Forever Mine
Israt Jahan probah
.৪
(ভয়ানক সেই রাত/ অতীতের দ্বিতীয় অংশ)
[এইখানে অনেক বাজে ভায়োলেন্স শব্দ থাকবে এন্ড এইখানে অনেক ভয়ানক দৃশ্য থাকবে যদি অস্বস্তি লাগে এড়িয়ে যেতে পারেন]
⚠️অনুমতি ছাড়া কপি করা নিষিদ্ধ ⚠️
আপু আজকে আমাকে স্কুলে নিয়ে যাবি আমার না আজকে একা একা যেতে ইচ্ছে করছে না একটু নিয়ে যা না আপু। নরম গলায় চৌদ্দ বছরের জাফা জারিনের হাত ধরে টেনে ধরে কথাটা বলে।
জারিন ভার্সিটির উদ্দেশ্য তৈরি হতে হতে ব্যস্ত কণ্ঠে বলে,, ঢং করিস না তো সব সময় আমার মাথা খেয়ে এখন আসছে আমাকে নিয়ে যা না আপু বলতে" এই তোর মতলব টা কি রে শুনি আর এমনিতেও আজকে আমি যেতে পারবো না আমার আজকে ভার্সিটিতে টেস্ট এক্সাম So“I can’t go anywhere with you.” bye শার্ট এর হাতা ফুল্ড কোর্ট করতে বের হয়ে জারিন।
জাফা আর কিছু না বলে মন মরা হয়ে ড্রেস পরে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে তার মা কে ডাক দিয়ে বলে ,,, আম্মু আমি গেলাম,
স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়ে যায় তার মায়ের উত্তর এর অপেক্ষা না করে।
বিকেল ৪:৩০ মিনিটে স্কুল ছুটি হয়ে যায়, যে যার বাসার উদ্দেশে রওনা দেয় জাফা বাড়ির দিকে না গিয়ে একা বারান্দায় গালে হাত দিয়ে বসে আছে।
দারোয়ান গেইট বন্ধ করতে এসে দেখে জাফাকে এইভাবে বসে থাকতে দেখে দারোয়ান জাফা দিকে যেত থাকে।
জাফার কাছে গিয়ে দরোয়ান বলেন,, মা জাফার বাসায় না গিয়ে এইখানে এইভাবে একা বসে আছো কেন?
আমার পেটে ব্যথা করতেছে আঙ্কেল হাঁটতে পারছি না পা গুলো কেমন যেন কামড়াচ্ছে আর ব্যথা করছে তাই এইখানে বসেছি যদি একটু ভালো লাগে তাহলে আমি বাসায় চলে যাবো আঙ্কেল। মিষ্টি হেসে উত্তর দেয় জাফা।
ঠিক আছে মামনি তুমি বের হওয়ার সময় আমাকে ডাক দিও আমি তোমাকে বাড়ির রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দিবো কেমন। দারোয়ান আঙ্কেল কথাটা বললে জাফা দুদিকে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে।
ডোর বেল বাজতেই নাজিয়া বেগম দরজা খুলে দেন , তাকিয়ে দেখেন পাশে ক্লান্ত শরীর নিয়ে দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তারেক রহমান।
নাজিয়া বেগম উৎকণ্ঠে বলে,, কি হয়েছে আপনার শরীরের এই অবস্থা কেন? বলেই নাজিয়া বেগম এগিয়ে গিয়ে তিনি কাঁধে হাত বাড়িয়ে দিয়ে সাবধানে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেন।
জারিনের মা আমার প্রেসার টা একটু মাপো তো মনে হচ্ছে কমে গেছে। তারেক রহমান কথাটি বলেন। নাজিয়া বেগম ও ব্যাক ড্রয়ার থেকে প্রেসার মেশিন টা বের করে মাপতে থাকেন।
সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে শীতল বাতাস বইতে শুরু করেছে। বারান্দার আলোটা টিমটিম করে জ্বলছে। জাফা এখনও সেই একই জায়গায় বসে আছে। পেটের মোচড়ানো ব্যথাটা একটুও কমেনি, বরং সময়ের সাথে সাথে আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। পা দুটো যেন অবশ হয়ে আসছে। দারোয়ান আঙ্কেল চলে যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিলেন, কিন্তু জাফা তাকে আর ডাকতে চায়নি; ভেবেছিল একটু বসলেই হয়তো ব্যথা কমে যাবে। কিন্তু ব্যথা কমার বদলে তার চোখের সামনে সব কিছু যেন কেমন যেন অন্ধকার হয়ে আসছে। দুর্বল শরীরটা আর টেনে নিতে পারছে না সে।
রাস্তা পার হওয়ার সময় একটি কার এর সাথে ধাক্কা লাগে জাফার এমনিতেই শরীরের ব্যথায় হাঁটতে পারছিল না মেয়েটি এখন আবার পরে গিয়ে হাত পায়ের অংশ ছিলে গেছে। ব্যথায় চুপচাপ চোখের পানি ফেলতে ফেলতে উঠে দাঁড়াতেই খুব কষ্ট হচ্ছিল তও কোনরকম গাড়িটা পার করে থেমে থেমে যেতে থাকে।
গাড়িতে বসে থাকা একজোড়া চোখ জাফার দিকে কু দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল যা সে জানতো না জাফাঁকে চলে যেতে দেখে এই অগন্তকটি গাড়ি থেকে নেমে জাফার সামনে এসে অন্তত নমনীয় গলায় বলে,, ইশ খুব ব্যথা পেয়েছো আমি ড্রাইভার এর পক্ষ থেকে ক্ষমা চাচ্ছি আমাকে করে দাও। আসলে ও নতুন তো বুঝতে পারেনি।
জাফা লোকটির দিকে তাকিয়ে ভদ্র ভাবে বলে,, না না সমস্যা নেই বলেই জাফা হাঁটতে থাকে।
লোকটি আবারও জাফার পিছে পিছে এসে তাকে বলে,, তুমি তো ব্যথা পেয়েছো মেয়ে চলো আমি তোমাকে তোমার বাসা পর্যন্ত ড্রপ করে দেই।
জাফা মুখের উপর বলে দেই,, না না আঙ্কেল আমি যেতে পারবো আপনি যে বলেছেন এতেই অনেক ধন্যবাদ আমি চলে যেতে পারবো আপনাকে কষ্ট করতে হবে না।
লোকটি তো জাফার পিছন ছাড়ছেই না শেষে রেগে চিৎকার দিয়ে বলে উঠে,,, এই মেয়ে বলতেই জাফা ভয়ে জড়সড় হয়ে থেমে যায়। আসে পাশে তাকিয়ে দেখে কোনো লোকজন নেই রাস্তা খালি ,যদিও সে জানে এইসময়ে তেমন কোনো মানুষের আনাগোনা থাকে না।
জাফা বিরক্তিতে লোকটিকে বলে উঠে,, দেখুন আঙ্কেল আমি তো বলছি আমি আপনার সাথে যাবো না কেন জোর করছেন আপনি চলে যান আমি যেতে পারবো আমাকে .... কথাটা শেষ করতেও পারেনি জাফা তার আগেই ওই লোকটি আগেই তার এক লোক কে ইশারা করতেই এই এসে জাফার মুখ চেপে ধরে গাড়িতে টেনে হিঁচড়ে উঠিয়ে নিয়ে চলে যায়।
এদিকে ঘরে তখন অন্য এক পরিস্থিতি। তারেক রহমানকে স্যালাইন খাইয়ে কিছুটা সুস্থ করার পর নাজিয়া বেগমের হঠাৎ খেয়াল হলো—
— "ওমা! জাফা তো এখনও স্কুল থেকে ফেরেনি! এত দেরি হওয়ার তো কথা নয়!"
আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা নিয়ে নাজিয়া বেগম দ্রুত ড্রয়িংরুমে এলেন। ঠিক তখনই ভার্সিটি থেকে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরল জারিন। দরজায় এসেই মায়ের মুখ থেকে শুনল জাফা এখনো ফেরেনি।
জারিন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল ঘড়িতে প্রায় সাড়ে সাতটা বাজে। তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সকালবেলা স্কুলে যাওয়ার জন্য করা জাফার সেই আকুতি আর নিজের ঝামেলার কথা মনে পড়ে গেল। অপরাধবোধে তার গলা শুকিয়ে এল।
জারিন কাঁপতে কাঁপতে বলল—
— "আম্মু... সকালবেলা ও যখন একা যেতে ভয় পাচ্ছিল, তখন যদি আমি জেদ না ধরে সাথে চলে যেতাম, তবে তো এই অবস্থা হতো না! আমি এখনই স্কুলে যাচ্ছি খুঁজতে।"
তারেক রহমান অসুস্থ শরীর নিয়েই কোনোমতে ড্রয়িংরুমে এসে বললেন, "দ্রুত দেখ কোথায় আছে মেয়েটা, দারোয়ানকে নিয়ে চারপাশ খোঁজ করো।"
জঙ্গলের পাশ ঘেষে একটি কালো রঙের গাড়ি দার করানো হয়েছে।
এইপাশে কোনো মানুষের চলাফেরা নেই দূরে শিয়াল এর ডাক আর কুকুরের ঘেঁউ ঘেউ ডাক শুনা যাচ্ছে।
গাড়িটি থেকে একটু দূরে একটি মেয়ের কান্না মিশ্রিত চিৎকার শুনা যাচ্ছে ,,,, আর কিছু বুঝা যাচ্ছে না।
জারিন ব্যাগ সোফায় ছুঁড়ে মারে দৌড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।
নাজিয়া বেগম পেছন থেকে ডেকে উঠেন,, জারিন একা বাহিরে জাস নে আমি আসতেছি দাড়া।
জারিন হাত দিয়ে থামিয়ে বলে,, না মা আমি একা যাচ্ছি না রিসা জাস্টিন আসবে আমি কল দিয়েছি রাস্তায় আছে চলে আসবে তুমি আব্বু পাশে থাকো আমি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবো বলেই জারিন বাড়ির গেইট পেরিয়ে রাস্তায় উঠে পড়ে,,,
একটু দূরে যেতেই রিসা জাস্টিন কে দেখে জারিন দৌড়ে তাদের কাছে যায় রিসা গিয়ে জারিন কে জড়িয়ে ধরে।
রিসা কে জারিন ফুপিয়ে কেঁদে উঠে,,, রিস রিসা আমার বোনটা কে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না কথায় গেল ও তো এমন কখনোই করে না আমার খুব ভয় লাগছে রে রিসা।
জাস্টিন ব্যস্ত কণ্ঠে বলে ,,, জাফার কোনো খবর পেয়েছিস কি?
জারিন না সূচক মাথা নাড়ে,,,
রিসা জারিন কে শান্ত করতে করতে বলে,, জাস্ট রিল্যাক্স কিচ্ছু হবে না জাফার সাথে তুমি ঘাবড়ে যাচ্ছিস কেন একটু শান্ত হ আমরা খুঁজে বের করবো থাম একটু নে একটু পানি খা।
বলেই জারিন কে পানি খাইয়ে শান্ত করে। জারিন পানি খেয়ে রাস্তায় বসে পড়ে রিসা ও গিয়ে বসে পড়ে।
রিসা জারিনের কাঁধে হাত রেখে চিন্তিত কণ্ঠে বলে,, জাফা তো স্কুলে থেকেই এই তো আর আসে নাই তাইনা ?
জারিন হ্যাঁ বলে,,
জাস্টিন এবার এসে বলে,, চল তাহলে আমরা স্কুলের দিকে যায়।
জারিন উঠে নিজের চাদর ঠিক করে তারাহুরো করে যেতে থাকে জাফার স্কুলের দিকে।
স্কুলের গেইটে সামনে তালা জুলছে এটা স্বাভাবিক কারণ এখন সন্ধ্যে ছয়টা ওপরে বাজতে চলল এম সময় স্কুল বন্ধ থাকাটাই স্বাভাবিক।
জারিন আসে পাশে তাকিয়ে সামনে চায়ের দোকানে দিকে দৌড়াতে থাকে পিছনে রিসারাও আসতে থাকে।
জারিন সেখানে গিয়ে একজন লোক কে ডাক দিয়ে বলে,,
আঙ্কেল স্কুল আজকে কয়টায় ছুটি হয়েছে বলতে পারবেন?
দোকানদার বলেন,, ঐতো সব সময় যেই সময়ে বন্ধ করে ওই সময় এই তো করছে হেরা,,,,
জারিন উৎকণ্ঠে বলে উঠে,, আচ্ছা আঙ্কেল একটি মেয়েকে দেখেছেন স্কুল থেকে বের হতে সবার সাথে ইয়ে মানে শুকনো আর দুইদিকে বেনি করা লম্বা এমন কোনো মেয়ে দেখেছেন ?
