পর্ব ৪৬
লেখিকা : মরিয়াম আক্তার সুকন্যা
হলুদের দিন সকাল।
রোজ একটা হলুদ থ্রি পিস পড়েছে। চোখে গাঢ় করে কাজল দিচ্ছে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে।
এমন সময় ওর খালাতো বোন আদিবা এসে বললো,
_আদিবা:_ "আপু চলো নিচে যাই"
_রোজ:_ "হুম চল"
রোজ আর আদিবা নিচে নামলো।
একপাশে আরিয়ান, শান আর আফরান দাঁড়িয়ে কথা বলতেছিলো।
শান আরিয়ানের কাঁধে হাত রেখে বললো,
_শান:_ "ভাবির পাশে ওই মেয়েটা কেরে?"
_আরিয়ান:_ "রোজের খালাতো বোন"
_শান দাঁত কেলিয়ে:_ "দেখ মেয়েটা কি সুন্দর"
_আফরান ভ্রু কুচকে:_ "আমাদের বউ আছে, তুই দেখ"
এই বলে আরিয়ান আর আফরান ওখান থেকে চলে গেলো।
শান পেছন থেকে বললো, "মেয়েটাকে আমার চাই"
রোজ সামনে গিয়ে আফরানকে দেখে বললো,
_রোজ:_ "এই কি রেডি হও নাই?"
_আফরান:_ "হবো এখন"
_রোজ:_ "হুম যাও"
রোজ চলে যাচ্ছিলো, তখনই আরিয়ান পেছন থেকে ওর হাত টান দিয়ে নিজের কাছে নিয়ে আসলো।
_আরিয়ান রাগী গলায়:_ "এতো সেজেছো কেনো?"
_রোজ অবাক হয়ে:_ "কই এতো সাজলাম?"
_আরিয়ান:_ "ছেলেদের থেকে দূরে থাকবে"
_রোজ মাথা নেড়ে:_ "ঠিক আছে"
আরিয়ান আর কিছু না বলে রোজের গালে আলতো করে চুমু দিলো।
রোজ লজ্জা পেয়ে দৌড়ে স্টেজের দিকে চলে গেলো।
ওখানে আফরান বসে ছিলো। আফরান ফোন বের করে রাইফাকে ভিডিও কল দিলো।
রাইফা কল ধরতেই আফরান থমকে গেলো। ওর বউ হবে, মেয়েটা আজ এতো সুন্দর করে সেজেছে।
_রাইফা:_ "কিছু বলবেন?"
_আফরান:_ "কোনো ছেলের দিকে তাকাবা না"
_রাইফা হেসে:_ "ঠিক আছে"
বলে আফরান কল কেটে দিলো।
একটু পর রোজ এসে আফরানকে হলুদ লাগালো। লাগিয়ে একটা সুন্দর মুচকি হাসি দিলো।
পাশে বসে থাকা কয়েকটা ছেলে বললো,
_ছেলে ১:_ "দেখ মেয়েটা কতো সুন্দর করে হাসে। হাসিটা মারাত্মক"
আরিয়ান পাশেই ছিলো। কথা শুনে রাগে ওর চোখ লাল হয়ে গেলো।
উঠে গিয়ে ছেলে কয়টার সামনে দাঁড়িয়ে বললো,
_আরিয়ান:_ "ওর দিকে তাকাবি না। ওই মেয়েটা আমার বউ"
_ছেলে গুলা ভয় পেয়ে:_ "সরি ভাই"
তারপর আরিয়ান রোজের হাত ধরে ওকে নিয়ে সোজা ছাদের উপর চলে গেলো।
ছাদে গিয়ে আরিয়ান রোজকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরলো।
_আরিয়ান:_ "তোমার হাসি, তোমার সাজ সব আমার। আর কেউ দেখলে আমি শেষ করে ফেলবো"
_রোজ:_ "আচ্ছা
আরিয়ান রোজের কপালে, গালে পরপর কয়েকটা চুমু দিলো। রোজ লজ্জায় আরিয়ানের বুকে মুখ লুকালো।
আরিয়ান শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখলো ওকে।
---
আরিয়ান রোজকে ছাদে নিয়ে যাওয়ার একটু পরেই...
আদিবা হাতে ফুলের ডালা নিয়ে উপরে যাচ্ছিলো।
সিঁড়িতে শান নামছিলো।
আদিবাকে দেখে শান দাঁড়িয়ে গেলো।
*শান:* "এই যে মিস, কোথায় যাচ্ছেন?"
