ফন্ট সাইজ:
থিম:
Tell me who i am(২য় খণ্ড)

৮ম পর্ব

লেখক: আয়সা ইসলাম মনি

#Tell_me_who_I_am

#পর্ব_৭_প্রথমাংশ

#আয়সা_ইসলাম_মনি

(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)

🍁২য় খণ্ড🍁

__________________________________________☞

ফজরের নামাজ শেষে প্রতিদিনের মতো আজও তারান্নুম একঘণ্টা ধরে কুরআন তেলাওয়াতে মনোনিবেশ করেছিল। কিন্তু তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস রয়েছে তার। তবে আগের রাতে সময়ের আগেই ঘুমিয়েছিল বলে তেলাওয়াত শেষেও আর ঘুম আসেনি আজ। কুরআন শরীফটা যত্ন করে কাপড়ে মুড়িয়ে নির্ধারিত তাকের ওপর রেখে দিল। তারপর উঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরাতেই সকালের নরম রোদ এসে তার মুখ ছুঁয়ে গেল। গাছের পাতাগুলো হেলে পড়েছে। চড়ুই, শ্যামা, আর বউ কথা কও পাখি ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে।

তারান্নুম দাঁড়িয়ে থেকে চোখ বন্ধ করে বলল, "সকালটা যে এত্ত সুন্দর হয়, আগে বুঝবার পারলে চিত্তারাইরা ঘুমাইয়া থাকতাম না। আহ, কি শান্তি যে লাগতাছে!" বুক ভরে দীর্ঘ একটা নিশ্বাস নিল; ফুসফুসে ঢুকে গেল প্রকৃতির নির্মলতা। আবার চোখ খুলে হেসে বলল, "কবে যে ফয়সাইল্লার পোলায় আইসা বিয়াটা কইরা নিবে! উফফ! আর যে তর সয় না।"

তার মুখে লজ্জালু হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু সেই হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল, যখন সে দেখতে পেল, বনের ভেতর থেকে আকবর ধীরপায়ে বেরিয়ে আসছে।

তবে খুব একটা চমকায়নি সে, কিন্তু দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। বিড়বিড় করে নিজেকেই প্রশ্ন করল, "কাকায় আবার ওইদিকে কই গেছিল?"

এবার সে গলা খাঁকারি দিয়ে 'ও কাকা...' বলে ডাক দিতে যাবে, ঠিক তখনই একই দিক থেকে ফাতিমা বেরিয়ে এলো। এবার তারান্নুমের মুখ থেকে প্রশান্তির আবরণ সরে গিয়ে ভ্রূ কুঁচকে উঠল একঝটকায়। সন্দিহান কণ্ঠে বলল, "মা-ও বা ওইদিকে কই গেছিল?"

দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সে। চৌকাঠ পেরিয়ে আসার আগেই ফাতিমাকে চোখে পড়ল। আর যেই না চোখে পড়েছে, কেমন যেন ফাতিমা থমকে গেলেন। এত ভোরে দরজার সামনে কঠিন চোখে মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বুক কেঁপে উঠল তার। ঠোঁটও শুকিয়ে এলো। গলার কাঁপন লুকিয়ে রেখে মুচকি হাসতে চেষ্টা করে বললেন, "ওমা! তুই ঘুমাইস নাই?"

তারান্নুম কর্কশ গলায় জিজ্ঞেস করল, "কই গেছিলা?"

ফাতিমার মুখে হাসি থাকলেও ভেতরে আতঙ্ক কাজ করল। গলার স্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বললেন, "সর তো। কামের অভাব নাই। আয়, শাক কয়টা বাইছা দিবি।"

এই বলে পাশ কাটিয়ে যাবার চেষ্টা করলেন ফাতিমা। চোখে-মুখে হঠাৎ ধরা পড়া অস্বস্তির ছাপ বেড়ে ওঠার আগে অনাকাঙ্ক্ষিত উন্মোচনের হাত থেকে পালিয়ে বাঁচতে চান তিনি। ঠিক তখনই তারান্নুম দাঁত চেপে, ঠোঁট শক্ত করে উচ্চারণ করল, "আকবর কাকার লগে তোমার কীসের সম্পর্ক?"

ফাতিমা থমকে দাঁড়ালেন। তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন। তার চেহারা দেখে মনে হবে, ভিতরের গোপন কোনো দরজায় ঢিল মেরেছে কেউ। কিন্তু গলা শক্ত করে দাঁত কষে বললেন, "মুখ সামলাইয়া কথা কইস, মাইয়া! কারে কি কইতাছোস, খেয়াল আছে তোর?"

"তোমারে আমি আরো একবার দেখছি, আকবর কাকা আসার পর তুমিও চুপিচুপি বনের ভিতর দিয়া বাইর হও। কীসের সম্পর্ক তোমার লগে তার? সত্য কও।"

ফাতিমার মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মুখ খুলতে পারছেন না, শুধু অভিযুক্তের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। ঢোক গিলে গলা পরিষ্কার করে কেবল বললেন, "তোরে... তোরে আমি বুঝাইয়া কইতাছি, মা। আয়, একটু নিড়ায় কই।"

কিন্তু তারান্নুম দম নিতে নিতে এবার আর সহ্য করল না। চোখ লাল হয়ে উঠেছে রাগে। গলার স্নায়ু টান টান করে চেঁচিয়ে উঠল, "আমি জানতে চাই, তোমার আর ওই ব্যাটার মধ্যে কোনো ইটিসপিটিস চলে কিনা!"

কথাটা মুখে আসতেই যেন বোমা ফাটল ঘরের আঙিনায়। ফাতিমার হাত পড়ল মেয়ের গালে। চড়টা এতই অপ্রত্যাশিত, এতই জোরালো ছিল যে তারান্নুমের গালের ফর্সা রঙে ফাতিমার পাঁচ আঙুলের দাগ তীব্রভাবে স্পষ্ট হলো। মাথা ঘুরে উঠল তারান্নুমের। চোখ থেকে জলের ধারা ছুটল। অসহায়ের মতো মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।

ফাতিমার বুকের ভেতরটা দপদপ করে কাঁপছিল। মুখ শক্ত করে, গলা ভার করে বলে উঠলেন, "ওইটা তোর বাপ হয়, ছেমড়ি।"

অবশেষে নির্মম সত্য উদ্‌ঘাটিত করতেই হলো মেয়ের সামনে। জীবনে প্রথমবার কন্যার প্রতি শারীরিক আঘাত হানার তীব্র অনুশোচনায় তার অন্তঃকরণে নিঃশব্দ ক্ষরণ বয়ে গেল। তবুও নিশ্চুপ নিথর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের পানে।

তারান্নুম বিস্ময়ে স্তব্ধ। এমন কিছু কল্পনার পরিধিতেও ছিল না তার। সে যেন বুঝতেই পারছিল না, কী শুনল এইমাত্র!

কণ্ঠে একগুচ্ছ প্রশ্ন জমে থাকলেও মুখ দিয়ে বের হলো মাত্র একটা বাক্য, "কি কইলা তুমি?"

ফাতিমা এবার চোখ নামিয়ে ফেললেন। ভাঙা স্বরে বললেন, "আকবরের লগে অনেক আগেই আমার নিকা হইছে। তোগো কইবার সুযোগ মিলে নাই। এহন থেইকা ওনারে বাপ ডাকবি। ঐদিকটায় চল, লক্ষ্মীটা। আমি তোরে সব বুঝাইয়া কইতাছি।"

তিনি আলতো করে হাত তুলে মেয়ের গালে যে দাগ বসিয়ে দিয়েছিলেন, সেখানে মমতা ছোঁয়াতে চাইলেন। কিন্তু তারান্নুম সেই হাত এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল, "আমি মানি না। আমি মানি না তারে বাপ হিসেবে, বুঝবার পারছো? আমি মানি না।"

মেয়ের স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান শুনে মুহূর্তে ভেঙে পড়লেন ফাতিমা। চোখে বোবা অনুশোচনা নিয়ে তিনি ধীরে বললেন, "আমি তোরে বুঝামু, মা। উনি আমার স্বামী হয়, তাই এমন কইরা কইতে হয়..."

কিন্তু কথা শেষ হওয়ার আগেই তারান্নুম দাঁত চেপে বলে উঠল, "উনি তোমার স্বামী হইতে পারে, কিন্তু আমার বাপ না। আমার বাপ ম'রছে। আর বছরের পর বছর আমিন ধইরা যার জন্য কান্না করছি আমি, তারে কেউ রিপ্লেস করতে পারব না। তুমি আমার সেই ম'রা বাপের প্রতি এতটা বেঈমানি কেমনে করলা, মা?"

তার গলার ধ্বনি রাগে, যন্ত্রণায়, ঘৃণায়, বঞ্চনায় কাঁপছিল। তবুও সে কান্না থামায়নি, কিন্তু মাথাও নীচু করেনি। অথচ ফাতিমা মুখ নামিয়ে ফেললেন। তার ভেতরে যা ছিল, আজ তা প্রকাশ পেয়েছে—সেই নগ্নতা ঢাকার মতো কোনো শব্দ আর তার মুখে রইল না।

মায়ের মুখে কোনো জবাব না পেয়ে, ভিতরে জমে ওঠা চাপা অভিমান নিয়ে ওড়নাটা গায়ের এক পাশে জড়িয়ে নিল তারান্নুম। তারপর তাড়াহুড়ো করে দরজার দিকে পা বাড়াতেই চোখে পড়ল আম্বিয়া অনড় ভঙ্গিতে তসবি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন।

তিনি যে সব শুনেছেন, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ রইল না। তার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই তারান্নুমের চোখ থেকে কান্নার ফোঁটাগুলো ঢাল হয়ে ঝরতে লাগল। ওড়নার প্রান্ত দিয়ে তা মুছতে মুছতে নিজের ঘরের দিকে ছুটে গেল। দরজা আটকে নিজেকে সেই কক্ষে আবদ্ধ করল। তারান্নুম বিছানার এক কোণে বসে, দু’হাত মুঠো করে কটমট করে বলে উঠল, "যারে আমি কাকা মনে কইরা মাথার ওপর জায়গা দিছি, তারে কোনোদিনও বাপ মানমু না। না, মানমু না আমি! তার মানে জীবনের কতগুলা বছর মিথ্যারে বিশ্বাস করছি আমি! ঠকাইলা তুমি আমগো, মা..."

তার কণ্ঠ ক্রমশ কর্কশ হয়ে উঠলো, কিন্তু বুকের ভেতরে শুধু হাহাকার বইছে।

ঘরের চৌকাঠে কঠিন মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন আম্বিয়া৷ তিনি গভীর কণ্ঠে বললেন, "এত্ত বড় সোমত্ত মাইয়ার গায়ে হাত তুললি?"

ফাতিমা তখনো মাটির দিকে তাকিয়ে মুখ নামিয়ে চৌকাঠে বসে ছিলেন। কথাটা কানে যেতেই তার কাঁধটা আচমকা ঝাঁকুনিতে কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে মায়ের দিকে তাকালেন। আম্বিয়ার চোখের দিকে একবার তাকালেই বোঝা যায়—এই চেহারায় ক্ষমা নেই, করুণা নেই, আছে শুধুই বিচার। তসবির পুঁতির মতো তার চোখে গুনে গুনে জমা হচ্ছে প্রশ্ন।

ফাতিমা দাঁড়িয়ে তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এলেন। কাঁপা কাঁপা হাতে আম্বিয়ার কাঁধে হাত রাখলেন। গলায় ব্যাকুলতা এনে বললেন, "আম্মা... আম্মা গো, আমারে তুমি ভুল বুইঝো না। আমি... আমি তোমারে সব কইতাছি..."

আম্বিয়া পেছনে এক পা সরে কাঁধটা ঝেড়ে নিলেন, যেন অপবিত্র কিছু লেগেছে শরীরে। তারপর গলা গাঢ় করে বললেন, "কবে করছস এই কাম?"

একটা প্রশ্ন, অথচ এর ভার ছিল পাহাড়সম। ফাতিমা মুখ নামিয়ে, প্রায় ফিসফিস করে বললেন, "রমজান মা'রা যাওনের পরদিনই।"

কথাটা এমন সহজ, এমন নির্লজ্জ স্বাভাবিকতায় উচ্চারিত হলো যে, আম্বিয়ার চোখে তৎক্ষণাৎ প্রবল সন্দেহের ঢেউ খেলে গেল। চোখ কুঁচকে উঠল। স্বামী ম'রার পরের দিনই যদি স্ত্রী কারও সঙ্গে নিকাহ পড়ে, তার মানে তো সম্পর্ক আগে থেকেই গড়ে উঠেছিল! এই কথার ভেতরে যে পচা গন্ধ লুকানো রয়েছে, আম্বিয়া তা বুঝলেন।

হাত বাড়িয়ে ফাতিমার কবজি চেপে ধরে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেন, "এদিকে আয়।"

আর একটাও শব্দ না বলে তাকে টেনে নিয়ে বাগানের দিকে যেতে শুরু করলেন। এতটা প্রবলভাবে হাঁটছেন যে পায়ের নিচে খসখস আওয়াজে পাতা ভাঙছিল।

অন্যদিকে তারান্নুম বিছানায় হাঁটু মুড়ে বসে ছিল। তার নাক, গাল ফুলে উঠেছিল, চোখ লাল হয়ে গিয়েছিল কান্নায়। ওড়নার প্রান্ত ভিজে স্যাঁতসেঁতে হয়ে উঠেছিল। বুকের ভেতরটা এমন ভারী লাগছিল যে নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল। ঠিক এমন সময়ই হঠাৎ ফোন থেকে একটানা মেসেজের শব্দ কানে আসল। অকস্মাৎ চমকে উঠল সে। চোখ বড় হয়ে গেল। সজাগ চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখল ফারহানের মেসেজ এসেছে।

এত সকালে! তারান্নুম ঘড়ির দিকে তাকালো। বাংলাদেশে সকাল ছয়টা বাজে। দুবাইতে তাহলে এখন হয়ত মাত্র চারটা বাজে। এই অসময়ে ফারহান কেন?

সে হাতে ফোন তুলল। স্ক্রিনের আলোয় তার ফুলে থাকা চোখ দুটো একদম উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। মেসেজ খুলে দেখল সেখানে লেখা, "কি জানি, কখন আমার কুইনের ঘুম ভাঙবে! অথচ তার চিন্তায় আমার ঘুম ভেঙে গেছে।"

অবিচল দৃষ্টিতে বার্তার দিকে তাকিয়ে রইল তারান্নুম। কিছুক্ষণ আগেই নেমে আসা এক অপার আঘাত এখনো তার ভেতরে ধ্বনিত হয়ে চলেছে, আর ঠিক এই সময়েই এমন কোমল শব্দের আদর—এটা তার কাছে বেমানান ঠেকল। সে নিস্পৃহ হাতে ফোনটি আগের জায়গায় রেখে নিঃশব্দে বসে রইল।

তবে ফারহান লক্ষ করল, সে বার্তা 'সিন' করেছে। ল্যাপটপ বন্ধ করে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল সে। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে বলল, "আশ্চর্য! আমার ঘুমকাতুরে গোবরচারিনী এখন জেগে আছে?" কপালের ভাঁজ গভীর করে একটু থেমে সংযোজন করল, "তবে সিন করে রিপ্লাই না দেওয়াটা দণ্ডনীয় অপরাধ। কুইন, এখন তোমাকে আমার জেলে বন্দী করা থেকে কে আটকাবে?" এ কথা ভাবতে ভাবতে আরেকটা মেসেজ পাঠাল সে, "হেই মাই গ্লিমার, চুপ আছো কেন? রিপ্লাই দিচ্ছ না যে..."

আবারও টুন শব্দে কেঁপে উঠল তারান্নুমের ফোন। কান্না কিছুটা থেমে এল, কিন্তু এবার আর আবেগে নয়, রাগে। চোখে আগুন জ্বলতে লাগল যেন। ঠোঁট কামড়ে ফোনটা হাতে নিল। টুকরো টুকরো ক্ষোভ জমে গিয়ে একটা বিস্ফোরণের অপেক্ষায় রয়েছে।

ফোন খুলে দেখল, আগের মতোই নরম, বেহায়া শব্দে মেসেজ সাজানো। তারান্নুমের ধৈর্যচূড়ান্তে গিয়ে পৌঁছাল। এবার আর না, এবার সে উত্তর দেবে। এমন এক উত্তর, যাতে ওর হৃদয়ের মায়াজাল ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। কিড়মিড় করে ফোনটা শক্ত করে ধরে টাইপ করতে শুরু করল। কিন্তু ঠিক তখনই স্ক্রিনটা কেঁপে উঠল।

ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল, ‘বজ্জাত ব্যাটা কলিং...’

কলটা রিসিভ করেই সে ঝাঁঝালো স্বরে বলে উঠল, "মাথায় কি ছিট আছে আপনার? সিন কইরা রিপ্লাই না দেওয়ার মানে বুঝেন না? তাও কল দিতাছেন ক্যান? আপনার প্রেম-পিরিতি রাখেন নিজের জন্য। আমার মোটেও আপনার সাথে কথা বলার ইচ্ছা নাই। আর আমারে কল দিবেন না।"

ফারহান অনুধাবন করল, আজ হয়ত তারান্নুম প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত অথবা চরমভাবে বিমর্ষ। তাই প্রতিক্রিয়ায় রাগ না দেখিয়ে সে যুক্তিসঙ্গতভাবে বোঝানোর প্রস্তুতি নিল। এদিকে কল কেটে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তারান্নুম আঙুলটা তুলতেই ফারহান তড়িৎ গতিতে বলে উঠল, "কুইন... কুইন প্লিজ, ওয়ান সেকেন্ড..."

তারান্নুমের আঙুল থেমে গেল। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ নিজের রাগকে ভিতরে পুরে রাখতে চেষ্টা করল। অবশেষে দম নিয়ে ফোনটা আবার কানে লাগাল। গলার ধরণ এবারও বদলায়নি, "ফাজলামো লাগাইছেন? আবার কুইন? শোনেন, আপনি আমার জীবন থেইকা সইরা যান। আমি আপনারে বিয়া করতে পারুম না। আমি আপনার জন্য না, আপনি আমার জন্য না। আমি আপনার স্ত্রী হওয়ার যোগ্য নই—এ কথা আপনারেই নয়, নিজেরেও বহুবার বলছি। আপনি একটা মর্যাদাসম্পন্ন, উৎকৃষ্ট নারীকে বিয়ে করুন। আমার জীবন থেকে আপনার প্রস্থান চূড়ান্ত। আমারে আর কখনো কল করবেন না, কথাটা মনেপ্রাণে গাঁইথা নেন। আর যদি দেন, আমি নম্বর ব্লক কইরা দিমু।"

ফারহানের বিমর্ষ মুখচ্ছবিই বলে দিচ্ছিল, কথাগুলো তার মর্মে কতটা আঘাত করেছে। তবুও সে নিজেকে সংবরণ করে গম্ভীর স্বরে বলল, "আমাকে কি একটুও বলার সুযোগ দেবে না তুমি?"