মা আইহানে কোট মানু আইয়ে কইডারে দেহুম সবাই তো একই লাগে ,
তিনি বলেন।
জারিন নিরাশ হয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে মাটিতে বসে চিৎকার করে উঠে,,, আল্লাহ আমার বোন টা কোথায় আমার সোনা টা কে খুঁজে দাও না আল্লাহ আমার কলিজা টা কে খুঁজে দাও না আল্লাহ বলেই মুখে হাত দিয়ে হু হুঁ করে কেঁদে উঠে জারিন।
রিসা দৌড়ে এসে জারিন কে উঠিয়ে নিয়ে একপাশে গিয়ে নিজেও কান্না ভেজা গলায় বলে ,,, নিজেকে সামলা জারিন এইভাবে ভেঙে পরিস না please জাফার কিছু হবে না আমরা খুঁজে নিবো তো ?
আমাকে আমাকে বলেছিল আজকে ওর সাথে স্কুলে যেতে আমি আমি যাইনি আমি কি রাগ করে বের হয়ে এসেছি আমি আমি কি করবো বল না আমার বোন কে এনে দে না আমার বোন আমার বোন বলেই জারিন আবারও ফুপিয়ে উঠে।
জাস্টিন জারিনের কাছে এসে বলে ,,, এইখানে দাঁড়িয়ে থাকলে কিছু করা সম্ভব না চল ওই দিক টাই দেখি যদি থাকে । বলেই হাতের ইশারা করে স্কুলের অন্য পাশের রাস্তার দিকে।
রিসা বিরক্তি কণ্ঠে বলে ,, ফাইজলামি করছস কেন ? ও একটা বাচ্চা ওইদিকে কেন যাবে ওইদিকে তো জঙ্গল।
জাস্টিন বলে ,,, এই আবাল ওইদিকে থাকুক বা না থাকুক যেতে সমস্যা কি? বলেই জারিন কে নিয়ে জাস্টিন যেতে থেকে।
তাদের পিছনে পিছনে রিসা ও যেতে থাকে।
বাতাসের তীব্রতা ধীরে ধীরে বাড়ছে। চারপাশটা যেন আরও বেশি নিঃঝুম হয়ে আসছে। জঙ্গলঘেঁষা নির্জন রাস্তাটার অন্ধকারে একটা কালো রঙের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এই এলাকায় এই সময়ে মানুষের কোনো চলাচল থাকে না বললেই চলে। দূরে শেয়ালের হেসার আর কুকুরের একটানা ঘেউ ঘেউ শব্দ রাতের নিস্তব্ধতাকে আরও বেশি আতঙ্কজনক করে তুলেছে।
গাড়িটার দরজা সশব্দে বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো। তার একটু দূরেই একটা তরুণীর চাপা কান্না আর আর্তনাদ বাতাসে ভেসে আসছে, কিন্তু সেই আর্তনাদ থামানোর কেউ নেই। নরপিশাচগুলোর কাছে এক অবুঝ কিশোরী তখন পুরোপুরি জিম্মি। জাফার পিরিয়ডের শারীরিক দুর্বলতা আর অসহ্য পেটের ব্যথা ইতোমধ্যে তার শরীরের শেষ শক্তিটুকু শুষে নিয়েছিল। তার ওপর এই পৈশাচিক নির্যাতন তার নিস্তব্ধ প্রতিবাদ সমস্ত প্রতিরোধ ক্ষমতাকে চিরতরে গুঁড়িয়ে দেয়।
তিনটে হায়েনার নিষ্ঠুর লালসার শিকার হয়ে জাফার ছোট্ট শরীরটা মুহূর্তের মধ্যে নিথর হয়ে পড়তে শুরু করে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও শরীরের ভেতরের যন্ত্রণায় তার নিশ্বাসগুলো ভারী হয়ে আসে। সে বুঝতে পারছিল, তার জীবনপ্রদীপ নিভে আসছে।
এদিকে রাস্তার মোড় থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে জারিন, রিসা আর জাস্টিন সেই অন্ধকার এলাকায় এসে পৌঁছায়। বুক ফেটে কান্না আসছে জারিনের। পায়ের নিচে জুতার শব্দ কিংবা গায়ের চাদর সামলানোর সময়টুকুও তার নেই। তার একমাত্র লক্ষ্য—যেভাবেই হোক তার বোনটাকে খুঁজে বের করা।
হঠাৎ করেই দূরে জঙ্গলের কোণায় গাড়ি স্টার্ট নেওয়ার আওয়াজ পায় তারা। হেডলাইটের তীব্র আলোয় জারিন দেখতে পায়, একটা কালো গাড়ি দ্রুতগতিতে পেছনের দিকে ব্যাক করে মেইন রাস্তার দিকে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
নরপিশাচগুলো তাড়াহুড়ো করে গাড়িতে ওঠার মুহূর্তে গাড়ির পেছনের নম্বর প্লেটটি জারিনের চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে ভেসে ওঠে। অন্ধকারের মাঝেও গাড়ির আলোয় একজনের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখে নরপিশাচটার ডান হাতের কব্জিতে থাকা অদ্ভুত একটি গাঢ় ট্যাটু জারিনের চোখে পড়ে যায়।
সেই লোকটি গাড়িতে বসে চলে যাওয়ার উপক্রম করতেই জারিনের ভেতরের বড় বোনের সত্ত্বাটা উন্মাদ হয়ে ওঠে। সে তখন আর নিজের হুশ বা ভয় রাখতে পারে না। "থাম! বলছি থাম আমার বোনকে কোথায় নিয়েছিস বল থাম !"—চিৎকার করতে করতে জারিন ওই চলন্ত গাড়ির পেছনে পেছনে উন্মাদের মতো দৌড়াতে থাকে। সে গাড়িটাকে থামানোর চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়। গাড়িটি চোখের নিমিষে তীব্র গতিতে অন্ধকার পেরিয়ে শহরের মূল রাস্তার দিকে মিলিয়ে যায়।
হতাশায় জারিনের পা দুটো যেন আর চলছে না। সে কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। হঠাৎ তার খেয়াল হয়, একটু দূরে ঝোপঝাড়ের পাশে একটা ছোট ছায়া পড়ে আছে। বুক কাঁপানো ভয় নিয়ে জারিন সেই দিকে ছুটে যায়।
কাছে গিয়ে যা দেখল, তাতে জারিনের গোটা পৃথিবীটা চিরতরে যেন ধূলিস্যাত হয়ে গেল।
রক্তাক্ত এবং নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে তার আদরের ছোট বোন জাফা। জাফার পরনের স্কুল ড্রেসটা ছিন্নভিন্ন, শরীরজুড়ে অসংখ্য আঘাতের নীলচে দাগ। জাফার পিরিয়ডের রক্ত আর সেই নরপিশাচদের হিংস্রতার দাগ একাকার হয়ে গেছে। জাফা তখন মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তে লড়াই করছে।
জারিন পাগলের মতো কেঁদে উঠে জাফাকে নিজের কোলের মধ্যে জড়িয়ে ধরে। হু হু করে কেঁদে উঠে জারিন বলে ওঠে—
— "জাফা! ও আমার সোনা বোনটা! চোখ খোল দেখ আমি এসে গেছি! রেখেই তোকে বুকে টেনে নিতে পারলাম না রে...!"
জাফা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার ঠিক আগের মুহূর্তে অতি কষ্টে চোখের পাতা দুটি মেলে তাকায়। তার ঠোঁট দুটো কেঁপে ওঠে।
ঝাপসা ও ভাঙা গলায় অত্যন্ত করুন কণ্ঠে সে তার বড় বোনকে উদ্দেশ্য করে বলে—
— "আপু... আজকে আমাকে স্কুলে নিয়ে গেলি না কেন...? আমার না অনেক পেটে ব্যথা করছিল... আর লাল লাল কী যেন বের হচ্ছিল... কিন্তু আমি তো বাড়িতেই যাচ্ছিলাম আপু..."
কথাগুলো বলতে বলতেই জাফার গলা দিয়ে কান্নার আওয়াজটা ফুরিয়ে আসে। সে আবার ফুঁপিয়ে উঠে কষ্টের মাঝেও অস্পষ্ট স্বরে বলে—
— "আপু... ওরা আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে... খুব মেরেছে..."
নিজের হাত দিয়ে নিজের বুকের বাম পাশটার দিকে অতিকষ্টে একটু ইঙ্গিত করে জাফা ফুঁপিয়ে বলে ওঠে—
— "এইখানে... এই বুকটার দিকে... ওরা অনেক জোরে জোরে ব্যথা দিয়েছে আপু... খুব ব্যথা দিয়েছে... আমি আর সহ্য করতে পারছি না..."
কথা শেষ হতেই জাফার নিথর হাতটি জারিনের কোল থেকে আস্তে করে খসে পড়ে মাটি ছুঁয়ে যায়। চোখ দুটো চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায় তার।
— "জাফাআআআ...!"
বুকফাটা আর্তনাদে জারিনের সেই আর্তনাদ রাতের অন্ধকার চিরে আকাশ-বাতাস ভারী করে তোলে। রিসা আর জাস্টিন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। জারিনের চোখের সামনে তখন শুধু একটাই ছবি ঘুরপাক খাচ্ছে—সেই নরপিশাচের হাতের সেই অদ্ভুত ট্যাটু আর চোখের পলকে পালিয়ে যাওয়া গাড়িটার নম্বর প্লেট। অপরাধীকে সে ছাড়বে না, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই প্রতিশোধ সে নেবেই।
জাফার নিথর দেহটা তখনো জারিনের উষ্ণ কোলের মধ্যে লেপ্টে আছে, কিন্তু সেই শরীরে জীবনের কোনো স্পন্দন নেই। রাতের জমাট বাঁধা অন্ধকার যেন আরও ভারী হয়ে চেপে বসেছে তাদের চারপাশের বাতাসে।
রিসা তখনো নিজের চোখ দুটো দু'হাতে ঢেকে ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদছে। তার কান্নার আওয়াজটা রাতের শেয়ালের ডাকের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। জাস্টিন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এগিয়ে এসে কাঁপতে কাঁপতে জারিনের কোল থেকে জাফার সেই রক্তে ভেজা, নিথর হালকা শরীরটা নিজের শক্ত বাহুতে তুলে নিল। জাফার হাতগুলো ঝুলে পড়ে রইল জাস্টিনের কাঁধের ওপর।
কিন্তু জারিন? সে কোনো কথা বলল না, কেঁদেও ফেলল না। সে শুধু পাথরের মূর্তির মতো হাঁটু গেড়ে বসা অবস্থাতেই তাকিয়ে রইল সেই শূন্য জায়গার দিকে, যেখানে একটু আগেও তার আদরের বোনটা যন্ত্রণায় ছটফট করছিল। তার চোখ দুটো শুষ্ক, দৃষ্টি কাচের মতো ফ্যাকাশে। ভেতরে কান্নার কোনো সমুদ্র উপচে পড়ছে না, বরং সেখানে তৈরি হয়েছে এক ভয়ংকর শূন্যতা।
— "চল জারিন... বাড়ি যেতে হবে..."—রিসা কাঁপতে কাঁপতে জারিনের হাত ধরে তোলার চেষ্টা করল।
কিন্তু জারিনের নড়াচড়া নেই। সে যন্ত্রের মতো নিজের শক্ত হয়ে যাওয়া পা দুটো টেনে উঠে দাঁড়াল। তারপর জাস্টিনের কোলে থাকা জাফার ঠান্ডা মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে বিড়বিড় করে শুধু একটা কথাই বলল—
— "আমার বোনটা... একা একা খুব ভয় পাচ্ছিল রে..."
এই এই তোরা তোরা শুনতে পাচ্ছিস আমার বোন একা একা এই জায়গায় খুব কষ্ট খুব কষ্ট পাচ্ছিল আর আর আমি আমি কিছু করতে পারিনি কিছু না কিছু না।
জারিন কে কোনো রকম সামলে তারা তাদের বাড়ির গেটের সামনে যখন জাস্টিন জাফার লাশ কোলে নিয়ে এসে দাঁড়াল, তখন ঘড়িতে রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে। ড্রয়িংরুমের টিমটিমে আলোটা জ্বলছিল। দরজা খুলতেই নাজিয়া বেগম উৎকণ্ঠিত মুখে সামনে এগিয়ে এলেন। তার ঠোঁটে একটা প্রশ্ন ছিল—"পেয়েছিস? কোথায় ও?"
কিন্তু প্রশ্নটা তার গলাতেই আটকে গেল
সামনে জাস্টিনের কোলে সাদা চাদরে মোড়ানো, রক্তে ভেজা জাফার ছোট্ট শরীরটা দেখতে পেয়ে নাজিয়া বেগম একটা বিকট আর্তনাদ করে ঘরের মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।
— "ও খোদা! এ আমি কী দেখছি! আমার মা... আমার জাফা মনি কোথায় গেল রে!"—নাজিয়া বেগম নিজের বুক চাপড়ে পাগলের মতো কাঁদতে লাগলেন। তার সেই কান্নার আওয়াজে পুরো বাড়িটা কেঁপে উঠল। তিনি হামাগুড়ি দিয়ে মেয়ের লাশের কাছে গিয়ে জাফার ঠান্ডা মুখটা নিজের বুকে জড়িয়ে ধরলেন। — "ওরে আমার সোনা পাখি চোখ খোল! একবার আম্মু বলে ডাক! একটা বার কথা বল!"—তার কান্নার শব্দে আশেপাশের বাতাস ভারী হয়ে এল।
ঘরের ভেতর থেকে অসুস্থ শরীর টেনে ড্রয়িংরুমে বেরিয়ে এলেন তারেক রহমান। বুকে হাত দিয়ে তিনি কোনোমতে সোফার কর্নারটা ধরে দাঁড়িয়েছিলেন। মেয়ের নিথর শরীরটার দিকে তাকিয়ে তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না। তার চোখের কোণ গড়িয়ে এক ফোঁটা জল নামল বটে, কিন্তু সেই চাওনি ছিল সম্পূর্ণ নিথর, মৃত। মানুষটার চোখের সামনে যেন তার পুরো পৃথিবীটা এক নিমিষে তাসের ঘরের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
তিনি থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সোফার ওপর বসে পড়ে দু'হাতে নিজের মুখ ঢেকে ফেললেন। বুক ফেটে তার কান্নার আওয়াজ বের হলেও গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না।
পুরো ঘরজুড়ে তখন মৃত্যুর নীরবতা আর বুকফাটা কান্নার রোল।
ঠিক এই নরকীয় পরিবেশের মাঝে হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ, হিমশীতল শব্দে ঘরটা কেঁপে উঠল।
জারিন এগিয়ে গেল ড্রয়িংরুমের মাঝখানে। তার চোখের চাউনি এতই ভয়ংকর যে তাকে দেখে মনে হচ্ছিল কোনো রক্তমাংসের মানুষ নয়, স্বয়ং ধ্বংস দাঁড়িয়ে আছে। সে তার মায়ের কান্নার আওয়াজ উপেক্ষা করে সোজা গিয়ে দাঁড়াল তার পক্ষাঘাতগ্রস্ত বাবার সামনে। তার গলায় এতটুকু কাঁপন নেই, বরং এক পাথুরে কঠিন দৃঢ়তা।
— "বাবা..."—জারিনের গলাটা ফিনফিনে চাকুর মতো ধারালো শোনাল।
তারেক রহমান কাঁপতে কাঁপতে মাথা তুললেন।
— "কাদঁবে না বাবা..."—জারিন শক্ত কণ্ঠে বাবার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোর মধ্যে পুরে নিল। তার গলার স্বরটা ঘরের সবাইকে স্তব্ধ করে দিল— "বাবা, কেঁদো না। আমি ওই লোকটাকে দেখেছি। নিজের চোখে দেখেছি তাকে। তার ডান হাতের কব্জিতে একটা বিশ্রী ট্যাটু ছিল... আর গাড়ির নম্বর প্লেটটাও আমার মাথায় গেঁথে আছে। ওরা আমার বোনটাকে কেড়ে নিয়েছে বাবা... কিন্তু আমি জারিন বলছি, ওই নরপিশাচগুলোর রক্ত দিয়ে আমার বোনের চিতা ঠান্ডা করব। আমি ওদের ছাড়ব না! এই পৃথিবীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত খুঁজে বের করব ওদের!"
জারিনের এই প্রতিজ্ঞার মধ্যে কান্নার লেশমাত্র ছিল না, ছিল কেবল এক পৈশাচিক প্রতিশোধের আগুন।
পরদিন ভোরে পাড়ার কিছু মানুষ, জাস্টিন আর রিসার সহযোগিতায় বাড়ির পেছনের কবরস্থানে জাফাকে দাফন করা হলো। জানাজার সময় নাজিয়া বেগম বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলেন, আর তারেক রহমানকে ধরাধরি করে দাঁড় করিয়ে রাখতে হয়েছিল। মাটির নিচে চিরকালের মতো ঘুমিয়ে পড়ল চোদ্দো বছরের ফুটফুটে একটা মেয়ে, যার জীবন শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেল।
সবাই যখন আস্তে আস্তে কবরস্থান ছেড়ে বাড়ির দিকে ফিরে গেল, জাস্টিন আর রিসা অনেক বুঝিয়েও জারিনকে সেখান থেকে সরাতে পারল না।
জারিন তখনো ঠিক ওই নতুন মাটির তৈরি ছোট্ট কবরটার পাশে পাথরের মতো চুপচাপ বসে আছে। তার দৃষ্টি ওই সদ্য দেওয়া মাটির স্তূপটার ওপর স্থির। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে, রোদের তেজ বাড়ছে, কিন্তু জারিনের শরীরের কোনো নড়চড় নেই। সে যেন ওই মাটির সাথে সেঁটে গেছে। তার মাথার ভেতর তখন শুধু বাজছে জাফার সেই শেষ কথাগুলো— "আপু... ওরা আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে..."
সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। চারপাশের আলো আবছা হয়ে আসছে। কবরস্থানের নির্জনতায় ঝিঁঝি পোকার ডাক শুরু হয়েছে।
হঠাৎ করেই জারিনের চোখের সামনে থেকে সেই পাথুরে স্থবিরতা কেটে গেল। তার মনের ভেতর কে যেন একটা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিল। তার ভেতরের বোনটা ফুসে উঠল।
— "না... আমার জাফা একা থাকতে পারে না! ও ঠান্ডা পাচ্ছে! ও অন্ধকার ভয় পায়!"—বিহ্বল পাগলের মতো প্রলাপ বকতে শুরু করল জারিন।
তার চোখের সেই শুষ্ক দৃষ্টি পলকে উধাও হয়ে সেখানে নেমে এল উন্মাদনা। সে হুড়মুড় করে কবরের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল।
— "জাফা! ও সোনা আমার! তুই নিচে একা কেন শুয়ে আছিস রে? আয়, তোকে আমি ঘরে নিয়ে যাব!"—চিৎকার করে কেঁদে উঠল জারিন।
তারপর সে তার খালি হাত দুটো দিয়ে ওই সদ্য খোঁড়া কাঁচা মাটির স্তূপটার ওপর আঁচড় কাটতে শুরু করল। নখগুলো ভেদ করে মাটি খুঁড়তে গিয়ে তার আঙুল দিয়ে রক্ত ঝরতে লাগল, কিন্তু সেদিকে তার কোনো হুঁশ নেই। সে পাগলের মতো মাটি সরাতে লাগল।
— "আমি তোকে একা ছাড়ব না জাফা! এই মাটি সরিয়ে তোকে আমি কোলে তুলে নেব!"—কাঁদতে কাঁদতে সে মাটি খুঁড়তেই থাকল। তার গায়ের জামাকাপড় ধুলোবালিতে একাকার হয়ে গেছে, হাত দুটো রক্তাক্ত।
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা জাস্টিন আর রিসা এই দৃশ্য দেখে চিৎকার করে দৌড়ে এল। জাস্টিন এসে পেছন থেকে জারিনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করল।
— "জারিন কী করছিস তুই! পাগল হয়ে গেছিস নাকি! ছাড় এটাকে!"—জাস্টিন কান্নায় ভেঙে পড়ে তাকে সামলানোর চেষ্টা করল।
কিন্তু জারিন তখন এক উন্মাদের শক্তি পেয়ে গেছে। সে জাস্টিনের কোল থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ধস্তাধস্তি করতে লাগল এবং কবরের মাটির দিকে হাত বাড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল—
— "ওকে ওঠাও! আমার বোনটাকে মাটি থেকে বের করো! ও একা আটকে আছে ওখানে! জাফাআআ...!"
তার সেই বুকফাটা আর্তনাদ আর কান্নার শব্দে সন্ধ্যার আকাশটা যেন কেঁপে উঠল। রিসা আর জাস্টিন দুজনে মিলে জারিনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কবরস্থান থেকে টেনেহিঁচড়ে যখন বাড়ির দিকে নিয়ে আসছে, তখন জারিনের চোখ দুটো পেছনের ওই ছোট্ট মাটির ঢিবিটার দিকেই স্থির হয়ে আছে। তার ভেতরে জন্ম নেওয়া সেই অন্ধকার আগুন তখন ঠিক করে নিয়েছে—এই দুনি
য়ায় ওই নরপিশাচগুলোর নিঃশ্বাস নেওয়ার অধিকার আর এক সেকেন্ডও নেই।
( ভেবেছিলাম আজকে অতীত শেষ করে দিবো কিন্তু সাময়িক আমার কিছু কাজের কারণে পারিনি পেরা নিও না বিকেলের দিকে আবারও পর্ব আসবে সোনা মনিরা)
চলবে,,,