*আদিবা:* "জি ছাদে"
*শান ভ্রু উঁচিয়ে:* "কেনো?"
*আদিবা:* "ফুল দিয়ে আসতে"
*শান:* "যাওয়া লাগবে না"
*আদিবা অবাক হয়ে:* "কেনো?"
*শান আদিবার একদম কাছে এসে ফিসফিস করে:* "উপরে অনেক ছেলে আছে"
আদিবা শানের দিকে তাকিয়ে বললো,
*আদিবা:* "তো?"
শান হঠাৎ সিরিয়াস হয়ে গেলো। আদিবার চুলের পাশ থেকে ফুলটা ঠিক করে দিলো।
*শান:* "একটা ছেলে আপনাকে ভালোবাসে মিস। সে চায় আপনাকে অন্য কেউ না দেখুক"
আদিবা বাঁকা হেসে বললো,
*আদিবা:* "কে সে? দেখি"
শান দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসলো।
*শান:* "আছে একজন। পরে দেখবেন"
আদিবা হুট করে শানের টাই টেনে ধরে ওর কলার কাছে মুখ নিয়ে গেলো।
*আদিবা:* "ভালো তো আমি বাসি... মাই হিটলার"
এই বলে ফুলের ডালা নিয়ে চলে গেলো।
শান সিঁড়ির মাঝে দাঁড়িয়ে পেছন ঘুরে তাকালো। ঠোঁটে দুষ্টু হাসি।
*শান:* "আমি হিটলার? সমস্যা নেই মাই জান। আপনার হিটলার হতে রাজি আছি"
বলে শানও নিচে চলে গেলো।রাত ১টা।
হলুদের অনুষ্ঠান শেষ। বাড়ি একদম ফাঁকা।
ছাদের এক কোণে আদিবা একা দাঁড়িয়ে ছিলো। হাতে সেই ফুলের ডালা।
পেছন থেকে কারো পায়ের শব্দ পেয়ে ঘুরে তাকালো।
শান।
হাতে দুই কাপ চা, আর ঠোঁটে সেই দুষ্টু হাসি।
*শান:* "কি মিস, ঘুম আসতেছে না?"
*আদিবা:* "আপনি এখানে কেনো?"
*শান চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে:* "যে আপনাকে সারাদিন জ্বালায়, সে এখানে থাকবে না?"
আদিবা চা নিলো না।
*আদিবা:* "নাটক বাদ দেন। কি বলবেন বলেন"
শান একটু চুপ করে রইলো। তারপর সোজা আদিবার সামনে দাঁড়ালো।
*শান সিরিয়াস গলায়:* "আদিবা, আমি তোমাকে ভালোবাসি"
আদিবা চমকে উঠলো।
*আদিবা:* "হঠাৎ?"
*শান:* "হঠাৎ না। যেদিন প্রথম তুমি 'মাই হিটলার' বলছিলা সেদিন থেকেই। তোমার রাগ, তোমার জেদ, সব আমার ভালো লাগে। তুমি অন্য ছেলেদের দিকে তাকালে আমার কলিজা পুড়ে যায়"
আদিবা মাথা নিচু করে ফেললো। লজ্জা পাচ্ছে।
*আদিবা আস্তে করে:* "আমিও... আমিও আপনাকে ভালোবাসি"
*শান অবাক হয়ে:* "সত্যি?"
*আদিবা:* "হুম। নাহলে কি আর কাউকে হিটলার ডাকি?"
শান খুশিতে আদিবার দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলো।
*শান:* "তাহলে প্রমিজ করো, আর কারো দিকে তাকাবা না। শুধু আমার দিকে তাকাবা"
*আদিবা হেসে:* "প্রমিজ। কিন্তু আপনি?"
*শান আদিবার কপালে কপাল ঠেকিয়ে:* "আমি? আমি সারাজীবন তোমার হিটলার হয়েই থাকবো। শুধু তোমার জন্য"
বাতাসে বেলি ফুলের গন্ধ। ছাদের লাইটের আলোতে আদিবার মুখ লাল হয়ে গেছে।
শান আস্তে করে আদিবার কপালে একটা চুমু দিলো।
*শান ফিসফিস:* "মাই জান"
*আদিবা লজ্জা পেয়ে শানের বুকে মুখ লুকালো:* "মাই হিটলার"
শান আদিবাকে শক্ত করে জড়ায় ধরলো।
*শান:* "আর ছাড়বো না। কাল বিয়েতে আমার পাশেই থাকবা"
*আদিবা:* "হুম থাকবো"
নিচ থেকে ফাহিমের ডাক: "শান ভাই, আদিবা আপু, নিচে আসেন!"
ওরা দুইজন একসাথে হেসে দিলো।
শান আদিবার হাত ধরে বললো,
*শান:* "চলো, সবাইকে জানায় দেই আমার জানটাকে পেয়ে গেছি"
বিয়ের দিন। সকাল থেকে বাড়িতে হুলুস্থুল।
সবাই রেডি। শুধু রোজ এখনো নামছে না।
আরিয়ান অস্থির হয়ে ঘরময় পায়চারি করছে।
শেষে আদিবাকে ডাক দিলো।
*আরিয়ান:* "আদিবা, তোমার ভাবিকে দেখছো?"
*আদিবা:* "রেডি হচ্ছে দুলাভাই।"
একটু থেমে দুষ্টু হেসে বললো, "কেনো দুলাভাই? বউয়ের জন্য তর সইছে না?"
আরিয়ান কান লাল করে ফেললো।
*আরিয়ান:* "দেখতে ইচ্ছে করছে শালিকা। এটা তুমি বুঝবে না।"
আদিবা হাসতে হাসতে চলে গেলো।
কিছুক্ষণ পর...
সিঁড়ি দিয়ে হালকা পায়ের শব্দ।
আরিয়ান তখন শানের সাথে কথা বলছিলো। কথার মাঝেই উপরে চোখ গেলো।
আর চোখ আটকে গেলো।
রোজ।
মেরুন রঙের জামদানি শাড়ি। হালকা গহনা। চুলে বেলি ফুল।
নিচে নামছে ধীরে ধীরে, যেন পুরো বাড়ির আলো ওর সাথেই নামছে।
আরিয়ানের বুকের ভেতর ধক করে উঠলো।
*আরিয়ান শানকে ধরে:* "শান... আমাকে ধর। আমি শেষ।"
*শান হেসে:* "ভাই নিজেকে সামলা।
আরিয়ান আর দাঁড়াতে পারলো না। সোজা গিয়ে রোজকে এক সাইডে টেনে নিয়ে আসলো।
*রোজ চমকে:* "কি করছেন আপনি?"
*আরিয়ান ওর দিকে তাকিয়ে:* "তুমি কি আমাকে মারতে চাও?"
*রোজ:* "কি বলছেন এইসব?"
*আরিয়ান গলা নামিয়ে:* "তুমি শাড়ি পরছো কেনো?"
*রোজ লজ্জা পেয়ে:* "এমনি। মন চাইলো তাই পরলাম।"
*আরিয়ান ওর কানের কাছে ফিসফিস করে:* "আমার তো মন চাচ্ছে... শাড়িটা খুলতে।"
*রোজ রেগে + লজ্জায়:* "অসভ্য লোক! কি বলছেন আপনি!"
বলে রাগ করে রাইফার কাছে চলে গেলো।
আরিয়ান ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বিরবির করলো,
*আরিয়ান:* "অনুষ্ঠান শেষ হতে দাও... তারপর তোমার শাড়ি আমি নিজেই খুলবো।"
শান পাশ থেকে শুনে ফিক করে হেসে দিলো।
---বাড়িতে সকাল থেকেই ঢোলের শব্দ।
রাইফাকে পার্লার থেকে সাজিয়ে আনা হয়েছে। মেরুন লেহেঙ্গা, ভারী গহনা, হাতে মেহেদি।
আফরান নেভি ব্লু শেরওয়ানি পরে বসে আছে। চোখ শুধু দরজার দিকে।
পাশে রোজ আর আদিবা রাইফার ওড়না ঠিক করে দিচ্ছে।
*কাজী সাহেব:* "বর সাহেব, কবুল বলেন"
আফরান একবার রাইফার দিকে তাকালো। রাইফা ঘোমটা দিয়ে বসে আছে। হাত কাঁপছে।
*আফরান গলা কাঁপিয়ে:* "কবুল"
*আবার:* "কবুল"
*শেষবার:* "কবুল"
সাথে সাথে সবাই "আলহামদুলিল্লাহ" বলে উঠলো।
শান পাশ থেকে ফিসফিস করে বললো, "অবশেষে ভাইয়ের বউ অফিসিয়াল হলো"
এবার রাইফার পালা।
*কাজী:* "মা, কবুল বলেন"
রাইফার গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না। রোজ পাশ থেকে হাত চেপে ধরলো।
*রাইফা কাঁপা গলায়:* "কো... কবুল"
*আবার:* "কবুল"
*শেষে:* "কবুল"
সবাই তালি দিলো। আফরান শুধু এক দৃষ্টিতে রাইফার দিকে তাকিয়ে আছে।