"যা বলার জলদি বলেন। সময় নেই আমার।"

ফারহান ঠান্ডা গলায় বলল, "ভিডিও কল দিচ্ছি, রিসিভ করো।"

তারান্নুম চোখ কুঁচকে তাকাল। গলায় ঝাঁজ নিয়ে বলল, "আপনি তো দেখি এক্কেবারে পা'গল। আপনার কি ধারণা আমি এহন প্রেম-ভালবাসার মুডে আছি?"

"আমি প্রেম করার জন্য বলিনি।"

"তাইলে?"

"আগে ধরো কলটা। তারপর দেখাচ্ছি।"

তারান্নুমের অন্তর্গত রাগ যেন হাতের তালু জ্বালিয়ে দিচ্ছিল। ইচ্ছে করছিল ফোনটা দেয়ালে ছুঁড়ে মারতে। তবু না চেয়ে থাকতে পারল না। মনের ভেতর একটা কৌতূহল তাকে রিসিভ বাটনে হাত রাখতে বাধ্য করল।

ভিডিও চালু হতেই ফারহানের চোখে পড়ল তারান্নুমের লাল হয়ে ওঠা চোখ, আর গালের ঠিক বাঁদিকে উজ্জ্বল আঙুলের চিহ্ন। যেটা অবিন্যস্ত চুলের আড়ালে লুকানোর গোপন চেষ্টা চলছে। ফারহানের চোখেমুখ এক মুহূর্তে কঠিন হয়ে উঠল, সে তীক্ষ্ণ গলায় বলল, "এসবের মানে কী? কে মে'রেছে তোমাকে? বলো, কে সাহস করল তোমাকে ছোঁয়ার?"

"শুনে কি করবেন আপনি?" তারান্নুমের ঠোঁট কাঁপল।

"এখনই গিয়ে কবরে শুইয়ে দিয়ে আসব তাকে।"

তারান্নুম না চাইতেও একটা ক্লান্ত, বিদ্রুপ মেশানো হাসি দিয়ে বলল, "মুখ সামলাইয়া কথা বলেন। মা'রছে আমার মা।"

ফারহান অনুশোচনায় জিভ কেটে চোখ মুদে নিল। এই প্রতিক্রিয়ার নেপথ্যে পারিবারিক কোনো গহিন ক্ষতই হয়ত রয়েছে। যেহেতু সে এখনো এই পরিবারে আত্মীকভাবে স্বীকৃত নয়, তাই মা-মেয়ের মধ্যকার স্পর্শকাতর বিষয়ে মতপ্রকাশ করা তার অনুচিত। তাই প্রসঙ্গ এড়িয়ে একটু থেমে হেসে বলল, "ওপস! সরি, কুইন। শ্বাশুড়িমাকে সালাম জানাবে। কিন্তু আমি তোমার গালের ওই লালচে দাগটা একদম সহ্য করতে পারছি না। ইচ্ছে করছে এখুনি বাংলাদেশে উড়ে গিয়ে ওই দাগটা চুমু খেয়ে মুছে দেই।"

তারান্নুম চোখ গরম করে বলে উঠল, "বদের বাচ্চা বদ! কি দেখাইবেন বলেন জলদি।"

ফারহান নিঃশব্দে হাসল। ক্যামেরার ফ্রেমটা সামান্য কাঁপতে কাঁপতে একটা ঘরের দরজার সামনে থেমে গেল। হ্যান্ডেল চেপে দরজাটা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই ক্যামেরার উলটো বাটনে চাপ দিল সে।

তারান্নুমের চোখ বিস্ময়ে গোল হয়ে গেল। দৃষ্টিপথে ধরা দিল এক স্বপ্নের রাজ্য। পুরো ওয়াক-ইন ক্লোজেট সাজানো শাড়ির ঢিবি দিয়ে। বেনারসি, জামদানি, কটন, তসর, গরদ—এত এত শাড়ি যে তারান্নুম হয়ত গুনেও শেষ করতে পারবে না৷ পাশে স্তরে স্তরে সাজানো লেডিস ব্যাগ, চোখ ধাঁধানো দামি হিল, জুতো আর পারফিউমের সারি। এক মুহূর্ত যেন নিশ্বাস নিতে ভুলে গেল তারান্নুম।

ফিসফিস করে বলে উঠল, "হায় আল্লাহ! এত্ত শাড়ি... এত্ত ব্যাগ কার লাইগা?"

ফারহান ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে বলল, "আমার বউয়ের লাইগা..."

তারান্নুম মুহূর্তেই শিরদাঁড়া সোজা করে চোখ কুঁচকে তাকাল, "কিহ! মানে? আপনি ম্যারিড?"

ফারহান ভ্রূ একটুখানি নাচিয়ে বলল, "হুম। এই যে কথা কইতাছি, এইটাই আমার ফিউচার ওয়াইফ।"

তারান্নুম থতোমতো খেয়ে গেল। সংকোচে লাল হয়ে উঠল গাল। মুহূর্তের মধ্যে চোখের পানি, রাগ, অভিমান—সব গলে গিয়ে ঠোঁটের কিনারা নরম হাসিতে পরিণত হলো। সে মুখ নামিয়ে রাখল।

ফারহান ক্যামেরা ঘুরিয়ে নিজের মুখের দিকে নিল। দুষ্টুমি চোখে হাসিমুখে বলল, "এই যে লাজুক মুখখানা দেখছি, এটুকুই তো আমার বাঁচার জ্বালানি। তুমি জানো না গোবরচারিনী, কীভাবে তুমি আমাকে দিনে দিনে নিঃশেষ করে দিচ্ছো। কারান এমনিতেই প্রতিনিয়ত আমার বিয়ের তৃষ্ণা দ্বিগুণ করে তুলছে। দেখবে একদিন কোনো নোটিশ না দিয়েই তোমার দুয়ারে এসে উপস্থিত হব! এরপর সোজা বাসর..."

তারান্নুম চোখ উল্টিয়ে বলল, "বাসর মানে? আগে বিয়া করবেন না নাকি?"

ফারহান ভ্রূক্ষেপে হেসে বলল, "উল্‌লাহ বাবা! বিয়ে করার জন্য আমার বউ দেখি উত্তেজিত হয়ে আছে।"

এ কথায় তারান্নুম আরও রাঙা হয়ে গেল। ঠোঁটে একরাশ চাপা হাসি ফুটে উঠল। দৃশ্যটা দেখে ফারহানের হাসিও চেপে রাখা কঠিন হয়ে পড়ল।

একটু থেমে তারান্নুম কৌতুকে বলল, "আপনি কি আমারে ব্যঙ্গ করতাছেন, না কি আমার ভাষার অনুকরণে পারদর্শী হইয়া গেছেন?"

"তোমার কাছ থেকেই তোমার ভাষা শিখে নিয়েছি, মাই গ্লিমার!" তারান্নুম এক ফালি হাসি নিয়ে বিছানার হেডবোর্ডের কাছে গিয়ে মাথা ঠেকিয়ে বসল। ফারহান আবারও রসিকতা করে বলল, "এই যে বেবি, ‘মাই গ্লিমার’ নামটা কেমন লাগল তোমার?"

"বলতাম নট।"

ফারহান চোখ কুঁচকে বলল, "ঘাড়ত্যাড়া কুইন আমার।"

তারান্নুম ঠোঁটে হাসি লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করল। ফারহান বলল, "তোমার হ্যাকার বফ কিন্তু বাইক রেসারও। ভাবছি বাংলাদেশ গিয়ে তোমাকে পিছনে বসিয়ে পুরো পৃথিবীটাকে ঘুরিয়ে দেখাব।"

"হাহ্! এই কথা তো সব প্রেমিকই বলে, পৃথিবী দেখাবে! পৃথিবী বুঝি আপনার পিতৃদত্ত সম্পত্তি!"

ফারহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "আহ্! দিলে তো আমার রোমান্টিক মুডে পানি ঢেলে!"

তারান্নুম মুখ টিপে হাসল। ফারহান তখন নরম স্বরে বলল, "তুমি জানো না, তোমাকে ঘিরে আমি কত শত স্বপ্ন বুনেছি! যেটার একটিরও বাস্তবায়ন এখনো হয়নি, অথচ তুমি প্রতিদিনই আমার স্বপ্নের ঠিকানায় নতুন প্রদীপ জ্বেলে দাও।"

তারান্নুম ভেংচি কেটে চোখ সরু করে বলল, "হইছে, এইবার দয়া কইরা কল কাইটা দিন।"

ফারহান ভ্রূ উঁচিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "উঁহুঁ, আরও একটা সারপ্রাইজ বাকি আছে।"

"আবার কি?"

হঠাৎই ফারহানের চোখের ভাষা পাল্টে গেল। মুখে নেশালো ঘোর, ঠোঁটের কোনে সম্মোহনী হাসি ফুটে উঠল। ক্যামেরার এ-পার থেকে ওভাবে চেয়ে থাকায় তারান্নুমের বুকের গভীরে কোথাও কেমন একটা অস্বস্তি দোলা দিল। সে কাঁধ সোজা করে, ঠোঁট শক্ত করে কিছু একটা বলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখনই ফারহান ঠোঁট গোল করে আচমকা একটা উড়ন্ত চুমু ছুঁড়ে দিল ক্যামেরায়।

তারান্নুমের চোখ দুটো চড়কগাছ। সে হতভম্বভাবে তাকিয়ে রইল স্ক্রিনে। ফারহান আড় হাসল। ক্যামেরার কাছে মুখ এনে নরম কণ্ঠে বলল, "তোমাকে আজকে কেমন যেন বউ বউ লাগছে, কুইন।"

তারান্নুম এবার রাগে ফুঁসতে লাগল। দাঁত কামড়ে বলল, "হ্যাকাইরা হালা! তোর ঠোঁট যদি না ছিঁড়ছি আমি, আমার নাম তারান্নুম না!"

ফারহান হেসে দুই হাত মাথার ওপরে তুলে আলসে আড়মোড়া ভাঙল। "অনেক দিন চুমু খাই না, মাই গ্লিমার। প্রোটিনের অভাবে ঠোঁট দুটো শুকিয়ে যাচ্ছিল ..."

তারান্নুম চট করে বলল, "অনেক দিন চুমু খান না মানে? আগে খাইছেন নাকি?"

ফারহান জিভ কেটে মাথা চুলকাতে চুলকাতে গলায় একটু খাঁকর দিল। চোখের দৃষ্টি এদিক ওদিক ছুঁড়ে দিয়ে আনমনে বলল, "খাইছে রে! একে এখন কেমনে বুঝাই যে শুধু চুমু না, আরো অনেক কিছুই খাওয়া হয়ে গেছে।"

তারান্নুম চোখ সরু করে বলল, "কি হলো? বলছেন না কেন?"

ফারহান কাশির শব্দ করে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল, "মা-বাবাকে ছোটবেলা অনেক চুমু খেয়েছি, আর এখন তো বউকে খাওয়ার পালা।"

এই কথায় তারান্নুমের চোখে বিদ্যুৎ চমকালো যেন। সে একপাশে মুখ ফিরিয়ে মুচকি মুচকি হেসে নিজের লাল গাল দুটো ঢাকতে চাইল। কিন্তু ততক্ষণে গালের রং টকটকে গোলাপের পাপড়ির ন্যায় হয়ে উঠেছে। ফারহান কথার মোড় পালটে বলল, "তোমার ভাই ভাবির সাথে পরিচয় করিয়ে দিলে না?"

"তারা এখন কিছুদিনের জন্য ঢাকাতে আছে। থাকুক কিছুদিন, তারপর করাইয়া দিব ভাই ভাবির প্যাকেজ প্রেজেন্টেশন।"

ঠিক তখনই তারান্নুমের গালে একটা মশা বসে গেল। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফারহান চিৎকার দিয়ে উঠল, "এই, এই কুইন! মা'রো মশাটাকে! মে'রে ফেলো জলদি, ও আমার খাবারে ভাগ বসাচ্ছে।"

তারান্নুম চোখ বড় করে তাকাল। "কীসের খাবার?"

ফারহান ঠোঁট কামড়ে হাসল, "তোমার গাল... ওটা তো আমার মেন্যুতে বুকিং করা। মশাটা কীভাবে ঢুকলো ওখানে!"

তারান্নুম খিলখিল করে হেসে উঠল। অথচ ফারহানের মুখে তখন রীতিমতো বিদ্রোহের ছাপ। সে চোখ কুঁচকে বলল, "জা'নোয়ার মশা! তোর কলিজা ছিঁড়ে মাছির বাচ্চাদের ডিনারের আয়োজন করব আমি। বেয়াদব কোথাকার! মা-বাপ শিক্ষা দেয়নি তোকে? অন্যের বউকে চুমু খাস? তোর নিজের বউ নাই?" তারান্নুম হাসতে হাসতে বিছানায় লুটিয়ে পড়ল, অথচ ফারহানের তীক্ষ্ণ উপহাস অব্যাহত থাকল, "তুমি এসব মূর্খ, অর্ধ-সভ্য মশাদের সঙ্গে বাস করো? ঘরের শত্রু বিভীষণ! তুমি সহ্য করো কি করে এদের? মালকিনের গালে কামড় দিয়েছে, দাঁতগুলো এক এক করে ভেঙে গুঁড়ো করে দাও তো, বেবি!"

তারান্নুমের হাসির তোড় এবার এমন তীব্র হলো যেন হাসতে হাসতেই দমবন্ধ হয়ে যাবে তার। তার হাসির উচ্ছ্বাস দেখে অবশেষে ফারহান নিজেও হেসে উঠল।

আসলে তারান্নুম আজ বিষণ্ন ছিল, ভেতরে জমে ছিল অভিমান; তাই ফারহান সেই বিষণ্নতাকে হাসির রোদের নিচে শুকিয়ে তুলল। এভাবেই দুষ্টু-মিষ্টি কথোপকথনের মাধ্যমে তাদের সময়টা কেটে যেতে লাগল...

অন্যদিকে বাড়ির পেছনের বাগানে আম্বিয়া ফাতিমার হাত ধরে টেনে সিমেন্টের পুরোনো বেঞ্চে বসালেন। তারপর চোখে-মুখে কঠোরতা জড়ানো ভঙ্গিতে বললেন, "আর রমজানরে কি করছস?"

ফাতিমা চোখ না সরিয়েই নির্ভীক গলায় জবাব দিলেন, "তুমি যেমন তোমার স্বামীরে খু*ন করছো, তেমন আমিও করছি।"

🍁চলবে?🍁

#Tell_me_who_I_am

#পর্ব_৭_দ্বিতীয়াংশ

#আয়সা_ইসলাম_মনি

(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)

🍁২য় খণ্ড🍁

__________________________________________☞

মিরার হৃদয়ের অন্তঃস্থলে প্রবল ঝঞ্ঝা আছড়ে পড়ল। কপালের ভাঁজ ক্রমশ গাঢ়তর হলো, গলা শুকিয়ে এলো। "তুমি... তুমি এসব আজেবাজে কথা কেন বলছ, কারান? এসব-এসব নিছকই বিভ্রান্তি। আমি তো এখন তোমাকে নিয়েই সন্দেহ করছি। তুমি আমার কারানই তো? বাহির থেকে আসার পর থেকেই তোমার আচরণ বদলে গেছে। তুমি ঠিক আছো তো? তোমার মাথায় এসব কে ঢুকিয়েছে?"

"আমার স্পর্শ পেয়েও কি তোমার মনে হয় আমি অন্য কেউ?"

মিরা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। সত্যিই তো, এ যে নিঃসন্দেহে তার কারানই। তবুও তার মাকে নিয়ে উচ্চারিত সেই নির্মম বাক্য মনের গভীরতায় প্রবল অস্বস্তি সৃষ্টি করছে। কথাগুলো মিরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না।

কারান আবার বলল, "হয়ত আজ বিশ্বাস করতে পারবে না। তবুও শুধু এটুকু মনে রেখো, যা-ই ঘটুক না কেন, যত গভীর আঁধারেই ডুবে যাক জীবন, আমার প্রতি তোমার বিশ্বাস যেন ভাঙে না। আমি তোমাকে ভালোবাসি, মিরা। নিজের জীবন, আত্মা, অস্তিত্বের চেয়েও বেশি ভালোবাসি।" মিরার ঠোঁটে আলতো করে বুড়ো আঙুল ছুঁয়ে কণ্ঠস্বর আরো কোমল করে বলল, "I love you endlessly. I'm madly and hopelessly in love with you. I love you more than words can express. You're the only one my soul aches for. Loving you is the only thing I’m certain of. Even if the whole world turns against me, I will still love you. Do you even realize how deeply I love you?"

মিরার শ্বাস গাঢ় হয়ে এলো। ফিসফিস করে বলল, "তুমি আমাকে যেন হিপনোটাইজ করে ফেলছ, কারান।"

কারান অনড় চোখে বলল, "তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দাওনি, মিরা।"

চোখ নামিয়ে নিল মিরা। বুকের ভেতর জমে থাকা অজস্র কথা তার ঠোঁট থেকে বেরিয়ে এলো, "আমি জানি, তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো। সত্যিই আমি তা বুঝতে পারি। তুমি যেন এক সীমাহীন মহাসাগর, আর আমি কেবল তটরেখায় দণ্ডায়মান। তোমার ঢেউয়ের আঘাত অনুভব করি বটে, কিন্তু গহ্বরের গভীরতা স্পর্শ করতে পারি না। আমার ভালোবাসা হয়ত তোমার মতো প্রবল ও বিধ্বংসী নয়; কিন্তু প্রতিটি নিশ্বাস, প্রতিটি প্রার্থনা, প্রতিটি অশ্রুবিন্দুতে আমি শুধু তোমাকেই খুঁজে ফিরি।"

মিরার কণ্ঠ থেমে যেতেই কারান হঠাৎ তার ঠোঁটযুগল নিজের ঠোঁটের মাঝে বন্দি করে ফেলল। অপ্রস্তুত মিরা প্রথমে খানিকটা কেঁপে উঠল। কিন্তু সে দ্রুতই নিজেকে সামলে নিল। কারানের ঠোঁটের তীব্রতা ক্রমেই গভীর হলো। মিরা শুধু তাকিয়ে রইল। সে ইচ্ছাকৃতই নিজেকে এই আবেগঘন মুহূর্তে ছেড়ে দিয়েছে, যাতে কারান নিজের মতো করে তার ঠোঁটটিকে আগলে ধরতে পারে। তবু কারান চুম্বনকে দীর্ঘায়িত করল না; মায়াময় স্পর্শের পর সরে মিরার দিকে তাকিয়ে রইল। মিরার ঠোঁটে অনিচ্ছুক মধুর হাসি ফুটে উঠল। সে হালকা শ্বাস ফেলে জানালার দিকে মুখ ফেরাল। দেখল, আকাশের প্রান্তে ম্লান অন্ধকারের ভেতর থেকে আলো ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। জানালার কাচে আলো প্রতিফলিত হলেও ভারী পর্দার কারণে ঘরের ভেতর অন্ধকার প্রায় অটুট।

কারান লক্ষ্য করল, মিরা আর তার দিকে তাকাচ্ছে না। সেও ধীরে ধীরে মিরার মতোই দৃষ্টি ফেরাল জানালার দিকে। কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর সে উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে কাচ খুলে দিল। সঙ্গে সঙ্গেই ঘরে ঢুকে পড়ল সকালের স্নিগ্ধ বাতাস।

মিরাও উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কারান মিরার পেছনে এসে ধীর কণ্ঠে বলল, "এবার কাজে লেগে পড়ি, বেগম।"

মিরা জানত, কারানকে বারণ করলেও সে শুনবে না। "চলো, দুজনে মিলে করলে অনেক দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।"

কারান গম্ভীর মুখে কঠিন গলায় বলল, "মিরা, এক বছর আগে তোমাকে দিয়ে কাজ করানোর অর্থটা ভিন্ন ছিল। কারণ আমি চাই তুমি এমনভাবে শেখো, যাতে আমি না থাকলেও তুমি আমার সাম্রাজ্য শাসন করতে পারো একাই। কিন্তু আমি থাকতেও যদি তোমাকে পরিশ্রম করতে দিই, তবে আমি কীভাবে তোমার রক্ষক হলাম? আর তুমি আমার রানি, আমার মহারানি ভিক্টোরিয়া, তোমার জন্য সুরক্ষা ও আরামের রাজত্ব গড়ে তোলাই আমার কর্তব্য। অথচ তুমি আমার কথার মানেই বুঝতে পারো না।"

"একসাথে কাজ করার মধ্যেই তো প্রকৃত আনন্দ, কারান। দুজনের খুনশুটি, দুষ্টুমিভরা আলাপ, কাজের ফাঁকে একটু কাছে আসা—এই যে স্পর্শের ক্ষণস্থায়ী উষ্ণতা, এই শান্তি আর কোথায় পাবে বলো?

তুমি হয়ত বলবে, আমাকে 'প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট' দিতে চাও। কিন্তু আমি তো কখনো এটা চাইনি যে আমি রাজকন্যার মতো বসে থাকব, আর তুমি সব বোঝা একা কাঁধে নেবে। আমার কাছে আদর-যত্ন মানে হলো বোঝাপড়ার সুন্দর সমীকরণ। তার উপর তোমার হাতে ব্যথা। এই অবস্থায় তুমি এত এত রান্না করবে, তা মেনে নিলে আমি তো নিজের কাছেই অপরাধী হয়ে যাব। আমি যদি তোমার ক্লান্তি অনুভব না করি, কষ্টকে ভাগ না করি, তবে কেমন স্ত্রী আমি? কেন কেবল স্বামীকেই স্ত্রীর খেয়াল রাখার দায়িত্ব নিতে হবে?"

কারান ঠোঁটের একপাশে হেসে মিরার কোমল গাল দুটো হাতের মাধ্যমে বন্দি করল। "But I’ll manage, Starling."

"এটা কি নতুন নাম?"

"I’ve given you a hundred already. And you noticed just this one?"

"বুঝলাম। কিন্তু আমি মোটেও তোমাকে একা একা কাজ করতে দিচ্ছি না।"

কারান ভ্রূ কুঁচকে বলল, "বেশি জেদ করলে আপনাকে সেন্সলেস করে রেখে রান্না করতে যাবো।"

"এতক্ষণ যে এত বড় বড় বানী ছাড়লাম। কোনো কাজেই আসল না দেখছি।"

কারান মৃদু হাসি নিয়ে পাঞ্জাবি খুলে রাখল। ক্লোজেট থেকে তুলে আনল একখানা সরল টিশার্ট, তার সঙ্গে পরে নিল একটি ঢিলেঢালা ট্রাউজার। মিরাও ততক্ষণে বোরকা অপসারণ করল। তারপর গায়ে জড়াল কারানের কালো শার্ট, যার বুকের দুইটি বোতাম খোলা। সেই ফাঁক গলে উজ্জ্বল শ্বেতবর্ণ বক্ষখণ্ডের রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শার্টটি তার হাঁটুর কাছ পর্যন্ত নেমে এসেছে, আর নিম্নাঙ্গের প্রকাশ্য অংশ আবেশ ছড়িয়ে দিচ্ছে।

মাথার উপরে চুল তুলে কাঁকড়া ব্যান্ডে জড়ো করতে শুরু করল মিরা।

কারান দুই হাত ট্রাউজারের পকেটে গুঁজে, দৃষ্টিকে নিবিষ্ট করে মিরাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।

____

কারান রান্নাঘরে প্রবেশ করে গায়ে অ্যাপ্রোন জড়িয়ে নিল। মিরা এগিয়ে এসে নরম স্বরে বলল, "এবার বলো, আমি কী করব? আচ্ছা, সবজিগুলো বরং কেটে দিই।"

কারান একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলল, "চুপচাপ গিয়ে সোফায় বসো।"

"তুমি একা সামলাতে পারবে না। তার উপর হাতের এই অবস্থায়..."

"যেতে বলেছি।"

মিরা কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে তার খামখেয়ালি রাগের অন্তরালে লুকোনো স্নেহ বুঝে নিল। অবশেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে গিয়ে সামনের সোফায় বসে পড়ল। কারান নিষ্ঠাভরে মাংস ধুয়ে নিল, তারপর সমান আকারে টুকরো করতে লাগল।

সোফায় বসে মিরা কিছুক্ষণ তার কাজ লক্ষ্য করল। পরে গলা উঁচু করে বলল, "কারান, এখান থেকে তো কথা বলার জন্য আমাকে গলা উঁচু করতে হয়। বরং আমি একটা চেয়ার টেনে কিচেনেই বসি?"

কারান মাথা না তুলে ছুরি চালাতে চালাতেই বলল, "কিন্তু তোমার উন্মুক্ত পদযুগল যে আমাকে সি'ডি'উস করে ফেলবে, তাই দূরে বসিয়েছি।"

লজ্জায় মিরার গাল রক্তাভ হয়ে উঠল। সলজ্জ ভঙ্গিতে সে সোফা থেকে একটি কুশন তুলে নিল। চেয়ার টেনে রান্নাঘরের কোণে বসল, আর কুশনটা পায়ের ওপর রেখে মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল, "এবার চলবে?"

কারান ছুরি থামিয়ে এক মুহূর্ত তার দিকে তাকাল। তবে সে নিজেকে সংযত করল। পুনরায় কাজে মন দিয়ে বলল, "আমার তো গিনেস বুকে নাম ওঠা উচিত। বউ এত হট ফিগার নিয়ে সামনে বসে আছে, আর আমি নির্বিকারভাবে কুকিং করছি।"

মিরা মুচকি হেসে কথাটাকে এড়িয়ে মাথা কাত করল, "কারান, আমি তো তোমার থেকে ছয় বছরের ছোট, তাই না?"

"হ্যাঁ, বাচ্চা তুমি।"

"বাচ্চা? তুমি চাইলে আমি বাচ্চার মাও হয়ে যেতে পারি। আর ভালো কথা মনে করিয়ে দিলে, আমাদের বেবি কবে আসবে, কারান?"

"দুইটা বেইবি সামলাতে পারবে না, সুইটহার্ট।"

মিরা চোখ কপালে তুলল, "দুইটা? টুইন বেবি আসবে নাকি?"

"উঁহুঁ। একটা বাচ্চার নাম কারান, আর যে আসবে তার নাম হবে কায়রা।"

মিরার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে হাতদুটো একসঙ্গে জড়িয়ে নরম স্বরে বলল, "মা শা আল্লাহ! নামটা কিন্তু দারুণ, হানি। কারান প্লাস মিরা সমান কায়রা, তাই তো?"

কারান নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। মিরা হঠাৎ ভ্রূ কুঁচকে কণ্ঠে বিদ্রুপ নিয়ে বলল, "আর তুমি বাচ্চা?"

কারান মাংস গুলো পাত্রে রাখল। এরপর পেঁয়াজ রসুন কাটতে কাটতে বলল, "বাচ্চাই তো। তুমি সবদিক থেকে বিবেচনা করলে দেখবে, আমার মতো ইনোসেন্ট, অবুঝ, নির্দোষ শিশু আরেকটা নেই।"

মিরা চোখ পাঁকাল, নাক ফুলিয়ে ঠান্ডা স্বরে বলল, "হুম, দামড়া শিশু! কিন্তু কারান, এবার আমি সিরিয়াস। খুব বেশি সিরিয়াস কিন্তু।"

"কি নিয়ে?"

মিরা ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। এরপর লাজুক হেসে বলল, "আমরা বেবি নিচ্ছি কবে?"

_______

ফাতিমার কথা শুনে আম্বিয়ার পায়ের নীচ থেকে যেন মাটি সরে গেল। হঠাৎ মনে হলো, তার বয়সজীর্ণ শরীরের ভিতরকার সমস্ত শক্তি এক নিমেষে নিঃশেষ হয়ে গেছে। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো, মাথা ঘুরে উঠল; তিনি পড়ে যাচ্ছিলেন ঠিক তখনই ফাতিমা উঠে দাঁড়িয়ে তাকে জাপটে ধরলেন। "আম্মা!"

ক্লান্ত অস্থি, কাঁপা শরীর, তবু মনের দিক থেকে আম্বিয়া ছিলেন অনমনীয়। মেয়ের হাত নিজের শরীর থেকে সরিয়ে দিতে দিতে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, "আমারে ধরিস না। আমি ঠিক আছি। ক্যান মা'রলি ছোড়াটারে? কী দোষ আছিল ওর? তোরে তো ভালা ঘরেই বিয়া দিছিলাম। ক্যান মা'রলি, মুখপুরি?"

এই প্রশ্নে মুহূর্তের মধ্যে ফাতিমার চেহারা আগুনের লেলিহান শিখায় রূপ নিল। চোখে জ্বলে উঠল দাউ দাউ অঙ্গারের শিখা, ঠোঁট কেঁপে উঠল বহুদিনের ক্ষতবিক্ষত অভিমানে। তিনি থেমে থেমে উচ্চারণ করলেন, "ভালো ঘর? কোন দিক দিয়া ভালো ঘর? জা'নোয়ারের থাবার নিচে ফালাইয়া দিছিলা, আম্মা! ওর চোখের চাহনি, ওর হাতের ছোঁয়া—সব আছিল র*ক্তপিপাসু হায়েনার মতোন। ক্যান বিয়া দিছিলা? হ্যাঁ? কীসের অভাব আছিল তোমার? তোমার মাইয়ারে দু-মুঠো খাওয়াইতে এত খরচ হইত?"

কথাগুলো শুনে আম্বিয়ার বুকের ভেতর ঝড় বইতে লাগল। ফাতিমার চোখে তখন জল চিকচিক করছিল, অথচ সেই জলের গভীরে দুঃসহ অন্ধকার ইতিহাস লুকিয়ে আছে, এমনই ধারণা হলো আম্বিয়ার। তার কুঁচকে যাওয়া আঙুল ধীরে ধীরে বাড়ালেন মেয়ের কাঁধের দিকে। হাতের ছোঁয়া ভারী হলেও তাতে মমতা মিশে ছিল। কণ্ঠটা আগের মতো কঠোর রইল না, "বয়।"

বুকভরা ক্রোধ আর চোখভরা কান্না নিয়ে ফাতিমা ধীরে ধীরে বসলেন। আম্বিয়া মাটির দিকে দৃষ্টি নামিয়ে বসে পড়লেন মেয়ের পাশে।

সামান্যক্ষণ নীরব থাকার পর তার চোখ গভীর হয়ে উঠল, গলার স্বর আরো নরম হয়ে এলো, "এইবার সব খুইলা ক। আমি শ্যাষ পোরযোন্ত শুনবার চাই।"

ফাতিমা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে শুরু করলেন, "ওই বাড়তে যাওয়ার পর পোরথোম দিকে মনে হইছিল, আল্লাহ কী সুন্দর সংসার দিল আমারে! সবাই এত্ত ভালো, এত্ত যত্ন করত আমারে... তোমার জামাই তো এক মুহূর্তও চোখের আড়াল করতে চাইত না। শাউড়ী, ননদ, সবাইর আদরের যেন কেন্দ্রবিন্দুই আছিলাম আমি। রান্নাঘরে গেলেও কামে হাত দিতে দিত না। বলতেন, ‘এতাগ্গিন হামের বেডি তাইকতে, তোঁয় কিল্লাই হষ্ট হইত্তা লাইগ্গু, বউ?’

(এতগুলো কাজের লোক থাকতে, তুমি কেন কষ্ট করবে, বৌমা?’)

তহন মনে হইছিল, সত্যি আমি কত ভাগ্যবতী! এমন সংসার কয়জনে পায়!

আমি তহন নতুন জায়গায় দেইখা চট্টগ্রামের ভাষা বুঝবার পারতাম না ভালো কইরা, শুধু রমজানের মুখের কথাই ধরতে পারতাম। তাই স্বামীরে নিয়াই স্বস্তি খুঁজতাম।

এরপর যহন দুই মাসের মাথায় তালহা পেটে আইলো, তহন তো আরও আপন কইরা নিল সবাই। পোরথোম সন্তান ছেলে হইছে, এই আনন্দে সারা বাড়িই মাতোয়ারা। আমি নিজেও খুশি হইছিলাম খুউউব—কে না চায় এরম শুউরবাড়ি?

কিন্তু আম্মা... ওই আনন্দ বেশিদিন টিকল না৷ আমি অচিরেই বুঝতে পারলাম, ওইসব সবই মুখোশ আছিল, সবই অভিনয় আছিল। সব... সব মিথ্যা আছিল, আম্মা। ওদের ভালোবাসা আসলে আমার উপর না, আমার বাপের ক্ষমতার উপর আছিল। আমি চেয়ারম্যানের মাইয়া বইলাই তহন এত আদর দিছিল সবাই। তালহা পেটে, অথচ তোমার জামাই তহন চাকরির লাইগা ঘরে নাই। ঠিক তহনই বাড়ির সবাইর আচরণ এক্কেবারে পাল্টাইয়া গেল। ভিত্রে ভিত্রে দম বন্ধ হইয়া আইতে লাগল।

আমি ভাবলাম, থাক, এই অবস্থায় বাপের বাড়ি গেলে শান্তি পাব। কিন্তু শাউড়ী তহন এমন কথা কইলেন, যেটা শুইনা বুকটা হিম হইয়া গেছিল। কইলেন, ‘যাইতা লাইগ্গ্যু দে বালা হতা, তইলে লগে কিছু লই আইন্ন্যু।’

(যাবে তো ভালো কথা, তাহলে সাথেও কিছু নিয়ে এসো।’)

আমি কিছুই বুঝবার পারলাম না। হাদার মতোন তাকাইয়া রইলাম শুধু। তহন শাউড়ী সরাসরি কইলেন, ‘গয়নাগাটি লই আইচ্চু। বুইজ্জ্যু নে?’

আমি হতভম্ব হইয়া গেলাম। এতদিনের আদরটা যে আসলে আছিল লোভের মুখোশ, সেইটা তহন পোরথোম বুঝলাম। তুমি তো জানোই, তোমার মাইয়া সরল-সোজা, তোমার মতোন অত শক্ত না, তাই মুখ খুলতে চাইয়াও কিছুই কইতে পারলাম না। মনের ভিত্রে ঝড় উঠলেও তহন কোনো প্রতিবাদ করতে পারলাম না। শুধু গিল্লা ফালাইলাম।

এরপর যহন এই বাড়তে পা রাখলাম, তহন মনে মনে ভাবলাম, এইবার হয়ত সবকিছু বদলাইয়া যাইব। কিন্তু শাউড়ী যহনই চিঠি পাঠাইতো, পোরথোমে ভালো ভালো কথা কইয়া লাস্টে বলতেন, ‘গয়না আনতে ভুলে যাবে না কিন্তু!’

আমি চুপচাপ চিঠিখান পইড়া যাইতাম, কিন্তু চিঠির উত্তর পাঠাই নাই কোনোদিন। ভাবছিলাম সময় গেলে হয়ত শান্ত হইব, ভুইলা যাইব।

তারপর তালহা হওয়ার পর যহন পোরথোম ওই বাড়তে পা রাখলাম, জামাই আদরের মতোন আমারেও বরণ করা হইলো। দুই’দিন মনে হইলো, হয়ত সত্যিই এইবার আগের মতোন ভালোবাসা জুটবো, ঘরটা আলোকিত হইব। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন রইল না। কিছুদিন যাইতেই ননদ আর শাউড়ি মিল্যা আমারে ঘির‍্যা ধরল। তীক্ষ্ণ চোখে তাকাইয়া জিগাইল, ‘গয়না আনছো তো?’

তাদের কণ্ঠে তহন আনন্দ দেহি নাই, দেখলাম পশুর মতোন দুইটা চোখ, যার মধ্যে দাবি জ্বলজ্বল করতাছে। ছেলে জন্মের খুশিতে এতদিন চাইপা রাখছিল কথাগুলান। আমি গভীর শ্বাস নিয়া সাফ সাফ উত্তর দিলাম, ‘আম্মা, এই বাড়িতে আসার সময় আমার বাপ-মা যতটুকু সামর্থ্য আছিল, সব দিয়া দিছে। আমার মায়ের হাত বালা, কানের দুল, গলার হার, কোমরের বিছাটা পোরযোন্ত দিয়া দিছে। এ ছাড়াও পাঁচখান আংটি, হাতপাটি, মনিহার, গলার পাতি, নথ, মাথার মুকুট, আপনার ছেলেরে চওড়া চেইন—কম তো দেয় নাই; সেই গয়না দিয়াই আপনার সারাটা জীবন সুখেই কাইটা যাইব, লগে আপনার মাইয়াটারেও দিতে পারবেন। এহন আর আমি কিছুই আনতে পারব না বাপের বাড়ি থেইকা।’

কথাটা কওয়ার সময় বুকটা কাঁইপা উঠছিল। কারণ আমার বাপের ঘাম ঝরানো টাকায় কেনা গয়না ওগুলা, আমার মায়ের গায়ের গন্ধ মিশানো গয়না ওগুলা, এতকিছু দেবার পরও ওগো চোখে সামান্য মনে হইল? সবসময় শুধু আরও চাই, আরও দেও। শুধু চাই আর চাই। আমার চোখ ভিজ্যা উঠছিল, তবুও নিজেরে শক্ত রাখলাম।

কিন্তু আমার মুখে অমন কথা শুইন্যা শাউড়ির চোখ লাল হইয়া গেল, তেড়ে আইসা মুহূর্তেই আমার গালে একখান জোরে থাপ্পড় দিল। সঙ্গে সঙ্গে গালটা ফুইলা উঠল। ব্যথায় চোখে পানি চইলা আইছিল, বুকের ভিত্রে আগুন জ্বলতাছিল, তবুও কিছু কইলাম না। কারণ তুমি তো শিখাইছ, ‘বড়রা রাগে অনেকসময় টুকটাক কটু কথা বা কটু আচরণ করতেই পারে, কিন্তু জবাবে যদি সেও একই আচরণ করে, তাহলে সে প্রকৃত শিক্ষা পায় নাই। অভদ্রতা পারিবারিক দিকেও আঙুল তুলে, বংশের উপরও কথা ওঠে।’ এই কথা মনে কইর‍্যা সব সহ্য কইর‍্যা নিলাম।

কিন্তু তার বিড়বিড় করা কথাগুলান আমার কানে এহনও বাজে, ‘যেত্তর বড় গাল নো, এত্তোর বড় হতা! সুরুতের নাই কোনো ফুয়াদ, নাই কোনো ঢং, এনে তো কাইল্ল্যে মাইয়া। আবার আঁরে হতা উনাইতু আইচ্চে দে! রমজান আইয়্যুক এক্কানা...’

(‘যত বড় মুখ না, তত বড় কথা! চেহারার তো না আছে রূপ, না আছে ঢং, তার উপর কালো মেয়ে, আবার আমাকেই কথা শোনায়! এবার রমজান আসুক শুধু।’)

আম্মা, তহন মনে হইছিল মাটি ফাইট্যা গেলে তলায়ে যাইতাম। আমার গায়ের রং শ্যামলা দেইখা মাইরের দাগটা বাইর থেইকা বোঝা যায় নাই, কিন্তু ভিত্রের ক্ষত তো কোনোদিন সারল না। ঘরের ভিত্রে একা বইসা কাঁনতেছিলাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বুকের ভিত্রেটা ভাইঙা যাইতেছিল। ইচ্ছা করছিল তহনই তোমার কাছে ছুইটা যাই, তোমারে জড়াইয়া ধরি। তোমার কাছে যাইতে তো মানা নাই, কিন্তু পারলাম না। বাপটার লাইগা পারলাম না। তার সম্মানের লাইগা পারলাম না। গেরামের মানষের চোখের লাইগা পারলাম না। তারা তো বলত, ‘চেয়ারম্যানের মেয়েরে স্বামীর বাড়ি থেইকা তাড়াইয়া দিছে’ এই কথার বোঝা তোমার ঘাড়ে চাপাইতে ইচ্ছে করে নাই। কারণ বাপটারে তো চিনি, সব দোষ তোমারেই দিত, তোমার পেটরেই দিত। তাই যন্ত্রণা বুকের ভিত্রে চাপা দিয়া মুখে কুলুপ আঁটলাম। নিজেরে সান্ত্বনা দিলাম, ‘রমজান একবার আসুক, ও তো আমারে মেলা ভালোবাসে, ওর লগে চইলা যামু আমি। থাকুম না এই শ'য়তানের ঘরে, থাকুম না...’"

আম্বিয়া হঠাৎই হাত উঠিয়ে মেয়ের মুখের ধারা থামিয়ে দিলেন। ফাতিমা স্তব্ধ হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। দেখলেন, রাগের তীব্রতায় আম্বিয়ার মুখমণ্ডল থরথর করে কাঁপছে, তা দেখে বুক কেঁপে উঠল তার। বয়সের ভারে শরীর ঝুঁকে গেলেও চোখে-মুখে যে প্রখর দম, যে অটল দৃঢ়তা, তা একটুও ম্লান হয়নি।

কাঁপা গলায় কঠোর স্বরে আম্বিয়া বলে উঠলেন, "তার মানে তুই আমারে মিথ্যা কইছিলি? আমার লগে নাটক করছিলি? কি রে, তোর এত্ত বড়ো সাহস! মার লগে অভিনয় করলিছি, হতচ্ছাড়ি? তুই আমারে ধোঁকা দিছস? ওই মাইয়া, কথা কস না ক্যান? মুখ খোল, ফাতমা..."

ফাতিমা মুখ নামিয়ে রাখলেন। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছিল, চোখের কোনা থেকে এক ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ে বুকের আঁচল ভিজে গেল। প্রতিটি নিশ্বাস যন্ত্রণায় দগ্ধ মনে হচ্ছিল তার কাছে। সে ধীরে ধীরে মাথা রাখল মায়ের কাঁধে। নাক টেনে কেঁপে কেঁপে বলল, "করতাম, আম্মা... করতাম অভিনয়। তোমার চোখে সুখ দেখাইবার লাগি করতাম। চাই নাই তুমি কষ্ট পাও। চাই নাই তুমি আমার যন্ত্রণা বুঝো! তাই হাসতাম, মিথ্যা আনন্দ দেখাইতাম..."

কথাগুলো বলেই সে নিথর হয়ে গেল। কিন্তু আম্বিয়া মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন না। বুক ভরা অভিমান তাকে শীতল বরফে পরিণত করেছে। কর্কশ গলায় বললেন, "আহহ! সুখের মুখোশে আমার মাইয়া আমারে ধোঁকা দিল, মিথ্যা মুখ দেখাইয়া রাখল! তোর অভিনয় আমার বুক বিদীর্ণ করছে, ফাতমা।"

ফাতিমা স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। মুখ খুললেন না৷ আম্বিয়া একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে কণ্ঠটা আরো গভীর করে বললেন, "তুই এহনও আসল কথা কইলি না। রমজানরে মাইরা ফালাইবার কারণ, ওইটা কিন্তু অহনো লুকায়া রাখছস।"

ফাতিমা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন। হতাশ নিশ্বাস ফেলে খানিক চুপ থেকে কাঁপা গলায় বলতে শুরু করলেন, "এরপর শুরু হইল তোমার মাইয়ার উপ্রে আসল নির্যাতন। খাওয়া নিয়া খোঁটা, কথায় কথায় খারাপ কথা, রূপের খোঁচা দিত আইতে যাইতে। পাতে খাবার উঠলেও মুখে তুলতে পারতাম না, বুক ভরা অপমানের তিক্ততায় গলা শুকাইয়া যাইত। কত রাত এক্কেবারে না খাইয়াই শুইয়া পড়ছি, হিসাব নাই। পেটের ভিত্রে যতখানি ক্ষুধা জ্বালাতন করত, তার চেয়েও অধিক মনের ক্ষুধা দগ্ধ করত।

কিছুদিন পর রমজান আইলো। তার আগমনে ভাইবা লইলাম, সে বুঝি আমারেও লগে নিয়া যাইব। ছেলেরে দেইখা সে খুশি হইছিল বৈকি, আমার মাথায় হাতও বুলাইয়া দিছিল, তালহার কপালে চুমু খাইছিল। তহন মনে হইছিল, এইবার হয়ত আমার কষ্টের দিন শ্যাষ, আল্লাহ আমার দিকে মুখ তুইলা চাইল অবশেষে। কিছুদিন সে যত্নও নিল, কিন্তু আমি কওয়ার সাহস করলাম না যে, ‘আমারেও সাথে নিবেন এইবার।’

অবশেষে তার ফির‍্যা যাওয়ার দিন কী পাইলাম জানো? সে আমার হাতে গুঁইজা দিল হাজারখানেক টাকা, তালহার মাথায় হাত বুলাইয়া দিয়া কইল, ‘মিলেমিশে থাকবে, মায়ের কথা শুনবে, ঘরে শান্তি রাখবে। আর আমার ছেলের যত্ন নিও। দূরে কাজে যাচ্ছি, ঘরের তর্কাতর্কি যেন কানে না আসে। আর হ্যাঁ, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি, ফাতিমা। চললাম, দোয়া করবে।’

তারপর একটুও না থাইমা আবার চইলা গেল তার কাজে। আমি গলা মুখ ফুটে কইতেও পারলাম না, ‘আমারেও নিয়া যাও। ওগো, আমারে নিয়া যাও। আমারে না হইলেও ছেলেটারে নিয়া যাও।’

কইলাম না কিছুই, শুধু দরজার আড়ালে দাঁড়াইয়া চাইয়া চাইয়া তার যাওন দেখলাম।

বুকের ভেতরটা শূন্য শূন্য ঠেকছিল, মনটা আনচান আনচান করছিল। তহনই বুঝলাম, আবারও দুঃখের দিন সামনে দাঁড়াইয়া রইছে। তবুও মনটারে শক্ত করলাম। ভাবলাম, ‘না, এইবার ছেলের জন্য এই টাকাগুলাই ভরসা হইব। মনের মতো খাওয়ানো তো যাইব।’

কিন্তু মা, তোমার মাইয়ার ভাগ্যটাই বুঝি অভিশপ্ত। রমজান যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই শাউড়ী হুট কইরা আমার হাত থেইকা টাকাগুলা ছিনাইয়া নিল। আমি চোখ লাল কইরা দাঁড়াইয়া গেলাম। দাঁতে দাঁত চাইপা কইলাম, ‘ওই টাকা আমার স্বামী দিয়া গেছে, ছেলের জন্যই রাইখা গেছে। টাকাটা ফেরত দেন, আম্মা।’

কিন্তু উনি ফিরাইয়া দিলেন না। উলটো ঠান্ডা হাসি দিয়া কইলেন, ‘আগে আঁর ফুঁয়ার যোগ্য বৌ ওই দেহাও, ইয়ারফর আঁর ফুঁয়ার ট্যিঁয়াত হাত দিয়্যু।’

(‘আগে আমার ছেলের যোগ্য বউ হয়ে দেখাও, তারপর না হয় আমার ছেলের টাকায় হাত দিবে।’)

আমি ভেতর থেইকা শক্ত হইয়া হাত বাড়াইলাম আবার। দৃঢ় কণ্ঠে কইলাম, ‘টাকাটা দ্যান, দয়া কইরা দ্যান। আমার ছেলের খাওয়ার ব্যবস্থা করোন লাগব, ছেলেটা শুকাইয়া গেছে একদম। মা হইয়া ওর এমন চেহারার দিকে তাকাইতে পারি না। টাকাটা ফেরত দ্যান, আম্মা...’

সে তখন এক ঝটকায় আমার হাত সরাইয়া দিল। এমন এক ঝটকা দিল যে হাতে মোচড় খাইলাম। ব্যথায় মুখটা কুঁচকাইলাম একটু৷ উনি আমার চোখে চোখ রাইখা বিষের মতো কইলেন, ‘ফুঁয়া তো তুঁয়ার ডইল্লা ফটোকফি বাইর ওইয়্যেদে এনা। ডেকসির তলাও বহুত পরিষ্কার আছে। আর ফুঁয়ার দুল্লাহ দলা ফুঁয়া জন্ম দিতা এক্কানা, তইলে এনা দিতাম দে এনা ট্যিঁয়া। হালা মাইনষের তুন এতো হাইবার দরহার নাই।’

(‘ছেলে তো তোমারই ফটোকপি বের হয়েছে। পাতিলের তলাও এর চেয়ে ফরসা। আমার ছেলের মতো সুন্দর ছেলে যদি জন্ম দিতে, তাহলে না হয় দিতাম টাকাটা। কালো মানুষের এত খাওয়ার দরকার হয় না।’)

তহন মনে হইলো, পৃথিবীটা যেন হঠাৎ আমার উপ্রে ভাইঙা পড়ছে। নিজের রং নিয়া কতদিন কত কথা শুনছি, গায়ে লাগত, তবুও মুখ বুইজা সহ্য করতাম। কিন্তু ওইদিন... ওইদিন ওরা যখন আমার নিরীহ, নিষ্পাপ বাচ্চা ছেলেটারেও ছাড়লো না, বুকটা যেন চৌচির হইয়া গেছিল। চোখ দিয়া টপটপ কইরা পানি ঝরছিল, বুকের ভিত্রেটা পুড়তাছিল আগুনের মতন।

ক্যান, আম্মা? কও না, আমি ক্যান কালা হইলাম? তুমি তো এত সুন্দর, তোমার মুখের রূপে গেরামের লোক মুগ্ধ হইত, তাইলে তোমার মাইয়া ক্যান কালা হইল? ভাইজানও তো ধবধবা, ইসহাকও ফরসা; কারোর গায়ের রং তো কালা হয় নাই। তাইলে আমি ক্যান হইলাম, আম্মা? কালা হইয়া জন্মাইয়া কি পাপ করছিলাম? কালা রংটা কি অভিশাপ? কালা হইয়া অপরাধ করছি, আম্মা? ও আম্মা...চুপ ক্যান? কও না..."

আম্বিয়ার চোখ থেকে অজান্তেই জলপাত পড়ল। এত বছরের অভিজ্ঞতা আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা—সব কিছু ভেঙে পড়ল এক মুহূর্তে। মেয়ের শ্যামলা গায়ের কারণে তিনি চারপাশ থেকে অহেতুক মন্তব্য শুনে এসেছেন বহু আগেই, কিন্তু কখনো ছোট করার সুযোগ দেননি। তার মুখের ভাব আর চোখের আগুন এত শক্তিশালী ছিল যে, কেউ সরাসরি কিছু বলতে সাহস পায়নি। তবু পিছপিছু শোনা অবহেলাসূচক বাক্যগুলো কানে বাজত। কিন্তু ভাবতে পারেননি, তার মেয়ে শ্বশুরবাড়িতেও এসব কটু কথার শিকার হবে। বড় ঘরে বিয়ে দিয়েছেন, শোভা দেখেছেন, তবু ভাগ্যের অভাব মায়ের চোখে ধরা পড়ল। এই নিস্পৃহ নিয়তি কি সমাজে যুগে যুগে চলতে থাকবে? কেন থাকবে?

আম্বিয়া উঠে দাঁড়ালেন। নুয়ে নুয়ে পা ফেলে তিনি বাড়ির দিকে এগোতে লাগলেন। ফাতিমা মায়ের এই আচরণ দেখে চোখ তুলে তাকালেন। আবেগমিশ্রিত কণ্ঠে বললেন, "কই, কই যাও, আম্মা?"

আম্বিয়া কিছুক্ষণ থেমে গভীর শ্বাস নিয়ে বললেন, "তুই বয় , তুই বয় ফাতমা। আইজকা আমি পুরা দুনিয়াটারে দেখাইমু। আইতাছি..."

এই বলে তিনি আবার পা বাড়ালেন। কিন্তু ফাতিমা মায়ের কথা বুঝতে পারলেন না কিছুই, বোঝার চেষ্টাও করলেন না। বুকের মধ্যে অজানা উত্তেজনা, আতঙ্ক আর প্রত্যাশার মিশ্রণ খেলা করছে। নিজেকে প্রশ্ন করলেন, "আমি যে রমজানরে মারলাম, ওরে মারার কারণ কি আসলেই যথাযথ আছিল? আম্মা কি আমারে ভুল বুঝব? না, আম্মা তো আমার মতন বোকাসোকা না। সাহস রাখ, ফাতিমা। তোরে আম্মা বুঝবেন, বুঝবেনই।"

ফাতিমা শ্বাস নিয়ে ঘাড় সোজা করে বেঞ্চে বসলেন। হাত শক্ত করে বেঞ্চ আঁকড়ে ধরলেন। চোখে-মুখে নীরব সংকল্প ফুটে উঠল। এখন যেহেতু সুখের দরজার মুখে দাঁড়িয়ে আছেন, সেহেতু অতীতের ক্ষতগুলোকে মনে করে কষ্ট নেওয়ার দরকার নেই। তিনি অল্প হাসার চেষ্টা করলেন।

কিছুক্ষণ পরই আম্বিয়া বাগানে আবার ফিরে এলেন। মায়ের দৃঢ়, কঠোর, সতর্ক অবয়ব দেখে ফাতিমা উঠে দাঁড়ালেন। আম্বিয়া বললেন, "দাঁড়াইলি ক্যান? বয়।"

মায়ের মনে কি চলছে, ফাতিমা কিছুই বুঝতে পারলেন না। শুধু মায়ের দিকে অপলক তাকিয়ে তার নির্দেশ অনুযায়ী বসে গেলেন। হঠাৎ ধূসর শাড়ির নীচ থেকে আম্বিয়া কুঁচকে যাওয়া কাঁপা কাঁপা হাত বের করে ফাতিমার বাম গালে কালি মেখে দিলেন। ফাতিমা হতবাক হয়ে রইলেন। মুহূর্তের মধ্যে কষ্ট ও অভিমানের ঢেউ বুকে ধাক্কা দিল। চোখ দিয়ে অজান্তেই পানি ঝরতে লাগল। মায়ের দিকে তাকিয়ে কম্পিত কণ্ঠে বললেন, "এইটা কি করলা, আম্মা? তুমিও প্রমাণ করলা যে তোমার মাইয়া কালা? ও আম্মা, তুমিও এমন করলা? মা গো, ক্যান করলা?"

আম্বিয়া কিছুই বললেন না। তিনি অন্য হাত থেকে আয়না বের করে ফাতিমার মুখের সামনে ধরলেন। ফাতিমা দেখলেন, মুখের এক পাশে কালির দাগ। চোখের পানিতে কালি ধুয়ে গলায় এসে পড়ছে। গায়ে পড়া হলুদ শাড়িটাও কালো ছোপে ভিজে যাচ্ছে।

আম্বিয়া থমথমে মুখশ্রীতে হালকা কণ্ঠে বললেন, "পাতিলের তলির কালি মাখাইলাম আমার সোনার টুকরা মাইয়ার গালে। মিলাইয়া দেখ, আমার মাইয়া আদৌ কালা?"

ফাতিমা প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। আম্বিয়া থরথর চেহারায় ফাতিমার পাশে বসলেন। তারপর হাতে থাকা কালি হালকা করে ফাতিমার বাম হাতের উলটো পাশে মেখে দিলেন। চোখে গভীর ভাব লুকিয়ে রেখে ঢোক গিলে বলে উঠলেন, "এই কালির লগে আমার কইলজার মাইয়ার রঙের কোনো মিল আছে কি? আছে মিল?"

ফাতিমা শ্বাস আটকে ডানে বামে মাথা নেড়ে বললেন, "মিল নাই, আম্মা। মিল নাই..."

আম্বিয়ার চোখ থেকে অজান্তেই জল পড়ল। তিনি ফাতিমাকে কোমরে জড়িয়ে ধরলেন। ফাতিমা মায়ের বুকে মাথা রেখে কান্নায় ভেসে গেলেন। আম্বিয়া হাতের উলটো পাশ দিয়ে নিজ চোখের পানি মুছলেন, তারপর সান্ত্বনামূলক, কোমল গলায় বললেন, "আমার মাইয়া কালা না। ওগো মন কালা। এই জাতি কালা, এই সমাজ কালা, এই দ্যাশ কালা। আমার মাইয়া কালা না, বুঝছোস তুই? তুই আমার চাঁদের টুকরা। তোর গায়ের রং চাঁদেরও নাই, চাঁদও তোরে দেইখা হিংসা করব। তুই আমার লাল সূর্যাস্তের আঁচল, তোরে দেইখা আকাশও লাজে রাঙা হইয়া যাইব। তুই আমার রক্তরাগ গোলাপ, তোরে দেইখা বাগানের সব ফুলগুলানও সম্মানে নুইয়া পড়ব। তোর গায়ে আলো পড়লে যে চমক দেয়, ওই চমক হীরায়ও দেয় না। তাইলে কেমনে অমানুষের জাত কয়, আমার মাইয়া কালা! ওগো চোখ দুইটা নষ্ট হইয়া গেছে, জমজমের পানিদ্দা ধুইয়া দেওন লাগব।"

ফাতিমা মায়ের গায়ে ফোঁপাতে থাকলেন। বুকটা ধকধক করছিল, গলাটা ঘামে ভিজে গেছে। বহুদিন জমে থাকা কষ্ট, ভয়, লজ্জা—সব অবশেষে মায়ের কাছে খুলতে চলেছেন। বুক থেকে যেন পাথরের ভার অবশেষে নামতে শুরু করল।

আম্বিয়া উপরের দিকে তাকিয়ে আপনমনে অভিযোগ দিলেন, "যেইহানে দুনিয়ার অগণিত সুরাতের রং কালা, সেইহানে আমার মাইয়া কালা না হইয়াও ক্যান অপরাধীর মতন দাগি হইলো, আল্লাহ? তোমার কুরআনের বানী তো কালা, হাজরে আসওয়াদ তো কালা, এমনকি তোমার সান্নিধ্য খুঁইজা পাওয়া তাহাজ্জুদের গভীর রাত্রিরও কালা। তাইলে আমার মাইয়ার রং ক্যান ওর অপমানের কারণ হইলো? দোষ কি আমার, আমার প্যাটের? ওর তো কোনো অপরাধ নাই। তাইলে ক্যান ওরে এত্ত তিরস্কার, এত্ত আঘাত সইতে হইলো?"

🍁চলবে?

#Tell_me_who_I_am

#পর্ব_৭_শেষাংশ

#আয়সা_ইসলাম_মনি

(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)

🍁২য় খণ্ড🍁

__________________________________________☞

কারান থেমে মুচকি হেসে আড় চোখে তাকাল। সম্মোহনী গলায় বলল, "এত তাড়া কীসের? আমি তো চাইলে তোমাকে এক্ষুনি বাচ্চার মা বানিয়ে দিতে পারি, কিন্তু সমস্যা হলো, তাহলে বেবিটা আমাদের রোমান্সে অনেক বাঁধা দিবে। তাছাড়া ওকে তো আর এসব হওয়ার পরই শিখানো উচিত না, বলো?"

মিরার কটমট করে তাকিয়ে বলল, "তুমি এতটা অ'সভ্য কেন, কারান?"

কারান ভাবলেশহীন মুখেই রান্নাঘরের সিঙ্কের দিকে এগিয়ে গেল। ঝকঝকে কলের তলায় শীতল জলের ধারায় সবজিগুলো ধুতে শুরু করল। জলধ্বনির মধ্যে দিয়ে কারানের কণ্ঠ ভেসে এলো, "দেখো, এই ব্যাপারে আমি কিন্তু ভীষণ সিরিয়াস। আমি ভেতর থেকে ছটফট করব, জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে যাব, যখন আমার বদলে ও তোমার কোলের মধ্যে মাথা রেখে ডট ডট খাবে।"

মিরার ভ্রূ ঊর্ধ্বমুখী হলো। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকলেও তার র'ক্তস্রোত ক্রোধে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কারান ফাঁকে একবার ক্ষণিকের দৃষ্টিতে মিরার চোখে তাকিয়ে ঠোঁট দুটো চোখা করে চুমু খেয়ে নিল। আবার নির্বিকার মুখে ফের জলে হাত চালিয়ে ধুতে থাকল। শান্ত গলায় বলল, "আজব! তুমি এভাবে তাকাচ্ছ কেন? তোমার মাইন্ড ঠিক করো, স্টারলিং। আমি চুমু খাওয়ার কথা বলেছি।"

রাগে ফুঁসে উঠল মিরা। চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়িয়ে বজ্রকণ্ঠে বলল, "নষ্টের ঘরের নষ্ট! বাচ্চা জন্ম নিয়েই আমাকে চুমু খেতে আসবে, তাই না? ডাবল মিনিং করে কথা বলবে, তারপর বলবে আমি ভুল বুঝেছি!"

কারান এগিয়ে আসল মিরার দিকে। এক নিমিষে কোমর আঁকড়ে ধরল। ঠোঁটে ধূর্ত হাসি ফুটিয়ে ঝুঁকে নেশাভরা স্বরে বলল, "শেম অন ইউ, সুইটহার্ট। তুমি কি ভাবো, আমি এত ভদ্র যে শুধু উপরের দিকটা খাওয়ার কথা বলব?"

চোখের দিকনির্দেশে সে স্পষ্ট ইঙ্গিত করল নিচের দিকে। ক্রোধে ক্ষিপ্ত হল মিরা। র'ক্তচক্ষুর দাহে সে কারানের হাত সরিয়ে দিল কোমর থেকে। কারান মুখ শক্ত করে নিজের আবেগকে দমন করল। নির্বিকার ভঙ্গিতে সবজি তুলে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে কাটতে শুরু করল। তার শীতল মুখশ্রী মিরার ক্রোধকে আরও উসকে দিল। দাঁত চেপে সে বলে উঠল, "শয়তানের ঘরের শয়তান! আজ তোমাকে আমি গুলি করে উড়িয়ে দেব!"

গুলির নাম শুনেই কারানের মুখে গাম্ভীর্য ঘনীভূত হলো। এগিয়ে এসে শান্ত কণ্ঠে বলল, "ভালো কথা মনে করেছ। তুমি তো গান ইউজ করতে জানো না। তোমাকে শেখাতে হবে, সুইটহার্ট।"

"আমার এসব শিখতে হবে না। সরো তুমি।"

সে কারানকে ঠেলে দূরে সরাতে চাইছিল। কিন্তু কারান পরিহাসমিশ্রিত ভঙ্গিতে মিরার হাত আঁকড়ে ধরে হঠাৎই টেনে তাকে নিজের উদরের সঙ্গে একাকার করে ফেলল। তার আঙুলগুলি মিরার হাতের নীচ থেকে চলে গিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ছুরিটা তুলে নিল। মিরাকে নিজের সাথে চেপে রেখে, পিছনে দাঁড়িয়ে কারান সবজি কাটার টুংটাং শব্দ তুলে বলল, "আচ্ছা, তুমি কি সত্যিই ডাবল মিনিং কথার মানে বুঝতে পারো?"

মিরা বিরক্ত ভঙ্গিতে তাকে কনুই দিয়ে সরাতে সরাতে বলল, "খুব ভালোই বুঝি।"

কারান আবার কোমরে চাপ দিল, টান দিয়ে তার দেহটাকে আরও শক্ত করে নিজের বৃত্তে আবদ্ধ করল। তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, "না, তুমি বুঝ না। যদি বুঝতে তবে সেই দিন ফুচকা খাওয়ার সময় আমি যে কথাটা বলেছিলাম, তার গুপ্তার্থ বুঝে ফেলতে।"

স্মৃতি খুঁজে বের করার চেষ্টা করল মিরা। কিন্তু স্পষ্ট মনে পড়ছিল না। ভ্রূ আরও কুঁচকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, "কোন কথা?"

কারান মুখের কোণে বিদ্রুপমাখা হাসি ফুটিয়ে উচ্চারণ করল, "তুমি এত বড় হা করতে পারো?"

বাক্যটি কানে পৌঁছতেই মিরার দৃষ্টি বিস্ফোরিত হয়ে উঠলো। তার ঠোঁট অনিচ্ছায় আধখোলা হয়ে গেল, আর চোখে জমলো বিমূঢ় বিস্ময়। হৃদকম্পন যেন আচমকা বেড়ে গেল। তারপর হঠাৎই সে শক্ত করে মুঠি আঁটল, আর কারানের উদরে এক চোরা ঘুসি বসিয়ে দিল। আঘাতের পর নিজেকে সরিয়ে নিয়ে সে ঝট করে ঘুরে দাঁড়াল, আর দেখতে পেল, কারান এখনও সেই তির্যক হাসি খেলাচ্ছে ঠোঁটে।

এই দৃশ্য দেখে মিরার রাগ চূড়ান্তে পৌঁছল। সে ক্ষিপ্ত হয়ে কারানের পায়ে এক লাথি বসিয়ে বলল, "অস'ভ্যেরও অস'ভ্য, নির্ল'জ্জেরও নির্ল'জ্জ! তোমার ভেতরে এতটা লাগামহীনতা কেন, কারান?"

কারান ব্যথার তোয়াক্কা না করেই পায়ের দিকে তাকাল, আবার সেই একই হাসি খেলল তার মুখে। আসলেই কতটা অশোভন কথা সে বলে ফেলেছিল, অথচ সেই অর্থ এতদিনে মিরার বোধগম্য হয়েছে। মিরার এই দেরিতে পাওয়া উপলব্ধিতে সে বিদঘুটে বিনোদন খুঁজে পেল। আবারও মিরাকে ঘুরিয়ে নিজের আয়ত্তে নিয়ে এলো। তার থুতনি মিরার কাঁধে স্থির হয়ে রইল। ছুরি দিয়ে টুপটাপ করে সবজি কাটতে কাটতে ব্যঙ্গমিশ্রিত কণ্ঠে কারান বলল, "সমস্যাটা কোথায় জানো? এই কথাটাই যদি আমি ইংলিশে বলতাম, তুমি ঠিকই রস আস্বাদন করতে। কিন্তু বাংলায় বলেছি বলেই এত শক খেয়েছ। দিস ইজ নট ফেয়ার, জান।"

মিরা ভ্রূরেখা গভীরভাবে ভাঁজ করে বলল, "সমস্যা ভাষায় নয়, সমস্যা তুমিতে। আমার মনে হয় না পৃথিবীতে তোমার মতো আর কোনো নির্লজ্জ পুরুষ আছে। লাগামহীন কথার প্রকৃত কিং তুমি।"

"অপবাদ দিচ্ছ? অ্যান্ড ইয়েস, আই অ্যাম ডেফিনিটলি দ্য কিং। বিকজ ইট'স কারান চৌধুরি, ইউ নো। কিন্তু তুমি আমাকে খারাপ বলতে পারো না। যদি সত্যিই খারাপ হতাম, তবে বউয়ের অসুস্থতার সুযোগ নিতাম। কিন্তু দেখো, এই কয়েকদিন আমি নিজেকে কতটা কন্ট্রোলে রেখেছি।"

"তোমার সান্নিধ্যে আমিও দিনে দিনে লাগামহীন হয়ে যাচ্ছি। কি একটা জিনিস আবিষ্কার করেছে আমার শ্বশুর!"

কারান ছুরি নামিয়ে মিরার দিকে তাকিয়ে ভ্রূ উঁচাল, "শ্বশুর? বলো আমাদের রাইটার। শি'জ সাচ আ জিনিয়াস, রাইট বেবি?"

মিরা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, "ঢং করছ?"

"একটু। কিন্তু তুমি তো আমার সেই ইচ্ছেটা পূরণ করোনি, সোনা।"

"কোনটা?"

কারান হাসি চেপে মিরার কানের কাছে ফিসফিস করল, "হা করার ব্যাপারটা।"

এই কথা শুনে মিরা রাগ আর লজ্জা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছিল, কিন্তু কারান কোমরে শেকলের মতো হাত শক্ত করে ধরে রাখল। তার শরীর কারানের বেষ্টনী ভেদ করে আর সরতে পারল না। বিরক্ত হয়ে বলল, "আসলে রোমানা ভাবি তোমার এসব বেহায়া কথার সঠিক জবাব দিতে পারত। আমি বেশি ভোলাভালা হয়ে গেছি।"

"আমার সঙ্গে এতদিন কাটানোর পরও নিজেকে ভোলাভালা দাবি করলে যে আমার ইজ্জত যাবে।"

মিরা মুখ টিপে হেসে বলল, "ওই ইজ্জত তো অনেক আগেই লুটে নিয়েছি আমি। এখন তুমি এক্সপায়ার্ড, ইউজড প্রোডাক্ট।"

কারান হাত আরও শক্ত করে মিরাকে কাছে টেনে নিয়ে বলল, "ছি! আমার তথাকথিত ভোলাভালা বউ আমাকে ইউজ করে ফেলেছে! ছি কারান, লজ্জা কর! তোর মুখ তো এখন বউয়ের শাড়ির নিচে লুকিয়ে ফেলা উচিত।"

মিরা চোখ ঘুরিয়ে কারানের দিকে তাকাল। লজ্জায় তার গালের দু’পাশে লালিমা ভরে উঠল, মনে হয় গাল দুটো ফেটে যাবে। যদিও সে এখন শাড়ি পড়ে নেই, তবে কারানের ইঙ্গিতের গভীরতা ঠিকই উপলব্ধি করতে পারল। কারান ঠোঁটের কোনে হালকা হেসে চুল ব্যাকব্রাশ করতে করতে বলল, "I said saree, not underskirt."

মিরার মনে হল, এই মুহূর্তে এই লোককে কিছু উত্তর দেওয়া মানে আরও গভীর, আরও বিপদসীমার দিকে ধাবিত হওয়া। কিন্তু কারানের নি'র্লজ্জ হাসি তাকে আরও বিব্রত করল। স্বাভাবিকভাবেই মিরা হেসে তার হাত ধরল, যেন মুহূর্তটি হালকা হতে পারে। কারান মিরার অভ্যন্তরীণ অনুভূতি বুঝেও কিছু বলল না। এরপর মুখের মধ্যে জিভ দিয়ে গাল ঠেলে বিড়বিড় করল, "এভাবে জোর করে হাসি চাপতে গিয়ে আমার গাল ব্যথা হয়ে যাচ্ছে।"

মিরা ঘুরে বলল, "কিছু... কিছু বললে?"

"উঁহুঁ।"

কারানের ঠোঁটে আবার সেই বাঁকা, প্রলুব্ধ হাসিটা ফুটে উঠলো। মিরা কিছু না বলে সামনে তাকাল। কিচেন বোর্ডের উপর দুজনেই নিখুঁত সমন্বয়ে বাকি সবজি কাটতে লাগল। কারান হঠাৎ মৃদুভাবে মিরার ঘাড়ে আলতো চুমু দিল। মিরা হেসে কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠল। এই হালকা স্পর্শেও তার হৃদয়ের অগ্নিশিখা জ্বেলে উঠল।

দুজন একসাথে রান্নার উপকরণ প্রস্তুত করল। কারান প্যান বসাল, মিরা তাতে মশলা ছিটাল। কারান মাংস ঢেলে দিল। মিরা ফাঁকে তার গালে চুমু দিল। সে মিরার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল। এরপর তরকারি নাড়তে শুরু করল, আর মিরা আলতো হেসে বলল, "ওয়েট, তোমার রান্নায় একটু দম এনে দিই।"

কারান কপাল কুঁচকে তাকাল। এই ফাঁকে মিরা ফোনে একটি সফট গান চালিয়ে দিল। সকালবেলার এমন স্নিগ্ধ সুর মুহূর্তে মন শান্ত করে দিল। কারান ভ্রূ উঁচিয়ে বলল, "ওহ, বেব, দ্যাট'স সুইট।"

এরপর মিরার হাত ধরে ঘুরিয়ে নিল। দুজন একসাথে মাথা নাড়াতে নাড়াতে নাচতে লাগল। মাঝে মাঝে মিরা তাকে জড়িয়ে ধরল, আর সে মিরার ডান হাতের উলটো দিকে আলতো চুমু খেল। মিরা হাসল। তারপর আবার রান্নায় মনোযোগ দিল।

এই প্রশান্ত মুহূর্তে অকস্মাৎ মিরা কারান থেকে একটু দূরে সরে গেল। কারণ জানে, যে কথাটা এখন বলতে চলেছে, তা কারানকে আগুনের মতো উত্তেজিত করে দিতে পারে। মিরা আলতো কাশি দিয়ে শান্ত গলায় বলল, "কারান, আমি কিন্তু ইচ্ছে করেই রেলিংয়ে উঠেছিলাম। কারণ আমি জানতাম, যদি পড়েও যাই, তুমি ঠিকই ধরে ফেলবে।"

কথাটা শুনে কারান ঘুরে দাঁড়াল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, হাতে থাকা খুন্তিটা শক্ত করে ধরল। মিরার দিকে তাকিয়ে কিড়মিড় করে বলল, "খুন্তির বারি মা'রব তোকে! আবার রাগাচ্ছিস?"

মিরা কারানের রাগ বুঝে হাসিটা জোর করে মুখে চেপে রাখল। কারান তার কাছে এগিয়ে এলো। কটমট করে বলল, "বুদ্ধি কি বাবার বাড়িতে সিন্দুকে তালা দিয়ে রেখে এসেছ? ইডিয়ট!"

মিরা দুই হাত দিয়ে কারানের গলা আঁকড়ে ধরে তার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল। ফিসফিসে আওয়াজে বলল, "আমি অনেক ভেবে দেখেছি, তোমার মধ্যে কিন্তু ব্যাপার আছে, হানি। রেগে গেলে তোমাকে আরো বেশি সে'ক্সি লাগে। চেহারাটা লাল টকটকে হয়ে যায়, একদম ঝাল মরিচের মতো! ইচ্ছে করে কাম'ড় দিয়ে খে'য়ে ফেলি।"

মিরা একটা হালকা কামড়ের ভঙ্গিমা করল। কারান নেশাগ্রস্ত চেহারায় দাঁত চেপে ধরে তাকাল। হঠাৎ করে সে মিরার ঠোঁটে কামড় বসিয়ে দিল। মিরা চিৎকার না করে ঠোঁটের দিকে হাত নিল। হাতটা চোখের সামনে এনে ধরল। সামান্য র*ক্ত ঝলমল করলেও সে রাগ দেখাল না; উলটো চোখে নেশার ঝিলিক নিয়ে এক ভ্রূ উঁচু করল।

মিরার এই দমনকৃত উচ্ছ্বাস আর প্রলোভনময় চাহনি দেখে কারান ঠোঁট কামড়াল, অবশিষ্ট মনকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আবার রান্নায় মন দিয়ে বলল, "কন্ট্রোল ইয়োরসেলফ, সুইটহার্ট। এরপর কিন্তু রান্না রেখে কাঁধে তুলে বেডে নিয়ে যাব।"

মিরা হঠাৎ একটি ধূর্ত আইডিয়া পেল। হালকা খুকখুক কাশি দিয়ে বলল, "কারান, আমার শ্বশুর মা শা আল্লাহ, বেশ আকর্ষণীয় ও ব্যক্তিত্বময় মানুষ।"

কারান কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। কাজ করতে করতে হালকা গলায় বলল, "হুঁ..."

"আর ভাসুরটাও খুব স্মার্ট, মা শা আল্লাহ।"

এবার কারান হালকা ভ্রূ কুঁচকে বলল, "ওকে... আর স্বামী?"

"আস্তাগফিরুল্লাহ!"

কারান শান্ত চেহারায় বলল, "আমার বউয়ের নজর এখন বাড়ির অন্য দিকে চলে যাচ্ছে। এবার মনে হচ্ছে ভাই আর বাবার গলা কা'টতে হবে।"

মিরার চোখ কপালে উঠল। অবাক কণ্ঠে বলল, "নাউজুবিল্লাহ!"

"আর তোমারটাও।"

"ইন্না-লিল্লাহ!"

কারান কিড়মিড় করে বলল, "আরেকবার এমন কথা বলে দেখো, মিরা। তোমার বুক চিড়ে হার্ট বের করে আনব।"

মিরা কারানের অনড় মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল যে তার কথাগুলো কারানের অন্তরে মোটেও গ্রহণযোগ্য হয়নি, যদিও সে নিজের ভঙ্গিমায় নিস্পৃহ ও শান্ত। কিন্তু কারানের চোখের মণিতে যেন আগুন জ্বলে উঠেছে, আর গলার নীল রগগুলো ফুলে ফুলে দৃশ্যত প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে। সে দাঁত চেপে মিরার দিকে তাকিয়ে আছে।

মিরা লক্ষ্য করল, যদি সে এখনো এই বিষয় ধরে রাখে, কারানের রাগ আরও বাড়বে। তাই হঠাৎ করে বিষয় পাল্টিয়ে বলল, "কারান, তোমার কাছে এখন কত টাকা আছে?"

কারান ওভেনে একটি খাবার আইটেম ঢুকিয়ে দিয়ে, আবেগহীন কণ্ঠে বলল, "জানি না।"

মিরা বুঝল, রাগ এখনও মিশে আছে কারানের কণ্ঠে। তাই সে কপাল কুঁচকে, হালকা অসহায় ভঙ্গিতে বলল, "এত রাগ দেখাতে হবে না, বলো না।"

"জানলে তো বলব। এগুলো কি হিসেব করে রাখার বিষয়?"

মিরা অবাক হয়ে বলল, "কি বলছ? টাকাপয়সা হিসেব করার বিষয় না? তাহলে কি হিসাব করা উচিত?"

কারান দুই হাত উপরে তুলে আড়মোড়া ভেঙে বলল, "বউ কয়টা চুমু দিচ্ছে, আর কয়টা দিতে কিপটেমি করছে।"

মিরার গাল লজ্জায় রক্তিম হয়ে গেল। তবুও সে শান্ত কণ্ঠে বলল, "সবসময় এসব বলতেই হবে? অন্তত আন্দাজে কিছু বলো।"

কারান গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "কয়েক ট্রিলিয়ন।"

মিরা মুখ বেজার করে বলল, "মজা করছ? তুমি কি বিল গেটসের থেকেও লোডেড নাকি?"

হঠাৎ করেই কারান পেছন থেকে মিরাকে আলিঙ্গন করল। ওভেনের দিকে তাকিয়ে খাবার হওয়ার অপেক্ষা করতে করতে বলল, "হুম।"

মিরা ভ্রূ কুঁচকে মোচড়ামুচড়ি করতে করতে বলল, "এই সরো তুমি! সবসময় এমন করবে! তুমি কি ডাকাতি করেছ নাকি?"

"হুম।"

মিরার চোখ অবাক হয়ে চড়কগাছ। সে মুখ ঘুরিয়ে কারানের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, "কিহ?"

"ব্যাংক রবারি করেছি। অর্থাৎ তোমার হাসব্যান্ড বিল গেটসের থেকেও ওয়েলথি।"

মিরা এবারও রাগে মুখ লাল করে বলল, "তুমি একটা মিথ্যুক, কারান। তুমি ডাকাতি করেছ, আর তোমাকে তো পুলিশ না ধরে বসে থাকবে?"

"পুলিশ তো জানেই না।"

মিরার মনটা হঠাৎ বিষণ্ন হয়ে গেল। কারণ সে ভালোই বুঝতে পারছিল, কারান সবই মজা করে বলছে, কিন্তু তার কণ্ঠের অস্বাভাবিক স্থিরতা, চোখের ধারালো দৃষ্টি সবই অন্যরকম প্রাধান্য বহন করছে। মৃদু হতাশার সঙ্গে মিরা বলল, "আচ্ছা, তাহলে আমাকে যে সব গিফট দিয়েছ, সেগুলো সবই কি হারাম অর্থের?"

"সব হালাল, মহারানি। ওগুলো তোমার স্বামীর পরিশ্রমের ফল। এমনও গেছে, আমি টানা তিন রাত ঘুমাইনি, শুধু কাজের জন্য।"

"আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের মালিক তুমি, শুধু বিজনেস করে, এটা কীভাবে সম্ভব?"

কারানের চোখে নিস্পৃহ দৃঢ়তা ফুটে উঠল। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ধীরে ধীরে বলল, "ওকেএএএ! তোমাকে আমি হিসেব দিই, তুমি নিজেই বিচার করো।

আমার টেক্সটাইল গ্রুপ বছরে পঁয়ত্রিশ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রেভিনিউ জেনারেট করে। লাভ-লোকসানের হিসেব বাদ দিলেও, শুধু আমার শেয়ার থেকেই মাসে গড়ে চারশো-পাঁচশো কোটি টাকার বেশি আসে। দুবাই থেকে দোহা, মিলান থেকে ম্যানহ্যাটান, আমার রিয়েল এস্টেট প্রজেক্টগুলো শুধু জমি ডেভেলপ করে না, পুরো স্কাইলাইন বদলে দেয়। সেখান থেকে মাসে আরও প্রায় তিনশো কোটি আসে। অ্যাট টুয়েন্টিওয়ান, ডিউরিং মাই এন সি স্টেট ইয়ার্স, আমি আমার এআই অ্যান্ড অটোমেশন কোম্পানি গড়ে তুলেছিলাম। সেটা এখন ইউরোপের সতেরোটা ন্যাশনাল গভার্নমেন্ট সার্ভার অপারেট করে। শুধু সফটওয়্যার লাইসেন্স আর সার্ভিস থেকেই মাসে আরও দুইশো কোটির বেশি আসে। আর তুমি তো জানোই না, আফ্রিকার ছয়টি ডায়মন্ড মাইনে আমার কন্ট্রোলিং স্টেক আছে। সেগুলো থেকে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়।

ইউবিএস, এইচএসবিসি, এমিরেটস এনবিডি, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে আমার ইনভেস্টমেন্ট আর অফশোর হোল্ডিংস ছড়িয়ে আছে। শুধু ইন্টারেস্ট আর ডিভিডেন্ড থেকেই মাসে আরও একশো কোটির মতো আসে। আর ইনভেস্টমেন্ট? নাজড্যাক বা ডাও জোনস যেভাবে ফ্লাকচুয়েট করে, আমার অ্যাসেট ভ্যালুও তেমনই বাড়তেই থাকে।

আমি চাইলে তোমার জন্য পুরো একটা রাজপথ হীরা দিয়ে মুড়ে দিতে পারি। আর যে হোপ ডায়মন্ডটা তোমাকে দিয়েছিলাম, ওটা আমার কোল্ড ভল্টে থাকা সবচেয়ে সাধারণ পাথরগুলোর একটা মাত্র।

অন অ্যাভারেজ, আই আর্ন একশ পঞ্চাশ থেকে দুইশো কোটি এভরি সিঙ্গেল ডে, তাও সব হিসেব বলিনি। কারণ মানি ফর মি ইজ দ্য মোস্ট রিপ্লেসেবল অ্যাসেট। আমার সবচেয়ে ইরিপ্লেসেবল প্রপার্টি কি জানো?"

মিরার মাথা ভারী হয়ে গেল। সে চোখ বড় করে তাকাল। কিন্তু তবুও উত্তরটা জানা চাই, তাই বিস্ময় মিশ্রিত কণ্ঠে বলল, "কি?"

কারান তার দিকে গভীর চোখ রেখে বলল, "দ্যাটস ইউ।"

মিরা ঠোঁটে বিস্তৃত, উজ্জ্বল হাসি ফোটাল। ঘুরে কারানের দিকে তাকিয়ে বলল, "তুমি এভাবে আমাকে পা'গল না করলেও পারতে, কারান। আমি আর জীবনেও তোমাকে এসব টাকাপয়সার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করব না।"

"তুমি কি সব বুঝেছ?"

"অর্ধেকটা আমার মাথার উপর থেকে উড়ে গেছে। আর বাকিটা বুঝতে চাই না।"

হঠাৎ করেই কারান মুখের ভঙ্গি বদলাল। চোখ ক্ষুদ্র করে মুখে ভারী ভাব নিয়ে বলল, "মিরা, আমি একটা বড় ভুল করে ফেলেছি।"

মিরার কৌতূহল জাগল। "কি হয়েছে?"

কারান মুখ ছোট করে বলল, "বিশাল, অপরিসীম একটা ভুল করেছি।"

মিরা দ্রুত তার গলা ধরে বলল, "কি ভুল?"

"আমার রিগ্রেট হচ্ছে, মিরা।"

"আমাকে এত অস্থিরতায় রাখছ কেন? কি হয়েছে, বলো তো।"

কারান দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলল, "আমার নিজেকে এখন অপরাধী মনে হচ্ছে, বকা দিতে মন চাচ্ছে।"

মিরা হতবুদ্ধি হয়ে বলল, "কেন, কারান? হঠাৎ এমনভাবে বলছ কেন?"

"এত দিন হয়ে গেল আমাদের ম্যারিড লাইফের, অথচ আমি এখনও একটা বেসিক ইনফরমেশন জানি না।"

"কি জানো না? উফফ, বলো না বাবা!"

কারানের কণ্ঠে হঠাৎ অস্থিরতা ফুটল, "মিরা, তোমার বার্থডে কবে?"

মিরা হালকা হাসল। মনে মনে বলল, "এমনভাবে বলল যেন কি না কি ভুল করে ফেলেছে!"

এরপর দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে আওয়াজ করে বলল, "সত্যি বলব?"

"আজব! তাহলে কি মিথ্যা বলবে? বলো, কবে?"

মিরা হেসে বলল, "১৩ই এপ্রিল।"

কারান গভীর চোখে তাকিয়ে বলল, "আমি সিরিয়াস, বেগম।"

"আমিও।"

কারান কপাল কুঁচকে বলল, "তোমার বার্থডে আমাদের ম্যারেজ অ্যানিভার্সারির দিন?"

মিরা মাথা হেলিয়ে হালকা ভাবে বলল, "হুম।"

কারান চোখ বিস্ময়ে বড় করে বলল, "হোয়াট দ্য ফা'ক! কেমনে সম্ভব?"

"প্ল্যান করে করলে সবই সম্ভব।"

কারান কৌতূহল ও বিস্ময় মিশ্রিত কণ্ঠে বলল, "প্ল্যান করে মানে?"

মিরা এবার কারানের গলা ছেড়ে সামান্য পেছনে সরে এলো। তবে কারান এক দৃষ্টিতে ওভেনের ভেতর তাকিয়ে বুঝল, খাবারটা সঠিক সময়েই সম্পূর্ণ হয়েছে। সে ধীরস্থির ভঙ্গিতে তাপরোধী দস্তানা গলিয়ে সাবধানে ট্রেটা নামিয়ে আনল। গরম ধোঁয়া ঘূর্ণায়মান পরতের মতো উপরে উঠে রান্নাঘরের বাতাসকে মশলাদার সুবাসে ভরিয়ে তুলল।

অন্যদিকে মিরা রান্নাঘরের মার্বেল কাউন্টারের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। সে স্নিগ্ধ হেসে বলল, "আমি মাহিকে আগেই বলেছিলাম, যেন মাকে দিয়ে এই তারিখটাই ঠিক করায়। তখন তো তোমারটা জানতাম না, তাই আমার জন্মদিনের তারিখের সঙ্গে মিলিয়ে বিয়ের দিন নির্ধারণ করেছিলাম।"

কারান বিস্মৃত ভঙ্গিতে ভ্রূ তুলে তার দিকে তাকাল। তারপর স্নিগ্ধ হাসি নিয়ে মিরার দিকে এগিয়ে গিয়ে গাল দুটোকে দু’হাতে আলতোভাবে ধরে বলল, "দ্যাট'স মাই ওয়াইফ। বুদ্ধিটা ভালো ছিল। এখন একদিনেই দুইটা সেলিব্রেশন করা যাবে, আর আমার টাকাগুলোও বেঁচে যাবে।"

মিরা হেসে জবাব দিল, "হ্যাঁ, তোমার টাকা বাঁচাতেই তো আমি সবকিছু হিসেব করে করেছি।"

কারান মৃদু হাসিতে মিরার গালে হাত বুলিয়ে দিল। কোমল কণ্ঠে বলল, "এবার যাও সোনা, টেবিলে গিয়ে বসো। আমি একে একে সব আইটেম সার্ভ করে দিচ্ছি।"

মিরা অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, "সব হয়ে গেছে নাকি?"

কারান মাথা নেড়ে বলল, "না! যেগুলো তৈরি হয়ে গেছে সেগুলো আগে তোমার সামনে দেব। তুমি খেতে শুরু করো, বাকিগুলো আমি শেষ করছি।"

মিরা ঠোঁট বাঁকিয়ে কপট অভিমানী ভঙ্গিতে বলল, "হুম... তাই তো! আমি ওখানে আরাম করে বসে গিলব, আর আমার স্বামী একা এখানে দাঁড়িয়ে কাজ করে যাবে, এটাই চাচ্ছ তো?"

মিরার মুখের ভাঁজ আর চোখের ভেতর চাপা বিরক্তি দেখে কারান মিরাকে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, "আচ্ছা, ঠিক আছে। বাকিগুলোও হোক, তারপর একসঙ্গে বসে খাবো। কিন্তু এখন তুমি বসো। আমি চাই না, আমার বউয়ের পায়ে সামান্যতম ক্লান্তিও জমুক।"

মিরা হাসিমুখে টেবিলে গিয়ে বসল, দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখল রান্নাঘরে ব্যস্ত কারানের দিকে।

কারান হাত বাড়িয়ে কাছেই রাখা জীবন্ত লবস্টারটিকে তুলে নিল। বরফ-শীতল পানিতে কিছুক্ষণ সেটাকে ডুবিয়ে রেখে স্টিমারে তুলল। ফুটন্ত পানিতে পড়তেই লবস্টারের খোলস বাদামি থেকে র'ক্তাভ লালে রূপ নিল। স্টিমিং শেষে কাটিং বোর্ডে এনে ধারালো ছুরিতে খোলস ভেঙে উন্মোচন করল শুভ্র রসাল মাংস। তার উপর ঢেলে দিল বাটার, রসুন কুচি আর পার্সলে। প্লেট সাজানোর সময় লবস্টারের অর্ধেক খোলসের ভেতর মাংস রাখল, পাশে লেবুর টুকরো, সী-সল্ট, আর গ্রিল করা অ্যাসপারাগাস দিয়ে সাজালো। শেষ ছোঁয়ায় হালকা অলিভ অয়েল ব্রাশ করে পরিবেশনের জন্য প্রস্তুত করল।

মিরা চেয়ারের হাতলে থুতনি ঠেকিয়ে এতক্ষণ একটানা কারানের প্রতিটি কাজ মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করছিল। কিন্তু হঠাৎ কি যেন ভেবে তার মনে অস্থিরতার ঢেউ আছড়ে পড়ল। নিজের সাথে নিজেই নিঃশব্দে বিতর্ক করল, "এখন প্রশ্নটা করা কি ঠিক হবে? যদি এই শান্ত মুহূর্তটা নষ্ট হয়ে যায়?" কিছুক্ষণ থেমে আবার নিজের মনে যুক্তি খুঁজল, "না, বলা উচিত। উলটো গোপন রাখাটা অন্যায় হবে।"

শেষমেশ শান্ত কণ্ঠে বলল, "কারান, অনেকদিন ধরে একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু... সুযোগ হয়নি।"

কারান ইতোমধ্যেই ইলিশের পাতুরি করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। টাটকা ইলিশটিকে টেবিলে রেখে প্রথমে অস্থি আলাদা করল। পানির নিচে ভালোভাবে ধুতে ধুতে জিজ্ঞেস করল, "কি কথা?"

মিরা দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে বলল, "আকবর কাকা... তিনি ফুফির স্বামী। ফুফি হয়ত কাউকে বলেনি, শুধু আমাকেই জানিয়েছেন। আমার মনে হলো, তোমাকে জানানো দরকার।"

কারান তখন শান্ত মুখে মাছের শরীরকে সমান টুকরোতে ভাগ করছিল। বিস্মিত হওয়া ছাড়াই নির্বিকার স্বরে বলল, "জানি।"

________

তারান্নুমের সাথে দীর্ঘ আলাপচারিতা শেষ করে ফারহান আবার নির্লিপ্ত মুখে কাজে মনোনিবেশ করল। টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কাগজপত্র, হার্ডডিস্ক, নথি আর অগণিত ডিজিটাল ডিভাইসের ভিড়ে ল্যাম্পের ক্ষীণ আলো তার চোখের তলদেশে অনিদ্রার ছায়া স্পষ্ট করে তুলছিল।

জেহেরের বিরুদ্ধে সন্দেহ নতুন কিছু নয়—বছরের পর বছর ধরে নাম উঠেছে অঙ্গ পা'চার ও নারী পা'চারের সাথে সংশ্লিষ্টতার। কিন্তু সমস্যা হলো, প্রমাণের অভাব। প্রতিবারই পুলিশের হাতে ধরা দেয় খণ্ডিত ইঙ্গিত, অথচ আদালতে টিকবে এমন অখণ্ড প্রমাণ মেলে না।

আয়লার কাছ থেকেও সুনির্দিষ্ট কিছু পাওয়া যায়নি। সে কেবলমাত্র একবার জেহেরকে ম্যানিপুলেট করতে সক্ষম হয়েছিল, আর সেখানেই জেহের বলেছিল, "হ্যাঁ, আমাদের একটা গোপনে স্পেশাল জায়গা আছে। সেখানে অনেক অনৈতিক কাজ করা হয়। আমি এসব ডিল করি।"

এর বাইরে কী ধরনের কাজ হয়, কোথায় হয়, সেসব প্রশ্ন করার আগেই জেহেরের লোক চলে আসায় আর জিজ্ঞেস করতে পারেনি আয়লা। তবুও ফারহান ও আয়লা অন্তরে নিশ্চিত, সে ‘গোপন কাজ’ আসলে মানবদেহের অঙ্গপাচা'র ও নারী পা'চারের দিকেই ইঙ্গিত করেছে। এখন একমাত্র প্রয়োজন অখণ্ড ও নিবারণযোগ্য প্রমাণ।

ফারহান ডেস্কে বসে কম্পিউটারে জেহেরের একটি সাম্প্রতিক ছবি লোড করে মুখ শনাক্তকরণ সফটওয়্যার চালু করল। সফটওয়্যার একের পর এক ডাটাবেজ স্ক্যান করতে লাগল। মিনিট কয়েকের ভেতরেই কিছু ফলাফল বেরিয়ে এলো।

জেহেরের একাধিক ভুয়া নাম, জাল আইডি, আর ডজনখানেক বিদেশ ভ্রমণের রেকর্ড পাওয়া গেল। ফারহানের মুখ কঠিন হয়ে উঠল। আরও গভীরে অনুসন্ধান করতে এবার হাতে নিল হ্যাকিং টুলস। লক্ষ্য সেই পুরোনো ল্যাপটপ, যেটি কয়েক মাস আগে বাজেয়াপ্ত হলেও যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি। আসলে এই তথ্যটাও আয়লাই সরবরাহ করেছিল, যখন সে চতুর কৌশলে জেহেরকে ম্যানিপুলেট করেছিল।

হার্ডড্রাইভ খুঁটিয়ে ঘাঁটতে গিয়ে ফারহান আবিষ্কার করল স্তম্ভিত করার মতো কিছু প্রমাণ:

- ডিলারদের সঙ্গে এনক্রিপ্টেড ই-মেইল আদান-প্রদানের ইতিহাস।

- অচেনা নারীদের মেডিকেল রিপোর্ট, সার্জারির প্রস্তুতির ডকুমেন্ট।

- ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেটে কোটি কোটি টাকার সমমূল্যের লেনদেন।

- একটি ফোল্ডার ভর্তি বিদেশি নামের তালিকা ও পাসপোর্ট স্ক্যান, সম্ভবত ভিকটিম অথবা ক্রেতাদের তথ্য।

স্ক্রিনে তথ্যগুলো ভেসে উঠতেই ফারহানের চোখে দমিত ক্ষোভ জমাট বাঁধল। মুঠো শক্ত করে সে ফাইলগুলো সেভ করে প্রতিটি ডকুমেন্ট একত্রিত করল।

ফারহান একা একাই বিড়বিড় করল, "এগুলো দিয়ে জেহেরকে ধরা তো সম্ভব। বাট ইট'স স্টিল আননোন যে ওদের আসল অপারেশনের সাইট কোথায়! আর সেখানে কয়জন নারী বা শিশু আটকে রাখা হয়েছে? জেহেরকে ধরা হলে যদি অপরদিকে ওদেরকে ক্ষতি করে ফেলে? মোস্ট অফ দ্য টাইম এরা তো এসবই টার্গেট করে! আচ্ছা, এমন তো নয় যে আমাদের ভুলপথে চালিত করা হচ্ছে! নাহলে এত দ্রুত প্রুফ পেয়ে যাব!"

এসব ভাবতে ভাবতেই ক্লান্ত দেহটাকে টেনে চেয়ারে হেলান দিল ফারহান। কপালে হাত রেখে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চোখের ভেতর ক্লান্তি জমেছে, কিন্তু ঘুমালে চলবে না। কয়েক মুহূর্ত বাদে আবার সংযত হলো। সজাগ মস্তিষ্কে সব প্রমাণ এনক্রিপ্টেড ফরম্যাটে কারানের কাছে ই-মেইলে পাঠিয়ে দিল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে হঠাৎ তার কাঁধে একজোড়া হাত স্পর্শ করল। চমকে উঠে সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।

আয়লাকে দেখে ঠোঁট শক্ত করে সামান্য বিরক্ত ভঙ্গিতে আবার স্ক্রিনের দিকে মন দিল। আয়লা সাধারণ কালো ট্রাউজার আর হালকা গোলাপি রঙের গেঞ্জি পরা, চুলগুলো সুন্দরভাবে পেছনে জুটি বাঁধা।

কিছুক্ষণ পর ফারহান শুষ্ক গলায় বলল, "তোমার উচিত জেহেরের সাথে রিলেশনশিপের ভান করা। তাহলে ভেতরের সব গোপন তথ্য বের করা সম্ভব হবে। আর সত্যি বলতে, বান্দা কিন্তু এমনিতে হ্যান্ডসাম আছে।"

শেষ কথাটা মুখে বাঁকা হাসি টেনে বলল সে।

আয়লা এই কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। চোখে অন্যমনস্কতা নিয়ে নিস্তেজ স্বরে বলল, "তোমার ফ্রেন্ডের খবর কি? ও আর দুবাই আসবে না নাকি?"

ফারহান ঠোঁট বাঁকিয়ে ব্যঙ্গভরা হাসি ছুঁড়ে বলল, "ও শালা বউকে পেলে দুনিয়ার আর কিছুই মাথায় রাখে না। ওর উপর আমার বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই। এবার মনে হয় সোজা বাচ্চা জন্ম দিয়ে কোলে নিয়েই হাজির হবে।" কথাটা শেষ করেই সে আচমকা আয়লার দিকে তাকাল। দেখল, তার শীতল চোখ দুটো রহস্যে জর্জরিত। ফারহান ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, "তুমি আবার ওকে নিয়ে হঠাৎ এত ইন্টারেস্ট দেখাচ্ছ কেন?"

আয়লা তার পাশে সোফায় বসল। ফারহানের ম্যাকবুক টেনে নিয়ে নিজের হাঁটুর উপর রাখল, আঙুলগুলো নির্ভুল ছন্দে কি-বোর্ডে চলতে লাগল। শান্ত কণ্ঠে বলল, "ইন্টারেস্টেড তাই।"

ফারহান সামান্য ঝুঁকে আয়লার চোখে চোখ রাখল। "নিজের চরিত্র ঠিক রেখো, আয়লা।"

"আমার চরিত্র ঠিকই আছে, নাহলে কবেই তোমার বন্ধুকে খে'য়ে ফেলতাম।"

ফারহানের মুখ মুহূর্তেই রং হারাল। রাগে তার বুকের ওঠানামা তীব্র হয়ে উঠল। সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল, তার কণ্ঠে ঝাঁঝ ঝরে পড়ল, "আরেকবার যেন তোমার মুখে কারানকে নিয়ে কোনো বাজে কথা না শুনি!"

আয়লা মাথা সামান্য কাত করল। কটমট করা ফারহানকে দেখে সে হাসতে হাসতেই বলল, "তুমি এমনভাবে রিয়েকশন দিচ্ছ যেন কারান তোমার বয়ফ্রেন্ড। আচ্ছা, তোমরা দুজন আবার... বাইসে'ক্সু'য়াল না তো?"

"মাথার সব তার কি ছিঁড়ে গেছে তোমার?"

আয়লা ল্যাপটপে চোখ রেখেই ঠান্ডা সুরে বলল, "এত উত্তেজিত হচ্ছ কেন? তুমি যেভাবে কারান কারান করো, তাতে আমার তো প্রায়ই মনে হয় কারান তোমার বউ, না হলে তুমি ওর বউ। সাধারণত বউকে নিয়েও মানুষ এতটা টেনশনে থাকে না।"

"কারণ কারান শুধু আমার বন্ধু না, ও আমার ভাই। আর ওর জন্য আমি যেমন প্রাণ দিতে পারি, তেমন প্রাণ নিতেও পারি।"

আয়লা ম্যাকবুকে মনোযোগ রেখে পা নাড়াতে লাগল। স্বরে মৃদু বিস্ময় ফুটে উঠল, "ইন্টারেস্টিং! আচ্ছা, তুমি কখনো মিরাকে দেখেছ?"

ফারহানের চোখ এক লহমায় ক্ষীণ হয়ে এলো। ভ্রূ কুঁচকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, "কারানের স্ত্রী?"

"হ্যাঁ।"

"কেন? হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?"

আয়লা এবার ম্যাকবুক বন্ধ করল। শান্ত গলায় বলল, "দেখে ফেললে কারান তোমার শত্রুতে পরিণত হবে। যদিও মিরা... মিরা তো আবার আমার চিরশত্রু।"

ফারহান আয়লার পাশে বসল। আয়লার হাত থেকে ম্যাকবুকটা ছিনিয়ে নিল। হুঁশিয়ারি কণ্ঠে বলল, "ডিরেক্ট কথা বলো। আমাকে রাগিয়ে দিও না, আয়লা। কারান যেমন চিতাবাঘ, আমি তেমন ব্ল্যাক প্যান্থার। খু'ন কিন্তু আমিও কম করিনি। তোমাকে করলে বড়জোর হাত ময়লা হবে।"

আয়লা এক ভ্রূ উঁচু করে তাকাল, ঠোঁটে বিদ্রুপ টেনে বলল, "ওহ, রিয়েলি? তুমি একজন RAW-এর এজেন্টকে থ্রেট দিচ্ছ?"

"উঁহুঁ। আমি বা আমরা থ্রেট দিই না। সোজা কবরস্থানে পাঠিয়ে দিই। আর কথা ঘুরিয়ে নিও না। কারান আমার, আর মিরা তোমার শত্রু কীভাবে?"

"কারান যদি মিরাকে বিয়ে না করত, তাহলে আমার হতো। তবে চিন্তা করো না। আয়লার পার্সোনালিটি তোমার নিশ্চয়ই জানা। আমি কারান বা মিরাকে এক সেকেন্ডের জন্যও ডিস্টার্ব করব না। না ওদের মাঝে হাড্ডি হবো! বাট দ্য ট্রুথ ইজ, আই লাভ হিম।"

ফারহান কটমট করে তাকাল। রাগে তার মুখ লালচে হয়ে উঠল। চোখ দুটি যেন রক্তাভ আগুনে জ্বলছে। এক মুহূর্তে আয়লার গলার দিকে হাত বাড়িয়ে আবার সরিয়ে নিল। কণ্ঠে ঝাঁঝালো হুঁশিয়ারি নিয়ে বলল, "শুধুমাত্র আমি কুইনকে ভালোবাসি বলে মেয়েদের গায়ে হাত দিলাম না। কারানকে ভালোবাসার কথা মুখে আনলে কোন সাহসে?"

আয়লা চোখে অটল দৃঢ়তা নিয়ে বলল, "ওকে না ভালোবাসার একটা কারণ দেখাও।"

"আমি মেয়ে না যে ওর গুণাগুণ খুঁজব। ও আমার প্রাণ, আর তোমার মতো দুই পয়সার মেয়েরা ওর ওপর ইন্টারেস্ট দেখাবে, এটা আমি সহ্য করব না।"

এই কথায় আয়লা হঠাৎ পাশের ছু'রি হাতে তুলে চটজলদি ফারহানের কোলের উপর বসে পড়ল। তার শক্ত হাতে ফারহানের চুল ধরে সোফার সঙ্গে ঠেকিয়ে গলার কাছে ছু'রি ঠেকাল। ফারহানও উত্তেজিত হয়ে পকেট থেকে পি'স্তল বের করে আয়লার বুকের মাঝখানে ধরল। রাগে তার হাতের শিরা ফুলে উঠল।

আয়লা চোখ-মুখ কুঁচকে বলল, "Have we ever been intimate physically?"

ফারহান কপাল কুঁচকে বলল, "হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন? আর তুমি নাইফ সরাও, নয়তো আমি গান চালিয়ে দিব।"

"আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।"

"না।"

"তাহলে কেন বললে 'দুই পয়সার মেয়ে'? তুমি কি জানো, আমি এখনো ভা'র্জিন।"

ফারহান ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, "আমি জানতেও চাই না।"

"তোমার জানা উচিত। আমি স্টিল ভা'র্জিন, তার কারণ কারান।"

ফারহান অবাক হয়ে আয়লার বুক থেকে বন্দুকটা সরিয়ে নিল। চোখ বড় করে বলল, "ওহ ফা'ক! আর ইউ কিডিং মি?"

আয়লাও ছু'রিটা সরিয়ে ফারহানের কোল থেকে উঠে পাশে বসল। দীর্ঘ এক নিশ্বাস নিল। চোখ বন্ধ করে শান্তভাবে মাথা নত করল। দুই পায়ের ফাঁকের মধ্যে হাতদুটো রেখে একত্র করল। শীতল কণ্ঠে বলল, "তুমি তো জানো, আমি ইন্ট্রোভার্ট। আমাদের রিলেশনশিপের এক মাসের মাথায় একদিন হঠাৎ তুমি আমার রুমে এলে। আমি তখন আমার মিশনের একটা কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। হুট করে তুমি আমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলে। যদিও আগেও আমরা দুজন দুজনকে হাগ করেছি, কিন্তু ওইদিন ওই মুহূর্তে আমি ফিল করলাম, তুমি অন্য মুডে আছ। পরবর্তীতে তুমি রুমডেটের প্রস্তাব দিলে। হ্যাঁ, আমি তখন তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম, তাই রাজি হয়ে গেলাম। এরপর আমরা একসাথে বেডে গিয়েছিলাম। তুমি শার্টটা খুললে..."

এরপর আর ফারহানের সহ্যশক্তি স্থির থাকলো না। হ্যাঁ, অতীতে সে প্রকৃতপক্ষে দুর্বৃত্ত ছিল, মাসের পর মাস নারীদের প্রতি তার অস্থির প্রবণতা ছিল। কিন্তু বর্তমানে তার হৃদয় সম্পূর্ণরূপে তারান্নুমের প্রতি নিবেদিত। অতীতের অনাকাঙ্ক্ষিত স্মৃতি তার কাছে অচেতন মনে হলো; কারণ সে তো সেগুলোকে স্মৃতিশূন্য করতে চায়। সে হঠাৎ বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল। উত্তেজনায় দেহে ঝাঁকুনি খেল। গলার স্বরে টান দিয়ে বলল, "স্টপ ইট, আয়লা! এত বছর পর এখন এসব কেন তুলছ?"

আয়লা কটাক্ষের স্বরে উত্তর দিল, "আমার কথা বলার মাঝে বাঁধা দেওয়াটা আমার পছন্দ নয়, এটা তুমি জানো। চুপচাপ বসো, মাই ওয়ার্ডস আর নট ওভার ইয়েট।"

ফারহানের হৃদ্‌যন্ত্র দ্রুত এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে ধুকপুক করছে। প্রতিটি স্পন্দন তার ভেতরের অস্থিরতা আরও প্রবল করে তুলছে। তবুও অনিচ্ছাসত্ত্বেও বসল। আয়লার চোখ এড়িয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে বলল, "বেশি সময় নিবে না।"

আয়লা গভীর নিশ্বাস নিয়ে বলল, "যখন তুমি শার্টটা খুললে, হঠাৎ করে কারানের কল এল। তুমি কলটা পেয়ে এত এক্সাইটেড হয়ে গেলে যে আমাদের ওই স্পেশাল মোমেন্টের কথা ভুলেই গেলে। আমার রাগ হলো। আমি তোমাকে কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে চাচ্ছিলাম, কিন্তু ঠিক তখনই তুমি কল রিসিভ করলে। আর ফোন লাউডে থাকায় আমি সবই শুনেছি। তখন কারানের গলায় প্রথম ‘ফারহান’ ডাকটা শুনেই আমার ভিতরে অস্থিরতার ঝড় বয়ে গেল। আমার চেতনার সবচেয়ে সংবেদনশীল স্তর পর্যন্ত প্রবেশ করল। ওর প্রতিটি উচ্চারণ এতটা ডিপ আর ম্যানলি যে কিছু মুহূর্তের জন্য আমি যেন অন্য একটা দুনিয়ায় চলে গেলাম। কল কেটে যাওয়ার পরও আমার সেই অস্থিরতা থামল না। তুমি আমাকে অনেকক্ষণ ডাকলে, আমি শুনলাম না। তাই তুমি আমাকে ধাক্কা দিয়ে হুঁশে ফিরিয়েছিলে। আমার ভিতরের উত্তেজনা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। আমি চমকে উঠে কেবল তোমার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

তুমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলে, ‘মে আই?’

আমি বললাম, ‘নো।’

তুমি বিস্ময়ে বললে, ‘হোয়াট ডু ইউ মিন?’

আমি তখনই কণ্ঠস্থভাবে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি যার সঙ্গে কথা বলেছিলে, ওর নাম কি?’

‘মাই ফ্রেন্ড কারান। এনি প্রবলেম, বেবি?’

‘Farhan, give me some time, I’ll think about it and let you know later.’

তুমি তখন আমার অবস্থাটা বুঝে সংক্ষেপে ‘ওকে’ বলে সরে গেলে।"

আয়লা চোখে দীপ্তি নিয়ে পুনরায় বলতে থাকল, "এদিকে কারানের প্রতিটি শব্দ আমার চেতনার অঙ্গনে গভীরভাবে গেঁথে রইল। আমার ওর প্রতি আগ্রহ বাড়তেই থাকল। যে কারণে আমি তোমার থেকে সাটলভাবে ওর প্রোফাইল জেনে নিলাম। প্রথম দেখাতেই ওর চোখে আটকে গেলাম। মনে হলো, চোখ দুটো যেন রাতের আকাশে জ্যোতির্ময় কোনো নক্ষত্র। ওর সঙ্গে আমার সংযোগের আকাঙ্ক্ষা প্রতিনিয়ত বর্ধিত হতে লাগল। প্রতিটি ক্ষণ ওর সম্পর্কে জানার তীব্র কৌতূহল আমার ভেতরের ক্ষুধা আরও উদ্দীপ্ত করল। এরপর ওকে স্টক করতে শুরু করি, জানার চেষ্টা করি, ও কেমন মানুষ, কোথায় থাকে। ওকে যত জানছিলাম, ততই প্রতিটি সেকেন্ড আমি আরও মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম। আমি বিভিন্নভাবে ওর সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করার চেষ্টা করি। কিন্তু কারানের ইন্টারেস্ট কোনো মেয়েদের দিকে ছিল না, তাই কথা বলা হয়ে উঠেনি। দেয়ারফোর, আমি শুধু ওর প্রতি ক্রমশ মুগ্ধতায় বন্দি রইলাম, এবং প্রতিটি মুহূর্তে ওর রহস্যময় ব্যক্তিত্ব আমাকে আরও আকৃষ্ট করতে থাকল।"

এসব শুনে ফারহান কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ চোখে তাকাল। তারপর বলল, "তুমি এসব আগে কেন আমাকে বলোনি? আর তার মানে কি তুমি ওকে আরও পাঁচ বছর আগে থেকেই...?"

"হ্যাঁ," আয়লা গভীরভাবে নিশ্বাস নিয়ে বলল, "আই হ্যাভ লাভড হিম হোলহার্টেডলি ফর ফাইভ ইয়ার্স। আর ওর জন্যই তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক শেষ করেছি।"

ফারহান চমকে বলল, "কিন্তু ফার্স্ট যেদিন তোমাকে ওর সঙ্গে মিট করালাম, সেদিন তো আমার কাছে কিছুই মনে হয়নি।"

"ফারহান, যেখানে তুমি এটা বুঝতে পারোনি যে আমি একজন এজেন্ট, সেখানে তুমি কীভাবে বুঝবে যে আমি কারানকে ভালোবাসি? ওইদিন আমি নিজেকে এমনভাবে প্রেজেন্ট করেছিলাম যেন মনে হয় আমি ওকে চিনিই না। কিন্তু সত্যি কথা বলতে, ওকে দেখে আমি শকড হয়ে গিয়েছিলাম, কারণ ও এতটাই সুদর্শন। আর সবথেকে বেশি আঘাত পেয়েছিলাম যখন জানলাম, ও বিয়ে করে ফেলেছে। যে মানুষটিকে আমি পাঁচ বছর... পাঁচটা বছর ধরে অন্তরের গভীরতা দিয়ে ভালোবেসেছি, প্রথম দেখাতেই জানতে পারলাম সে ম্যারিড। তবুও আমি ভেতরের যন্ত্রণাকে কোনোভাবেই প্রকাশ করিনি। ভিতরে ভিতরে যেন সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু আমি কোনো সংকেত দেইনি; না তোমাকে, না কারানকে। শুধু চেয়েছিলাম ওর একটু... একটুখানি কাছে থাকতে, কিন্তু ও তো সেটাও হতে দেয়নি।"

ফারহান চোখ কুঁচকে প্রশ্ন করল, "ঠিক আছে। আগে একটা কথা বলো, তুমি যে কারানকে স্টক করলে... কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব হলো? ওর সবকিছুই তো আমি হ্যান্ডেল করি। কারান নিজেই সব সিকিউরিটি নিশ্চিত করেছে, যা কেউ জানতেও পারবে না। ওর ফোনে সিকিউরিটি এনক্রিপশন, গাড়িতে ট্র্যাকিং ডিভাইস, বাড়িতে ২৪/৭ ক্যামেরা এবং ব্যক্তিগত বডিগার্ডদের তালিকা সবই সম্পূর্ণ গোপন। এমনকি বাংলাদেশের ওর পরিবার থাকার খবরটাও শুধু ওর জানা, বাইরে কেউ কিছুই জানে না। তাহলে তুমি কীভাবে..."

আয়লা হালকা হেসে বলল, "ওর সম্পর্কে ধারণা নেওয়াটা সহজ ছিল না। বহুত ধৈর্য আর কঠোর পরিশ্রমের পরই জানলাম যে ওর বাংলাদেশে ফ্যামিলি আছে। আর এসব সম্ভব হয়েছে শুধুই তোমার জন্য।"

ফারহান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "হোয়াট? আমার জন্য?"

"হ্যাঁ, তুমি জানো না, মাঝে আমি তোমাকে ম্যানিপুলেট করেছিলাম। তখনই কারানের পরিবারের সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম।"

"তার... তারপর?"

আয়লা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, "তারপর আর কি, তুমি নিজেই কারান সম্পর্কে অনেক ইনফরমেশন দিয়েছ। আর দুবাইতে কারান আসার পর ওর বিয়ের খবর জানার পর ভাবলাম, কারানকেও ম্যানিপুলেট করে ওর মস্তিষ্ক থেকে মিরাকে সরিয়ে দেব। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও পারিনি।"

ফারহান হালকা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, "তুমি একজন ম্যানিপুলেটরকে ম্যানিপুলেট করতে চেয়েছিলে? রিডিকিউলাস!"

"সে জন্যই চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। তবে আমি অন্য পথ খুঁজছিলাম, কিন্তু তার আগেই মিরার ছবি চোখে পড়ল। আর তখনই বুঝলাম, আমার ভালোবাসা একপাক্ষিক হয়েই থাকবে। কারানকে পাওয়া সম্ভব না। আর তুমি যদি মিরাকে দেখো, হয়ত চেষ্টা করবে কারানকে সরানোর।"

ফারহান রেগে না গিয়ে, গভীর স্বরে বলল, "তোমার ধারণা নেই তুমি ঠিক কতটা নিম্ন ও অমূল্য অবমাননাকর কথা বলছ।"

"আর তুমি জানো না, মিরা ঠিক কতটা অপার্থিব ও মনোমুগ্ধকর সুন্দরী।"

"এটা আমার জানার দরকার পড়বে না। আমি অলরেডি বুঝতে পেরেছি, কারানকে হ্যান্ডেল করতে পারে যে, সেই মেয়ে কি ক্যালিবার এর!"

আয়লা নীরব হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর শিহরন জাগানো কণ্ঠে বলল, "I won’t hurt Mira. And never Karan. But Karan... his persona, the way he strides with a manly grace, the calm precision in his words, the seamless etiquette, the commanding aura, the sculpted physique—they unsettle me, yet fascinate me."

(বাংলা: আমি মিরাকে আঘাত করব না। আর কারানকে তো কখনোই না। কিন্তু কারান... ওর ব্যক্তিত্ব, ও যেভাবে ম্যানলি ভঙ্গিতে হাঁটে, ওর কথার শান্ত শব্দগুলো, নিখাদ ভদ্রতা, কর্তৃত্বময় উপস্থিতি, গড়া দেহসৌষ্ঠব—সবকিছুই আমাকে অস্থির করে তোলে, তবু অদ্ভুতভাবে মুগ্ধও করে।)

ফারহান এক গভীর নিশ্বাস নিয়ে বলল, "এসব ভাবনা বন্ধ করো, তোমারই ক্ষতি।"

"আমার কোনো লাভের আশা নেই, ফারহান। তুমি হয়ত বুঝবে না। ভালোবাসা অনেকসময় অদৃশ্য বন্ধনের মতো; যা সাধারণ চোখে ধরা পড়ে না, যা সবাই উপলব্ধি করতে পারে না।"

ফারহান প্রথমবারের মতো আয়লার চোখে জমে থাকা জল দেখল। হঠাৎ তার মনও অস্বাভাবিকভাবে ভারী হয়ে উঠল। সে পাশ থেকে টিস্যুর বক্স খুলে টিস্যু তুলে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দিল।

আয়লা হেসে সেটা নিয়ে চোখ মুছতে লাগল, ফারহানের এই সহজ ভঙ্গি তার হৃদয়কে শান্তির স্পর্শ দিল। ফারহান ওর পিঠে হালকা চাপড় দিয়ে হাত রাখল। সহানুভূতির স্বরে বলল, "ভালোবাসার ওপর কোনো বিধিনিষেধ নেই। ভালোবাসো, কিন্তু চাওয়ার চেষ্টা করো না।"

"চাওয়ার সাহসও থাকব না," আয়লা ভারাক্রান্তভাবে হেসে বলল।

ফারহান ধীরে মাথা নাড়ল। তারপর নীরবভাবে আয়লার দিকে তাকিয়ে থাকল। আয়লার বুকের ভেতরে দীর্ঘদিন জমে থাকা শ্বাসরুদ্ধকর ভার হঠাৎ সরে গিয়ে শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। অথচ সেই শূন্যতাকে আয়লার চোখে প্রতিফলিত করা যাচ্ছিল না। তার কণ্ঠে তীক্ষ্ণতা থাকলেও ভিতরে ছিল দগ্ধ হৃদয়ের চাপা উত্তাপ।

কিছু সময় পর আয়লা ঠোঁট কামড়ে হঠাৎ বলল, "থাক, এসব বাদ দাও। এখন তুমি বরং কারানকে যত দ্রুত সম্ভব এখানে আনো। ও ছাড়া এই মিশন সফল হবে না। ইব্রাহিমের প্যালেসের ভিতরে প্রবেশ করার একমাত্র উপায় ও-ই।"

ফারহান চোখ নামিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল, "ও হয়ত অন্য কোনো কারণে দেরি করছে।"

আয়লা কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল, "কি কারণ?"

"এই মিশনটা অস্বাভাবিকভাবে টাফ। পরিণতি আমরা কেউ জানি না। আমরা ফিরে আসতে পারব কিনা, সেটাও অনিশ্চিত। হয়ত সেই অনিশ্চয়তার জন্যই কারান এখন কিছুটা সময় নিজেকে দিচ্ছে।"

"ও এখন কোথায় আছে?"

ফারহান মুহূর্তের জন্য চুপ করে গেল। সে জানে, কারান আসলে আমেরিকায়, কিন্তু সত্য প্রকাশ করা মানেই বিপর্যয় ডেকে আনা। ঠান্ডা মাথায় গোপন রেখেই বলল, "বাড়িতে... আই থিংক বাড়িতেই আছে।"

আয়লা ঠোঁটে ক্ষীণ বিদ্রূপের রেখা টেনে উত্তর দিল, "মিথ্যা বলছ? কারান এখন আমেরিকায়, আর তার স্ত্রীকে নিয়েই আছে।"

ফারহান চোখ সরু করে তাকাল। "তুমি আবার ওকে স্টক করা শুরু করেছ নাকি?"

আয়লা নির্বিকার কণ্ঠে বলল, "না। তুমি নিজেই তো বলেছিলে।"

ফারহান বিস্মিত হয়ে উঠে দাঁড়াল। "আমি? কখন?"

"সেদিন, যেদিন তুমি আমেরিকা থেকে ফিরে এলে।"

ফারহান থমকে গেল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে নীচু স্বরে বলল, "আমি... আমি আমেরিকায় গিয়েছিলাম কেবল নিশ্চিত হতে, কারান সেইফ আছে কি না। তখনই জেনেছি ও অ্যাকসিডেন্ট থেকে অল্পের জন্য বেঁচে গেছে। পরে ট্র্যাফিক পুলিশ থেকে জানলাম, সাথে ওর ওয়াইফও ছিল। অথচ কারান আমাকে কিছুই জানায়নি। হয়ত কল ট্র্যাক হওয়ার সম্ভাবনা ছিল বলে গোপন করেছে। কিন্তু তুমি জানলে কীভাবে?"

"ম্যানিপুলেশন।"

ফারহান ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকাল। তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল, "তুমি কি পা'গল হয়ে গেছ?"

"আমার আর উপায় ছিল না। যখন জিজ্ঞেস করলাম কোথায় গিয়েছিলে, তুমি কোনো উত্তর দাওনি। তাই আমাকে বাধ্য হয়ে তোমাকে ম্যানিপুলেট করতে হয়েছে।"

ফারহান দাঁত চেপে ফিসফিস করল, "এই কথা যেন আমাদের মাঝেই থাকে। যদি কারান টের পায় আমি ওকে না জানিয়েই আমেরিকায় গিয়েছিলাম, তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে যাবে। গুম করে ফেলবে দুজনকেই।"

আয়লা হঠাৎ অন্য প্রসঙ্গ তুলল, "একটা প্রশ্নের উত্তর দাও, মিরার নাম মেলেক ইলমাজ কেন দেওয়া হলো?"

ফারহান গম্ভীর স্বরে বলল, "মিরাকে সুরক্ষিত রাখার জন্য। ইউএসএ-তে আমাদের শত্রুর সংখ্যা অগণিত। একবার যদি ওরা জানতে পারে মিরা আসলে কারানের স্ত্রী, তবে ওকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে এক মুহূর্তও দেরি করবে না। তাই ওর পরিচয় আড়াল করা ছাড়া উপায় ছিল না।"

আয়লা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, "আচ্ছা... তোমরা আগে কি এমন করতে যে প্রতিটি ডিসিশনেই এত রিস্ক?"

ফারহান মুখ ঘুরিয়ে নিল। ঠান্ডা কণ্ঠে উত্তর দিল, "সেসব বলা যাবে না। তুমি বরং অপ্রয়োজনীয় দিকে মন না দিয়ে সামনে নজর দাও। শুনেছি, জেহেরের সঙ্গে বাংলাদেশের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিও যুক্ত রয়েছে।"

আয়লার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। ঠোঁট থেকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও বেরিয়ে এলো, "ও এম জি! তাহলে এবার আমাকে জেহেরের সঙ্গে প্রেম করতে হবে?"

ফারহান ম্লান হাসল, "প্রেম নয়, কিন্তু একটু লাইন তো মারতেই পারো।"

আয়লা দুষ্টু হেসে ফারহানের দিকে তাকাল। কিন্তু আর কোনো অতিরিক্ত প্রশ্ন করল না। মাথা নাড়িয়ে নীরবে কাজে মন দিল। ফারহানও তার পাশে দাঁড়িয়ে ম্যাকবুকে মনোযোগ দিল।

________

পলাশ যেহেতু পুলিশ সদর দপ্তরে খবর দিয়েছিল, তাই রাত গভীর হতেই নীলবাতি জ্বালানো গাড়ির বহর ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল। অথচ তার আগেই অন্ধকারের ফাঁক গলে OWL-রা মিলিয়ে গিয়েছিল। পুলিশের টর্চলাইটের আলোয় ধরা পড়ে গিয়েছিল পলাশের ছি'ন্নভিন্ন দেহ। দেখে মনে হয়েছিল, কোনো নৃশংস জন্তুর থাবায় তাকে ছিঁ*ড়ে ফেলা হয়েছে। দৃশ্যটি এতটাই নির্মম ছিল যে চারপাশে দাঁড়ানো অফিসারদের বুক হিম হয়ে গিয়েছিল। কণ্ঠ শুকিয়ে এসেছিল, কারো কারো হাত কেঁপে উঠেছিল।

শবদেহ দ্রুত সাদা কাপড়ে ঢেকে নেওয়া হয়েছিল। পলাশের র*ক্তাক্ত শরীরের দাগ ঢাকতে ঢাকতে একজন অফিসার বিড়বিড় করে বলেছিল, "হে আল্লাহ! এমন ন'রপি'শাচও আছে পৃথিবীতে!"

তার লা'শকে পাঠানো হয়েছিল ফরেনসিক বিভাগে, যেন টুকরো টুকরো দেহ থেকে ন্যূনতম সূত্র উদ্ধার করা যায়।

রাত গড়িয়ে ভোর হলে থানার ভেতরে ভারী নীরবতা নেমে আসল। সবার মুখেই হতাশা আর দুঃখবোধ স্পষ্ট। এমন একজন কর্মঠ, সৎ, দায়িত্বশীল পুলিশের এমন জঘন্য মৃ*ত্যু কেউই মেনে নিতে পারছিল না।

ডেস্কে বসে ছিল আমান। তার কপালে ঘাম জমে ছিল। সে ভাবছিল, কীভাবে মুখোমুখি হবে পলাশের পরিবারের? কেমন করে জানাবে, যে প্রতিদিন সত্যের সাথে লড়াই করেছে, সে আজ এমন অমানবিক মৃ*ত্যুর শিকার! বলতেও তো পারবে না যে তাদের প্রিয়জন OWL নামক অশুভ গোষ্ঠীর হাতে নিহ'ত হয়েছে। কারণ এই তদন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে গোপন। এই খবর যদি জনগণ জানতে পারে, তাহলে ভয়, বিদ্বেষ আর বিশৃঙ্খলা একসাথে বিস্ফোরিত হবে। পুলিশ বাহিনীর ওপর আস্থা ভেঙে পড়বে মুহূর্তেই। সবাই বলবে, ‘যেখানে পুলিশই নিরাপদ নয়, সেখানে সাধারণ মানুষ বাঁচবে কীভাবে?’

আমানের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে হুমায়ুন। লম্বা শরীর কেঁপে উঠছে বারবার, চোখ ভিজে উঠেছে। বুকের ভেতর শূন্যতা আর ক্রোধ একসাথে ধাক্কা দিচ্ছে। এমন একজন মানুষের অমানবিক মৃ*ত্যু তার মস্তিষ্ক মানতে চাইছে না। তার উপর সে ছিল হুমায়ুনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, প্রায় পরিবারের মতো। অসহায় বেদনায় তার ভেতরটা পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে।

অমানকে নিশ্চুপ বসে থাকতে দেখে হুমায়ুন আর সামলাতে নিজেকে পারল না। গলা কেঁপে উঠলেও সরাসরি বলেই ফেলল, "স্যার, এরপরও কি আমাদের হাত গুটিয়ে বসে থাকা উচিত হবে?"

কথাটা শুনেও আমান কোনো উত্তেজনা প্রকাশ করল না। ধীর ভঙ্গিতে কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল, "তো, কী করতে চান আপনি?"

হুমায়ুনের বুক ফেটে যাচ্ছিল ক্ষোভে, তবুও গলা সামলে বলল, "স্যার, এবার পুরো দেশে ওদের হ*ত্যাকাণ্ড প্রকাশ করা উচিত। অন্তত মেয়েরা ঘরে নিরাপদ থাকুক। আর কতকাল এমন চলবে?"

অমান ভ্রূ কুঁচকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, "আপনার নিজের কেউ কি এর শিকার হয়েছে?"

হুমায়ুন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হলো। তারপর বলল, "না তো, স্যার।"

"তাহলে এত উত্তেজনা কেন? আগে উপরমহল থেকে নির্দেশ আসুক, তারপর ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।"

অমানের নির্লিপ্ত উত্তর শুনে হুমায়ুনের ভেতরটা যেন তীব্র আগুনে জ্বলতে লাগল। সে জানে, দফতরের আমলাতান্ত্রিক নিষ্ক্রিয়তা মানেই আরো অসংখ্য নিরপরাধ প্রাণ হারানো। সে দাঁত চেপে মনে মনে উচ্চারণ করল, "ঠিক আছে। যদি রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিতে না চায়, তবে আমি নেব। পলাশের শেষ ইচ্ছা আমি পূরণ করবোই। আর কোনো মেয়ে এই দেশে লাঞ্ছিত হবে না। আজ সন্ধ্যায় গোটা দেশ জানবে আউলদের র'ক্তপিপাসার কথা। সব রিপোর্ট, সব প্রমাণ আমি নিজে প্রকাশ করব।" তার চোখে পলাশের র*ক্তাক্ত শরীরের দৃশ্য ভেসে উঠল। বুকের ভেতর প্রতিজ্ঞা আরো দৃঢ় করল, "না, আর নয়। এবার সত্য উন্মোচিত হবেই। এবার আলোয় টেনে আনতেই হবে ওদের। আই প্রমিজ, আর একটা মেয়েকে তোদের হাতে পড়তে দিব না, জা'নো'য়ারের দল।"

🍁চলবে?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন