ফন্ট সাইজ:
থিম:
সুইট পয়জন

২য় পর্ব

লেখক: ইশরাত জাহান জেরিন

#সুইট_পয়জন

#ইশরাত_জাহান_জেরিন

#পর্ব_২

সকালের আলোটা চোখে এসে পড়তেই তূর্যার ঘুম ভাঙে। এক মুহূর্তে কিছুই বোঝে না সে। সাদা সিলিং। পরিচিত ফ্যানের ঘুরে চলা ছায়া। নিজের ঘর। নিজের বিছানা। নিঃশ্বাসটা হঠাৎ আটকে যায়। সে হুড়মুড়িয়ে উঠে বসে। বুক ধড়ফড় করছে এমনভাবে, যেন সারা রাত দৌড়ে এসেছে। হাত দু’টো নিজের গলায় চলে যায়। ব্যাথা আছে এখনো। মাথার ভেতর শুধু একটা প্রশ্ন,"সে মরেছে, নাকি মরেনি?" ইনজেকশনটা সে দেখেছিল। নিজের ঘাড়ে ঢুকতে দেখেছিল। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এসেছিল। শ্বাস নিতে পারছিল না।

হৃদপিণ্ডটা থেমে যাওয়ার আগের সেই শূন্যতাটা ওটা কল্পনা হতে পারে? সে নিজের বুকের ওপর হাত রাখে।

হার্টবিট আছে। জীবিত মানুষের মতো। কিন্তু পা দু’টো ব্যথা করছে। হাঁটার ব্যথা না— দৌড়ে পালানোর ব্যথা।

এই ব্যথা মিথ্যা না। সে আঙুল বুলায় পায়ের কাটা দাগে।

শুকনো রক্তের রেখা। স্বপ্ন হলে শরীর এত নিখুঁতভাবে মনে রাখে কীভাবে? তূর্যা চোখ বন্ধ করে গত রাতটা টেনে আনে। জঙ্গল, পাতার গন্ধ, রক্তের উষ্ণতা লোকটার নিঃশ্বাস। সবকিছু এত স্পষ্ট যে ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাহলে প্রশ্নটা বদলাতে হয়। আমি বেঁচে আছি কেন? সে জানে ইনজেকশনটা ঘুমের ছিল না।

ওটা ছিল তাকে শেষ করার জন্য। লোকটার চোখে দয়া ছিল না। তূর্যার মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে।

“সে যদি আমাকে মারতে না চায়… তাহলে আমাকে ছেড়ে গেল কেন? আর যদি মারতেই চায়…তাহলে আমি এখানে কীভাবে?”

তূর্যা ঘড়ির দিকে তাকায়। আজকে তার ক্লাস মিস হয়ে গিয়েছে। তার বাড়িটা একেবারে পাহাড় আর সমুদ্রের সাথেই। এখান থেকে যেমন সমুদ্র দেখা যায় তেমনই পাহাড়। এই কাঠের দোতলা বাড়িতে সে ছাড়া আর কেউ থাকে না। এই বাড়ির মালিক বৃদ্ধ, অনেক আগেই মারা গেছে। আগেও এই বাড়িতে মহিলা থাকতে না। এটা তার সামার হাউজ ছিল। বৃদ্ধ মহিলা তূর্যাকে একেবারে সস্তায় ভাড়া দিয়েছিল বাড়িটা। তার মৃত্যুর পর তূর্যার বাড়ি ভাড়ার টাকাটা বেঁচে গিয়েছে। এক বছরের মতো হয়েছে মহিলাটা মারা গেছে। সেই থেকে কেউ টাকার জন্য আসে না। তূর্যা একবার শুনেছিল বৃদ্ধর নাকি কেউ নেই দুনিয়ায়।

এখন বার্সেলনায় গ্রীষ্মকাল চলছে। তূর্যার বাড়ির জানালা দিয়ে সকালের নরম আলো ঢুকছে।