আজ থেকে এই মেয়েটা শুধুই ওর।
ফটোগ্রাফার: "বর-কনে একসাথে"
আফরান রাইফার হাত শক্ত করে ধরলো। রাইফা লজ্জায় মাথা নিচু।
*শান পেছন থেকে:* "ভাই একটু রোমান্টিক হন"
আফরান রাইফার কানের কাছে ফিসফিস: "রাতে দেখাবো কতো রোমান্টিক"
রাইফা লজ্জায় আফরানের বুকে চিমটি কাটলো।
এদিকে আরিয়ান রোজের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। রোজকে মেরুন শাড়িতে দেখে আরিয়ানের চোখ সরছে না।
*আরিয়ান ফিসফিস:* "তুমিও এরকম সাজবা একদিন"
*রোজ লজ্জা পেয়ে:* "অসভ্য"
শান আদিবাকে টেনে ফ্রেমে ঢুকালো।
*শান:* "আমরাও কাপল"
*আদিবা:* "কে আপনার কাপল? হিটলার একটা"
*শান আদিবার কোমর ধরে:* "হ্যাঁ তোমার হিটলার"
বিকাল। গাড়ি রেডি।
রাইফার মা কান্না করছে। রাইফাও।
আফরান রাইফার পাশে দাঁড়িয়ে।
*রাইফার মা:* "মা, শ্বশুরবাড়ির সবাইকে দেখে রাখিস"
রাইফা শুধু মাথা নাড়লো। কান্নায় কথা বলতে পারছে না।
আফরান আস্তে করে রাইফার হাত ধরলো।
*আফরান:* "কাঁদে না। আমি আছি তো"
*রাইফা:* "আম্মুকে ছেড়ে..."
বলেই আফরানের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে কাঁদতে লাগলো।
আফরান শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। পিঠে হাত বুলিয়ে দিলো।
*আফরান:* "আমি তোমার নতুন বাড়ি। আমি তোমার নতুন পরিবার। কাঁদবা না পাগলি"
রোজ পাশ থেকে রাইফাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।
*রোজ:* "আপু তুই চলে যাচ্ছিস"
*রাইফা:* "তুইও চলে আসিস আমার বাসায়"
গাড়িতে উঠার আগে আফরান রাইফাকে কোলে তুলে নিলো।
সবাই "উহু" করে উঠলো।
রাইফা লজ্জায় আফরানের শেরওয়ানিতে মুখ লুকালো।
গাড়ি চলতে শুরু করলো। রাইফা জানালা দিয়ে পেছনে তাকিয়ে কাঁদছে।
আফরান রাইফার হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে কপালে চুমু দিলো।
*আফরান:* "আর কান্না না। এখন থেকে আমি তোমার সব কষ্ট নিজের করে নিবো"
রাইফা খাটের এক কোণে বসে আছে। ঘোমটা দিয়ে। হার্টবিট বেড়ে গেছে।
দরজা খোলার শব্দ।
আফরান ভেতরে ঢুকলো। হাতে দুধের গ্লাস।
আফরান ধীরে ধীরে রাইফার সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো।
ঘোমটা আস্তে করে সরালো।
রাইফাকে দেখে আফরানের নিঃশ্বাস আটকে গেলো।
*আফরান:* "আজ তুমি আমার। শুধু আমার"
রাইফা কিছু বললো না। শুধু চোখের পানি ফেললো।
আফরান আঙুল দিয়ে পানি মুছে দিলো।
*আফরান:* "আর ভয় পেতে হবে না। আমি আছি"
আফরান রাইফার কপালে লম্বা একটা চুমু দিলো। তারপর দুধের গ্লাস এগিয়ে দিলো।
*আফরান:* "নাও। আজ থেকে আমরা একসাথে"
রাইফা কাঁপা হাতে গ্লাস নিলো। আফরান রাইফার পাশে বসে ওর হাত ধরলো।
বাইরে জোনাকির আলো। ভেতরে ভালোবাসার নতুন অধ্যায়।
সমাপ্ত 💞