমধ্যে পানিতে নেমে গল্প করতে করতে গোসল শুরু করে দিয়েছে। অরণ্যা একটু সংকোচ নিয়ে বলল,
“ভাবী… এখানে?”
জুনু অবাক হয়ে তাকায়, “কেন? এখানে কী সমস্যা?”
অরণ্যা ধীরে বলে, “এত খোলা জায়গা… কেউ যদি হঠাৎ এসে পড়ে?”
জুনু হেসে ওঠে, “এইডা গ্রাম, অরু। এখানে সবাই এইভাবেই গোসল করে। কেউ কিছু মনে করে না।”
পাশ থেকে আরেকজন মহিলা কথা জুড়ে দেয়, “আর আসবেই বা কে? এই সময় তো সব ঘরের মানুষ ঘরেই থাকে।” অরণ্যা তবুও নিশ্চিন্ত হতে পারে না। তার চোখ বারবার চারপাশে ঘুরে বেড়ায়, যেন কোনো অচেনা দৃষ্টি তাকে ছুঁয়ে যাবে এই আশঙ্কায়। সে নিচু স্বরে আবার বলে, “তবুও… আমার কেমন অস্বস্তি লাগছে।”
ভাবী একটু কাছে এসে নরম গলায় বলে, “প্রথম প্রথম সবারই লাগে। পরে ঠিক হয়ে যায়। আমরা তো আছিই, ভয় কিসের?”
অরণ্যা ভেতর ভেতর বলে ওঠে, "পরে ঠিক হওয়া দিয়ে আমি কি করব? আমি কি এখানে চিরকাল থাকার জন্য এসেছি নাকি?"
জুনু ফের বলল, "আরে শুরু করো।" অরণ্যা একটু ইতস্তত করে বলল, “ভাবী… আমি এখানে গোসল করতে পারব না।” কথাটা শুনেই পাশে থাকা আরেকজন মহিলা খিলখিল করে হেসে উঠল, “এইডা আবার কেমন কথা? পুকুরে গোসল করবা না মানে!”
আরেকজন বলল, “ঢাকার মাইয়া আইছে তো, লজ্জা বেশি!”
ভাবী এগিয়ে এসে অরণ্যার হাত টেনে বলল, “এইসব ঢং কইরো না। আমরা সবাই তো একসাথেই গোসল করি।” অরণ্যা অস্বস্তিতে চারপাশে তাকায়, গলার স্বরটা নিচু করে বলে, “তাও… খোলা জায়গা… কেউ যদি দেখে ফেলে?” এইবার সবাই একসাথে হেসে ওঠে। একজন একটু মজা করেই বলে, “কে দেখবো? গাছ দেখবো না পানি দেখবো?”
ভাবী চোখ টিপে বলে, “আমরা তো মহিলা মানুষ। আমাগো সামনে গোসল করলে কী হইব?”
পাশ থেকে আরেকজন কথা বাড়ায়, “এইডা আবার নতুন কিসের লজ্জা! কাল বিয়া হইলে জামাইয়ের সামনে উদাম বইসা থাকবা, আর এইখানে লজ্জা!”
কথাটা শুনে সবাই আবার হেসে ওঠে। অরণ্যার মুখ লাল হয়ে যায়। বিরক্তি আর লজ্জা মিশে তার ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। এই ধরনের মশকরা তার একদমই ভালো লাগে না, কিন্তু কিছু বললেও এখানে সেটা উল্টো হয়ে যাবে এটা সে ভালোই জানে। সে চুপ করে থাকে। চোখ নামিয়ে ফেলে। “আরে ভয় পাইও না। আয়, নামো।” জুনু আবার বলল।
শেষ পর্যন্ত সবার জোরাজুরিতে অরণ্যা পানিতে নামল। মুখে পানি দিল, সাবানটা হাতে নিল। কিন্তু ভেতরের অস্বস্তিটা কিছুতেই কাটছে না। মনে হচ্ছে, চারপাশের খোলা আকাশ যেন তাকে আরও উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
ঠিক তখনই তার চোখ হঠাৎ থেমে গেল সামনে ঝোপের দিকে। ঝোপের ফাঁক দিয়ে…একজোড়া চোখ।
স্থির সেই দৃষ্টি। নোংরা চাহনি তার দিকেই তাকিয়ে আছে। অরণ্যার বুক কেঁপে উঠল। চোখে চোখ পড়তেই সে হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, “ওখানে কে! কেউ আছে!”
সবাই থমকে গেল। জুনু অবাক হয়ে বলল,
“কোথায়? কে থাকব?”
অরণ্যা কাঁপা আঙুল তুলে দেখাল,
“ওই ঝোপটার মধ্যে… কেউ তাকিয়ে ছিল!”
পাশের এক মহিলা বলল, “আরেহ, কিচ্ছু না। তোমার ভুল হইছে।”
কিন্তু অরণ্যা মাথা নাড়ল, “না! আমি স্পষ্ট দেখছি!”
জুনু এবার একটু সিরিয়াস হলো। “তুমি থাকো, আমি দেখি।” সে দ্রুত পানি ছেড়ে উঠে ঝোপের দিকে গেল। পাতাগুলো সরিয়ে এদিক-সেদিক খুঁজল।
কিছুই নেই। ফিরে এসে বলল, “কেউ নাই তো! হয়তো কাক-টাক আছিল।”
কিন্তু অরণ্যার চোখে ভয় জমে গেছে। গলার স্বর শক্ত হয়ে গেল, “না, কেউ ছিল।” তার ভেতরে রাগও জেগে উঠেছে। এই জায়গা, এই পরিস্থিতি, এই অসহায়ত্ব সবকিছু মিলিয়ে। সে আর এক মুহূর্তও থাকতে পারল না। পানি থেকে উঠে কাপড় জড়িয়ে দ্রুত ঘাট ছাড়তে লাগল। জুনু পিছন থেকে ডাকল,
“এই! কোথায় যাও? গোসল তো শেষ করো!”
অরণ্যা না ঘুরেই বলল, “আমি পারব না। আমার ভালো লাগছে না।”
-
পুকুরের পানি থেকে একে একে সবাই উঠে পড়ল। গল্প করতে করতে ভেজা শাড়ি সামলে ঘাট ছাড়তে লাগল তারা। অরণ্যা এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখ এখনও স্থির সেই ঝোপটার দিকে। মনে হচ্ছে না, ভুল হতে পারে না। কেউ ছিলই সেখানে। জুনু কাছে এসে বলল,
“কি হইছে? দাঁড়াইয়া আছো ক্যান? চলো।”
অরণ্যা ধীরে বলল, “ভাবী… কেউ ছিল। আমি ভুল দেখি নাই।”
জুনু একটু বিরক্ত, একটু আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল,
“আরে না রে, কিছু না। তোর মনে ভয় ধরছে। চল, বাড়ি যাই।” অরণ্যা আর কিছু বলল না। তবে হাঁটার সময়ও একবার পেছনে তাকাল৷
বাড়ির উঠানে ঢুকতেই অরণ্যা থমকে গেল।
ভিতরে বেশ ভিড়। হঠাৎ এত মানুষ দেখে তার ভেতরের অস্বস্তিটা যেন আরও বেড়ে গেল। রাবেয়া দূর থেকে অরণ্যাকে দেখে ডাক দিল, “যাও যাও মা, ঘরে যাও। এই গরমে আর বাইরে থাইকো না।” তার গলায় ছিল স্নেহ, কিন্তু অরণ্যার কানে সেটা যেন কেমন ফাঁপা লাগল।
জুনু তার হাত ধরে টেনে নিল, “চলো, আমি দেখাইয়া দিতেছি।”
অরণ্যা চুপচাপ তার সাথে ভেতরে ঢুকে গেল। চারপাশে মানুষের কোলাহল, তবুও তার মনে হচ্ছিল এই ভিড়ের মাঝেও সে একা। রুমে ঢুকতেই যেন একটু স্বস্তি পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হলো না। দরজাটা বন্ধ করেও তার বুকের ভেতর কেমন অজানা কাঁপুনি রয়ে গেল।
জুনু বলল, “পোশাক বদলাইয়া নাও। আমি বাইরে আছি।”
অরণ্যা মাথা নাড়ল। জুনু বেরিয়ে যেতেই ঘরটা নিঃশব্দ হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে ভেজা কাপড় খুলতে শুরু করল। হাত কাঁপছে অল্প অল্প। হঠাৎ মনে হলো, কেউ তাকিয়ে আছে। একদম তার ওপরেই। অরণ্যা থেমে গেল। চারপাশে তাকাল। ঘরে কেউ নেই। জানালা বন্ধ। দরজা বন্ধ। তবুও সেই অনুভূতিটা যাচ্ছে না।
সে তাড়াতাড়ি অন্য পোশাকটা গায়ে চাপাতে লাগল। বুকের ভেতর ধকধক শব্দ যেন আরও জোরে শোনা যাচ্ছে। নিজের কাছেই ফিসফিস করে বলল,
“কিছু না… কিছু না…” কিন্তু কথাগুলো তার নিজের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য লাগল না। মনে হচ্ছিল
ওই ঝোপের আড়ালের চোখ… এখনও যেন তাকে অনুসরণ করে এসেছে।
অরণ্যা দ্রুত পোশাক বদলে নিল। তারপর দরজাটা খুলে বাইরে বের হতেই হঠাৎই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার সাথে তার মুখোমুখি হয়ে গেল। ইমন দরজার সামনে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, অরণ্যাকে দেখে তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।
"এই তো… শহরের মাইয়া। এত তাড়াতাড়ি গোসল শেষ?”
অরণ্যা চোখ তুলে তাকাল। তার দৃষ্টিতে কোনো সংকোচ নেই, “আপনার কিছু দরকার ছিল?” ইমন একটু এগিয়ে এল। তার চোখে সেই অস্বস্তিকর দৃষ্টি, যা অরণ্যা আগে থেকেই অপছন্দ করে। সে ধীরে ধীরে বলল,
“দরকার তো নাই… তবে জানতে চাইতাছিলাম, গ্রামের পানিতে গা ভেজানোর পর কেমন লাগতাছে।”
অরণ্যা কিছু বলল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। ইমন এবার তার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল, “তবে তোমারে দেখতেছি… গ্রামের মাইয়াদের মতো না। শরীরটাও… একটু আলাদা ধরণের।” কথাটার ভেতরের অর্থ পরিষ্কার। অরণ্যার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল। সে এক পা এগিয়ে এল। গলার স্বর ঠাণ্ডা,
“সবাই তো আর এক রকম হয় না। কারও চোখ ভালো জিনিস চিনতে পারে, কারও চোখ শুধু… নোংরা জিনিসই খোঁজে।” ইমন একটু থমকে গেল। তারপর কটমট করে তাকাল, “কি কইলা?”
অরণ্যা এবার হেসে বলল, “কিছু না। আপনার বুঝার মতো কিছু না।” এইবার ইমনের মুখটা শক্ত হয়ে গেল।
সে আরও কাছে এগিয়ে এল, “তুমি অনেক কথা কও, তাই না?”
অরণ্যা বিন্দুমাত্র পিছু হটল না। “যতটুকু দরকার, ততটুকুই বলি। আর হ্যাঁ নিজের সীমা জানি। তবে অন্যদেরও জানানো লাগে মাঝে মাঝে।”
ইমনের চোখে এবার স্পষ্ট রাগ। হাতটা একটু উঠল কিছু একটা করার ইঙ্গিতে। ঠিক তখনই উঠান থেকে রাবেয়ার গলা ভেসে এল, “ইমন! এই ইমন! কই গেলি?”
ইমন থেমে গেল। দাঁত চেপে রইল কিছুক্ষণ।
তারপর চোখ সরু করে অরণ্যার দিকে তাকিয়ে বলল,
“বেশি চালাকি ভালো না।”
অরণ্যা শান্ত স্বরে উত্তর দিল,
“চালাকি না। আত্মসম্মান।”
রাবেয়া আবার ডাকল,
“ইমন! তাড়াতাড়ি আয়!”
ইমন আর কিছু না বলে বিরক্ত মুখে সরে গেল।
অরণ্যা স্থির দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তবে হঠাৎ করে মনে পড়ল এইবার আবারও তার বাড়িতে ফোন দেওয়া দরকার। তার ফোনে এমবিও নেই। নেটে ঢুকার সুযোগও হচ্ছে না। তানিশা তো সারাদিন লাইনে থাকে। তবে অবাক করার বিষয় হচ্ছে বাড়িতে এতবার সেই রাত থেকে কল দেওয়ার পরেও কল কেন কেউ ধরছে না? ভাবতে না ভাবতেই হঠাৎ উঠানে হইচই বেঁধে গেল। অরণ্যা চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে দৌড়ে গেল। ওই যে পাশের বাড়ির যে মহিলাটাও তাদের সঙ্গে গোসল করতে নেমেছিল, তার ১৩ বছরের মেয়েটার কী যেন হয়েছে। কান্নার শব্দে ইতিমধ্যে মানুষ জমে গেছে। ভিড়ও বেড়েছে।
অরণ্যা সেখানে যেতে নিলে জুনু তাকে আটকে দেয়। বলে,
“ওই মরিয়ম মাইয়াটা বাড়ির পেছনের খড়ের পালার পেছনে পড়ে ছিল।”
“তো কী হয়েছে?”
“ভাতারের লগে নষ্টামি করছে। ভাতার কাম সাইরা ফালাইয়া পালাইছে। এখন মাইয়ার মরা-মরা দশা।”
“কি?” এবার অরণ্যা চুপ থাকতে পারল না। জুনুর হাত ছাড়িয়ে দিয়ে ভিড় ঠেলে ওই বাড়ির উঠানে চলে গেল। বাচ্চা একটা মেয়ে পড়ে আছে। সালোয়ার রক্তে ভিজে গেছে। যাওয়া-আসা করছে শ্বাস। গায়ের ওপর চাদর দিয়ে রাখা হয়েছে। মরিয়মের মা বুক চাপড়ে কাঁদছেন। কে তাদের এত বড় সর্বনাশ করল!
মরিয়মের বাবাকে লোকেরা ঘিরে ধরেছে। গালাগালি দিচ্ছে। মরিয়মের মা হাসপাতালে নিতে চাইলেও এলাকার মানুষজন কড়া নিষেধ জারি করেছে।
“একে তো পাপ করছে! এমন মেয়েদের মরা উচিত!”
“এক ব্যাটায় কাজ হয় না নাকি? এখন হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে আবার পুরুষ ডাক্তারের সামনে নিতে চায়!”
“আগেই কইছিলাম বিয়া দিয়া দে! না, মেয়ে পড়ালেখা কইরা বড় মানুষ হবে! হইছে এখন?”
ভিড় আরও ঘন হয়ে উঠল। উঠান তো নয় যেন বিচারসভা। কিন্তু সেখানে বিচার নয় ছিল শুধু নোংরা কথা, দোষ চাপানো, আর নিষ্ঠুরতা। একজন বয়স্ক মহিলা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “এই বয়সে এমন কাণ্ড! নিশ্চয়ই নিজের ইচ্ছায় গেছে। এতদিন চুপ ছিল কেন?”
পাশ থেকে আরেকজন পুরুষ হেসে উঠল,
“মাইয়াগো আবার জোর কইরা কিছু হয় নাকি? সবই রাজি-খুশি!”
ইমন ভিড়ের সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে কোনো দয়া নেই। সে গলা উঁচু করে বলল, “এখন আবার নাটক শুরু করছে। আগে কি করতেছিল?”
ইমনের বাবা ধমক দিয়ে বলল, “এইসব ঘটনা বাইরে গেলে গ্রামের মান-সম্মান শেষ। মাটি চাপা দিয়া ফেলো। চুপচাপ থাকলেই ভালো।”
কেউ সায় দিল,
“হ, ঠিক কইছে। থানাপুলিশ লাগলে সবাই ঝামেলায় পড়ব।”
অরণ্যার বুক ধকধক করতে লাগল। সে চারপাশে তাকিয়ে দেখল। কেউ সত্যটা জানতে চায় না। সবাই শুধু দোষ চাপাতে ব্যস্ত। হঠাৎ মরিয়মের মা চিৎকার করে উঠলেন। কান্নায় তার গলা ভেঙে গেছে,
“এইটা ফারুকের কাজ! ওই জানোয়ার আমার মাইয়ার সর্বনাশ করছে! আমার মাইয়ারে বিয়া করবার চাইছিল। আমরা রাজি হই নাই দেইখা অনেক দিন ধইরা বিরক্ত করছে!”
ভিড়ের মধ্যে গুঞ্জন উঠল। কিন্তু সহানুভূতি নয় সন্দেহ আর পক্ষপাতের। একজন পুরুষ মাথা নেড়ে বলল,
“ফারুক? আরে, ওই পোলা এমন না। পুরুষ মানুষের গায়ে দোষ লাগে না।”
আরেকজন যোগ করল,“মাইয়াটারই দোষ। নিশ্চয়ই কিছু আছিল, না হলে এমন হয় নাকি?”
ইমন ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল, “ফালতু দোষ দিচ্ছে। নিজের লজ্জা ঢাকতে এখন অন্যের নাম নিচ্ছে।”
মরিয়মের বাবা হঠাৎ বসে পড়লেন মাটিতে। দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁপতে লাগলেন। “আমার মাইয়ারে বাঁচান… কেউ একটা বাঁচান…”
কিন্তু তার সেই আর্তনাদ ভিড়ের কোলাহলে চাপা পড়ে গেল। অরণ্যা দাঁড়িয়ে রইল স্থির হয়ে। তার মনে হলো এই মানুষগুলোই আসলে সবচেয়ে ভয়ংকর। এখানে অপরাধী একজন না, পুরো ভিড়টাই অপরাধী।
অরণ্যার আর সহ্য হলো না। চারদিকের শব্দ যেন একসাথে তার মাথার ভেতর আছড়ে পড়ছে। সে অনুভব করল, আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকলে নিজেকেই ঘৃণা করবে। হঠাৎ সে সামনে এগিয়ে গেল। ভিড় ঠেলে, মানুষের কাঁধ সরিয়ে, ঠাসাঠাসি পেরিয়ে পৌঁছে গেল মাঝখানে। মাটিতে পড়ে থাকা মেয়েটার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। চাদরটা আলতো করে সরাল। ক্ষীণ শ্বাস উঠানামা করছে। মুখটা ফ্যাকাশে, ঠোঁট শুকনো। বয়সটা কিছুই না, একেবারে বাচ্চা।
অরণ্যার হাত কেঁপে উঠল। “পিছাই যাও!” হঠাৎ করেই একটা কড়া গলা উঠল। অরণ্যা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল না। মেয়েটার কপালে হাত রাখল।
“পানি আনেন কেউ… তাড়াতাড়ি।”
কেউ এগিয়ে এলো না। বরং পেছন থেকে ঠাণ্ডা স্বরে কেউ বলল, “এইসব ঝামেলায় জড়াইও না। পরে নিজেরই নাম খারাপ হইব। তুমি শহরের মাইয়া।”
একজন মহিলা এগিয়ে এসে দাঁড়াল, চোখ-মুখ কুঁচকে বলল, “এই মাইয়া এত আগ বাড়াইতেছে ক্যান? নিজের ঘরের খবর রাখো গা আগে! শুনছি বয়স তো কম হয় নাই। তাও জ্ঞান নাই?”
অরণ্যা এবার মাথা তুলল। চোখ দুটো রাগে আর অসহায়তায় ঝলসে উঠছে। “ওকে হাসপাতালে নিতে হবে। এখনই। দাঁড়িয়ে আছেন কেন সবাই?”
একটু নড়াচড়া হলো ভিড়ে। কিন্তু এগিয়ে আসার সাহস কারও নেই। বরং কথাগুলো আরও ধারালো হয়ে উঠল।
“হাসপাতাল নিয়া কী হইব?”
“আগে যা হইবার হইছে।”
“এখন আবার পুরুষ ডাক্তারের সামনে নিবে? লজ্জা নাই!”
অরণ্যার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
“মানুষ বাঁচানো লজ্জার না!” সে প্রায় চিৎকার করেই বলল, “এইটা একটা বাচ্চা মেয়ে!”
ইমনের বাবা সামনে এগিয়ে এলেন। চোখে বিরক্তি, “ইমন তুই অরণ্যারে ঘরে নিয়া যাহ।”
ইমন তখনই এগিয়ে এলো।
“চলো” সংক্ষিপ্ত গলায় বলল সে।
অরণ্যা মাথা নাড়ল, “আমি কোথাও যাব না। আগে ওকে” কথা শেষ হওয়ার আগেই ইমন তার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল। চাপ এতটাই বেশি যে অরণ্যা কেঁপে উঠল। “চুপচাপ চলো,” ইমন ফিসফিস করে বলল। সেই ফিসফিসে ভয় মিশে আছে, হুমকি মিশে আছে। অরণ্যা হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল,
“ছাড়েন! আপনি বুঝতে পারছেন না…. ওই মেয়েটা”
“বুঝার দরকার নাই,” ইমন দাঁত চেপে বলল।
ভিড় থেকে কেউ বলল,
“নিয়া যা, বেশি বাড়াবাড়ি করে।”
“এই বয়সেই এত সাহস! পরে আরও কী করব কে জানে!”
“মেয়েদের লাগাম ধরতে হয়।”
অরণ্যা চারদিকে তাকাল। একবার, শেষবারের মতো। কোনো মুখে সহানুভূতি নেই। কেউ এগিয়ে আসছে না। সবাই শুধু দেখছে। বিচার করছে। আঙুল তুলছে।
তার বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো গলায় এসে আটকে গেল। ইমন তাকে টেনে নিয়ে যেতে শুরু করল। অরণ্যার পা যেন জমে গেছে, তবুও তাকে টেনে হিঁচড়ে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ঠিক তখনই মাটিতে পড়ে থাকা মেয়েটা নড়ল সামান্য। চাদরের ফাঁক দিয়ে তার চোখ ধীরে ধীরে খুলল। অস্পষ্ট, ঝাপসা দৃষ্টি… তবুও খুঁজে নিল অরণ্যাকে।সেই চোখে ছিল না অভিযোগ, না শব্দ।
শুধু একটুকরো মরে যাওয়া আর্তি।
যেন বলছে, “বাঁচান…” অরণ্যার বুকটা কেঁপে উঠল। সে হঠাৎই আরও জোরে ছটফট করতে লাগল।
“আমাকে ছাড়েন! আমি যাব! আমি ওকে”
কিন্তু ইমনের হাত আরও শক্ত হলো।
“চুপ!” সে এবার স্পষ্ট গলায় বলল।
এক ঝটকায় অরণ্যাকে ভিড়ের বাইরে টেনে নিয়ে গেল সে। উঠান, মানুষ, কান্না সব পেছনে পড়ে যেতে লাগল। অরণ্যার চোখ তখনও পিছনে।
সেই মেয়েটার চোখের দৃষ্টি যেন তাকে আটকে রেখেছে। একটা শেষ আশার মতো যেটা সে পূরণ করতে পারল না। এখন সে নিজেকে কি জবাব দিবে? নিজের প্রতি আবারও ঘৃণা জন্মালো বুঝি?
-
সন্ধ্যা নেমে এসেছে অনেকক্ষণ। আকাশের শেষ আলোটুকু মিলিয়ে গিয়ে চারদিক এখন ধূসর অন্ধকারে ঢেকে গেছে। দূরে কোথাও আজানের সুর ভেসে এলো, আবার মিলিয়ে গেল নিস্তব্ধতার ভেতর। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা অরণ্যার ভেতরে নেই তার ভেতরটা এখনও কাঁপছে। সেই বিকেল থেকে তাকে ঘরে আটকে রাখা হয়েছে। সেই থেকে চিৎকার করে দরজা খোলার জন্য বলছে। কিন্তু কোনো সারা নেই। ঘরের দরজাটা বাহির থেকে বন্ধ। অরণ্যা এখনো দরজার পাশে বসে আছে, কখনো উঠে দাঁড়িয়ে ধাক্কা দিচ্ছে, কখনো আবার ক্লান্ত হয়ে মেঝেতে বসে পড়ছে। “দরজা খুলেন! প্লিজ… কেউ দরজা খুলেন!” তার কণ্ঠ ভেঙে গেছে বারবার চিৎকার করতে করতে। কেউ এলো না।
অরণ্যা আবার দরজায় কপাল ঠেকাল। “ওকে হাসপাতালে নেওয়া দরকার ছিল… একটু সাহায্য করলে কী হতো? চোখ বন্ধ করতেই সেই দৃশ্যটা আবার ভেসে উঠল। মাটিতে পড়ে থাকা মেয়েটা…
ফ্যাকাশে মুখ… কাঁপতে থাকা শ্বাস…
আর সেই চোখ… অরণ্যা হঠাৎ চোখ মেলে দিল, সেই দৃষ্টি থেকে সে পালাতে চাইল। কিন্তু পারল না।
মেয়েটার চোখে যে আশাটা ছিল সেটা বারবার এসে তার বুকের ভেতর খোঁচা মারছে। সে নিজের দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরল। “মেয়ে মানুষের জীবন কি এতই সস্তা?” খুব আস্তে করে বলল সে, “একটা মেয়ে চোখের সামনে পড়ে রইল… আর গোটা গ্রাম দাঁড়িয়ে তামাশা দেখল…এরা মানুষ…?” ঠোঁট কেঁপে উঠল, “না অন্য কিছু…” বাইরের ভিড় বাড়ছেই। মেয়েটার পরে কি হলো জানা নেই। চিন্তায় মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ ঘরের নীরবতা ভেঙে টুকটুক করে বেজে উঠল মোবাইলটা। অরণ্যা প্রথমে খেয়ালই করল না। তারপর শব্দটা বারবার কানে এসে লাগতেই সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল। মোবাইলটা মেঝের এক পাশে পড়ে আছে।সে একটু দ্বিধা নিয়ে এগিয়ে গেল, তুলে নিল ফোনটা। স্ক্রিনে আলো জ্বলছে। অরণ্যার চোখ থেমে গেল সেখানে। “তনিমা আপু …” অরণ্যা কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে।
কলটা বেজেই চলেছে…সে আর দেরি না করে কলটা রিসিভ করতেই তনিমা ভাঙা গলা ভেসে এলো। সে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল, “আমাদের তানিশা আর নাই রে। আত্মহত্যা করছে রে অরু। সব শেষ একটা ভিডিওর জন্য জীবনটা শেষ করে দিলো।”
অরণ্যা চুপসে গেল। মাথার ওপর দিয়ে গেল সব। সে এবার একটু রেগে বলল, “এসব কি ধরনের মজা আপা?”
তনিমার গলার কান্না যেন উপড়ে পড়ল এবার৷ “ওই একটা ভিডিও ভাইরাল হওয়াতেই তানিশা গলায় ধরি দিয়েছেরে। আল্লাহ এই কোন পরীক্ষা নিচ্ছো?”
অরণ্যা একটা ঢোক গিলল। মাথার মধ্যে প্রথম যেই প্রশ্ন এলো তা হচ্ছে ভিডিও? সঙ্গে সঙ্গে তনয় জেইদীর মুখটা ভেসে এলো। অরণ্যা ধাক্কা সামলাতে পারছে না। মাথা কাজ করা বন্ধ হয়ে গেছে তার। হঠাৎ দরজাটা খুলে গেল। জুনু দরজার সামনে দাড়িয়ে বলল, “চলো তোমারে তৈয়ার করি।”
অরণ্যার চোখে তখন জল। সে না পারছে কিছু বলতে, না পারছে সইতে। তার বোন? তার বোন আর নেই? কি সব বলল তনিমা আপা? অরণ্যা অসহায় দৃষ্টিতে জুনুর দিকে চাইতেই জুনু বলল, “তোমার বিয়া হইব। একটু পর ইমন ব্যাপারীর বউ হইবা তুমি।”
চলবে?
(সবাই কমেন্ট করবেন, এরপর কি হতে পারে আপনার মতে? সব কি স্বাভাবিক নাকি এর পিছনে কিছু একটা আছে?)