বার্সেলোনা জেগে উঠছে একদম স্বাভাবিকভাবে।

অথচ তূর্যার শরীর স্বাভাবিক নেই।সে ধীরে ধীরে পা নামায় বিছানা থেকে। মেঝেতে পা পড়তেই মুখ কুঁচকে যায়। ব্যথা করছে। একদম সত্যি ব্যথা। হাঁটুর নিচে, পায়ের পাতায় গত রাতের সেই দৌড়ের ব্যথা এখনো রয়ে গেছে। তূর্যা নিজের পায়ের দিকে তাকায়। ছোট ছোট কাটা দাগ। শুকনো রক্তের রেখা। তার মাথার ভেতরটা আবারও ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে। “স্বপ্ন হলে… এগুলো এল কোথা থেকে?” বাথরুমের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সে। চুল এলোমেলো। চোখের নিচে তার কালচে দাগ পড়েছে। আর চোখ? তার হ্যাজেল চোখে এখনও তীক্ষ্ণতা স্পষ্ট। ঘাড়ের পাশে আঙুল ছোঁয়াতেই সে কেঁপে ওঠে। একটা ছোট লাল দাগ। ইনজেকশনের দাগ। তূর্যা আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ।

নিজেকে চিনতে পারছে না। “আমি এখানে কী করে এলাম? বাড়ি কি করে এলাম? কি হয়েছিল আমার সাথে? বাঁচলাম কী করে? এটা আদৌও কী সম্ভব?" পরক্ষণেই নিজের ওপর বিরক্তি এসে পড়ে। ধ্যাত, এসব কী ভাবছে সে! নিজে কীভাবে বেঁচে বাড়ি ফিরল, সেটাই তো এখনো পরিষ্কার নয়। সেখানে আরেকজনের কথা ভাবার শক্তি তার কোথায়? একটা দীর্ঘ শাওয়ার নিয়ে বাইরে বের হয় তূর্যা। ঘড়িতে চোখ পড়ে। বেলা গড়িয়ে গেছে। পেটটা খিদেয় মোচড় দেয়, অথচ কিছুই খাওয়া হয়নি। ঠিক তখনই মনে পড়ে, ঘরে তো কোনো বাজারই নেই। বোনের ডেলিভারির আগে বাংলাদেশ গিয়েছিল সে। তারপর একের পর এক ঘটনার ভিড়ে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। কামাই করা টাকাগুলো যাতায়াতেই শেষ। তবু নিরাশা গিলে সে নিচে, কিচেনের দিকে যায়।

ঘরটা গুমোট। পুরো বাসাটা পরিষ্কার করা দরকার। কত ঝামেলা! তার ওপর আজ থেকেই আবার কাজে ফিরতে হবে। তূর্যার দুটো পার্ট-টাইম জব। সব সামলে বাড়ি ফিরতে ফিরতে কখনো সন্ধ্যা, কখনো রাত হয়। সেই সময় এসে রান্না করার ইচ্ছা আর থাকে না। তাই প্রায়ই ফেরার পথে কিছু খেয়ে নেয়। সস্তা কিন্তু লোভনীয়, তার প্রিয় চিকেন স্যান্ডউইচ। কিন্তু এখন পরিস্থিতি আলাদা। হাতে টাকা নেই বললেই চলে। রোজ রোজ বাইরে খাওয়ার সুযোগ নেই। যা আছে, হিসেব করে বাজার করতে হবে, রান্না চাপাতে হবে, তারপর তৈরি হয়ে কাজে বেরোতে হবে। তার ওপর ঘরটার অবস্থা দেখে বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। এই মুহূর্তে সত্যিই কান্না পাচ্ছে তার। কিন্তু কাঁদার সময়ও নেই। আর এই দুনিয়ায় কেঁদে কেউ কিছু পায় না মানুষ কাঁদে তখনই, যখন কিছু হারিয়ে যায়।

তূর্যা ফ্রিজ খুলে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে।

ফ্রিজ ভরতি মাছ-মাংস, ফলমূল এমনকি ভালোভাবে বাঁচতে একজন সুখী মানুষের যা যা প্রয়োজন, সবই সেখানে সাজানো। মুহূর্তের মধ্যে মাথার ভেতরটা ঝিম ধরে যায়। কীভাবে সম্ভব? এসব কী হচ্ছে তার সঙ্গে?

এইবার সত্যিই মনে হয়, তূর্যা পাগল হয়ে যাবে। আর নেওয়া যাচ্ছে না, একদমই না।

হঠাৎ করেই বাড়ির কলিং বেলটা বেজে ওঠে।

তূর্যা চমকে ওঠে। এই সময় কে আসতে পারে? কারও আসার কথা তো নেই। বুকের ভেতরটা অকারণেই কেঁপে ওঠে। তবু চিন্তা চেপে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোয় সে। তালা খুলে দরজা মেলতেই শূন্য করিডোর। চারদিকে কেউ নেই। ঠিক ফিরে যেতে যাবে, তখন চোখে পড়ে দরজার সামনেই একটা খাম। নিখুঁতভাবে ভাঁজ করা। তূর্যা চারপাশে তাকায়। কেউ নেই, কোনো পায়ের শব্দও না। খামটা হাতে নিতেই অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে আঙুল বেয়ে। কে রেখে গেল? কখন?

ভেতর থেকে ছোট একটা চিঠি বের করে সে।

লেখাটা পরিষ্কার। "মে মাই অ্যারাইভাল ইন ইয়োর লাইফ বি অ্যাজ বিউটিফুল অ্যাজ ইউ আর। উই উইল মিট এগেইন ভেরি সুন। মাই সুগারপ্লাম।"

তূর্যা মুহূর্তেই কেঁপে উঠল। আবারও সেই ডাক। একই সম্বোধন, ঠিক যেভাবে সেই কালো ভ্রমর চোখের অধিকারী মানুষটি তাকে ডেকেছিল। ভয়ের ধাক্কায় দরজার কাছেই সে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। কী হচ্ছে এসব? এখন তার নিজের অস্তিত্ব নিয়েই সন্দেহ জাগছে। সে কি সত্যিই বেঁচে আছে, নাকি সবকিছু মৃত্যুর পরের কোনো বিভ্রম? হাঁপাতে হাঁপাতে তূর্যা দ্রুত ঘরে ঢুকে পড়ল। মাথাটা ঝিমঝিম করছে, চারপাশটা ঘুরছে। এখানে আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি নেই। দৌড়ে রুমের দিকে যেতে নিতেই ফোনে কল বেজে উঠল। নাম্বার দেখে বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়টা একটু হলেও হালকা হলো। কাজের জায়গা থেকে ফোন। তাকে এখনই বের হতে হবে। কিছু খাওয়ার সুযোগও হলো না। খালি পেটেই তাড়াহুড়ো করে তৈরি হয়ে সে কাজে বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু সঙ্গে করে নিয়ে গেল না সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর সেগুলো পড়ে রইল বাড়িতেই। আচ্ছা উত্তরের ওপাশে আসলে কে দাঁড়িয়ে আছে?

-

বার্সেলনার সমুদ্রতীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে এই ক্যাফেটেরিয়াটা। ক্যাফের নাম "ব্লু ওসান"। পুরোনো ইউরোপিয়ান ডিজাইনে ডেকোরেশন করা। দেয়ালের গায়ে ঝোলানো সাদা-কালো ছবি। পুরোনো নাবিক, সমুদ্রযাত্রা, প্রেমিক যুগল সবকিছুই নিয়েই এই ক্যাফে। জায়গায়টা এমনিতে শান্ত থাকে, কিন্তু আজ নয়।

আজ সমুদ্র মানুষ টেনে এনেছে। টুরিস্টে ভরা। আর সেই ভিড়ের মাঝখানে তূর্যা কাজ করে যাচ্ছে। আজ কাজের চাপ অস্বাভাবিক। এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ছুটছে সে।কেউ এসপ্রেসো চায়, কেউ ক্যাপুচিনো, কেউ আবার সামুদ্রিক খাবার।

“মিস, ওয়ান মোর কফি!”

“এক্সকিউজ মি!”

“হেই, এখানে!” ডাকের শেষ নেই। তার পাশে আরেকজন কাজ করে৷ নাম তার আলেজান্দ্রো। স্পেনের একটা গ্রামে জন্মগ্রহণ তার। চুপচাপ, শান্ত স্বভাবের ছেলে। চোখে সবসময় এক ধরনের চিন্তিত ভাব থাকে। তূর্যার গ্লাস ফসকে গেলে সে আগেই এগিয়ে আসে। ভারী ট্রে তুলতে গেলে সে ধরে নেয়। হাত কেটে গেলে ন্যাপকিন এনে দেয়, কিছু বলা লাগে না তাকে।

আজ সে ছায়ার মতো তূর্যার পেছনে পেছনে আছে। তূর্যা একটু কাজ করছে, একটু দাঁড়াচ্ছে। আলেজান্দ্রোর বুঝতে বাকি রইল না মেয়েটার শরীর খারাপ। সে তূর্যাকে বলল, “তুমি একটু বসো, আমি এই টেবিলটা সামলাই। পানি খাও, তূর্যা। তোমার মুখটা লাল হয়ে গেছে।” তূর্যা হালকা হাসে, কিন্তু বসার সময় নেই।

সূর্য ধীরে ধীরে সমুদ্রে ডুবে যায়। আকাশ কমলা থেকে বেগুনি হয়ে ওঠে। ক্যাফেতে বাতি জ্বলে ওঠে। হালকা হলুদ আলোয় জায়গাটা আরো উষ্ণ লাগে। কিন্তু ভিড় কমে না। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। শেষ দিকের কয়েকটা টেবিলে কিছু মাতাল, বেহায়া টাইপ লোক বসে আছে।

তাদের চোখ তূর্যার উপর অস্বস্তিকরভাবে থেমে থাকে।

একজন বিশেষভাবে একটু বেশিই অসভ্য ধরনের লোক। চওড়া কাঁধ, অর্ধেক খোলা শার্ট। প্রচন্ড মাতাল সে। তূর্যা বিল দিতে যায় তাদরেকে। হঠাৎ লোকটি তাকে বলে, “কফিটা ভালো ছিল… কিন্তু তোমাকে আরো ভালো লাগছে।”

তূর্যার শরীরটা কেঁপে ওঠে। “স্যার, বিলটা।"

লোকটা হেসে চেয়ারের কাছে ঝুঁকে পড়ে। “তুমি চাইলে রাতটা আমার সাথে কাটাতে পারো। টাকা কোনো ব্যাপার না।” তার হাত এগিয়ে আসে। খুব কাছাকাছি।

তূর্যার বুকের ভেতর হাহাকার ওঠে। চারপাশে মানুষ আছে। শব্দ আছে। কিন্তু কেউ দেখছে না। কণ্ঠ আটকে যায় তার। ভয়, অপমান, লজ্জা একসাথে গিলে ফেলে তাকে। “স্যার… প্লিজ…” লোকটা হাসে।

“এত ভাবছ কেন? এইসব মেয়েরা তো এমনই হয়।” তূর্যার চোখে পানি চলে আসে। কিছু বলতে চায়।

চেঁচাতে চায়। কিন্তু ‘কাস্টমার’ শব্দটা গলার ওপর পাথরের মতো চেপে বসে। আলেজান্দ্রো দূর থেকে সব দেখে ছুটে আসতে চায়। কিন্তু মালিকের কড়া চোখে আটকে যায়। লোকটা শেষে টাকা ছুঁড়ে দিয়ে উঠে যায়।

“ভেবেছিলাম বার্সেলনাতে মেয়েরা একটু স্মার্ট হয়।”বলেই সে সিগারেট ধরাতে ধরাতে চলে যায়৷ তূর্যার হাত কাঁপছে। ট্রেটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। লোকটা যেতেই আলেজান্দ্রো কাছে এসে বলল, “তুমি ঠিক আছো?”

