#বসন্ত_বিলাসিনী
#ইশরাত_জাহান_জেরিন
#পর্বঃ২
'ভয় পেয়েছেন বুঝি?'
'ছি ছি কি বলছো?ভয় আর আমি?ভয় পাওয়া তো মেয়েদের স্বভাব। আর আমি তো পুরুষ। পুরুষ মানুষ বুঝি ভয় পায়?'
'বুঝলাম। এখন বলুন কি খাবেন?'
'আরে বোন হালাল খাবারে বাছাই কিসের?যা আছে সব আনো।পেটের জ্বালায় আমার মরিমরি দশা।'
'আপনি নিজের রুমে গিয়ে বসুন।আমি খাবার আনছি।'
স্নিগ্ধ অধোরাকে ছোট্ট করে একটা ধন্যবাদ জানিয়ে গুনগুন করতে করতে নিজের রুমে চলে যায়।
রাতে অধোরাই স্নিগ্ধকে খাবার বেরে দেয়।বেশির ভাগ সময়ই এসব কাজ অধোরাই করে।কারন প্রায়ই সে রাত জেগে পড়ে। তখন স্নিগ্ধকেও আর কষ্ট করে ভাত তরকারি খুঁজতে হয় না।অধোরা ভাত তরকারির সাজিয়ে দেয়।কখনো বা না চাইতেই ভাতের থালা নিয়ে ঘরে চলে আসে।
-
বেলা ১১টা বাজে।আজ সকালে চাঁদনীকে দেখতে পারে নি বিধায় টিফিন টাইমে চাঁদনীর কলেজে গিয়ে উপস্থিত হয় স্নিগ্ধ।বাহিরে গিয়ে একসঙ্গে খাবে দু'জন।স্নিগ্ধ ক্লাসে গিয়ে সরাসরি চাঁদনীর সামনে এসে দাঁড়ায়। চাঁদনী বাসা থেকে টিফিন এনেছে।ক্লাসের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে এক সঙ্গে খাচ্ছে।দু'টো ছেলেও সেখান থেকে খাচ্ছে।মুহুর্তেই ভেতরটা একেবারে জ্বলে উঠে স্নিগ্ধর।তার ফিউচার বউয়ের টিফিনে ভাগ?এখন অব্দি তো সে নিজেই খেতে পারলো না।আর দেখো গরু দু'টো কেমন ছাগলের মতো গপাগপ খাচ্ছে। যেন দু'বছর অনাহারে কাটিয়েছে।স্নিগ্ধ নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে।এখন মারপিট করা যাবে না।ভালো একটা মুড নিয়ে এসেছিলো, ভালো একটা মুড নিয়েই সে এখান থেকে যেতে চায়।
'চাঁদনী চলো আমার সঙ্গে।'
ক্লাসের সব মেয়েরা স্নিগ্ধর দিকে হা করে তাকিয়ে আছে।কেউ কেউ আবার ফিসফিস ও করছে।হঠাৎ চাঁদনীর পাশ থেকে তার বন্ধু নাদিয়া উঠে এসে বলল,
'ভাইয়া আপনি ওকে কোথায় নিয়ে যাবেন?কেন নিয়ে যাবেন?জানেন না এখন কলেজ টাইম চলছে।'
'কাপ্পল ব্লগ করবো তো।তাই তোমার বান্ধবীকে নিতে আসলাম।শুনেছি কাপ্পল ব্লগ করতে পারলেই নাকি রাতারাতি বড়লোক হওয়া সম্ভব? বাই দ্যা ওয়ে আমি এখন আমার ময়না পাখিকে নিতে এসেছি এর মানে এখন তো ওকে আমি নিয়েই যাবো।পারলে গিয়ে তোমাদের অধ্যক্ষ মশাইকে বলে দিও,স্নিগ্ধ কলেজ থেকে তার হবু বউকে নিয়ে চলে গেছে।’
শেষ কথাটা স্নিগ্ধ চাঁদনীর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে বলে।
'নিচে আমার বাইক আছে।কোন চেঁচামেচি না করে বাইকে বসবে।কেমন?’বলল স্নিগ্ধ।
'কেনো বসবো?কে হোন আপনি আমার? '
'শুনো ময়না আমি হলাম তোমার কাবির সিং আর তুমি হলে আমার প্রিয়া।মুভিটা দেখোনি?প্রিয়া কেমন করে কাবিরের কথায় উঠে বসে।যাও লক্ষী বউয়ের মতো কথা শুনো।অযথা আমাকে ইতিহাস তৈরি করতে বাধ্য করো না।’
চাঁদনী ভয়ে আর কোন তর্কে যায় না।কলেজে এমনিতেই একটা হেনস্তাকর কান্ড ঘটে গেছে।যদি এবার তাকে কলেজ থেকে টিসি দিয়ে দেয়?তখন কি হবে? স্নিগ্ধ চাঁদনীর ব্যাগটা গুছিয়ে নিজের কাঁধে নিয়ে নেয়।চাঁদনী শুধু জামেলা এড়াতে চুপ করে আছে।স্নিগ্ধর সঙ্গে যেতে রাজি হয়েছে।কিন্তু একবার বাহিরে যাক স্নিগ্ধর হাতে সে হারিকেন ধরাবে।স্নিগ্ধ সকলের সামনে চাঁদনীর হাত ধরে।তারপর বের হয়ে যায় ক্লাস থেকে।চাঁদনীর যেমন লজ্জা লাগছে তেমনি রাগও হচ্ছে।পুরো কলেজের ছেলে-মেয়েরা তাকিয়ে আছে স্নিগ্ধ আর চাঁদনীর দিকে।স্নিগ্ধর সেদিকে পাত্তা নেই। তার চোখে কালো চশমা।পুরোই হিরো লাগছে তাকে।ভেতরে সাদা টিশার্ট আর ওপরে কালো চেকশার্ট পড়া।
চাঁদনী এবার লজ্জায় কান্নাই করে দিবে।কলেজের সবার ভিড়ে সেই দৃশ্য অধোরার দৃষ্টিও কেড়ে নেয়।সে শুধু অপলক নয়নে স্নিগ্ধ আর চাঁদনীর পাওয়ার পানে চেয়ে রয়।
.
গাজীপুরের একটা নতুন রেস্তোরাঁ।সেখানেই চাঁদনীকে নিয়ে স্নিগ্ধ এসেছে।
'মুখে কয় কেজি চাল ডুকিয়েছো ময়না?গাল দু'টো তো খানিক বাদে ব্লাস্ট হবে।'
চাঁদনী ঠোঁট উল্টে জবাব দেয়,
'আপনাকে আমি ছাড়বো না ভাইয়া বলে দিচ্ছি।
'ছাড়তে কে বলেছে?আমি তো চাই তুমি আমাকে নিজের বুকে জড়িয়ে রাখো।'
'ছিঃঅসভ্য কোথাকার!কোথায় কি বলতে হয় এটাও জানেন না?'
'আল্লাহ তাই তো!এসব কথা তো বেড রুমে বলতে হয়।আমার তো বিরাট পাপ হয়ে গেছে।চলো চলো বেড রুমে যাই।পাপ কমাতে হলে অসভ্যতামি বেড রুমে গিয়েই করতে হবে।'
'হ্যা আর ওই বেডের চাদরটা দিয়েই আপনাকে আমি সিলিংফ্যানের সঙ্গে ঝুলাবো।সেই হবে না?'
স্নিগ্ধ ভ্রু কুঁচকে ঢোক গিলে।
'এই ময়না এমন করে কেন বলছো?আচ্ছা কোন জাদু করলে আমাকে তুমি একটু ভালোবাসবে বলো তো?লালজাদু?নীলজাদু?নাকি কালোজাদু।'
'ভাইয়া!!'
'উঁহু বলো সাইয়া...।'
'ওয়েট অনেকতো খাওয়াতে নিয়ে এসেছেন।আজ যদি আমি আপনার হাতে ভিক্ষার থলি না ধরাই তবে আমার নামও অনামিকা চাঁদনী না।'
'খাও খাও ময়না।যত পারো খাও।খেয়ে মোটা হলে অন্য কোনো পুরুষের নজর আর তোমার ওপর পড়বে না।ভালোই তো হবে।'
চাঁদনী জিদ দেখিয়ে একসঙ্গে অনেকগুলো খাবার অর্ডার করে।খাবার আসতেই একবার এটা খায় তো আরেকবার অন্যটা।এহেন দৃশ্যে স্নিগ্ধ আর হাসি আঁটকে রাখতে পারে না।সে মুখ ফুঁসকে বলে ফেলে,
'এটা ওটা না খেয়ে আমাকে খেলেও পারো।'
.
দুপুরের পর থেকেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। এই এলাকার একটাই সমস্যা একটু বৃষ্টি হলেই মহল্লা জল কাঁদায় একাকার। চায়ের দোকানে স্নিগ্ধ এবং তার বন্ধু মহল আড্ডা দিচ্ছে।
'কিরে আজকে নয়নকে দেখছি না তো?সে কোথায় গেছে?'
স্নিগ্ধর প্রশ্নে তার বন্ধু রাজ্য বলে,
'আরে শালাকে কয়দিন ধরেই দেখছি না।সকালে জিজ্ঞেস করলে বলে,আমাশয় হয়েছে বিকেলে জিজ্ঞেস করলে বলে ডাইরিয়া। ব্যাটা নিশ্চিত একটা খিচুড়ি পাকাচ্ছে।'
হঠাৎ দোকানে উপস্থিত হন রবিউল চাচা।গায়ের রং কৃষ্ণ কালো।কথা বললে দাঁত একটাও দেখা যায় না।যাবেই বা কেমন করে? দাঁত গুলো তো বেকার ছেলেদের ভবিষ্যৎ এর থেকেও বেশি কালো।দেখলে বুঝাই যায় না দাঁত আছে কিনা। তার ওপর এই বয়সেও অমন ক্লিন সেইভ।এলাকার কোনো মানুষই তার সামনে মুখ খুলে না।কারন এনি হচ্ছেন এই এলাকার বিবিসি নিউজ।সারাদিন এই বাড়ির খবর ওই বাড়িতে পাচার করেন।তাও আবার খবরে এক্সট্রা মশলা এড করে।কথায় কথায় ঝাড়ি দেওয়াও তার বদঅভ্যস বলা চলে।
'চাচা লুঙ্গি আর কত উপরে উঠাবেন?কি যেনো কালো একটা দেখা যাচ্ছে।'আদিপের কথায় দোকানের সবাই শব্দ করে হেসে উঠে।তাতেই ক্ষেপে যায় রবিউল চাচা। ক্ষিপ্ত কন্ঠে সে তেড়ে এসে আদিপকে বলে,
'হোপ! ফাউল কথা কস? একটা দিমু ধইরা।আবার হাসে হে....হেইট....তোগোর টা মনে হয় ধলা?ছুডু বেলায় তো আমিই কাটছিলাম।এখন আমার লগে বানরামি?এ.....ই....এই,এই হাসবি না।’
রবিউল চাচার এনেন ঝাড়ি আর তোতলানো দেখে ছেলেপেলে মুখ চেপে সব হাসছে।স্নিগ্ধরও হাসি থামচ্ছেনা।তবুও সে নিজেকে খুব কষ্টে সামলিয়ে চাচার কাছে গিয়ে বসে।বলে,
'আরে চাচা ওরা সব বাচ্চা মানুষ। কি অবস্থা বলুন?দিন কাল কেমন যাচ্ছে?আজ ক'টা খবর এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি ব্রিক্রি করলেন?'
'হে..হেইট..'
'আচ্ছা আচ্ছা সরি সরি।এত জোড়ে ধমক মারলে তো ক'দিন পর গলার রগটাও ধমকের সঙ্গে ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে।এখন বলুন এই বৃষ্টির দিনে এখানে কি কাজ?'
রবিউল চাচার মুখটা এবার চকচক করে উঠে।পকেট থেকে একটা স্মার্ট ফোন বের করে বলে,
'ফোন কিনছি। এক্কারে টাচ ফোন।আমারে একটা টিকটক খুইল্লা দে তো সিদ্ধ। '
'সিদ্ধ না স্নিগ্ধ। বুড়ো এখনো আমার নামটাও উচ্চারন করতে পারে না।আবার এই বয়সে এসেছে টিকটক করতে।'
'আরে হলো ওই একটা।দে না বাপ।আজকাল সবাই করতাছে।আমিও একটু করবার চাই।এমনিতেই দেরি করার কারনে কতগুলা ট্রেন মিস হইয়া গেলো।'
‘ওটা ট্রেন না।ট্রেন্ড হবে।’
স্নিগ্ধ আরো কিছু বলতে যাবে তার আগেই রবিউল চাচা পুনরায় বলে উঠেন,
'একটা ইমুও নামাইয়া দিস বাপ।মিয়া বাড়ির কাজের ছেড়ি লতিফা ইমু দিয়া মাসে হাজার হাজার টাকা ইনকাম করে।কামডা আমারও শিখতে হইবো।বেকার জীবন আর ভালো লাগে না।'
স্নিগ্ধর এবার বিষম খাওয়ার পালা।শেষে এই বুড়ো হবে ইমু বিজন্যাস ম্যান?
চলবে?