তূর্যা মাথা নেড়ে কিছু বলার চেষ্টা করে… পারে না।

চোখের পানি চুপচাপ গড়িয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর সে সাহস করে মালিককে জানায়। কিন্তু মালিকের মুখে বিরক্তি। “কাস্টমারকে অসন্তুষ্ট করেছ তুমি। এভাবে নাটক করলে এখানে কাজ করা যাবে না। কাল থেকে আর আসবে না।” একটা বাক্যে তার চাকরি শেষ।

তূর্যা কি হেরে যাচ্ছে? সে তো এত দূর্বল না। না কখনো ছিল, কিন্তু ইদানীং তার সাথে কি হচ্ছে এসব? তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। এই চাকরিটা চলে গেলে তার কাছে করার মতো কিছুই থাকবে না। তখন সে চলবে কি করে? আলেজান্দ্রো এগিয়ে এলো। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, "আমি মালিকের সাথে কথা বলছি তুমি বাড়ি চলে যাও। আর হ্যাঁ শুনো, কিচ্ছু হবে না। সব ঠিক হয়ে যাবে।"

তূর্যা ওয়াশরুমে গেল। ওই জানোয়ার লোকটা তার গায়ে কেবল মাত্র একটা আঙুল ছুঁইয়েছে। তাতেই কি বিশ্রী রকমের অনূভুতি হচ্ছে। সে ভালো করে স্পর্শ

করা জায়গাটা পানি নিয়ে পরিষ্কার করল। মুখটা পানি দিয়ে ভালো করে শুয়ে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে বলল," এই জীবনের কোথাও একফালি সুখ নেই কেন? সুখের মূল্য বাজারে এতটাই বেশি যে ধনীরাও চাইলে কিনতে পারে না, গরীবেরা তো সুখের স্বপ্নই দেখে না। আর মধ্য বিত্ত সুখের স্বপ্ন দেখতে দেখতেই মরে যায়।"

ক্যাফের থেকে তাড়াহুড়োয় বের হতেই কার সঙ্গে যেন একটা ধাক্কা খেল তূর্যা। চোখে তার পানি। নিচের দিকে তাকিয়ে সরি চেয়ে সোজা হাঁটা শুরু করল। তবে পেছন ফিরে হঠাৎ একবার দেখল। কালো হুডি পড়া একটা লোক। সে কথা না বলে সরাসরি চলে গেল। যাওয়ার সময় ভাবল, "ইশ কেমন মানুষ, সরি চাইলাম একবার ইট’স ওকেও বলল না।"

-

বাসায় ফিরে তূর্যা নিজেই খাবার তৈরি করল। ফ্রিজ থেকে বাজার বের করে চুপচাপ রান্নায় মন দিল। এখন তার অত ভাবার শক্তি নেই এই সব জিনিস এল কোথা থেকে, কে রেখে গেল। আপাতত শুধু পেট ভরলেই হলো। খেয়ে এক বোতল পানি হাতে নিয়ে দোতলায় উঠে গেল সে। তার ঘরের বারান্দা থেকে সমুদ্র দেখা যায়। রাত নামলেই ঢেউয়ের গর্জন বাড়তে থাকে। ভারী শব্দে চারপাশ ভরে ওঠে। অথচ আজকাল কিছুই আর ভালো লাগে না তার। শরীর ক্লান্ত, মনটাও অদ্ভুতভাবে ভারী। ফোনে এলার্ম সেট করে সে শুয়ে পড়ল। তূর্যা সাধারণত ঘরের দরজা লক করে ঘুমায় না। আজও তাই করল। চোখ মাত্র বন্ধ করেছে, এমন সময় স্পষ্ট যেন কারও পায়ের শব্দ কানে এলো। এই বাড়িতে আগে কখনো এমন অদ্ভুত কিছু ঘটেনি। শহরের শেষ প্রান্তে তার বাসা। চারপাশটা প্রায় গ্রাম্য। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ির দূরত্বও বেশ। আশেপাশে কারা থাকে, তূর্যা ভালো করে দেখেওনি কখনো। সে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। মুহূর্তেই চারপাশ আরও নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তূর্যা জানে নিস্তব্ধতায় সামান্য শব্দও যে ভয়ের মতো লাগে। কিন্তু পাশ ফিরতেই পায়ের শব্দটা যেন আরও স্পষ্ট হলো। হৃদপিণ্ড দমকে উঠল। তূর্যা ঝট করে উঠে দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিল। তারপর সব স্বাভাবিক। কোনো শব্দ নেই। কোনো নড়াচড়া নেই। শুধু সমুদ্রের দূরের গর্জন। ধীরে ধীরে চোখ ভারী হয়ে এলো। ক্লান্তি তাকে টেনে নিল গভীর ঘুমের ভেতর।

-

মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে। চারপাশ নিস্তব্ধ। তূর্যা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। হঠাৎ ভেতর থেকে বন্ধ করা দরজাটা নিঃশব্দে খুলে যায়। কীভাবে খুলল। সে রহস্য একমাত্র দরজা খোলা সেই মানুষটিই জানে। লোকটি ধীরে, একেবারে প্রায় ছায়ার মতো ঘরের ভেতর প্রবেশ করে। জানালা গলে চাঁদের আলো এসে পড়েছে তূর্যার মুখে। আলোয় তার ঘুমন্ত মুখটা নিষ্পাপ দেখাচ্ছে। লোকটি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে। তারপর আলতো করে তার ঠোঁটে স্পর্শ করে। তূর্যার শরীর সামান্য নড়ে ওঠে। কিন্তু ঘুম ভাঙে না। লোকটি ধীরে ধীরে তার চুলে হাত বুলায় অস্বাভাবিক যত্নে। হঠাৎ তার আঙুল গিয়ে থামে ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে ক্যাফেতে ওই বদমাশ লেকটা স্পর্শ করেছিল। সে সেখানে তাকিয়ে থাকে দীর্ঘক্ষণ। তারপর দৃষ্টি আবার ফিরে যায় তূর্যার ঠোঁটে। নিম্নস্বরে বলে ওঠে, “আমার জন্য যা নির্ধারিত, আমি সেটাই নিজের করে নিই। খুব শিগগিরই তুমি কেবল আমার হবে, সুগারপ্লাম।” ঠিক তখনই তূর্যার ঘুম ভেঙে যায়। তার বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে। স্পষ্ট অনুভব হয়, এই ঘরে কেউ ছিল। সে ঝট করে উঠে আলো জ্বালায়। কিন্তু কেউ নেই। ঘরের দরজাও বন্ধ। যেমন ছিল তেমনই। নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করে, হয়তো স্বপ্ন। তবু শরীরের ভেতর ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। মধ্যরাতে তার ক্ষুধা লাগে প্রায়ই। এই কারণেই সে এমন সময়ে জেগে উঠতে চায় না। হাই তুলতে তুলতে সাদা নাইটি পরে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে। ঠিক তখনই।কলিং বেল বেজে ওঠে। এই গভীর রাতে? বুকের ওপর আবার আতঙ্ক চেপে বসে। সকালে ঘটে যাওয়া ঘটনা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তবু সাহস জোগাড় করে দরজার দিকে এগোয় সে। দরজা খুলতেই আবার দেখে একটা খাম পড়ে আছে। কিন্তু এবার খামটা ভেজা। তূর্যা চারপাশে তাকায়। কেউ নেই। দ্রুত খামটা তুলে নেয়। হাতের ভেতর অস্বস্তিকর এক ঠান্ডা ভাব। খাম খুলে ভেতরে হাত ঢোকাতেই হৃদয় থেমে যাওয়ার উপক্রম। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে একটা কাটা আঙুল। তূর্যা মুহূর্তে পাথরের মতো স্থির হয়ে যায়। নিজের হাতের দিকে তাকায়, সেথায় রক্ত লেগে গেছে।গলা পর্যন্ত বমি উঠে আসে। তবু নিজেকে সামলে নেয়। কাঁপতে কাঁপতে খামের ভেতর থেকে চিঠিটা বের করে। তাতে স্পষ্ট লেখা, “আমার সুগারপ্লামের নামটাও কেউ উচ্চারণ করুক আমি চাই না। সেখানে তাকে স্পর্শ করা তো দূরের কথা। নিজের যত্ন নাও, সুগারপ্লাম।

পুরুষ মানুষ থেকে মেপে মেপে দূরে থাকবে। কারণ আমি চাই না পরের বার কেউ তোমার দিকে বাজে চোখে তাকাক, আর তার বদলে তার দু’খানা চোখ

তোমার বাড়িতে মধ্যরাতে পৌঁছাক।”

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন